📄 অগ্নি পরীক্ষায় হযরত আইয়ূব (আ)
এই কথা সর্বজনস্বীকৃত যে, হযরত আইয়ূব (আ) মহাবিপদে পড়িয়াছিলেন। আর এই কারণেই তিনি আল্লাহ্র দরবারে ফরিয়াদ করিয়া বলিয়াছিলেন, আমি দুঃখ-কষ্টে পড়িয়াছি এবং শয়তান তো আমাকে যন্ত্রণা ও কষ্টে ফেলিয়াছে। ইমাম কুরতুবী (র) বলেন, আয়াতে উল্লিখিত عذاب (আযাব) বলিয়া আর্থিক বিপর্যয়ের কথা বুঝানো হইয়াছে। আল্লামা আলুসী (র)-ও অনুরূপ অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন। দৈহিক ও আর্থিক দিক হইতে হযরত আইয়ূব (আ) কত কাল ও কি ধরনের বিপদ-আপদের সম্মুখীন হইয়াছিলেন সে সম্পর্কে ইমাম কুরতুবী (র) বলেন, হযরত ইব্ন আব্বাস (রা)-এর মতে হযরত আইয়ুব (আ) সাত বৎসর সাত মাস সাত দিন সাত ঘন্টা রোগাক্রান্ত অবস্থায় ছিলেন। ওয়াহব ইন্ন মুনাব্বিহ (র) বলেন, তিনি সাত বৎসর রুগ্ন অবস্থায় ছিলেন। কোন কোন ব্যাখ্যাকার বলেন, তিনি দশ বৎসর ভিন্নমতে আঠার বৎসর পর্যন্ত রোগাক্রান্ত অবস্থায় ছিলেন।
তাঁহার রোগ সম্পর্কে তাফসীর ও ইতিহাস গ্রন্থে ইসরাঈলী রিওয়ায়াতসমূহে বহু অতিরঞ্জন রহিয়াছে। তাহাতে এমন সব রোগের কথা বলা হইয়াছে যাহা ঘৃণার কারণ বলিয়া বিবেচিত হয় এবং যে সমস্ত রোগের কারণে পীড়িত ব্যক্তি হইতে দূরে সরিয়া থাকা একান্ত জরুরী মনে করা হয়, যেমন কুষ্ঠ, ফোঁড়া, পাচড়া ইত্যাদি, এমন অবস্থায় পৌছিয়া যাওয়া যাহাতে শরীর পচিয়া-গলিয়া দুর্গন্ধ ছড়াইয়া পড়ে এবং তাহাতে সুস্থ লোকদের ঘৃণার কারণ হয়। এইরূপ রিওয়ায়াতগুলি উদ্ধৃত করার পর কোন কোন তাফসীরকার প্রশ্ন উত্থাপন করিয়াছেন যে, নবী ও রাসূলদের এমন রোগ হয় না যাহা সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে ঘৃণার কারণ হয় এবং উক্ত কারণে তাহারা রোগী হইতে পলায়ন করে। কেননা ইহা নবী ও রাসূল প্রেরণের উদ্দেশ্যের পরিপন্থী এবং হিদায়াত ও নসীহতকার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে বিরাট বড় বাধা। এ কারণেই ইবনুল আরাবী (র) এই জাতীয় রিওয়ায়াতকে বাতিল বলিয়া আখ্যায়িত করিয়াছেন। সূক্ষ্মদর্শী আলিমগণ বলেন, যদি ইসরাঈলী বর্ণনাসমূহ সহীহ বলিয়া মানিয়া নেয়া হয়, তাহা হইলে এই সম্বন্ধে আমাদের অভিমত হইল, সম্ভবত নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বে হযরত আইয়ূব (আ) এই রোগে আক্রান্ত হইয়াছিলেন। অতঃপর এই রোগ হইতে আরোগ্য লাভ করিবার পর আল্লাহ তাআলা তাঁহাকে নবুওয়াত দান করেন। আল্লাহ তা'আলা হযরত আইয়ুব (আ)-কে অগাধ ধনদৌলত, সহায়-সম্পত্তি, সুরম্য লান-কোঠা, যানবাহন, সন্তান-সন্ততি ও