📄 স্বামী ভক্তির অপূর্ব দৃষ্টান্ত হযরত রহীমা (রা)
হযরত আইয়ূব (আ)-এর অসুস্থ থাকাকালীন এই দীর্ঘ সময়ে একমাত্র তাঁহার স্ত্রীই তাঁহার খেদমতে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি হযরত আইয়ূব (আ)-কে ছাড়িয়া কোথাও যান নাই। স্বামীর এই অবস্থায় তিনি অত্যন্ত শোকাভিভূত হইয়াছিলেন। স্বামীভক্তির অপূর্ব দৃষ্টান্ত হযরত রহীমা (রা)। ইতিহাসে এই জাতীয় খেদমতের নযীর বিরল।
একদিন হযরত রহীমা (রা) হযরত আইয়ূব (আ)-এর কষ্টে অত্যন্ত অধীর হইয়া এমন কিছু কথা বলিয়া ফেলিলেন, যাহা ছিল বাহ্যিক দৃষ্টিতে সবরের পরিপন্থী। ধৈর্য ও সহনশীলতার মূর্ত প্রতীক হযরত আইয়ূব (আ) তাহা বরদাশত করিতে পারিলেন না। তিনি কসম করিয়া বলিলেন, আমি তোমাকে এক শত বেত্রাঘাত করিব।
ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল (র) ইবন 'আব্বাস (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেন, হযরত আইয়ূব (আ)-এর অসুস্থতার সময় একদা শয়তান চিকিৎসকের বেশে আইয়ূব (আ)-এর পত্নীর সাথে সাক্ষাত করে। তিনি তাহাকে চিকিৎসক মনে করিয়া তাহার স্বামীর চিকিৎসা করিতে অনুরোধ করেন। তখন শয়তান বলিল, আমি এই শর্তে চিকিৎসা করিতে পারি যে, আরোগ্য লাভের পর এই কথার স্বীকৃতি দিতে হইবে যে, আমিই তাহাকে আরোগ্য দান করিয়াছি। এই স্বীকৃতিটুকু ছাড়া আমি আর কোন পারিশ্রমিক চাহি না। স্ত্রী হযরত আইয়ূব (আ)-কে এই কথা জানাইলে তিনি বলিলেন, তোমার সরলতা দেখিয়া সত্যিই দুঃখ হয়। সে তো শয়তান। এই প্রস্তাবের মধ্যে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে তাহাদেরকে শিরকে লিপ্ত করার একটা অপপ্রয়াস ছিল। এই কারণে হযরত আইয়ূব (আ) রাগ হইয়া শপঞ্চ করিয়া বলিলেন, আমি তোমাকে এক শত বেত্রাঘাত করিব। তাফসীর গ্রন্থসমূহে এই জাতীয় আরো বহু ঘটনার উল্লেখ রহিয়াছে।
অবশেষে যখন হযরত আইয়ূব (আ)-এর পরীক্ষার মেয়াদ শেষ হইয়া গেল এবং তিনি সুস্থ হইলেন তখন তিনি কসম পূর্ণ করিবার পদ্ধতির ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করিতে লাগিলেন। তখন আল্লাহ তা'আলা স্বামী ভক্তির মূর্ত প্রতীক হযরত রহীমা (রা)-এর খেদমতের প্রতিদানস্বরূপ আইয়ূব (আ)-কে আদেশ করিলেন, এক মুষ্টি তৃণ লও এবং উহা দ্বারা তাহাকে মৃদু আঘাত কর। এইভাবে তোমার কসম পূর্ণ হইয়া যাইবে। ইরশাদ হইয়াছে:
وَخُذْ بِيَدِكَ ضِغْنًا فَاضْرِبْ بِهِ وَلَا تَحنَّتْ إِنَّا وَجَدْنَاهُ صَابِرًا نِعْمَ الْعَبْدُ إِنَّهُ أَوَّابٌ .
