📄 যুল-কিফল (আ) নবী ছিলেন কি?
এই পুণ্যাত্মা ব্যক্তি নবী ছিলেন, না শুধুমাত্র সৎকর্মপরায়ণ আল্লাহ্র প্রিয় বান্দা ছিলেন—এই ব্যাপারে আল-কুরআনের ভাষ্যকারগণ দুই ভাগে বিভক্ত। হাদীছ বিশারদগণও এই সম্পর্কে দ্বিধাগ্রস্ত।
মুফাসসির ও মুহাদ্দিছগণের একদলের অভিমত হইল, যুল-কিফল (আ) কেবল আল্লাহ্র প্রিয় বান্দা ছিলেন, নবী ছিলেন না। সাহাবা ও তাবিঈগণের মধ্যেও এই ব্যাপারে মতানৈক্য রহিয়াছে। প্রসিদ্ধ সাহাবী আবূ মূসা আল-আশআরী (রা) ও বিশিষ্ট তাবিঈ মুজাহিদ (র) বলেন, যুল-কিফল (আ) নবী ছিলেন না, আল্লাহর একজন ওয়ালী ছিলেন। আল-কুরতুবী বলেন, অধিকাংশ তাঁহার নবী না হওয়ার অভিমত পোষণ করেন।
অপর একদল মুফাসসির ও মুহাদ্দিছের অভিমত হইল, যুল-কিফল (আ) আল্লাহ্র নবী ছিলেন। হাসান বসরী (র)-এর মতে সংখ্যাগরিষ্ঠ আলিমের অভিমত হইল, ফুল-কিফল নবী ছিলেন। প্রখ্যাত মুফাসসিরগণ যেমন সায়্যিদ আল-আলুসীযাদা, ফখরুদ্দীন আর-রাযী ও আত-তাবরিযী প্রমুখ তাঁহার নবী হওয়ার পক্ষে স্ব স্ব তাফসীর গ্রন্থে অভিমত প্রকাশ করিয়াছেন। সায়্যিদ কুতব ফী জিলালিল-কুরআনে বলিয়াছেন: “সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য অভিমত হইল, যুল-কিফল (আ) বনী ইসরাঈলের একজন নবী ছিলেন। তবে কেহ কেহ বলিয়াছেন, তিনি ছিলেন বনী ইসরাঈলের একজন সৎকর্মপরায়ণ ব্যক্তি"।
যাহারা যুল-কিফল (আ)-কে আল্লাহর নবী মনে করেন তাঁহারা বলেন, আল্লাহ তা'আলা যুল কিফল (আ)-এর কথা আল-কুরআনের দুইটি স্থানেই এমন সকল মনিষীর সহিত করিয়াছেন যাঁহারা সকলেই নবী ছিলেন। যুল-কিফল (আ) যদি নবী না হইতেন তাহা হইলে, তাঁহার কথা নরী ইসমাঈল, ইদরীস ও আল-য়াসা' (আ)-এর সহিত উল্লেখ করিতেন না। তাঁহার প্রসঙ্গটি প্রথমেই আসিয়াছে সূরা আল-আমবিয়ায়। তিনি নবীগণের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন বলিয়াই তো নবীগণের আলোচনা-সম্বলিত সূরায় তাঁহার প্রসঙ্গের অবতারণা করা হয়। তাফসীরবিদ আল্লামা তাবরিজী বলেন, কিতাবুন- নুবুওয়া গ্রন্থে সূত্রসহ বর্ণিত আছে, আবদুল আজীম ইব্ন আবদিল্লাহ আল-হাসানী বলেন, যুল-কিফল (আ) কাঁহার নাম ও তিনি কি রাসূলগণের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, এই সম্পর্কে অবহিত হইবার উদ্দেশে আমি আবু জাফরের নিকট পত্র লিখিয়াছিলাম। উত্তরে তিনি লিখিলেন, আল্লাহ তা'আলা এক লক্ষ চব্বিশ হাজার নবী প্রেরণ করিয়াছিলেন। তাহাদের মধ্যে হইতে তিন শত তেয় জন হইলেন রাসূল। যুল-কিফল (আ) রাসূলগণের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তিনি সুলায়মান ইবন দাউদ (আ)-এর পরে প্রেরিত হইয়াছিলেন। তিনি দাউদ (আ)-এর ন্যায় মানুষের মধ্যে মামলা-মোকদ্দমা নিষ্পত্তি করিতেন। তিনি একমাত্র আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি লাভের নিমিত্তেই কাহারও উপর রাগ করিতেন। কোন সময়ই আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ ব্যতীত কাহারও উপর রাগ করিতেন না। তাঁহার নাম ছিল আদাবিয়্যা ইবন আদাবীন।
আবদুল-হক দেহলাবী তাঁহার তাফসীর হাককানীতে লিখিয়াছেন যে, কাহারও কাহারও মতে যুল-কিফল (আ) একজন বাদশাহ ছিলেন। নবী আল-য়াসা' (আ)-এর আদেশে তিনি বাদশাহী লাভ করিয়াছিলেন। প্রতিমা পূজা উৎখাতের দায়িত্ব গ্রহণ করায় তাঁহাকে যুল-কিফল বলা হইত।
টিকাঃ
যাদুল-মাসীর, ৫খ, ৩৭৯
তাফসীরে কুরতুবী, ১১খ, ৩২৭
তাফসীরুল কাবীর, ২২খ, ২১০
৪খ, ২৩৯৩
মাজমা'উল বায়ান ফী তাফসীরিল কুরআন, ৭/৮খ, ৯৫
তাফসীর হাককানী, উরদু, ১৭খ, ২৩
📄 আল-ইয়াসা' (আ) কর্তৃক খলীফা নিযুক্তির ঘটনা
মুজাহিদ (র) যুল-কিফল (আ) সম্পর্কে একটি ঘটনা বর্ণনা করিয়াছেন। তাঁহার বর্ণিত ঘটনা সদৃশ ইব্ন আবী হাতিম (র) আবদুল্লাহ ইব্ন আব্বাস ও আবূ মূসা আল- আশআরী (রা)-এর বরাতে একটি হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন। ঘটনাটি এইরূপ: আল্লাহর নবী আল-য়াসা' (আ) বার্ধক্যে উপনীত হইলে এমন এক ব্যক্তিকে তাঁহার খলীফা নিযুক্ত করিবার ইচ্ছা পোষণ করিলেন, যিনি তাঁহার জীবদ্দশায় তাঁহার পক্ষ হইতে দায়িত্ব সম্পাদন করিতে পারিবেন। এই উদ্দেশে তিনি তাঁহার সকল অনুসারীকে আহবান করিয়া বলিলেন, আমার পক্ষ হইতে যেই ব্যক্তি দিনে সিয়াম পালনের, সারা রাত্রি সালাত আদায় করিবার এবং বিচারকার্য সম্পাদনের সময় রাগান্বিত না হইবার, এই তিনটি দায়িত্ব পালনের ওয়াদাবদ্ধ হইবে তাহাকে আমি খলীফা নিযুক্ত করিয়া যাইব।
তাঁহার আহবানে একমাত্র যুল-কিফল (আ) সাড়া দিয়াছিলেন, দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার করিয়াছিলেন, প্রতিশ্রুতি মত যথাযথভাবে তাহা পালনও করিয়াছিলেন। ইহার দরুণ তাঁহাকে যুল-কিফল বলিয়া অভিহিত করা হইয়াছিল। আল-য়াসা' (আ)-এর এই ঘটনা শুনিয়া সমাবেশ হইতে এক ব্যক্তি উঠিয়া দাঁড়াইল। লোকটি নিতান্তই অখ্যাত ছিল। তাহাকে সকলেই অতি সাধারণ জ্ঞান করিত। সে বলিল, আমি এই কাজের জন্য প্রস্তুত আছি। আল-য়াসা' (আ) তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি কি সদা-সর্বদা রোযা রাখ, ইবাদতে রাত্রি জাগরণ কর এবং কোন সময় রাগান্বিত হও না? লোকটি উত্তর দিল, নিঃসন্দেহে এই তিনটি আমল আমার মধ্যে আছে। আল-য়াসা' (আ) সম্ভবত তাঁহার কথা বিশ্বাস করিতে পারিলেন না। তাই সেই দিন তাহাকে ফিরাইয়া দিলেন।
