📄 ইউনুস (আ)-এর ইবাদত বন্দেগী
ইউনুস (আ)-এর ইবাদতের ধরন, প্রকৃতি, নিয়ম-পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত কোন তথ্য পাওয়া যায় না। পবিত্র কুরআনে এই বিষয়ে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত আকারে বলা হইয়াছে, অ
"তিনি ছিলেন তাসবীহ পাঠকারীদের অন্তর্ভুক্ত” (৩৭: ১৪৩)। এই আয়াত হইতে জানা যায় যে, তাসবীহ পাঠ করাই ছিল তাঁহার অন্যতম ইবাদত। এখানে তাসবীহ-এর অর্থ কি সে বিষয়ে বিভিন্ন মত উক্ত হইয়াছে। আরবীতে মূলত 'সুবহানাল্লাহ' বলা বা পড়াকে তাসবীহ বলা হইয়া থাকে। সেই জন্য হযরত ইব্ন জুবায়র (র)-এর মতে এখানে তাসবীহ-এর অর্থ হইতেছে শুধুমাত্র 'সুবহানাল্লাহ' পড়া। পরবর্তীতে তাসবীহ শব্দটির অর্থ ব্যাপকতা লাভ করিয়াছে। শুধু সুবহানাল্লাহ নহে, বরং সকল প্রকার যিকির-আযকারও তাসবীহ-এর অন্তর্ভুক্ত হইয়াছে। সেজন্য অনেকের মতে এখানে তাসবীহ-এর অর্থ হইতেছে ব্যাপকভাবে আল্লাহর যিকির-আযকার করা, মহত্ত্ব বর্ণনা করা, গুণগান করা, স্তুতি করা। কাহারও কাহারও মতে এখানে তাসবীহ বলিতে যিকির ও অন্যান্য ইবাদত উভয়টিকে বুঝান হইয়াছে। ইব্ন আব্বাস (রা) ও আর-রাযীর মতে এখানে তাসবীহ-এর অর্থ হইতেছে সালাত আদায় করা। কেহ কেহ ইহা দ্বারা নফল সালাত আদায় করা বুঝিয়াছেন। এখানে তাসবীহ হইল, মাছের পেটে অবস্থানের সময় তিনি যে সালাত আদায় করিয়াছিলেন তাহা। যাহাই হউক বিভিন্ন নবীদের সময়, ইবাদতের প্রকৃতি ছিল ভিন্ন। হইতে পারে ইউনুস (আ)-এর শরীআতে তাসবীহ করাই ছিল আমাদের সালাত আদায় করার মতই গুরুত্বপূর্ণ ফরয ইবাদত, এমনকি যে সকল নবী ও রাসূল (আ)-এর সময় সালাত আদায়ের প্রচলন ছিল; ইহার প্রকৃতি, নিয়ম-পদ্ধতিও এক এক নবী রাসূল (আ)-এর সময় অন্য নবী-রাসূল (আ) হইতে ভিন্ন হওয়াটা ছিল স্বাভাবিক। সেজন্য এখানে তাসবীহ-এর অর্থ সালাত হইলেও সেই সালাত হয়তবা উম্মতে মুহাম্মাদীর সালাত থেকে ভিন্ন পদ্ধতির ছিল। তাসবীহ-এর প্রকৃতি যাহাই হউক না কেন, সন্দেহাতীভাবে বলা যায় যে, সেটিই ছিল ইউনুস (আ)-এর ইবাদত।
কোন কোন মুফাসসিরের মতে তাঁহার এই তাসবীহ ছিল, মাছের পেটে অবস্থানের পূর্বে তিনি যে তাসবীহ পাঠ করিতেন সেই তাসবীহ। কেহ কেহ বলেন, না, মাছের পেটে অবস্থানের সময় তিনি যে তাসবীহ পাঠ করিয়াছিলেন এখানে সেই সময়ের তাসবীহকে বুঝান হইয়াছে। হযরত কাতাদা (র) বলিয়াছেন, "এইটি ছিল তাঁহার সুসময়ের আমলবিশেষ"। ইবন আবী হাতিম, বায়হাকী, আল-হাকেম হযরত হাসান (রা) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন, "তিনি সুসময়ে প্রচুর পরিমাণে সালাত