"আমি তাহাকে আদেশ করিলাম, এক মুষ্টি তৃণ লও ও উহা দ্বারা আঘাত কর এবং শপথ ভঙ্গ করিও না। আমি তো তাহাকে পাইলাম ধৈর্যশীল। কত উত্তম বান্দা সে! সে ছিল আমার অভিমুখী" (৩৮ঃ৪৪)।
টিকাঃ
কাসাসুল কুরআন, ২য় খণ্ড, পৃ. ১৮৯
আল-জামি লি-আহকামিল কুরআন, ১৫তম খণ্ড, পৃ. ১৩৮
📄 হযরত আইয়ূব (আ)-এর ইনতিকাল
কঠিন পীড়া ও অগ্নিপরীক্ষা হইতে মুক্তিলাভের পর হযরত আইয়ূব (আ) এক শত চল্লিশ বৎসর পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। পুত্র, প্রপৌত্রসহ চারি পুরুষ পর্যন্ত তিনি দেখিয়া যাইতে সক্ষম হন। ইহার পর তিনি ইনতিকাল করেন। ইয়াহূদী পণ্ডিতগণের মতে তাঁহার সর্বমোট বয়স ২১০ বৎসর ছিল।
টিকাঃ
কাসাসুল কুরআন, ২য় খণ্ড, পৃ. ১৯৩; তাফসীর মাজেদী, পৃ. ৬৭০, টীকা নং ১১০
📄 শিক্ষণীয় বিষয়
হযরত আইয়ূব (আ)-এর জীবনীর উল্লেখযোগ্য শিক্ষণীয় বিষয়গুলি নিম্নরূপ:
(১) আল্লাহ পাকের বান্দাগণের মধ্য হইতে আল্লাহ তা'আলার সহিত যাহার যতটুকু সান্নিধ্য আছে তাহার পরীক্ষাও সে অনুপাতে হইয়া থাকে। পরীক্ষায় পতিত হইয়া যদি কেহ সবর করে, কোনরূপ অভিযোগ না করে তবে তাহার মর্যাদা পূর্বের তুলনায় শত গুণে বাড়িয়া যায়। একদা হযরত সা'দ (রা) নবী করীম (স)-কে প্রশ্ন করিলেন:
اي الناس اشد بلاء قال الانياء ثم الامثل فالامثل يبتلى الرجل على حسب دينه فان كان في دينه صلبا اشتد بلاته وان كان في دينه رقة ابتلي علي قدر دينه
"কোন ধরনের মানুষ কঠিনতর পরীক্ষার সম্মুখীন হইয়া থাকে? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, নবীগণ সর্বাধিক কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হইয়া থাকেন। ইহার পর যাহারা উত্তম। এইভাবে পরীক্ষার কঠোরতা ক্রমেই লঘু হইতে থাকে। মোটকথা, মানুষ তাহাদের দীনের স্তর অনুপাতেই পরীক্ষার মুখামুখি হইয়া থাকে। কেহ যদি ধর্মে দৃঢ় ও পরিপক্ক হয় তবে তাহার পরীক্ষা অপরাপর মানুষের তুলনায় কঠিন হয়। আর যে ব্যক্তি ধর্মের ব্যাপারে দুর্বল তাহার পরীক্ষাও সেই অনুসারেই হইয়া থাকে”।
(২) সুখে-দুঃখে তথা জীবনের সকল অবস্থায় মানুষের জন্য উচিত তাহাদের প্রতিপালকের শোকর আদায় করা, জীবনে সুখ-সমৃদ্ধি আসিলে উহাকে আল্লাহ পাকের রহমত বলিয়া গণ্য করা। আর যদি কোন প্রতিকূল পরিবেশ বা পরিস্থিতির সম্মুখীন হইতে হয় তাহা হইলে ধৈর্যধারণ করা। আল্লাহর প্রতি অভিযোগ নবী-রাসূলগণের শিক্ষার পরিপন্থী।
(৩) মানুষের জন্য উচিত কোন অবস্থাতেই আল্লাহর রহমত হইতে নিরাশ না হওয়া। নিরাশ হওয়া কুফরী।
(৪) স্ত্রীর জন্য উচিত সর্বদা স্বামীর খেদমতে নিয়োজিত থাকা, সুখে-দুঃখে সর্বাবস্থায় স্বামীর পাশে থাকা, নিজের সর্বস্ব উজাড় করিয়া দিয়া হইলেও স্বামীর সন্তুষ্টি অর্জন করা এবং তাহার সেবায় নিয়োজিত থাকা। যেমন হযরত আইয়ূব (আ)-এর সতী-সাধবী স্ত্রী হযরত রহীমা (রা) করিয়াছিলেন।
টিকাঃ
তিরমিযী ২য় খণ্ড, পৃ. ৬৫
কাসাসুল কুরআন, ২য় খণ্ড, পৃ. ১৯৩-১৯৫