📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হযরত আইয়ূব (আ)-এর সময়কাল

📄 হযরত আইয়ূব (আ)-এর সময়কাল


মাওলানা আবুল কালাম আযাদের মতে হযরত আইয়ূব (আ) হয়তো হযরত ইবরাহীম (আ)-এর সমসাময়িক ছিলেন, কিংবা তিনি হযরত ইসহাক ও হযরত ইয়াকূব (আ)-এর সমসাময়িক। ইবন 'আসাকির-এর মতে হযরত আইয়ুব (আ) হযরত ইবরাহীম (আ)-এর নিকটবর্তী কালের লোক ছিলেন। বস্তুত তিনি ছিলেন হযরত লূত (আ)-এর সমসাময়িক এবং তিনি দীন-ই ইবরাহীমের অনুসারী ছিলেন।
আবদুল ওয়াহ্হাব আন-নাজ্জার (র)-এর মতে হযরত আইয়ূব (আ) হযরত ইবরাহীম (আ)-এর ১০০ বৎসরেরও বেশ কিছু সময় পূর্বেকার লোক ছিলেন। মাওলানা সাইয়িদ সুলায়মান নদভী (র) বলেন, হযরত আইয়ূব (আ) বনী আদম বংশের লোক এবং তিনি খৃষ্টপূর্ব ৭০০ সন ও ১০০০ সনের মধ্যবর্তী কালে এই পৃথিবীতে আবির্ভূত হইয়াছেন। মাওলানা হিফযুর রহমান (র) বলেন, মাওলানা সাইয়িদ সুলায়মান নদভীর বিশ্লেষণ যথাযথ নহে; বরং এই ক্ষেত্রে বিশুদ্ধতম অভিমত হইল, হযরত আইয়ূব (আ)-এর যমানা ছিল হযরত মূসা (আ) এবং হযরত ইসহাক ও ইয়াকূব (আ)-এর সময়কালের মধ্যবর্তী যুগ অর্থাৎ খৃষ্টপূর্ব ১৫০০ সন হইতে খৃষ্টপূর্ব ১৩০০ সন-এর মাঝামাঝিতে তাঁহার আবির্ভাব। এই বক্তব্যের সমর্থনে নিম্নোক্ত যুক্তিসমূহ পেশ করা যায়:
(১) তাওরাতের তত্ত্বজ্ঞানীদিগের সর্ববাদী মতে, হযরত আইয়ূব (আ)-এর সহীফাটি হযরত মূসা (আ)-এর পূর্ববর্তী কালের এবং হযরত মূসা (আ) ইহাকে প্রাচীন আরবী ভাষা হইতে হিব্রু ভাষায় রূপান্তরিত করিয়াছেন।
(২) তাওরাত গ্রন্থের প্রথমে হযরত আইয়ূব (আ)-এর সহীফার উল্লেখ রহিয়াছে। ইহাতে এই কথা প্রমাণিত হয় যে, "সিফরে আইয়ূব" হযরত মূসা (আ)-এর যমানার পূর্ববর্তী কালের।
(৩) ইমাম বুখারী (র)-এর মতও অনুরূপ বলিয়া অনুমিত হয়। এই কারণেই তিনি কিতাবুল আম্বিয়াতে নবী-রাসূলগণের যে ক্রমধারা সাজাইয়াছেন তাহাতে হযরত ইউসুফ (আ)-এর পরে এবং হযরত মূসা (আ)-এর পূর্বে হযরত আইয়ূব (আ)-এর উল্লেখ করিয়াছেন।
শায়খ নাজ্জার মিসরী (র) এবং আরও অন্যান্য উলামায়ে কিরামের মতে এই বিষয়ে এগারটি অভিমতের উল্লেখ পাওয়া যায়।
(১) বুস্তানী-এর মতে হযরত আইয়ূব (আ)-এর সময়কাল হযরত ইবরাহীম (আ)-এর যমানার ১০০ বৎসর পূর্বে।
(২) ইবন আসাকির (র)-এর মতে তাঁহার সময়কাল হযরত ইবরাহীম (আ)-এর যমানার পরপরই।
(৩) ক্যান্ট-এর মতে, তিনি হযরত ইয়াকূব (আ)-এর সমসাময়িক।
(৪) অ্যান্টাল-এর মতে তিনি হযরত মূসা (আ)-এর সমসাময়িক।
(৫) তাবারী (র)-এর মতে তাঁহার সময়কাল হযরত শু'আয়ব (আ)-এর পরবর্তী যমানা।
(৬) অপর এক মতে তিনি হযরত সুলায়মান (আ)-এর সমসাময়িক।
(৭) ইবন খায়সামা (র)-এর মতে তিনি হযরত সুলায়মান (আ)-এর পরবর্তী যমানার নবী।
(৮) ইবন ইসহাক, (র)-এর মতে তিনি ইসরাঈলী নবী কিন্তু তাঁহার সময়কাল অজ্ঞাত।
(৯) তিনি বুখতে নসর (নেবুচাদ নেজার) বাদশাহর সমসাময়িক।
(১০) তিনি বনী ইসরাঈলের বিচারকদের সমসাময়িক।
(১১) তিনি ইরাকের রাজা "আরদেশীর"-এর সমসাময়িক।
উপরিউক্ত বক্তব্যের সারমর্ম হইল, হযরত আইয়ূব (আ)-এর সময়কাল হযরত ইয়াকূব ও হযরত মূসা (আ)-এর যমানার মধ্যবর্তী কাল।

