📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বংশপরিচয়

📄 বংশপরিচয়


ইউনুস (আ)-এর বংশপরিচয় সম্পর্কে তেমন কোন বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায় না। এ বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আকারে দুইটি বর্ণনা পাওয়া যায়।
(ক) ইউনুস ইব্‌ন মাত্তা (আ) ছিলেন ইয়া'কূব ইবন ইসহাক ইব্‌ন ইবরাহীম (আ)-এর বংশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নবী।
(খ) তিনি হুদ (আ)-এর বংশধর ছিলেন।
কোন কোন মনীষী মনে করেন, মাত্তা ইউনুস (আ)-এর মাতার নাম। আসলে ইহা একটি ভ্রান্ত ধারণা। কেননা ইমাম বুখারী (র) বুখারী শরীফের 'আম্বিয়া' অধ্যায়ে আব্দুল্লাহ ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতে একটি হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন। সেখানে "মাত্তা" যে তাঁহার মাতার নাম নয়, বরং তাঁহার পিতার নাম, ইহা পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা হইয়াছে। সুতরাং সন্দেহাতীতভাবে একথা প্রমাণিত হয় যে, "মাত্তা” হইতেছে ইউনুস (আ)-এর পিতার নাম।
ইংরেজী বাইবেল গ্রন্থে ইউনুস (আ)-এর নাম আমাওই'র পুত্র জোনাহ (Jonah) হিসাবে উল্লেখ করা হইয়াছে। ইহা ভাষাগত পার্থক্যের কারণে হইয়াছে, ইবরানী ভাষার নিয়ম-পদ্ধতির সাথে সংগতি রাখিয়াই তাঁহার নাম এইভাবে উল্লেখ হইয়াছে।
তিনি যখন জন্মগ্রহণ করেন তখন তাঁহার পিতার বয়স ছিল ৭০ বৎসর। তিনি শুধু একটি কাঠের চামচ রাখিয়া কিছু দিনের মধ্যে ইন্তিকাল করেন। অলৌকিক স্বপ্ন প্রভাবে তিনি যাকারিয়‍্যা ইন্ন ইয়াহ্ইয়া-এর কন্যাকে বিবাহ করিয়াছিলেন। এক পর্যায়ে তিনি তাঁহার স্ত্রী-পুত্র ও সম্পদ-সম্পত্তি হারাইয়াছিলেন এবং শেষে অলৌকিকভাবে সব কিছু পুনরায় ফিরিয়া পাইয়াছিলেন।

টিকাঃ
তাবাকাত ইবন সা'দ
আজাইবুল কাসাস

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 কুরআন মজীদে ইউনুস (আ)

📄 কুরআন মজীদে ইউনুস (আ)


পবিত্র কুরআনের দশম সূরা ইউনুস (আ)-এর নামে নামকরণ করা হইয়াছে। কুরআনের ছয়টি জায়গায় ইউনুস (আ)-এর উল্লেখ হইয়াছে। আয়াতসমূহ হইতেছে :
১। সূরা আন-নিসা-এর ১৬৩ তম আয়াত।
২। সূরা আল-আনআম-এর ৮৭ তম আয়াত।
৩। সূরা ইউনুস-এর ৯৮তম আয়াত।
৪। সূরা আল-আম্বিয়া-এর ৮৭ তম ও ৮৮তম আয়াত।
৫। সূরা আস-সাফফাত-এর ১৩৯তম হইতে ১৪৮তম আয়াত।
৬। সূরা আল-কালাম-এর ৪৮ হইতে ৫০ নং আয়াত।
উল্লেখ্য যে, সূরা আন-নিসা ও সূরা আল-আনআমে অন্যান্য নবীদের নামের সহিত তাঁহার নামও উল্লেখ করা হইয়াছে। তাঁহাদের সম্পর্কে কোন বিস্তারিত বা সংক্ষিপ্ত আলোচনা সেখানে আসে নাই। আয়াত দুইটি হইতেছে:
اِنَّا اَوْحَيْنَا اِلَيْكَ كَمَا اَوْحَيْنَا اِلَى نُوْحٍ وَالنَّبِيّٖنَ مِنْ بَعْدِهٖ وَاَوْحَيْنَا اِلٰٓى اِبْرٰهِيْمَ وَاِسْمٰعِيْلَ وَاِسْحٰقَ وَيَعْقُوْبَ وَالْاَسْبَاطِ وَعِيْسٰى وَاَيُّوْبَ وَيُوْنُسَ وَهٰرُوْنَ وَسُلَيْمٰنَ وَاٰتَيْنَا دَاوٗدَ زَبُوْرًا .