আদায় করিতেন। যখন তিনি মাছের পেটে প্রবেশ করিলেন তখন এই অবস্থাকে মৃত্যুর অবস্থা ধারণা করিলেন। তারপর তিনি তাঁহার দুইটি পা নাড়াইলেন। সে সময় পাদু'টিকে তিনি নড়াতে দেখিয়া সিজদাতে অবনত হইলেন এবং বলিলেন, "হে রাব্ব! আমি এমন একটি জায়গাকে আপনার উদ্দেশে সিজদার জায়গা হিসাবে গ্রহণ করিলাম যেই স্থানকে অন্য কেহ কখনো সিজদার জায়গা হিসাবে গ্রহণ করে নাই"। এই বর্ণনা অনুযায়ী স্পষ্টত বুঝা যাইতেছে যে, তিনি মাছের পেটে অবস্থানের পূর্বে ও অবস্থানরত উভয় অবস্থাতেই ইবাদতকারী ছিলেন। অপর একটি হাদীছে বিষয়টি আরো পরিষ্কারভাবে বর্ণিত হইয়াছে। সেখানে ফেরেশতারা ইউনুস (আ)-কে মাছের পেটে বন্দী হওয়ার খবর শুনিয়া আশ্চর্য হইয়া আল্লাহ তা'আলাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, হয়রত আবূ হুরায়রা (রা) যেমন বলিয়াছেন যে, আমি রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিতে শুনিয়াছি, "তাঁহারা আশ্চর্য হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, তিনি কি ঐ ইউনুস (আ) যিনি প্রত্যহ আপনার উদ্দেশে অসংখ্য ভাল কাজ সম্পাদন করিতেন? মহান আল্লাহ বলিলেন, হাঁ"। সুতরাং এই হাদীছে ইউনুস (আ) যে পূর্ব হইতেই অসংখ্য ভাল কাজ করিতেন তাহার প্রমাণ পাওয়া যায়। তাই এ কথা পরিষ্কার করিয়া বলা যায় যে, ইউনুস (আ) তাসবীহ, তাঁহার শরীআতে প্রচলিত সালাত ও বিভিন্ন প্রকার ভাল কাজকে ইবাদত হিসাবে পালন করিতেন। এই সবগুলিই ছিল তাঁহার ইবাদত হিসাবে গণ্য।
টিকাঃ
আবু হায়্যান, তাফসীর, ৭খ, ৩৫৯
আল-আলুসী; ২৩ খ. ৪৪
আল-আলুসী ২৩ খ., ১৪৪
আর-রাযী, ২৬ খ., ১৫৬
আবু হ্যায়ান, ৭খ, ৩৫৯
আল-আলুসী, ২৩ খ, ১৪৪
ইবন হাজার, ৬খ., ৫২১; ইবন কাছীর, কাসাসুল আমবিয়া, ২৯১
📄 দু'আ ইউনুসের ফযীলত
ইউনুস (আ) মাছের পেটে অবস্থান করিবার সময় যে দু'আটি বারবার পাঠ করিয়াছিলেন তাহা হইতেছে:
لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
"আপনি ব্যতীত কোন ইলাহ নাই। আপনি পবিত্র আর আমি অপরাধীদের একজন।"
এই দু'আ'টির নামই দু'আ ইউনুস। এই দু'আটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাবান। ইহার ফযীলত ও মর্যাদা সম্পর্কে বেশ কয়েকটি হাদীছও বর্ণিত হইয়াছে:
وعن محمد بن سعد عن أبيه عند سعد بن ابي وقاص قال سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم قال دعوة ذي النون إذا دعا وهو في بطن الحوت لا إِلهَ إِلا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ . فَأَنَّهُ لَمْ يَدْعُ بِهَا رَجُلٌ مُسْلِمٌ فِي شَيْءٍ قَطْ اسْتَجَابَ اللَّهُ لَهُ .
