📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ইউনুস (আ)-এর সম্প্রদায়ের পরিচয় ও তাহাদের গোমরাহী

📄 ইউনুস (আ)-এর সম্প্রদায়ের পরিচয় ও তাহাদের গোমরাহী


নিনিওয়া অঞ্চলে তদানিন্তন কালে বসবাসরত লোকেরাই ছিল ইউনুস (আ)-এর সম্প্রদায়। মহান আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীন এই সম্প্রদায়কে হিদায়াতের পথে ডাকিবার জন্য ইউনুস (আ)-কে সেখানে নবী করিয়া প্রেরণ করিয়াছিলেন।
কোন কোন বিদ্বানদের অভিমত হইতেছে যে, ইউনুস (আ)-এর সম্প্রদায় ছিল দুইটি। এই উভয় সম্প্রদায়ের নিকট তাঁহাকে পাঠান হইয়াছিল। মাছের ঘটনা সংঘটিত হইবার পূর্বে নিনিওয়ার অধিবাসীদের নিকট তাঁহাকে পাঠান হইল। আর মাছের ঘটনার পরে তাঁহাকে অন্য সম্প্রদায়ের নিকট প্রেরণ করা হয়। সূরা আস-সাফফাতের আয়াতসমূহের উপরে ভিক্তি করিয়াই এই মতামত প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। যেমন বলা হইয়াছে: وَإِن يُونُسَ لَمِنَ الْمُرْسَلِينَ ، إِذْ أَبَقَ إلى الفُلْكِ الْمَشْحُونِ . فَسَاهَمَ فَكَانَ مِنَ الْمُدْحَضِينَ . فَالْتَقَمَهُ الحُوتُ وَهُوَ مُلِيمٌ ، فَلَوْلا أَنَّهُ كَانَ مِنَ الْمُسَبِّحِينَ . للبث فِي بَطْنِه إِلى يَوْمِ يُبْعَثُونَ ، فَنَبَدْنَاهُ بِالْعَرَاءِ وَهُوَ سَقِيمٌ ، وَأَنْبَتْنَا عَلَيْهِ شَجَرَةً مِّنْ يَقْطِينِ .
"আর ইউনুস অবশ্যই প্রেরিত পুরুষদের অন্যতম। যখন সে বোঝাই করা একটি নৌকার দিকে পালাইয়া যাইতে লাগিল ও পরে লটারীতে অংশগ্রহণ করিয়া দোষী সাব্যস্ত হইল। শেষ পর্যন্ত মাছ তাঁহাকে গিলিয়া ফেলিল। সে ছিল তিরস্কৃত। তখন যদি সে তাসবীহকারীদের অন্তর্ভুক্ত না হইত, তাহা হইলে তাহাকে কিয়ামত পর্যন্ত মাছের পেটে থাকিতে হইত। অবশেষে আমি তাহাকে বিজন ভূখণ্ডে নিক্ষেপ করিলাম, তখন সে রুগ্ন ছিল। আমি তাহার উপর লতাবিশিষ্ট গাছ উদগত করিলাম" (৩৭: ১৩৯-১৪৬)।
সেখানে ইউনুস (আ)-এর ঘটনা বর্ণনা করিতে যাইয়া প্রথমে মাছের ঘটনা উল্লেখ করা হইয়াছে। ইহার পরে বলা হইয়াছে: وَأَرْسَلْنَاهُ إِلى مِائَةِ أَلْفِ أَوْ يَزِيدُونَ ، فَأَمَنُوا فَمَتَّعْنَاهُمْ إِلَى حِينٍ .
