📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আসহাবুল আয়কা ও আসহাবে মাদয়ান একই সম্প্রদায়

📄 আসহাবুল আয়কা ও আসহাবে মাদয়ান একই সম্প্রদায়


ইতোপূর্বে 'আসহাবু মাদয়ান' ও 'আসহাবুল আয়কা'কে দুইটি ভিন্ন সম্প্রদায় বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। তবে অধিকাংশ ইতিহাসবেত্তা ও গবেষকদের মতে উভয় সম্প্রদায় এক ও অভিন্ন।
'আসহাবু মাদয়ান' এবং 'আসহাবুল আয়কা' প্রকৃত বিচারে একই সম্প্রদায়ের দুইটি শাখা। এই সম্পর্কে তাফহীমুল কুরআনে বলা হইয়াছে : "পক্ষান্তরে কোন কোন তাফসীরকার উভয়কে একই জাতি মনে করেন। তাহাদের যুক্তি এই যে, সূরা হুদ ও সূরা আ'রাফ-এ মাদয়ানবাসীদের যে দোষ ও অবৈধ কার্যকলাপের উল্লেখ করা হইয়াছে, এখানে আয়কাবাসীদের সম্পর্কেও ঠিক তাহাই উল্লেখ করা হইয়াছে। হযরত শু'আয়ব (আ)-এর দাওয়াত ও নসীহত উভয় স্থানেই সম্পূর্ণ একরূপ, আর পরিণতির দিক দিয়াও তাহাদের মধ্যে কোনরূপ পার্থক্য দেখা যায় না। গবেষণায় জানা যায় যে, তাহারা একই গোত্রের দুইটি শাখা। হযরত ইবরাহীম (আ)-এর স্ত্রী কিংবা দাসী কাতুরার গর্ভজাত সন্তান আরব ও ইসরাঈলের ইতিহাসে বনু কাতুরা নামে খ্যাত। তাহাদেরই একটি গোত্র ইবরাহীম (আ)-এর পুত্র 'মাদয়ান'-এর দিক দিয়া 'মাদায়ানী' কিংবা মাদয়ানবাসী নামে পরিচিত হয়। তাহারা উত্তর হিজায হইতে ফিলিস্তীনের দক্ষিণ পর্যন্ত এবং সেখান হইতে সীনাই উপদ্বীপের শেষ সীমা পর্যন্ত লোহিত সাগর ও আকাবা উপসাগরের উপকূল এলাকায় ছড়াইয়া পড়িয়াছিল। 'মাদয়ান' নামক শহর ছিল তাহাদের কেন্দ্রস্থল। ঐতিহাসিক আবুল ফিদার বর্ণনামতে উহা ছিল আকাবা উপসাগরের পশ্চিম তীর আয়লা হইতে পাঁচ দিনের দূরত্বে অবস্থিত। আর বনূ কাতুরা, যাহাদের বনূ দিদান (Dedanites) শাখাটি অধিক প্রসিদ্ধ হইয়াছিল, উত্তর আরবে তায়মা, তাবুক ও আল-উলার মাঝখানে বসতি স্থাপন করিয়াছিল। ইহাদের কেন্দ্রস্থল ছিল তাবুক" (তাফহীমুল কুরআন, অনু. আবদুর রহীম, ১০খ, ১৩১)।
অতএব দেখা যাইতেছে যে, ভৌগোলিক অবস্থানের দিক দিয়াও উভয় সম্প্রদায় কাছাকাছি বসবাস করিত। তাই প্রমাণিত হয় যে, উভয় সম্প্রদায় একটি বড় গোত্রের দুইটি শাখা।
আল্লামা ইব্‌ন কাছীর জোরালো যুক্তির মাধ্যমে প্রমাণ করিয়াছেন যে, 'আসহাবু মাদয়ান' ও 'আসহাবুল আয়কা' একই সম্প্রদায়। ইহার বিপক্ষে কাতাদা (র) হইতে যে বর্ণনা পাওয়া যায়, তিনি উহার অসারতা প্রমাণ করিয়াছেন এবং বলিয়াছেন, এই বর্ণনা ঠিক নহে এবং ইহা গ্রহণযোগ্যও নহে। ইহার পর তিনি আয়কার বর্ণনায় বলিয়াছেন, আয়কা হইল ঘন বৃক্ষ শোভিত জঙ্গল। আল্লাহ যখন তাহাদিগকে শাস্তি প্রদান করিতে ইচ্ছা করিলেন তখন আবহাওয়া প্রচণ্ড উত্তপ্ত করিয়া দিলেন। গরম সহ্য করিতে না পারিয়া তাহারা ঘরবাড়ি হইতে খোলা ময়দানে বাহির হইয়া আসিল। তখন আল্লাহ তাহাদের উপর মেঘমালা প্রেরণ করিলেন। ছায়া লাভের জন্য তাহারা মেঘমালার নিম্নে অবস্থান গ্রহণ করিলে তাহাদের উপর অগ্নিবৃষ্টি বর্ষিত হইল (দ্র. আল-বিদায়া, ১খ, ১৭৭; আল-কামিল, ১খ, ৮৯)।
'আসহাবু মাদয়ান' হযরত ইবরাহীম (আ)-এর স্ত্রী কাতুরার গর্ভজাত সন্তান 'মাদয়ান'-এর বংশধর। আর 'আসহাবুল আয়কা' কাতুরার গর্ভজাত সন্তান 'য়াকযান'-এর বংশধর। তাহা হইলে বুঝা যাইতেছে যে, উভয় সম্প্রদায় মূলত একই বংশের দুইটি শাখা।
উভয় সম্প্রদায়ের শাস্তির ক্ষেত্রে একই ধরনের বর্ণনা পরিলক্ষিত হয়। ইবন কাছীর (র) বলিয়াছেন যে, উভয় সম্প্রদায়ের সাজা একই রকম হইয়াছিল। এই সম্পর্কে আল-কুরআনে তিনিটি শব্দ আসিয়াছে- الرَّجْفَةُ (ভূমিকম্প), الصَّيْحَةُ (মহানাদ) এবং عَذَابَ يَوْمِ الظُّلَّةِ (মেঘচ্ছন্ন দিবসের শাস্তি)। আল্লাহ বলিয়াছেন, فَأَخَذَهُمُ الرَّجْفَةُ "অতঃপর তাহারা ভূমিকম্প দ্বারা আক্রান্ত হইল" (সূরা আ'রাফ)।
وأَخَذَتِ الَّذِينَ ظَلَمُوا الصَّيْحَةُ

