📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আলোচনা

📄 আলোচনা


আল্লামা হিফজুর রাহমান সিউহারূবী উপরোল্লিখিত ঘটনাটির সমালোচনা করিয়া বলিয়াছেন, আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস ও আবু মূসা আল- আশআরী (রা)-এর নিকট হইতে যেই সকল বর্ণনা পাওয়া যায়, সেইগুলি হইল মুনকাতি' (সনদ সূত্র কর্তিত) অর্থাৎ এই দুই বিশিষ্ট সাহাবী (রা) হইতে বর্ণনাকারী ব্যক্তি সরাসরি তাঁহাদের নিকট হইতে বর্ণনা করেন নাই বরং ঐ হাদীছ বর্ণনাকারী ও সাহাবীদ্বয়ের মধ্যে অনেক বর্ণনাকারী বাদ পড়িয়াছেন যাহাদের কথা সনদে উল্লেখ নাই। সঙ্গত কারণেই হাদীছগুলি দুর্বল।
বিশিষ্ট তাবিঈ মুজাহিদ (রা)-এর বর্ণনাটিও সন্দেহমুক্ত নয়। বিবেকের দিক দিয়াও যুল-কিফল (আ)-এর জীবনী ও অবস্থাদি সম্পর্কে আলোকপাত করা হয় নাই, তদুপরি তাঁহাকে নবী ও রাসূলগণের সূচীতে গণ্য করা হইয়াছে। ইহার ফলে আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস ও আবু মুসা আশআরী (রা)-এর মত ব্যক্তিত্বসম্পন্ন সাহাবী এবং মুজাহিদ (র) এর মত তাবিঈ হইতে এই জাতীয় বর্ণনা বিশ্বাসযোগ্য নহে যে, তাঁহারা যুল-কিফল (আ) সম্পর্কে এইরূপ বলিবেন যে, তিনি নবী ছিলেন না, বরং একজন সৎলোক ছিলেন।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 যুল-কিফল ও আল-কিফল কি একই ব্যক্তি কি?

📄 যুল-কিফল ও আল-কিফল কি একই ব্যক্তি কি?