"আমি তাহাকে এক লক্ষ কিম্বা উহা অপেক্ষা বেশী লোকদের নিকট প্রেরণ করিলাম। অতঃপর তাহারা ঈমান আনিল। তাহাদেরকে আমি একটি সময় পর্যন্ত জীবন উপভোগ করিবার সুযোগ দিলাম" ( ৩৭: ১৪৭-১৪৮)।
সুতরাং ইহাতে ধরিয়া লওয়া যায় যে, মাছের ঘটনা সংঘটিত হইবার পরে তাঁহাকে অন্য একটি সম্প্রদায়ের নিকট পাঠান হইয়াছিল। ইহার পূর্বে অন্য একটি সম্প্রদায়ের মাঝে রিসালাতের দায়িত্ব পালন করিতে যাইয়া মহান আল্লহর নির্দেশ ব্যতীত হিজরত করিবার কারণে তাঁহাকে মাছের পেটে বন্দী থাকিতে হয়। ইহা দ্বারা প্রামণিত হয় যে, মাছের ঘটনার পূর্বে তাঁহাকে একটি সম্প্রদায়ের নিকট আর এই ঘটনার পরে তাঁহাকে অন্য সম্প্রদায়ের নিকট প্রেরণ করা হইয়াছিল। অতএব সেখানে এইভাবে বর্ণিত হইবার কারণে আমরা বলিতে পারি যে, তাঁহাকে মাছের ঘটনার পূর্বে নিনিওয়াবাসীর কাছে পাঠান হইয়াছিল। আর যেহেতু তাঁহাকে এই ঘটনার পরে অন্য সম্প্রদায়ের নিকট প্রেরণ করা হইয়াছিল বলিয়া মনে হইতেছে সেহেতু তিনি নাম না জানা আর কোন এক সম্প্রদায়ের নিকট প্রেরিত হইয়াছিলেন বলিয়া ধারণা করা যায়।
আলোচ্য আয়াতসমূহে ঘটনার ধারাবহিকতার দিক লক্ষ করিয়া ইউনুস (আ)-কে পৃথক পৃথক দু'টি সম্প্রদায়ের নিকট পাঠান হইয়াছিল, এই ধারণার অবকাশ থাকিলেও মুফাসসিরগণ ইহাতে একমত যে, তাঁহাকে শুধু নিনিওয়ায় বসবাসরত সম্প্রদায়ের নিকটই প্রেরণ করা হইয়াছিল, অন্য কোন সম্প্রদায়ের নিকট তাঁহাকে প্রেরণ করা হয় নাই। কোন ঘটনার পূর্বাংশ পরে ও পরের অংশ পূর্বে উল্লেখ করা সাহিত্য অলংকারের অন্যতম নিয়ম, ইহা দ্বারা ঘটনার আসল ধারাবাহিকতা পরিবর্তন হওয়া অত্যাবশ্যকীয় নয়। আল-কুরআনে সেই নীতি অবলম্বন করা হইয়াছে।
অপরপক্ষে কোন কোন গবেষক বলিয়াছেন যে, ইউনুস (আ)-কে মাছের ঘটনার পরে নিনিভায় বসবাসরত সম্প্রদায়ের নিকটে প্রেরণ করা হইয়াছিল, আর এই ঘটনার পূর্বে অন্য কোন নাম জানা যায়নি এমন সম্প্রদায়ের নিকটেও প্রেরণ করা হইয়াছিল।
মুফাস্সিসর, ঐতিহাসিক বা অন্য কাহারো নিকট হইতে নiniওয়ার অধিবাসীরা ব্যতীত ইউনুস (আ)-এর যে অন্য কোন সম্প্রদায় ছিল, ইহার নাম, তাহাদের বসবাসের স্থান বা অন্য কোন তথ্য পাওয়া যায় নাই বরং তাহাকে একই সম্প্রদায়ের নিকট মাছের ঘটনার পূর্বে একবার ও পরে আর একবার, এই দুইবারই পাঠাইবার পক্ষে অনেক সমর্থন পাওয়া যায় বিধায় আমাদের অভিমত এই যে, ইউনুস (আ)-এর সম্প্রদায় ছিল শুধু নিনিওয়াবাসী। অন্য কোন সম্প্রদায়ের নিকট