"আমি তোমার প্রতি ওহী পাঠাইয়াছি, যেমন নূহ ও তাঁহার পরবর্তী নবীদের প্রতি পাঠাইয়াছিলাম; ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকুব ও তাঁহার সন্তানদের প্রতি এবং ঈসা, আইয়ূব, ইউনুস, হারূন ও সুলায়মানের প্রতিও ওহী পাঠাইয়াছি। আর আমি দাউদকে যাবুর দান করিয়াছি" (৪: ১৬৩)।
وَاسْمَاعِيْلَ وَالْيَسَعَ وَيُوْنُسَ وَلُوْطًا وَكُلًّا فَضَّلْنَا عَلَى الْعٰلَمِيْنَ .
"এবং ইসমাঈল, আল-য়াসা, ইউনুস ও লূত প্রত্যেকেই সারা বিশ্বে গৌরবান্বিত করিয়াছি” (৬:৮৬)।
অবশিষ্ট চারটি জায়গায় ইউনুস (আ) সম্পর্কিত ঘটনাবলী বর্ণিত হইয়াছে। সূরা ইউনুস ও সূরা আম্বিয়া' এই দুইটি জায়গায় তাঁহাকে ইউনুস নামে ও সূরা আস-সাফাতে যুন্-নূন অর্থাৎ মৎসওয়ালা ও সূরা আল-কালামে সাহিবুল হৃত অর্থাৎ মৎসওয়ালা উপাধি উল্লেখ করিয়া তাঁহার ঘটনা বর্ণনা করা হইয়াছে। উল্লিখিত আয়াতসমূহ ও সেই সংশ্লিষ্ট বিষয়টি নিম্নরূপ:
فَلَوْلَا كَانَتْ قَرْيَةٌ اٰمَنَتْ فَنَفَعَهَا اِيْمَانُهَا اِلَّا قَوْمَ يُونُسَ لَمَّا اٰمَنُوا كَشَفْنَا عَنْهُمْ عَذَابَ الْخِزْيِ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَمَتَّعْنَاهُمْ إِلَى حِينٍ .
"শুধু ইউনুসের সম্প্রদায় ছাড়া অন্য কোন জনপদের লোকেরা (শাস্তি অনিবার্য উপলব্ধি করিয়া) ইউনুসের সম্প্রদায়ের মত কেন ঈমান গ্রহণ করিল না, যাহাদের ঈমান গ্রহণ তাহাদের জন্য লাভবান প্রমাণিত হইয়াছিল? অতঃপর (ইউনুসের সম্প্রদায়ের) যাহারা ঈমান আনিয়াছিল আমি তাহাদের পার্থিব জীবন হইতে লাঞ্ছনার শান্তি দূর করিয়া তাহাদেরকে একটি সময় পর্যন্ত জীবন উপভোগের সুযোগ দিয়াছিলাম" (১০:৯৮)।
আলোচ্য আয়াতে একটি সন্দেহের উদ্রেক হইতে পারে, সেইজন্য উহা নিরসন হওয়া বাঞ্ছনীয়। মহান আল্লাহর সিদ্ধান্ত এইরূপ যে, কোন সম্প্রদায়ের কৃতকর্মের ফলস্বরূপ তাহাদের উপর মহান আল্লাহর শাস্তি পতিত হইলে উহা তওবা বা ঈমানের ঘোষণা দ্বারা রহিত হয় না। যেমন ফির'আওন ডুবন্ত অবস্থায় মূসা ও হারুন (আ)-এর রবের উপরে ঈমান আনয়নের ঘোষণা দিলেও উহা গ্রহণ করিয়া তাহাকে শাস্তি হইতে পরিত্রাণ দেওয়া হয় নাই। কেননা শাস্তি পতিত হইয়া গেলে উহা স্বচক্ষে দেখিবার পর তওবা করিলে বা ঈমান আনিবার ঘোষণা দিলে উহা হইতে শাস্তি রহিত করা মহান আল্লাহ্র নির্দেশে নাই। তাহা হইলে প্রশ্ন দাঁড়ায় উল্লিখিত আয়াতে কিভাবে ইউনুসের সম্প্রদায়ের উপর হইতে মহান আল্লাহ অনিবার্য শাস্তি রহিত করিলেন?
