📄 আসহাবুল আয়কার পেশা ও লেনদেন
ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথের পাশে বসবাস করিবার দরুন মাদয়ান সম্প্রদায়ের মতো তাহারাও ব্যবসায় ক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থানকে শক্তিশালী করিয়াছিল। মাদয়ান সম্প্রদায়ের মধ্যে যে বদঅভ্যাস ছিল তাহা তাহাদের মধ্যেও বিস্তার লাভ করিয়াছিল। মাপে ও ওযনে কম দেওয়া তাহাদের অভ্যাসে পরিণত হইয়াছিল। বিভিন্ন ধোঁকাবাজি ও অবৈধ লেনদেন ব্যাপকভাবে তাহাদের মধ্যে ছড়াইয়া পড়িয়াছিল। মাদ্যানের এবং আসহাবুল আয়কার মাঝে এই আচরণগত মিল থাকিবার কারণে বহু সংখ্যক মুফাসসির উভয় সম্প্রদায়কে একই সম্প্রদায় বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন।
টিকাঃ
মা'আল আম্বিয়া ফিল-কুরআন, পৃ. ২০৩; নাজ্জার-কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ১৯১; আম্বিয়ায়ে কুরআন, ২খ., পৃ. ৮৪
📄 আসহাবুল আয়কার ধর্মীয় অবস্থা
বাইবেলে কিংবা কুরআন মজীদে তাহাদের ধর্মীয় অবস্থার বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায় না। তবে তাহারা শিকার করিত, বহুবিধ জুলুম-অত্যাচারে লিপ্ত ছিল এবং নবী-রাসূলদের সহিত বেআদবি ও চরম দুর্ব্যবহার করিয়াছিল বলিয়া বর্ণনা পাওয়া যায়। আল্লাহ তা'আলা বলিয়াছেন: وَإِنْ كَانَ أَصْحَابُ الْأَيْكَةِ الظَّالِمِينَ "আর নিঃসন্দেহে আয়কা অধিবাসিগণ ছিল সীমালংঘনকারী" (১৫ঃ ৭৮)।
كَذَّبَتْ قَبْلَهُمْ قَوْمٌ نُوحٍ وَعَادٌ وَفِرْعَوْنُ ذُو الْأَوْتَادِ. وَثَمُودُ وَقَوْمُ لُوطٍ وَأَصْحَابُ الْأَيْكَةِ أُولئِكَ الْأَحْزَابُ . إِنْ كُلُّ إِلَّا كَذَّبَ الرُّسُلَ فَحَقِّ عِقَابِ.
"ইহাদের পূর্বেও রাসূলদেরকে অস্বীকার করিয়াছিল নূহের সম্প্রদায়, 'আদ ও বহু শিবিরের অধিপতি ফির'আওন, ছামূদ, লূত সম্প্রদায় ও 'আয়কা'র অধিবাসী। উহারা ছিল এক একটি বিশাল বাহিনী, উহাদের প্রত্যেকেই রাসূলগণকে অস্বীকার করিয়াছে। ফলে উহাদের ক্ষেত্রে আমার শাস্তি হইয়াছে বাস্তব" (৩৮: ১২-১৪)।
كَذَّبَتْ قَبْلَهُمْ قَوْمٌ نُوحٍ وَأَصْحَابُ الرَّسِّ وَثَمُودُ. وَعَادٌ وَفِرْعَوْنُ وَإِخْوَانُ لُوطٍ، وَأَصْحَابُ الْأَيْكَةِ وَقَوْمُ تُبَّعِ كُلٌّ كَذَّبَ الرُّسُلَ فَحَقِّ وَعِيدِ .
"উহাদের পূর্বেও সত্য প্রত্যাখ্যান করিয়াছিল নূহের সম্প্রদায়, রাস্স ও ছামূদ সম্প্রদায়, 'আদ, ফির'আওন ও লূত সম্প্রদায় এবং আয়কার অধিবাসী ও তুব্বা' সম্প্রদায়; উহারা সকলেই রাসূলদেরকে মিথ্যাবাদী বলিয়াছিল, ফলে উহাদের উপর আমার শাস্তি আপতিত হইয়াছে" (৫০: ১২-১৪)।
এই সম্প্রদায় শিরকের মধ্যেও নিমজ্জিত ছিল বলিয়া Old Testament (Book of Numbers, 21: 29)-এ ইঙ্গিত পাওয়া যায়। 'মূলাক' ও 'বা'ল' নামক দুইটি মূর্তির তাহারা পূজা করিত, এমনকি এই মূর্তির উদ্দেশে তাহারা সন্তান পর্যন্ত কুরবানী করিত।
টিকাঃ
আরদুল কুরআন, ২খ., পৃ. ১৭৭-১৭৮
📄 আসহাবুল আয়কার প্রতি শু'আয়ব (আ)-এর দাওয়াত
মাদ্য়ান সম্প্রদায়ের ধ্বংসের পর আল্লাহ তা'আলা শু'আয়ব (আ)-কে আসহাবুল আয়কার নিকট প্রেরণ করিয়াছিলেন। এই সম্প্রদায়ের বহুবিধ অপকর্ম প্রত্যক্ষ করিয়া তিনি অত্যন্ত ব্যথিত হইলেন। অন্য এক আয়াতে উল্লেখ করা হইয়াছে যে, আসহাবুল আয়কা রাসূলদিগকে মিথ্যাবাদী বলিয়াছিল। অন্যত্র ইরশাদ হইয়াছে :