হিদায়াত পেশের দায়িত্ব তাঁহাকে দেওয়া হয় নাই। তবে ইউনুস (আ)-এর নিনিওয়াবাসী এই সম্প্রদায়ের লোকসংখ্যা কত ছিল ইহা সম্পর্কে সূরা আস-সাফ্ফাত-এর বর্ণনায় এক লক্ষ অথবা উহা অপেক্ষা বেশী বলিয়া উল্লেখ করা হইলেও বেশী বলিতে কত ছিল সে সম্পর্কে মতভেদ রহিয়াছে। ইমাম মাকহুলের মতে এই বেশীর অর্থ হইতেছে দশ হাজার। তিরমিযী (র) আবুল আলীয়া উবায় ইব্‌ন কা'ব হইতে বর্ণনা করিয়াছেন যে, এই আয়াত সম্পর্কে তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-কে প্রশ্ন করিয়াছিলেন। উত্তরে তিনি বলিয়াছিলেন যে, বেশীর অর্থ হইতেছে বিশ হাজার। হাদীছটির বর্ণনাকারী যদি অপরিচিত না হইত তাহা হইলে আমরা এই সংখ্যাকে চূড়ান্ত বলিয়া ধরিয়া লইতে পারিতাম। এই বিষয়ে ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতে কয়েকটি বর্ণনা উল্লেখ করা হইয়াছে। তাহা হইতেছে—এই বেশীর অর্থ ত্রিশ হাজার, ত্রিশ হাজার ও চল্লিশ হাজারের মধ্যবর্তী কোন একটি সংখ্যা, চল্লিশ ও পঞ্চাশ হাজারের মধ্যকার কোন সংখ্যা। সাঈদ ইব্‌ন যুবায়র (র) বলিয়াছেন, এই বেশীর অর্থ হইতেছে—সত্তর হাজার। তবে মহান আল্লাহ ও তাঁহার রাসূল (স)-এর পক্ষ হইতে এ বিষয়ে সহীহ কোন বর্ণনা না পাওয়ার কারণে এই সংখ্যা কত ছিল উহা নির্দিষ্ট করিয়া না বলাই উত্তম।
সংখ্যা যাহাই হউক না কেন তাহারা শিরক-এ নিমজ্জিত ছিল। কুফরী ও শির্ক তাহাদেরকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিয়াছিল যে, কোন প্রকার সত্য তাহাদের কর্ণকুহরে প্রবেশ করিতেছিল না। তাহারা স্পষ্ট পথভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত ছিল।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ইউনুস (আ)-এর দাওয়াত ও তাবলীগ

📄 ইউনুস (আ)-এর দাওয়াত ও তাবলীগ


তিনি তাঁহার সম্প্রদায়কে তেত্রিশ বৎসর ধরিয়া মহান আল্লাহর পথে আসিবার আহবান জানাইলেন, শিরক-এর ভয়াবহতা ব্যাখ্যা করিলেন, মহান আল্লাহর উপর ঈমান আনিলে ইহকাল ও পরকালে যেসব কল্যাণ নিহিত রহিয়াছে তাহার সুসংবাদ দিলেন, আর ঈমান না আনিলে, শিরক ও কুফরীর মধ্যে নিমজ্জিত থাকিলে যেই কঠিন পরিণতি তাহাদের জন্য অবধারিত, উহার ভয় তাহাদেরকে দেখাইলেন। ফলে দীর্ঘ এই তেত্রিশ বৎসরে মাত্র দুইজন লোক ঈমান আনিল। তিনি নিরাশ হইলেন, তাহাদের জন্য বদদো'আ করিলেন। এত তাড়াতাড়ি নিরাশ হইয়া তাঁহাকে বদদো'আ না করিবার জন্য নির্দেশ দেওয়া হইল। তাহাদের মাঝে আরো চল্লিশ দিন দাওয়াতী কাজ অব্যাহত রাখার জন্য তাঁহাকে বলা হইল। সাঁইত্রিশ দিন অতিবাহিত হইল। কেহই তাঁহার আহবানে সাড়া দিল না।
