📄 শু'আয়ব (আ) মু'মিনগণকে দেশ হইতে বহিষ্কারের হুমকী
মাদ্য়ান সম্প্রদায়ের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা যখন প্রত্যক্ষ করিল যে, শু'আয়ব (আ)-এর দলবল দিন দিন বৃদ্ধি পাইতেছে, তখন তাহারা সন্ত্রাসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হইয়া বলিল, তোমাদিগকে পিতৃ-পুরুষের ধর্মে ফিরিয়া আসিতে হইবে, অন্যথায় তোমাদিগকে এই দেশ হইতে বহিষ্কার করিয়া দিব। আল-কুরআনের ভাষায় : قَالَ الْمَلَأُ الَّذِينَ اسْتَكْبَرُوا مِنْ قَوْمِهِ لِنُخْرِجَنَّكَ يَا شُعَيْبُ وَالَّذِينَ آمَنُوا مَعَكَ مِنْ قَرْيَتِنَا أَوْ لَتَعُودُنَّ فِي مِلَّتِنَا قَالَ أَوَلَوْ كُنَّا كَارِهِيْنَ .
"তাহার সম্প্রদায়ের দাম্ভিক প্রধানগণ বলিল, হে শু'আয়ব! আমরা তোমাকে ও তোমার সহিত যাহারা ঈমান আনিয়াছে তাহাদিগকে আমাদের জনপদ হইতে বহিষ্কৃত করিবই অথবা তোমাদিগকে আমাদের ধর্মাদর্শে ফিরিয়া আসিতেই হইবে। সে বলিল, যদিও আমরা উহা ঘৃণা করি তবুও" (৭:৮৮)?
দাম্ভিক প্রধানদের কঠোর ধমকে শু'আয়ব (আ) মোটেই বিচলিত হইলেন না, বরং তাহাদিগকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিতে থাকিলেন, আমার বন্ধু-বান্ধব এবং আপজন কি তোমাদের নিকট আল্লাহ্ চাইতে শক্তিশালী? তোমাদের জন্য আফসোস! তোমরা চরম বিভ্রান্তিতে লিপ্ত হইয়া পড়িয়াছ। আল-কুরআনের সূরা হূদে ইহার বিশদ বর্ণনা আসিয়াছে : قَالَ يَا قَوْمِ أَرَهْطِي أَعَزُّ عَلَيْكُمْ مِّنَ اللهِ وَاتَّخَذْتُمُوهُ وَرَاءَكُمْ ظَهْرِيَّاً ، إِنَّ رَبِّي بِمَا تَعْمَلُوْنَ مُحِيطٌ ، وَيَا قَوْمِ اعْمَلُوا عَلَى مَكَانَتِكُمْ إِنِّي عَامِلٌ سَوْفَ تَعْلَمُونَ . مَنْ يَأْتِيهِ عَذَابٌ يُخْزِيْهِ وَمَنْ هُوَ كَاذِبٌ وَارْتَقِبُوا إِنِّي مَعَكُمْ رَقِيبٌ .
