📄 মাদয়ান সম্প্রদায়ের পেশা
ইতোপূর্বে বর্ণিত মাদয়ান সম্প্রদায়ের ভৌগোলিক অবস্থান হইতে বুঝা যায় যে, হিজাযের উত্তর-পশ্চিম অংশে আফ্রিকা এবং আরব বাণিজ্য কাফেলাসমূহের যাতায়াতের সংযোগস্থলে এই সম্প্রদায় বসবাস করিত। তাহাদের মধ্য হইতে একটি বড় দল ব্যবসায়ী ছিল। তাই ইতিহাসে ইহাদিগকে ব্যবসায়ী সম্প্রদায় হিসাবে উল্লেখ করা হইয়াছে। উহারাই ইতিহাসের সর্বপ্রথম জাতি যাহারা ব্যবসায়ী হিসাবে পরিচয় লাভ করিয়াছে। তবে উহাদের মধ্যে বিভিন্ন ব্যবসায়িক দুর্নীতি ও অনুপ্রতারণা প্রবেশ করিয়াছিল। তাহারা যখন মানুষকে ওযন করিয়া দিত তখন মাপে কম দিত; কিন্তু নিজেরা যখন ওযন করিয়া লইত তখন মাপে বেশি লইত। তাহা ছাড়া তাহারা সূদ ভিত্তিক নিষিদ্ধ লেনদেনও করিত। অন্য যে পেশা তাহারা গ্রহণ করিয়াছিল তাহা হইল পশুপালন। এই সম্প্রদায়ের অনেক মানুষ পশুপালন করিয়া জীবিকা নির্বাহ করিত। শু'আয়ব (আ)-ও এই পেশা অবলম্বন করিয়াছিলেন। হযরত মূসা (আ) যখন অনিচ্ছা সত্ত্বেও এক মিসরীকে হত্যা করিয়া মাদ্য়ানে চলিয়া আসেন, তখন পশুগুলিকে পানি পান করানো উপলক্ষে শু'আয়ব কন্যাদ্বয়ের সাথে তাঁহার সাক্ষাত হয়। সূরা কাসাসের ২৩ নং আয়াতে ইহার বর্ণনা রহিয়াছে। হযরত শু'আয়ব (আ) কয়েক বৎসর তাঁহার পশুগুলিকে প্রতিপালনের শর্তে স্বীয় কন্যাকে মূসা (আ)-এর নিকট বিবাহ দিয়াছিলেন।
📄 মাদয়ান সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও চারিত্রিক অবস্থা
ধর্মীয় দিক হইতে মাদয়ান সম্প্রদায় চরম বিভ্রান্তিতে লিপ্ত হইয়া পড়িয়াছিল। তাহারা আল্লাহর সাথে শিরক করিত এবং বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজা করিত। ইহার প্রমাণ হিসাবে বলা যায়, তাহাদের মধ্য 'শিরক' ছিল বলিয়াই শু'আয়ব (আ) সর্বপ্রথম তাহাদিগকে এক আল্লাহ্ ইবাদতের প্রতি আহবান জানাইয়াছেন: يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللهَ مَا لَكُمْ مِنْ إِلهِ غَيْرُهُ .
"হে আমার সম্প্রদায়! তোমারা আল্লাহর ইবাদত কর, তিনি ব্যতীত তোমাদের কোন ইলাহ নাই" (৭:৮৫)। Old Testament-এর Book of Numbers (22:41; 25: 3)-এর বক্তব্য অনুযায়ী তাহাদের সবচাইতে বড় দেবতার নাম ছিল বা'ল )بعل(। তাহারা সকলে এই মূর্তির পূজা করিত, মূর্তির সম্মানার্থে সুগন্ধি পেশ করিত, এই দেবতার নামে কুরবানীও করিত। তাওরাতে তিনভাবে এই দেবতার নাম আসিয়াছেঃ (১) বা'ল (Book of Number, 22:41); (২) বা'ল ফায়ূর (Book of Number, 25: 2); (৩) বা'ল বারিস (Book of Number, 9:4)
চারিত্রিক অবক্ষয় এবং অধঃপতনের দিক হইতেও তাহারা ধ্বংসের প্রান্তসীমায় পৌছিয়াছিল। ব্যভিচারের মত দুষ্টক্ষত সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করিয়াছিল (আম্বিয়ায়ে কুরআন, ২খ., পৃ. ৬৯)। চারিত্রিক অবক্ষয়ের দরুন সমাজে এক মহাবিপর্যয় নামিয়া আসিয়াছিল। সমাজের কোথাও এতটুকু শান্তি ছিল না। এই বিপর্যয় ও ধ্বংসের হাত হইতে রক্ষার জন্য শু'আয়ব (আ)-এর আহবান ছিল:
وَلا تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ بَعْدَ اصلاحها .
