📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হযরত উযায়র (আ)-এর জন্ম ও বংশপরিচয়

📄 হযরত উযায়র (আ)-এর জন্ম ও বংশপরিচয়


যে সব নবীর নাম কুরআন মজীদে উল্লেখ করা হইয়াছে তাঁহাদের মধ্যে হযরত উযায়র (আলায়হিস সালাম) অন্যতম। ইহাই প্রসিদ্ধ মত। তাঁহার সময়কাল খৃ. পূ. ষষ্ঠ শতাব্দী বলিয়া ধারণা করা হয়। তাঁহার পিতা ও বংশলতিকার কোন কোন নাম সম্বন্ধে ঐতিহাসিকগণের মধ্যে মতভেদ আছে। কিন্তু সকলেই এ বিষয়ে একমত যে, তিনি হযরত হারুন ইব্‌ন ইমরানের বংশধর। ইব্‌ন আসাকির তাঁহার পিতার নাম জারওয়াহ বলেন। কেহ কেহ শারখিয়া , সূরীক এবং কেহ কেহ সারুখা বলিয়া উল্লেখ করেন। বাইবেলের ইয়া (EZRA) অধ্যায়ে তাঁহার পিতার নাম সরায় বলিয়া উল্লেখ আছে। ইব্‌ন কাছীর হযরত উযায়র (আ)-এর বংশতালিকা উল্লেখ করিয়াছেন নিম্নরূপঃ উযায়র ইব্‌ন জারওয়া অথবা সুরুখা অথবা সূরী (সোরিক) ইব্‌ন আদয়া ইব্‌ন আয়্যুব ইব্‌ন দারযান ইব্‌ন উরা ইব্‌ন তাকী ইব্‌ন উসবূ ইব্‌ন ফিনহাস ইব্‌ন আযির ইব্‌ন হারূন ইব্‌ন ইমরান। মুহাম্মাদ জামীল আহমাদ বলেন, হযরত উযায়র (আ) হযরত হারুন (আ)-এর ষষ্ঠ অধঃস্তন বংশধর। বাইবেলে তাঁহার বংশতালিকা লিখিত হইয়াছে এইরূপঃ ইয়া ইব্‌ন সারায় ইব্‌ন আসরিয় ইব্‌ন হিল্কি ইব্‌ন শালুম ইব্‌ন সাদোক ইব্‌ন অহীটুব ইব্‌ন অমরিয় ইব্‌ন অসরিয় ইব্‌ন মরায়োত ইব্‌ন মরহিয় ইব্‌ন উষি ইব্‌ন বুক্কি ইব্‌ন অবীশূয় ইব্‌ন্ন পীনহস ইব্‌ন ইলিয়াসার ইব্‌ন হারূন।

টিকাঃ
আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ, ৪৩
পবিত্র বাইবেল, ইব্রা অধ্যায়, ১-৫

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 কুরআন ও হাদীছে হযরত উযায়র (আ)

📄 কুরআন ও হাদীছে হযরত উযায়র (আ)


