📄 শু'আয়ব (আ)-এর দাওয়াত ও মাদয়ানবাসীদের प्रतिक्रिया
বিশ্ব-চরাচরে আম্বিয়া-রাসূলদের প্রেরণ করিবার মূল উদ্দেশ্য হইল মানুষের উপর হইতে মানুষের প্রভুত্ব খতম করিয়া একমাত্র সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তা'আলার প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠা করা এবং শিরক হইতে মানুষকে বিরত রাখা। এইজন্যই সকল নবী (আ)-র কণ্ঠে সর্বপ্রথম তাওহীদ বা একত্ববাদের আওয়াজ অনুরণিত হইয়াছে। শু'আয়ব (আ)-ও ইহার ব্যতিক্রম নন। তিনি ইবরাহীম (আ)-এর প্রতি নাযিলকৃত সহীফাসমূহ তিলাওয়াত ও অনুসরণ করিতেন।
📄 আকীদা সংশোধনের দাওয়াত
মাদয়ান সম্প্রদায় শিরকের মধ্য আকণ্ঠ নিমজ্জিত হইয়া পড়িয়াছিল। তাই শু'আয়ব (আ) সর্বপ্রথম এই বলিয়া উদাত্ত আহবান জানাইলেন : يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللهَ مَا لَكُمْ مِنْ إِلهِ غَيْرُهُ .
"হে আমার সম্প্রদায়! তোমারা আল্লাহর ইবাদত কর, তিনি ব্যতীত তোমাদের কোন ইলাহ নাই" (৭:৮৫-৮৪)। তিনি তাওহীদের দ্বারা দাওয়াত প্রদান শুরু করিয়াছেন। কেননা তাওহীদ হইল সঠিক আকীদার ভিত্তি। ইহা ব্যতীত ইসলাম নামক বিশাল অট্টালিকা নির্মাণ অসম্ভব (ফী যিলালিল কুরআন, ৩খ., পৃ. ১৩১৭; মুহাম্মাদ আহমাদ আল-আদাবী, দাওয়াতুর-রাসূল, পৃ. ১৫৩)। আখিরাতের প্রতি অকুণ্ঠ আস্থাই মূলত তাওহীদের ভিত্তিকে মযবুত করিয়া থাকে। তাই তিনি এই ঘোষণাও দিলেন: "হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহ্ ইবাদত কর এবং শেষ দিবসের প্রত্যাশা কর" (৩৬)।
📄 ব্যবসা-বাণিজ্য ও লেনদেনে পরিচ্ছন্নতার দাওয়াত
শু'আয়ব (আ) শুধুমাত্র আখেরাত সংশ্লিষ্ট বিষয়টি সংশোধনের দাওয়াত প্রদান করিয়া ক্ষান্ত হন নাই; বরং পার্থিক জীবনকেও সুন্দর করিবার প্রয়াস পাইয়াছিলেন। মাদ্য়ান সম্প্রদায় যেহেতু ঐতিহাসিকভাবে বণিক সম্প্রদায় হিসাবে বিখ্যাত ছিল এবং তাহাদের মধ্যে নানান ধরনের অবৈধ লেনদেন ও ওযনে কারচুপি করিবার মানসিকতা মাথাচাড়া দিয়া উঠিয়াছিল, তাই শু'আয়ব (আ) তাহাদিগকে বলিলেন (কুরআনের ভাষায়):
فَأَوْفُوا الْكَيْلَ وَالْمِيزَانَ وَلَا تَبْخَسُوا النَّاسَ أَشْيَاءَهُمْ .
"কাজেই পরিমাপ ও ওযন সঠিকভাবে কর এবং মানুষের প্রাপ্য বস্তুতে কম করিও না" (৭:৮৫)।
وَلا تَنْقُصُوا المِكْيَالَ وَالْمِيزَانَ إِنِّي أَرَاكُمْ بِخَيْرٍ وَإِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ عَذَابَ يَوْمٍ مُحِيطٌ ، وَيَا قَوْمِ أَوْفُوا المِكْيَالَ وَالْمِيزَانَ بِالقسط وَلَا تَبْخَسُوا النَّاسَ أَشْيَاءَهُمْ.