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 শু'আয়ব (আ)-এর দাওয়াত ও মাদয়ানবাসীদের प्रतिक्रिया

📄 শু'আয়ব (আ)-এর দাওয়াত ও মাদয়ানবাসীদের प्रतिक्रिया


বিশ্ব-চরাচরে আম্বিয়া-রাসূলদের প্রেরণ করিবার মূল উদ্দেশ্য হইল মানুষের উপর হইতে মানুষের প্রভুত্ব খতম করিয়া একমাত্র সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তা'আলার প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠা করা এবং শিরক হইতে মানুষকে বিরত রাখা। এইজন্যই সকল নবী (আ)-র কণ্ঠে সর্বপ্রথম তাওহীদ বা একত্ববাদের আওয়াজ অনুরণিত হইয়াছে। শু'আয়ব (আ)-ও ইহার ব্যতিক্রম নন। তিনি ইবরাহীম (আ)-এর প্রতি নাযিলকৃত সহীফাসমূহ তিলাওয়াত ও অনুসরণ করিতেন।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আকীদা সংশোধনের দাওয়াত

📄 আকীদা সংশোধনের দাওয়াত


মাদয়ান সম্প্রদায় শিরকের মধ্য আকণ্ঠ নিমজ্জিত হইয়া পড়িয়াছিল। তাই শু'আয়ব (আ) সর্বপ্রথম এই বলিয়া উদাত্ত আহবান জানাইলেন : يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللهَ مَا لَكُمْ مِنْ إِلهِ غَيْرُهُ .
"হে আমার সম্প্রদায়! তোমারা আল্লাহর ইবাদত কর, তিনি ব্যতীত তোমাদের কোন ইলাহ নাই" (৭:৮৫-৮৪)। তিনি তাওহীদের দ্বারা দাওয়াত প্রদান শুরু করিয়াছেন। কেননা তাওহীদ হইল সঠিক আকীদার ভিত্তি। ইহা ব্যতীত ইসলাম নামক বিশাল অট্টালিকা নির্মাণ অসম্ভব (ফী যিলালিল কুরআন, ৩খ., পৃ. ১৩১৭; মুহাম্মাদ আহমাদ আল-আদাবী, দাওয়াতুর-রাসূল, পৃ. ১৫৩)। আখিরাতের প্রতি অকুণ্ঠ আস্থাই মূলত তাওহীদের ভিত্তিকে মযবুত করিয়া থাকে। তাই তিনি এই ঘোষণাও দিলেন: "হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহ্ ইবাদত কর এবং শেষ দিবসের প্রত্যাশা কর" (৩৬)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ব্যবসা-বাণিজ্য ও লেনদেনে পরিচ্ছন্নতার দাওয়াত