বাস্তবে মহান আল্লাহ সাধারণ বান্দাদের সহিত এক, আর ইউনুস (আ)-এর সম্প্রদায়ের সহিত অন্য কোন স্বতন্ত্র নির্দেশ করেন নাই। স্বচক্ষে শাস্তি শুরু হওয়া দেখিয়া ঈমান আনিবার পরে ইউনুস (আ)-এর সম্প্রদায় হইতে মহান আল্লাহ শাস্তি রহিত করিয়াছিলেন এইরূপ কথা ঠিক নহে। ইউনুস (আ)-এর দোআ, হুঁশিয়ারী ও রাগান্বিত হইয়া নিজের সম্প্রদায় ত্যাগ করিয়া যাওয়া হইতে তাঁহার সম্প্রদায় উপলব্ধি করিতে পারিয়াছিল যে, তাহাদের উপর শাস্তি আসা অবধারিত। সেইজন্য তাহারা ঈমান আনিয়াছিল ও তওবা করিয়াছিল। তাহাদের উপর শাস্তি নিপতিত হইবার পূর্বে তাহারা ঈমান আনিয়াছিল বলিয়াই তাহাদের উপর হইতে মহান আল্লাহ শাস্তি রহিত করিয়াছিলেন। অন্যদের মত যদি তাহারও শাস্তি পতিত হইতে দেখিয়া ঈমান আনিত তাহা হইলে মহান আল্লাহ্র চিরন্তন নীতি অনুযায়ী তাহাদেরকেও সেই শাস্তি ভোগ করিয়া ধ্বংস হইয়া যাইতে হইত। সুতরাং সাধারণ বান্দাদের উপর হইতে শাস্তি রহিত না হইবার কারণ হইতেছে, তাহারা শাস্তি আসিতেছে স্বচক্ষে দেখিয়াই তাঁহার উপর তওবা বা ঈমানের ঘোষণা দিয়াছে। আর ইউনুস (আ)-এর এই সম্প্রদায়ের উপর শাস্তি আসিবার পূর্বেই ঈমান আনিবার কারণে তাহাদের সহিত স্বতন্ত্র আচরণ করিয়া তাহাদের উপর হইতে শাস্তি রহিত করা হইয়াছে। এই উভয় শ্রেণীর অবস্থা ছিল ভিন্নতর; বরং আলোচ্য আয়াতে মহান আল্লাহ অন্য কোন সম্প্রদায় ইউনুস (আ)-এর সম্প্রদায়ের মত শাস্তি পতিত হইবার পূর্বেই ঈমান ও তওবা-এর ঘোষণা দিলে তাহাদেরকেও শাস্তি হইতে বাঁচাইবার পরোক্ষ প্রতিশ্রুতিও দিয়াছেন। সুতরাং মহান আল্লাহ তাঁহার নিজস্ব নিয়ম লংঘন করিয়া ইউনুস (আ)-এর সম্প্রদায়ের সহিত বৈষম্য আচরণ করিয়াছেন, এ সন্দেহ একেবারেই অবান্তর। অপর আয়াত হইতেছে:
وَذَا النُّونِ إِذْ ذَهَبَ مُغَاضِبًا فَظَنَّ أَنْ لَنْ نَقْدِرَ عَلَيْهِ فَنَادَى فِي الظُّلُمَاتِ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ . فَاسْتَجَبْنَا لَهُ وَنَجَّيْنَاهُ مِنَ الغَمِّ وَكَذَلِكَ نَنْجْزِي الْمُؤْمِنِينَ .
