📄 সূচনা
হযরত ইলিয়াস (আ) ছিলেন বনী ইসরাঈলের অন্যতম নবী। তিনি হযরত হিযকীল (আ)-এর পরে নবী হন। কুরআন মজীদে তাঁহাকে 'ইলয়াস' নামে অভিহিত করা হইয়াছে। কিন্তু বাইবেলে তাঁহাকে এলিয়, ইলিয়াহ ও এলিজা বলা হইয়াছে। কুরআন মজীদে তাঁহার নাম দুই স্থানে তিনবার উল্লিখিত হইয়াছে। সূরা আন'আম-এর ৮৫ নং আয়াতে পয়গম্বরগণের তালিকায় তাঁহার নাম রহিয়াছে, কিন্তু কোন ঘটনা উল্লেখ করা হয় নাই। সূরা আস-সাফাত-এর ১২৩ হইতে ১৩২ পর্যন্ত আয়াতে তাঁহার নবুওয়াত প্রাপ্তি ও নিজ সম্প্রদায়কে হেদায়াত করা সংক্রান্ত অবস্থাদি সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণনা করা হইয়াছে:
وَكُلًّا هَدَيْنَا وَنُوحًا هَدَيْنَا مِنْ قَبْلُ وَمِنْ ذُرِّيَّته دَاوُدَ وَسُلَيْمَانَ وَأَيُّوبَ وَيُوسُفَ وَمُوسَى وَهَرُونَ وَكَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ. وَزَكَرِيَّا وَيَحْيَى وَعِيسَى وَالْيَاسَ كُلُّ مِنَ الصَّلِحِينَ ، وَاسْمُعِيلَ وَالْيَسَعَ وَيُونُسَ وَلُوْطًا وَكُلًّا فَضَّلْنَا عَلَى الْعُلَمِينَ.
"আমি তাহাদের প্রত্যেককে হেদায়াত দান করিয়াছি। নূহকে হেদায়াত দান করিয়াছি ইহার পূর্বে, তাঁহার বংশধরদের মধ্য হইতে দাউদ, সুলায়মান, আয়্যব, ইউসুফ, মূসা এবং হারূনকেও। এইরূপেই আমি সৎকর্মশীলদের প্রতিদান দিয়া থাকি। যাকারিয়া, ইয়াহইয়া, ঈসা এবং ইলয়াসকেও। ইহারা সকলেই ছিল সজ্জনদের অন্তর্গত। ইসমাঈল, আল-য়াসা, ইউনুস এবং লূতকেও। সবাইকেই আমি বিশ্ববাসীর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করিয়াছিলাম" (৬:৮৫)।
ইহা মূলত হযরত ইবরাহীম (আ)-এর সন্তান ও তাঁহাদের বংশধরদের মধ্যকার নবী-রাসূলগণের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা। এইখানে বনী ইসরাঈল বংশীয় নবীগণকে বিশেষ বিশেষ বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়া তিন ভাগে বিভক্ত করা হইয়াছে। কিছু সংখ্যক নবী-রাসূল এমন ছিলেন যাঁহারা রাজ্য ক্ষমতা কিংবা মন্ত্রিত্ব ও নেতৃত্বের অধিকারী ছিলেন। যেমন হযরত দাউদ, সুলায়মান, আয়্যব, ইউসুফ, মূসা ও হারুন (আ)। প্রথম দুইজন বিশাল রাজ্যের, তৃতীয়জন একটি ক্ষুদ্র রাজ্যের, চতুর্থজন মন্ত্রিত্বের এবং পঞ্চম ও ষষ্ঠজন নেতৃত্বের অধিকারী ছিলেন। দ্বিতীয় শ্রেণীতে রহিয়াছেন সেই সকল নবী-রাসূল, যাঁহারা পার্থিব জীবনের প্রতি অনাসক্ত ছিলেন। সারা দিন তাঁহারা সত্যের প্রচারে মশগুল থাকিতেন। হযরত যাকারিয়্যা, ইয়াহইয়া, 'ঈসা ও ইলয়াস আলায়হিমুস সালাম এই শ্রেণীর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তৃতীয়ভাগে সেইসব পয়গম্বরের নাম উল্লেখ করা হইয়াছে যাঁহারা রাজত্ব কিংবা কর্তৃত্বের অধিকারী ছিলেন না, বরং তাঁহারা মধ্যম প্রকারের জীবন যাপন করিয়া সত্য প্রচারে জীবন কাটাইয়াছেন। যেমন হযরত ইসমাঈল, আল-য়াসা, ইউনুস ও লুত আলায়হিমুস সালাম। সূরা আস-সাফফাতে ইয়াস (আ)-এর রিসালাত এবং তাঁহার নিজ সম্প্রদায়কে সত্যের পথে আহবান সংক্রান্ত অবস্থাদি সংক্ষিপ্তভাবে উল্লেখ করা হইয়াছে :
وَإِنَّ الْبَاسَ لَمِنَ الْمُرْسَلِينَ ، إِذْ قَالَ لِقَوْمِهِ أَلَا تَتَّقُونَ . أَتَدْعُونَ بَعْلًا وَتَدْرُونَ أَحْسَنَ الْخَالِقِينَ . اللَّهَ رَبَّكُمْ وَرَبُّ أَبَائِكُمُ الأَوَّلِينَ . فَكَذَّبُوهُ فَإِنَّهُمْ لَمُحْضَرُونَ ، إِلَّا عِبَادَ اللَّهِ الْمُخْلَصِينَ، وَتَرَكْنَا عَلَيْهِ فِي الآخِرِينَ ، سَلَامٌ عَلَى الْيَاسِينَ . إِنَّا كَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ ، إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا الْمُؤْمِنِينَ.
"নিঃসন্দেহে ইলয়াস রাসূলগণের অন্তর্ভুক্ত, যখন তিনি নিজ সম্প্রদায়কে বলিলেন, তোমরা কি সাবধান হইবে না? তোমরা বা'লকে ডাকিতেছ অথচ সর্বোত্তম স্রষ্টাকে পরিহার করিতেছ? আল্লাহকে, যিনি তোমাদের প্রভু, তোমাদের পূর্বপুরুষদেরও প্রভু। তাহারা তাঁহাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করিল। সুতরাং তাহাদিগকে উপস্থিত করা হইবে। তবে আল্লাহ্ নিষ্ঠাবান বান্দাগণকে নহে। আমি পরবর্তী কালের লোকদের মধ্যে তাহার আলোচনা স্থায়ী রাখিয়াছি। ইলয়াসীনের উপর শান্তি বর্ষিত হউক। নিশ্চয় আমি সৎকর্মশীলদিগকে এইরূপ প্রতিদান দিয়া থাকি। নিশ্চয় সে আমার মুমিন বান্দাদিগের অন্তর্গত" (৩৭: ১২৩-১৩২)।
এই স্থলে কুরআন মজীদে উল্লিখিত الياسين শব্দ সম্পর্কে মাওলানা 'আবদুর রশীদ নু'মানী (করাচী) বলেন, ইলয়াস শব্দটির ভিন্ন উচ্চারণ ইলয়াসীন। কারণ ইলয়াস একটি অনারব বিশেষ্য। অনারব বিশেষ্যসমূহের উচ্চারণে আরবরা অনেক সময় ভিন্নতা করিয়া থাকে। যেমন ইসমাঈলের স্থলে ইসমাঈন, মীকাঈলের স্থলে মীকাল বা মীকাঈন, ইবরাহীম-এর স্থলে ইবরাম বা ইবরাহাম, ইসরাঈল-এর পরিবর্তে ইসরাঈন, তুর সীনা-এর পরিবর্তে তৃর-সীনীন ইত্যাদি। আরবদের নিয়ম রহিয়াছে, তাহারা অনেক সময় সম্প্রদায়ের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তির নামে গোটা সম্প্রদায়কে আখ্যায়িত করিয়া থাকে। এই হিসাবে ইলয়াসীন বলিতে হযরত ইলয়াস (আ)-এর অনুসারিগণকে বুঝানো হইতে পারে বলিয়া অনেকে মনে করিয়াছেন। কিন্তু তাহা সঠিক নহে। কারণ পূর্বাপর বর্ণনা ইহার সহিত সঙ্গতিপূর্ণ মনে হয় না। তেমনি এনসাইক্লোপিডিয়া অব ইসলাম-এর নিছক দ্যোতনা রক্ষা ও ছান্দিকতা বজায় রাখার জন্য ইলয়াস শব্দটিকে ইলয়াসীন-এ রূপান্তরিত করা হইয়াছে বলিয়া মি. উইনসিংক যে মন্তব্য করিয়াছেন, তাহাও সঠিক বলিয়া প্রতীয়মান হয় না। কেননা আরবী ভাষায় উভয় শব্দ প্রচলিত রহিয়াছে। সুতরাং রূপান্তরের দাবি করা সঙ্গত হইতে পারে না। বস্তুত কুরআন মজীদে হযরত ইল্ল্যাস (আ)-এর জীবনালেখ্য ও দাওয়াতী কার্যক্রম বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয় নাই। নির্ভরযোগ্য হাদীছেও উহা পাওয়া যায় না। তাই তাঁহার সম্পর্কে তাফসীরের গ্রন্থাদিতে যেইসব উক্তি ও বিবরণ পাওয়া যায়, উহার অধিকাংশই ইসরাঈলী রিওয়ায়াত হইতে গৃহীত হইয়াছে বলিয়া উহার গ্রহণযোগ্যতা লইয়া প্রশ্ন উত্থাপনের যথেষ্ট অবকাশ রহিয়াছে।
