📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 জিহাদের আদেশ অমান্য করিবার পরিণাম

📄 জিহাদের আদেশ অমান্য করিবার পরিণাম


পূর্বেই উল্লেখ করা হইয়াছে যে, বুতরুস আল-বুসতানী তাঁহার দাইরাতুল মাআরিফে বলেন, একদল লোকের অভিমত হইল, যুল-কিফ্ল (আ) হইলেন আইয়ুব (আ)-এর পুত্র বিশর (আ)। এই যুল-কি (আ)-কে তাঁহার পিতা আইয়ূব (আ)-এর পর রূম ভূখণ্ডে আল্লাহ তা'আলা রাসূল হিসাবে প্রেরণ করিয়াছিলেন। তাঁহার নবুওয়াত লাভের পর তথাকার লোকজন তাঁহার উপর ঈমান আনিল, তাঁহাকে সত্য নবী বলিয়া স্বীকার করিল এবং তাঁহাকে অসুসরণ করিয়া জীবন যাপন করিতে শুরু করিল। আল্লাহ তা'আলা তাঁহার উম্মতকে জিহাদ করিবার আদেশ দিলে তাহারা আল্লাহর এই আদেশ অমান্য করিয়া বলিল, "হে বিশর! আমরা হইলাম সেই জাতি যাহারা জীবনকে অত্যধিক ভালবাসে, মৃত্যুকে ঘৃণা করে। ইহা সত্ত্বেও আমরা মহান আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলকে ভালবাসি। তাঁহাদের অবাধ্য হওয়াকে অপসন্দ করি। যদি আপনি আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করিতেন যে, তিনি আমাদের যেন হায়াত বৃদ্ধি করিয়া দেন, আমাদের ইচ্ছামত আমাদের মৃত্যু দেন যাহাতে আমরা তাঁহার ইবাদত করিতে ও তাঁহার শত্রুদের সহিত জিহাদ করিতে পারি। তাহাদের এই আবেদনের জবাবে বিশর ইবন আইয়ুব (আ) বলিলেন, তোমরা আমার নিকট এক মহাবস্তুর আবেদন করিয়াছ এবং এক অসম্ভব জিনিসের জন্য আমাকে বাধ্য করিয়াছ। অতঃপর তিনি দাঁড়াইয়া সালাত আদায় করিয়া আল্লাহ্র নিকট দু'আ করিলেন:
"হে আল্লাহ্! আপনি আমাকে রিসালাতের দায়িত্ব পৌঁছাইয়া দিবার আদেশ করিয়াছিলেন। আমি উহা পৌঁছাইয়া দিয়াছি। আমার শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদ করিবার আদেশ করিয়াছেন। আপনি নিশ্চয় জানেন, আমি একমাত্র আমার আত্মার উপরই ক্ষমতাবান। জিহাদের আদেশ শুনিয়া আমার কওম আমার নিকট যেই জিনিসের আবেদন করিয়াছে উহা আপনি আমার চেয়ে বেশী অবগত আছেন। সুতরাং অন্যদের অবাধ্যতার দরুণ আপনি আমাকে পাকড়াও করিবেন না। আপনার সন্তষ্টি লাভের মাধ্যমে আমি আপনার ক্রোধ হইতে আশ্রয় চাহিতেছি। আপনার ক্ষমা লাভের মাধ্যমে আপনার শাস্তি হইতে পরিত্রাণ চাহিতেছি"।
এই সময় আল্লাহ তা'আলা তাঁহার নিকট ওয়াহয়ি পাঠাইলেন যে, আমি তোমার কওমের উক্তি শুনিয়াছি। তাহারা যেই জিনিসের আবদার করিয়াছে তাহা আমি তাহাদেরকে দান করিলাম। তুমি তাহাদের জন্য জামিন হইয়া যাও। বিশর (আ) রিসালাতের দায়িত্ব পালন করিতে থাকিলেন, আল্লাহ্র ওয়াহয়ি সম্পর্কে তাহাদেরকে অবগত করিলেন এবং এই ব্যাপারে তিনি তাহাদের জামিন হইয়া গেলেন। ইহা হইতেই তিনি যুল-কিফল নামে অভিহিত হন। অতঃপর তাহাদের বংশবৃদ্ধি পাইতে থাকিল। জনংখ্যা বৃদ্ধির ফলে স্বদেশে তাহাদের আবাসন সংকুলানে সংকট দেখা দিল। তাহাদের জীবনোপকরণ সংগ্রহ কঠিন হইয়া পড়িল। এই সংকটের সম্মুখীন হইয়া তাহারা আল্লাহর নিকট দু'আ করিতে বাধ্য হইল আল্লাহ যেন তাহাদেরকে পূর্ব নির্ধারিত আয়ু ফিরাইয়া দেন।
আল্লাহ তা'আলা যখন যুল-কিফল (আ)-এর নিকট ওয়াহয়ি পাঠাইলেন, তোমার কওম কি জানিত না যে, তাহাদের ইচ্ছা হইতে আমার ইচ্ছাই ঊর্ধ্বে। অতঃপর তাহাদেরকে তাহাদের পূর্বের বয়সে ফিরাইয়া দেওয়া হইল। তাহারা নির্ধারিত আয়ু অনুযায়ী ইনতিকাল করিল।
আল্লাহর নির্দেশে যু'ল-কিফল (আ)-এর কওমের লোক আবার জীবিত হইয়া গেল। আনন্দে উদ্বেলিত হইয়া যুল-কিফল (আ) আল্লাহ্ অসংখ্য শোকর আদায় করিলেন।
পুনর্জীবিত লোকসকল তাহাদের বাসস্থানে ফিরিয়া গেল। তাহারা যে মৃত্যুর পরে জীবিত হইয়াছিল, আল্লাহ পাক তাহাদের মধ্যে ইহার একটি নিদর্শন রাখিয়া দিলেন। এই সকল লোকের সন্তান-সন্ততিদের শরীর হইতে নির্গত ঘাম হইতে মৃত লাশের গন্ধের মত একটি দুর্গন্ধ ছড়াইত। হযরত যুল-কিফল (আ) পুনরায় তাহাদের মধ্যে ধর্ম প্রচার শুরু করিলেন। প্রথমদিকে তাহারা তাঁহাকে মানিয়া চলিলেও কিছু দিন পরে আবার অবাধ্য হইয়া উঠে এবং আল্লাহর ইবাদত ছাড়িয়া মূর্তিপূজা আরম্ভ করে। শত চেষ্টা করিয়াও যুল-কিফল (আ) তাহাদেরকে সৎপথে আনিতে সক্ষম হইলেন না। মনের দুঃখে তিনি স্বদেশ ত্যাগ করিয়া অন্যত্র চলিয়া গেলেন।