টিকাঃ
ফাতহুল বারী, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃ. ৪২০
কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৩৪৯
আরদুল কুরআন, ২য় খণ্ড, পৃ. ২৪
কাসাসুল কুরআন, ২য় খণ্ড, পৃ. ১৭৯-১৮১
কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৩৫০; কাসাসুল কুরআন, ২য় খণ্ড, পৃ. ১৮৩-১৮৪

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বাইবেলে হযরত আইয়ূব (আ)

📄 বাইবেলে হযরত আইয়ূব (আ)


তাওরাতের একটিমাত্র সহীফাতে হযরত আইয়ূব (আ)-এর পবিত্র ভাষণসমূহ লিপিবদ্ধ রহিয়াছে। উহাকে সহীফায়ে আইয়ুব বা সিফরে আইয়ূব বলা হয়। সিফরে আইয়ূব-এর মধ্যে কয়েক শত আয়াত এবং বিয়াল্লিশটি অধ্যায় রহিয়াছে। বাইবেলে বর্ণিত আছে:
পরিচয়: (১) উষ দেশে ইয়োব নামে একজন লোক বাস করতেন। তিনি একজন নির্দোষ ও সৎ লোক ছিলেন। তিনি সদাপ্রভুকে ভক্তিপূর্ণ ভয় করতেন এবং মন্দ থেকে দূরে থাকতেন। (২-৩) তাঁর সাত ছেলে ও তিন মেয়ে ছিল। তাঁর সাত হাজার ভেড়া, তিন হাজার উট, পাঁচশো জোড়া ষাড় ও পাঁচশো গাধী ছিল এবং তাঁর দাস-দাসীও ছিল অনেক। পূর্বদেশের সমস্ত লোকদের মধ্যে তিনি ছিলেন সবচেয়ে ধনী। (৪) তাঁর ছেলেরা পালা-পালা করে তাদের নিজের নিজের বাড়িতে ভোজ প্রস্তুত করত এবং তাদের সংগে খাওয়া-দাওয়া করবার জন্য লোক পাঠিয়ে তাদের তিন বোনকে নিমন্ত্রণ করত। (৫) তাদের ভোজের দিনগুলো শেষ হয়ে গেলে পর ইয়োব তাদের ডেকে এনে শুচি করতেন। ভোরবেলা তিনি তাদের প্রত্যেকের জন্য একটা করে পোড়ানো উৎসর্গের অনুষ্ঠান করতেন। তিনি ভাবতেন, আমার ছেলেমেয়েরা হয়তো পাপ করেছে এবং মনে মনে সদাপ্রভুকে অসম্মান করেছে। ইয়োব সব সময় এই রকম করতেন। (৬) একদিন স্বর্গদূতেরা সদাপ্রভুর সামনে গিয়ে উপস্থিত হলেন আর শয়তানও তাঁদের সংগে উপস্থিত হল। তখন সদাপ্রভু শয়তানকে বললেন, "তুমি কোথা থেকে আসলে?" উত্তরে শয়তান সদাপ্রভুকে বলল, "পৃথিবীর মধ্য দিয়ে এদিক-ওদিক ঘোরাফেরা করে আসলাম।"
(৮) সদাপ্রভু তখন শয়তানকে বললেন, "আমার দাস ইয়োবের দিকে কি তুমি লক্ষ্য করেছ? পৃথিবীতে তার তুল্য আর কেউ নেই। সে নির্দোষ ও সৎ। সে আমাকে ভক্তিপূর্ণ ভয় করে এবং মন্দ থেকে দূরে থাকে।" (৯-১০) তখন শয়তান বলে, "ইয়োব কি এমনি এমনি আপনাকে ভক্তিপূর্ণ ভয় করে? আপনি কি তার চারপাশে এবং তার বাড়ি ও তার যা কিছু আছে তার চারপাশে ঘেরা দিয়ে রাখেন নি? আপনি তো তার কাজে আশীর্বাদ করেছেন, সেইজন্য তার পশুপালে দেশ ছেয়ে গেছে। (১১) কিন্তু আপনি হাত বাড়িয়ে তার সবকিছুকে আঘাত করুন, সে নিশ্চয়ই আপনার সামনেই আপনার বিরুদ্ধে অপমানের কথা বলবে।"
(১২) তখন সদাপ্রভু শয়তানকে বললেন, "বেশ ভাল; তার যা কিছু আছে তা তোমার হাতে দিলাম, কিন্তু তার দেহের উপরে তুমি একটা আঙ্গুলও ছোঁয়াবে না।" তখন শয়তান সদাপ্রভুর সামনে থেকে বের হয়ে চলে গেল।