"সে বলিল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমাদের নিকট কি আমার স্বজনবর্গ আল্লাহ অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী? তোমরা তাঁহাকে সম্পূর্ণ পশ্চাতে ফেলিয়া রাখিয়াছ। তোমরা যাহা কর আমার প্রতিপালক অবশ্যই তাহা পরিবেষ্টন করিয়া আছেন। হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা স্ব স্ব অবস্থায় কাজ করিতে থাক, আমিও আমার কাজ করিতেছি। তোমরা শীঘ্রই জানিতে পারিবে কাহার উপর আসিবে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি এবং কে মিথ্যাবাদী। সুতরাং তোমরা প্রতীক্ষা কর, আমিও তোমাদের সহিত প্রতীক্ষা করিতেছি" (১১ঃ ৯২-৯৩)।
দেশ হইতে বহিষ্কার করিবার হুমকিতে ও শু'আয়ব (আ) এতটুকুন দমিলেন না, বরং অকাট্য যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে সাব্যস্ত করিলেন যে, হক কখনও বাতিলের সহিত সন্ধি করিতে পারে না। হক আগমন করিয়াছে বিশ্বস্রষ্টা আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হইতে। তিনি সর্বশক্তিমান এবং সবকিছুর নিয়ন্ত্রক। কাজেই, আমার ও তোমাদের মধ্যে ফয়সালার জন্য একমাত্র আল্লাহ্র উপরই আমি ভরসা করিতেছি। তিনি বলিলেন:
قَدِ افْتَرَيْنَا عَلَى اللهِ كَذِبًا إِنْ عُدْنَا فِي مِلتِكُمْ بَعْدَ إِذْ نَجَّانَا اللهُ مِنْهَا وَمَا يَكُونُ لَنَا أَنْ نَعُودَ فِيهَا إِلَّا أَنْ يَشَاءَ اللهُ رَبُّنَا وَسِعَ رَبُّنَا كُلَّ شَيْئٍ عِلْمًا رَبَّنَا افْتَحْ بَيْنَنَا وَبَيْنَ قَوْمِنَا بِالْحَقِّ وَأَنْتَ خَيْرُ الْفَاتِحِينَ.
"তোমাদের ধর্মাদর্শ হইতে আল্লাহ আমাদিগকে উদ্ধার করিবার পর যদি আমরা উহাতে ফিরিয়া যাই তবে তো আমরা আল্লাহ্র প্রতি মিথ্যা আরোপ করিব। আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ ইচ্ছা না করিলে আর উহাতে ফিরিয়া যাওয়া আমাদের জন্য সমীচীন নয়। সব কিছুই আমাদের প্রতিপালকের জ্ঞানায়ত্ত; আমরা আল্লাহর প্রতি নির্ভর করি। হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের ও আমাদের সম্প্রদায়ের মধ্যে ন্যায্যভাবে মীমাংসা করিয়া দাও এবং তুমিই শ্রেষ্ঠ মীমাংসাকারী" (৭ঃ ৮৯)।
অত্র আয়াতে শু'আয়ব (আ)-এর অনিন্দ্য সুন্দর ব্যক্তব্য দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, নবীগণের অন্তরে আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত দুনিয়ার কোন ক্ষমতা অথবা শক্তির ভীতি বিন্দুমাত্র থাকে না। প্রতিপালকের উপর সর্বদা তাহাদের আস্থা অবিচল থাকে। এই সকল যুক্তির বিপক্ষে তাঁহার সম্প্রদায় কোন যৌক্তিক বক্তব্য উপস্থাপন করিতে সক্ষম হয় নাই। অতঃপর তাহারা নিজেদের মধ্যে শলাপরামর্শ করিল এবং শেষ পর্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ঘোষণা করিল, যদি তোমরা শু'আয়ব-এর অনুসরণ করিয়া চল তাহা হইলে পার্থিব ও ধর্মীয় উভয় দিক দিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হইবে। পার্থিব ক্ষতি এই যে, তোমাদের যেইভাবে খুশি অর্থ উপার্জনের সুযোগ থাকিবে না। আর ধর্মীয় ক্ষতি এই যে, তোমাদিগকে পূর্বপুরুষের ধর্ম পরিত্যাগ করিতে হইবে। তাই কোন অবস্থাতেই তোমরা তাঁহার অনুসরণ করিবে না। পবিত্র কুরআনের ভাষায়:
قَالَ الْمَلَأُ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ قَوْمِهِ لَئِنِ اتَّبَعْتُمْ شُعَيْبًا إِنَّكُمْ إِذًا لَخَاسِرُونَ .
