📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হযরত আইয়ূব (আ)-এর রোগমুক্তি

📄 হযরত আইয়ূব (আ)-এর রোগমুক্তি


অতঃপর আল্লাহ তা'আলা হযরত আইয়ূব (আ)-এর দু'আ কবুল করিলেন। কুরআন মজীদে ইরশাদ হইয়াছে:
فَاسْتَجَبْنَا لَهُ فَكَشَفْنَا مَا بِهِ مِنْ ضُرٍّ وَأَتَيْنَهُ أَهْلَهُ وَمِثْلَهُمْ مُّعَهُمْ .
"অতঃপর আমি তাহার দুআ কবুল করিলাম, তাহার দুঃখ-কষ্ট দূরীভূত করিয়া দিলাম, তাহাকে তাহার পরিবার-পরিজন ফিরাইয়া দিলাম এবং তাহাদের সঙ্গে তাহাদের মত আরো দিলাম" (২১:৮৪)।
ইহার পর আল্লাহ তা'আলা আদেশ করিলেন, আইয়ূب! স্বস্থান হইতে উঠ এবং যমীনের উপর পদাঘাত কর। ইরশাদ হইয়াছে:
أركض برِجْلِكَ هُذَا مُعْتَسَلٌ بَارِدُ وَشَرَابٌ .
"আমি তাহাকে বলিলাম, তুমি তোমার পদ দ্বারা আঘাত কর, এই তো গোসলের সুশীতল পানি আর পানীয়" (৩৮: ৪২)।
আইয়ূب (আ) আল্লাহ্র আদেশে তাহাই করিলেন। তৎক্ষণাৎ আল্লাহ তা'আলা তাঁহার জন্য একটি ফোয়ারা জারী করিয়া দিলেন। তিনি ঐ ফোয়ারার পানি দ্বারা গোসল করিলেন। ইহাতে তাঁহার শরীরের বাহ্যিক সমস্ত রোগ নিরাময় হইয়া গেল। তৎপর তিনি পুনরায় পদাঘাত করিলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে দ্বিতীয় আরেকটি ফোয়ারা উথলাইয়া উঠিল। তিনি উহার পানি পান করিলেন। তাহাতে তাঁহার দেহের অভ্যন্তরীণ অংশে রোগের যেই প্রভাব ও ক্রিয়া ছিল তাহাও নির্মূল হইয়া গেল। এইরূপে তিনি পূর্ণ স্বাস্থ্য লাভ করিয়া আল্লাহ পাকের দরবারে শোকর আদায় করিলেন। হাফিয ইব্‌ন হাজার (র) ইন জারীর তাবারী (র)-এর সূত্রে হযরত কাতাদা (র) হইতে অনুরূপ অভিমত বর্ণনা করিয়াছেন। তাফসীরে রূহুল মাআনীতেও অনুরূপ বর্ণনা রহিয়াছে। হযরত আনাস (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হযরত আইয়ূب (আ) দীর্ঘ তের বৎসর (ভিন্ন মতে তিন, সাত, আঠার বৎসর) পর্যন্ত নানাবিধ বিপদ-আপদের কঠিন অগ্নিপরীক্ষায় জর্জরিত হইয়াছিলেন। তাঁহার অবস্থা এমন হইয়াছিল যে, তাঁহার নিকটবর্তী ও দূরবর্তী আত্মীয়-স্বজন সকলেই তাঁহার নিকট হইতে দূরে সরিয়া পড়িলেন। অবশ্য আত্মীয়দের মধ্যে দুইজন আত্মীয় সকালে ও সন্ধ্যায় তাঁহার নিকট আসিতেন। একবার তাঁহাদের মধ্য হইতে একজন অপরজনকে বলিলেন, হয়তো আইয়ূב বড় ধরনের কোন পাপ কার্য করিয়াছেন। অন্যথায় তিনি এই বিপদ হইতে অবশ্যই মুক্তি পাইতেন। অপর এক ব্যক্তি এই কথাটি হযরত আইয়ূب (আ)-কে শুনাইলেন। ইহা শুনিয়া তিনি অত্যন্ত চিন্তিত হইলেন এবং আল্লাহ্র দরবারে দু'আ করিলেন। ভিন্ন সূত্রে বর্ণিত আছে যে, সিজদায় পড়িয়া তিনি এই দু'আ করিলেন, হে আল্লাহ! আমি আপনার সত্তার কসম করিয়া বলিতেছি, আমাকে রোগমুক্ত না করা পর্যন্ত আমি মাথা উত্তোলন করিব না)।
অতঃপর তাঁহাকে রোগমুক্ত করিয়া দেওয়া হইল। ইহার অব্যবহিত পরেই আইয়ূב (আ) সৌচকার্যের উদ্দেশে উঠিলেন এবং তাহার স্ত্রী হাতে ধরিয়া তাঁহাকে লইয়া গেলেন। ইসতিন্‌জা সমাপন করিয়া তথা হইতে একটু স্থানান্তর হইতেই আল্লাহ তা'আলা তাঁহার প্রতি এই মর্মে ওহী নাযিল করিলেন, 'যমীনের উপর পদাঘাত কর'। তিনি পদাঘাত করিতেই পানির ফোয়ারা উথলাইয়া উঠিল। সুস্থতা লাভের জন্য তিনি উহাতে গোসল করিলেন। অমনি তিনি সুস্থ হইয়া গেলেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে জান্নাতী লেবাস পরাইয়া দিলেন। অতঃপর তাঁহার স্ত্রী আসিলেন। তিনি হযরত আইয়ূב (আ)-কে চিনিতে না পারিয়া তাঁহার নিকটেই আইয়ূב (আ) সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করিলেন। তিনি বলিলেন, আমিই আইয়ূب। দৈনন্দিন আহারের জন্য হযরত আইয়ূב (আ)-এর নিকট এক পুটুলি গম ও এক পুটুলি যব থাকিত। আল্লাহ তা'আলা তাঁহার ধন-সম্পত্তি বৃদ্ধি করিয়া দেওয়ার জন্য গমগুলিকে স্বর্ণ এবং যবগুলিকে রৌপ্যে রূপান্তরিত করিয়া দিলেন। হযরত ইবন আব্বাস (রা) বলেন, অতঃপর আল্লাহ তা'আলা হযরত আইয়ূב (আ)-এর ধন-দৌলত ফিরাইয়া দিলেন এবং সন্তান-সন্ততিও। হযরত ইবন মাসউদ (রা) বলেন, হযরত আইয়ূב (আ)-এর সাত পুত্র ও সাত কন্যা ছিল। পরীক্ষার দিনগুলিতে তাহারা সকলেই মারা গিয়াছিলেন। ইহার পর যখন আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে সুস্থতা দান করিলেন তখন মারা যাওয়া সন্তানদেরকেও জীবিত করিয়া দিলেন এবং তাঁহার স্ত্রীর গর্ভে নূতন সন্তানও এই পরিমাণ অর্থাৎ সাত পুত্র ও সাত কন্যা দান করিলেন। কুরআন মজীদে ইরশাদ হইয়াছে:
وَأَتَيْنُهُ أَهْلَهُ وَمِثْلَهُمْ مُّعَهُمْ
"এবং তাহাকে তাহার পরিবার-পরিজন ফিরাইয়া দিলাম এবং তাহাদের সঙ্গে তাহাদের মত আরো দিলাম" (২১:৮৪)।