কুরআন কারীমে হযরত উযায়র (আ)-এর নাম শুধু এক স্থানে উল্লেখ করা হইয়াছে। উহাতেও শুধু এতটুকুই বলা হইয়াছে যে, ইয়াহুদীরা হযরত উযায়র (আ)-কে আল্লাহ্র পুত্র বলে। কুরআনে বর্ণিত আছে:
وَقَالَتِ الْيَهُودُ عُزَيْرُ ابْنُ اللَّهِ وَقَالَتِ النَّصْرَى الْمَسِيحُ ابْنُ اللهِ ذَلِكَ قَوْلُهُمْ بِأَفْوَاهِهِمْ يُضَاهِنُونَ قَوْلَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ قَبْلُ قَاتَلَهُمُ اللَّهُ أَنِّي يُؤْفَكُونَ .
"ইয়াহুদীগণ বলে, উযায়র আল্লাহ্ পুত্র এবং খৃস্টানগণ বলে, মাসীহ (ঈসা) আল্লাহর পুত্র। উহা তাহাদের মুখের কথা। পূর্বে যাহারা কুফরী করিয়াছিল উহারা তাহাদের মত কথা বলে। আল্লাহ উহাদিগকে ধ্বংস করুন। আর কোন দিকে উহাদিগকে ফিরাইয়া দেওয়া হইয়াছে" (৯:৩০)?
অবশ্য সূরা বাকারায় এক ব্যক্তির একটি ঘটনা বর্ণিত হইয়াছে, যিনি গাধায় আরোহণ করিয়া এক বিধ্বস্ত জনপদ অতিক্রম করিতেছিলেন। সেখানে কোনও অধিবাসীও ছিল না এবং কোনও আবাসগৃহও ছিল না। ঐ ব্যক্তি এই অবস্থা দেখিয়া বিস্ময়ের সহিত বলিয়া উঠিলেন, এমন ধ্বংসস্তূপ এবং বিধ্বস্ত ও উজাড় জনপদ পুনরায় কেমন করিয়া আবাদ হইবে? আল্লাহ তা'আলা তৎক্ষণাৎ ঐ ব্যক্তির জান কবষ করিয়া নিলেন এবং পূর্ণ এক শত বৎসরকাল তাঁহাকে এই মৃত অবস্থায়ই রাখিয়া দিলেন। এই দীর্ঘকাল পর তাঁহাকে পুনরায় জীবন দান করিলেন। কুরআন কারীমের বর্ণনায় ঘটনাটি এইরূপ:
﴿أَوْ كَالَّذِي مَرَّ عَلَى قَرْيَةٍ وَهِيَ خَاوِيَةٌ عَلَى عُرُوشِهَا قَالَ أَنَّى يُحْيِي هَذِهِ اللَّهُ بَعْدَ مَوْتِهَا فَأَمَاتَهُ اللَّهُ مِائَةَ عَامٍ ثُمَّ بَعَثَهُ قَالَ كَمْ لَبِثْتَ قَالَ لَبِثْتُ يَوْمًا أَوْ بَعْضَ يَوْمٍ قَالَ بَلْ لَبِثْتَ مِائَةَ عَامٍ فَانْظُرْ إِلَى طَعَامِكَ وَشَرَابِكَ لَمْ يَتَسَنَّهُ وَانْظُرْ إِلَى حِمَارِكَ وَلِنَجْعَلَكَ آيَةً لِلنَّاسِ وَانْظُرْ إِلَى الْعِظَامِ كَيْفَ نُنْشِرُهَا ثُمَّ نَكْسُوهَا لَحْمًا فَلَمَّا تَبَيَّنَ لَهُ قَالَ أَعْلَمُ أَنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ .
"অথবা তুমি কি সেই ব্যক্তিকে দেখ নাই, যে এমন এক নগরে উপনীত হইয়াছিল যাহা ধ্বসস্তূপে পরিণত হইয়াছিল। সে বলিল, মৃত্যুর পর কিরূপে আল্লাহ ইহাকে জীবিত করিবেন? তৎপর আল্লাহ তাহাকে এক শত বৎসর মৃত রাখিলেন, পরে তাহাকে পুনর্জীবিত করিলেন। আল্লাহ বলিলেন, তুমি কতকাল অবস্থান করিলে? সে বলিল, এক দিন অথবা এক দিনেরও কিছু কম সময় অবস্থান করিয়াছি। তিনি বলিলেন, না, বরং তুমি এক শত বৎসর অবস্থান করিয়াছ। তোমার খাদ্যসামগ্রী ও পানীয় বস্তুর প্রতি লক্ষ্য কর, উহা অবিকৃত রহিয়াছে এবং তোমার গর্দভটির প্রতি লক্ষ্য কর, কারণ তোমাকে মানব জাতির জন্য নিদর্শনস্বরূপ করিব। আর অস্থিগুলির প্রতিও লক্ষ্য করো, কিভাবে সেইগুলিকে সংযোজিত করি এবং গোশত দ্বারা ঢাকিয়া দেই। যখন ইহা তাহার নিকট স্পষ্ট হইল, তখন সে বলিয়া উঠিল, "আমি জানি যে, আল্লাহ নিশ্চয়ই সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান" (২: ২৫৯)।