টিকাঃ
যোহন লিখিত সুসমাচার, ১৪ ২১, পৃ. ১৫৮
আবদুর রশীদ নু'মানী, লুগাতুল-কুরআন, ১খ., ২৩
📄 বংশপরিচয়
অধিকাংশ ঐতিহাসিক ও মুফাসসির এই ঐকমত্য পোষণ করেন যে, হযরত ইলয়াস (আ) ছিলেন বনী ইসরাঈলের অন্যতম নবী এবং তিনি হযরত হারুন (আ)-এর বংশধর। তাঁহার পিতৃপরম্পরা হইল : ইলয়াস ইবন য়াসীন ইবন ফিলহাস ইবন 'আয়যার ইব্ন 'ইমরান ইব্ন হারূন (আ)। অথবা ইলয়াস ইবন 'আযির ইবন 'আয়যার ইব্ন হারূন। কিন্তু 'আবদ ইব্ন হুমায়দ, মুহাম্মাদ ইবন জারীর, ইবনুল মুনযির, ইব্ন আবী হাতিম, ইবন 'আসাকির প্রমুখ মুহাদ্দিছ হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ (রা)-এর বরাত দিয়া বর্ণনা করিয়াছেন যে, হযরত ইদরীস (আ)-ই হইলেন ইলয়াস (আ)। হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ (রা)-এর উক্তির একটি অর্থ এই হইতে পারে যে, দুই নামের একটি তাঁহার প্রকৃত নাম, অপরটি উপনাম। কিন্তু যদি ইহার অর্থ এই হয় যে, ইলয়াস বলিতে প্রসিদ্ধ পয়গাম্বর হযরত ইদরীস (আ)-কে বুঝানো হইয়াছে, তবে তাহা হইবে অধিকাংশ গবেষক ও মনীষীর অভিমতের পরিপন্থী। কেননা কুরআন মজীদে দুইজনের আলোচনা আলাদাভাবে করা হইয়াছে। তাহা হইতে দুইজন যে পৃথক পৃথক ব্যক্তি তাহাই প্রতীয়মান হয়। তাহা ছাড়া সূরা আন্আমের যে আয়াতে আম্বিয়ায়ে কিরামের নামের তালিকায় তাঁহার উল্লেখ রহিয়াছে, উহা হইতেও এই অভিমতের বিশুদ্ধতা সাব্যস্ত করা যায় না। সেখানে উল্লিখিত وَمِنْ ذُرِّيَّتِهِ -এর সর্বনাম দ্বারা হযরত ইবরাহীম (আ) উদ্দেশ্য হইবেন অথবা নূহ (আ) হইবেন। ইহাই অধিক যুক্তিসঙ্গত। কেননা নূহ (আ)-এর নামই নিকটবর্তী। দ্বিতীয়ত, আয়াতে উল্লিখিত ইউনুস (আ) ও লূত (আ) হযরত ইবরাহীম (আ)-এর বংশধর নহেন।
মোট কথা, কুরআন মজীদে হযরত ইল্যাস (আ)-কে হযরত ইবরাহীম (আ) অথবা হযরত নূহ (আ)-এর বংশধর বলিয়া বর্ণনা করা হইয়াছে। অথচ অধিকাংশ ঐতিহাসিক ও মুফাসসিরের বর্ণনা মুতাবিক হযরত ইদরীস (আ)-এর সময়কাল ছিল হযরত নূহ (আ)-এর অনেক পূর্বে। হাকেম (র) তাঁহার মুস্তাদরাক-এ আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস (রা)-এর বরাত দিয়া বর্ণনা করিয়াছেন, হযরত নূহ (আ) ও হযরত ইদরীস (আ)-এর সময়কালের মধ্যে এক হাজার বৎসরের ব্যবধান ছিল। কিন্তু ইমাম বুখারী (R) তাঁহার আল-জামি'উ'স-সাহীহ-এ আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা)-এর একটি উক্তি সনদ ব্যতীত উদ্ধৃত করিয়াছেন যাহা আবদুল্লাহ ইবন মাস'ঊদ (রা)-এর উক্তিরই অনুরূপ। 'আবদুর রশীদ নু'মানীর মতে, ইমাম বুখারী (র) সনদ উল্লেখ না করিলেও হাকিম তাঁহার মুস্তাদরাক-এ সনদ উল্লেখ করিয়া আবদুল্লাহ ইব্ন আব্বাস (রা)-এর যে উক্তি উদ্ধৃত করিয়াছেন তাহার ভিত্তিতে প্রমাণিত হয় না যে, হযরত ইদরীস (আ)-এর সময়কাল হযরত নূহ (আ)-এর পূর্বে; বরং হযরত নূহ (আ)-এরই সময়কাল ছিল হযরত ইদরীস (আ)-এর পূর্বে। অনুরূপভাবে হাফিজ আবু বাক্ ইবনুল 'আরাবী (র) বুখারী শরীফে আবদুল্লাহ ইবন মাস'ঊদ (রা) ও হযরত 'আবদুল্লাহ ইব্ন 'আব্বাস (রা)-এর উক্তিকে যুক্তি হিসাবে ব্যবহার করিয়া মন্তব্য করেন যে, হযরত ইদরীস (আ) প্রকৃতপক্ষে হযরত নূহ (আ)-এর পূর্বপুরুষ ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন বনী ইসরাঈল-এর আম্বিয়ায়ে কিরামের অন্যতম। কেননা হযরত ইলয়াস (আ) সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, তিনি ছিলেন ইসরাঈলী নবী।
এই প্রসঙ্গে তিনি মহানবী (স)-এর মি'রাজ রজনী সংক্রান্ত প্রসিদ্ধ হাদীছ উপস্থাপন করেন। উহাতে রহিয়াছে, হযরত ইদরীস (আ) তখন মহানবী (স)-কে অভ্যর্থনা জানাইতে গিয়া বলিলেন, "মারহাবা বান্নাবী আস সালেহ ওয়াল আখুস্ সালেহ" অর্থাৎ মহানবী (স)-কে তিনি ভাই বলিয়া সম্বোধন করেন। হযরত ইদরীস (আ) যদি প্রকৃতই হযরত নূহ (আ)-এর পূর্বের যুগের হইতেন, তাহা হইলে তিনি মহানবী (স)-কে সম্বোধনে 'আল ইবনুস্ সালেহ' (সুযোগ্য পুত্র) শব্দ ব্যবহার করিতেন, যেমন করিয়াছিলেন হযরত আদম (আ) ও হযরত ইবরাহীম (আ)। কিন্তু হাফিজ ইব্ন কাছীর (র) তাঁহার 'আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া' গ্রন্থে লিখিয়াছেন, সম্ভবত হাদীছের বর্ণনাকারী মহানবী (স)-এর উচ্চারিত শব্দসমূহ ভালভাবে স্মরণ রাখিতে ব্যর্থ হইয়াছেন অথবা হযরত ইদরীস (আ) বিনয়ের কারণে নিজের পিতৃসম্পর্ক উল্লেখ করেন নাই। তথাপি ইহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই যে, হযরত ইদরীস (আ) ও হযরত ইলয়াস (আ)-এর ব্যক্তিত্ব পৃথক পৃথক হওয়ার পক্ষে ইহা ব্যতীত আর কোন প্রমাণ উপস্থাপন করা সম্ভবপর নহে যে, কুরআন মজীদে তাঁহাদের দুইজনকে পৃথক পৃথক নামে উল্লেখ করা হইয়াছে। বস্তুত এই যুক্তি এমন অকাট্য নহে, যাহার ভিত্তিতে কোন নিশ্চিত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায়। অধিকাংশ ঐতিহাসিকের এই সংক্রান্ত বিবরণী ইসরাঈলী সাহিত্য হইতে সংগৃহীত। সুতরাং উহার বিশুদ্ধতা প্রশ্নাতীত নয়। যাঁহারা হযরত ইদরীস (আ) ও হযরত ইলয়াস (আ) বলিতে একই ব্যক্তিত্ব উদ্দেশ্য হওয়ার পক্ষে অভিমত পোষণ করেন, তাঁহাদের যুক্তির সারসংক্ষেপ ইহাই।
মহানবী (সা)-এর একটি হাদীছে এই মর্মেও বর্ণনা রহিয়াছে যে, হযরত খিযির (আ) ও হযরত ইলয়াস (আ) অভিন্ন ব্যক্তি। ইব্ন মারদাবিয়্যা সূরা আন'আম-এর তাফসীরে ইহা উল্লেখ করিয়াছেন। হাফিজ ইব্ন হাজার আসকালানী (র) তাঁহার আল-ইসাবা গ্রন্থে এই বর্ণনার বিস্তারিত সনদ উল্লেখ করিয়াছেন। তিনি কোন রাবীর যদিও সমালোচনা করেন নাই, তবুও বলিয়াছেন যে, সনদটি একেবারেই গরীব বা অপ্রসিদ্ধ। গবেষক ও সত্য সন্ধানী মনীষিগণ এই অভিমত খণ্ডন করিয়াছেন। সুতরাং হযরত ইলয়াস (আ) একজন স্বতন্ত্র পয়গাম্বর। তিনি হযরত ইদরীস (আ)-ও নহেন, হযরত খিযির (আ)-ও নহেন। তিনি একজন ইসরাঈলী নবী এবং হযরত মূসা (আ)-এর তিরোধানের অনেক পরে প্রেরিত হইয়াছিলেন।