"তাহার সম্প্রদায়ের অবিশ্বাসী প্রধানগণ বলিল, তোমরা যদি শু'আয়বকে অনুসরণ কর তবে তোমরা তো ক্ষতিগ্রস্ত হইবে" (৭ঃ ৯০)।
📄 মাদয়ান সম্প্রদায়ের ধ্বংস
কুফরী, শিরক, হকের বিরোধিতা, পাপাচার, চারিত্রিক অবক্ষয় এবং সীমালংঘনের দায়ে যখন মাদ্য়ান সম্প্রদায়ের পাপ ষোলকলায় পূর্ণ হইল তখন তাহাদের উপর বহুমুখী শান্তি নামিয়া আসিল। বাইবেলের বর্ণনা অনুসারে হযরত মূসা (আ) ১২ হাজারের এক বিশাল সৈন্যবাহিনী লইয়া তাহাদেরকে শাস্তি প্রদান করিতে আসিলেন। তাহাদের অগণিত অসংখ্য শিশু এবং বিবাহিত মহিলাকে হত্যা করা হইল। অঢেল গনীমতের সম্পদ লাভ হইল: ৭৫ হাজার বকরী, ৭২ হাজার গাভী, ৬১ হাজার গাধা এবং ৩২ হাজার এমন রমণী যাহারা কখনও পুরুষের সহিত মিলিত হয় নাই। বাইবেলের সরাসরি ভাষ্য হইল:
"And the booty the rest of the plunder that the people of the expedition has taken as plunder amounted to six hundred and seventy five thousand of the flock and seventy two thousand of the herd and sixty one thousand of asses, As for human souls from the women who had not known the act of lying with a male. all the souls were thirty two thousand" (Old Testament, Book of Numbers, 31 : 1-35)।
আল-কুরআনুল কারীমে মাদ্য়ান সম্প্রদায়ের শান্তি ও ধ্বংসের বর্ণনা আসিয়াছে: فَكَذَّبُوهُ فَأَخَذَتْهُمُ الرِّجْفَةُ فَأَصْبَحُوا فِي دَارِهِمْ جَاثِمِينَ .
"কিন্তু উহারা তাহার প্রতি মিথ্যা আরোপ করিল; অতঃপর উহারা ভূমিকম্প দ্বারা আক্রান্ত হইল; ফলে উহারা নিজ গৃহে নতজানু অবস্থায় শেষ হইয়া গেল" (২৯: ৩৭)। فَأَخَذَتْهُمُ الرِّجْفَةُ فَأَصْبَحُوا فِي دَارِهِمْ جَاثِمِينَ الَّذِينَ كَذَّبُوا شُعَيْبًا كَانْ لَّمْ يَغْنُوا فِيهَا الَّذِينَ كَذَّبُوا شُعَيْبًا كَانُوا هُمُ الْخَاسِرِينَ.
"অতঃপর তাহারা ভূমিকম্প দ্বারা আক্রান্ত হইল, ফলে তাহাদের প্রভাত হইল নিজগৃহে অধঃমুখে পতিত অবস্থায়। মনে হইল, যাহারা শু'আয়বকে প্রত্যাখ্যান করিয়াছিল তাহারা যেন কখনও সেখানে বসবাস করেই নাই। শু'আয়বকে যাহারা মিথ্যাবাদী বলিয়াছিল তাহারাই ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছিল” (৭: ৯১-৯২)।
সূরা হূদে একটু ভিন্নভাবে বর্ণনা আসিয়াছে। সেখানে বলা হইয়াছে: وَأَخَذَتِ الَّذِينَ ظَلَمُوا الصَّيْحَةُ فَأَصْبَحُوا فِي دَارِهِمْ جَاثِمِينَ . كَانْ لَّمْ يَعْنُوا فِيهَا أَلَا بُعْدًا لَمَدْيَنَ كَمَا بَعدَتْ ثَمُودُ .