উপরিউক্ত আয়াতে উল্লিখিত ব্যক্তি কে ছিলেন, সে বিষয়ে প্রসিদ্ধ মত এই যে, তিনি ছিলেন হযরত উযায়র (আ)। আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকেই আদেশ করিয়াছিলেন, যেরুসালেম যাও, আমি উহাকে পুনরায় আবাদ করিয়া দিব। তিনি যখন তথায় পৌছিলেন এবং শহরটিকে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত ও ভগ্নস্তূপ অবস্থায় দেখিলেন, তখন উযায়র (আ) মানব সুলভ স্বভাবের তাগিদে বলিয়া উঠিলেন, এই বিধ্বস্ত জনপদে পুনরায় কেমন করিয়া প্রাণের সঞ্চার হইবে? তাঁহার এই উক্তিটি অবিশ্বাসজনিত কারণে ছিল না, বরং কিভাবে তিনি উহা বাস্তবে রূপ দিবেন তাহাই জানিতে চাহিয়াছিলেন। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা নিজের মনোনীত বান্দা ও প্রেরিত নবীর এরূপ উক্তিও পসন্দ করিলেন না। কেননা তাঁহার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট ছিল যে, আল্লাহ তা'আলা এই জনপদটিকে পুনরায় আবাদ করিয়া দেওয়ার ওয়াদা করিয়াছেন। কিন্তু তিনি সেদিকে লক্ষ্য না করিয়া বিস্ময় প্রকাশ করিলেন। ফলে আল্লাহ মানুষেরই জন্য নিদর্শনস্বরূপ তাঁহাকে এক শত বৎসর পর্যন্ত মৃত অবস্থায় রাখিলেন। আর যখন তাঁহাকে জীবিত করা হইল, তখন যেরুসালেম নগরী পূর্বাপেক্ষা সুন্দর ও সুশোভিতরূপে আবাদ হইয়া গিয়াছিল।
হযরত আলী (রা), হযরত আবদুল্লাহ ইব্‌ন আব্বাস (রা) ও হযরত আবদুল্লাহ ইব্‌ন সালাম (রা) এবং কাতাদা, সুলায়মান ইব্‌ন বুরায়দা, সুদ্দী, ইকরিমা, রাবী, দাহ্হাক ও হাসান (র) প্রমুখের মত এই যে, এই ঘটনাটি হযরত উযায়র (আ) সম্বন্ধীয়। আর ওয়াহ্হ্ব ইব্‌ন মুনাব্বিহ্ এবং 'আবদুল্লাহ ইব্‌ন উবায়দ ও ইব্‌ন জারীরের মতে ঐ ব্যক্তি ছিলেন হযরত ইরমিয়া ইন্ন হালকিয়া/কালকিয়া (ইয়ারমিয়া) (আ)। মৃত্যুর পর জীবনদান সম্পর্কে হযরত উযায়র (আ)-এর বিস্ময়ের জবাব সামগ্রিক ঘটনার মাধ্যমে দেওয়া হইয়াছে। বিস্ময়ের উপাদান ছিল প্রথমত পুনরায় জীবিত করা, দ্বিতীয়ত দীর্ঘকাল পর জীবিত করা, তৃতীয়ত বিশেষভাবে জীবিত করা, চতুর্থত এই দীর্ঘ অন্তর্বর্তী সময়ে রূহকে জীবিত রাখা, পঞ্চমত জীবিত হওয়ার পর মৃত অবস্থায় (বারযাখে) থাকার সময়কাল অজ্ঞাত থাকা। এসমুদয়ই অতি বিস্ময়কর ব্যাপার। তাই প্রথমোক্ত বিষয়টি স্বয়ং তাঁহাকে জীবিত করিয়া এবং তাঁহার গাধার মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করিয়া প্রমাণ করিয়া দেওয়া হইয়াছে। দ্বিতীয় বিষয়টি প্রমাণ করার জন্য তাঁহাকে এক শত বৎসর মৃত রাখা হইয়াছে। তৃতীয় বিষয়টির জন্য গাধাটিকে তাঁহার সামনে জীবিত করা হইয়াছে। চতুর্থ বিষয়টি প্রমাণের জন্য পানীয় অবিকৃত রাখা হইয়াছে এবং তাহার দেহকে খাদ্য, পানীয় ও দেহ পচনশীল হওয়া সত্ত্বেও অবিকৃত থাকায় রূহের জীবিত থাকার বিষয়টি আরো সুস্পষ্ট। পঞ্চম বিষয়ের জন্য "আমি একদিন কিংবা দিনের কিছু অংশ মৃত ছিলাম" তাঁহার এই উক্তি সেই বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ যে, হাশরের দিন মানুষ দীর্ঘ সময়কেও কম মনে করিবে এবং বলিবে, আমরা তো মরার পর অতিদ্রুত জীবিত হইয়া গিয়াছি।