كَذَّبَ أَصْحَابُ الأَيْكَةِ الْمُرْسَلِينَ . "আয়কার অধিবাসীগণ রাসূলদেরকে মিথ্যাবাদী বলিয়াছিল" (২৬ঃ ১৭৬)।
শু'আয়ব (আ)-এর দাওয়াত আয়কার অধিবাসিরা গ্রহণ করা তো দূরের কথা, তাহারা বিরূপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করিল। এমনকি সীমাতিরিক্ত দুঃসাহস দেখাইয়া তাহারা বলিল, আমরা তোমাকে মিথ্যাবাদী বলি। যদি তুমি সত্যবাদী হইয়া থাক তাহা হইলে আমাদের জন্য শাস্তির প্রার্থনা কর। তোমার ক্ষমতা থাকিলে আসমানের এক অংশ আমাদের উপর ফেলিয়া দাও। অবস্থা এমন বেগতিক হইল যে, তাহারা যেন আল্লাহ তাআলার শাস্তি ও অস্তিত্বকে অস্বীকার করিয়া বসিল। তাহারা বলিল,
فَأَسْقِطَ عَلَيْنَا كِسَفًا مِّنَ السَّمَاءِ إِنْ كُنْتَ مِنَ الصَّادِقِينَ . "যদি তুমি সত্যবাদী হও তাহা হইলে আকাশের এক খণ্ড আমাদের উপর ফেলিয়া দাও" (২৬:১৮৭)।
এই চ্যালেঞ্জের সময়ও শু'আয়ব (আ) ইস্পাত কঠিন ধৈর্যের পরিচয় দিয়াছিলেন। তিনি শুধু উত্তরে বলিলেন:
قَالَ رَبِّي أَعْلَمُ بِمَا تَعْمَلُونَ "সে বলিল, আমার প্রতিপালক ভালো জানেন, তোমরা যাহা কর” (২৬ঃ ১৮৮)।
📄 আসহাবুল আয়কার উপর শাস্তি
তাহাদের সীমালংঘন ও বাড়াবাড়ির দরুন অবশেষে তাহাদের উপর আল্লাহ্র পক্ষ হইতে শাস্তি নামিয়া আসে। আল-কুরআনে এই শাস্তির বর্ণনায় বলা হইয়াছে :
فَكَذَّبُوهُ فَأَخَذَهُمْ عَذَابٌ يَوْمِ الظُّلَّةِ إِنَّهُ كَانَ عَذَابَ يَوْمٍ عَظِيمٍ . إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَةٌ وَمَا كَانَ أَكْثَرُهُمْ مُؤْمِنِينَ . وَإِنَّ رَبَّكَ لَهُوَ الْعَزِيزُ الرَّحِيمُ . "অতঃপর উহারা তাহাকে প্রত্যাখ্যান করিল, পরে উহাদেরকে মেঘাচ্ছন্ন দিবসের শাস্তি গ্রাস করিল। ইহা তো ছিল এক ভীষণ দিবসের শাস্তি। ইহাতে অবশ্যই রহিয়াছে নিদর্শন, কিন্তু উহাদের অধিকাংশই মুমিন নহে এবং তোমার প্রতিপালক, তিনি তো পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু" (২৬: ১৮৯-১৯১)।
"অতঃপর তাহাদিগের হইতে আমি প্রতিশোধ লইয়াছি" (১৫: ১৭৯)।
এই শাস্তির বর্ণনায় ইবনে আব্বাস (রা) বলিয়াছেন, আল্লাহ তাহাদের শাস্তির জন্য জাহান্নামের উত্তপ্ত বাতাস পাঠাইলেন। সাত দিন তাহারা এই গরমের মধ্যে অবস্থান করিল, যাহাতে তাহাদের বাড়িঘর, এমনকি কূপের পানি পর্যন্ত উত্তপ্ত হইয়া গেল। ইহা হইতে বাঁচিবার জন্য তাহারা ঘরবাড়ি হইতে বাহির হইয়া গেল। তখন আল্লাহ তাহাদের মাথার উপর সূর্য আনিয়া দিলেন, এমনকি তাহাদের মাথা টগবগ করিতে লাগিল। পায়ের নীচ হইতেও গরম উঠিতে লাগিল এবং পায়ের গোস্ত খসিয়া পড়িতে লাগিল। ইহার পর কালো মেঘের মত একটি ছায়া দেখা দিল। ইহা দেখিয়া তাহারা দ্রুত দৌড়াইয়া যখন এই ছায়ায় আসিল তখন মেঘ হইতে অগ্নিবৃষ্টি ঝরিতে লাগিল এবং তাহারা ধ্বংস হইয়া গেল। শুধু শু'আয়ব (আ) ও তাঁহার অনুসারী মু'মিনগণ আল্লাহর অনুগ্রহে রক্ষা পাইলেন। মালিক ইবন আনাস (র) বলিয়াছেন, এই মেঘাচ্ছন্ন দিবসের শাস্তি ছিল এই রকম যে, এই মেঘমালা তাহাদের জন্য আগুনে পরিণত হইয়াছিল।
টিকাঃ
দ্র. তাহযীব তারীখ দিমাশক, খ. ৬, পৃ. ৩২১; আল-কামিল, খ. ১, পৃ. ৮৯; কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ১৯১; দাওয়াতুর রুসুল, পৃ. ১৭৪
তাহযীব তারীখ দিমাশক, খ. ৬, পৃ. ৩২২