চাকর-নওকর দান করিয়াছিলেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে শারীরিক পরীক্ষার পাশাপাশি সন্তান-সন্ততি ধন-সম্পদ ইত্যাদির ব্যাপারেও অগ্নিপরীক্ষায় নিপতিত করিলেন। ধন-সম্পদ অর্থকড়ি যাহা ছিল সব শেষ হইয়া গেল। সন্তান-সন্ততি সব মৃত্যুমুখে পতিত হইল এবং তিনিও আক্রান্ত হইলেন এক দূরারোগ্য ব্যাধিতে। মোটকথা, হযরত আইয়ূব (আ) পার্থিব ধন-দৌলত ও সহায়-সম্পত্তি হইতে বঞ্চিত হইয়া এমন এক শারীরিক ব্যাধিতে যাক্রান্ত হন যে, ইহার কারণে কেহই তাঁহার নিকট আসিতে ইচ্ছা করিত না। তিনি লোকালয়ের বাহিরে এক আবর্জনাময় স্থানে দীর্ঘ কয়েক বৎসর পর্যন্ত পড়িয়া থাকেন। এই অবস্থা হা-হুতাশ, অস্থিরতা ও অভিযোগের কোন বাক্যও তিনি মুখে উচ্চারণ করেন নাই। সতী-সাধ্বী স্ত্রী লিয়া (বা রহমত) একবার আরয করিলেন, আপনার কষ্ট অনেক বাড়িয়া গিয়াছে। এই কষ্ট দূর হওয়ার জন্য আল্লাহর নিকট দু'আ করুন। তিনি জবাব দিলেন, আমি সত্তর বৎসর সুস্থ ও নিরোগ অবস্থায় আল্লাহ তা'আলার অফুরন্ত নিআমত ও দৌলতের মধ্যে দিনাতিপাত করিয়াছি। ইহার বিপরীতে সাত বৎসর বিপদে থাকা কঠিন হইবে কেন? পয়গাম্বর সুলভ দৃঢ়তা, সহিষ্ণুতা ও সবরের ফলে তিনি দু'আ করারও হিম্মত করিতেন না, যাহাতে কোথাও সবরের খেলাফ না হইয়া যায়। বস্তুত আল্লাহ্র কাছে দু'আ করা এবং নিজের অভাব ও দুঃখ-কষ্টের কথা পেশ করা সবরের পরিপন্থী কোন কাজ নহে। অবশেষে এমন একটি কারণ ঘটিয়া গেল, যাহা তাহাকে দু'আ করিতে বাধ্য করিল। আল্লাহ তাআলা তাঁহার সবর ও ধৈর্যের প্রশংসা করিয়াছেন।
اِنَّا وَجَدْنَاهُ صَابِرًا نِعْمَ الْعَبْدُ انَّهُ اوَّابٌ .
"আমি তো তাহাকে পাইলাম ধৈর্যশীল। কত উত্তম বান্দা সে। সে ছিল আমার অভিমুখী" (৩৮ : ৪৪; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১ম খণ্ড, পৃ. ২৫৫; মাআরিফুল কুরআন (সংক্ষিপ্ত), পৃ. ৮৮৭; আল-জামি লিআহকামিল কুরআন, ১১তম খণ্ড, পৃ. ২১৪)।
টিকাঃ
আল-জামি' লি আহকামিল কুরআন, ১৫ খণ্ড, পৃ. ১৩৫; তাফসীরে রূহুল মাআনী-২৩, পৃ. ২০৯
আল-জামিলি আহকামিল কুরআন, ১৫তম খণ্ড, পৃ. ১৩৮
কাসাসুল কুরআন, ২য় খণ্ড, পৃ. ১৮৭; আল-জামি লিআহকামিল কুরআন, ১৫তম খণ্ড, পৃ. ১৩৬
কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৩৫০; কাসাসুল কুরআন, ২য় খণ্ড, পৃ. ১৮৭
📄 হযরত আইয়ূব (আ)-এর রোগমুক্তি
অতঃপর আল্লাহ তা'আলা হযরত আইয়ূব (আ)-এর দু'আ কবুল করিলেন। কুরআন মজীদে ইরশাদ হইয়াছে:
فَاسْتَجَبْنَا لَهُ فَكَشَفْنَا مَا بِهِ مِنْ ضُرٍّ وَأَتَيْنَهُ أَهْلَهُ وَمِثْلَهُمْ مُّعَهُمْ .