"(আর আমি ধন্য করিয়াছি) মৎস ওয়ালাকেও, যখন সে ক্রুদ্ধ হইয়া চলিয়া গিয়াছিল এবং ধারণা করিয়াছিল যে, আমি তাহার পথ সংকীর্ণ করিব না। অতঃপর সে অন্ধকারের মধ্যে হইতে আমাকে এই বলিয়া ডাকিল যে, আপনি ব্যতীত কোন ইলাহ নাই, আপনি পূত পবিত্র, আর আমি অবশ্যই যালিমদের (অপরাধীদের) অন্তর্ভুক্ত। তখন আমি তাহার দোআ কবুল করিলাম, তাহাকে দুশ্চিন্তা হইতে মুক্তি দিলাম। আমি এইভাবেই মুমিনদের মুক্তি দান করিয়া থাকি" (২১:৮৭-৮৮)।
আলোচ্য আয়াত দুইটির দৃষ্টিতে কোন কোন গবেষক ইউনুস (আ)-এর উপর কয়েকটি অভিযোগ উত্থাপন করিয়াছেন। সত্যের মাপকাঠিতে এইগুলির গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে আলোচনা হওয়া একান্ত প্রয়োজন।
কাহারো মতে "তিনি ক্রুদ্ধ হইয়া চলিয়া গিয়াছিলেন"-এর অর্থ হইতেছে তিনি মহান আল্লাহর বিরুদ্ধে ক্রুদ্ধ হইয়াছিলেন। একজন নবী হইয়া মহান আল্লাহর বিরুদ্ধে ক্রুদ্ধ হওয়া বা রাগান্বিত হওয়া নবীদের মর্যাদার পরিপন্থী।"
আসলে সন্দেহের উপর ভিত্তি করিয়াই ইউনুস (আ)-এর বিরুদ্ধে এই অভিযোগ উত্থাপিত হইয়াছে। একজন নবী হইয়া তিনি তাঁহার রবের উপর ক্রুদ্ধ হইতেই পারেন না। মূলত তিনি কয়েকটি কারণে তাঁহার সম্প্রদায়ের উপর ক্রুদ্ধ হইয়াছিলে :
(ক) পূর্ব হইতে তাঁহার সম্প্রদায়ের সাড়ে নয়টি গোত্র বন্দী হইয়াছিল। রাজা হিযকিয় শুধু তাঁহাকেই ঐ সকল অবরুদ্ধদের নিকট প্রেরণ করিয়াছিলেন। সেই সময় ইসরাঈল বংশে আরো পাঁচজন নবী বিদ্যমান ছিলেন। অন্যদেরকে বাদ রাখিয়া শুধু তাঁহার উপর সমগ্র মিশনের দায়িত্ব ন্যস্ত হওয়ায় তিনি রাগান্বিত হইয়াছিলেন।
(খ) এ দায়িত্ব পালনের জন্য তাঁহাকে এত বেশী তাকীদ দেওয়া হইয়াছিল যে, তিনি জুতাটি পর্যন্ত পরিধান ও বাহনের পশুর পৃষ্ঠে আরোহণেরও সময় পান নাই। এইজন্য তিনি ক্রুদ্ধ হইয়াছিলেন।
(গ) তাঁহার দেওয়া দাওয়াত বিশ্বাস করিয়া নিনাওয়াবাসী ঈমান না আনিয়া তাঁহাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করিবার জন্য তিনি ক্রুদ্ধ হইয়াছিলেন।
যাই হউক, তাঁহার এই ক্রুদ্ধ হওয়া মহান আল্লাহর বিরুদ্ধে ছিল না, তাঁহার সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধেই ছিল। সুতরাং তাঁহার বিরুদ্ধে উল্লিখিত অভিযোগ সঠিক নয়।
কোন কোন গবেষক এখানের لَنْ نَقْدَرَ عَلَيْهِ-এর অর্থ করিয়াছেন-"তিনি এই ধারণা পোষণ করিয়াছিলেন যে, আল্লাহ তাঁহাকে পাকড়াও করিবার ক্ষমতা রাখেন না"। এখানে প্রশ্ন জাগে যে, সকল ক্ষমতার আধার সার্বভৌমত্বের মালিক মহান আল্লাহ সম্পর্কে একজন নবীর পক্ষ হইতে এইরূপ ধারণা পোষণ করা আপত্তিকর নয় কি? আসলে এই আয়াতের সঠিক অর্থ হইতেছে- "তিনি ধারণা করিয়াছিলেন যে, মহান আল্লাহ তাঁহার পথকে সংকীর্ণ করিবেন না"। অর্থাৎ তিনি তাঁহার সম্প্রদায়ের উপর ক্ষুব্ধ হইয়া মহান আল্লাহর নির্দেশ ব্যতীত হিজরত করিবার কারণে তিনি ধারণা করিয়াছিলেন যে, মহান আল্লাহ তাঁহার পথকে সংকীর্ণ করিবেন না, বরং তাঁহার প্রতি অনুগ্রহ প্রদর্শন করিবেন। সুতরাং