সা'দ ইব্ন আবী ওয়াক্কাস (রা) বর্ণনা করিয়াছেন, আমি রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিতে শুনিয়াছি: “ইউনুস মাছের পেটে অবস্থানকালে যে দু'আ'টি পাঠ করিয়াছিলেন, তাহা হইতেছে:
لَا إِلَٰهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
যখনই কোন মুসলিম ইহা পাঠ করিয়া দু'আ করিবে, আল্লাহ তা'য়ালা তাহা অবশ্যই কবুল করিবেন”।
অন্য বর্ণনায় আরো রহিয়াছে যে, সা'দ ইবন আবী ওয়াক্কাস (রা) বলিয়াছেন, "অমি এক সময় মাসজিদ নববী তে গেলাম। তখন সেখানে হযরত 'উছমান (রা) উপস্থিত ছিলেন। আমি তাঁহাকে সালাম দিলাম। তিনি অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে আমার দিকে তাকাইলেন, তবে সালামের কোন উত্তর দিলেন না। আমি এ বিষয়ে আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার (রা)-এর নিকট অভিযোগ করিলাম। তিনি হযরত উছমান (রা)-কে ডাকিলেন এবং একজন মুসলমান ভাইয়ের সালামের উত্তর না দেওয়ার কারণ সম্পর্কে জানিতে চাহিলেন। তিনি বলিলেন, "সা'দ আমার নিকট আসেন নাই। তিনি আমাকে সালামও জানান নাই। তাই আমি তাহার উত্তরও দেই নাই।" ইহার পর আমি যে তাহাকে সালাম করিয়াছিলাম সে বিষয়ে আল্লাহর শপথ করিলাম। তিনিও তাঁহার বক্তব্যের পক্ষে শপথ করিলেন। এই সময় হঠাৎ তিনি একটি চিন্তা করিয়া তওবা পড়িলেন ও বলিলেন, হাঁ, (হে সা'দ) আপনি এমন সময় বাহির হইয়াছিলেন যখন আমি আমার আত্মার সাথে ঐ বিষয়ে কথোপথন করিতেছিলাম যে সম্পর্কে আমি রাসূলুল্লাহ (স.) হইতে শুনিয়াছিলাম। আল্লাহর শপথ! যখন এই বিষয়টি আমার মনে উদয় হয় তখন শুধু আমার চক্ষুর উপর নহে, বরং আমার আত্মার উপরও পর্দা পড়িয়া যায়।” হযরত সা'দ বলিলেন, "রাসূলুল্লাহ (স.) আমাকে প্রথম একটি দু'আর কথা উল্লেখ করিয়াছিলেন। ইহার পর একজন বেদুঈন আগন্তুকের সঙ্গে কথোপকথনে লিপ্ত হইয়া পড়িবার কারণে পরবর্তীতে তিনি এই বিষয়টি ভুলিয়া গিয়াছিলেন। আমি এই বিষয়েই আপনাকে কিছু বলিতে চাই।
অনেক সময় অতিবাহিত হইবার পর রাসূলুল্লাহ (স.) সেই স্থান হইতে উঠিয়া বাড়ির দিকে রওয়ানা করিলেন। আমিও তাঁহার পিছনে পিছনে চলিতে লাগিলাম। এক পর্যায়ে আমি আশংকা করিতে লাগিলাম যে, তিনি আমাকে রাখিয়া ঘরের ভিতরে প্রবেশ করিবেন। আমি তাঁহার দৃষ্টি আকর্ষণ করিবার জন্য মাটিতে জোরে জোরে পা ফেলিয়া শব্দ করিতে করিতে হাঁটিতে লাগিলাম। তিনি আমার জুতার শব্দ শুনিয়া আমার দিকে তাকাইলেন। ইহার পর জিজ্ঞাসা করিলেন, কে, আবু ইসহাক নাকি? আমি বলিলাম, হে আল্লাহ্র রাসূল! হাঁ। তিনি আমার কিছু বলার আছে কিনা জিজ্ঞাসা করিলেন। আমি বলিলাম, "আপনি প্রথমত একটি দু'আর কথা বলিয়াছিলেন, তারপর বেদুঈন লোকটি আসিবার কারণে আপনি তাহার সহিত কথোপকথনে ব্যস্ত হইয়া পড়িলেন। তিনি বলিলেন, "হাঁ, উক্ত দু'আটি ছিল মৎস্যওয়ালার দু'আ, যাহা তিনি মাছের পেটে থাকিয়া পাঠ করিয়াছিলেন:
ল আল্লাহ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