"অতঃপর আমি তাহার দুআ কবুল করিলাম, তাহার দুঃখ-কষ্ট দূরীভূত করিয়া দিলাম, তাহাকে তাহার পরিবার-পরিজন ফিরাইয়া দিলাম এবং তাহাদের সঙ্গে তাহাদের মত আরো দিলাম" (২১:৮৪)।
ইহার পর আল্লাহ তা'আলা আদেশ করিলেন, আইয়ূب! স্বস্থান হইতে উঠ এবং যমীনের উপর পদাঘাত কর। ইরশাদ হইয়াছে:
أركض برِجْلِكَ هُذَا مُعْتَسَلٌ بَارِدُ وَشَرَابٌ .
"আমি তাহাকে বলিলাম, তুমি তোমার পদ দ্বারা আঘাত কর, এই তো গোসলের সুশীতল পানি আর পানীয়" (৩৮: ৪২)।
আইয়ূب (আ) আল্লাহ্র আদেশে তাহাই করিলেন। তৎক্ষণাৎ আল্লাহ তা'আলা তাঁহার জন্য একটি ফোয়ারা জারী করিয়া দিলেন। তিনি ঐ ফোয়ারার পানি দ্বারা গোসল করিলেন। ইহাতে তাঁহার শরীরের বাহ্যিক সমস্ত রোগ নিরাময় হইয়া গেল। তৎপর তিনি পুনরায় পদাঘাত করিলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে দ্বিতীয় আরেকটি ফোয়ারা উথলাইয়া উঠিল। তিনি উহার পানি পান করিলেন। তাহাতে তাঁহার দেহের অভ্যন্তরীণ অংশে রোগের যেই প্রভাব ও ক্রিয়া ছিল তাহাও নির্মূল হইয়া গেল। এইরূপে তিনি পূর্ণ স্বাস্থ্য লাভ করিয়া আল্লাহ পাকের দরবারে শোকর আদায় করিলেন। হাফিয ইব্ন হাজার (র) ইন জারীর তাবারী (র)-এর সূত্রে হযরত কাতাদা (র) হইতে অনুরূপ অভিমত বর্ণনা করিয়াছেন। তাফসীরে রূহুল মাআনীতেও অনুরূপ বর্ণনা রহিয়াছে। হযরত আনাস (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হযরত আইয়ূب (আ) দীর্ঘ তের বৎসর (ভিন্ন মতে তিন, সাত, আঠার বৎসর) পর্যন্ত নানাবিধ বিপদ-আপদের কঠিন অগ্নিপরীক্ষায় জর্জরিত হইয়াছিলেন। তাঁহার অবস্থা এমন হইয়াছিল যে, তাঁহার নিকটবর্তী ও দূরবর্তী আত্মীয়-স্বজন সকলেই তাঁহার নিকট হইতে দূরে সরিয়া পড়িলেন। অবশ্য আত্মীয়দের মধ্যে দুইজন আত্মীয় সকালে ও সন্ধ্যায় তাঁহার নিকট আসিতেন। একবার তাঁহাদের মধ্য হইতে একজন অপরজনকে বলিলেন, হয়তো আইয়ূב বড় ধরনের কোন পাপ কার্য করিয়াছেন। অন্যথায় তিনি এই বিপদ হইতে অবশ্যই মুক্তি পাইতেন। অপর এক ব্যক্তি এই কথাটি হযরত আইয়ূب (আ)-কে শুনাইলেন। ইহা শুনিয়া তিনি অত্যন্ত চিন্তিত হইলেন এবং আল্লাহ্র দরবারে দু'আ করিলেন। ভিন্ন সূত্রে বর্ণিত আছে যে, সিজদায় পড়িয়া তিনি এই দু'আ করিলেন, হে আল্লাহ! আমি আপনার সত্তার কসম করিয়া বলিতেছি, আমাকে রোগমুক্ত না করা পর্যন্ত আমি মাথা উত্তোলন করিব না)।