"অতঃপর যাহারা সীমালংঘন করিয়াছিল মহানাদ তাহাদেরকে আঘাত করিল, ফলে উহারা নিজ নিজ গৃহে নতজানু অবস্থায় পড়িয়া রহিল, যেন তাহারা সেথায় কখনও বসবাস করে নাই। জানিয়া রাখ! ধ্বংসই ছিল মাদ্য়ানবাসীদের পরিণাম, যেভাবে ধ্বংস হইয়াছিল ছামূদ সম্প্রদায়" (১১: ৯৪-৯৫)।
মাদ্য়ান সম্প্রদায়ের ধ্বংস হইয়াছিল দুই ধরনের শাস্তির মাধ্যমে: (ক) প্রচণ্ড ভূমিকম্প সবকিছু তছনছ করিয়া দিয়াছিল; (খ) মহানাদ বা প্রচণ্ড আওয়াজে তাহারা মরিয়া গিয়াছিল।
📄 ধ্বংস হইতে মু'মিনদের পরিত্রাণ ও শু'আয়ব (আ)-এর অভিব্যাক্তি
অত্যাচার, সীমালংঘন এবং নবীকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করিবার অপরাধে শু'আয়ব (আ)-এর সম্প্রদায়ের উপর যেই দৃষ্টান্তমূলক চরম শাস্তি ও কঠিন আযাব নিপতিত হইয়াছিল তাহা হইতে আল্লাহ তা'আলা শু'আয়ব (আ) ও মুমিনদিগকে আপন করুণাবশে পরিত্রাণ দিয়াছিলেন। এই প্রসঙ্গে আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে:
وَلَمَّا جَاءَ أَمْرُنَا نَجِّيْنَا شُعَيْبًا وَالَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ بِرَحْمَةٍ مِّنَّا.
"যখন আমার নির্দেশ আসিল তখন আমি শু'আয়ব ও তাহার সঙ্গে যাহারা ঈমান আনিয়াছিল তাহাদেরকে আমার অনুগ্রহে রক্ষা করিয়াছিলাম" (১১ঃ ৯৪)।
মাদ্য়ানবাসীদের ধ্বংস ও চরম পরিণতির পর হযরত শু'আয়ব (আ) ঐ এলাকা পরিত্যাগ করিয়া বাহির হইয়া আসিতেছিলেন। এমতাবস্থায় তিনি সম্প্রদায়ের ধ্বংসাবশেষের দিকে আরেকবার তাকাইয়া স্বীয় অভিব্যক্তি প্রকাশ করিয়া বলিলেন :
فَتَوَلَّى عَنْهُمْ وَقَالَ يَا قَوْمِ لَقَدْ أَبْلَغْتُكُمْ رِسَالَاتِ رَبِّي وَنَصَحْتُ لَكُمْ فَكَيْفَ آسَى عَلَى قَوْمٍ كَافِرِينَ.
"সে তাহাদের হইতে মুখ ফিরাইল এবং বলিল, হে আমার সম্প্রদায়! আমার প্রতিপালকের বাণী আমি তো তোমাদেরকে পৌঁছাইয়া দিয়াছি এবং তোমাদেরকে উপদেশ দিয়াছি। সুতরাং আমি কাফির সম্প্রদায়ের জন্য কি করিয়া আক্ষেপ করি" (৭ঃ ৯৩)!
📄 ধ্বংসস্থানের নির্দেশ
মাদয়ান সম্প্রদায়ের ধ্বংস এবং অশুভ পরিণতির যে বর্ণনা কুরআনে রহিয়াছে, তাহার প্রেক্ষিতে ঐতিহাসিক নিদর্শনের অনুসন্ধান করা হইয়াছে। মুসলিম ভূগোলবেত্তাগণের সকলেই মাদ্য়ান-এর নাম উল্লেখ করিয়াছেন এবং তাহার নির্দিষ্ট স্থানও সনাক্ত করিয়াছেন। ভূতত্ত্ববিদ ও প্রত্নতত্ত্ববিদদের অনেকেই মাদ্য়ান সম্প্রদায়ের বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শন, যেমন শিলালিপি ইত্যাদি প্রত্যক্ষ করিয়াছেন। মিসরে ইসমাঈল পাশার রাজত্বকালে ১৮৮৭ খৃস্টাব্দে BARTAN নামের এক বৈজ্ঞানিক স্বর্ণের খনির অনুসন্ধান করিতে গিয়া বেশ কিছু নাবাতী ভাষার শিলালিপি উদ্ধার করিয়াছেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং পর্যালোচনার দ্বারা বুঝিতে পারা যায় যে, ইহা ঐ মাদ্য়ান যুগের শিলালিপি।
টিকাঃ
২খ., পৃ. ১৯-২০