হযরত মূসা (আ) ও হযরত হারুন (আ)-এর পরে প্রথমদিকে যাঁহারা তাঁহাদের স্থলবর্তী হইয়াছিলেন, কুরআন মজীদে তাঁহাদের নাম উল্লেখ করা হয় নাই। হযরত যূশা' (আ)-এর বিষয় দুই স্থানে আলোচনা করা হইয়াছে। কিন্তু এক স্থানে ফাতাহু অর্থাৎ হযরত মূসা (আ)-এর যুবক সঙ্গী (কাহফঃ ৬০) বলা হইয়াছে। অন্য এক স্থানে অর্থাৎ সূরা মাইদায় (আয়াত ২৬) রজ্ লান বলিয়া হযরত যূশা' (আ) ও হযরত কালিব ইব্ন যুকান্না (আ)-কে বুঝানো হইয়াছে। হযরত হিযকীল (আ)-এর আলোচনা অধিকাংশ তাফসীরবিদ ও ঐতিহাসিকের বর্ণনা অনুযায়ী শুধুমাত্র ঘটনার মাধ্যমেই করা হইয়াছে, কোন আয়াতে কোন বিশেষণের মাধ্যমেও তাঁহার উল্লেখ করা হয় নাই।
হযরত মূসা (আ) ও হযরত হারুন (আ)-এর পরে সর্বপ্রথম যেই পয়গম্বরের বিষয় কুরআন মজীদে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা হইয়াছে, তিনি হইলেন হযরত ইয়াস (আ)। আল্লামা তাবারী (র)-এর বর্ণনামতে, তিনি ছিলেন হযরত আল্-য়াসা' (আ)-এর চাচাত ভাই।
📄 নবুওয়াত লাভের স্থান ও সময়কাল
হযরত ইলয়াস (আ) কখন কোথায় প্রেরিত হইয়াছিলেন, কুরআন ও হাদীছে তাহার কোন উল্লেখ নাই। কুরআন মজীদে অতীত যুগের কাহিনী বর্ণনার উদ্দেশ্য হইল উম্মতে মুহাম্মদীকে পূর্বযুগের লোকদের ঘটনা স্মরণ করাইয়া উহা' হইতে উপদেশ গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করা। তাই কুরআন মজীদে পূর্ববর্তী ঘটনাসমূহের শুধুমাত্র ততটুকু অংশই উল্লেখ করা হইয়াছে, যতটুকু শিক্ষণীয় বিষয় হিসাবে মানব জীবনের প্রয়োজন এবং মানুষের সাফল্য ও কল্যাণের পথে উহা হইতে নির্দেশনা লাভ করা যায়। ঘটনার সকল অংশ পরিপূর্ণরূপে বর্ণনা করা কিংবা ইতিহাস রচনা করা কুরআন মজীদের আলোচ্য বিষয় নহে। হযরত ইলয়াস (আ)-এর আলোচনায় কুরআন মজীদে তাঁহার জীবনের শুধুমাত্র এই দিকটিকে প্রোজ্জ্বল করা হইয়াছে, যাহা মানবজাতির জন্য পথনির্দেশনা হইতে পারে।
সূরা আন'আম-এ ইলয়াস (আ)-সহ আম্বিয়ায়ে কিরামের এক দীর্ঘ তালিকা উল্লেখ করিয়া শুধু বলা হইয়াছে, ই'হারা সকলেই আল্লাহর মনোনীত ছিলেন এবং তাঁহাদিগকে হেদায়াত ও সংশোধনের দায়িত্ব অর্পণ করা হইয়াছিল। সূরা আস-সাফফাত-এ বলা হইয়াছে, তিনি ছিলেন একজন রাসূল। তিনি নিজ সম্প্রদায়কে আল্লাহর পথে আহবান জানাইয়াছিলেন এবং তাহাদিগকে বা'ল মূর্তির পূজা হইতে নিবৃত্ত থাকিতে বলিয়াছিলেন। কিন্তু আল্লাহর কতিপয় নিষ্ঠাবান বান্দা ব্যতীত সম্প্রদায়ের অবশিষ্ট সকল লোক তাঁহার আহবান প্রত্যাখ্যান করিল। মহানবী (স)-ও আম্বিয়ায়ে কিরামের আলোচনার সময় কুরআন মজীদেরই রীতি অনুসরণ করিয়াছেন। সেই কারণে এই বিষয়ে কুরআন মজীদে যাহা বলা হইয়াছে, কোন বিশুদ্ধ হাদীছে ইহার অতিরিক্ত কিছু উল্লেখ নাই। সেইজন্য হযরত ইয়াস (আ) সম্পর্কে ইতিহাস ও জীবনী গ্রন্থসমূহে যাহা বর্ণিত হইয়াছে, উহা হয়ত ইসরাঈলী বর্ণনাসমূহ হইতে গৃহীত, যাহার শুদ্ধাশুদ্ধ সম্বন্ধে নিশ্চিতরূপে কিছু বলিবার উপায় নাই, বরং অনেক অংশই এমন যে, উহা দৃশ্যত অসত্য গণ্য করিবার যথেষ্ট অবকাশ রহিয়াছে অথবা এইসব কাহিনী রচনা করিয়াছেন এক শ্রেণীর বাগ্মী ও ঐতিহাসিক, যাহারা অভিনব কাহিনী বর্ণনা করিয়া প্রশংসা অর্জন করিতে ভালবাসেন। অধিকাংশ ঐতিহাসিক বর্ণনা এই বিষয়ে প্রায় একমত যে, হযরত ইলয়াস (আ) বনী ইসরাঈলের প্রতি প্রেরিত হইয়াছিলেন হযরত হিযকীল (আ)-এর পরে এবং হযরত আল-য়াসা' (আ)-এর পূর্বে। এই সময়ে বনী ইসরাঈলের সাম্রাজ্য দুই ভাগে বিভক্ত হইয়া পড়িয়াছিল। এক অংশকে ইয়াহুদা অথবা ইয়াহুদিয়্যা বলা হইত। ইহার রাজধানী ছিল বায়তুল মুকাদ্দাসে অবস্থিত। অপর অংশের নাম ছিল ইসরাঈল। ইহার রাজধানী তৎকালীন সামিরাহ, বর্তমান নাবলুসে অবস্থিত ছিল। হযরত ইলয়াস (আ) জর্দানে "জিলীআদ" নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। তখনকার ইসরাঈলের শাসনকর্তার নাম বাইবেলে "আখিয়ায়” এবং আরবী ইতিহাসে "আজিব" অথবা "উজব" অথবা "আখিব" বলিয়া উল্লিখিত হইয়াছে। তাঁহার স্ত্রী ঈযাবিল ছিল দুষ্কর্মপরায়ণা।
অধিকাংশ ঐতিহাসিক ও মুফাসসির এই ব্যাপারেও ঐকমত পোষণ করিয়াছে যে, হযরত ইলয়াস (আ) সিরিয়ার অধিবাসীদের হেদায়াতের জন্য প্রেরিত হইয়াছিলেন এবং প্রসিদ্ধ "বা'লবাক্ক” শহর তাঁহার দাওয়াতের কেন্দ্রভূমি ছিল। হযরত ইলয়াস (আ)-এর সম্প্রদায় 'বা'লের' পূজারী ছিল এবং আল্লাহর তাওহীদ হইতে বিমুখ হইয়া কুফর ও শিরকে লিপ্ত হইয়া পড়িয়াছিল। এই বা'ল মূর্তিটি প্রাচ্যে বসবাসকারী সেমিটিক (সামী) জাতিসমূহের নিকট সবচেয়ে বেশী প্রিয় ও পূজনীয় দেবতা ছিল। ইহাকে শনি ও বৃহস্পতি নামক নারী নক্ষত্র দেবীদ্বয়ের স্বামী বলিয়া মনে করা হইত। ফিনিশীয়, কিনআনী, মুআবী ও মাদয়ানী লোকেরা বিশেষভাবে ইহার পূজা করিত। বস্তুত বা'লের পূজা অনেক প্রাচীন কাল হইতে চলিয়া আসিতেছিল। মুআবী ও মাদয়ানীরা হযরত মূসা (আ)-এর সময় হইতে ইহার পূজা করিত। সিরিয়ার বিখ্যাত শহর বা'লবাক্কও এই দেবতার নামের সহিত সম্পর্কিত। হযরত শু'আয়ব (আ) মাদয়ানে এই বা'লের পূজারীদেরই হেদায়াতের জন্য প্রেরিত হইয়াছিলেন। কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে হিজাযের দেবতা হুবালও এই বা'লের আর এক নাম।
বা'ল দেবতার মাহাত্ম্য ও দানের কথা কল্পনা করিয়া লোকেরা ইহাকে বিভিন্ন নামে আখ্যায়িত করিত। কেননা সেমিটিক জাতিগুলির বা'ল পূজার উল্লেখ করিয়া তাওরাতে বা'লকে বা'ল বারীস ও বা'ল ফাগুর নামে আখ্যায়িত করা হইয়াছে। আকরোসীদের নিকট ইহার নাম ছিল বা'ল্ যাবুর। কালদানীরা বলিত বি'ল। তাহারা ইহাকে বি'লুস কিংবা বা'লুসও বলিত। হযরত ইলয়াস (আ)-এর সময়ে য়ামান ও সিরিয়ায় এই মূর্তিটি প্রিয় দেবতা ছিল। হযরত ইর্লয়াস (আ)-এর সম্প্রদায় অন্যান্য মূর্তির সহিত এই মূর্তিটির বিশেষভাবে পূজা করিত। হযরত ইলয়াস (আ) আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হইতে এই ভূখণ্ডে তাওহীদ প্রচার করিবার ও বনী ইসরাঈলকে মূর্তি পূজা হইতে নিবৃত্ত করিবার নির্দেশ লাভ করেন।
টিকাঃ
মাআরিফুল কুরআন, ৩খ. ৯৯-১০৫
📄 স্বীয় সম্প্রদায়ের সহিত সংঘর্ষ