ঐকান্তিক আস্থার সহিত তিনি তাহাদেরকে দাওয়াত দিতে থাকলেন। তাহারা কুফরীর উপর অটল রহিল, ইউনুস (আ)-কে মিথ্যা প্রতিপন্ন করিল। তখন তিনি দুঃখ ভারাক্রান্ত হইয়া পড়িলেন। তাঁহার এই মিথ্যা প্রতিপন্নকারী সম্প্রদায়কে অল্প দিনের মধ্যেই শাস্তি অবতীর্ণ হইবার ভয় দেখাইয়া তিনি তাহাদেরকে পরিত্যাগ করিয়া অন্যত্র রওনা হইলেন।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ইউনুস (আ)-এর সম্প্রদায়ের প্রতি আগত শাস্তি ও ইহা রহিত হইবার কারণ

📄 ইউনুস (আ)-এর সম্প্রদায়ের প্রতি আগত শাস্তি ও ইহা রহিত হইবার কারণ


নিজের সম্প্রদায়কে পরিত্যাগের পূর্বে কুফরীর উপর অবিচল এই সম্প্রদায়কে তিনি তিন দিনের মধ্যে অনিবার্য কঠোর শাস্তি অবতীর্ণ হইবার ভীতি প্রদর্শন করিলেন। আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) মুজাহিদ, কাতাদা, সাঈদ ইবন্ যুবায়র (র) প্রমুখ মনীষিগণ বলিয়াছেন যে, তিনি তাঁহার সম্প্রদায়কে পরিত্যাগ করিয়া যাইতে দেখিলে তাহারা মহান আল্লাহর পক্ষ হইতে তাহাদের উপর কঠিন শাস্তি পতিত হইবার ব্যাপারে আশঙ্কা বোধ করিল। ইউনুস (আ)-এর ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী শাস্তির পূর্বাভাসস্বরূপ তাহাদের গায়ের রং তাহারা পরিবর্তিত হইতে দেখিল। কৃষ্ণ রঙের মেঘ ধোঁয়া ছড়াইতে ছড়াইতে তাহাদেরকে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিল। তাহারা তাহাদের অনিবার্য ধ্বংস উপলব্ধি করিল। সেই মুহূর্তে মহান আল্লাহ তাহাদের অন্তকরণে তাহাদের কৃত পাপরাশি হইতে তওবা করিবার অনুভূতি জাগ্রত করিয়া দিলেন। তাহারা তাহাদের নিকট প্রেরিত নবীর সাথে অনাকাংখিত কঠোর আচরণ করিয়া যে তাঁহাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করিয়াছিল সেইজন্য তাহারা মনেপ্রাণে অনুতপ্ত হইল। ইহার পর তাহারা পশমের তৈরী পোশাক পরিধান করিল। তাহারা তাহাদের মালিকানাভুক্ত সকল চতুষ্পদ প্রাণীকে তাহাদের বাচ্চাসমূহ হইতে বিচ্ছিন্ন করিল। তাহারা একাগ্র চিত্তে ঈমান আনয়ন করিল, মহান আল্লাহকে স্মরণ করিল। তাহারা নিরুপায় হইয়া চিৎকার ছাড়িয়া মহান আল্লাহকে ডাকিতে লাগিল। কাকুতি-মিনতি করিয়া, অশ্রুসিক্ত হইয়া তাঁহার শাহী দরবারে কান্নাকাটি করিতে লাগিল, নিজেদের অপারগতা প্রকাশ করিয়া ক্ষমা চাহিলে। যুলুম করিয়া তাহারা পরস্পরে