📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হযরত ইউসুফ (আ)-এর জীবন চরিতে শিক্ষণীয় বিষয়

📄 হযরত ইউসুফ (আ)-এর জীবন চরিতে শিক্ষণীয় বিষয়


ইতিহাসের তথ্য মানবজীবনের ঘাত-প্রতিঘাত, সুখ-দুঃখ আনন্দ-বেদনা, সুযোগ-দুর্যোগ ও সংকট সমাধানের ক্ষেত্রে মানুষের বিভিন্নমুখী স্বভাব-চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ এবং উল্লিখিত পরিস্থিতিসমূহে মানুষের করণীয় সম্পর্কে শিক্ষার বহুল উপকরণ।
(ক) ঐতিহাসিক তথ্য- উপকরণ: ইউসুফ (আ)-এর ঘটনায় কানআনবাসী বনী ইসরাঈলের মিসর গমনের পটভূমি বিবৃত হইয়াছে। সেই সাথে ইতিহাসের জন্য প্রয়োজনীয় সমকালীন বিশ্বের রাষ্ট্রীয় তথা রাজনৈতিক, সামাজিক, নৈতিক ও ধর্মীয় রীতিনীতি ও মূল্যবোধের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ রহিয়াছে। ইয়া'কূব ও ইউসুফ (আ)-এর সমকালে বর্তমান যুগের ন্যায় একদিকে নগর সভ্যতা ও অপরদিকে অবহেলিত ও পশ্চাদপদ অথবা নিরুপদ্রব কোলাহলমুক্ত পল্লী জীবনের আভাস ইহাতে পাওয়া যায়। রাষ্ট্র ব্যবস্থায় নিরংকুশ রাজতন্ত্রের সাথে সক্রিয় মন্ত্রী পরিষদের অস্তিত্ব মোটামুটি সুশৃঙ্খল ও সংহত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি স্বেচ্ছাচারিতার উপস্থিতি ও আযীয মিসর কর্তৃক পারিবারিক মান-মর্যাদা রক্ষার খাতিরে নির্দোষ ইউসুফকে কারাগারে প্রেরণ দ্বারা প্রমাণিত হয়। আবার উচ্চতর আদালতে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে কারারুদ্ধ ব্যক্তির মুক্তি লাভ এবং তাঁহার যোগ্যতা ও গুণের কদর করিয়া তাঁহার বিগত জীবনে গোলাম থাকিবার বিষয়টি উপেক্ষা করিয়া শাসন-প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদে আসীন করা দ্বারা একদিকে যোগ্যতার কদর ও অপরদিকে রাজার নিরংকুশ ক্ষমতার আভাসও পাওয়া যায়। ইহা ছাড়া পূর্বাপর ঘটনাবলীর বিবরণে উপর তলায় ক্ষমতার অপব্যবহারের অস্তিত্ব থাকিলেও সাধারণভাবে ব্যাপক দুর্নীতিমুক্ত আইনের শাসন প্রচলিত থাকিবার, নাগরিক কল্যাণ ও প্রজা পালনে রাষ্ট্রের কর্তব্যপরায়ণতা, নাগরিক অধিকার রক্ষা, সাধারণভাবে জনতার আইন মানিয়া চলা, খাদ্য সংগ্রহ ও বণ্টনের নীতিমালা প্রতিপালন, চুরির শাস্তি প্রদানে রাষ্ট্রীয় বিধান লংঘনের সুযোগ না থাকা ইত্যাদির প্রতি ইউসুফ (আ)-এর ঘটনায় আলোকপাত হইয়াছে। আধুনিক নগর সভ্যতার উপকরণসমূহ রাজ-প্রাসাদ, অভিজাত আবাসিক এলাকা, হাটবাজার ও বাণিজ্য কেন্দ্র, আইন-শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদের জন্য কারাগার ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশের সুরক্ষার জন্য নগর পরিধির বাহিরে কারাগারের অবস্থান, আধুনিক আপ্যায়ন ভোজ সভা, সোফাসেট, ছুরি, চাকুর ব্যবহারমুক্ত সুখী সমৃদ্ধ বিলাসী জীবন ইত্যাদির প্রতিও স্পষ্ট ইংগিত পাওয়া যায়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বাণিজ্য কাফেলাসমূহের দূর-দূরান্তে গমনাগমন, মিসরের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্র হওয়ার সাথে সাথে সহজেই মানুষকে গোলাম-বাঁদী বানানো এবং পশুপালের ন্যায় মানুষ ক্রয়-বিক্রয়ের হাটবাজারের অস্তিত্বের সন্ধান ইহাতে পাওয়া যায়। বাণিজ্যিক কাফেলা ছাড়া দুর্ভিক্ষকালে দেশে-বিদেশে বহু কাফেলার মিসরমুখী অভিযাত্রাও লক্ষণীয়।
