📄 হাদীছ শরীফে শু'আয়ব (আ)
হাদীছ শরীফে হযরত শু'আয়ব (আ) সম্পর্কে খুব বেশি বর্ণনা পাওয়া যায় না। সিহাহ সিত্তাতে তাঁহার সম্পর্কে কোন বর্ণনা নাই। তবে অন্যান্য হাদীছের কিতাবে তাঁহার সম্পর্কে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। যেমন:
(১) সহীহ ইবনে হিব্বান-এ আম্বিয়া ও রাসূলগণের আলোচনা প্রসঙ্গ অধ্যায়ে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) আবূ যার গিফারী (রা)-কে লক্ষ্য করিয়া বলেন: مِنْهُمْ أَرْبَعَةً مِّنَ الْعَرَبِ هُودٌ وَصَالِحٌ وَشُعَيْبٌ ونَبِيُّكَ يَا أَبَا ذَرِّ. “নবীগণের মধ্যে চারজন আরবদের মধ্য হইতেঃ হূদ, সালিহ, শু'আয়ব (আ) এবং তোমার নবী হে আবু যর!”
(২) ইবন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত আছেঃ كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا ذَكَرَ شُعَيْبًا قَالَ ذَاكَ خَطِيبُ الأَنْبِيَاءِ. “রাসূলুল্লাহ (স) শু'আয়ব (আ)-এর নাম উল্লেখকালে তাঁহাকে নবীদের মধ্যে বাগ্মী (খাতীবুল আম্বিয়া) বলিয়া আখ্যায়িত করিতেন” (আল-বিদায়া, ১খ., পৃ. ১৭৩)।
(৩) হযরত আবদুল্লাহ ইবনুল আস (রা) হইতে বর্ণিত আছে: قَالَ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّ مَدينَ وَأَصْحَابَ الأَيْكَةِ أُمَّتَانِ بَعَثَ اللَّهُ إِلَيْهِمَا شُعَيْبًا النَّبِيُّ. “নিশ্চয় মাদ্য়ান এবং আসহাবুল আয়কা দুইটি সম্প্রদায়। আল্লাহ তা'আলা শু'আয়বকে তাহাদের জন্য নবী করিয়া পাঠাইয়াছিলেন” (আল-বিদয়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ., পৃ. ১৭৮)।
📄 শু'আয়ব (আ)-এর সম্প্রদায়ের পরিচয়
কুরআনের বর্ণনাধারা হইতে প্রতীয়মান হয় যে, শু'আয়ব (আ) দুই সম্প্রদায়ের জন্য নবী হিসাবে প্রেরিত হইয়াছিলেন। প্রথমত মাদ্য়ান সম্প্রদায়। ইহাদের প্রসঙ্গ আসিয়াছে সূরা আ'রাফের ৮৫ নম্বর আয়াতে, সূরা হূদের ৮৪. নম্বর আয়াতে এবং সূরা আনকাবূতের ৩৬ নম্বর আয়াতে। অন্যদিকে আসহাবুল আয়কার বর্ণনা আসিয়াছে সূরা হিজরের ৭৮ নং আয়াতে, সূরা শু'আরার ১৭৬ আয়াতে, সূরা সাদ-এর ১৩ নং আয়াতে এবং সূরা কাফ-এর ১৪ নং আয়াতে।
মাদয়ান সম্প্রদায় প্রকৃতপক্ষে হযরত ইবরাহীম (আ)-এর সন্তান 'মায়ান'-এর বংশধর। শু'আয়ব (আ) এই বংশেই জন্মগ্রহণ করেন। তাই কুরআনে যখন 'মাদয়ান'-এর প্রসঙ্গ উপস্থাপন করা হইয়াছে তখন শু'আয়বকে তাহাদের 'ভাই' বলিয়া পরিচয় দেওয়া হইয়াছে। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা বলিয়াছেন:
وَإِلَى مَدينَ أَخَاهُمْ شُعَيْبًا
"মাদয়ানবাসীদের নিকট তাহাদের ভাই শু'আয়বকে পাঠাইয়াছিলাম" (সূরা আ'রাফ-৮৫; হূদ-৮৪; আনকাবুত-৩৬)।
অন্যদিকে 'আসহাবুল আয়কা' হযরত ইবরাহীম (আ)-এর অন্য ছেলে 'ইয়াকসান'-এর পুত্র 'দিদান'-এর বংশধর। এই বংশে শু'আয়ব (আ) জন্মগ্রহণ না করিলেও তিনি তাহাদের জন্যও নবী ছিলেন। তাই কুরআনে যখন 'আসহাবুল আয়কা'-এর উল্লেখ আসিয়াছে, তখন শু'আয়ব-এর ক্ষেত্রে 'ভাই' বলিয়া পরিচয় পেশ করা হয় নাই। যেমন আল্লাহ বলিয়াছেন:
أَذْ قَالَ لَهُمْ شُعَيْبٌ .