মুসনাদ আহমাদ ও তিরমিযী শরীফ গ্রন্থদ্বয়ে আবদুল্লাহ ইবন উমার (রা) হইতে একটি হাদীছ বর্ণিত পাওয়া যায়। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর মুখে একটি হাদীছ একবার-দুইবার নয়, সাতবারেরও বেশী শুনিয়াছি। তিনি বলিয়াছেন: বানী ইসরাঈলের এক ব্যক্তির নাম ছিল কিফল। এমন কোন গোনাহ নাই যাহা সে করে নাই। একদা জনৈকা মহিলা তাহার নিকট আসিলে সে ষাট দীনারের বিনিময়ে তাহাকে ব্যভিচারে সম্মত করিয়া লইল। লোকটি যখন কুকর্ম করিতে উদ্যত হইল, তখন মহিলাটি কাঁপিতে লাগিল এবং কান্নায় ভাঙ্গিয়া পড়িল। সে মহিলাকে জিজ্ঞাসা করিল, তুমি কাঁদিতেছ কেন? আমি কি তোমার উপর কোন জোরযবরদস্তি করিয়াছি? মহিলাটি বলিল, না, কোন যবরদস্তি কর নাই। কিন্তু আমি এই পাপ গত জীবনে কোন দিন করি নাই। এখন অভাব-অনটন আমাকে তাহা করিতে বাধ্য করিয়াছে। ফলে আমি সম্মত হইয়াছিলাম। এই কথা শুনিয়া কিফল তদবস্থাতেই মহিলার নিকট হইতে সরিয়া দাঁড়ায় এবং বলে, যাও! এই, দীনারও তোমার জন্য। এই সময় কিফল ওয়াদা করিল, ভবিষ্যত জীবনে সে আর কোন পাপকার্যে লিপ্ত হইবে না। ঘটনাক্রমে কিফল সেই দিন রাত্রেই ইন্তিকাল করেন। লোকজন সকালে তাহার দরজায় এই বাক্য লেখা দেখিতে পাইল, কেহ যেন অদৃশ্য হইতে তাহা লিখিয়াছে: "আল্লাহ কিফলকে ক্ষমা করিয়াছেন"। এই হাদীছটি ইবন উমার (রা) হইতে বিভিন্ন সনদে বর্ণিত পাওয়া যায়। কোন কোন সূত্রে এবং কোন কোন গ্রন্থে হাদীছটি বর্ণনা করিবার সময় আল-কিফলের স্থলে যুল-কিফল উল্লেখ করা হইয়াছে। আল-কুরতুবীও হাদীছটি বর্ণনা করিবার সময় যুল-কিফল উল্লেখ করিয়াছেন। এইজন্য অনেকের ধারণা হইল, আল-কুরআনে উল্লিখিত যুল-কিফল ও হাদীছে বর্ণিত এই লোকটি একই ব্যক্তি।
কিন্তু তাত্ত্বিক মুফাসসিরগণ এই ধারণাকে অত্যন্ত ভ্রান্ত বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। ইব্‌ন কাছীর এই রিওয়ায়াতটি বর্ণনা করিয়া বলিয়াছেন, কিফল নামক এই ব্যক্তি অন্য কেহ হইবে, আয়াতে উল্লিখিত যুল-কিফল নন।
এই হাদীছটিকে ইমাম তিরমিযী ও আল-হাকিম হাসান বলিয়া অভিহিত করিলেও ইব্‌ন কাছীর বলেন, এই রিওয়ায়াত সিহাহ সিত্তাতে বর্ণিত নাই। এই সনদ অপরিচিত। ইহাকে প্রামাণ্য ধরিয়া লওয়া হইলেও ইহাতে কিফলের কথা বলা হইয়াছে, যুল-কিফলের নয়। মনে হয় সে অন্য কোন ব্যক্তি। ইবনুল জাওযী তাঁহার তাফসীর গ্রন্থ যাদুল-মাসীরে বলিয়াছেন, হাদীছে বর্ণিত লোকটি হইল আল-কিফল এবং আল- কুরআনে উল্লিখিত ব্যক্তি হইল যুল-কিফল (আ)। হিফজুর রহমানও অনুরূপ কথা বলিয়াছেন।
যুল-কিফল ও আল-কিফল যে দুই ভিন্ন ব্যক্তি তাহা বুঝাইতে গিয়া তিনি বলিয়াছেন, আল-কিফল নামক লোকটি যেই রাত্রিতে তাওবা করিয়াছিল সেই রাত্রেই সে মারা গিয়াছিল। সে এইরূপ সময় পায় নাই, যেই সময়ের মধ্যে ইবলীসের সহিত যুল-কিফল (আ)-এর সুপ্রসিদ্ধ ঘটনা ঘটিয়া ছিল।
তিনি ইহাও বলিয়াছেন যে, যদি আমরা যুল-কিফল (আ)-কে নবী হিসাবে মানিয়া লই, তাহা হইলে কিফলের গোনাহে লিপ্ত হইবার যেই ঘটনা, হাদীছে বর্ণিত হইয়াছে তাহা নবুওয়াত লাভের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। কারণ নবীগণ সব সময়ই মা'সূম (নিষ্পাপ) থাকেন।

টিকাঃ
তিরমিযী, বৈরূত, ৪খং ৬৫৭, দিল্লী ২খ, ৭৩; তাফসীরে কুরতুবী, ১১খ, ৩২৭, ৩২৮
তাফসীরে কুরতুবী, ১১খ, ৩২৭
মাআরিফুল কুরআন, ৬খ, ২২৭, ২২৮
কাসাস, ২খ, ২২৬
যাদুল-মাসীর, ৫খ, ৩৭৯, ৩৮০

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 [যুল-কিফল]-এর কওমের পরিচয় এবং তাহাদের আবাসভূমি