টিকাঃ
রূহুল মা'আনী, ৩খ, পৃ. ২০; ইহয়াউ'ত রুরাছুল, 'আরাবী, বৈরূত; ইব্‌ন কাছীর, ১খ, ৩১৪ পৃ.; তাফসীর-ই মাযহারী, ২খ, পৃ. ৩৯; তাফসীর কাবরি, ৭খ, পৃ. ২৯; তারজুমানুল্-কুরআন, ২খ, পৃ. ২৩৮ উর্দু, কাশশাফ, যামাখশারী, 'আরবী, পৃ. ১০৭
তাফসীর ইন্ন কাছীর, ১খ,; পৃ. ৩১৪; তাফসীর তাবারী, ৩খ, পৃ. ১৯
বায়ানুল্ কুরআন, ১খ, পৃ, ১৫৫

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হযরত উযায়র (আ)-এর পরিবার-পরিজনদের সহিত সাক্ষাত

📄 হযরত উযায়র (আ)-এর পরিবার-পরিজনদের সহিত সাক্ষাত


মুফাসসিরগণ বলেন, হযরত উযায়র (আ) যখন এক শত বৎসর পর জীবিত হন, তখন শহরটি খুব সুন্দরভাবে গড়িয়া উঠিয়াছিল। তাঁহার মৃত গাধাটিকে তাঁহার চোখের সামনে অলৌকিকভাবে জীবিত করা হইল। তিনি সওয়ার হইয়া গৃহের দিকে রওয়ানা হন। কিন্তু কেহ তাঁহাকে চিনিতে পারিল না। কেননা মৃত্যুকালে তিনি যুবক ছিলেন এবং তাঁহার পূর্বের সন্তানগণ বৃদ্ধ হইয়া গিয়াছিল। জনপদের নূতন গঠন-কাঠামো দেখিয়া তিনি নিজেও তাঁহার ঘর-বাড়ি চিনিতে পারিলেন না। কিছু লোককে বলিলেন, আমি 'উযায়র, কিন্তু কেহ তাহা বিশ্বাস করিল না। একটি ঘরের দরজায় এক অন্ধ বুড়িকে দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, ইহা কি 'উযায়রের ঘর? বুড়ি বলিল, হ্যাঁ। তবে তুমি কে? দীর্ঘকাল পর তুমি আমার মনিবের নাম লইতেছ। তিনি বলিলেন, আমি উযায়র। সেবিকা বুড়ি বলিল, আপনি উযায়র? তিনি তো এক শত বৎসর পূর্বে নিখোঁজ হইয়া গিয়াছেন। তিনি কোথায় উধাও হইয়া গিয়াছেন, তাঁহার কোন সন্ধান পাওয়া যায় নাই। হযরত উযায়র (আ) মুস্তাজাবুদ্‌-দা'ওয়াত ছিলেন। অর্থাৎ তিনি আল্লাহ্র কাছে যে দু'আই করিতেন, তাহা সঙ্গে সঙ্গে কবুল হইত। আপনি যদি উযায়র হইয়া থাকেন তবে দু'আ করুন, আমার অন্ধত্ব যেন ঘুচিয়া যায়। আমি যেন চোখে দেখিতে পারি। হযরত 'উযায়র দু'আ করিলেন এবং তাঁহার হাত বুড়ির চোখে বুলাইয়া দিলেন। আল্লাহ তাঁহার দু'আ কবুল করিলেন এবং বুড়ি দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়া পাইল। তখন বুড়ি উচ্চৈঃস্বরে চিৎকার করিয়া বলিল, নিশ্চয় আপনি উযায়র। আমি সাক্ষ্য দিতেছি এবং আমি এখন আপনাকে চিনিতে পারিয়াছি। এতকাল পরও আপনার আকার-আকৃতি ও চেহারা-সুরতে কোন পরিবর্তন সাধিত হয় নাই। অন্ধ বুড়ি পঙ্গুও ছিল। উযায়র (আ) তাঁহার হাত ধরিয়া আল্লাহর হুকুমে দাঁড়াইতে বলায় বুড়ির পঙ্গুত্ব দূর হইয়া যায় এবং সে দৌড়াইয়া পরিবার-পরিজনকে খবর দেয়। হযরত উযায়রের একজন পুত্র জীবিত ছিলেন। তিনি এক শত আঠার বৎসরের বৃদ্ধ হইয়া গিয়াছিলেন। পৌত্রও বৃদ্ধ হইয়া গিয়াছেন। বনু 'ইসরাঈলের অনেক বৃদ্ধ-যুবা জমা হইয়া গেল। বুড়ি বলিল, আমি তাঁহার দু'আয় দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়া পাইয়াছি ও আমার পঙ্গুত্ব দূর হইয়াছে। পুত্র বলিলেন, উযায়রের দুই কাঁধের মাঝখানে একটি কাল তিল ছিল। সেইটি দেখাও। তিনি পিঠ খুলিলেন। পুত্র তিল দেখিয়া চিনিতে পারিলেন এবং পিতাকে জড়াইয়া ধরিলেন। বনু ইসরাঈল বলিল, উযায়র ছাড়া আর কাহারও তাওরাত মুখস্থ ছিল না। আপনি উযায়র হইলে আমাদিগকে তাওরাত লিখিয়া দিন। উযায়র (আ) লোকদিগকে লইয়া একটি নির্দিষ্ট স্থানে যান, যেখানে তাঁহার পিতা তাওরাতের একটি কপি মাটিতে পুতিয়া রাখিয়াছিলেন। কপিটি মাটি খুঁড়িয়া উদ্ধার করা হইল। তিনি তাঁহার স্মৃতি হইতে তাওরাত আবৃত্তি করিতে লাগিলেন যাহা হুবহু মিলিয়া গেল। তখন লোকেরা তাঁহার প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধায় এত বাড়াবাড়ি করিল যে, তাঁহাকে আল্লাহ্ পুত্র বলিতে লাগিল। বিষয়টি কুরআনে কারীমে উল্লিখিত হইয়াছে এইভাবে: قَالَتِ الْيَهُودُ عُزَيْرُن بنُ الله “আর ইয়াহুদীরা বলিত, 'উযায়র আল্লাহ্র পুত্র” (বিদায়া, ২খ, ৪৪-৪৫; তারীখ-ই আম্বিয়া, ২খ, তা.বি.)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 অন্যান্য ধর্মগ্রন্থে হযরত উযায়র (আ)