অন্যান্য পয়গাম্বরের ন্যায় হযরত ইলয়াস (আ)-কেও স্বীয় সম্প্রদায়ের কঠিন বাধার সম্মুখীন হইতে হইয়াছে। তিনিও নির্বিঘ্নে তাওহীদের প্রচার করিতে সক্ষম হন নাই। কতিপয় সজ্জন ব্যতীত কেহই তাঁহার আহবানে সাড়া দেয় নাই; বরং তাহারা তাঁহাকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করিল ও তাঁহার আহবান প্রত্যাখ্যান করিল। ফলে তাহাদের প্রতি আল্লাহর পক্ষ হইতে আযাব নামিয়া আসে। মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক, ওয়াহ্ত্ব ইবন মুনাব্বিহ, কা'ব আল-আহবার প্রমুখের বরাত দিয়া তাফসীরের গ্রন্থসমূহে স্বীয় সম্প্রদায়ের সহিত হযরত ইলয়াস (আ)-এর সংঘর্ষের বিবরণ দেওয়া হইয়াছে। তবে এই সংক্রান্ত যত বর্ণনা পাওয়া যায় তাহার অধিকাংশই বাইবেল ও ইসরাঈলী উৎস হইতে সংগৃহীত। তাফসীর গ্রন্থসমূহের বিবরণ হইতে জানা যায়, হযরত ইলয়াস (আ) ইসরাঈলী শাসনকর্তা আখিয়াব বা উজব ও তাহার প্রজাবৃন্দকে বা'ল দেবমূর্তির পূজা করিতে নিষেধ করিলেন এবং তাহাদিগকে তাওহীদের দাওয়াত দিলেন। কিন্তু দুই-একজন সত্যপন্থী ব্যতীত কেহই তাঁহার কথায় কর্ণপাত করিল না; বরং তাহারা নানাভাবে তাঁহাকে উত্যক্ত করিতে লাগিল। এমনকি রাজা উজব ও রানী এযাবীল তাঁহাকে হত্যা করিবার পরিকল্পনা করিল। ফলে তিনি দূরবর্তী এক গুহায় আশ্রয় লইলেন এবং দীর্ঘকাল সেখানে অবস্থান করিলেন। অতঃপর তিনি দোআ করিলেন যেন ইসরাঈলের লোকেরা দুর্ভিক্ষের শিকার হয়। তিনি দোআ করিয়া যখন সকলকে দুর্ভিক্ষ হইতে রক্ষা করিবেন, তখন লোকেরা তাঁহার এই অলৌকিক ক্ষমতা দেখিয়া হয়ত আল্লাহ্র প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করিবে। এই, দোআর ফলে ইসরাঈলে ভীষণ দুর্ভিক্ষ দেখা দিল। অতঃপর হযরত ইলয়াস (আ) রাজা উজবের সহিত সাক্ষাত করিলেন এবং আল্লাহ্র নির্দেশমত তাহাকে জানাইলেন যে, আল্লাহর নাফরমানীই এই দুর্ভিক্ষের কারণ। তোমরা এখনও আল্লাহর নাফরমানী হইতে বিরত থাকিলে এই আযাব দূর হইতে পারে। আমার সত্যতা পরীক্ষা করারও ইহা একটি সুযোগ। তুমি বলিয়া থাক ইসরাঈল সাম্রাজ্যে তোমাদের বা'ল দেবতার সাড়ে চারি শত ভাববাদী আছে। তুমি একদিন তাহাদের সকলকে আমার সম্মুখে উপস্থিত কর। তাহারা বা'ল দেবতার নামে কুরবানী পেশ করুক, আর আমি আল্লাহ তা'আলার নামে কুরবানী পেশ করিব। যাহার কুরবানী আকাশ হইতে অগ্নিবিদ্যুৎ আসিয়া ভষ্ম করিয়া দিবে তাহার ধর্মই সত্য বলিয়া সাব্যস্ত হইবে। সবাই এই প্রস্তাব সানন্দে মানিয়া লইল।
সেইমতে কোহে করমশ নামক স্থানে উভয় পক্ষের সমাবেশ হইল। বা'ল দেবতার মিথ্যা নবীরা তাহাদের কুরবানী পেশ করিল। সকাল হইতে দুপুর পর্যন্ত বা'লের উদ্দেশে তাহারা অনুনয়-বিনয় সহকারে প্রার্থনা করিল। কিন্তু কোন সাড়া পাওয়া গেল না। অতঃপর হযরত ইলয়াস (আ) তাঁহার কুরবানী পেশ করিলেন। অবিলম্বে আকাশ হইতে অগ্নিবিদ্যুৎ আসিয়া তাহা ভষ্ম করিয়া দিল। এই দৃশ্য দেখিয়া অনেকেই সিজদায় পড়িয়া গেল। তাহাদের সামনে সত্য প্রস্ফুটিত হইল। কিন্তু বা'ল দেবতার মিথ্যা ভাববাদীরা ইহার পরেও সত্য গ্রহণ করিল না। ফলে হযরত ইলয়াস (আ) তাহদিগকে কায়শুন উপত্যকায় লইয়া গিয়া মৃত্যুদণ্ড দিলেন।
এই ঘটনার পর মুষলধারে বৃষ্টি হইল এবং সমস্ত ভূখণ্ড ধুইয়া-মুছিয়া সাফ হইয়া গেল। কিন্তু রাজা উজবের পত্নী এযাবীলের ইহাতেও চক্ষু খুলিল না। সে বিশ্বাস স্থাপনের পরিবর্তে হযরত ইলয়াস (আ)-এর প্রতি আরো শত্রুভাবাপন্ন হইয়া পড়িল এবং তাঁহাকে হত্যা করিবার জন্য প্রস্তুতি লইতে লাগিল। হযরত ইলয়াস (আ) সংবাদ পাইয়া পুনরায় সামিরাহ হইতে আত্মগোপন করিলেন এবং কিছুদিন পর বনী ইসরাঈলের অপর রাষ্ট্র ইয়াহুদিয়ায় পৌঁছেন এবং তাওহীদের প্রচার আরম্ভ করিলেন। কারণ সেখানেও বা'ল দেবতার পূজা ছড়াইয়া পড়িয়াছিল। সেখানকার সম্রাট য়াহুরামও হযরত ইলয়াস (আ)-এর কথা শুনিল না। অবশেষে হযরত ইলয়াস (আ)-এর ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী সেও ধ্বংসপ্রাপ্ত হইল। কয়েক বৎসর পর তিনি আবার ইসরাঈলে ফিরিয়া আসিলেন এবং উজব ও তাহার পুত্র আখ্যিয়াকে সত্যপথে আনিবার চেষ্টা করিলেন। কিন্তু তাহারা পূর্বের ন্যায় কুকর্মেই লিপ্ত রহিল। অবশেষে তাহাদিগকে বৈদেশিক আক্রমণ ও মারাত্মক ব্যাধির শিকার হইতে হইল। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাঁহার পয়গাম্বরকে উঠাইয়া লইলেন।
কাযী ছানাউল্লাহ পানিপথী (র) তাঁহার তাফসীরে মাযহারীতে (১০ খ., ৫২-৬৪) আল্লামা বাগাবীর বরাতে এতদসংক্রান্ত বিস্তারিত বিবরণ উল্লেখ করিয়াছেন, যাহা মুহাম্মাদ ইব্ন ইসহাকের সূত্রে বর্ণিত। মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক বর্ণনা করেন, হযরত হিযকীল (আ)-এর মৃত্যুর পর বনী ইসরাঈলের মধ্যে নানা বিপর্যয় ও অনাচার দেখা দিলে তাহারা পথভ্রষ্ট হইয়া পড়িল। তাহাদের মধ্যে কুফর, শিরক ও বিদআত ছড়াইয়া পড়ে এবং তাহারা মূর্তি নির্মাণ ও উহার পূজা করিতে থাকে। তাই তাহাদিগের হেদায়াতের জন্য আল্লাহ তা'আলা হযরত ইলয়াস (আ)-কে নবী মনোনীত করিয়া তাহাদের মধ্যে প্রেরণ করিলেন। হযরত মূসা (আ)-এর পরে বনী ইসরাঈলের নিকট নবীগণ প্রেরিত হইতেন তাওরাতের যেসব বিধান বনী ইসরাঈলগণ ভুলিয়া যাইত অথবা বিনষ্ট করিয়া ফেলিত তাহা তাহদিগকে নূতন করিয়া জানাইয়া দিবার এবং যাহারা পথভ্রষ্ট হইয়া যাইত তাহাদিগকে সঠিক পথে ফিরাইয়া আনিবার উদ্দেশ্যে। বনী ইসরাঈল তখন সমগ্র সিরিয়াতে ছড়াইয়া পড়িয়াছিল, হযরত যুশা' ইব্নু নূন (আ) সিরিয়া বিজয় করিবার পর বনী ইসরাঈলের জন্য সিরিয়াতে বসতি স্থাপন করেন।
তাহাদেরই গোত্র বা'লবাক্ক শহরের আধিবাসী ছিল। হযরত ইলয়াস (আ) তাহাদের হেদায়াতের জন্য প্রেরিত হইলেন। তখন তাহাদের যে রাজা ছিল তাহার নাম ছিল উজব। সে ছিল মূর্তিপূজক। বনী ইসরাঈলকেও সে মূর্তিপূজায় লিপ্ত করিয়াছিল। তাহার একটি মূর্তির নাম ছিল বা'ল। চারি মুখবিশিষ্ট এই মূর্তিটির দৈর্ঘ্য ছিল ত্রিশ হাত। রাজা-প্রজা সকলেই উক্ত মূর্তির পূজায় লিপ্ত থাকিত।