রাষ্ট্রীয় জীবনের ক্ষেত্রে আরও একটি বিষয় লক্ষণীয়। উহা এই যে, আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার ভৌগোলিক সীমান্ত চিহ্নিতকরণ, সীমান্ত রক্ষা ব্যবস্থা ও তদুদ্দেশ্যে বাহিনী গঠন এবং রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা রক্ষার জন্য পূর্ণাঙ্গ পাসপোর্ট ও ভিসা ব্যবস্থার প্রচলন না থাকিলেও দেশী-বিদেশী পরিচয় যাচাইয়ের ব্যবস্থা বহুলাংশে বিদ্যমান ছিল এবং ইউসুফ ভ্রাতৃবর্গকে গুপ্তচর বৃত্তির অভিযোগের সম্মুখীন হইতে হইয়াছিল। এই ক্ষেত্রে সর্বাধিক লক্ষণীয় বিষয় ইয়া'কুব (আ) ও তাঁহার পুত্রদের অভিবাসন ও 'নাগরিকত্ব' প্রদান প্রক্রিয়া যাহা রাজার প্রত্যক্ষ নির্দেশ বা অনুমোদনে সম্পন্ন হইয়াছিল। ইহা ছাড়াও বিদেশী ইউসুফ (আ)-কে রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে গ্রহণের স্বীকৃতিও লক্ষণীয়। আবার বনী ইসরাঈলের সুদীর্ঘ কাল (প্রায় চার শত বৎসর) মিসরে অবস্থান এবং সেখানকার জন-জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হওয়ার পরেও নাগরিক অধিকারে বৈষম্য, তাহাদের উপর 'বিদেশী' ছাপ অব্যাহত থাকা ও দাসসুলভ জীবন-যাপন করা এবং অবশেষে মিসর ত্যাগে বাধ্য হওয়া বর্তমান যুগের আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রীয় পরিস্থিতির সহিত তুলনীয়।
সামাজিক জীবন, সংস্কৃতি ও নৈতিকতার ক্ষেত্রে আধুনিকতা ও প্রাচুর্যপূর্ণ বিলাসী জীবন যাপনের অপরিহার্য পরিণতিরূপে নৈতিকতা ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, নারী স্বাধীনতার নামে যথেচ্ছাচারিতা ও বল্লাহীনতা, বিশেষত উপর তলার সমাজে অশ্লীলতা ও অধিকারের নামে নারীর লজ্জাহীনতা, পরকীয়া প্রেমের চর্চা, নারীর উপর পুরুষের নিয়ন্ত্রণহীনতা এবং নারীর কাছে পুরুষের এক ধরনের 'বশীভূত' জীবন যাপন দ্বারা সমকালীন মিসরীয় সমাজে প্রচলিত থাকার প্রমাণ ইউসুফ বৃত্তান্তে বিদ্যমান। জুলায়খা ও তাহার সখীদের আচরণ হইতে ইহার প্রমাণ পাওয়া যায় (দ্র. ফী জিলালিল কুরআন, ৪খ., ৬৬৩, ৬৬৯, ৬৭০)। ইউসুফ (আ)-এর জীবন কাহিনী হইতে তখনকার মিসরীয় সমাজে মদের বহুল ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়। রাজাকে সূরা পরিবেশনের জন্য স্বতন্ত্র কর্মচারী বা সাকী ছিল। সাকীর দেখা স্বপ্নে মদ তৈরীর (اعصر خمرا) উল্লেখ রহিয়াছে।
তখনকার কানআনী ও মিসরীয় সমাজে এবং নবী পরিবার ও রাজপরিবারে স্বপ্নের ব্যাখ্যা সংক্রান্ত জ্ঞানের চর্চা বিদ্যমান ছিল। প্রসঙ্গত ইয়াকুব (আ), ইউসুফ (আ), বন্দীদ্বয় ও রাজার স্বপ্ন এবং ইউসুফ (আ)-কে স্বপ্নের ব্যাখ্যার ইল্ম প্রদান এবং ইউসুফ (আ) কর্তৃক আল্লাহ প্রদত্ত এই যোগ্যতার জন্য শুকরিয়া আদায় প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য (দ্র. ১২:৪, ২১, ৩৬, ১০১)。