📄 [যুল-কিফল]-এর কওমের পরিচয় এবং তাহাদের আবাসভূমি


আল্লামা কুরতুবী তাঁহার তাফসীর গ্রন্থে উল্লেখ করিয়াছেন যে, কা'ব বলেন, বনী ইসরাঈলে একজন কাফির বাদশাহ ছিল। তাহার রাজত্বে একদা একজন নেককার মানুষ আগমন করিলেন। তিনি বাদশাহকে বলিলেন, আপনি এই দেশ ত্যাগ করিলে আমি এই দেশে ইসলাম প্রচার করিতাম। বাদশাহ বলিল, ইহার বিনিময়ে আমি কি লাভ করিব? তিনি বলিলেন, জান্নাত। অতঃপর তিনি তাহার নিকট জান্নাতের সুখ-শান্তির বর্ণনা দিলেন। বাদশাহ বলিল, আমার জন্য এই জান্নাতের জামিন কে হইবে? নেককার ব্যক্তি বলিলেন: আমি। এই কথা শুনিয়া বাদশাহ ইসলাম গ্রহণ করিলেন। রাজত্বের পরিচালনার দায়িত্ব হইতে অবসর গ্রহণ করিয়া তিনি ইবাদতে মাশগুল হইলেন। আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন থাকা অবস্থায় তাহার মৃত্যু হইল। তাহাকে দাফন করা হইল। পরদিন লোকজন ভোরে ঘুম হইতে জাগ্রত হইয়া তাহার একটি হাত কবরের বাহিরে দেখিতে পাইল। হাতের মধ্যে সবুজ বর্ণের একখানা কাগজ ছিল উহাতে নূরের লেখা ছিল: "আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করিয়া দিয়াছেন, আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাইয়াছেন এবং অমুক জামানত পূর্ণ করিয়া দিয়াছেন"।
এই ঘটনা প্রত্যক্ষ করিয়া লোকজন ঈমান আনিবার জন্য ঐ নেককার লোকটির নিকট গমন করিল এবং বাদশাহকে যেভাবে তিনি জান্নাতের জামানত দিয়াছিলেন তাহাদেরকেও সেভাবে জামানত দানের জন্য অনুরোধ করিল। তিনি তাহাদেরকে অনুরূপ জামানত দান করিলেন। ইহাতে তাহারা সকলে মুসলমান হইয়া গেল। এই নেককার লোকটিই ছিলেন হযরত যুল-কিফল (আ) এবং এই লোকগুলিই ছিল তাঁহার কওম বা উম্মত। এই লোকগুলি বনী ইসরাঈল গোত্রভুক্ত ছিল, এই কথার উল্লেখ থাকিলেও তাহারা বনী ইসরঈলের কোন বংশের ছিল উহার কোন বিবরণ নাই। তাহাদের আবাসভূমি কোথায় ছিল তাহারও কোন উল্লেখ নাই।

টিকাঃ
তাফসীরে কুরতুবী, ১১খ,৩২৭, ৩২৮

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 জিহাদের আদেশ অমান্য করিবার পরিণাম