তিনি মহান আল্লাহর ক্ষমতার ব্যাপকতা সম্পর্কে সন্দেহ করিয়াছিলেন এ অভিযোগ ঠিক নহে। তবে মহান আল্লাহর নির্দেশের বা অনুমতির অপেক্ষা না করিয়া তাঁহার সম্প্রদায়কে ছাড়িয়া হিজরত করিবার মত পদস্খলন তাঁহার পক্ষ হইতে সংঘটিত হওয়ার কারণেই তাঁহাকে ভর্ৎসনা করা হইয়াছে। কেননা নবীদের হিজরত মহান আল্লাহর নির্দেশ ব্যতীত হওয়াটা বাঞ্ছনীয় নয়। এই তিরস্কার ছিল এইজন্যেই, রিসালাতের দায়িত্ব পালনে শিথিলতা প্রদর্শনের জন্য নহে। মূলত সম্প্রদায়কে ছাড়িয়া হিজরত করার সংগত কারণ ছিল বলিয়াই তিনি মহান আল্লাহর নির্দেশে অপেক্ষা না করিয়া হিজরত করিয়াছিলেন। কারণ হইতেছে ইউনুস (আ) মহান আল্লাহ্র নির্দেশে তাঁহার দাওয়াত উপেক্ষাকারী সম্প্রদায়কে কয়েক দিনের ভিতরে কঠিন শাস্তির মাধ্যমে ধ্বংস হইবার সংবাদ শুনাইলেন। ইহার পর তিনি তাহাদের পরিত্যাগ করিয়া চলিয়া গেলেন। কিন্তু পরিস্থিতির ভয়াবহতা লক্ষ্য করিয়া তাহারা তওবা ও ঈমানের ঘোষণা দান করিলে মহান আল্লাহ তাহাদের উপরের অনিবার্য শাস্তিকে রহিত করিলেন। ইউনুস (আ) ভাবিলেন, তিনি মিথ্যাবাদী প্রমাণিত হইয়াছেন। এই অবস্থায় তাঁহার সম্প্রদায়ের নিকট ফিরিয়া গেলে তাঁহাদের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী মিথ্যা আচরণের শাস্তি হিসাবে তাঁহাকে তাহারা হত্যা করিবে। সুতরাং এই স্থান ত্যাগ করিয়া হিজরত করা ব্যতীত তাঁহার কোন গত্যন্তর ছিল না। এহেন সঙ্কটময় মুহূর্তেও যে হিজরত করিবার জন্য মহান আল্লাহ্র নির্দেশ বা অনুমতি একজন নবীর জন্য অত্যাবশ্যক, উহা না বুঝিয়াই তিনি এইরূপ করিয়াছিলেন। সুতরাং তাঁহার তিরস্কৃত হইবার কারণ হইতেছে, তাঁহার পক্ষ হইতে এইরূপ পদস্খলন সংঘটিত হওয়া। রিসালাতের দ্বায়িত্ব পালনে অবহেলা করিবার মত বড় কোন অপরাধের জন্য তিনি তিরস্কৃত হন নাই। মাছের পেটে, বন্দী হইবার মত সাজা তিনি সেই কারণে লাভ করেন নাই। অতএব রিসালাতের দায়িত্ব পালনে শিথিলতা প্রদর্শনের জন্য তিনি তিরস্কৃত হইয়াছেন ও সাজা পাইয়াছেন, এই অভিযোগ সঠিক নহে। মূলত এ ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর নিয়ম হইতেছে, নবী (আ)-গণ নিজেদের ধারণায় যে কাজকে ভাল মনে করেন, মহান আল্লাহ যদি উহা ভাল মনে না করেন তাহা হইলে পৃথিবীতেই তাহার প্রাপ্য সাজা দান করিয়া থাকেন। কেননা এইটি সাধারণের জন্য শাস্তিযোগ্য না হইলেও একজন নবীর ক্ষেত্রে ইহা শাস্তিযোগ্য। এই জন্যই পরে বিষয়টি বুঝিতে পারিয়া ইউনুস (আ) নিজেকে অপরাধী বলিয়া স্বীকার করিয়া নিয়াছিলেন। যেমন তিনি বলিয়াছেন:
لا الهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ .
"আপনি ব্যতীত কোন ইলাহ নাই, আপনি পূত-পবিত্র, আর আমি অবশ্যই অপরাধীদের অন্তর্ভুক্ত"।
পরবর্তী আয়াতসমূহ হইতেছে:
وَلَا تَكُنْ كَصَاحِبِ الحُوْتِ إِذْ نَادَى وَهُوَ مَكْظوم . لولا أَنْ تَدَارَكَهُ نِعْمَةً مِنْ رَبِّهِ لِنُبِدَ بِالْعَرَاءِ وَهُوَ مَسْرُمُومٌ ، فَاجْتَبَاهُ رَبُّهُ فَجَعَلَهُ مِنَ الصَّالِحِينَ .