টিকাঃ
কাসাসুল কুরআন, ২য় খণ্ড, পৃ. ১৯০
আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১ম খণ্ড, পৃ. ২৫৬-২৫৭
ফাতহুল বারী, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃ. ৪২০; তাফসীরে রূহুল মাআনী, ২৩তম পারা, পৃ. ২০৭
বুখারী, ১ম খণ্ড, পৃ. ৪৮০, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১ম খণ্ড, পৃ. ২৫৮
মাআরিফুল কুরআন, পৃ. ৮৮৬; আল জামি লি আহকামিল কুরআন, ১১তম খণ্ড, পৃ. ২১৬; তাফসীরে রূহুল মাআনী, ২৩তম পারা, পৃ. ২০৭

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 স্বামী ভক্তির অপূর্ব দৃষ্টান্ত হযরত রহীমা (রা)

📄 স্বামী ভক্তির অপূর্ব দৃষ্টান্ত হযরত রহীমা (রা)


হযরত আইয়ূব (আ)-এর অসুস্থ থাকাকালীন এই দীর্ঘ সময়ে একমাত্র তাঁহার স্ত্রীই তাঁহার খেদমতে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি হযরত আইয়ূব (আ)-কে ছাড়িয়া কোথাও যান নাই। স্বামীর এই অবস্থায় তিনি অত্যন্ত শোকাভিভূত হইয়াছিলেন। স্বামীভক্তির অপূর্ব দৃষ্টান্ত হযরত রহীমা (রা)। ইতিহাসে এই জাতীয় খেদমতের নযীর বিরল।
একদিন হযরত রহীমা (রা) হযরত আইয়ূব (আ)-এর কষ্টে অত্যন্ত অধীর হইয়া এমন কিছু কথা বলিয়া ফেলিলেন, যাহা ছিল বাহ্যিক দৃষ্টিতে সবরের পরিপন্থী। ধৈর্য ও সহনশীলতার মূর্ত প্রতীক হযরত আইয়ূব (আ) তাহা বরদাশত করিতে পারিলেন না। তিনি কসম করিয়া বলিলেন, আমি তোমাকে এক শত বেত্রাঘাত করিব।
ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল (র) ইবন 'আব্বাস (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেন, হযরত আইয়ূব (আ)-এর অসুস্থতার সময় একদা শয়তান চিকিৎসকের বেশে আইয়ূব (আ)-এর পত্নীর সাথে সাক্ষাত করে। তিনি তাহাকে চিকিৎসক মনে করিয়া তাহার স্বামীর চিকিৎসা করিতে অনুরোধ করেন। তখন শয়তান বলিল, আমি এই শর্তে চিকিৎসা করিতে পারি যে, আরোগ্য লাভের পর এই কথার স্বীকৃতি দিতে হইবে যে, আমিই তাহাকে আরোগ্য দান করিয়াছি। এই স্বীকৃতিটুকু ছাড়া আমি আর কোন পারিশ্রমিক চাহি না। স্ত্রী হযরত আইয়ূব (আ)-কে এই কথা জানাইলে তিনি বলিলেন, তোমার সরলতা দেখিয়া সত্যিই দুঃখ হয়। সে তো শয়তান। এই প্রস্তাবের মধ্যে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে তাহাদেরকে শিরকে লিপ্ত করার একটা অপপ্রয়াস ছিল। এই কারণে হযরত আইয়ূব (আ) রাগ হইয়া শপঞ্চ করিয়া বলিলেন, আমি তোমাকে এক শত বেত্রাঘাত করিব। তাফসীর গ্রন্থসমূহে এই জাতীয় আরো বহু ঘটনার উল্লেখ রহিয়াছে।
অবশেষে যখন হযরত আইয়ূব (আ)-এর পরীক্ষার মেয়াদ শেষ হইয়া গেল এবং তিনি সুস্থ হইলেন তখন তিনি কসম পূর্ণ করিবার পদ্ধতির ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করিতে লাগিলেন। তখন আল্লাহ তা'আলা স্বামী ভক্তির মূর্ত প্রতীক হযরত রহীমা (রা)-এর খেদমতের প্রতিদানস্বরূপ আইয়ূব (আ)-কে আদেশ করিলেন, এক মুষ্টি তৃণ লও এবং উহা দ্বারা তাহাকে মৃদু আঘাত কর। এইভাবে তোমার কসম পূর্ণ হইয়া যাইবে। ইরশাদ হইয়াছে:
وَخُذْ بِيَدِكَ ضِغْنًا فَاضْرِبْ بِهِ وَلَا تَحنَّتْ إِنَّا وَجَدْنَاهُ صَابِرًا نِعْمَ الْعَبْدُ إِنَّهُ أَوَّابٌ .
"আমি তাহাকে আদেশ করিলাম, এক মুষ্টি তৃণ লও ও উহা দ্বারা আঘাত কর এবং শপথ ভঙ্গ করিও না। আমি তো তাহাকে পাইলাম ধৈর্যশীল। কত উত্তম বান্দা সে! সে ছিল আমার অভিমুখী" (৩৮ঃ৪৪)।

টিকাঃ
কাসাসুল কুরআন, ২য় খণ্ড, পৃ. ১৮৯
আল-জামি লি-আহকামিল কুরআন, ১৫তম খণ্ড, পৃ. ১৩৮