📄 জিহাদের আদেশ অমান্য করিবার পরিণাম


পূর্বেই উল্লেখ করা হইয়াছে যে, বুতরুস আল-বুসতানী তাঁহার দাইরাতুল মাআরিফে বলেন, একদল লোকের অভিমত হইল, যুল-কিফ্ল (আ) হইলেন আইয়ুব (আ)-এর পুত্র বিশর (আ)। এই যুল-কি (আ)-কে তাঁহার পিতা আইয়ূব (আ)-এর পর রূম ভূখণ্ডে আল্লাহ তা'আলা রাসূল হিসাবে প্রেরণ করিয়াছিলেন। তাঁহার নবুওয়াত লাভের পর তথাকার লোকজন তাঁহার উপর ঈমান আনিল, তাঁহাকে সত্য নবী বলিয়া স্বীকার করিল এবং তাঁহাকে অসুসরণ করিয়া জীবন যাপন করিতে শুরু করিল। আল্লাহ তা'আলা তাঁহার উম্মতকে জিহাদ করিবার আদেশ দিলে তাহারা আল্লাহর এই আদেশ অমান্য করিয়া বলিল, "হে বিশর! আমরা হইলাম সেই জাতি যাহারা জীবনকে অত্যধিক ভালবাসে, মৃত্যুকে ঘৃণা করে। ইহা সত্ত্বেও আমরা মহান আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলকে ভালবাসি। তাঁহাদের অবাধ্য হওয়াকে অপসন্দ করি। যদি আপনি আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করিতেন যে, তিনি আমাদের যেন হায়াত বৃদ্ধি করিয়া দেন, আমাদের ইচ্ছামত আমাদের মৃত্যু দেন যাহাতে আমরা তাঁহার ইবাদত করিতে ও তাঁহার শত্রুদের সহিত জিহাদ করিতে পারি। তাহাদের এই আবেদনের জবাবে বিশর ইবন আইয়ুব (আ) বলিলেন, তোমরা আমার নিকট এক মহাবস্তুর আবেদন করিয়াছ এবং এক অসম্ভব জিনিসের জন্য আমাকে বাধ্য করিয়াছ। অতঃপর তিনি দাঁড়াইয়া সালাত আদায় করিয়া আল্লাহ্র নিকট দু'আ করিলেন:
"হে আল্লাহ্! আপনি আমাকে রিসালাতের দায়িত্ব পৌঁছাইয়া দিবার আদেশ করিয়াছিলেন। আমি উহা পৌঁছাইয়া দিয়াছি। আমার শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদ করিবার আদেশ করিয়াছেন। আপনি নিশ্চয় জানেন, আমি একমাত্র আমার আত্মার উপরই ক্ষমতাবান। জিহাদের আদেশ শুনিয়া আমার কওম আমার নিকট যেই জিনিসের আবেদন করিয়াছে উহা আপনি আমার চেয়ে বেশী অবগত আছেন। সুতরাং অন্যদের অবাধ্যতার দরুণ আপনি আমাকে পাকড়াও করিবেন না। আপনার সন্তষ্টি লাভের মাধ্যমে আমি আপনার ক্রোধ হইতে আশ্রয় চাহিতেছি। আপনার ক্ষমা লাভের মাধ্যমে আপনার শাস্তি হইতে পরিত্রাণ চাহিতেছি"।
এই সময় আল্লাহ তা'আলা তাঁহার নিকট ওয়াহয়ি পাঠাইলেন যে, আমি তোমার কওমের উক্তি শুনিয়াছি। তাহারা যেই জিনিসের আবদার করিয়াছে তাহা আমি তাহাদেরকে দান করিলাম। তুমি তাহাদের জন্য জামিন হইয়া যাও। বিশর (আ) রিসালাতের দায়িত্ব পালন করিতে থাকিলেন, আল্লাহ্র ওয়াহয়ি সম্পর্কে তাহাদেরকে অবগত করিলেন এবং এই ব্যাপারে তিনি তাহাদের জামিন হইয়া গেলেন। ইহা হইতেই তিনি যুল-কিফল নামে অভিহিত হন। অতঃপর তাহাদের বংশবৃদ্ধি পাইতে থাকিল। জনংখ্যা বৃদ্ধির ফলে স্বদেশে তাহাদের আবাসন সংকুলানে সংকট দেখা দিল। তাহাদের জীবনোপকরণ সংগ্রহ কঠিন হইয়া পড়িল। এই সংকটের সম্মুখীন হইয়া তাহারা আল্লাহর নিকট দু'আ করিতে বাধ্য হইল আল্লাহ যেন তাহাদেরকে পূর্ব নির্ধারিত আয়ু ফিরাইয়া দেন।
আল্লাহ তা'আলা যখন যুল-কিফল (আ)-এর নিকট ওয়াহয়ি পাঠাইলেন, তোমার কওম কি জানিত না যে, তাহাদের ইচ্ছা হইতে আমার ইচ্ছাই ঊর্ধ্বে। অতঃপর তাহাদেরকে তাহাদের পূর্বের বয়সে ফিরাইয়া দেওয়া হইল। তাহারা নির্ধারিত আয়ু অনুযায়ী ইনতিকাল করিল।
আল্লাহর নির্দেশে যু'ল-কিফল (আ)-এর কওমের লোক আবার জীবিত হইয়া গেল। আনন্দে উদ্বেলিত হইয়া যুল-কিফল (আ) আল্লাহ্ অসংখ্য শোকর আদায় করিলেন।
পুনর্জীবিত লোকসকল তাহাদের বাসস্থানে ফিরিয়া গেল। তাহারা যে মৃত্যুর পরে জীবিত হইয়াছিল, আল্লাহ পাক তাহাদের মধ্যে ইহার একটি নিদর্শন রাখিয়া দিলেন। এই সকল লোকের সন্তান-সন্ততিদের শরীর হইতে নির্গত ঘাম হইতে মৃত লাশের গন্ধের মত একটি দুর্গন্ধ ছড়াইত। হযরত যুল-কিফল (আ) পুনরায় তাহাদের মধ্যে ধর্ম প্রচার শুরু করিলেন। প্রথমদিকে তাহারা তাঁহাকে মানিয়া চলিলেও কিছু দিন পরে আবার অবাধ্য হইয়া উঠে এবং আল্লাহর ইবাদত ছাড়িয়া মূর্তিপূজা আরম্ভ করে। শত চেষ্টা করিয়াও যুল-কিফল (আ) তাহাদেরকে সৎপথে আনিতে সক্ষম হইলেন না। মনের দুঃখে তিনি স্বদেশ ত্যাগ করিয়া অন্যত্র চলিয়া গেলেন।

টিকাঃ
বুতরুস আল-বুসতানী, দাইরাতুল-মাআরিফ, ৮খ, ৪১৩
কাসাসুল কুরআন, উরদূ, ২খ, ২০

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00