দ্বিতীয় দিন তিনি আবার সমাবেশকে লক্ষ্য করিয়া এই কথা জিজ্ঞাসা করিলে উপস্থিত সকলেই নিরুত্তর রহিল এবং পূর্বোক্ত ব্যক্তিই আবার দণ্ডায়মান হইল। আল-য়াসা' (আ) তাঁহাকে তখন খলীফা নিযুক্ত করিবার কথা ঘোষণা করিলেন। যুল-কিফল (আ) এই পদ লাভে সফল হইয়াছেন দেখিয়া শয়তান তাহার অনুচরগণকে ডাকিয়া বলিল, যাও, তোমরা কোনরূপে এই ব্যক্তির দ্বারা এমন কাজ করাইয়া লও, যাহার ফলে তাহার এই পদটি বিলুপ্ত হইয়া যায়। শয়তানের সাঙ্গপাঙ্গরা তাহাদের অক্ষমতা প্রকাশ করিয়া বলিল, এই ব্যক্তিটি আমাদের বশে আসিবার পাত্র নয়। ইবলীস বলিল, তাহা হইলে এই দায়িত্ব আমার হাতে ছাড়িয়া দাও। আমি তাহাকে দেখিয়া লইব। যুল-কিফল (আ) স্বীকারোক্তি অনুযায়ী সারাদিন রোযা রাখিতেন এবং সারা রাত্রি জাগ্রত থাকিতেন। শুধুমাত্র দুপুরে কিছুক্ষণ নিদ্রা যাইতেন। ইবলীস ঠিক দুপুরে নিদ্রার সময় উপস্থিত হইল এবং দরজার কড়া নাড়িতে লাগিল। তিনি জাগ্রত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, কে? ইবলীস উত্তর দিল, আমি একজন বৃদ্ধ মজলুম। যুল-কিফল (আ) দরজা খুলিয়া দিলেন। ভিতরে প্রবেশ করিয়া সে দীর্ঘ কাহিনী বলিতে শুরু করিল, আমার সহিত আমার সম্প্রদায়ের বিবাদ রহিয়াছে। তাহারা আমার উপর এই জুলুম করিয়াছে, সেই জুলুম করিয়াছে। এইভাবে দুপুরের নিদ্রার সময় অতিবাহিত হইয়া গেল। যুল-কিফল (আ) সব শুনিয়া বলিলেন, আমি যখন বাহিরে যাইব, তখন আসিবে। আমি তোমার বিচার করিয়া দিব। যুল-কিফল (আ) বাহিরে আসিলেন এবং আদালত কক্ষে বসিয়া লোকটির জন্য অপেক্ষা করিলেন। কিন্তু সে আসিল না। পরদিন দুপুরে যখন তিনি নিদ্রার জন্য শয়ন কক্ষে গেলেন, তখন লোকটি আসিয়া দরজার কড়া নাড়িতে লাগিল। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, কে? উত্তর হইল, আমি একজন বৃদ্ধ মজলুম। তিনি দরজা খুলিয়া বলিলেন, আমি কি তোমাকে বলি নাই যে, মজলিসে বসিবার সময় আসিও। তুমি গতকালও আসিলে না, আজ সকাল হইতে তোমার দেখা নাই। সে বলিল, হুযূর! আমার শত্রুপক্ষ খুবই ধূর্ত প্রকৃতির। আপনাকে মজলিসে বসা দেখিলে তাহারা আমার প্রাপ্য পরিশোধ করিবে বলিয়া স্বীকার করিয়া লইবে। আবার আপনি যখন মজলিস ত্যাগ করিবেন তখন অস্বীকার করিয়া বসিবে। এই কথোপকথনের মধ্যে সেদিনকার দুপুরও গড়াইয়া গেল এবং তাঁহার নিদ্রা হইল না। পরের দিনও দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করিলেন। কিন্তু তাহার দেখা পাওয়া গেল না।