হযরত ইলয়াস (আ)-ই একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করিতেন এবং নিজ সম্প্রদায়কে তাওহীদের প্রতি আহবান জানাইতেন। কিন্তু তাহারা তাঁহার আহবানে সাড়া দিত না। যেহেতু রাজা মূর্তিপূজক ছিল, তাই লোকেরাও রাজার অনুসরণে মূর্তিপূজায় লিপ্ত থাকিত। হযরত ইলয়াস (আ) রাজাকে আল্লাহ্ একত্বে বিশ্বাস স্থাপন করিবার জন্য আহবান জানাইতেন এবং তাহাকে আত্মসংশোধনের জন্য উপদেশ দিতেন। এযাবীল নাম্নী রাজার একজন স্ত্রী ছিল। যুদ্ধ ইত্যাদির প্রয়োজনবশত রাজা কখনো রাজধানীর বাহিরে গেলে রাণী এযাবীলকে রাজ্য পরিচালনার দায়িত্ব দিয়া যাইত। সে তখন রাজার স্থলে শাসনকার্য চালাইত। এযাবীল ছিল নবী-রাসূলগণের শত্রু। অনেকের মতে হযরত ইয়াহ্ইয়া (আ)-কেও এই এযাবীলই হত্যা করিয়াছিল। তাহার একজন জ্ঞানী কর্মকর্তা ছিলেন, যিনি প্রকৃতপক্ষে ঈমানদার থাকিলেও নিজের ঈমানের কথা গোপন রাখিতেন। এযাবীল আরো অনেক নবীকে হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। এই ঈমানদার ব্যক্তির আন্তরিক প্রচেষ্টায় তাহা বানচাল হইয়া যায়। সাতজন বনী ইসরাঈলী রাজার সহিত তাহার বিবাহ হইয়াছিল এবং প্রত্যেককেই সে প্রতারণা করিয়া হত্যা করে। তাহার সত্তরজন সন্তান হয়। সে দীর্ঘজীবন লাভ করিয়াছিল। রাজা উজবের একজন প্রতিবেশী ছিলেন। বনী ইসরাঈলীয় এই ব্যক্তির নাম ছিল মুযদাকী। তিনি খুব নেককার ছিলেন। তাহার একটি ছোট বাগিচা ছিল। সেই বাগিচার আয় হইতে তাহার জীবিকা নির্বাহ হইত এবং তিনি উক্ত বাগিচা দেখাশুনা করিতেন। রাজমহলের পাশেই ছিল বাগিচাটি।
রাজা ও রাণী মাঝেমাঝে সেখানে বেড়াইতে যাইত, সেখানকার ফলমূল আহার করিত এবং পানি পান করিত। রাজা তাহার প্রতিবেশীর সহিত উত্তম আচরণ করিত। কিন্তু রাণী এযাবীল তাহাকে হিংসার দৃষ্টিতে দেখিত এবং লোকজনের মুখে বাগানটির সৌন্দর্যের কথা শুনিয়া উহা দখল করিয়া লইবার কৌশল অনুসন্ধান করিত। লোকেরা বলাবলি করিত, এই প্রাসাদের মালিকেরই বাগানটি হওয়া উচিত ছিল। রাজা রাণী ইহা দখল করিতেছে না দেখিয়া তাহারা বিস্মিত হইত। তাই লোকটিকে কিভাবে হত্যা করিয়া তাহার বাগানাটি দখল করা যায়, রাণী এই চিন্তায় মগ্ন থাকিত। কিন্তু রাজা তাহাকে নিষেধ করিত। সে কারণে মহিলা ইহার কোন সুযোগ পাইত না। ঘটনাক্রমে রাজা একবার এক দীর্ঘ সফরে গমন করিল। তাহার এই দীর্ঘ অনুপস্থিতিকে এযাবীল এক মহাসুযোগ মনে করিল। সে এই সুযোগে নেককার ব্যক্তি মুযদাকীকে কৌশলে হত্যা করিয়া তাহার বাগানটি হস্তগত করিবার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত চাহিল। নেককার ব্যক্তি ইহার কিছুই জানিতেন না। তিনি তো নিজ প্রভুর ইবাদতে ও নিজ জীবিকার সন্ধানে লিপ্ত থাকিতেন। এযাবীল একদল লোককে একত্র করিয়া তাহাদিগকে এই মর্মে মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদানের আদেশ করিল যে, মুযদাকী তাহাদের রাজা উজবকে গালি দিয়াছেন। তাহারা তাহার কথায় মুযদাকীর বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদানের জন্য সম্মত হইল। তখনকার দিনে এই বিধান ছিল যে, কোন ব্যক্তি রাজাকে গালি দিয়াছে বলিয়া প্রমাণিত হইলে তাহার প্রাণদণ্ড হইত। মুযদাকীকে হাজির করা হইল। এযাবীল বলিল, আমি জানিতে পারিয়াছি যে, তুমি রাজাকে গালি দিয়াছ ও তাহার নিন্দা করিয়াছ। মুযদাকী ইহা অস্বীকার করিলেন। এযাবীল তখন সাক্ষী উপস্থিত করিল। সাক্ষীরা সকলের সম্মুখে এই মর্মে মিথ্যা সাক্ষ্য দিল। এযাবীল মুযদাকীকে হত্যার নির্দেশ দিল। তাঁহাকে হত্যা করা হইল এবং এযাবীল তাঁহার বাগিচাটি দখল করিয়া লইল।
একজন নেককার বান্দাকে এইভাবে হত্যা করার দরুন আল্লাহ তা'আলা তাহাদের প্রতি খুবই অসন্তুষ্ট হইলেন। রাজা সফর হইতে ফিরিয়া আসিলে এযাবীল সকল ঘটনা তাঁহার নিকট বর্ণনা করিল। রাজা বলিল, তুমি সঠিক কাজ কর নাই, বরং অন্যায় করিয়াছ। তাঁহাকে হত্যা করিয়া আমরা সাফল্য লাভ করিব বলিয়া মনে হয় না। তাঁহার বাগিচাটির প্রয়োজন আমাদের ছিল' 'না। আমরা সেখানে যাইয়া বেড়াইতে পারিতাম। তিনি আমাদের প্রতিবেশী ছিলেন এবং দীর্ঘকাল আমাদের সহিত বসবাস করিয়া আসিতেছিলেন। আমরা তাঁহাকে প্রতিবেশী জানিয়া তাঁহার অনিষ্ট করিতাম না। কেননা আমাদের নিকট তাঁহার অধিকার ছিল। কিন্তু তুমি আমাদের প্রতিবেশীর অধিকার ক্ষুণ্ণ করিলে। তোমার নিবুদ্ধিতা, অশুদ্ধ চিন্তা ও অপরিণামদর্শিতাই তোমাকে এইরূপ দুঃসাহস করিতে উৎসাহ যোগাইয়াছে। সে বলিল, আমি তোমারই কারণে তাঁহার প্রতি অসন্তুষ্ট হইয়াছি এবং তোমার আইন অনুযায়ীই তাঁহার বিচার করিয়াছি। রাজা বলিল, তুমি ধৈর্য ধারণ করিতে পারিলে না এবং একজন মানুষকে ক্ষমা করিয়া প্রতিবেশীর অধিকার সমুন্নত রাখিলে না। এযাবীল বলিল, যাহা হইবার হইয়া গিয়াছে।
আল্লাহ তাআলা হযরত ইলয়াস (আ)-এর নিকট রাজা উজব ও তাহার সম্প্রদায়ের উদ্দেশ্যে ওহী প্রেরণ করিলেন এবং তাহাদিগকে জানাইয়া দিতে বলিলেন যে, আল্লাহ তা'আলার একজন ওলীকে সকলের সামনে অন্যায়ভাবে হত্যা করার কারণে তিনি তাহাদের প্রতি ভীষণ অসন্তুষ্ট হইয়াছেন। তিনি শপথ করিয়া বলিয়াছেন, যদি রাজা উজব ও তার স্ত্রী তাহাদের কৃত অপরাধ হইতে তওবা না করে এবং মুযদাকীর উত্তরাধিকারিগণের নিকট তাহার বাগানটি ফেরত না দেয়, তাহা হইলে আল্লাহ তা'আলা তাহাদিগকে ধ্বংস করিয়া দিবেন। তাহাদের উভয়ের লাশ উক্ত বাগানের মধ্যেই নিক্ষেপ করা হইবে এবং তাহাদের হাড় হইতে গোস্ত পৃথক করা হইবে। হযরত ইয়াস (আ) রাজার নিকট আল্লাহ তা'আলার এই বাণী পৌঁছাইয়া দিলেন। রাজা ইহা শুনিয়া অত্যন্ত রাগান্বিত হইল এবং হযরত ইলয়াস (আ)-কে বলিল, আপনি আমাকে যে বিষয়ের প্রতি আহধান জানাইতেছেন, তাহা সঠিক নহে। এই পৃথিবীতে আরও অনেক মূর্তিপূজক রাজা রহিয়াছে। তাহারা আমাদেরই ন্যায় মূর্তিপূজা করে। এতদসত্ত্বেও তাহারা অনেক আনন্দ ফুর্তিতে রাজত্ব করিতেছে। যেই কাজকে আপনি অন্যায় ও অসার বলিতেছেন, তাহা করিবার পরও তাহাদের কোন ক্ষতি হইতেছে না। ইহার পর রাজা হযরত ইলয়াস (আ)-কে কষ্ট দেওয়ার ও তাঁহাকে হত্যা করার ইচ্ছা করিলেন। হযরত ইলয়াস (আ) যখন উপলব্ধি করিলেন যে, রাজা তাঁহার প্রাণের শত্রু হইয়া পড়িয়াছে, তখন তিনি তাহাকে ছাড়িয়া গেলেন এবং পাহাড়ের উচ্চ চূড়ায় আশ্রয় গ্রহণ করিলেন। রাজা তখন বা'ল মূর্তিপূজা করিতে লাগিল। রাজার অত্যাচার হইতে আত্মরক্ষার জন্য হযরত ইলয়াস (আ)-কে একাধারে সাত বৎসর আত্মগোপন করিয়া থাকিতে হয়। উজবের লোকজন তাঁহাকে অনুসন্ধান করিত কিন্তু তাঁহার সাক্ষাত পাইত না। আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে গোপন করিয়া রাখিয়াছিলেন। এইভাবে সাত বৎসর অতিবাহিত হয়। অতঃপর আল্লাহপাক তাঁহাকে বাহির হইয়া আসিবার অনুমতি প্রদান করিলেন। সেই সময় রাজার জ্যেষ্ঠপুত্র অত্যন্ত অসুস্থ হইয়া পড়িয়াছিল। তাহার জীবন সম্পর্কে উজব প্রায় নিরাশ হইয়া গিয়াছিল। রাজা তাহার উপাস্য দেবতা বালে নিকট অনেক কান্নাকাটি করে, কিন্তু তাহার সকল ক্রন্দন নিষ্ফল প্রমাণিত হয়। অথচ উজব ও তাহার সকল প্রজা উক্ত মূর্তিটিরই পূজা করিত। মূর্তিটির সেবায় চার শত খাদেম নিযুক্ত ছিল। উহার অভ্যন্তরে শয়তান প্রবেশ করিয়া কথা বলিত। তাহা শুনিয়া সেবকরা রাজাকে অবহিত করিত।