"শান্তি স্থাপিত হইবার পর পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করিও না" (৭:৮৫)।
মোটকথা, চরম চারিত্রিক অবক্ষয় মাদয়ান সম্প্রদায়কে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়াইয়া রাখিয়াছিল। এই সকল বদঅভ্যাস এবং অবক্ষয়কে তিনভাবে ভাগ করা যাইতে পারে: (ক) শিরক ভিত্তিক আচার-আচরণ; (খ) মাপে কম দেওয়া ও বেশি নেওয়া এবং (গ) লেনদেন, ভেজাল ও গর্হিত সন্ত্রাসী তৎপরতা (হিফজুর রহমান, কাসাসুল কুরআন, ১খ., পৃ. ৩৪৬)।
📄 আসহাবুল আয়কা ও আসহাবে মাদয়ান একই সম্প্রদায়
ইতোপূর্বে 'আসহাবু মাদয়ান' ও 'আসহাবুল আয়কা'কে দুইটি ভিন্ন সম্প্রদায় বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। তবে অধিকাংশ ইতিহাসবেত্তা ও গবেষকদের মতে উভয় সম্প্রদায় এক ও অভিন্ন।
'আসহাবু মাদয়ান' এবং 'আসহাবুল আয়কা' প্রকৃত বিচারে একই সম্প্রদায়ের দুইটি শাখা। এই সম্পর্কে তাফহীমুল কুরআনে বলা হইয়াছে : "পক্ষান্তরে কোন কোন তাফসীরকার উভয়কে একই জাতি মনে করেন। তাহাদের যুক্তি এই যে, সূরা হুদ ও সূরা আ'রাফ-এ মাদয়ানবাসীদের যে দোষ ও অবৈধ কার্যকলাপের উল্লেখ করা হইয়াছে, এখানে আয়কাবাসীদের সম্পর্কেও ঠিক তাহাই উল্লেখ করা হইয়াছে। হযরত শু'আয়ব (আ)-এর দাওয়াত ও নসীহত উভয় স্থানেই সম্পূর্ণ একরূপ, আর পরিণতির দিক দিয়াও তাহাদের মধ্যে কোনরূপ পার্থক্য দেখা যায় না। গবেষণায় জানা যায় যে, তাহারা একই গোত্রের দুইটি শাখা। হযরত ইবরাহীম (আ)-এর স্ত্রী কিংবা দাসী কাতুরার গর্ভজাত সন্তান আরব ও ইসরাঈলের ইতিহাসে বনু কাতুরা নামে খ্যাত। তাহাদেরই একটি গোত্র ইবরাহীম (আ)-এর পুত্র 'মাদয়ান'-এর দিক দিয়া 'মাদায়ানী' কিংবা মাদয়ানবাসী নামে পরিচিত হয়। তাহারা উত্তর হিজায হইতে ফিলিস্তীনের দক্ষিণ পর্যন্ত এবং সেখান হইতে সীনাই উপদ্বীপের শেষ সীমা পর্যন্ত লোহিত সাগর ও আকাবা উপসাগরের উপকূল এলাকায় ছড়াইয়া পড়িয়াছিল। 'মাদয়ান' নামক শহর ছিল তাহাদের কেন্দ্রস্থল। ঐতিহাসিক আবুল ফিদার বর্ণনামতে উহা ছিল আকাবা উপসাগরের পশ্চিম তীর আয়লা হইতে পাঁচ দিনের দূরত্বে অবস্থিত। আর বনূ কাতুরা, যাহাদের বনূ দিদান (Dedanites) শাখাটি অধিক প্রসিদ্ধ হইয়াছিল, উত্তর আরবে তায়মা, তাবুক ও আল-উলার মাঝখানে বসতি স্থাপন করিয়াছিল। ইহাদের কেন্দ্রস্থল ছিল তাবুক" (তাফহীমুল কুরআন, অনু. আবদুর রহীম, ১০খ, ১৩১)।
