📄 ধ্বংসস্থানের নির্দেশ
মাদয়ান সম্প্রদায়ের ধ্বংস এবং অশুভ পরিণতির যে বর্ণনা কুরআনে রহিয়াছে, তাহার প্রেক্ষিতে ঐতিহাসিক নিদর্শনের অনুসন্ধান করা হইয়াছে। মুসলিম ভূগোলবেত্তাগণের সকলেই মাদ্য়ান-এর নাম উল্লেখ করিয়াছেন এবং তাহার নির্দিষ্ট স্থানও সনাক্ত করিয়াছেন। ভূতত্ত্ববিদ ও প্রত্নতত্ত্ববিদদের অনেকেই মাদ্য়ান সম্প্রদায়ের বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শন, যেমন শিলালিপি ইত্যাদি প্রত্যক্ষ করিয়াছেন। মিসরে ইসমাঈল পাশার রাজত্বকালে ১৮৮৭ খৃস্টাব্দে BARTAN নামের এক বৈজ্ঞানিক স্বর্ণের খনির অনুসন্ধান করিতে গিয়া বেশ কিছু নাবাতী ভাষার শিলালিপি উদ্ধার করিয়াছেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং পর্যালোচনার দ্বারা বুঝিতে পারা যায় যে, ইহা ঐ মাদ্য়ান যুগের শিলালিপি।
টিকাঃ
২খ., পৃ. ১৯-২০
📄 শু'আয়ব (আ) ও আসহাবুল আয়কা : আসহাবুল আয়কা-এর নামকরণ
আসহাব অর্থ অধিবাসী, বাসিন্দা। আয়কা শব্দের অর্থ সারিবদ্ধ বৃক্ষরাজি। এই সম্প্রদায়ের আবাসভূমি ছিল বৃক্ষরাজি, গাছপালা বা জংগল দ্বারা পরিবেষ্টিত। তাই এই এলাকার অধিবাসীদিগকে আল-কুরআনে 'আসহাবুল-আয়কা' বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। ঈসা (আ)-এর আগমনের এক শত বৎসর পূর্বে এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর আগমনের সাত শত বৎসর পূর্বেও এই জঙ্গল এলাকা অবশিষ্ট ছিল। একজন প্রখ্যাত গ্রীক ভূগোলবেত্তা মাদ্য়ান ও আকাবা উপসাগরের আশপাশের এলাকায় অনুসন্ধান করিয়া মত পেশ করিয়াছেন যে, এই অঞ্চলে একদা জঙ্গল ছিল বলিয়া মনে হয়। শু'আয়ব (আ)-এর বংশপরিচয় পেশ প্রসঙ্গে ইতোপূর্বে উল্লেখ করা হইয়াছে যে, কাতুরার গর্ভ হইতে ইবরাহীম (আ)-এর ছয় সন্তানের জন্ম হইয়াছিল। তাহারা হইল : (১) যামরান, (২) ইয়াকযান, (৩) মাদান, (৪) ইছবাক, (৫) মাদ্য়ান ও (৬) দুখ। ইয়াকযানের পুত্রের নাম ছিল দিদান। এই দিদানের বংশধরদিগকে আসহাবুল আয়কা বলা হয়। অন্যদিকে মাদয়ান-এর বংশধররা মাদয়ান সম্প্রদায় বলিয়া পরিচিত হইয়াছে। শু'আয়ব (আ) এই বংশে জন্মগ্রহণ করেন।
টিকাঃ
দ্র. লিসানুল আরাব, আল-মু'জামুল ওয়াসীত, আল-মিছবাহুল মুনীর
তাহযীব তারীখ দিমাশক, ৬খ, পৃ. ৩২১; আল-কামিল, ১খ., পৃ. ৮০; কাসাসুল আম্বিয়া, নাজ্জার, পৃ. ১৯১; মাআল আম্বিয়া ফি'ল-কুরআন, পৃ. ২০৩
বিস্তারিত বিবরণের জন্য দ্র. আরদুল কুরআন, ২খ., পৃ. ২৩
আম্বিয়ায়ে কুরআন, ২খ., পৃ. ৮২
📄 আসহাবুল আয়কার ভৌগোলিক অবস্থান