(১৩) একদিন ইয়োবের ছেলে-মেয়েরা তাদের বড় ভাইয়ের বাড়িতে খাওয়া-দাওয়া করছিল ও আংগুর রস খাচ্ছিল। (১৪) এমন সময় ইয়োবকে খবর দেবার জন্য একজন লোক এসে বলল, "আপনার ষাড়গুলো জমি চাষ করছিল এবং গাধীগুলোও কাছাকাছি চরছিল। (১৫) এর মধ্যে শিবায়ীয়েরা লুট করতে এসে সেগুলো নিয়ে গেছে। তারা আপনার দাসদের মেরে ফেলেছে। আপনাকে খবর দেবার জন্য কেবল আমিই রক্ষা পেয়েছি।
(১৬) লোকটি তখনও কথা বলছিল, এমন সময় আর একজন এসে খবর দিল, "আকাশ থেকে সদাপ্রভুর আগুন পড়ে আপনার ভেড়ার পাল আর দাসদের পুড়িয়ে দিয়েছে। আপনাকে খবর দেয়ার জন্য কেবল আমিই রক্ষা পেয়েছি। (১৭) দ্বিতীয় লোকটি তখনও কথা বলছিল এমন সময় আর একজন এসে খবর দিল, কলদীয়েরা তিনটি দলে ভাগ হয়ে হানা দিয়ে আপনার উটগুলো নিয়ে গেছে। তারা আপনার দাসদের মেরে ফেলেছে। আপনাকে খবর দেবার জন্য কেবল আমিই রক্ষা পেয়েছি। (১৮) তৃতীয় লোকটি তখনও কথা বলছিল এমন সময় খবর দেবার জন্য আর একজন এসে বলল, আপনার ছেলে-মেয়েরা তাদের বড় ভাইয়ের বাড়িতে খাওয়া-দাওয়া করছিলেন ও আংগুর রস খাচ্ছিলেন। (১৯) তখন মরু এলাকা থেকে হঠাৎ একটা জোরে বাতাস এসে ঘরটাকে আঘাত করল। তাতে ঘরটা ভেংগে তাদের উপর পড়াতে তাঁরা মারা গেছেন। আপনাকে খবর দেবার জন্য কেবল আমিই রক্ষা পেয়েছি।
(২০) এই কথা শুনে ইয়োব উঠে মনের দুঃখে তাঁর কাপড় ছিঁড়লেন এবং মাথা কামিয়ে ফেললেন। (২১) তারপর মাটিতে পড়ে সদাপ্রভুকে তাঁর অন্তরের ভক্তি জানিয়ে বললেন, মায়ের পেট থেকে আমি উলংগ এসেছি আর উলংগই চলে যাব। সদাপ্রভুই দিয়েছিলেন আর সদাপ্রভুই নিয়ে গেছেন; সদাপ্রভুর গৌরব হোক। (২২) এইসব হলেও ইয়োব পাপ করলেন না কিংবা সদাপ্রভুকে দোষী করলেন না।
ইয়োবের দ্বিতীয় পরীক্ষা: (১) আর একদিন স্বর্গদূতেরা সদাপ্রভুর সামনে গিয়ে উপস্থিত হলেন; আর শয়তানও তাঁর সামনে উপস্থিত হবার জন্য স্বর্গদূতদের সংগে আসল। (২) সদাপ্রভু শয়তানকে বললেন, "তুমি কোথা থেকে আসলে?" উত্তরে শয়তান সদাপ্রভুকে বলল, "পৃথিবীর মধ্যে এদিক-ওদিক ঘোরাফেরা করে আসলাম।"
(৩) তখন সদাপ্রভু শয়তানকে বললেন, "আমার দাস ইয়োবের দিকে তুমি লক্ষ্য করেছ? পৃথিবীতে তাঁর মত আর কেউ নেই। সে নির্দোষ ও সৎ। সে আমাকে ভক্তিপূর্ণ ভয় করে ও মন্দতা থেকে দূরে থাকে। যদি তুমি বিনা কারণে তার সর্বনাশ করার জন্য আমাকে খুঁচিয়ে তুলেছ তবুও সে এখনও কোন দোষ করেনি।" (৪) শয়তান বলল, তার জীবনই তার কাছে প্রাণের প্রাণ; মানুষ নিজের প্রাণ বাঁচাবার জন্য তার যা কিছু আছে সবই দেবে। (৫) আপনি হাত বাড়িয়ে তার দেহে আঘাত করুন, সে নিশ্চয়ই আপনার সামনেই আপনার বিরুদ্ধে অপমানের কথা বলবে।
(৬) তখন সদাপ্রভু শয়তানকে বললেন, "বেশ ভাল; তাকে তোমার হাতে দিলাম, কিন্তু তুমি তাকে প্রাণে মারবে না।" (৭) এরপর শয়তান সদাপ্রভুর সামনে থেকে বের হয়ে গেল এবং ইয়োবের মাথার তালু থেকে পায়ের তলা পর্যন্ত যন্ত্রণাপূর্ণ ঘা দিয়ে তাকে কষ্ট দিতে লাগল। (৮) তখন ইয়োব ছাইয়ের মধ্যে বসে মাটির পাত্রের একটা টুকরা দিয়ে নিজের ঘা ঘষতে লাগলেন। (৯) তখন তাঁর স্ত্রী তাঁকে বললেন, "তুমি এখনও দাবি করছ যে, তুমি নির্দোষ? সদাপ্রভুকে দোষ দিয়ে মরে যাও।" (১০) কিন্তু ইয়োব তাঁকে বললেন, তুমি একজন বোকা স্ত্রীলোকের মত কথা বলছ। আমরা সদাপ্রভুর কাছ থেকে কি কেবল মঙ্গলই গ্রহণ করব, অমঙ্গল গ্রহণ করব না? এইসব হলেও ইয়োব তাঁর কথার মধ্য দিয়ে পাপ করলেন না।