এদিকে রাজপুত্রের রোগ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। রাজা তাঁহার পূত্রের রোগমুক্তির জন্য সেবায়েতদের শরণাপন্ন হইতে থাকে কিন্তু কোন ফল হইত না। পূর্বে ইবলীস মূর্তিটির পেটের ভিতর প্রবেশ করিয়া সেবায়েতদের সহিত কথা বলিত। পরবর্তী কালে আল্লাহর হুকুমে মূর্তির অভ্যন্তরে শয়তানের প্রবেশের পথ রুদ্ধ হইল। সেবায়েতগণ রাজাকে বলিল, দেবতা আপনার প্রতি অসন্তুষ্ট, তাহা না হইলে অবশ্যই জবাব দিত। উজব জিজ্ঞাসা করিল, আমি তো দেবতার পূজা করিতেছি, তবুও দেবতা আমার প্রতি অসন্তুষ্ট কেন? সেবায়েতরা বলিল, আপনি এখনও ইলয়াসকে হত্যা করেন নাই' ইহাই দেবতার অসন্তুষ্টির কারণ। সেবায়েতরা ইহাও বলিল যে, আরো যেসব দেবতা 'রহিয়াছে তাহাদের নিকটেও আরাধনা করা উচিত। সেইমতে রাজা কিছু সেবায়েতকে সিরিয়ার বিভিন্ন স্থানে প্রেরণ করিল। যে পাহাড়ে হযরত ইলয়াস (আ) আত্মগোপন করিয়াছিলেন সেবায়েতরা 'সেই পাহাড়ের পাদদেশে পৌঁছাইলে আল্লাহ তা'আলা হযরত ইলয়াস (আ)-এর নিকট এই মর্মে ওহী প্রেরণ করিলেন যে, আপনি নিচে অবতরণ করুন এবং তাহাদের সহিত নিঃসঙ্কোচে কথা বলুন। আমি তাহাদের ষড়যন্ত্র বানচাল করিয়া দিব। তাহাদের অন্তরে আপনার ভয় সৃষ্টি করিব।
আল্লাহ্র নির্দেশ মুতাবিক হযরত ইলয়াস (আ) অবতরণ করিলেন এবং তাহদিগকে অপেক্ষন করিতে আদেশ দিলেন এবং বলিলেন, আল্লাহ তা'আলা আমাকে তোয়াদের নিকট এবং তোমরা যাহাদের নিকট হইতে আসিয়াছ তাহাদের নিকট প্রেরণ করিয়াছেন। আল্লাহ তা'আলা একটি বাণী প্রেরণ কয়িাছেন। তোমরা তাহা শ্রবণ কর এবং তোমাদের রাজাকে উহা শুনাইয়া দিও। আল্লাহ পাক ইরশাদ করিয়াছেন, "হে উজব! তুমি কি জান না যে, আমি ব্যতীত আর কোন ইলাহ নাই, আমিই বনি ইসরাঈলের স্রষ্টা। আমিই সকলকে রিযিক দিয়া থাকি। জীবন ও মৃত্যু আমারই হাতে। তুমি কোন্ কারণে আমার সহিত শির্ক কর এবং আমাকে ব্যতীত অন্যের নিকট তোমার পুত্রের রোগমুক্তির জন্য প্রার্থনা কর? আমার ইচ্ছা না হইলে কেহই কিছু করিতে পারে না। আমি আমার পবিত্র নামের শপথ করিয়া বলিতেছি, তোমার পুত্রের প্রতি গজব আপতিত হইবে। তাহার মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। ইহাতে তুমি উপলব্ধি করিতে পারিবে যে, আমি ধ্যতীত কেহই কোন কিছু করিতে পারে না।
'হযরত ইল্লাস' (আ)-এর মাধ্যমে আল্লাহ পাকের বাণী শ্রবণ করিয়া রাজী উজবের প্রেরিত সেবায়েতরা ভীত হইয়া পড়িল এবং রাজার নিকট আসিয়া সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করিল। তাহারা ইহাও বলিল, আমরা যখন ইলয়াস (আ)-এর সম্মুখে দণ্ডায়মান হইলাম, তখন ভয়ে আমাদের বাকশক্তি রুদ্ধ হইবার উপক্রম হইল। রাজা উজব এই সংবাদ পাইয়া উপলব্ধি করিল যে, হযরত ইলয়াস (আ) জীবিত থাকিলে তাহার জীবন দুর্বিসহ হইয়া পড়িবে। তাই একটি ষড়যন্ত্র করিল এবং তাহার সম্প্রদায়ের পঞ্চাশজন শক্তিশালী লোককে নির্বাচন করিয়া এই আদেশ দিল যে, যে কোন ভাবেই প্রতারণা করিয়া হযরত ইলয়াস (আ)-কে হত্যা করিবে। তোমরা যাইয়া তাঁহাকে বলিবে, আমরা সকলেই আপনার প্রতি ঈমান আনিয়াছি। এই কথা শ্রবণ করিয়া তিনি তোমাদের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হইয়া যাইবেন এবং প্রতারিত হইবেন। তখন তোমরা তাঁহাকে আমার নিকট লইয়া আসিবে। রাজার নির্দেশে তাহারা রওয়ানা হইল। তিনি যে পাহাড়ে ছিলেন তাহারা সেই পাহাড়ে পৌঁছিয়া ছড়াইয়া পড়িল এবং তাঁহাকে ডাক দিয়া বলিল, "হে আল্লাহর নবী! আপনি আমাদের প্রতি দয়া করুন, আমরা আপনার প্রতি ঈমান আনিয়াছি। রাজা-প্রজা তথা সমগ্র জাতি আপনার প্রতি ঈমান আনিয়াছে। আমরা আপনার কথা মানিয়া চলিব। আপনি যে আদেশ দিবেন, তাহাই পালন করিব। আমরা আপনার অনুগত হইয়াছি। অতএব আমাদের হইতে আপনার পৃথক থাকার কোন যুক্তি নাই।
তিনি এইভাবে দোআ করিলেন, হে আল্লাহ! যদি ইহারা তাহাদের কথায় সত্যবাদী হয়, তাহা হইলে আমাকে তাহাদের নিকট বাহির হইবার অনুমতি দান করুন। আর যদি তাহারা মিথ্যাবাদী হয়, তাহা হইলে তাহাদের নিকট হইতে আমাকে বিরত রাখুন এবং তাহাদের প্রতি এমন অগ্নি বর্ষণ করুন, যাহাতে দগ্ধ হইয়া তাহারা শেষ হইয়া যায়। এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে আসমান হইতে অগ্নি বর্ষিত হইতে থাকে এবং সঙ্গে সঙ্গে তাহারা ধ্বংস হইয়া যায়।
উজব যখন তাহার প্রেরিত লোকদের ধ্বংসের খবর পাইল তখনও ভ্রান্ত পথ হইতে বিরত হয় নাই এবং প্রতারণার উদ্দেশ্যে আরো একটি দল তৈরী করে যাহা পূর্ববর্তী দলের অপেক্ষাও বেশী শক্তিশালী ছিল। তাহারা পুনরায় ঐ পাহাড়ে আরোহণ করিল এবং হযরত ইলয়াস (আ)-কে ডাক দিয়া বলিল, হে আল্লাহর নবী! আমরা আল্লাহর গজব হইতে আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থী; ইতোপূর্বে যাহারা আসিয়াছিল, তাহারা মোনাফেক ছিল। তাহারা আমাদের পরামর্শ ব্যতীতই আপনাকে প্রতারণার জন্য হাজির হইয়াছিল। যদি তাহাদের সম্পর্কে আমরা পূর্বে জানিতাম, তাহা হইলে তাহাদের সকলকে হত্যা করিতাম এবং আপনাকে কষ্ট করিতে হইত না। হযরত ইল্যাস তাহাদের কথা শ্রবণ করিয়া পুনরায় আল্লাহ পাকের দরবারে দোআ করিলেন। তখন আল্লাহ পাক আসমান হইতে অগ্নি বৃষ্টি বর্ষণ করিলেন, পরিণামে তাহারা সকলেই নিশ্চিহ্ন হইয়া গেল।
