📄 নামকরণ
যুল-কিফল (আ)-এর পরিচয় ও তাঁহার নাম সম্পর্কে বিস্তর মতপার্থক্য পাওয়া গেলেও আল-কুরআনের অধিকাংশ ভাষ্যকারের অভিমত হইল, আর যাহাই হউক যুল-কিফল তাঁহার মূল নাম ছিল না। ইহা তাঁহার ছদ্মনাম বা উপাধি। এই উপাধির কারণ নির্ণয়ে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পরিলক্ষিত হয়। তিনি অনেক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন বলিয়া এই বহুমুখী দৃষ্টিভঙ্গির সৃষ্টি হইয়াছে। ইহা ছাড়া আরবী কিফল শব্দের অনেক আভিধানিক অর্থও রহিয়াছে। মতপার্থক্য সৃষ্টির ইহাও অন্যতম কারণ।
আরবী ভাষা ও ব্যাকরণবিদ আয- যাজ্জাজ বলেন, কিফল শব্দের আভিধানিক অর্থ হইল যেই কাপড়খণ্ড উটের নিতম্বে বাঁধা হয়। সায়্যিদ আলুসী বলেন, এই শব্দটির অর্থ হইল অংশ, দ্বিগুণ। সাধারণভাবে তাহার অর্থ কাহারও যামানত গ্রহণ করা বা যামিন হওয়া। অন্য রেফারেন্সে অংশ অর্থ লওয়া হইলে যুল-কিফল যৌগিক শব্দের অর্থ হয় অংশের অধিকারী, যেহেতু যুল-কিফল নামে অভিহিত করা হইত। কিফল শব্দের দ্বিগুণ অর্থ অনুসারে কেহ বলিয়াছেন, যেহেতু তিনি সমকালীন নবীগণ হইতে দ্বিগুণ আমল করিতেন এবং তাঁহার কৃত আমলের ছওয়াবও ছিল দ্বিগুণ, এই কারণে তাঁহাকে যুল-কিফল বলা হইত।
কেহ বলিয়াছেন, তিনি বনী ইসরাঈলের জনৈক নবীর দৈনিক এক শত রাক'আত সালাত আদায় করিবার যামিন হইয়াছিলেন এবং তদনুযায়ী তাহা আদায়ও করিয়াছিলেন। ইহার দরুন তাঁহাকে যুল-কিফল বলা হইত। কেহ বলিয়াছেন, যুল-কিফল (আ) স্বীয় যুগের কোন নবীর কাজের দায়িত্ব গ্রহণ করিয়াছিলেন এবং তাহা যথাযথভাবে সম্পাদন করিয়াছিলেন। ইহার ফলে তাঁহার নাম পড়িয়াছিল যুল-কিফল। এইরূপ একটি অভিমতও পাওয়া যায় যে, যul-কিফল (আ) তাঁহার সমসাময়িক কিনআন বাদশাহকে ঈমানের দাওয়াত দিয়াছিলেন। তাহার আবেদনে তিনি তাহার জন্য জান্নাতের যামিন হইয়াছিলেন, তথায় প্রবেশ করিবার নিমিত্তে তিনি তাহাকে একখানা পত্রও লিখিয়া দিয়াছিলেন। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে তাঁহার নাম যুল-কিফল হিসাবে প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছিল।