শুনিয়া রাখ, যখন কোন মুসলমান যে বিষয়ে তাহার রবের নিকটে ইহার মাধ্যমে দু'আ করিবে আল্লাহ অবশ্যই তাহা কবুল করিবেন"। এখানে দু'আ ইউনুস (আ)-এর মাধ্যমে মহান আল্লাহর নিকট কিছু প্রার্থনা করিলে তাহা কবুল হইবার সুস্পষ্ট ঘোষণা মূলত এই দু'আটির ফযীলত ও মর্যাদাকে সমুন্নত করিয়াছে।
এই প্রসঙ্গে আরো বর্ণিত হইয়াছে, হযরত সা'ঈদ ইবনুল মুসায়্যাব (র) বলিয়াছেন, "অমি হযরত সা'দ ইবন মালিক (রা)-কে বলিতে শুনিয়াছি, "আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) কে বলিতে শুনিয়াছি, "দু'আটি যাহার মাধ্যমে দু'আ করিলে কবুল হয়, যাহার মাধ্যমে কিছু চাহিলে তাহা দেওয়া হয়, তাহা হইতেছে ইউনুস ইবন মাত্তা (আ)-এর দু'আ। সা'দ ইবন মালিক (রা) বলিলেন, "আমি বলিলাম, "ইহা কি শুধুমাত্র হযরত ইউনুস (আ)-এর জন্যই নির্দিষ্ট না সকল মুসলমানদের জন্য?" তিনি (স) বলিলেন, "ইহা ইউনুস (আ)-এর জন্য নির্ধারিত হইলেও যখন অন্যান্য মুমিনও ইহার মাধ্যমে দু'আ করে তখন সাধারণভাবে তাহাদেরও দু'আ কবুল হয়। তুমি কি মহান আল্লাহর বাণীটি শ্রবণ কর নাই?
فَنَادِي فِي الظُّلُمَاتِ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ ، فَاسْتَجَيْنَا لَهُ وَنَجَّيْنَاهُ مِنَ الْغَمِّ وَكَذَلِكَ تُنْجْزِي الْمُؤْمِنِينَ
"অতঃপর সে অন্ধকারের মধ্য হইতে আমাকে এই বলিয়া ডাকিল, আপনি ব্যতীত কোন ইলাহ নাই, আপনি পূত পবিত্র, আর আমি অবশ্যই যালিমদের অন্তর্ভুক্ত। তখন আমি তাহার দু'আ কবুল করিলাম, তাহাকে দুশ্চিন্তা হইতে মুক্তি দিলাম। আমি এইভাবেই মুমিনদের মুক্তিদান করিয়া থাকি" (২১:৮৭-৮৮)। ইহার মাধ্যমেই দু'আ করাটাকে আল্লাহ শর্ত করিয়াছেন"। অর্থাৎ এইখানে দু'আ কবুলের জন্য অন্য কোন শর্ত করা হয় নাই। যে কেহ যে কোন সময় যে কোন বিষয়ে ইহার মাধ্যমে দু'আ করিলেই তাহা কবুলের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হইয়াছে। শর্তহীন এই প্রতিশ্রুতি মূলত এই দু'আটির বিরাট মর্যাদারই সাক্ষ্য বহন করে।
হযরত হাসান বসরী (র)-কে প্রশ্ন করা হইয়াছিল যে, আল্লাহকে কোন নামে ডাকিলে তিনি দু'আ কুবল করিয়া থাকেন। তিনি সূরা আল-আম্বিয়া'-এর এই ৮৭তম ও ৮৮তম আয়াত দুইটি তিলাওয়াত করিলেন ও বলিলেন, "ইহাই হইতেছে আল্লাহর ঐ শ্রেষ্ঠ নাম (ইসমে আজম) যাহা দ্বারা দু'আ করিলে দু'আ কবুল হইয়া থাকে"। এখানে দু'আ ইউনুসকে বুঝান হইয়াছে।
আসলে দু'আ ইউনুস হইতেছে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ একটি দু'আ। এখানে এই সকল বর্ণনা দু'আটির বিশেষ ফযীলত ও গুরুত্ব তুলিয়া ধরিয়াছেন। এখানে সকল বর্ণনার বক্তব্য প্রায় একই, আর তাহা হইতেছে এই সম্মানিত দু'আ'টির মাধ্যমে কোন কিছু আল্লাহ্র নিকটে চাহিলে তিনি অবশ্যই তাহা কবুল করেন।
টিকাঃ
তিরমিযী, ৫খ., ৫২
ইব্ন কাছীর, তাফসীরুল কুরআনিল আজীম, ৩খ, ১৮৩-১৮৪
আত-তাবারী, ৯খ., ৭৮
ইবন কাছীর, তাফসীরুল কুরআনিল আজীম, ৩খ., ১৮৪