ইয়োবের তিন বন্ধু: (১১) তৈমনীয় ইলীফস, সূহীয় বিলদদ ও নামাথীয় সোফর নামে ইয়োবের তিনজন বন্ধু যখন ইয়োবের সব বিপদের কথা শুনলেন তখন তারা তাদের বাড়ি থেকে রওনা হলেন। তারা একত্র হয়ে পরামর্শ করলেন যে, তারা গিয়ে তাঁর সংগে শোক করবেন ও তাঁকে সান্ত্বনা দিবেন। (১২) তারা দূর থেকে তাঁকে দেখে চিনতেই পারলেন না। তারা জোরে জোরে কাঁদতে লাগলেন এবং নিজেদের কাপড় ছিঁড়ে মাথার উপরে আকাশের দিকে ধুলা ছাড়লেন। (১৩) তারপর তারা সাত দিন ও সাত রাত তার সংগে মাটিতে বসে রইলেন। তাদের মধ্যে কেউ তাঁকে কিছুই বললেন না, কারণ তার কষ্ট যে কি ভীষণ তা তারা দেখতেই পাচ্ছিলেন। এইভাবে বিয়াল্লিশটি অধ্যায়ে ইয়োব সম্পর্কে আলোচনার পর বাইবেলে উল্লেখ করা হয়েছে।
শেষ কথা: (৭) ইয়োবকে এইসব কথা বলার পরে সদাপ্রভু তৈমনীয় ইলীফসকে বললেন, আমার দাস ইয়োবকে যেমন বলেছে তুমি ও তোমার বন্ধুরা সেইভাবে আমার বিষয় ঠিক কথা বলনি; সেইজন্য তোমাদের জন্য তোমাদের উপর আমার ক্রোধের আগুন জ্বলে উঠেছে। কাজেই এখন সাতটা ষাড় ও সাতটা ভেড়া নিয়ে আমার দাস ইয়োবকে কাছে যাও এবং নিজেদের জন্য পোড়ানো উৎসর্গের অনুষ্ঠান কর। আমার দাস ইয়োব তোমাদের জন্য প্রার্থনা করবে আর আমি তা গ্রহণ করব, তোমাদের বোকামি অনুসারে ফল দেব না। আমার দাস ইয়োব, যেমন আমার বিষয়ে ঠিক কথা বলেছে তোমরা তেমন বলনি। (৯) তখন তৈমনীয় ইলীফস, সূহীয় বিলদদ ও নামাথীয় সোফর সদাপ্রভুর কথামতই কাজ করলেন, আর সদাপ্রভু ইয়োবের প্রার্থনা গ্রহণ করলেন।
(১০) ইয়োব তাঁর বন্ধুদের জন্য প্রার্থনা করবার পর সদাপ্রভু আবার তাঁর অবস্থা ফিরালেন এবং তাকে সব কিছু আগের চেয়ে দুই গুণ দিলেন। (১১) তাঁর ভাই ও বোনেরা এবং যারা তাঁকে আগে চিনত তারা সকলে এসে তাঁর বাড়িতে তাঁর সংগে খাওয়া-দাওয়া করল। সদাপ্রভু তাঁর উপর যেসব কষ্ট এনেছিলেন তার জন্য তারা তাঁকে সান্ত্বনা দিল। তারা প্রত্যেকে তাকে এক টুকরা রূপা ও সোনার একটা কানের গহনা দিল।
(১২) সদাপ্রভু ইয়োবের জীবনের প্রথম অবস্থা থেকে পরের অবস্থা আরও আশীর্বাদযুক্ত করলেন। তাঁর চৌদ্দ হাজার ভেড়া, ছয় হাজার উট, এক হাজার জোড়া ষাঁড় ও এক হাজার গাধা হল। (১৩) তাঁর ঘরে সাত ছেলে ও তিন মেয়ের জন্ম হল। (১৪) তার বড় মেয়ের নাম যিমীমা, মেজ মেয়ের নাম কৎসীয়া ও ছোট-মেয়ের নাম কেরন-হল্লুক। (১৫) ইয়োবের মেয়েদের মত সুন্দরী দেশের মধ্যে আর কোথাও খুঁজে যেত না। তাদের বাবা তাদের ভাইদের সংগে তাদেরও সম্পত্তির ভাগ দিলেন। (১৬) এরপর ইয়োব আরও একশো চল্লিশ বছর বেঁচেছিলেন। তিনি তাঁর ছেলে-মেয়েদের ও তাদের ছেলে মেয়েদের চার পুরুষ পর্যন্ত দেখেছিলেন। (১৭) এইভাবে ইয়োব বুড়ো হয়ে এবং পূর্ণ আয়ু পাবার পরে মারা গেলেন।