দ্বিতীয় দলের ধ্বংসের খবর পাইয়া রাজার ক্রোধ আরো বৃদ্ধি পাইল। সে নিজেই হযরত ইলয়াস (আ)-এর অনুসন্ধানে বাহির হইবার ইচ্ছা করিল, কিন্তু তাহার পুত্রের রোগ বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে তাহার পক্ষে তাহা সম্ভব হইল না।
উজব পারিষদের মধ্যে এক ব্যক্তি গোপনে মুমিন ছিলেন। রাজা তাহার বিশ্বস্ততা ও যোগ্যতার জন্য তাহাকেই প্রেরণ করা পছন্দ করিল এবং তাহার নিকট এই মনোভাব ব্যক্ত করিল যে, আমি হযরত ইল্যাস (আ)-এর প্রতি কোন প্রকার জুলুম করিতে চাহি না। ঐ ব্যক্তির সঙ্গে রাজা তাহার নিজস্ব দলও প্রেরণ করে এবং তাহাদেরকে গোপনে আদেশ দেন, যদি ইল্যাস (আ) তোমাদের সঙ্গে আসিতে অসম্মত হয়, তাহা হইলে গ্রেফতার করিয়া লইয়া আসিবে। অন্যদিকে ঐ মুমিন ব্যক্তিকে বলিল, আমি পূর্বেকৃত অন্যায় হইতে তওবা করিয়াছি। আমার পুত্র অসুস্থ, আমার লোকজন আসমানী অগ্নি দ্বারা ভস্মীভূত হইয়াছে। এইসবই ইলয়াস (আ)-এর বদদোআর কারণে হইয়াছে।
এমতাবস্থায় তাঁহাকে আমরা চাই। তিনি আমার নিকট থাকিলে, তাঁহার আদেশ-নিষেধ মানিয়া চলিব। রাজা উজবের প্রেরিত ব্যক্তি হযরত ইলয়াস (আ)-এর নিকট হাজির হইলে আল্লাহ পাকের পক্ষ হইতে এই মর্মে ওহী নাযিল হইল যে, এই নেককার ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাত কর। হযরত ইয়াস (আ) তাহার সহিত সাক্ষাত করিলেন। তিনি বলিলেন, এই জালেম রাজা আমাকে আপনার নিকট প্রেরণ করিয়াছে। ইহার পর তিনি সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করিয়া বলিলেন, যদি আপনি আমার সঙ্গে না যান, আর আমি একা যাই তবে ভয় হয় রাজা আমাকে হত্যা করিবে। এখন আপনি যাহা হুকুম দিবেন আমি তাহাই করিব। আর যদি আপনার ইচ্ছা হয় যে, আমি রাজা হইতে পৃথক হইয়া যাই এবং আপনার কাছেই থাকিয়া তাহার মুকাবিলা করি, তাহাতেও আমি প্রস্তুত। কিংবা যদি আপনি আমার মাধ্যমে তাহার নিকট কোন বাণী প্রেরণ করিতে চাহেন তবে তাহাও আমি পৌছাইয়া দিব। আর আপনি আল্লাহ পাকের দরবারে দোআ করুন যেন তিনি এই সমস্যার সমাধান করিয়া দেন।
আল্লাহ পাক হযরত ইয়াস (আ)-এর নিকট ওহী প্রেরণ করিলেন, হে ইলয়াস! তুমি এই মুমিনের সঙ্গে চলিয়া যাও। আমি তোমাদের উভয়ের হেফাযত করিব। এই আদেশ পাইয়া হযরত ইলয়াস (আ) তাহার সঙ্গে রওয়ানা হইয়া রাজা উজুবের নিকট পৌছিলেন। তখন আল্লাহ পাকের হুকুমে রাজপুত্রের রোগ বৃদ্ধি পাইল, অবশেষে তাহার মৃত্যু হইল। পুত্র শোকে কাতর রাজা হযরত ইল্যাস (আ)-এর বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ পাইল না। হযরত ইলয়াস (আ) নিরাপদে প্রত্যাবর্তন করিলেন। এই ঘটনার কয়েক দিন পর যখন মুমিন ব্যক্তিকে হযরত ইলয়াস (আ) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয় তখন তিনি বলিলেন, আমি তাঁহার সম্পর্কে কিছুই জানি না। কেননা রাজপুত্রের মৃত্যুর কারণে শোকে এতই মুহ্যমান ছিলাম যে, কাহারো খবর নেওয়ার অবকাশ পাই নাই।
হযরত ইলয়াস (আ) পাহাড়ে সুদীর্ঘ কাল একাকী জীবন যাপন করিয়া যাইতেছিলেন। অতঃপর তিনি পাহাড় হইতে অবতরণ করেন এবং একজন ইসরাঈলী স্ত্রীলোকের বাড়িতে অবস্থান করেন। স্ত্রীলোকটি ছিলেন হযরত ইউনুস (আ)-এর মাতা। সেইখানে তিনি ছয়মাস আত্মগোপন করিয়া ছিলেন। তখন ইউনুস (আ) দুগ্ধপোষ্য শিশু ছিলেন। হযরত ইউনুস (আ)-এর মাতা হযরত ইলয়াস (আ)-এর খেদমত নিজেই করিতেন এবং তাঁহাকে অর্থ-সম্পদ দ্বারাও সাহায্য করিতেন। কিন্তু হযরত ইলয়াস (আ) যেহেতু পাহাড়ের উন্মুক্ত স্থানে জীবন যাপনে অভ্যস্থ হইয়া পড়িয়াছিলেন, তাই গৃহের সংকীর্ণ পরিবেশে ছয় মাসেই ক্লান্ত হইয়া পড়েন এবং পাহাড়ে চলিয়া যাওয়াই পছন্দ করেন। এদিকে কিছুদিন পর শিশু ইউনুস (আ)-এর ইন্তিকাল হয়, তখন তাঁহার মাতা অত্যন্ত ব্যাকুল হইয়া হযরত ইলয়াস (আ)-এর অনুসন্ধান করিতে থাকেন। অবশেষে তাঁহাকে পাইয়া বলেন, আপনি চলিয়া আসার পর আমার একমাত্র সন্তান ইউনুস-এর ইন্তিকাল হইয়াছে। আমার উপর এক মহাবিপদ আপতিত হইয়াছে। আপনি আমার দোয়া করুন যেন আমার পুত্র জীবিত হইয়া যায়। আমি তাঁহাকে দাফন করি নাই, শুধু কাপড় দ্বারা ঢাকিয়া রাখিয়াছি। হযরত ইয়াস (আ) বলিলেন, আল্লাহ পাক আমাকে এ ব্যাপারে কোন আদেশ প্রদান করেন নাই অর্থাৎ মৃতকে জীবিত করার জন্য দোআ করার অনুমতি দেওয়া হয় নাই। আর আমি তো একজন বান্দা মাত্র, আমি তাহাই করি যাহার হুকুম আমাকে দেওয়া হয়। এই কথা শ্রবণ করিয়া ইউনুস (আ)-এর মাতা আরো বেশী ক্রন্দন করিতে লাগিলেন। তখন আল্লাহ পাক ইলয়াস (আ)-কে স্ত্রীলোকটির প্রতি সহানুভূতিশীল করিয়া দিলেন। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমার পুত্র কবে ইন্তিকাল করিয়াছে? স্ত্রীলোকটি বলিলেন, সাত দিন। হযরত ইয়াস (আ) তখন তাঁহার সহিত রওয়ানা হইলেন। সাত দিন একাধারে চলিবার পর স্ত্রীলোকটির গৃহে পৌঁছিলেন, যেইখানে চৌদ্দ দিন পূর্বে তাঁহার পুত্র ইন্তিকাল করিয়া ছিল। হযরত ইয়াস (আ) উযু করিয়া নামায আদায় করিয়া মৃত শিশুটির জন্য দোআ করিলেন, আল্লাহ পাক ইউনুস (আ)-কে জীবিত করিয়া দিলেন। যখন হযরত ইউনুস (আ) জীবিত হইয়া উঠিয়া বসিলেন, তখন হযরত ইয়াস (আ) সঙ্গে সঙ্গে সেইখান হইতে বিদায় লইলেন এবং স্বস্থানে প্রত্যাবর্তন করিলেন।
১. এইদিকে হযরত ইল্যাস (আ)-এর সম্প্রদায়ের নাফরমানী বাড়িয়া গেলে তিনি তাহাদের উপর অত্যন্ত মনক্ষুণ্ণ হইলেন। আল্লাহ পাক সাত বৎসর পর তাঁহার নিকট ওহী প্রেরণ করিলেন, ওহী নাযিল হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তিনি চিন্তাগ্রস্ত ছিলেন। আল্লাহ পাক তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, হে ইয়াস! তোমার অন্তরে যে ব্যথা-বেদনা রহিয়াছে এবং তুমি যে চিন্তাগ্রস্ত রহিয়াছ, জিজ্ঞাসা করি, তুমি কি আমার ওহীর আমানতদার নও? আর পৃথিবীতে তুমি কি আমার দলীল নও? সারা পৃথিবীতে তুমি কি আমার মনোনীত ব্যক্তি নও? তোমার যাহা ইচ্ছা তাহা আমার নিকট চাও আমি তোমাকে দান করিব। আমার রহমত অসীম। হযরত ইলয়াস (আ) আরয করিলেন, হে আল্লাহ! আমাকে মৃত্যু দিন, আমার পূর্বপুরুষদের সঙ্গে একত্র হইবার সুযোগ দান করুন। আমি বনী ইসরাঈলদের ব্যাপারে ক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছি। আমার মন তাহাদের ব্যাপারে অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হইয়া পড়িয়াছে।