অতঃপর তাঁহাকে রোগমুক্ত করিয়া দেওয়া হইল। ইহার অব্যবহিত পরেই আইয়ূב (আ) সৌচকার্যের উদ্দেশে উঠিলেন এবং তাহার স্ত্রী হাতে ধরিয়া তাঁহাকে লইয়া গেলেন। ইসতিন্জা সমাপন করিয়া তথা হইতে একটু স্থানান্তর হইতেই আল্লাহ তা'আলা তাঁহার প্রতি এই মর্মে ওহী নাযিল করিলেন, 'যমীনের উপর পদাঘাত কর'। তিনি পদাঘাত করিতেই পানির ফোয়ারা উথলাইয়া উঠিল। সুস্থতা লাভের জন্য তিনি উহাতে গোসল করিলেন। অমনি তিনি সুস্থ হইয়া গেলেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে জান্নাতী লেবাস পরাইয়া দিলেন। অতঃপর তাঁহার স্ত্রী আসিলেন। তিনি হযরত আইয়ূב (আ)-কে চিনিতে না পারিয়া তাঁহার নিকটেই আইয়ূב (আ) সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করিলেন। তিনি বলিলেন, আমিই আইয়ূب। দৈনন্দিন আহারের জন্য হযরত আইয়ূב (আ)-এর নিকট এক পুটুলি গম ও এক পুটুলি যব থাকিত। আল্লাহ তা'আলা তাঁহার ধন-সম্পত্তি বৃদ্ধি করিয়া দেওয়ার জন্য গমগুলিকে স্বর্ণ এবং যবগুলিকে রৌপ্যে রূপান্তরিত করিয়া দিলেন। হযরত ইবন আব্বাস (রা) বলেন, অতঃপর আল্লাহ তা'আলা হযরত আইয়ূב (আ)-এর ধন-দৌলত ফিরাইয়া দিলেন এবং সন্তান-সন্ততিও। হযরত ইবন মাসউদ (রা) বলেন, হযরত আইয়ূב (আ)-এর সাত পুত্র ও সাত কন্যা ছিল। পরীক্ষার দিনগুলিতে তাহারা সকলেই মারা গিয়াছিলেন। ইহার পর যখন আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে সুস্থতা দান করিলেন তখন মারা যাওয়া সন্তানদেরকেও জীবিত করিয়া দিলেন এবং তাঁহার স্ত্রীর গর্ভে নূতন সন্তানও এই পরিমাণ অর্থাৎ সাত পুত্র ও সাত কন্যা দান করিলেন। কুরআন মজীদে ইরশাদ হইয়াছে:
وَأَتَيْنُهُ أَهْلَهُ وَمِثْلَهُمْ مُّعَهُمْ
"এবং তাহাকে তাহার পরিবার-পরিজন ফিরাইয়া দিলাম এবং তাহাদের সঙ্গে তাহাদের মত আরো দিলাম" (২১:৮৪)।
টিকাঃ
কাসাসুল কুরআন, ২য় খণ্ড, পৃ. ১৯০
আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১ম খণ্ড, পৃ. ২৫৬-২৫৭
ফাতহুল বারী, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃ. ৪২০; তাফসীরে রূহুল মাআনী, ২৩তম পারা, পৃ. ২০৭
বুখারী, ১ম খণ্ড, পৃ. ৪৮০, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১ম খণ্ড, পৃ. ২৫৮
মাআরিফুল কুরআন, পৃ. ৮৮৬; আল জামি লি আহকামিল কুরআন, ১১তম খণ্ড, পৃ. ২১৬; তাফসীরে রূহুল মাআনী, ২৩তম পারা, পৃ. ২০৭
📄 স্বামী ভক্তির অপূর্ব দৃষ্টান্ত হযরত রহীমা (রা)
হযরত আইয়ূব (আ)-এর অসুস্থ থাকাকালীন এই দীর্ঘ সময়ে একমাত্র তাঁহার স্ত্রীই তাঁহার খেদমতে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি হযরত আইয়ূব (আ)-কে ছাড়িয়া কোথাও যান নাই। স্বামীর এই অবস্থায় তিনি অত্যন্ত শোকাভিভূত হইয়াছিলেন। স্বামীভক্তির অপূর্ব দৃষ্টান্ত হযরত রহীমা (রা)। ইতিহাসে এই জাতীয় খেদমতের নযীর বিরল।