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হযরত আইয়ূব (আ)-এর ইনতিকাল

📄 হযরত আইয়ূব (আ)-এর ইনতিকাল


কঠিন পীড়া ও অগ্নিপরীক্ষা হইতে মুক্তিলাভের পর হযরত আইয়ূব (আ) এক শত চল্লিশ বৎসর পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। পুত্র, প্রপৌত্রসহ চারি পুরুষ পর্যন্ত তিনি দেখিয়া যাইতে সক্ষম হন। ইহার পর তিনি ইনতিকাল করেন। ইয়াহূদী পণ্ডিতগণের মতে তাঁহার সর্বমোট বয়স ২১০ বৎসর ছিল।

টিকাঃ
কাসাসুল কুরআন, ২য় খণ্ড, পৃ. ১৯৩; তাফসীর মাজেদী, পৃ. ৬৭০, টীকা নং ১১০

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 শিক্ষণীয় বিষয়

📄 শিক্ষণীয় বিষয়


হযরত আইয়ূব (আ)-এর জীবনীর উল্লেখযোগ্য শিক্ষণীয় বিষয়গুলি নিম্নরূপ:
(১) আল্লাহ পাকের বান্দাগণের মধ্য হইতে আল্লাহ তা'আলার সহিত যাহার যতটুকু সান্নিধ্য আছে তাহার পরীক্ষাও সে অনুপাতে হইয়া থাকে। পরীক্ষায় পতিত হইয়া যদি কেহ সবর করে, কোনরূপ অভিযোগ না করে তবে তাহার মর্যাদা পূর্বের তুলনায় শত গুণে বাড়িয়া যায়। একদা হযরত সা'দ (রা) নবী করীম (স)-কে প্রশ্ন করিলেন:
اي الناس اشد بلاء قال الانياء ثم الامثل فالامثل يبتلى الرجل على حسب دينه فان كان في دينه صلبا اشتد بلاته وان كان في دينه رقة ابتلي علي قدر دينه
"কোন ধরনের মানুষ কঠিনতর পরীক্ষার সম্মুখীন হইয়া থাকে? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, নবীগণ সর্বাধিক কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হইয়া থাকেন। ইহার পর যাহারা উত্তম। এইভাবে পরীক্ষার কঠোরতা ক্রমেই লঘু হইতে থাকে। মোটকথা, মানুষ তাহাদের দীনের স্তর অনুপাতেই পরীক্ষার মুখামুখি হইয়া থাকে। কেহ যদি ধর্মে দৃঢ় ও পরিপক্ক হয় তবে তাহার পরীক্ষা অপরাপর মানুষের তুলনায় কঠিন হয়। আর যে ব্যক্তি ধর্মের ব্যাপারে দুর্বল তাহার পরীক্ষাও সেই অনুসারেই হইয়া থাকে”।
(২) সুখে-দুঃখে তথা জীবনের সকল অবস্থায় মানুষের জন্য উচিত তাহাদের প্রতিপালকের শোকর আদায় করা, জীবনে সুখ-সমৃদ্ধি আসিলে উহাকে আল্লাহ পাকের রহমত বলিয়া গণ্য করা। আর যদি কোন প্রতিকূল পরিবেশ বা পরিস্থিতির সম্মুখীন হইতে হয় তাহা হইলে ধৈর্যধারণ করা। আল্লাহর প্রতি অভিযোগ নবী-রাসূলগণের শিক্ষার পরিপন্থী।
(৩) মানুষের জন্য উচিত কোন অবস্থাতেই আল্লাহর রহমত হইতে নিরাশ না হওয়া। নিরাশ হওয়া কুফরী।
(৪) স্ত্রীর জন্য উচিত সর্বদা স্বামীর খেদমতে নিয়োজিত থাকা, সুখে-দুঃখে সর্বাবস্থায় স্বামীর পাশে থাকা, নিজের সর্বস্ব উজাড় করিয়া দিয়া হইলেও স্বামীর সন্তুষ্টি অর্জন করা এবং তাহার সেবায় নিয়োজিত থাকা। যেমন হযরত আইয়ূব (আ)-এর সতী-সাধবী স্ত্রী হযরত রহীমা (রা) করিয়াছিলেন।

টিকাঃ
তিরমিযী ২য় খণ্ড, পৃ. ৬৫
কাসাসুল কুরআন, ২য় খণ্ড, পৃ. ১৯৩-১৯৫

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00