📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মাদয়ান সম্প্রদায়ের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

📄 মাদয়ান সম্প্রদায়ের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস


Old Testament-এর Book of Genesis-এর বিভিন্ন অধ্যায়ের বর্ণনা মোতাবেক খৃষ্টপূর্ব বিংশ শতক পর্যন্ত 'মাদ্‌য়ান' এলাকার ইতিহাস জানা যায়। যে বাণিজ্য কাফেলা হযরত ইউসুফ (আ)-কে কূপ হইতে উদ্ধার করিয়া 'কানআন' হইতে মিসরে লইয়া যায় এই বাণিজ্য কাফেলা ছিল মাদ্‌য়ান অধিবাসী ইসমাঈলী আরব। কুরআনুল কারীমের সূরা ইউসুফে ইহার বর্ণনা রাহিয়াছে: وَجَاءَتْ سَيَّارَةً فَأَرْسَلُوا وَارِدَهُمْ فَأَدْلى دَلوَهُ قَالَ يَا بُشرى هذا غُلَامٌ وَأَسَرُّوهُ بِضَاعَةَ وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِمَا يَعْمَلُونَ. وَشَرَوْهُ بِثَمَن بَخْسِدَ رَاهِمَ مَعْدُودَةٍ وَكَانُوا فِيهِ مِنَ الزَّاهِدِينَ. "এক যাত্রীদল আসিল, উহারা উহাদের পানি সংগ্রাহককে প্রেরণ করিল। সে তাহার পানির ডোল নামাইয়া দিল। সে বলিয়া উঠিল, কী সুখবর! এই যে এক কিশোর! অতঃপর উহারা তাহাকে পণ্যরূপে লুকাইয়া রাখিল। উহারা যাহা করিতেছিল সে বিষয়ে আল্লাহ সবিশেষ অবহিত ছিলেন। এবং উহারা তাহাকে বিক্রয় করিল স্বল্প মূল্যে, মাত্র কয়েক দিরহামের বিনিময়ে; উহারা ছিল তাহার ব্যাপারে নির্লোভ"। খৃষ্টপূর্ব সপ্তদশ শতাব্দী হইতে ষষ্ঠদশ শতাব্দীতে মূসা (আ)-এর জীবনেও এই মাদয়ান-এর উল্লেখ রহিয়াছে। মূসা (আ) এই এলাকায় আশ্রয় লইয়াছিলেন। The New Encyclopaedia Britannica-এর ভাষায়: with whom Moses look refuge after he killed an Egyptian and whose (Hobab) doughter Moses married", আল-কুরআনেও এই প্রসঙ্গে বর্ণনা রহিয়াছে: وَلَمَّا وَرَدَ مَاءَ مَدينَ وَجَدَ عَلَيْهِ أُمَّةٌ مِّنَ النَّاسِ يَسْقُونَ وَوَجَدَ مِنْ دُونِهِمُ امْرَأَتَيْنِ تَدُودَانِ قَالَ مَا خَطِبُكُمَا قَالَتَا لَا نَسْقِي حَتَّى يُصْدِرَ الرِّعَاءُ وَأَبُونَا شَيْخٌ كَبِيرٌ . "যখন সে মাদয়ানের কূপের নিকট পৌছিল, দেখিল, একদল লোক তাহাদিগের জানোয়ারগুলিকে পানি পান করাইতেছে এবং উহাদিগের পশ্চাতে দুইজন নারী তাহাদিগের পশুগুলিকে আগলাইতেছে। মূসা বলিল, তোমাদিগের কি ব্যাপার? উহারা বলিল, আমরা আমাদিগের পশুগুলিকে পানি পান করাইতে পারি না যতক্ষণ রাখালেরা তাহাদের পশুগুলিকে লইয়া সরিয়া না যায়।"

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মাদয়ান সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা

📄 মাদয়ান সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা


এই সম্প্রদায় বহু পুরাতন সভ্যতার অধিকারী। সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তাহারা বিভিন্ন নিয়মের অনুসরণ করিত। প্রত্যেক গোত্রের একজন গোত্রপ্রধান থাকিতেন, অন্যরা তাহার নির্দেশ মানিয়া চলিত। এই গোত্রপ্রধানকে 'শায়খ' অথবা 'বাদশাহ' বলা হইত। তাহাদের মধ্য বিভিন্ন ধরনের সামাজিক রেওয়াজ এবং অনুষ্ঠানাদির প্রচলন ছিল। নিজেদের মধ্যে কোন ঝগড়া-বিবাদ বা সংঘাত সৃষ্টি হইলে তাহারা গোত্রপ্রধানের নিকট মোকদ্দমা দায়ের করিয়া ফয়সালা করিয়া লইত। হযরত মূসা (আ) যখন এই এলাকায় আগমন করিয়াছিলেন তখন এই এলাকার 'শায়খ' বা প্রধান ছিলেন শু'আয়ব (আ)। তাওরাতের বর্ণনা অনুযায়ী বলা যাইতে পারে যে, শু'আয়ব (আ) মূসাকে সমাজ পরিচালনার বিধিবিধান শিক্ষা দিয়াছিলেন। মোটকথা, মাদয়ান সম্প্রদায় ছিল অনেক পুরাতন সভ্যতার ধারক ও বাহক।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মাদয়ান সম্প্রদায়ের পেশা