"... অতঃপর তুমি ঐ মৎস ওয়ালার মত হইও না, যখন সে দুঃখ ভারাক্রান্ত অবস্থায় (তাহার প্রভুকে) ডাকিতেছিল। যদি তাহার রবের অনুগ্রহ তাহার উপরে বর্ষিত না হইত, তাহা হইলে সে নিন্দিত অবস্থায় বিজন প্রান্তরে নিক্ষিপ্ত হইত। অবশেষে তাহার রব তাহাকে মনোনীত করিয়া তাহাকে সৎ বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করিয়া লইল" (৬৮:৪৮-৫০)।
এখানে মুহাম্মাদ (স)-কে ইউনুস (আ)-এর মত ধৈর্যহারা না হইবার আহবান করা হইয়াছে। মূলত ইউনুস (আ)-কে ইহা দ্বারা খাটো করা নহে, বরং ইউনুস (আ)-এর সম্প্রদায়ের মত মুহাম্মাদ (স)-এর উম্মতগণ যদি মুহাম্মাদ (স)-কে কষ্ট দেয় তাহা হইলে তিনি যেন ধৈর্যহারা না হন, ইহা দ্বারা সেই দিকেই দৃষ্টি আকর্ষণ করা হইয়াছে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হযরত ইউনুস (আ)-এর সময়কাল ও নবুওয়াত প্রাপ্তি

📄 হযরত ইউনুস (আ)-এর সময়কাল ও নবুওয়াত প্রাপ্তি


ইউনুস (আ) ইসরাঈল বংশের নবী ছিলেন। তিনি নবীবর হিযকীল (আ)-এর সময়ই প্রেরিত হইয়াছিলেন। তাঁহাকে ইরাকের মাওসিল অঞ্চলের একটি প্রসিদ্ধ শহর নিনাওয়া (Ninivich) এলাকায় পাঠান হইয়াছিল। ইহা অ্যাসিরীয়দের (Assyrian) বিখ্যাত শহর ছিল। ঐতিহাসিকগণ এ বিষয়ে একমত যে, এই শহরটি খৃস্টপূর্ব ৬১২ সালে ব্যাবলনীয়দের হাতে নিশ্চিহ্ন হইয়া যায়। আহলে কিতাবদের বর্ণনা অনুযায়ী ইউনুস (আ)-এর তিরোধানের কয়েক যুগ পর নিনাওয়াবাসিগণ খৃস্টপূর্ব ৬৯০ সালে পুনরায় শিরক-এ নিমজ্জিত হয়। তখন নাহুম (আ) নামক এক ইসরাঈলী নবীকে তাহাদের নিকট পাঠান হইয়াছিল। তিনি তাহাদেরকে একত্ববাদের দিকে আহবান জানাইলেন। কিন্তু তাহারা এই দাওয়াত গ্রহণ না করিয়া চরম বিরোধিতা করিল। তিনি তাহাদেরকে ধ্বংস হইয়া যাইবার ভয় প্রদর্শন করিলেন। অবশেষে সত্তর বৎসর পর উক্ত শহরটি ধ্বংস হইয়া গেল। ইহা দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, ইউনুস (আ)-এর সময়কাল ছিল খৃস্টপূর্ব ৬৯০ সালেরও অনেক আগে। ইমাম বুখারী (র) তাঁহাকে মূসা (আ), শু'আয়ব (আ) ও দাউদ (আ)-এর মধ্যবর্তী স্থানে তালিকাভুক্ত করিয়াছেন।
বাইলের বর্ণনা অনুযায়ী ইউনুস (আ) ঈসা (আ)-এর আবির্ভাবের ৮০০ বৎসর পূর্বের নবী ছিলেন। তিনি যখন নবুওয়াত লাভ করিয়াছিলেন, তখন তাঁহার বয়স ছিল ২৮ বৎসর।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ইউনুস (আ)-এর সম্প্রদায়ের পরিচয় ও তাহাদের গোমরাহী

📄 ইউনুস (আ)-এর সম্প্রদায়ের পরিচয় ও তাহাদের গোমরাহী


নিনিওয়া অঞ্চলে তদানিন্তন কালে বসবাসরত লোকেরাই ছিল ইউনুস (আ)-এর সম্প্রদায়। মহান আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীন এই সম্প্রদায়কে হিদায়াতের পথে ডাকিবার জন্য ইউনুস (আ)-কে সেখানে নবী করিয়া প্রেরণ করিয়াছিলেন।
কোন কোন বিদ্বানদের অভিমত হইতেছে যে, ইউনুস (আ)-এর সম্প্রদায় ছিল দুইটি। এই উভয় সম্প্রদায়ের নিকট তাঁহাকে পাঠান হইয়াছিল। মাছের ঘটনা সংঘটিত হইবার পূর্বে নিনিওয়ার অধিবাসীদের নিকট তাঁহাকে পাঠান হইল। আর মাছের ঘটনার পরে তাঁহাকে অন্য সম্প্রদায়ের নিকট প্রেরণ করা হয়। সূরা আস-সাফফাতের আয়াতসমূহের উপরে ভিক্তি করিয়াই এই মতামত প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। যেমন বলা হইয়াছে: وَإِن يُونُسَ لَمِنَ الْمُرْسَلِينَ ، إِذْ أَبَقَ إلى الفُلْكِ الْمَشْحُونِ . فَسَاهَمَ فَكَانَ مِنَ الْمُدْحَضِينَ . فَالْتَقَمَهُ الحُوتُ وَهُوَ مُلِيمٌ ، فَلَوْلا أَنَّهُ كَانَ مِنَ الْمُسَبِّحِينَ . للبث فِي بَطْنِه إِلى يَوْمِ يُبْعَثُونَ ، فَنَبَدْنَاهُ بِالْعَرَاءِ وَهُوَ سَقِيمٌ ، وَأَنْبَتْنَا عَلَيْهِ شَجَرَةً مِّنْ يَقْطِينِ .