কিফল শব্দের এক অর্থ হইল 'উল' বা পশম। ইহা হইতে কেহ কেহ বলিয়াছেন, কিফল অর্থাৎ পশম সদৃশ একটি কাপড় যাহা যুল-কিফল (আ) পরিধান করিতেন। ইহার কারণে তাঁহাকে যুল-কিফল বা পশমওয়ালা ডাকা হইত। সুপ্রসিদ্ধ অভিমত হইল, আল্লাহর নবী আল-য়াসা' (আ) বয়োবৃদ্ধ হইয়া যাইবার পর তাঁহার সকল উম্মতকে আহবান করিয়া বলিয়াছিলেন, আমার পক্ষ হইতে যেই ব্যক্তি দিনে সিয়াম পালনের, সারা রাত্রি সালাত আদায় করিবার এবং বিচারকার্য সম্পাদনের সময় রাগান্বিত না হইবার, এই তিনটি দায়িত্ব পালনের ওয়াদাবদ্ধ হইবে তাহাকে আমি খলীফা নিযুক্ত করিয়া যাইব। তাঁহার আহবানে একমাত্র যুল-কিফল (আ) সাড়া দিয়াছিলেন, দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার করিয়াছিলেন, প্রতিশ্রুতি মত যথাযথভাবে তাহা পালনও করিয়াছিলেন। ইহার দরুণ তাঁহাকে যুল-কিফল বলিয়া অভিহিত করা হইয়াছিল।
টিকাঃ
আত-তাফসীরুল-কাবীর, ২২খ, ২১০
রূহুল মাআনী, ১৭খ, ৮২
রূহুল মাআনী, ঐ
লিসানুল আরাব, ৫খ, ৩৯০৭; দাইরাতুল মাআরিফ, আরবী, ৮খ, ৪১৩
আশ-শাওকানী, ফাতহুল কাদীর, ৩খ, ৪২৩
দাইরাতুল মাআরিফ, উরদু, ১০খ, ৪২
লিসানুল আরাব, বৈরূত ৫খ, ৩৯০৭
আত-তাফসীরুল কাবীর, বৈরূত, ২২খ, ২১০
📄 জন্ম ও বংশপরিচয়
আল-কুরআনের উপরিউক্ত যে দুইটি স্থানে যুল-কিফল (আ)-এর কথা আলোচনা করা হইয়াছে সেখানে অতি সংক্ষেপে তাঁহার কথা আসিয়াছে। এই স্থানদ্বয়ে তাঁহার নাম এবং তাঁহার সহিত সংশ্লিষ্ট কোন ঘটনার অবতারণা করা হয় নাই। প্রসিদ্ধ হাদীছ গ্রন্থগুলিতেও তাঁহার সম্পর্কে কোন বিস্তারিত বিবরণ বিদ্যমান নাই। ইহার ফলে তত্ত্বজ্ঞানী ও তাফসীরকারগণ তাঁহার সম্পর্কে কোন সুনির্দিষ্ট অভিমত ব্যক্ত করিতে পারেন নাই। তাঁহার সম্পর্কে যত কিছু আলোচনা করা হইয়াছে তাহা সবই অনুমানভিত্তিক মনে হয়। যুল-কিফল (আ) কোন মহামানব ছিলেন তাহা সর্বাগ্রে স্থির করা প্রয়োজন। একদল তত্ত্বজ্ঞানীর অভিমত হইল যুল-কিফল প্রকৃত প্রস্তাবে আল্লাহ্ বিশিষ্ট নবী যাকারিয়্যা (আ)-এর উপনাম বা উপাধি ছিল। মহীয়সী রমণী 'ঈসা (আ)-এর মাতা মারয়াম (আ)-এর তত্ত্বাবধান তাঁহার হাতে ন্যস্ত ছিল বলিয়া তাঁহাকে যুল-কিফল বলা হইত। কেহ কেহ বলিয়াছেন, আল্লাহর নবী ইউশা' ইবন নূন (আ)-এর ছদ্মনাম ছিল যুল-কিফল। কেহ বলিয়াছেন, ইলয়াস (আ)-এর অপর নাম যুল-কিফল। কেহ বলিয়াছেন, আল-য়াসা' ইবন আখতুব (রা)-এর এক নাম ছিল যুল-কিফল। তবে পরবর্তী কালের বহু তাফসীরকারের নিকট গ্রহণযোগ্য অভিমত বলিয়া মনে হয় যে, যুল-কিফল (আ) ছিলেন আল-য়াসা' (আ)-এর খলীফা। কেহ কেহ বলিয়াছেন যুল-কিফ্ল (আ) হইলেন আইয়্যুব (আ)-এর পুত্র। তাঁহার নাম ছিল বিশর। স্বীয় পিতার পর আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে নবী হিসাবে প্রেরণ করিয়াছিলেন। আল্লাহ তা'আলাই তাঁহার নাম যুল-কিফল রাখিয়াছিলেন। মানুষের মধ্যে নবী হিসাবে প্রেরণ করিবার পর আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে তাঁহার একত্ববাদের প্রতি দাওয়াত দিবার জন্য আদেশ দিয়াছিলেন। তিনি ছিলেন প্রাচীন 'শাম' (সিরিয়ার) অধিবাসী। তাঁহার একটিমাত্র পুত্র সন্তান ছিল, তাহার নাম আবদান। মৃত্যুকালে তিনি তাঁহাকে অনেক কিছু ওসিয়ত করিয়া গিয়াছিলেন। পঁচাত্তর বৎসর বয়সে তিনি ইন্তিকাল করেন। ইহা আল-হাকীম কর্তৃক ওয়াহ্হ্ব সূত্রে বর্ণিত। বহু তত্ত্বজ্ঞানীর অভিমত হইল, তিনি নবী ছিলেন না। সুপ্রসিদ্ধ তাফসীর গ্রন্থ রূহুল মাআনীতে-বলা হইয়াছে, ইয়াহুদীগণ মনে করে, যুল-কিফল (আ) হইলেন বনী ইসরাঈলের নবী হিযকীল (আ)। কেহ কেহ এই অভিমতকে প্রাধান্য দিয়াছেন এবং তুলনমূলক গ্রহণযোগ্য বলিয়া বিবেচনা করিয়াছেন। আল-কুরআনের আধুনিক ভাষ্যকারগণের বিরাট একটি অংশকে এই অভিমত পোষণের প্রতি অতি আগ্রহী বলিয়া মনে হয়। যুল-কিফল (আ)-এর জন্ম খৃ. পূ. অনুমানিক ৬২২ সালে বলিয়া ধারণা করা হয়। তাফহীমুল কুরআন গ্রন্থে বলা হইয়াছেঃ খৃ. পূ. ৪৯৭ সালে হিযকীল (আ) নবুওয়াত লাভ করিয়াছিলেন। উপরিউক্ত দুইটি গ্রন্থে ভিন্ন ভিন্ন দুইটি নাম উল্লেখ করা হইলেও বর্ণনাভঙ্গি দ্বারা বুঝায় যায় যে, দাইরা মা'আরিফে ইসলামিয়ায় যুল-কিফল বলিতে হিযকীল (আ)-কেই বুঝাইয়াছেন। খৃ. পূ. ৬২২ সালে তাঁহার জন্ম হইলে কি করিয়া তিনি খৃ. পূ. ৫৯৭ সালে নবুওয়াত লাভ করিয়াছিলেন? ইহার কারণেই দাইরা মাআরিফ ইসলামিয়ায় বলা হইয়াছে, সম্ভবত ইহার পূর্বেই তাঁহার জন্ম হইয়া থাকিবে। "তাঁহার পিতার নাম বুযী বলিয়া উল্লেখ আছে। বায়তুল মাকদিসের "হায়কালে মাকদিসের" বংশোদ্ভূত লোক ছিলেন। অথবা ইসরাঈলী পরিভাষায় যাহাদেরকে জ্যোতিষবিদ বলা হইত, তাহাদের বংশভুক্ত লোক ছিলেন। কোন কোন ইসরাঈলী বর্ণনায় রহিয়াছে যে, বুযী প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর নবী য়ারমিয়া (আ)-এর অপর নাম। এই সূত্রটি বিশুদ্ধ প্রমাণিত হইলে হিযকীল (আ) কেবল নবীই নন, বরং নবীপুত্রও বটে। কাসাসুল কুরআনে বলা হইয়াছে, আধুনিক কালের অনেকে মনে করেন যে, যুল-কিফল হইল হিযকীল (আ)-এর উপাধি -এইটুকু বলিয়া কাসাসুল কুরআনের গ্রন্থকার নীরব থাকেন, এই মতের পক্ষে বা বিপক্ষে কোন অভিমতই প্রকাশ করেন নাই। তাঁহার গ্রন্থে তিনি হিযকীল (আ) সম্পর্কে স্বতন্ত্র আলোচনায়, তিনি কখনও বলেন নাই যে, হিযকীল