একদিন হযরত রহীমা (রা) হযরত আইয়ূব (আ)-এর কষ্টে অত্যন্ত অধীর হইয়া এমন কিছু কথা বলিয়া ফেলিলেন, যাহা ছিল বাহ্যিক দৃষ্টিতে সবরের পরিপন্থী। ধৈর্য ও সহনশীলতার মূর্ত প্রতীক হযরত আইয়ূব (আ) তাহা বরদাশত করিতে পারিলেন না। তিনি কসম করিয়া বলিলেন, আমি তোমাকে এক শত বেত্রাঘাত করিব।
ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল (র) ইবন 'আব্বাস (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেন, হযরত আইয়ূব (আ)-এর অসুস্থতার সময় একদা শয়তান চিকিৎসকের বেশে আইয়ূব (আ)-এর পত্নীর সাথে সাক্ষাত করে। তিনি তাহাকে চিকিৎসক মনে করিয়া তাহার স্বামীর চিকিৎসা করিতে অনুরোধ করেন। তখন শয়তান বলিল, আমি এই শর্তে চিকিৎসা করিতে পারি যে, আরোগ্য লাভের পর এই কথার স্বীকৃতি দিতে হইবে যে, আমিই তাহাকে আরোগ্য দান করিয়াছি। এই স্বীকৃতিটুকু ছাড়া আমি আর কোন পারিশ্রমিক চাহি না। স্ত্রী হযরত আইয়ূব (আ)-কে এই কথা জানাইলে তিনি বলিলেন, তোমার সরলতা দেখিয়া সত্যিই দুঃখ হয়। সে তো শয়তান। এই প্রস্তাবের মধ্যে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে তাহাদেরকে শিরকে লিপ্ত করার একটা অপপ্রয়াস ছিল। এই কারণে হযরত আইয়ূব (আ) রাগ হইয়া শপঞ্চ করিয়া বলিলেন, আমি তোমাকে এক শত বেত্রাঘাত করিব। তাফসীর গ্রন্থসমূহে এই জাতীয় আরো বহু ঘটনার উল্লেখ রহিয়াছে।
অবশেষে যখন হযরত আইয়ূব (আ)-এর পরীক্ষার মেয়াদ শেষ হইয়া গেল এবং তিনি সুস্থ হইলেন তখন তিনি কসম পূর্ণ করিবার পদ্ধতির ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করিতে লাগিলেন। তখন আল্লাহ তা'আলা স্বামী ভক্তির মূর্ত প্রতীক হযরত রহীমা (রা)-এর খেদমতের প্রতিদানস্বরূপ আইয়ূব (আ)-কে আদেশ করিলেন, এক মুষ্টি তৃণ লও এবং উহা দ্বারা তাহাকে মৃদু আঘাত কর। এইভাবে তোমার কসম পূর্ণ হইয়া যাইবে। ইরশাদ হইয়াছে:
وَخُذْ بِيَدِكَ ضِغْنًا فَاضْرِبْ بِهِ وَلَا تَحنَّتْ إِنَّا وَجَدْنَاهُ صَابِرًا نِعْمَ الْعَبْدُ إِنَّهُ أَوَّابٌ .
"আমি তাহাকে আদেশ করিলাম, এক মুষ্টি তৃণ লও ও উহা দ্বারা আঘাত কর এবং শপথ ভঙ্গ করিও না। আমি তো তাহাকে পাইলাম ধৈর্যশীল। কত উত্তম বান্দা সে! সে ছিল আমার অভিমুখী" (৩৮ঃ৪৪)।
টিকাঃ
কাসাসুল কুরআন, ২য় খণ্ড, পৃ. ১৮৯
আল-জামি লি-আহকামিল কুরআন, ১৫তম খণ্ড, পৃ. ১৩৮
📄 হযরত আইয়ূব (আ)-এর ইনতিকাল
কঠিন পীড়া ও অগ্নিপরীক্ষা হইতে মুক্তিলাভের পর হযরত আইয়ূব (আ) এক শত চল্লিশ বৎসর পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। পুত্র, প্রপৌত্রসহ চারি পুরুষ পর্যন্ত তিনি দেখিয়া যাইতে সক্ষম হন। ইহার পর তিনি ইনতিকাল করেন। ইয়াহূদী পণ্ডিতগণের মতে তাঁহার সর্বমোট বয়স ২১০ বৎসর ছিল।
টিকাঃ
কাসাসুল কুরআন, ২য় খণ্ড, পৃ. ১৯৩; তাফসীর মাজেদী, পৃ. ৬৭০, টীকা নং ১১০