টিকাঃ
বুতরুস আল-বুসতানী, দাইরাতুল-মাআরিফ, ৮খ, ৪১৩
কাসাসুল কুরআন, উরদূ, ২খ, ২০

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ইনতিকাল

📄 ইনতিকাল


উর্দু বিশ্বকোষে যুল-কিফল (আ) ও হিযকীল যে একই ব্যক্তি এই মতটিকে প্রাধান্য দিয়া বলা হইয়াছে যে, কোন কোন ইসরাঈলী বর্ণনামতে যুল-কিফল (আ)-কে তাঁহার শত্রুগণ শহীদ করিয়া দিয়াছিল। এই ইসরাঈলী সূত্র অনুযায়ী তাঁহার সমাধি বাগদাদের নামরূদ কূপের পার্শ্বস্থিত কিফল শহরে অবস্থিত। শত শত বৎসর যাবৎ কবরটি জনসাধারণের যিয়ারত স্থল হিসাবে বিবেচিত হইয়া আসিতেছে। কিন্তু তাজুল আরূস গ্রন্থে আছ-ছা'লাবীর বরাতে বর্ণিত আছে যে, তাঁহার মাযার সিরিয়ার (শাম) নাবলুস এলাকাধীন কিফল শহরে অবস্থিত। রূহুল মাআনীর বর্ণনা অনুযায়ী যুল-কিফল (আ) যদি বিশর ইবন আইয়ূব হইয়া থাকেন তবে তিনি সিরিয়ায় পঁচাত্তর বৎসর বয়সে ইনতিকাল করে।