তৃতীয় দিন দুপুর হইলে তিনি নিদ্রায় যাইবার সময় পরিবারের কোন এক লোককে বলিলেন, কেহ যেন দরজার কড়া না দেয়। বৃদ্ধ লোকটি এই দিনও আগমন করিল এবং দরজার কড়া নাড়া দিতে চাহিল। পাহারাদার তাহাকে নিষেধ করিল। অনন্যোপায় হইয়া সে গৃহের ঘুঘলি দিয়া ঘরে প্রবেশ করিল। ঘরের অভ্যন্তরে ঢুকিয়া ভিতর দিক হইতে দরজায় ধাক্কা দিতে লাগিল। য়ুল-কিফল (আ) জাগ্রত হইয়া বৃদ্ধ লোকটিকে ঘরের অভ্যন্তরে দেখিতে পাইয়া যেই লোককে পাহারার দায়িত্বে নিয়োজিত রাখিয়াছিলেন তাহাকে ডাকিয়া বলিলেন, আমি কি তোমাকে বলি নাই যে, কাহাকেও গৃহে প্রবেশ করিতে দিবে না। লোকটি বলিল, এই বৃদ্ধ লোকটি দরজা দিয়া প্রবেশ করে নাই। য়ুল-কিফল (আ) দরজার দিকে অগ্রসর হইয়া যথারীতি দরজা বন্ধ দেখিতে পাইলেন। বৃদ্ধ লোকটি য়ুল-কিফল (আ)-কে বলিল, মজলুম ব্যক্তি আপনার দরজায় দাঁড়াইয়া থাকিবে আর আপনি গৃহে ঘুমাইয়া পড়িবেন? এই সময় য়ুল-কিফল (আ) তাহার পরিচয় পাইয়া গেলেন যে, সে আসলে ইবলীস এবং সেও তাহা স্বীকার করিল। তিনি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, এই অপকর্মের প্রতি কেন অগ্রসর হইলে? সে বলিল, আপনি আমার সব চেষ্টা ব্যর্থ করিয়া দিয়াছেন, কিছুতেই আমার ফাঁদে পা দিলেন না। তখন আমি আপনাকে কোনরূপে রাগান্বিত করিবার চেষ্টা করিয়াছিলাম, যাহাতে আল- য়াসা' (আ)-এর সহিত কৃত আপনার ওয়াদা ভঙ্গ হইয়া যায়। এই উদ্দেশেই আমি এইসব অপকর্মে উদ্যত হইয়াছি। এই ঘটনার কারণেই তাঁহাকে য়ুল-কিফল খেতাব দেওয়া হইয়াছে বলিয়া অনেকের ধারণা।
য়ুল-কিফল শব্দের অর্থ অঙ্গীকার ও দায়িত্ব পূর্ণকারী ব্যক্তি। হযরত য়ুল-কিফল (আ) তাঁহার অঙ্গীকার পূর্ণ করিয়াছিলেন তাই তাঁহাকে এই নামে অভিহিত করা হয়। ইব্ন আব্বাস (রা) সূত্রে ইবনে আবী হাতিম বর্ণনা করিয়াছেন যে, বানী ইসরাঈলের জনৈক কাযীর মৃত্যু নিকটবর্তী হইলে তিনি বলিয়াছিলেন, কে আছ গোস্বা করিবে না, এই শর্তে আমার স্থলাভিষিক্ত হইবে? তখন যুল-কিফল নামক এক ব্যক্তি বলিয়াছিলেন : আমি রাজী আছি। ইব্ন হাজীরাতুল আকবার বর্ণনা করিয়াছিলেন যে, বনী ইসরাঈলের জনৈক বাদশাহর মৃত্যু নিকটবর্তী হইলে বানী ইসরাঈলের সরদারগণ আসিয়া তাহাকে বলিল, আমাদের জন্য একজন খলীফা নিযুক্ত করিয়া দিন। আমরা বিভিন্ন সমস্যা লইয়া তাহার নিকট উপস্থিত হইব। তখন তিনি বলিয়াছিলেন, আমার পক্ষ হইতে যেই ব্যক্তি তিনটি দায়িত্ব পালন করিবে তাহাকে আমি রাজত্ব প্রদান করিব। তাহার গোত্রের এক যুবক দাঁড়াইয়া বলিল, আমি দায়িত্ব পালন করিতে প্রস্তত। বাদশাহ তাহাকে