ইতোপূর্বে বলা হইয়াছে যে, লোহিত সাগর এবং আকাবা উপসাগরের সংযোগ স্থলে ছিল মাদয়ান সম্প্রদায়ের বসতি। আর দিদান সম্প্রদায় বা আসহাবুল আয়কাও এই মাদয়ান সম্প্রদায়ের নিকটবর্তী এলাকাতে বসবাস করিত। প্রাচীন যুগে ইয়ামন হইতে লোহিত সাগরের উপকূল দিয়া হিজায, মাদ্য়ান অতিক্রম করিয়া একটি বাণিজ্য পথ আকাবা উপসাগরের কিনারা দিয়া চলিয়া গিয়াছিল। 'তিহামা' এলাকা অতিক্রম করিয়া এই পথ আরও দূরে চলিয়া গিয়াছিল। প্রাচীনকালে ভারতবর্ষ, ইয়ামন, মিসর ও শামদেশের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপিত হইয়াছিল এই পথ ধরিয়া। এই বাণিজ্য পথের আশেপাশেই বিভিন্ন প্রাচীন সম্প্রদায় বসবাস করিত। 'ওয়াদিল কুরা' ছিল সামূদ জাতির আবাসস্থল। 'মাদয়ান' ছিল শু'আয়ব (আ)-এর সম্প্রদায়ের আবাসস্থল। 'সাদূম' ছিল লূত (আ)-এর সম্প্রদায়ের আবাসস্থল।
বাইবেলের ভাষ্যানুযায়ী দিদান সম্প্রদায় এই এলাকার আশপাশে বসবাস করিত। আল-কুরআনেও আছে যে, আসহাবুল আয়কা এই বিখ্যাত বাণিজ্য পথের পার্শ্বে বসবাস করিত। লূত (আ)-এর সম্প্রদায় যাহারা 'সাদৃম' এলাকাতে বসবাস করিত তাহাদের উল্লেখের পর আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
وَإِنْ كَانَ أَصْحَابُ الْأَيْكَةِ لظَالِمِينَ. فَانْتَقَمْنَا مِنْهُمْ وَإِنَّهُمَا لَبِامَامٍ مُّبِينٍ .
"আর আয়কাবাসীরাও তো ছিল সীমালংঘনকারী। সুতরাং আমি উহাদিগকে শাস্তি দিয়াছি, উহাদিগের উভয়ই ছিল প্রকাশ্য পথিপার্শ্বে অবস্থিত" (১৫ : ৭৮-৭৯)।
অতএব বুঝা যায় যে, ঐতিহাসিক বাণিজ্য পথের যেই বর্ণনা পেশ করা হইল এই পথের পার্শ্বেই ছিল 'আসহাবুল আয়কা'র আবাসস্থল।
টিকাঃ
আরদুল কুরআন, ২খ., পৃ. ২২, ২৩
📄 আসহাবুল আয়কার পেশা ও লেনদেন
ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথের পাশে বসবাস করিবার দরুন মাদয়ান সম্প্রদায়ের মতো তাহারাও ব্যবসায় ক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থানকে শক্তিশালী করিয়াছিল। মাদয়ান সম্প্রদায়ের মধ্যে যে বদঅভ্যাস ছিল তাহা তাহাদের মধ্যেও বিস্তার লাভ করিয়াছিল। মাপে ও ওযনে কম দেওয়া তাহাদের অভ্যাসে পরিণত হইয়াছিল। বিভিন্ন ধোঁকাবাজি ও অবৈধ লেনদেন ব্যাপকভাবে তাহাদের মধ্যে ছড়াইয়া পড়িয়াছিল। মাদ্যানের এবং আসহাবুল আয়কার মাঝে এই আচরণগত মিল থাকিবার কারণে বহু সংখ্যক মুফাসসির উভয় সম্প্রদায়কে একই সম্প্রদায় বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন।
টিকাঃ
মা'আল আম্বিয়া ফিল-কুরআন, পৃ. ২০৩; নাজ্জার-কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ১৯১; আম্বিয়ায়ে কুরআন, ২খ., পৃ. ৮৪