টিকাঃ
বাইবেল : ইয়োবের বিবরণ, পৃ. ৬৬৯-৭৪৫

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 কুরআন মজীদে হযরত আইয়ূব (আ)

📄 কুরআন মজীদে হযরত আইয়ূব (আ)


কুরআন মজীদের চার স্থানে হযরত আইয়ূব (আ)-এর নাম উল্লেখ রহিয়াছে। দুই স্থানে নবীগণের নামের সাথে শুধু নামটিই উল্লেখ রহিয়াছে, তাঁহার কোন বক্তব্য বা তাঁহার সম্পর্কিত কোন ঘটনার উল্লেখ এই স্থান দুইটিতে নাই। কুরআন মজীদে ইরশাদ হইয়াছে :
وَعِيسَى وَأَيُّوبَ وَيُونُسَ وَهَرُونَ وَسُلَيْمَانَ .
"আর ঈসা, আইয়ূব, ইউনুস, হারূন এবং সুলায়মান-এর নিকটও ওহী প্রেরণ করিয়াছিলাম" (৪: ১৬৩)।
وَمِنْ ذُرِّيَّتِهِ دَاوُدَ وَسُلَيْمَانَ وَأَيُّوبَ وَيُوسُفَ وَمُوسَى وَهُرُونَ
"এবং তাহার (নূহ-এর) বংশধর দাউদ, সুলায়মান, আইয়ুব, ইউসুফ, মূসা ও হারুনকেও (সৎপথে পরিচালিত করিয়াছিলাম)" (৬:৮৪)।
আর বাকী দুই স্থানে অত্যন্ত সংক্ষিপ্তভাবে হইলেও হযরত আইয়ূব (আ)-এর জীবনের বহুবিধ ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত রহিয়াছে। ইরশাদ হইয়াছে :
وَأَيُّوبَ إِذْ نَادَى رَبَّهُ أَنِّي مَسَّنِيَ الضُّرُّ وَأَنْتَ أَرْحَمُ الرَّحِمِينَ . فَاسْتَجَبْنَا لَهُ فَكَشَفْنَا مَا بِهِ مِنْ ضُرٍ وَآتَيْنَهُ أَهْلَهُ وَمِثْلَهُمْ مَعَهُمْ . رَحْمَةً مِنْ عِنْدِنَا وَذِكْرَى لِلْعَبِدِينَ .
"এবং স্মরণ কর আইয়ুবের কথা, যখন সে তাহার প্রতিপালককে আহ্বান করিয়া বলিয়াছিল, "আমি দুঃখ-কষ্টে পড়িয়াছি, আর তুমি তো সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু! তখন আমি তাহার ডাকে সাড়া দিলাম, তাহার দুঃখ-কষ্ট দূরীভূত করিলাম, তাহাকে তাহার পরিবার-পরিজন ফিরাইয়া দিলাম এবং তাহাদের সঙ্গে তাহাদের মত আরও দিলাম আমার বিশেষ রহমতরূপে এবং ইবাদতকারীদের জন্য উপদেশস্বরূপ” (২১:৮৩-৮৪)।
وَاذْكُرْ عَبْدَنَا أَيُّوبَ إِذْ نَادِي رَبَّهُ أَنِّي مَسَّنِي الشَّيْطَنُ بِنُصْبٍ وَعَذَابٌ . أركض بِرِجْلِكَ هذَا مُغْتَسَلَ بَارِدٌ وشَرَابٌ ، وَوَهَبْنَا لَهُ أَهْلَهُ وَمِثْلَهُمْ مَعَهُمْ رَحْمَةً مِنَّا وَذِكْرِي لِأُولِي الأَلْبَابِ . وَخُذْ بِيَدِكَ ضِعْثًا فَاضْرِبْ بِهِ وَلَا تَحْنَتْ إِنَّا وَجَدْنَهُ صَابِراً نِعْمَ الْعَبْدُ إِنَّهُ أَوَّابٌ .