অতএব দেখা যাইতেছে যে, ভৌগোলিক অবস্থানের দিক দিয়াও উভয় সম্প্রদায় কাছাকাছি বসবাস করিত। তাই প্রমাণিত হয় যে, উভয় সম্প্রদায় একটি বড় গোত্রের দুইটি শাখা।
আল্লামা ইব্ন কাছীর জোরালো যুক্তির মাধ্যমে প্রমাণ করিয়াছেন যে, 'আসহাবু মাদয়ান' ও 'আসহাবুল আয়কা' একই সম্প্রদায়। ইহার বিপক্ষে কাতাদা (র) হইতে যে বর্ণনা পাওয়া যায়, তিনি উহার অসারতা প্রমাণ করিয়াছেন এবং বলিয়াছেন, এই বর্ণনা ঠিক নহে এবং ইহা গ্রহণযোগ্যও নহে। ইহার পর তিনি আয়কার বর্ণনায় বলিয়াছেন, আয়কা হইল ঘন বৃক্ষ শোভিত জঙ্গল। আল্লাহ যখন তাহাদিগকে শাস্তি প্রদান করিতে ইচ্ছা করিলেন তখন আবহাওয়া প্রচণ্ড উত্তপ্ত করিয়া দিলেন। গরম সহ্য করিতে না পারিয়া তাহারা ঘরবাড়ি হইতে খোলা ময়দানে বাহির হইয়া আসিল। তখন আল্লাহ তাহাদের উপর মেঘমালা প্রেরণ করিলেন। ছায়া লাভের জন্য তাহারা মেঘমালার নিম্নে অবস্থান গ্রহণ করিলে তাহাদের উপর অগ্নিবৃষ্টি বর্ষিত হইল (দ্র. আল-বিদায়া, ১খ, ১৭৭; আল-কামিল, ১খ, ৮৯)।
'আসহাবু মাদয়ান' হযরত ইবরাহীম (আ)-এর স্ত্রী কাতুরার গর্ভজাত সন্তান 'মাদয়ান'-এর বংশধর। আর 'আসহাবুল আয়কা' কাতুরার গর্ভজাত সন্তান 'য়াকযান'-এর বংশধর। তাহা হইলে বুঝা যাইতেছে যে, উভয় সম্প্রদায় মূলত একই বংশের দুইটি শাখা।
উভয় সম্প্রদায়ের শাস্তির ক্ষেত্রে একই ধরনের বর্ণনা পরিলক্ষিত হয়। ইবন কাছীর (র) বলিয়াছেন যে, উভয় সম্প্রদায়ের সাজা একই রকম হইয়াছিল। এই সম্পর্কে আল-কুরআনে তিনিটি শব্দ আসিয়াছে- الرَّجْفَةُ (ভূমিকম্প), الصَّيْحَةُ (মহানাদ) এবং عَذَابَ يَوْمِ الظُّلَّةِ (মেঘচ্ছন্ন দিবসের শাস্তি)। আল্লাহ বলিয়াছেন, فَأَخَذَهُمُ الرَّجْفَةُ "অতঃপর তাহারা ভূমিকম্প দ্বারা আক্রান্ত হইল" (সূরা আ'রাফ)।
وأَخَذَتِ الَّذِينَ ظَلَمُوا الصَّيْحَةُ
📄 শু'আয়ব (আ)-এর দাওয়াত ও মাদয়ানবাসীদের प्रतिक्रिया
বিশ্ব-চরাচরে আম্বিয়া-রাসূলদের প্রেরণ করিবার মূল উদ্দেশ্য হইল মানুষের উপর হইতে মানুষের প্রভুত্ব খতম করিয়া একমাত্র সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তা'আলার প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠা করা এবং শিরক হইতে মানুষকে বিরত রাখা। এইজন্যই সকল নবী (আ)-র কণ্ঠে সর্বপ্রথম তাওহীদ বা একত্ববাদের আওয়াজ অনুরণিত হইয়াছে। শু'আয়ব (আ)-ও ইহার ব্যতিক্রম নন। তিনি ইবরাহীম (আ)-এর প্রতি নাযিলকৃত সহীফাসমূহ তিলাওয়াত ও অনুসরণ করিতেন।