"আর ইউনুস অবশ্যই প্রেরিত পুরুষদের অন্যতম। যখন সে বোঝাই করা একটি নৌকার দিকে পালাইয়া যাইতে লাগিল ও পরে লটারীতে অংশগ্রহণ করিয়া দোষী সাব্যস্ত হইল। শেষ পর্যন্ত মাছ তাঁহাকে গিলিয়া ফেলিল। সে ছিল তিরস্কৃত। তখন যদি সে তাসবীহকারীদের অন্তর্ভুক্ত না হইত, তাহা হইলে তাহাকে কিয়ামত পর্যন্ত মাছের পেটে থাকিতে হইত। অবশেষে আমি তাহাকে বিজন ভূখণ্ডে নিক্ষেপ করিলাম, তখন সে রুগ্ন ছিল। আমি তাহার উপর লতাবিশিষ্ট গাছ উদগত করিলাম" (৩৭: ১৩৯-১৪৬)।
সেখানে ইউনুস (আ)-এর ঘটনা বর্ণনা করিতে যাইয়া প্রথমে মাছের ঘটনা উল্লেখ করা হইয়াছে। ইহার পরে বলা হইয়াছে: وَأَرْسَلْنَاهُ إِلى مِائَةِ أَلْفِ أَوْ يَزِيدُونَ ، فَأَمَنُوا فَمَتَّعْنَاهُمْ إِلَى حِينٍ .
"আমি তাহাকে এক লক্ষ কিম্বা উহা অপেক্ষা বেশী লোকদের নিকট প্রেরণ করিলাম। অতঃপর তাহারা ঈমান আনিল। তাহাদেরকে আমি একটি সময় পর্যন্ত জীবন উপভোগ করিবার সুযোগ দিলাম" ( ৩৭: ১৪৭-১৪৮)।
সুতরাং ইহাতে ধরিয়া লওয়া যায় যে, মাছের ঘটনা সংঘটিত হইবার পরে তাঁহাকে অন্য একটি সম্প্রদায়ের নিকট পাঠান হইয়াছিল। ইহার পূর্বে অন্য একটি সম্প্রদায়ের মাঝে রিসালাতের দায়িত্ব পালন করিতে যাইয়া মহান আল্লহর নির্দেশ ব্যতীত হিজরত করিবার কারণে তাঁহাকে মাছের পেটে বন্দী থাকিতে হয়। ইহা দ্বারা প্রামণিত হয় যে, মাছের ঘটনার পূর্বে তাঁহাকে একটি সম্প্রদায়ের নিকট আর এই ঘটনার পরে তাঁহাকে অন্য সম্প্রদায়ের নিকট প্রেরণ করা হইয়াছিল। অতএব সেখানে এইভাবে বর্ণিত হইবার কারণে আমরা বলিতে পারি যে, তাঁহাকে মাছের ঘটনার পূর্বে নিনিওয়াবাসীর কাছে পাঠান হইয়াছিল। আর যেহেতু তাঁহাকে এই ঘটনার পরে অন্য সম্প্রদায়ের নিকট প্রেরণ করা হইয়াছিল বলিয়া মনে হইতেছে সেহেতু তিনি নাম না জানা আর কোন এক সম্প্রদায়ের নিকট প্রেরিত হইয়াছিলেন বলিয়া ধারণা করা যায়।
আলোচ্য আয়াতসমূহে ঘটনার ধারাবহিকতার দিক লক্ষ করিয়া ইউনুস (আ)-কে পৃথক পৃথক দু'টি সম্প্রদায়ের নিকট পাঠান হইয়াছিল, এই ধারণার অবকাশ থাকিলেও মুফাসসিরগণ ইহাতে একমত যে, তাঁহাকে শুধু নিনিওয়ায় বসবাসরত সম্প্রদায়ের নিকটই প্রেরণ করা হইয়াছিল, অন্য কোন সম্প্রদায়ের নিকট তাঁহাকে প্রেরণ করা হয় নাই। কোন ঘটনার পূর্বাংশ পরে ও পরের অংশ পূর্বে উল্লেখ করা সাহিত্য অলংকারের অন্যতম নিয়ম, ইহা দ্বারা ঘটনার আসল ধারাবাহিকতা পরিবর্তন হওয়া অত্যাবশ্যকীয় নয়। আল-কুরআনে সেই নীতি অবলম্বন করা হইয়াছে।