📄 মাদয়ান সম্প্রদায়ের পেশা


ইতোপূর্বে বর্ণিত মাদয়ান সম্প্রদায়ের ভৌগোলিক অবস্থান হইতে বুঝা যায় যে, হিজাযের উত্তর-পশ্চিম অংশে আফ্রিকা এবং আরব বাণিজ্য কাফেলাসমূহের যাতায়াতের সংযোগস্থলে এই সম্প্রদায় বসবাস করিত। তাহাদের মধ্য হইতে একটি বড় দল ব্যবসায়ী ছিল। তাই ইতিহাসে ইহাদিগকে ব্যবসায়ী সম্প্রদায় হিসাবে উল্লেখ করা হইয়াছে। উহারাই ইতিহাসের সর্বপ্রথম জাতি যাহারা ব্যবসায়ী হিসাবে পরিচয় লাভ করিয়াছে। তবে উহাদের মধ্যে বিভিন্ন ব্যবসায়িক দুর্নীতি ও অনুপ্রতারণা প্রবেশ করিয়াছিল। তাহারা যখন মানুষকে ওযন করিয়া দিত তখন মাপে কম দিত; কিন্তু নিজেরা যখন ওযন করিয়া লইত তখন মাপে বেশি লইত। তাহা ছাড়া তাহারা সূদ ভিত্তিক নিষিদ্ধ লেনদেনও করিত। অন্য যে পেশা তাহারা গ্রহণ করিয়াছিল তাহা হইল পশুপালন। এই সম্প্রদায়ের অনেক মানুষ পশুপালন করিয়া জীবিকা নির্বাহ করিত। শু'আয়ব (আ)-ও এই পেশা অবলম্বন করিয়াছিলেন। হযরত মূসা (আ) যখন অনিচ্ছা সত্ত্বেও এক মিসরীকে হত্যা করিয়া মাদ্‌য়ানে চলিয়া আসেন, তখন পশুগুলিকে পানি পান করানো উপলক্ষে শু'আয়ব কন্যাদ্বয়ের সাথে তাঁহার সাক্ষাত হয়। সূরা কাসাসের ২৩ নং আয়াতে ইহার বর্ণনা রহিয়াছে। হযরত শু'আয়ব (আ) কয়েক বৎসর তাঁহার পশুগুলিকে প্রতিপালনের শর্তে স্বীয় কন্যাকে মূসা (আ)-এর নিকট বিবাহ দিয়াছিলেন।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মাদয়ান সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও চারিত্রিক অবস্থা

📄 মাদয়ান সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও চারিত্রিক অবস্থা


ধর্মীয় দিক হইতে মাদয়ান সম্প্রদায় চরম বিভ্রান্তিতে লিপ্ত হইয়া পড়িয়াছিল। তাহারা আল্লাহর সাথে শিরক করিত এবং বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজা করিত। ইহার প্রমাণ হিসাবে বলা যায়, তাহাদের মধ্য 'শিরক' ছিল বলিয়াই শু'আয়ব (আ) সর্বপ্রথম তাহাদিগকে এক আল্লাহ্ ইবাদতের প্রতি আহবান জানাইয়াছেন: يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللهَ مَا لَكُمْ مِنْ إِلهِ غَيْرُهُ .
"হে আমার সম্প্রদায়! তোমারা আল্লাহর ইবাদত কর, তিনি ব্যতীত তোমাদের কোন ইলাহ নাই" (৭:৮৫)। Old Testament-এর Book of Numbers (22:41; 25: 3)-এর বক্তব্য অনুযায়ী তাহাদের সবচাইতে বড় দেবতার নাম ছিল বা'ল )بعل(। তাহারা সকলে এই মূর্তির পূজা করিত, মূর্তির সম্মানার্থে সুগন্ধি পেশ করিত, এই দেবতার নামে কুরবানীও করিত। তাওরাতে তিনভাবে এই দেবতার নাম আসিয়াছেঃ (১) বা'ল (Book of Number, 22:41); (২) বা'ল ফায়ূর (Book of Number, 25: 2); (৩) বা'ল বারিস (Book of Number, 9:4)

চারিত্রিক অবক্ষয় এবং অধঃপতনের দিক হইতেও তাহারা ধ্বংসের প্রান্তসীমায় পৌছিয়াছিল। ব্যভিচারের মত দুষ্টক্ষত সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করিয়াছিল (আম্বিয়ায়ে কুরআন, ২খ., পৃ. ৬৯)। চারিত্রিক অবক্ষয়ের দরুন সমাজে এক মহাবিপর্যয় নামিয়া আসিয়াছিল। সমাজের কোথাও এতটুকু শান্তি ছিল না। এই বিপর্যয় ও ধ্বংসের হাত হইতে রক্ষার জন্য শু'আয়ব (আ)-এর আহবান ছিল:
‏وَلا تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ بَعْدَ اصلاحها .
"শান্তি স্থাপিত হইবার পর পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করিও না" (৭:৮৫)।
মোটকথা, চরম চারিত্রিক অবক্ষয় মাদয়ান সম্প্রদায়কে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়াইয়া রাখিয়াছিল। এই সকল বদঅভ্যাস এবং অবক্ষয়কে তিনভাবে ভাগ করা যাইতে পারে: (ক) শিরক ভিত্তিক আচার-আচরণ; (খ) মাপে কম দেওয়া ও বেশি নেওয়া এবং (গ) লেনদেন, ভেজাল ও গর্হিত সন্ত্রাসী তৎপরতা (হিফজুর রহমান, কাসাসুল কুরআন, ১খ., পৃ. ৩৪৬)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00