ও যুল-কিফল (আ) এক ও অভিন্ন ব্যক্তি ছিলেন। হিযকীল (আ) সম্পর্কে আলোচনা করিতে গিয়া তিনি বলিয়াছেনঃ হিযকীল বনী ইসরাঈলের অন্যতম নবী ছিলেন। হিযকীল শব্দের বিশ্লেষণে বলা হইয়াছে যে, এই শব্দটি ইবরানী যৌগিক শব্দ। হিযকী ও ঈল এই দুইটি পদবাচ্যে তাহা গঠিত। হিব্রু (ইবরানী) ভাষায় হিযকী শব্দের অর্থ ক্ষমতা, শক্তি, আর ঈল হইল আল্লাহর নাম। আরবী ভাষায় তাহার অনুবাদ করা হয় 'আল্লাহর শক্তি'রূপে। হিযকীল (আ)-এর শৈশবেই তাঁহার পিতা ইন্তিকাল করিয়াছিলেন। তাঁহার নবুওয়াত লাভের সময় তাঁহার জননী অতিবার্ধক্যে উপনীত হইয়াছিলেন। ইহার কারণে ইসরাঈলী সম্প্রদায়ের নিকট তিনি ইবনুল 'আজুয (বৃদ্ধার পুত্র) উপাধিতে প্রসিদ্ধ ছিলেন।
টিকাঃ
আত-তাফসীরুল কুরতুবী, ১১খ, ৩২৭
রূহুল মাআনী, ১৮খ, ৮২
আত-তাফসীরুল কুরতুবী, ঐ
তাফহীমুল কুরআন, উরদু, ৩খ, ১৮
রূহুল-মাআনী, বৈরূত ১৭খ, ৮২
তাফসীরুল কাবীর, ২২খ, ২১০
ঐ, ১৭খ, ৮২
তাফহীমুল কুরআন, ৩খ., ১৮১
দাইরা মাআরিফ ইসলামিয়া, উরদু, ১০খ, ৬২
দাইরা মাআরিফ ইসলামিয়া, উরদু, ১০খ, ৫২
কাসাসুল কুরআন, উরদু, ২খ, ২২২৬
কাসাসুল কুরআন, উর্দু, ২খ, ২০
📄 আল-কুরআনে করীমে যুল-কিফল (আ)
সৃষ্টির আদিকাল হইতে পৃথিবীতে মহান আল্লাহ অসংখ্য নবী-রাসূল প্রেরণ করিয়াছিলেন। তাঁহাদের মধ্য হইতে হাতে গোনা কয়েকজন নবী-রাসূলের কথা আল-কুরআনে বিভিন্ন প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হইয়াছে, যুল-কিফল (আ) হইলেন সেই সকল মহান নবীর অন্তর্ভুক্ত। তাঁহার কথা আল-কুরআনে দুই স্থানে উল্লেখ করা হইয়াছে :
وَاسْمَعِيلَ وَإِدْرِيسَ وَذَا الْكِفْلِ كُلُّ مِنَ الصَّبِرِينَ . وَأَدْخَلْنَهُمْ فِي رَحْمَتِنَا إِنَّهُمْ مِنَ الصَّلِحِينَ .
"এবং স্মরণ কর ইসমাঈল, ইদরীস ও যুল-কিফল-এর কথা, তাহাদের প্রত্যেকেই ছিল ধৈর্যশীল। তাহাদেরকে আমি আমার অনুগ্রহভাজন করিয়াছিলাম; তাহারা ছিল সৎকর্মপরায়ণ" (২১ : ৮৫-৮৬)।
وَاذْكُرْ اسْمَعِيلَ وَالْيَسَعَ وَذَا الْكِفْلِ وَكُلُّ مِنَ الْأَخْيَارِ .
"স্মরণ কর ইসমাঈল, আল-ইয়াসা ও যুল-কিফলের কথা, ইহারা প্রত্যেকেই ছিল সজ্জন” (৩৮ : ৪৮)।
আল-কুরআনে এই দুইটি আয়াতে তাঁহার আলোচনা অন্যান্য নবীগণের সহিত করা হইয়াছে। বলা হইয়াছে, তিনি ছিলেন ধৈর্যশীল, আল্লাহর অনুগ্রহভাজন, সৎকর্মপরায়ণ ও নিষ্ঠাবান। আল-কুরআনে দুইটি স্থানেই তাঁহাকে যুল-কিফল নামে আখ্যায়িত করা হইয়াছে।
📄 যুল-কিফল (আ) নবী ছিলেন কি?