তখন আল্লাহ পাক হযরত ইয়াস (আ)-এর নিকট ওহী প্রেরণ করিলেন এবং ইরশাদ করিলেন, ইহা সেই দিন নয়, যখন আমি পৃথিবীকে তোমার নিকট হইতে খালি করিয়া দিব। পৃথিবীতে তোমার অবস্থান অনেক লোকের জন্যই কল্যাণকর ও বরকতময় হইবে, যদিও তাহাদের সংখ্যা হইবে অতি নগণ্য। অতএব ইহা ছাড়া অন্য কিছু চাও। হযরত ইলয়াস (আ) আরয করিলেন, যদি আমার মৃত্যু না হয় তাহা হইলে আমাকে বনী ইসরাঈল হইতে প্রতিশোধ নেওয়ার শক্তি দান করুন। আল্লাহ পাক ইরশাদ করিলেন, তুমি কি চাও? হযরত ইল্যাস (আ) আরয করিলেন, সাত বছর যাবত বৃষ্টির ভাণ্ডারটি আমার নিকট দিয়া দিন, আমার দোআ ব্যতীত যেন আকাশে মেঘমালা দেখা না যায় এবং আমার দোআ ব্যতীত যেন এক ফোঁটা পানিও পৃথিবীতে না পড়ে। এতদ্ব্যতীত এই দুষ্ট প্রকৃতির লোকগুলো অনুগত হইবে না। আল্লাহ পাক ইরশাদ করিলেন হে ইলয়াস। আমি আমার সৃষ্টির প্রতি অত্যন্ত দয়াবান। যদিও অহারা জুলুম করে কিন্তু আমি তাহাদের প্রতি দয়া করি। তখন হযরত ইলয়াস (আ) আরয করিলেন, তাহা হইলে অন্তত ছয় বৎসরের জন্য তাহাদের প্রতি বারিপাত বন্ধ করিয়া দিন। আল্লাহ পাক ইরশাদ করিলেন, এই সময়টিও আমার রহমতের দাবির পরিপন্থী। তবে তিন বৎসরের জন্য বারিপাত বন্ধ করিয়া তাহাদের শাস্তি বিধান করা যাইতে পারে।
তখন হযরত ইলয়াস (আ) আরয করিলেন, তবে এই সময় আমি কিভাবে জীবিত থাকিব? আল্লাহ পাক ইরশাদ করিলেন, আমি পাখিদের একদল তোমার সেবায় নিয়োজিত করিব, তাহারা তোমার খাদ্যদ্রব্য বিভিন্ন স্থান হইতে সংগ্রহ করিয়া তোমাকে সরবরাহ করিবে। ইহার পর আল্লাহ পাক বৃষ্টি বন্ধ করিয়া দিলেন। ফলে অনেক জীবজন্তু, কীটপতঙ্গ মরিয়া যায়, বৃক্ষগুলো শুকাইয়া যায়। মানুষ মহা বিপদের সম্মুখীন হয়। হযরত ইলয়াস (আ) আত্মগোপন করিয়াছিলেন। তবে তিনি যেখানেই থাকিতেন তাহার রিযিক পৌঁছাইয়া দেওয়া হইত। যে গৃহ হইতে খাদ্য দ্রব্যের সুগন্ধ পাওয়া যাই, লোকেরা বুঝিত, হয়ত সেইখানে হযরত ইলয়াস (আ) ছিলেন। তাহারা তাঁহাকে খোঁজ করিত, কিন্তু তাঁহাকে দেখিতে পাইত না। একবার তিনি এক বৃদ্ধার বাড়ি অতিক্রম করিতেছিলেন। তিনি ঐ বৃদ্ধাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমার নিকট কোন খাদ্যদ্রব্য আছে কি? সে বলিল, হাঁ, সামান্য আটা এবং যয়তুনের তেল আছে। হযরত ইলয়াস (আ) ঐ দু'টি বস্তুর উপর হাত বুলাইয়া দোআ করিলেন। তখন তাহার পাত্র দুইটি আটা এবং তৈল দ্বারা পরিপূর্ণ হইয়া গেল। লোকেরা জিজ্ঞাসা করিল, এইসব খাদ্যদ্রব্য কোথা হইতে পাইলে? তখন সে ঘটনা বর্ণনা করিল।
একবার তিনি একজন স্ত্রীলোকের বাড়িতে অবস্থান করিলেন। তাহার পুত্র আল-য়াসা' ছিল অসুস্থ, তাঁহার দোআয় সে সুস্থ হইল। সে হযরত ইলয়াস (আ)-এর প্রতি ঈমান আনিল এবং তাঁহার সহিত থাকিতে লাগিল। আল্লাহ পাক হযরত ইলয়াস (আ)-এর প্রতি ওহী প্রেরণ করিলেন, হে ইলয়াস! তোমার বদদোআর কারণে অনেক জীবজন্তু এবং মানুষ ধ্বংস হইয়া গিয়েছে। হযরত ইলয়াস (আ) আরয করিলেন, হে আমার পরওয়ারদিগার! আমি যেন তাহাদের পক্ষে দোআ করিতে পারি এবং তাহারা যে বিপদে আছে সে বিপদ হইতে রক্ষা পাইতে পারে। আল্লাহ পাক তাঁহাকে ইহার অনুমতি দান করিলেন। তখন হযরত ইলয়াস (আ) বনী ইসরাঈলের নিকট গমন করিয়া বলিলেন, তোমরা মূর্তি পূজার পাপে লিপ্ত, তোমাদের শির্ক ও অন্যান্য পাপাচারের শাস্তিই তোমরা ভোগ করিয়াছ। তোমরা শিরকসহ সকল পাপাচার পরিহার কর। তাহা হইলে আল্লাহ পাক তোমাদের বিপদ দূর করিয়া দিবেন। তখন তাঁহার সম্প্রদায় বলিল, আপনি সত্য কথা বলিয়াছেন। তাহারা তাহাদের মূর্তিগুলি নিজ নিজ ঘর হইতে বাহির করিয়া ফেলিয়া দিল। হযরত ইলয়াস (আ) তাহাদের পক্ষে দোআ করিলেন, ফলে ক্ষণিকের মধ্যেই আকাশে মেঘমালা দেখা গেল, বৃষ্টিপাত হইতে লাগিল, মৃত শুষ্ক ধরণী জীবন্ত হইয়া উঠিল। বনী ইসরাঈলের বিপদ দূরীভূত হইল, আল্লাহ পাক তাহাদের সকল কষ্ট দূর করিয়া দিলেন। কিন্তু এতদসত্ত্বেও তাহারা কুফর ও শিরক বর্জন করিল না, বরং পৌত্তলিকতা, কুফরী ও নাফরমানীর মধ্যেই লিপ্ত রহিল।
হযরত ইলয়াস (আ) যখন এই অবস্থা দেখিলেন, তখন বনী ইসরাঈলের হেদায়াতের ব্যাপারে নিরাশ হইয়া আল্লাহ পাকের দরবারে দোআ করিলেন, হে আল্লাহ! আমাকে ইহাদের' হইতে নাজাত দিন। আল্লাহর তরফ হইতে ওহী আসিল, অমুক তারিখের অপেক্ষা কর, ঐ নির্দিষ্ট দিনে অমুক স্থানে চলিয়া যাও। সেইখানে যেই বাহন পাও তাহাতে আরোহণ কর। নির্দেশ মুতাবিক হযরত ইলয়াস (আ) আল-য়াসা' (আ)-কে সঙ্গে লইয়া নির্ধারিত স্থানে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন, একটি নূরাণী অশ্ব আসিয়া দণ্ডায়মান। হযরত ইলয়াস (আ) তাহাতে আরোহণ করিলেন। অশ্বটি তাঁহাকে লইয়া রওয়ানা হইল। আল-য়াসা' (আ) চিৎকার করিয়া বলিলেন- হযরত! আমার সম্পর্কে কি আদেশ? হযরত ইলয়াস (আ) একটি লিখিত বাণী প্রেরণ করিলেন, যাহাতে প্রমাণ হয় যে, আল-য়াসা' (আ) কে বনী ইসরাঈলের জন্য তিনি খলীফা নিযুক্ত করিয়াছেন। হযরত ইলয়াস (আ)-এর সহিত এইটিই ছিল আল-য়াসা' (আ)-র শেষ সাক্ষাত। আল্লাহ হযরত ইলয়াস (আ)-কে বনী ইসরাঈলীদের হইতে বাহির করিয়া মহাশূন্যে উত্তোলন করিলেন, তাঁহাকে পানাহারের প্রয়োজন হইতে মুক্ত করিলেন এবং ফেরেশতাদের ন্যায় ডানা দান করিলেন। তিনি দুনিয়াতে মানুষ হিসাবেই জীবন-যাপন করিয়াছেন কিন্তু তাহাকে ফেরেশতাদের ন্যায় মহাশূন্যের অধিবাসী করিলেন।
এইদিকে রাজা উজব এবং তাহার জাতির উপর আল্লাহ পাক এক তাগুতী শক্তিকে হামলা করার ক্ষমতা দিলেন। হামলাকারী বাহিনী রাজা উজব এবং তাহার স্ত্রীকে মরহুম মুজাদকারীর বাগানে হত্যা করিল এবং তাহাদের লাশ ঐ বাগানেই খণ্ড-বিখণ্ড করিয়া ফেলিয়া দিল। আল্লাহ তা'আলা হযরত আল-য়াসা' (আ)-কে ওহীর মাধ্যমে এই সংবাদ দিলেন এবং তাঁহাকে রাসূল মনোনীত করিয়া বনী ইসরাঈলের নিকট প্রেরণ করিলেন। বনী ইসরাঈল হযরত আল-য়াসা' (আ)-এর প্রতি ঈমান আনিল এবং তাঁহাকে সম্মান করিল। মৃত্যুকাল পর্যন্ত বনী ইসরাঈলের মধ্যে তাঁহারপ্রভাব-প্রতিপত্তি বজায় ছিল।
টিকাঃ
মাজহারী, ১০ খ., ৬৪