একে অপরের যাহা কিছু ভোগ করিয়া আসিতেছিল, তাহা ইহার প্রকৃত মালিকের নিকটে ফিরাইয়া দিল। সকল পুরুষ-নারী, পুত্র-কন্যা মিলিয়া গগনবিদারী শব্দ করিয়া কাঁদিতে লাগিল। তাহাদের গৃহপালিত ও বন্য সকল পশুরা আকাশ ফাটা চিৎকার করিল। উট ও উট শাবকরা আর্তনাদ করিল। গরু-বাঁছুর প্রকম্পিত ডাক ছাড়িল। ছাগল ও ছাগশিশুরা ভীতসন্ত্রস্ত হইয়া করুণ শব্দ করা শুরু করিল। গোটা পরিবেশ ধ্বংসোম্মুখ ও অত্যন্ত বিপদশংকুল রূপ পরিগ্রহ করিল। অন্তরের গভীরতা হইতে উচ্ছ্বসিত মহান আল্লাহর শাস্তির ভয়ে সন্ত্রস্ত বান্দাদের এই ক্ষমা প্রার্থনা মহান আল্লাহর অপার অনুকম্পার দরজায় করাঘাত করিল। তিনি তাঁহার অসীম অনুগ্রহ ও সীমাহীন রহমতের দ্বারা তাহাদের পাপরাশি ক্ষমা করিলেন। তাহাদের উপর অনিবার্য শাস্তি আন্তরিক তওবা ও ঐকান্তিক ঈমান আনয়নের জন্য তিনি রহিত করিলেন। এই দিনটি ছিল আশূরার দিন বুধবার, মতান্তরে মধ্য শাওয়ালের বুধবার। এই ঘটনার উল্লেখ করিয়া আল্লাহ বলেন :
"শুধু ইউনুসের সম্প্রদায় ছাড়া অন্য কোন জনপদের লোকেরা (শাস্তি অনিবার্য উপলব্ধি করিয়া) ইউনুসের সম্প্রদায়ের মত কেন ঈমান গ্রহণ করিল না, যাহাদের ঈমান গ্রহণ তাহাদের জন্য লাভবান প্রমাণিত হইয়াছিল? অতঃপর (ইউনুসের সম্প্রদায়ের) যাহারা ঈমান আনিয়াছিল আমি তাহাদের পার্থিব জীবন হইতে লাঞ্ছনার শাস্তি দূর করিয়া তাহাদেরকে একটি সময় পর্যন্ত জীবন উপভোগের সুযোগ দিয়াছিলাম" (১০ : ৯৮)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মাছের পেটে ইউনুস (আ)-এর অবস্থান

📄 মাছের পেটে ইউনুস (আ)-এর অবস্থান


ইউনুস (আ)-এর পক্ষ হইতে মহান আল্লাহর দিকে আহবানকে তাঁহার সম্প্রদায় প্রত্যাখ্যান করিল। তিনি তাহাদের উপর রাগান্বিত হইলেন। তিনি তাহাদেরকে পরিত্যাগ করিয়া অন্যত্র হিজরত করিবার জন্য বাহির হইয়া পড়িলেন। পথিমধ্যে একটি সমুদ্রগামী জাহাজকে তিনি বাহন হিসাবে গ্রহণ করিলেন। তিনি জাহাজে আরোহণ করিলেন। নির্ধারিত পরিমাণের চাইতে বোঝাই বেশী হওয়ার কারণে জাহাজটি ডুবিয়া যাইবার উপক্রম হইল। প্রচণ্ড বেগে পানিতে জাহাজটি প্রকম্পিত হইয়া উথাল-পাথাল করিতে লাগিল। নিজেদের প্রাণ রক্ষার তাকীদে জাহাজের যাত্রিগণ লটারীর মাধ্যমে জাহাজটির মাত্রাতিরিক্ত বোঝাই হ্রাস করিবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিল। লটারীর মাধ্যমে যাহার বা যাহাদের নাম নির্ধারিত হইবে তাহাকে বা তাহাদেরকে সমুদ্রবক্ষে নিক্ষেপ করা হইবে বলিয়া তাহারা একমত হইল। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাহারা লটারী করিলে মহান আল্লাহ্ নবী ইউনুস (আ)-এর নাম নির্বাচিত হইল। তিনি সকলের মধ্যে সৎ পরিচিত হওয়ার কারণে তাহারা লটারীর এই ফলাফলকে অগ্রাহ্য করিয়া পুনরায় লটারীর ব্যবস্থা করিল। এবারও ইউনুস (আ)-এর নাম উঠিল। তখন তিনি তাঁহার শরীরের কাপড় খুলিয়া সমুদ্র বক্ষে লাফাইয়া পড়িবার প্রস্ততি গ্রহণ শুরু করিলেন। এইবারও তাহার সহযাত্রিগণ তাঁহাকে সমুদ্র গর্ভে নিক্ষিপ্ত হইতে দিল না। পুনরায় লটারীর ব্যবস্থা করিল। দুর্ভাগ্যবশত এইবারও ইউনুস (আ)-এর নাম উঠিল। মূলত মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের এক সুনিপুণ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হইবার উদ্দেশই প্রতিবারই লটারীতে তাঁহার নাম উঠিতে ছিল।
তিনি সাগর বক্ষে নিক্ষিপ্ত হইলেন। মহাবিজ্ঞানী মহান আল্লাহ তদানিন্তনকালে সবুজ সাগর নামে পরিচিত এক সাগর হইতে একটি বৃহদাকার মৎস প্রেরণ করেন। মাছটি তাঁহাকে মহান আল্লাহ্র নির্দেশে গিলিয়া ফেলিল। সে যেন ইউনুস (আ)-এর মাংস ভক্ষণ না করে এবং তাঁহার হাড়ও ভাঙ্গিয়া না ফেলে, মহান আল্লাহ তাহাকে সতর্ক করিয়া দিলেন। এই কথাও বলিয়া দিলেন যে, সে যেন ইউনুস (আ)-কে সংরক্ষণ করে, তাহাকে নিজের জীবিকা হিসাবে গ্রহণ না করে। মাছটি তাঁহাকে পেটে ধারণ করিয়া সমগ্র সাগর ভ্রমণ করিতে লাগিল। মুফাস্সিরগণ বলেন, যখন তিনি মাছের পেটে অবস্থান করিতেছিলেন তখন তিনি মরিয়া গিয়াছেন বলিয়া নিজে ধারণা করিতে লাগিলেন। তিনি নিজের শরীর নাড়াইতে চেষ্টা করিলে শরীরের নড়াচড়া উপলব্ধি করিলেন। এমতাবস্থায় তিনি যে জীবিত রহিয়াছেন তাহা বুঝিতে পারিলেন। মহান আল্লাহর কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তিনি তখন সিজদায় অবনত হইয়া বলিতে লাগিলেন, "হে আমার প্রভু! আমি এমন একটি জায়গাকে আপনার উদ্দেশে সিজদার জায়গা হিসাবে গ্রহণ করিলাম, যেই স্থানকে অন্য কেহ কক্ষনো সিজদার জায়গা হিসাবে গ্রহণ করে নাই"। ইউনুস (আ) সাগর বক্ষে সুচিবিদ্ধ অন্ধকারাচ্ছন্ন মাছের পেটে ভ্রমণ করিতেছেন এমন সময় তিনি সাগরের জলরাশির তর্জন-গর্জনের শব্দের মধ্যেও মাছ ও পাথরপুঞ্জরাও যে মহান আল্লাহর গুণকীর্তন ও তাস্বীহ করিতেছে সেই শব্দ শুনিলেন। এতদশ্রবণে তিনিও মহান আল্লাহ' তাসবীহ পাঠ শুরু করিলেন। তাঁহার তাসবীহ ছিল:
لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ .
"আপনি ব্যতীত সত্যিকারের কোন ইলাহ নেই, আপনি পবিত্র আর আমি অপরাধীদের একজন (২১:৮৭)।" যেমন মহান আল্লাহ বলেন:
فَنَادَى فِي الظُّلُمَاتِ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
"অতঃপর সে অন্ধকারের মধ্য হইতে এই বলিয়া ডাকিল যে, আপনি ব্যতীত কোন ইলাহ নাই। আপনি পূত-পবিত্র; আমি অবশ্যই যালিমদের অন্তর্ভুক্ত” (২১:৮৭)।
এই দু'আটি পরবর্তীতে 'দু'আ ইউনুস' নামে প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছে। তখন মহান আল্লাহ তাঁহার ডাকে সাড়া দিলেন। তিনি মাছটিকে ইউনুস (আ)-কে উদগীরণ করিতে নির্দেশ দান করিলেন। তিনি মুক্তিলাভ করিলেন। ইউনুস (আ)-এর এই ঘটনার অংশটুকুর বর্ণনা সূরা আস-সাফাতের ১৩৯ হইতে ১৪২, সূরা আল-আম্বিয়া-এর ৮৭ ও ৮৮ ও আল-কালামের ৪৮ হইতে ৫০ নম্বর আয়াতসমূহে সংক্ষিপ্তভাবে আসিয়াছে, যাহা ইতোপূর্বে উল্লেখ করা হইয়াছে। এখানে উল্লিখিত অন্ধকার বলিতে ইব্‌ন মাসউদ, ইব্‌ন আব্বাস, আমর ইবন মায়মূন, সাঈদ ইব্‌ন যুবায়র, মুহাম্মাদ ইবন কা'ব, হাসান, কাতাদা, আদ-দাহহাক (র) মাছের পেট ও সাগরের তলদেশের অন্ধকারকে বুঝাইয়াছেন। সালিম ইব্‌ন আবূ যায়িদ বলেন, যে মাছ ইউনুস (আ)-কে ভক্ষণ করিয়াছিল সেই মাছকে অন্য আর একটি মাছে ভক্ষণ করিয়াছিল। সুতরাং এখানে যে অন্ধকারের কথা বলা হইয়াছে তাহা হইতেছে দুই মাছের পেটের ও সাগরের সম্মিলিত অন্ধকার।
তাসবীহ পাঠের পর মহান আল্লাহ তাঁহাকে মুক্তি দান করিলেন। এ সম্পর্কে ইব্‌ন জারীর (র) তাঁহার তাফসীর গ্রন্থে এবং বাজজার তাঁহার মুসনাদ গ্রন্থে আবদুল্লাহ ইব্‌ন রাফি' হইতে বর্ণনা করিয়াছেন, তিনি বলেন, আবু হুরায়রা (রা) বলিয়াছেন: আমি রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিতে শুনিয়াছি, ফেরেশতারা ইউনুসের তাসবীহ শুনিতে পাইলেন। কোন জায়গা হইতে এই তাসবীহ-এর শব্দ আসিতেছে তাহা তাহারা বুঝিতে না পারিয়া মহান আল্লাহকে বলিলেন, "হে আমাদের রব! আমরা একটি অপরিচিত স্থান হইতে তাসবীহ-এর শব্দ শুনিতে পাইতেছি"। মহান আল্লাহ বলিলেন, "এই তাসবীহ পাঠকারী হইতেছে আমার বান্দা ইউনুস। সে গুনাহ করিয়াছিল বলিয়া আমি তাহাকে মাছের পেটে বন্দী করিয়াছি"। তাহারা আশ্চর্য হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, "তিনি কি ঐ ইউনুস, যিনি প্রত্যহ আপনার উদ্দেশেই অসংখ্য সৎকাজ সম্পাদন