"তোমরা মাপে ও ওযনে কম করিও না। আমি তোমাদিগকে সমৃদ্ধিশালী দেখিতেছি। কিন্তু আমি তোমাদের জন্য এক সর্বগ্রাসী দিবসের শাস্তির আশংকা করিতেছি। হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা ন্যায়সঙ্গতভাবে মাপিও ও ওজন করিও, লোকদিগকে তাহাদের প্রাপ্ত বস্তু কম দিও না" (১১: ৮৪-৮৫)
এই গর্হিত আচরণ হইতে আল্লাহ তা'আলা তাহাদিগকে নিষেধ করিয়াছিলেন। কেননা ইহার মাধ্যমে লোকদের মধ্যে সামান্য গহির্ত আচরণও ছড়াইয়া পড়ে। এইভাবে যাহারা ওযনে কম প্রদান করিবে তাহাদিগের ধ্বংস অনিবার্য। আল্লাহ তা'আলার বাণী:
وَيْلٌ للمُطَفِّفِينَ الَّذِينَ إِذَا اكْتَالُوا عَلَى النَّاسِ يَسْتَوْفُونَ. وَإِذَا كَالُوهُمْ أَوْ وَزَنُوهُمْ يُخْسِرُونَ . أَلَا يَظُنُّ أُولَئِكَ أَنَّهُمْ مَبْعُوثُونَ .
"মন্দ পরিণাম তাহাদিগের জন্য যাহারা মাপে কম দেয়, যাহারা লোকদিগের নিকট হইতে মাপিয়া লইবার সময় পূর্ণ মাত্রায় গ্রহণ করে এবং যখন তাহাদিগের জন্য মাপিয়া বা ওযন করিয়া দেয় তখন কম দেয়। উহারা কি চিন্তা করে না যে, উহারা পুনরুত্থিত হইবে" (৮৩: ১-৪)?
মাপ ও ওযনের সংশোধনের মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে শু'আয়ব (আ)-এর উদ্দেশ্য ছিল যাবতীয় অবৈধ পন্থার লেনদেন ও ব্যবসা-বাণিজ্য হইতে ফিরাইয়া রাখা।
📄 পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি না করিবার দাওয়াত
সৃষ্টির সেরা হিসাবে মানুষ দুনিয়াতে শান্তি ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠা করিবে ইহাই স্বাভাবিক। কিন্তু শু'আয়ব (আ)-এর সম্প্রদায় বিভিন্নভাবে পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করিয়াছিল। তাহারা কয়েক ধরনের বিপর্যয় সৃষ্টি করিত : (ক) নবী-রাসূলদের শিক্ষাকে পরিহার করিয়া পাপাচারের পথ অবলম্বন করিয়াছিল; (খ) নিজেরা শু'আয়ব (আ)-এর অনুসরণ করে নাই এবং যাহারা তাঁহার অনুসরণ করিয়াছিল তাহাদিগকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করিয়াছিল; (গ) দলে দলে প্রকাশ্য যাতায়াতের রাস্তায় বসিয়া দস্যুবৃত্তিতে লিপ্ত হইয়াছিল এবং লোকদিগকে শু'আয়ব (আ)-এর আহ্বান হইতে ফিরাইয়া রাখিয়াছিল; (ঘ) শিরকে নিজেরা লিপ্ত হইয়াছিল এবং লোকদেরকে লিপ্ত হইতে বাধ্য করিয়াছিল। এই সকল অপকর্ম হইতে ফিরিয়া থাকিবার জন্য শু'আয়ব (আ)-এর দাওয়াত ছিল এইরূপ:
وَلا تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ بَعْدَ إِصْلَاحِهَا ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ .
"শান্তি প্রতিষ্ঠিত হইবার পর তোমরা দুনিয়াতে বিপর্যয় সৃষ্টি করিও না। ইহাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর, যদি তোমরা মুমিন হইয়া থাক" (৭:৮৫)।
"এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করিও না" (২৯:৩৬)।
وَلَا تَعْثَوْا فِي الْأَرْضِ مُفْسِدِينَ .
وَلَا تَعْثَوْا فِي الْأَرْضِ مُفْسِدِينَ . بَقِيَّةُ اللهِ خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ .
"এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করিও না। আল্লাহ অনুমোদিত যাহা বাকি থাকিবে তাহা তোমাদের জন্য উত্তম যদি'তোমরা মুমিন হইয়া থাক" (১১:৮৫-৮৬)।
وَلَا تَقْعُدُوا بِكُلِّ صِرَاطٍ تُوعَدُونَ وَتَصُدُّوْنَ عَنْ سَبِيلِ اللهِ مَنْ آمَنَ بِهِ وَتَبْغُونَهَا عِوَجًا وَاذْكُرُوا إِذْ أَنْتُمْ قَلِيلًا فَكَثْرَكُمْ وَانْظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُفْسِدِينَ.
"তাহার প্রতি যাহারা ঈমান আনিয়াছে তাহাদিগকে ভয় প্রদর্শনের জন্য তোমরা কোন পথে বসিয়া থাকিবে না, আল্লাহ্ পথে তাহাদিগকে বাধা দিবে না এবং উহাতে বক্রতা অনুসন্ধান করিবে না। স্মরণ কর, তোমরা যখন সংখ্যায় কম ছিলে, আল্লাহ তখন তোমাদের সংখ্যা বৃদ্ধি করিয়াছেন এবং বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পরিণাম কিরূপ ছিল তাহা লক্ষ্য কর" (৭:৮৬)। এই আয়াতের তাফসীরে ইব্ন কাছীর বলেন, মালামাল প্রদান করিতে অস্বীকৃতি জানাইলে তাহারা লোকদিগকে হত্যার হুমকি দিত। সুদ্দী বলিয়াছেন, তাহারা রাস্তায় বসিয়া জোরপূর্বক লোকদিগকে হত্যার হুমকি দিত। ইব্ন আব্বাস (রা) বলিয়াছেন, তাহারা রাস্তায় বসিয়া শু'আয়ব (আ)-এর নিকট আগামনকারী মুমিনদিগকে ভয়ভীতির মাধ্যমে ফিরাইয়া দিত। প্রথম ব্যাখ্যাটি অধিকতর স্পষ্ট। একই পদ্ধতিতে কুরাইশ জালিমগণও বিশ্বনবী (স)-এর অনুসারীদিগকে নির্যাতনের মাধ্যমে তাঁহার নিকট হইতে ফিরাইয়া রাখিবার ব্যর্থ প্রয়াস পাইয়াছিল। দীর্ঘ দাওয়াতের পর মাত্র কিছু সংখ্যক লোক শু'আয়ব (আ)-এর উপর ঈমান আনিয়াছিল। এই অবস্থা প্রত্যক্ষ করিয়া শু'আয়ব (আ) বলিয়াছিলেন:
وَإِنْ كَانَ طَائِفَةٌ مِنْكُمْ آمَنُوا بِالَّذِي أُرْسِلَتُ به وَطَائِفَةً لَمْ يُؤْمِنُوا فَاصْبِرُوا حَتَّى يَحْكُمَ اللَّهُ بَيْنَنَا وَهُوَ خَيْرٌ الحاكمين ..
"আমি যাহা লইয়া প্রেরিত হইয়াছি তাহাতে যদি তোমাদের কোন দল ঈমান আনে এবং কোন দল ঈমান না আনে তবে ধৈর্য ধারণ কর, যতক্ষণ না আল্লাহ আমাদের মধ্যে মীমাংসা করিয়া দেন, আর তিনিই শ্রেষ্ঠ মীমাংসাকারী" (৭:৮৭)।