📄 অন্যান্য ধর্মগ্রন্থে হযরত উযায়র (আ)


কুরআন মজীদ কিংবা বিশুদ্ধ হাদীছে উযায়র (আ) সম্বন্ধে বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায় না বিধায় এখন এই ব্যাপারে বাইবেলের বিবরণের উপর নির্ভর করিতে হয়। বাইবেল ইতিহাস গ্রন্থটি হইতে জানা যায় যে, যখন বনী ইসরাঈলের অবাধ্যাচরণ ও অপকর্ম সীমা অতিক্রম করিয়া গিয়াছে এবং অত্যাচার ও উৎপীড়নের অবস্থা চরমে উঠিয়াছে, আল্লাহ তা'আলার তরফ হইতে তৎকালের পয়গাম্বর ইয়ারমিয়া (যিরমিয়) (আ)-এর উপর ওয়াহী আসিল যে, বনী ইসরাঈলের মধ্যে ঘোষণা করিয়া দাও, তাহারা যেন এ সমস্ত অসৎকার্য হইতে বিরত থাকে। অন্যথায় অন্যান্য জাতির ন্যায় তাহাদেরকে ধ্বংস করিয়া দেওয়া হইবে। ইয়ারমিয়া (আ) যখন আল্লাহ্ এই পয়গাম বনী ইসরাঈলের নিকট পৌছাইলেন, তখন তাহারা ইহার প্রতি কর্ণপাত করিল না, বরং অত্যাচার-অপকর্ম আরও বাড়াইয়া দিল, ইয়ারমিয়ার সহিত ঠাট্টা-বিদ্রূপ করিতে লাগিল, এমনকি তাঁহাকে গৃহবন্দী করিয়া রাখিল। এই অবস্থায়ও তিনি তাহাদেরকে বলিলেন, তাহারা ব্যাবিলনের বাদশাহ্ হাতে ধ্বংসপ্রাপ্ত হইবে। সে তাহাদেরকে বন্দী করিয়া ব্যাবিলনে লইয়া যাইবে আর যেরুসালেমকে বিলীন করিয়া ফেলিবে।
খৃ.পূ. সপ্তম শতাব্দীর প্রায় মধ্যভাগে নেবুকাদ নাযারের (বুখ্ নাসার-এর) আবির্ভাব হইল। সে তাহার প্রবল ক্ষমতাবলে আশেপাশের রাজ্যসমূহকে অধীন করিয়া লইল। স্বল্পকাল মধ্যে সে উপর্যুপরি তিনবার ফিলিস্তীন আক্রমণ করিয়া বনী ইসরাঈলকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করিল। যেরুসালেম ও ফিলিস্তীনের সমগ্র অঞ্চলটিকে ধ্বংস করিয়া ফেলিল। সমস্ত বনী ইসরাঈলকে বন্দী করিয়া ভেড়া ও বকরীর পালের ন্যায় হাঁকাইয়া ব্যাবিলনের দিকে লাইয়া গেল। তাওরাতের সমস্ত কপি পোড়াইয়া ফেলিল। একটি কপিও বনী ইসরাঈলের হাতে অবিশিষ্ট রহিল না। যে সময় 'বুখত্নাসার ইসরাঈলী পরিবারগুলিকে বন্দী করিয়া দাসে পরিণত করিতেছিল তখন এক ব্যক্তি তাহাকে বলিল, এখানে ইয়ারমিয়া নামের এক ব্যক্তি বন্দীখানায় আবদ্ধ রহিয়াছেন। তিনি তোমার এই আক্রমণের পূর্বেই সম্যক অবস্থা সম্বন্ধে বনী ইসরাঈলকে ভবিষ্যদ্বাণীর মাধ্যমে সতর্ক করিয়াছিলেন কিন্তু তাঁহার কওম তাঁহার কথায় কর্ণপাত না করিয়া তাঁহাকে কারাগারে