অপরপক্ষে কোন কোন গবেষক বলিয়াছেন যে, ইউনুস (আ)-কে মাছের ঘটনার পরে নিনিভায় বসবাসরত সম্প্রদায়ের নিকটে প্রেরণ করা হইয়াছিল, আর এই ঘটনার পূর্বে অন্য কোন নাম জানা যায়নি এমন সম্প্রদায়ের নিকটেও প্রেরণ করা হইয়াছিল।
মুফাস্সিসর, ঐতিহাসিক বা অন্য কাহারো নিকট হইতে নiniওয়ার অধিবাসীরা ব্যতীত ইউনুস (আ)-এর যে অন্য কোন সম্প্রদায় ছিল, ইহার নাম, তাহাদের বসবাসের স্থান বা অন্য কোন তথ্য পাওয়া যায় নাই বরং তাহাকে একই সম্প্রদায়ের নিকট মাছের ঘটনার পূর্বে একবার ও পরে আর একবার, এই দুইবারই পাঠাইবার পক্ষে অনেক সমর্থন পাওয়া যায় বিধায় আমাদের অভিমত এই যে, ইউনুস (আ)-এর সম্প্রদায় ছিল শুধু নিনিওয়াবাসী। অন্য কোন সম্প্রদায়ের নিকট হিদায়াত পেশের দায়িত্ব তাঁহাকে দেওয়া হয় নাই। তবে ইউনুস (আ)-এর নিনিওয়াবাসী এই সম্প্রদায়ের লোকসংখ্যা কত ছিল ইহা সম্পর্কে সূরা আস-সাফ্ফাত-এর বর্ণনায় এক লক্ষ অথবা উহা অপেক্ষা বেশী বলিয়া উল্লেখ করা হইলেও বেশী বলিতে কত ছিল সে সম্পর্কে মতভেদ রহিয়াছে। ইমাম মাকহুলের মতে এই বেশীর অর্থ হইতেছে দশ হাজার। তিরমিযী (র) আবুল আলীয়া উবায় ইব্‌ন কা'ব হইতে বর্ণনা করিয়াছেন যে, এই আয়াত সম্পর্কে তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-কে প্রশ্ন করিয়াছিলেন। উত্তরে তিনি বলিয়াছিলেন যে, বেশীর অর্থ হইতেছে বিশ হাজার। হাদীছটির বর্ণনাকারী যদি অপরিচিত না হইত তাহা হইলে আমরা এই সংখ্যাকে চূড়ান্ত বলিয়া ধরিয়া লইতে পারিতাম। এই বিষয়ে ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতে কয়েকটি বর্ণনা উল্লেখ করা হইয়াছে। তাহা হইতেছে—এই বেশীর অর্থ ত্রিশ হাজার, ত্রিশ হাজার ও চল্লিশ হাজারের মধ্যবর্তী কোন একটি সংখ্যা, চল্লিশ ও পঞ্চাশ হাজারের মধ্যকার কোন সংখ্যা। সাঈদ ইব্‌ন যুবায়র (র) বলিয়াছেন, এই বেশীর অর্থ হইতেছে—সত্তর হাজার। তবে মহান আল্লাহ ও তাঁহার রাসূল (স)-এর পক্ষ হইতে এ বিষয়ে সহীহ কোন বর্ণনা না পাওয়ার কারণে এই সংখ্যা কত ছিল উহা নির্দিষ্ট করিয়া না বলাই উত্তম।
সংখ্যা যাহাই হউক না কেন তাহারা শিরক-এ নিমজ্জিত ছিল। কুফরী ও শির্ক তাহাদেরকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিয়াছিল যে, কোন প্রকার সত্য তাহাদের কর্ণকুহরে প্রবেশ করিতেছিল না। তাহারা স্পষ্ট পথভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত ছিল।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00