"যখন শু'আয়ব তাহাদিগকে বলিয়াছিল” (১৭৭)।
একটি মত অনুযায়ী তাহারা পৃথক দুইটি সম্প্রদায়। কেননা সরাসরি আল-কুরআনেই ভিন্ন ভিন্ন বাচনভঙ্গী এবং বর্ণনাধারায় উভয় সম্প্রদায়ের উল্লেখ আসিয়াছে। আল্লামা সায়্যিদ সুলায়মান নদবীও এই মত পেশ করিয়াছেন (আরদুল কুরআন, ২খ., পৃ. ২১)।
📄 হযরত শু'আয়ব (আ) মাদয়ান প্রসঙ্গ
মাদয়ান সম্প্রদায়ের ভৌগোলিক অবস্থান সম্পর্কে আল-কুরআনে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত রহিয়াছে: "প্রকাশ্য পথিপার্শ্বে অবস্থিত"। এই আয়াতের উপর ভিত্তি করিয়া আমরা বলিতে পারি যে, মাদইয়ানের মূল এলাকা হিজাযের উত্তর-পশ্চিমে এবং ফিলিস্তীনের দক্ষিণে লোহিত সাগর ও আকাবা উপসাগরের উপকূলে অবস্থিত ছিল। 'সাইনা' উপদ্বীপের পূর্ব কূলেও ইহার কিছু অংশ বিস্তৃত ছিল, তথা বর্তমান তাবুক এলাকার বিপরীত দিকে ছিল। কেহ কেহ বলিয়াছেন, হিজাযের শেষ সীমানার পরে সিরিয়ার উপকণ্ঠে 'মাআন' নামক স্থানে তাহারা বসবাস করিত। প্রাচীন কালে যে বাণিজ্যিক সড়কটি লোহিত সাগরের উপকূল ঘেষিয়া ইয়ামন হইতে মক্কা ও ইয়ানবু হইয়া সিরিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত হইয়াছিল এবং দ্বিতীয় যে বাণিজ্যিক সড়কটি ইরাক হইতে মিসরের দিকে যাইত ইহাদের ঠিক সন্ধিস্থলে এই জাতির জনপদসমূহ অবস্থিত ছিল। এই কারণে আরবের ছোট-বড় সবাই মাদয়ানী জাতি সম্পর্কে জানিত এবং নিশ্চিহ্ন হইয়া যাইবার পরও সমগ্র আরবে ইহাদের খ্যাতি অপরিবর্তিত ছিল। কেননা আরবাসীদের বাণিজ্য কাফেলা মিসর ও ইরাক যাইবার পথে দিন-রাত ইহাদের ধ্বংসাবশেষের মধ্য দিয়াই চলাচল করিত।
📄 মাদয়ান সম্প্রদায়ের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
Old Testament-এর Book of Genesis-এর বিভিন্ন অধ্যায়ের বর্ণনা মোতাবেক খৃষ্টপূর্ব বিংশ শতক পর্যন্ত 'মাদ্য়ান' এলাকার ইতিহাস জানা যায়। যে বাণিজ্য কাফেলা হযরত ইউসুফ (আ)-কে কূপ হইতে উদ্ধার করিয়া 'কানআন' হইতে মিসরে লইয়া যায় এই বাণিজ্য কাফেলা ছিল মাদ্য়ান অধিবাসী ইসমাঈলী আরব। কুরআনুল কারীমের সূরা ইউসুফে ইহার বর্ণনা রাহিয়াছে: وَجَاءَتْ سَيَّارَةً فَأَرْسَلُوا وَارِدَهُمْ فَأَدْلى دَلوَهُ قَالَ يَا بُشرى هذا غُلَامٌ وَأَسَرُّوهُ بِضَاعَةَ وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِمَا يَعْمَلُونَ. وَشَرَوْهُ بِثَمَن بَخْسِدَ رَاهِمَ مَعْدُودَةٍ وَكَانُوا فِيهِ مِنَ الزَّاهِدِينَ. "এক যাত্রীদল আসিল, উহারা উহাদের পানি সংগ্রাহককে প্রেরণ করিল। সে তাহার পানির ডোল নামাইয়া দিল। সে বলিয়া উঠিল, কী সুখবর! এই যে এক কিশোর! অতঃপর উহারা তাহাকে পণ্যরূপে লুকাইয়া রাখিল। উহারা যাহা করিতেছিল সে বিষয়ে আল্লাহ সবিশেষ অবহিত ছিলেন। এবং উহারা তাহাকে বিক্রয় করিল স্বল্প মূল্যে, মাত্র কয়েক দিরহামের বিনিময়ে; উহারা ছিল তাহার ব্যাপারে নির্লোভ"। খৃষ্টপূর্ব সপ্তদশ শতাব্দী হইতে ষষ্ঠদশ শতাব্দীতে মূসা (আ)-এর জীবনেও এই মাদয়ান-এর উল্লেখ রহিয়াছে। মূসা (আ) এই এলাকায় আশ্রয় লইয়াছিলেন। The New Encyclopaedia Britannica-এর ভাষায়: with whom Moses look refuge after he killed an Egyptian and whose (Hobab) doughter Moses married", আল-কুরআনেও এই প্রসঙ্গে বর্ণনা রহিয়াছে: وَلَمَّا وَرَدَ مَاءَ مَدينَ وَجَدَ عَلَيْهِ أُمَّةٌ مِّنَ النَّاسِ يَسْقُونَ وَوَجَدَ مِنْ دُونِهِمُ امْرَأَتَيْنِ تَدُودَانِ قَالَ مَا خَطِبُكُمَا قَالَتَا لَا نَسْقِي حَتَّى يُصْدِرَ الرِّعَاءُ وَأَبُونَا شَيْخٌ كَبِيرٌ . "যখন সে মাদয়ানের কূপের নিকট পৌছিল, দেখিল, একদল লোক তাহাদিগের জানোয়ারগুলিকে পানি পান করাইতেছে এবং উহাদিগের পশ্চাতে দুইজন নারী তাহাদিগের পশুগুলিকে আগলাইতেছে। মূসা বলিল, তোমাদিগের কি ব্যাপার? উহারা বলিল, আমরা আমাদিগের পশুগুলিকে পানি পান করাইতে পারি না যতক্ষণ রাখালেরা তাহাদের পশুগুলিকে লইয়া সরিয়া না যায়।"