আবদ্ধ রাখিয়াছে। বুখতনাসার একথা শুনিয়া ইয়ারমিয়া (আ)-কে কারাগার হইতে বাহিরে আনিয়া তাঁহার সহিত কথাবার্তা বলিল। ইয়ারমিয়া (আ)-এর জ্ঞান ও যুক্তিপূর্ণ কথাবার্তা শুনিয়া সেও আগ্রহ প্রকাশ করিল যে, তিনিও যেন তাহার সঙ্গে ব্যাবিলনে গমন করেন। সেখানে সে তাঁহাকে সম্মানের সহিত রাখিবে। কিন্তু হযরত ইয়ারমিয়া (আ) এই বলিয়া তাহার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করিলেন যখন আমার কওম অপমান ও লাঞ্ছনার সহিত ব্যাবিলনে যাইতেছে, তখন আমি আমার এই সম্মানের তুলনায় আমার বর্তমান অবস্থাকে উত্তম মনে করিতেছি। অতঃপর তিনি যেরুসালেম হইতে দূরে কোন এক জঙ্গলে বসবাস করিতে লাগিলেন। ইয়ারমিয়া নবীর সহীফায় ইহাও আছে যে, তিনি সেখানে থাকিয়াই ব্যাবিলনে ইসরাঈলীদেরকে এই মর্মে ভবিষ্যদ্বাণী লিখিয়া পাঠাইয়াছিলেন যে, বনী ইসরাঈল সত্তর বৎসর পর্যন্ত ব্যাবিলনে অপমান ও লাঞ্ছনার সহিত থাকিবে। অতঃপর তাহারা আবার নিজেদের দেশে আসিয়া বসবাস করিবে।
অতঃপর বুখত্নাসারের মৃত্যুর পর খৃ. পৃ. প্রায় ৫৩৯ সালে পারস্য-রাজ সাইরাস (কায়খসরু) ব্যাবিলনের রাজা বেলশাহারকে পরাস্ত করিয়া পারস্য রাজ্যকে তাহার অত্যাচার হইতে মুক্ত করিলেন। সেই সময়ই তিনি ইসরাঈলকেও মুক্ত করিলেন এবং যেরুসালেম ও সেখানকার উপাসনালয় নির্মাণ করার জন্য তাহাদেরকে অনুমতি প্রদান করিলেন। পারস্য-রাজ কায়খসরূ ব্যাবিলন জয় করার পর আরও প্রায় দশ বৎসর জীবিত ছিলেন। সেই সময় বনী ইসরাঈল মুক্ত হইয়া বায়তুল মাকদিস নির্মাণকার্যে নিয়োজিত হইল। কিন্তু বাইবেলে ইয়া পুস্তক হইতে বুঝা যায় যে, এই নির্মাণ কার্য কায়খসরূর জীবিতকালে সমাপ্ত হয় নাই। মধ্যস্থলে কোন কোন নেতার হস্তক্ষেপের কারণে দুইবার বনী ইসরাঈলকে বায়তুল-মাকদিসের নির্মাণকার্য কিছু কালের জন্য বন্ধ রাখিতে হইয়াছিল। অনন্তর কায়খসরূর পরে দারা এবং দারার পরে আর্দেশেরের যুগে তাহারা উহার পুননির্মাণ সমাপ্ত করিতে সক্ষম হয় এবং যেরুসালেম আরেক বার পূর্বাপেক্ষা অধিক সুশোভিত শহররূপে দৃষ্ট হইতে লাগিল। এসব বিবরণের সারমর্ম এই যে, বুখত নাসার কর্তৃত যেরুসালেম ধ্বংস হওয়ার পর কায়খসরু হইতে আর্দশেরের যুগ পর্যন্ত ইহা পুনরায় পুরাপুরি আবাদ হওয়ার মধ্যবর্তী সময়ে ইয়ারমিয়া (প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী উযায়র) (আ)-এর সেই ঘটনাটি ঘটিয়া ছিল যাহা সূরা বাকারায় বর্ণিত হইয়াছে।