টিকাঃ
দা'ইরা মাআরিফে ইসলামিয়া, ১০খ, ৬২
রূহুল মাআনী, ১৭খ, ৮২

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সন্তান-সন্তুতি

📄 সন্তান-সন্তুতি


ইতোপূর্বে ‘পরিবার-পরিজনের সহিত সাক্ষাত’ উপ-শিরোনামে বলা হইয়াছে যে, হযরত উযায়র (আ) এক শত বৎসর মৃত থাকার পর পুনর্জীবন লাভ করিয়া স্বগৃহে প্রত্যাবর্তন করেন এবং তাঁহার জীবিত থাকা এক শত আঠার বৎসর বয়সের এক পুত্র তাঁহার দুই কাঁধের মধ্যস্থলের তিল দেখিয়া তাঁহাকে চিনিতে পারিয়াছিলেন। ইহা হইতে বুঝা যায় যে, তিনি বিবাহিত ছিলেন এবং তাঁহার একাধিক পুত্র ও পৌত্রাদি ছিল। বিদায়া ওয়ান-নিহায়ায় (পৃ. ৪২) উল্লিখিত হইয়াছে, হযরত উযায়র (আ) তাঁহার বৃদ্ধ পুত্র ও পৌত্রদের সহিত যুবক অবস্থায় বসবাস করিতেন। কেননা তিনি যখন চল্লিশ বৎসর বয়সের ছিলেন, তখন আল্লাহ তাঁহাকে মৃত্যু দান করিয়াছিলেন এবং সেই অবস্থায়ই তাঁহাকে পুনর্জীবিত করিয়াছিলেন।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 যুল-কিফল ও গৌতম বুদ্ধ

📄 যুল-কিফল ও গৌতম বুদ্ধ


ইদানিং কেহ কেহ বৌদ্ধ ধর্মের প্রচারক গৌতম বুদ্ধের সহিত যুল-কিফল (আ)-এর সম্পৃক্ততার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করিতেছেন। এই সম্পর্কে মাওলানা হিফযুর রহমান বলেন, আধুনিক কালের কাহারো কাহারো বিস্ময়কর অভিমত হইল যে, যুল-কিফল গৌতম বুদ্ধের উপাধি। ইহার কারণ হইল, গৌতম বুদ্ধের সদর দফতরের নাম "কপিল"। কপিলের আরবী কিফ্‌ল। আরবীতে যুল-কিফল শব্দটি মালিক ও অধিকারী অর্থে ব্যবহৃত হয়। যেমন সম্পদ ও বিত্তশালী ব্যক্তিকে যূ'মাল বলা হয়। শহর বা রাজ্যের অধিকারী ব্যক্তিকে যূ-বালাদ-এর খুবই প্রচলন রহিয়াছে। তাহারা বলেন, এই স্থলে যুল-কিফল বলিতে কপিলের অধিকারী বা তাহার শাসক বুঝানো হইয়াছে। এই অভিমত যাহারা পোষণ করেন তাহাদের যুক্তি হইল, গৌতম বুদ্ধের প্রচারিত ধর্মের মূল শিক্ষা ছিল তাওহীদ বা একত্ববাদ, যাহা ইসলামী দাওয়াতের অনুরূপ ছিল। কালক্রমে বৌদ্ধরা উহাতে বিকৃতি ঘটায়। বর্তমান বৌদ্ধ ধর্ম অতীতের ধর্মসমূহের মতই বিকৃত ও পরিবর্তিত রূপ, যাহার ফলে মূল ইসলামী শিক্ষার সহিত উহা পরস্পরবিরোধী মনে হয়। সুতরাং ব্যক্তি, নাম ও তাহার প্রচারিত ধর্মের মৌল শিক্ষার দিকে তাকাইলে মনে হয় তিনিই যুল-কিফল (আ)। এই অভিমত নিছক অনুমান ছাড়া আর কিছুই নহে। ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ হইতে সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য পাওয়া গেলে তবেই উহা গ্রহণ করা যাইতে পারে যাহা অস্বীকার করার কোন যৌক্তিকতা নাই। কিন্তু কেবল অনুমানের ভিত্তিতে এবং সঠিক ইতিহাস ব্যতীত কোন নবীকে কোন ধর্মপ্রচারকের সহিত সম্পৃক্ত করা আদৌ ঠিক নয়। কারণ কোন নবীকে নবী হিসাবে মান্য না করা যেমন কুফরী, অনুরূপ কোন অনবীকে নবী বলিয়া সাব্যস্ত করা বাতিল আকীদার শামিল। যুল-কিফল (আ)-কে গৌতম বুদ্ধ বলিয়া সাব্যস্ত করা অনুমান মাত্র। ইহার স্বপক্ষে ঐতিহাসিক কোন প্রমাণ পাওয়া যায় নাই।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00