"স্মরণ কর আমার বান্দা আইয়ূবকে, যখন সে তাহার প্রতিপালককে আহ্বান করিয়া বলিয়াছিল, শয়তান তো আমাকে যন্ত্রণা ও কষ্টে ফেলিয়াছে, আমি তাহাকে বলিলাম, তুমি তোমার পদ দ্বারা ভূমিতে আঘাত কর। এই তো গোসলের সুশীতল পানি আর পানীয়। আমি তাহাকে দান করিলাম তাহার পরিজনবর্গ ও তাহাদের মত আরও আমার অনুগ্রহস্বরূপ এবং বোধশক্তিসম্পন্ন লোকদের জন্য উপদেশস্বরূপ। আমি তাহাকে আদেশ করিলাম, এক মুষ্টি তৃণ লও ও উহা দ্বারা আঘাত কর এবং শপথ ভঙ্গ করিও না। আমি তো তাহাকে পাইলাম ধৈর্যশীল। কত উত্তম বান্দা সে! সে ছিল আমার অভিমুখী” (৩৮ : ৪১-৪৪)।
উপরিউক্ত আয়াতসমূহের আলোকে প্রতীয়মান হয় যে, হযরত আইয়ূব (আ) আল্লাহ তা'আলার একজন খাঁটি বান্দা এবং তাঁহার মনোনীত পয়গাম্বর ছিলেন। অর্থ-সম্পদ এবং পরিবার-পরিজনের দিক দিয়া আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে অত্যন্ত ভাগ্যবান এবং সমৃদ্ধ করিয়াছিলেন। কিন্তু অকস্মাৎ তিনি এক কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হইয়া পড়িলেন। তাঁহার মাল-দৌলত, পরিবার-পরিজন সবই ধ্বংস হইয়া গেল এবং তিনি আক্রান্ত হইলেন এক দূরারোগ্য ব্যাধিতে। এতদসত্ত্বেও তিনি মহান আল্লাহ তা'আলার প্রতি কোনরূপ অভিযোগ করিলেন না, বরং অত্যন্ত আদবের সহিত নিজের অবস্থা তাঁহার নিকট তুলিয়া ধরিলেন এবং বলিলেন :
"শয়তান তো আমাকে যন্ত্রণা ও কষ্টে ফেলিয়াছে"। এই ক্ষেত্রে হযরত আইয়ূব (আ) 'আপনি আমাকে যন্ত্রণা ও কষ্টে ফেলিয়াছেন' না বলিয়া "শয়তান তো আমাকে যন্ত্রণা ও কষ্টে ফেলিয়াছে" এই কথা এইজন্য বলিয়াছেন যে, তিনি জানিতেন, দুঃখ-কষ্ট সব কিছু আল্লাহ তা'আলারই সৃষ্ট। তবে এগুলির বহিঃপ্রকাশ ঘটে শয়তানের কারণে। এ পর্যায়ে তিনি আরো বলিয়াছেন: অ
"আমি দুঃখ-কষ্টে পড়িয়াছি। আর তুমি তো সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু"।
যখন তিনি এভাবে আল্লাহ তা'আলাকে ডাকিলেন, তখন তিনি তাঁহার ডাকে সাড়া দিলেন, তাঁহার দু'আ কবুল করিলেন এবং ধন-সম্পদ পরিবার-পরিজন যাহা কিছু তাঁহার ধ্বংস হইয়া গিয়াছিল তাহা এবং তৎসঙ্গে আরো বহু গুণ অধিক তাঁহাকে দান করিলেন। আর সুস্থ ও রোগমুক্ত হওয়ার জন্য আল্লাহ তাআলা পানির ফোয়ারা জারী করিয়াছিলেন। এই সবকিছু আল্লাহর রহমত এবং ইবাদতকারী বুদ্ধিমান লোকদের জন্য তাঁহার পক্ষ হইতে উপদেশস্বরূপ ছিল।