📄 ব্যবসা-বাণিজ্য ও লেনদেনে পরিচ্ছন্নতার দাওয়াত


শু'আয়ব (আ) শুধুমাত্র আখেরাত সংশ্লিষ্ট বিষয়টি সংশোধনের দাওয়াত প্রদান করিয়া ক্ষান্ত হন নাই; বরং পার্থিক জীবনকেও সুন্দর করিবার প্রয়াস পাইয়াছিলেন। মাদ্‌য়ান সম্প্রদায় যেহেতু ঐতিহাসিকভাবে বণিক সম্প্রদায় হিসাবে বিখ্যাত ছিল এবং তাহাদের মধ্যে নানান ধরনের অবৈধ লেনদেন ও ওযনে কারচুপি করিবার মানসিকতা মাথাচাড়া দিয়া উঠিয়াছিল, তাই শু'আয়ব (আ) তাহাদিগকে বলিলেন (কুরআনের ভাষায়):
فَأَوْفُوا الْكَيْلَ وَالْمِيزَانَ وَلَا تَبْخَسُوا النَّاسَ أَشْيَاءَهُمْ .
"কাজেই পরিমাপ ও ওযন সঠিকভাবে কর এবং মানুষের প্রাপ্য বস্তুতে কম করিও না" (৭:৮৫)।
وَلا تَنْقُصُوا المِكْيَالَ وَالْمِيزَانَ إِنِّي أَرَاكُمْ بِخَيْرٍ وَإِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ عَذَابَ يَوْمٍ مُحِيطٌ ، وَيَا قَوْمِ أَوْفُوا المِكْيَالَ وَالْمِيزَانَ بِالقسط وَلَا تَبْخَسُوا النَّاسَ أَشْيَاءَهُمْ.
"তোমরা মাপে ও ওযনে কম করিও না। আমি তোমাদিগকে সমৃদ্ধিশালী দেখিতেছি। কিন্তু আমি তোমাদের জন্য এক সর্বগ্রাসী দিবসের শাস্তির আশংকা করিতেছি। হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা ন্যায়সঙ্গতভাবে মাপিও ও ওজন করিও, লোকদিগকে তাহাদের প্রাপ্ত বস্তু কম দিও না" (১১: ৮৪-৮৫)
এই গর্হিত আচরণ হইতে আল্লাহ তা'আলা তাহাদিগকে নিষেধ করিয়াছিলেন। কেননা ইহার মাধ্যমে লোকদের মধ্যে সামান্য গহির্ত আচরণও ছড়াইয়া পড়ে। এইভাবে যাহারা ওযনে কম প্রদান করিবে তাহাদিগের ধ্বংস অনিবার্য। আল্লাহ তা'আলার বাণী:
وَيْلٌ للمُطَفِّفِينَ الَّذِينَ إِذَا اكْتَالُوا عَلَى النَّاسِ يَسْتَوْفُونَ. وَإِذَا كَالُوهُمْ أَوْ وَزَنُوهُمْ يُخْسِرُونَ . أَلَا يَظُنُّ أُولَئِكَ أَنَّهُمْ مَبْعُوثُونَ .
"মন্দ পরিণাম তাহাদিগের জন্য যাহারা মাপে কম দেয়, যাহারা লোকদিগের নিকট হইতে মাপিয়া লইবার সময় পূর্ণ মাত্রায় গ্রহণ করে এবং যখন তাহাদিগের জন্য মাপিয়া বা ওযন করিয়া দেয় তখন কম দেয়। উহারা কি চিন্তা করে না যে, উহারা পুনরুত্থিত হইবে" (৮৩: ১-৪)?
মাপ ও ওযনের সংশোধনের মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে শু'আয়ব (আ)-এর উদ্দেশ্য ছিল যাবতীয় অবৈধ পন্থার লেনদেন ও ব্যবসা-বাণিজ্য হইতে ফিরাইয়া রাখা।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00