করিতেন"? মহান আল্লাহ বলিলেন, হাঁ। অতঃপর ফেরেশতারা তাঁহার মুক্তির জন্য সুপারিশ করিলেন। মহান আল্লাহ সুপারিশ গ্রহণ করিলেন। তখন মাছটি তাঁহাকে একটি বৃক্ষহীন সমুদ্র সৈকতে রোগাক্রান্ত পালকহীন পক্ষী ছানার মত রোগগ্রস্ত অবস্থায় নিক্ষেপ করিল। কাতাদা (র)-এর মতে তিনি তিন দিন মাছের পেটে অবস্থান করিয়াছিলেন। জাফর আস-সাদিক বলেন, তিনি সেখানে সাত দিন, আর সাঈদ ইব্‌ন আবিল হাসান ও আবু মালিক (র) বলেন, তিনি ৪০ দিন অবস্থান করিয়াছিলেন।
অন্য একটি হাদীছে বর্ণিত হইয়াছে: ইহার পর মহান আল্লাহ তাঁহাকে ছায়াদানের জন্য সেখানে একটি লাউয়ের গাছ উদগত করিলেন। এই লাউ গাছ সম্পর্কে জাহিলী যুগের আরব কবি উমায়‍্যা ইবনুস সান্ত কত সুন্দরই না বলিয়াছেন!
"আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহের দ্বারা খুলিল নিরবধি নচেৎ তিনি শেষ হইতেন লাউ গাছ না হইত যদি।"
ইহার পর আল্লাহ তাঁহাকে দুগ্ধ পান করাইবার জন্য একটি পাহাড়ী বন্য দুম্বার ব্যবস্থা করিলেন। ছা'লাবী (র) বলেন, এইটি ছিল একটি শিংবিহীন হরিণী। কিসা'ঈ (র) বলেন, এইটি ছিল একটি শিংধারিণী হরিণী। আর ইবনুল আছীরের মতে এইটি ছিল একটি ছাগল। যাহাই হউক এই পশুটি সকাল-সন্ধ্যায় ইউনুস (আ)-কে দুগ্ধ পান করাইত। ঘটনার এই অংশের সংক্ষিপ্ত বর্ণনায় মহান আল্লাহ বলেন:
وَأَنْ يُونُسَ لَمِنَ الْمُرْسَلِينَ . إِذْ أَبَقَ إِلَى الْفُلْكِ الْمَسْحُوْنِ . فَسَاهَمَ فَكَانَ مِنَ الْمُدْحَضِينَ . فَالْتَقَمَهُ الحُوتُ وَهُوَ مُلِيمٌ ، فَلَوْلا أَنَّهُ كَانَ مِنَ الْمُسَبِّحِينَ . لَلَبِثَ فِي بَطْنِه الى يَوْمِ يُبْعَثُونَ ، فَنَبَدْنَاهُ بِالْعَرَاءِ وَهُوَ سقيم، وانْبَتْنَا عَلَيْهِ شَجَرَةٌ مِّنْ يُقْطِينِ .
"আর ইউনুস অবশ্যই প্রেরিত পুরুষদের অন্যতম। যখন সে বোঝাই করা একটি নৌকার দিকে পালাইয়া যাইতে লাগিল ও পরে লটারীতে অংশগ্রহণ করিয়া দোষী সাব্যস্থ হইল। শেষ পর্যন্ত মাছ তাঁহাকে গিলিয়া ফেলিল। সে ছিল তিরস্কৃত। তখন যদি সে তাসবীহকারীদের অন্তর্ভুক্ত না হইত, তাহা হইলে তাহাকে কিয়ামত পর্যন্ত মাছের পেটে থাকিতে হইত। অবশেষে আমি তাহাকে বিজন ভূখণ্ডে নিক্ষেপ করিলাম। সে তখন রুগ্ন ছিল। আমি তাহার উপর লতাবিশিষ্ট গাছ উদগত করিলাম" (৩৭: ১৩৯-১৪৬)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00