টিকাঃ
কাসাসুল কুরআন, ২য় খণ্ড, পৃ. ১৮৬-১৮৭; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১ম খণ্ড, পৃ. ২৫৪

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 অগ্নি পরীক্ষায় হযরত আইয়ূব (আ)

📄 অগ্নি পরীক্ষায় হযরত আইয়ূব (আ)


এই কথা সর্বজনস্বীকৃত যে, হযরত আইয়ূব (আ) মহাবিপদে পড়িয়াছিলেন। আর এই কারণেই তিনি আল্লাহ্র দরবারে ফরিয়াদ করিয়া বলিয়াছিলেন, আমি দুঃখ-কষ্টে পড়িয়াছি এবং শয়তান তো আমাকে যন্ত্রণা ও কষ্টে ফেলিয়াছে। ইমাম কুরতুবী (র) বলেন, আয়াতে উল্লিখিত عذاب (আযাব) বলিয়া আর্থিক বিপর্যয়ের কথা বুঝানো হইয়াছে। আল্লামা আলুসী (র)-ও অনুরূপ অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন। দৈহিক ও আর্থিক দিক হইতে হযরত আইয়ূব (আ) কত কাল ও কি ধরনের বিপদ-আপদের সম্মুখীন হইয়াছিলেন সে সম্পর্কে ইমাম কুরতুবী (র) বলেন, হযরত ইব্‌ন আব্বাস (রা)-এর মতে হযরত আইয়ুব (আ) সাত বৎসর সাত মাস সাত দিন সাত ঘন্টা রোগাক্রান্ত অবস্থায় ছিলেন। ওয়াহব ইন্ন মুনাব্বিহ (র) বলেন, তিনি সাত বৎসর রুগ্ন অবস্থায় ছিলেন। কোন কোন ব্যাখ্যাকার বলেন, তিনি দশ বৎসর ভিন্নমতে আঠার বৎসর পর্যন্ত রোগাক্রান্ত অবস্থায় ছিলেন।
তাঁহার রোগ সম্পর্কে তাফসীর ও ইতিহাস গ্রন্থে ইসরাঈলী রিওয়ায়াতসমূহে বহু অতিরঞ্জন রহিয়াছে। তাহাতে এমন সব রোগের কথা বলা হইয়াছে যাহা ঘৃণার কারণ বলিয়া বিবেচিত হয় এবং যে সমস্ত রোগের কারণে পীড়িত ব্যক্তি হইতে দূরে সরিয়া থাকা একান্ত জরুরী মনে করা হয়, যেমন কুষ্ঠ, ফোঁড়া, পাচড়া ইত্যাদি, এমন অবস্থায় পৌছিয়া যাওয়া যাহাতে শরীর পচিয়া-গলিয়া দুর্গন্ধ ছড়াইয়া পড়ে এবং তাহাতে সুস্থ লোকদের ঘৃণার কারণ হয়। এইরূপ রিওয়ায়াতগুলি উদ্ধৃত করার পর কোন কোন তাফসীরকার প্রশ্ন উত্থাপন করিয়াছেন যে, নবী ও রাসূলদের এমন রোগ হয় না যাহা সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে ঘৃণার কারণ হয় এবং উক্ত কারণে তাহারা রোগী হইতে পলায়ন করে। কেননা ইহা নবী ও রাসূল প্রেরণের উদ্দেশ্যের পরিপন্থী এবং হিদায়াত ও নসীহতকার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে বিরাট বড় বাধা। এ কারণেই ইবনুল আরাবী (র) এই জাতীয় রিওয়ায়াতকে বাতিল বলিয়া আখ্যায়িত করিয়াছেন। সূক্ষ্মদর্শী আলিমগণ বলেন, যদি ইসরাঈলী বর্ণনাসমূহ সহীহ বলিয়া মানিয়া নেয়া হয়, তাহা হইলে এই সম্বন্ধে আমাদের অভিমত হইল, সম্ভবত নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বে হযরত আইয়ূব (আ) এই রোগে আক্রান্ত হইয়াছিলেন। অতঃপর