হযরত উযায়র (আ)-এর পবিত্র জীবন সম্বন্ধে যে সমস্ত বিবরণ বাইবেলে বর্ণিত হইয়াছে, উহা হইতে বুঝা যায় যে, বনী ইসরাঈল ব্যাবিলনীয়দের হাতে বন্দী হওয়ার সময় হযরত উযায়র (আ) অল্পবয়স্ক ছিলেন এবং ইসরাঈলীদের সঙ্গে ব্যাবিলনেই ছিলেন। চল্লিশ বৎসর বয়সে ব্যাবিলনেই তিনি নবুওয়াত লাভ করেন আর যেরুসালেমের নির্মাণকার্য বাধা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে দারা ও আর্দেশেরের দরবারের যেই প্রতিনিধিদল অভিযোগ করিয়াছিল, তাহাতেও উযায়র (আ)-ই পুরোভাগে ছিলেন। আর বুস্ত নাসার কর্তৃক তাওরাত ধ্বংস হওয়ার পর যেরুসালেমে নূতন করিয়া তাওরাতের পুণর্লিখন ও পুনরুদ্ধার তাঁহারই নবুওয়াতের ফলে হইয়াছিল। খৃ.পৃ. ৪৫৮ সালে হযরত উযায়র (আ) ইয়াহুদিয়ায় পৌছেন। পারস্য-রাজ আর্দশের এক ফরমানবলে তাঁহাকে ক্ষমতা দান করেন। এই ফরমানবলে হযরত উযায়র (আ) মূসা (আ)-এর দীনের পুনরুজ্জীবনে বিরাট দায়িত্ব সম্পাদন করেন। তিনি বিভিন্ন এলাকা হইতে ইয়াহুদী জাতির সকল সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ লোককে একত্র করিয়া একটি শক্তিশালী শাসনব্যবস্থা গড়িয়া তোলেন। ইয়াহুদীদের দীনী শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। অন্য জাতির প্রভাবে বনী ইসরাঈলের মধ্যে যেসব আকীদাগত ও চারিত্রিক অনাচারের অনুপ্রবেশ ঘটিয়াছিল শরীআতের আইন জারী করিয়া তিনি সেগুলি দূর করেন। ইয়াহুদীরা যেসব মুশরিক মেয়েকে বিবাহ করিয়া ঘর-সংসার করিত, তাহাদেরকে তালাক দিবার ব্যবস্থা করেন। বনী ইসরাঈল-এর নিকট হইতে আবার নূতন করিয়া আল্লাহ্ বন্দেগী করার এবং তাঁহার আইন মানিয়া চলার অঙ্গীকার নেন।

টিকাঃ
পবিত্র বাইবেলের যিরমিয়া পুস্তক, কাসাসুল্-কুরআন, ২খ, পৃ. ২৩৯
কাসাসুল কুরআন, ২খ, ২৪০; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ, ৩৭-৩৮; তারীখ-ই ইব্‌ন খালদুন, এনসাইক্লোপেডিয়া অফ ইসলাম
কাসাসুল কুরআন, ২খ, ২৪০
কাসাসুল কুরআন, ২খ, ২৪১
তাফহীমুল কুরআন উর্দু, ২খ. ১৮৯
দ্র. ইয়া পুস্তক ৭: ২৫-২৬
তাফহীমুল কুরআন ২খ, ৫৯৯, টীকা, ৮

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00