এই পুণ্যাত্মা ব্যক্তি নবী ছিলেন, না শুধুমাত্র সৎকর্মপরায়ণ আল্লাহ্র প্রিয় বান্দা ছিলেন—এই ব্যাপারে আল-কুরআনের ভাষ্যকারগণ দুই ভাগে বিভক্ত। হাদীছ বিশারদগণও এই সম্পর্কে দ্বিধাগ্রস্ত।
মুফাসসির ও মুহাদ্দিছগণের একদলের অভিমত হইল, যুল-কিফল (আ) কেবল আল্লাহ্র প্রিয় বান্দা ছিলেন, নবী ছিলেন না। সাহাবা ও তাবিঈগণের মধ্যেও এই ব্যাপারে মতানৈক্য রহিয়াছে। প্রসিদ্ধ সাহাবী আবূ মূসা আল-আশআরী (রা) ও বিশিষ্ট তাবিঈ মুজাহিদ (র) বলেন, যুল-কিফল (আ) নবী ছিলেন না, আল্লাহর একজন ওয়ালী ছিলেন। আল-কুরতুবী বলেন, অধিকাংশ তাঁহার নবী না হওয়ার অভিমত পোষণ করেন।
অপর একদল মুফাসসির ও মুহাদ্দিছের অভিমত হইল, যুল-কিফল (আ) আল্লাহ্র নবী ছিলেন। হাসান বসরী (র)-এর মতে সংখ্যাগরিষ্ঠ আলিমের অভিমত হইল, ফুল-কিফল নবী ছিলেন। প্রখ্যাত মুফাসসিরগণ যেমন সায়্যিদ আল-আলুসীযাদা, ফখরুদ্দীন আর-রাযী ও আত-তাবরিযী প্রমুখ তাঁহার নবী হওয়ার পক্ষে স্ব স্ব তাফসীর গ্রন্থে অভিমত প্রকাশ করিয়াছেন। সায়্যিদ কুতব ফী জিলালিল-কুরআনে বলিয়াছেন: “সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য অভিমত হইল, যুল-কিফল (আ) বনী ইসরাঈলের একজন নবী ছিলেন। তবে কেহ কেহ বলিয়াছেন, তিনি ছিলেন বনী ইসরাঈলের একজন সৎকর্মপরায়ণ ব্যক্তি"।
যাহারা যুল-কিফল (আ)-কে আল্লাহর নবী মনে করেন তাঁহারা বলেন, আল্লাহ তা'আলা যুল কিফল (আ)-এর কথা আল-কুরআনের দুইটি স্থানেই এমন সকল মনিষীর সহিত করিয়াছেন যাঁহারা সকলেই নবী ছিলেন। যুল-কিফল (আ) যদি নবী না হইতেন তাহা হইলে, তাঁহার কথা নরী ইসমাঈল, ইদরীস ও আল-য়াসা' (আ)-এর সহিত উল্লেখ করিতেন না। তাঁহার প্রসঙ্গটি প্রথমেই আসিয়াছে সূরা আল-আমবিয়ায়। তিনি নবীগণের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন বলিয়াই তো নবীগণের আলোচনা-সম্বলিত সূরায় তাঁহার প্রসঙ্গের অবতারণা করা হয়। তাফসীরবিদ আল্লামা তাবরিজী বলেন, কিতাবুন- নুবুওয়া গ্রন্থে সূত্রসহ বর্ণিত আছে, আবদুল আজীম ইব্ন আবদিল্লাহ আল-হাসানী বলেন, যুল-কিফল (আ) কাঁহার নাম ও তিনি কি রাসূলগণের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, এই সম্পর্কে অবহিত হইবার উদ্দেশে আমি আবু জাফরের নিকট পত্র লিখিয়াছিলাম। উত্তরে তিনি লিখিলেন, আল্লাহ তা'আলা এক লক্ষ চব্বিশ হাজার নবী প্রেরণ করিয়াছিলেন। তাহাদের মধ্যে হইতে তিন শত তেয় জন হইলেন রাসূল। যুল-কিফল (আ) রাসূলগণের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তিনি সুলায়মান ইবন দাউদ (আ)-এর পরে প্রেরিত হইয়াছিলেন। তিনি দাউদ (আ)-এর ন্যায় মানুষের মধ্যে মামলা-মোকদ্দমা নিষ্পত্তি করিতেন। তিনি একমাত্র আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি লাভের নিমিত্তেই কাহারও উপর রাগ করিতেন। কোন সময়ই আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ ব্যতীত কাহারও উপর রাগ করিতেন না। তাঁহার নাম ছিল আদাবিয়্যা ইবন আদাবীন।
আবদুল-হক দেহলাবী তাঁহার তাফসীর হাককানীতে লিখিয়াছেন যে, কাহারও কাহারও মতে যুল-কিফল (আ) একজন বাদশাহ ছিলেন। নবী আল-য়াসা' (আ)-এর আদেশে তিনি বাদশাহী লাভ করিয়াছিলেন। প্রতিমা পূজা উৎখাতের দায়িত্ব গ্রহণ করায় তাঁহাকে যুল-কিফল বলা হইত।
টিকাঃ
যাদুল-মাসীর, ৫খ, ৩৭৯
তাফসীরে কুরতুবী, ১১খ, ৩২৭
তাফসীরুল কাবীর, ২২খ, ২১০
৪খ, ২৩৯৩
মাজমা'উল বায়ান ফী তাফসীরিল কুরআন, ৭/৮খ, ৯৫
তাফসীর হাককানী, উরদু, ১৭খ, ২৩