বসাইয়া দিলেন। দ্বিতীয় দিনও এইরূপ ঘোষণা করিলেন। এই সময় একমাত্র এই যুবকই দাঁড়াইল। বাদশাহ বলিলেন, তুমি আমার পক্ষ হইতে তিনটি জিনিসের দায়িত্ব সম্পাদন করিতে পারিলে আমি তোমাকে বাদশাহী দিব (শর্ত তিনটি ইতিপূর্বে উক্ত হইয়াছে)। যুবকটি বলিল, আমি এইগুলি সম্পাদন করিতে পারিব। বাদশাহ ঘোষণা করিলেন : আমি তোমাকে বাদশাহী প্রদান করিলাম।
টিকাঃ
মাআরিফুল কুরআন, ৬খ, ২২৭, ২২৮; তাফসীরে কুরতুবী, ১১খ, ৩২৭-৩২৮; নূরুল কুরআন, ১৭ খ, ১৩৫-১৩৬
রূহুল মাআনী, ১৭খ, ৮২
📄 আলোচনা
আল্লামা হিফজুর রাহমান সিউহারূবী উপরোল্লিখিত ঘটনাটির সমালোচনা করিয়া বলিয়াছেন, আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস ও আবু মূসা আল- আশআরী (রা)-এর নিকট হইতে যেই সকল বর্ণনা পাওয়া যায়, সেইগুলি হইল মুনকাতি' (সনদ সূত্র কর্তিত) অর্থাৎ এই দুই বিশিষ্ট সাহাবী (রা) হইতে বর্ণনাকারী ব্যক্তি সরাসরি তাঁহাদের নিকট হইতে বর্ণনা করেন নাই বরং ঐ হাদীছ বর্ণনাকারী ও সাহাবীদ্বয়ের মধ্যে অনেক বর্ণনাকারী বাদ পড়িয়াছেন যাহাদের কথা সনদে উল্লেখ নাই। সঙ্গত কারণেই হাদীছগুলি দুর্বল।
বিশিষ্ট তাবিঈ মুজাহিদ (রা)-এর বর্ণনাটিও সন্দেহমুক্ত নয়। বিবেকের দিক দিয়াও যুল-কিফল (আ)-এর জীবনী ও অবস্থাদি সম্পর্কে আলোকপাত করা হয় নাই, তদুপরি তাঁহাকে নবী ও রাসূলগণের সূচীতে গণ্য করা হইয়াছে। ইহার ফলে আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস ও আবু মুসা আশআরী (রা)-এর মত ব্যক্তিত্বসম্পন্ন সাহাবী এবং মুজাহিদ (র) এর মত তাবিঈ হইতে এই জাতীয় বর্ণনা বিশ্বাসযোগ্য নহে যে, তাঁহারা যুল-কিফল (আ) সম্পর্কে এইরূপ বলিবেন যে, তিনি নবী ছিলেন না, বরং একজন সৎলোক ছিলেন।
📄 যুল-কিফল ও আল-কিফল কি একই ব্যক্তি কি?
মুসনাদ আহমাদ ও তিরমিযী শরীফ গ্রন্থদ্বয়ে আবদুল্লাহ ইবন উমার (রা) হইতে একটি হাদীছ বর্ণিত পাওয়া যায়। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর মুখে একটি হাদীছ একবার-দুইবার নয়, সাতবারেরও বেশী শুনিয়াছি। তিনি বলিয়াছেন: বানী ইসরাঈলের এক ব্যক্তির নাম ছিল কিফল। এমন কোন গোনাহ নাই যাহা সে করে নাই। একদা জনৈকা মহিলা তাহার নিকট আসিলে সে ষাট দীনারের বিনিময়ে তাহাকে ব্যভিচারে সম্মত করিয়া লইল। লোকটি যখন কুকর্ম করিতে উদ্যত হইল, তখন মহিলাটি কাঁপিতে লাগিল এবং কান্নায় ভাঙ্গিয়া পড়িল। সে মহিলাকে জিজ্ঞাসা করিল, তুমি কাঁদিতেছ কেন? আমি কি তোমার উপর কোন জোরযবরদস্তি করিয়াছি? মহিলাটি বলিল, না, কোন যবরদস্তি কর নাই। কিন্তু আমি এই পাপ গত জীবনে কোন দিন