এই রোগ হইতে আরোগ্য লাভ করিবার পর আল্লাহ তাআলা তাঁহাকে নবুওয়াত দান করেন। আল্লাহ তা'আলা হযরত আইয়ুব (আ)-কে অগাধ ধনদৌলত, সহায়-সম্পত্তি, সুরম্য লান-কোঠা, যানবাহন, সন্তান-সন্ততি ও চাকর-নওকর দান করিয়াছিলেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে শারীরিক পরীক্ষার পাশাপাশি সন্তান-সন্ততি ধন-সম্পদ ইত্যাদির ব্যাপারেও অগ্নিপরীক্ষায় নিপতিত করিলেন। ধন-সম্পদ অর্থকড়ি যাহা ছিল সব শেষ হইয়া গেল। সন্তান-সন্ততি সব মৃত্যুমুখে পতিত হইল এবং তিনিও আক্রান্ত হইলেন এক দূরারোগ্য ব্যাধিতে। মোটকথা, হযরত আইয়ূব (আ) পার্থিব ধন-দৌলত ও সহায়-সম্পত্তি হইতে বঞ্চিত হইয়া এমন এক শারীরিক ব্যাধিতে যাক্রান্ত হন যে, ইহার কারণে কেহই তাঁহার নিকট আসিতে ইচ্ছা করিত না। তিনি লোকালয়ের বাহিরে এক আবর্জনাময় স্থানে দীর্ঘ কয়েক বৎসর পর্যন্ত পড়িয়া থাকেন। এই অবস্থা হা-হুতাশ, অস্থিরতা ও অভিযোগের কোন বাক্যও তিনি মুখে উচ্চারণ করেন নাই। সতী-সাধ্বী স্ত্রী লিয়া (বা রহমত) একবার আরয করিলেন, আপনার কষ্ট অনেক বাড়িয়া গিয়াছে। এই কষ্ট দূর হওয়ার জন্য আল্লাহর নিকট দু'আ করুন। তিনি জবাব দিলেন, আমি সত্তর বৎসর সুস্থ ও নিরোগ অবস্থায় আল্লাহ তা'আলার অফুরন্ত নিআমত ও দৌলতের মধ্যে দিনাতিপাত করিয়াছি। ইহার বিপরীতে সাত বৎসর বিপদে থাকা কঠিন হইবে কেন? পয়গাম্বর সুলভ দৃঢ়তা, সহিষ্ণুতা ও সবরের ফলে তিনি দু'আ করারও হিম্মত করিতেন না, যাহাতে কোথাও সবরের খেলাফ না হইয়া যায়। বস্তুত আল্লাহ্র কাছে দু'আ করা এবং নিজের অভাব ও দুঃখ-কষ্টের কথা পেশ করা সবরের পরিপন্থী কোন কাজ নহে। অবশেষে এমন একটি কারণ ঘটিয়া গেল, যাহা তাহাকে দু'আ করিতে বাধ্য করিল। আল্লাহ তাআলা তাঁহার সবর ও ধৈর্যের প্রশংসা করিয়াছেন।
اِنَّا وَجَدْنَاهُ صَابِرًا نِعْمَ الْعَبْدُ انَّهُ اوَّابٌ .
"আমি তো তাহাকে পাইলাম ধৈর্যশীল। কত উত্তম বান্দা সে। সে ছিল আমার অভিমুখী" (৩৮ : ৪৪; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১ম খণ্ড, পৃ. ২৫৫; মাআরিফুল কুরআন (সংক্ষিপ্ত), পৃ. ৮৮৭; আল-জামি লিআহকামিল কুরআন, ১১তম খণ্ড, পৃ. ২১৪)।

টিকাঃ
আল-জামি' লি আহকামিল কুরআন, ১৫ খণ্ড, পৃ. ১৩৫; তাফসীরে রূহুল মাআনী-২৩, পৃ. ২০৯
আল-জামিলি আহকামিল কুরআন, ১৫তম খণ্ড, পৃ. ১৩৮
কাসাসুল কুরআন, ২য় খণ্ড, পৃ. ১৮৭; আল-জামি লিআহকামিল কুরআন, ১৫তম খণ্ড, পৃ. ১৩৬
কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৩৫০; কাসাসুল কুরআন, ২য় খণ্ড, পৃ. ১৮৭

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00