📄 দু'আ ইউনুসের ফযীলত
ইউনুস (আ) মাছের পেটে অবস্থান করিবার সময় যে দু'আটি বারবার পাঠ করিয়াছিলেন তাহা হইতেছে:
لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
"আপনি ব্যতীত কোন ইলাহ নাই। আপনি পবিত্র আর আমি অপরাধীদের একজন।"
এই দু'আ'টির নামই দু'আ ইউনুস। এই দু'আটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাবান। ইহার ফযীলত ও মর্যাদা সম্পর্কে বেশ কয়েকটি হাদীছও বর্ণিত হইয়াছে:
وعن محمد بن سعد عن أبيه عند سعد بن ابي وقاص قال سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم قال دعوة ذي النون إذا دعا وهو في بطن الحوت لا إِلهَ إِلا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ . فَأَنَّهُ لَمْ يَدْعُ بِهَا رَجُلٌ مُسْلِمٌ فِي شَيْءٍ قَطْ اسْتَجَابَ اللَّهُ لَهُ .
সা'দ ইব্ন আবী ওয়াক্কাস (রা) বর্ণনা করিয়াছেন, আমি রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিতে শুনিয়াছি: “ইউনুস মাছের পেটে অবস্থানকালে যে দু'আ'টি পাঠ করিয়াছিলেন, তাহা হইতেছে:
لَا إِلَٰهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
যখনই কোন মুসলিম ইহা পাঠ করিয়া দু'আ করিবে, আল্লাহ তা'য়ালা তাহা অবশ্যই কবুল করিবেন”।
অন্য বর্ণনায় আরো রহিয়াছে যে, সা'দ ইবন আবী ওয়াক্কাস (রা) বলিয়াছেন, "অমি এক সময় মাসজিদ নববী তে গেলাম। তখন সেখানে হযরত 'উছমান (রা) উপস্থিত ছিলেন। আমি তাঁহাকে সালাম দিলাম। তিনি অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে আমার দিকে তাকাইলেন, তবে সালামের কোন উত্তর দিলেন না। আমি এ বিষয়ে আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার (রা)-এর নিকট অভিযোগ করিলাম। তিনি হযরত উছমান (রা)-কে ডাকিলেন এবং একজন মুসলমান ভাইয়ের সালামের উত্তর না দেওয়ার কারণ সম্পর্কে জানিতে চাহিলেন। তিনি বলিলেন, "সা'দ আমার নিকট আসেন নাই। তিনি আমাকে সালামও জানান নাই। তাই আমি তাহার উত্তরও দেই নাই।" ইহার পর আমি যে তাহাকে সালাম করিয়াছিলাম সে বিষয়ে আল্লাহর শপথ করিলাম। তিনিও তাঁহার বক্তব্যের পক্ষে শপথ করিলেন। এই সময় হঠাৎ তিনি একটি চিন্তা করিয়া তওবা পড়িলেন ও বলিলেন, হাঁ, (হে সা'দ) আপনি এমন সময় বাহির হইয়াছিলেন যখন আমি আমার আত্মার সাথে ঐ বিষয়ে কথোপথন করিতেছিলাম যে সম্পর্কে আমি রাসূলুল্লাহ (স.) হইতে শুনিয়াছিলাম। আল্লাহর শপথ! যখন এই বিষয়টি আমার মনে উদয় হয় তখন শুধু আমার চক্ষুর উপর নহে, বরং আমার আত্মার উপরও পর্দা পড়িয়া যায়।” হযরত সা'দ বলিলেন, "রাসূলুল্লাহ (স.) আমাকে প্রথম একটি দু'আর কথা উল্লেখ করিয়াছিলেন। ইহার পর একজন বেদুঈন আগন্তুকের সঙ্গে কথোপকথনে লিপ্ত হইয়া পড়িবার কারণে পরবর্তীতে তিনি এই বিষয়টি ভুলিয়া গিয়াছিলেন। আমি এই বিষয়েই আপনাকে কিছু বলিতে চাই।
অনেক সময় অতিবাহিত হইবার পর রাসূলুল্লাহ (স.) সেই স্থান হইতে উঠিয়া বাড়ির দিকে রওয়ানা করিলেন। আমিও তাঁহার পিছনে পিছনে চলিতে লাগিলাম। এক পর্যায়ে আমি আশংকা করিতে লাগিলাম যে, তিনি আমাকে রাখিয়া ঘরের ভিতরে প্রবেশ করিবেন। আমি তাঁহার দৃষ্টি আকর্ষণ করিবার জন্য মাটিতে জোরে জোরে পা ফেলিয়া শব্দ করিতে করিতে হাঁটিতে লাগিলাম। তিনি আমার জুতার শব্দ শুনিয়া আমার দিকে তাকাইলেন। ইহার পর জিজ্ঞাসা করিলেন, কে, আবু ইসহাক নাকি? আমি বলিলাম, হে আল্লাহ্র রাসূল! হাঁ। তিনি আমার কিছু বলার আছে কিনা জিজ্ঞাসা করিলেন। আমি বলিলাম, "আপনি প্রথমত একটি দু'আর কথা বলিয়াছিলেন, তারপর বেদুঈন লোকটি আসিবার কারণে আপনি তাহার সহিত কথোপকথনে ব্যস্ত হইয়া পড়িলেন। তিনি বলিলেন, "হাঁ, উক্ত দু'আটি ছিল মৎস্যওয়ালার দু'আ, যাহা তিনি মাছের পেটে থাকিয়া পাঠ করিয়াছিলেন:
ল আল্লাহ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
শুনিয়া রাখ, যখন কোন মুসলমান যে বিষয়ে তাহার রবের নিকটে ইহার মাধ্যমে দু'আ করিবে আল্লাহ অবশ্যই তাহা কবুল করিবেন"। এখানে দু'আ ইউনুস (আ)-এর মাধ্যমে মহান আল্লাহর নিকট কিছু প্রার্থনা করিলে তাহা কবুল হইবার সুস্পষ্ট ঘোষণা মূলত এই দু'আটির ফযীলত ও মর্যাদাকে সমুন্নত করিয়াছে।
এই প্রসঙ্গে আরো বর্ণিত হইয়াছে, হযরত সা'ঈদ ইবনুল মুসায়্যাব (র) বলিয়াছেন, "অমি হযরত সা'দ ইবন মালিক (রা)-কে বলিতে শুনিয়াছি, "আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) কে বলিতে শুনিয়াছি, "দু'আটি যাহার মাধ্যমে দু'আ করিলে কবুল হয়, যাহার মাধ্যমে কিছু চাহিলে তাহা দেওয়া হয়, তাহা হইতেছে ইউনুস ইবন মাত্তা (আ)-এর দু'আ। সা'দ ইবন মালিক (রা) বলিলেন, "আমি বলিলাম, "ইহা কি শুধুমাত্র হযরত ইউনুস (আ)-এর জন্যই নির্দিষ্ট না সকল মুসলমানদের জন্য?" তিনি (স) বলিলেন, "ইহা ইউনুস (আ)-এর জন্য নির্ধারিত হইলেও যখন অন্যান্য মুমিনও ইহার মাধ্যমে দু'আ করে তখন সাধারণভাবে তাহাদেরও দু'আ কবুল হয়। তুমি কি মহান আল্লাহর বাণীটি শ্রবণ কর নাই?
فَنَادِي فِي الظُّلُمَاتِ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ ، فَاسْتَجَيْنَا لَهُ وَنَجَّيْنَاهُ مِنَ الْغَمِّ وَكَذَلِكَ تُنْجْزِي الْمُؤْمِنِينَ
"অতঃপর সে অন্ধকারের মধ্য হইতে আমাকে এই বলিয়া ডাকিল, আপনি ব্যতীত কোন ইলাহ নাই, আপনি পূত পবিত্র, আর আমি অবশ্যই যালিমদের অন্তর্ভুক্ত। তখন আমি তাহার দু'আ কবুল করিলাম, তাহাকে দুশ্চিন্তা হইতে মুক্তি দিলাম। আমি এইভাবেই মুমিনদের মুক্তিদান করিয়া থাকি" (২১:৮৭-৮৮)। ইহার মাধ্যমেই দু'আ করাটাকে আল্লাহ শর্ত করিয়াছেন"। অর্থাৎ এইখানে দু'আ কবুলের জন্য অন্য কোন শর্ত করা হয় নাই। যে কেহ যে কোন সময় যে কোন বিষয়ে ইহার মাধ্যমে দু'আ করিলেই তাহা কবুলের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হইয়াছে। শর্তহীন এই প্রতিশ্রুতি মূলত এই দু'আটির বিরাট মর্যাদারই সাক্ষ্য বহন করে।
হযরত হাসান বসরী (র)-কে প্রশ্ন করা হইয়াছিল যে, আল্লাহকে কোন নামে ডাকিলে তিনি দু'আ কুবল করিয়া থাকেন। তিনি সূরা আল-আম্বিয়া'-এর এই ৮৭তম ও ৮৮তম আয়াত দুইটি তিলাওয়াত করিলেন ও বলিলেন, "ইহাই হইতেছে আল্লাহর ঐ শ্রেষ্ঠ নাম (ইসমে আজম) যাহা দ্বারা দু'আ করিলে দু'আ কবুল হইয়া থাকে"। এখানে দু'আ ইউনুসকে বুঝান হইয়াছে।
আসলে দু'আ ইউনুস হইতেছে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ একটি দু'আ। এখানে এই সকল বর্ণনা দু'আটির বিশেষ ফযীলত ও গুরুত্ব তুলিয়া ধরিয়াছেন। এখানে সকল বর্ণনার বক্তব্য প্রায় একই, আর তাহা হইতেছে এই সম্মানিত দু'আ'টির মাধ্যমে কোন কিছু আল্লাহ্র নিকটে চাহিলে তিনি অবশ্যই তাহা কবুল করেন।
টিকাঃ
তিরমিযী, ৫খ., ৫২
ইব্ন কাছীর, তাফসীরুল কুরআনিল আজীম, ৩খ, ১৮৩-১৮৪
আত-তাবারী, ৯খ., ৭৮
ইবন কাছীর, তাফসীরুল কুরআনিল আজীম, ৩খ., ১৮৪