করি নাই। এখন অভাব-অনটন আমাকে তাহা করিতে বাধ্য করিয়াছে। ফলে আমি সম্মত হইয়াছিলাম। এই কথা শুনিয়া কিফল তদবস্থাতেই মহিলার নিকট হইতে সরিয়া দাঁড়ায় এবং বলে, যাও! এই, দীনারও তোমার জন্য। এই সময় কিফল ওয়াদা করিল, ভবিষ্যত জীবনে সে আর কোন পাপকার্যে লিপ্ত হইবে না। ঘটনাক্রমে কিফল সেই দিন রাত্রেই ইন্তিকাল করেন। লোকজন সকালে তাহার দরজায় এই বাক্য লেখা দেখিতে পাইল, কেহ যেন অদৃশ্য হইতে তাহা লিখিয়াছে: "আল্লাহ কিফলকে ক্ষমা করিয়াছেন"। এই হাদীছটি ইবন উমার (রা) হইতে বিভিন্ন সনদে বর্ণিত পাওয়া যায়। কোন কোন সূত্রে এবং কোন কোন গ্রন্থে হাদীছটি বর্ণনা করিবার সময় আল-কিফলের স্থলে যুল-কিফল উল্লেখ করা হইয়াছে। আল-কুরতুবীও হাদীছটি বর্ণনা করিবার সময় যুল-কিফল উল্লেখ করিয়াছেন। এইজন্য অনেকের ধারণা হইল, আল-কুরআনে উল্লিখিত যুল-কিফল ও হাদীছে বর্ণিত এই লোকটি একই ব্যক্তি।
কিন্তু তাত্ত্বিক মুফাসসিরগণ এই ধারণাকে অত্যন্ত ভ্রান্ত বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। ইব্ন কাছীর এই রিওয়ায়াতটি বর্ণনা করিয়া বলিয়াছেন, কিফল নামক এই ব্যক্তি অন্য কেহ হইবে, আয়াতে উল্লিখিত যুল-কিফল নন।
এই হাদীছটিকে ইমাম তিরমিযী ও আল-হাকিম হাসান বলিয়া অভিহিত করিলেও ইব্ন কাছীর বলেন, এই রিওয়ায়াত সিহাহ সিত্তাতে বর্ণিত নাই। এই সনদ অপরিচিত। ইহাকে প্রামাণ্য ধরিয়া লওয়া হইলেও ইহাতে কিফলের কথা বলা হইয়াছে, যুল-কিফলের নয়। মনে হয় সে অন্য কোন ব্যক্তি। ইবনুল জাওযী তাঁহার তাফসীর গ্রন্থ যাদুল-মাসীরে বলিয়াছেন, হাদীছে বর্ণিত লোকটি হইল আল-কিফল এবং আল- কুরআনে উল্লিখিত ব্যক্তি হইল যুল-কিফল (আ)। হিফজুর রহমানও অনুরূপ কথা বলিয়াছেন।
যুল-কিফল ও আল-কিফল যে দুই ভিন্ন ব্যক্তি তাহা বুঝাইতে গিয়া তিনি বলিয়াছেন, আল-কিফল নামক লোকটি যেই রাত্রিতে তাওবা করিয়াছিল সেই রাত্রেই সে মারা গিয়াছিল। সে এইরূপ সময় পায় নাই, যেই সময়ের মধ্যে ইবলীসের সহিত যুল-কিফল (আ)-এর সুপ্রসিদ্ধ ঘটনা ঘটিয়া ছিল।
তিনি ইহাও বলিয়াছেন যে, যদি আমরা যুল-কিফল (আ)-কে নবী হিসাবে মানিয়া লই, তাহা হইলে কিফলের গোনাহে লিপ্ত হইবার যেই ঘটনা, হাদীছে বর্ণিত হইয়াছে তাহা নবুওয়াত লাভের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। কারণ নবীগণ সব সময়ই মা'সূম (নিষ্পাপ) থাকেন।
টিকাঃ
তিরমিযী, বৈরূত, ৪খং ৬৫৭, দিল্লী ২খ, ৭৩; তাফসীরে কুরতুবী, ১১খ, ৩২৭, ৩২৮
তাফসীরে কুরতুবী, ১১খ, ৩২৭
মাআরিফুল কুরআন, ৬খ, ২২৭, ২২৮
কাসাস, ২খ, ২২৬
যাদুল-মাসীর, ৫খ, ৩৭৯, ৩৮০