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সমকালীন ধর্মীয় অবস্থা

📄 সমকালীন ধর্মীয় অবস্থা


কানআন ইবরাহীমী বংশধরদের প্রভাবিত অঞ্চল হইলেও ইহার আশপাশে তখনও মূর্তি পূজার প্রচলন ছিল। এ প্রসঙ্গে ইউসুফ (আ.)-এর মাতা কর্তৃক ইউসুফের নানার মূর্তি সরাইয়া ফেলিবার পরামর্শ প্রদান উল্লেখযোগ্য। মিসরে তখন পৌত্তলিকতা ও আখিরাতের প্রতি অবিশ্বাস বিরাজ করিতেছিল। কারাগারে বন্দীদ্বয়ের স্বপ্ন ব্যাখ্যার প্রাক্কালে ইউসুফ (আ)-এর ভাষণে ইহার উল্লেখ রহিয়াছে (تَرَكْتُ مِلَّةَ قَوْمٍ لا يُؤْمِنُونَ بالآخرة) - ১২ : ৩৭ ; (أَرْبَابُ مُتَفَرِّقُونَ) - ১২ : ৩৯ ; (أَسْمَاءُ سَمَّيْتُمُوهَا) রাজা ও ক্ষমতাসীনরা অবতারের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত ছিল (পূর্ব আলোচনা দ্র.)। এমনকি পরবর্তী ফির'আওন নিজেকে 'বড় খোদা' বলিয়া দাবি করিয়াছিল। তবে সন্নিকটে ইবরাহীম একত্ববাদের প্রভাব অথবা মিসর অঞ্চলে পূর্ববর্তী নবীগণের সঠিক ধর্মের অবশিষ্ট প্রভাবরূপে একত্ববাদ, আখিরাত, আল্লাহ্র ভয় ইত্যাদি বিষয় সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয় নাই। যুলায়খার ফুসলানোর জবাবে 'মাআযাল্লাহ' বলা, অনাচারীরা সফলকাম হয় না বলা (১২ঃ ২৩), আল্লাহ বিশ্বাস ভঙ্গকারীদের সার্থকতা দান করেন না (১২: ৫২) বলা, আযীয মিসর কর্তৃক যুলায়খাকে অপরাধী সাব্যস্ত করিয়া ইসতিগফার করিতে বলা (১২: ২৯), চুরির অভিযোগ খশুনে ইউসুফ ভ্রাতৃবৃর্গের 'আল্লাহর নামে কসম খাওয়া (১২ঃ ৭৩) এবং আল্লাহর নামে দোহাই দিয়া ইউসুফ ভ্রাতৃবৃর্গের অপরিচিত ও ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে অপরিজ্ঞাত আযীয— ইউসুফের নিকট ব্যাখ্যা চাওয়া ইত্যাদি দ্বারা সামগ্রিকভাবে আল্লাহ্র অস্তিত্বে বিশ্বাসের আভাস পাওয়া যায়। ইহা ছাড়া কারাগারে তাওহীদের অনুকূলে ইউসুফ (আ)-এর ভাষণ ও ইউসুফ (আ)-এর আহবানে রাজার ইসলাম গ্রহণ দ্বারা অন্তত ধর্মীয় ব্যাপারে নমনীয়তার আভাস পাওয়া যায়। রাজার ইসলাম গ্রহণ ইউসুফ (আ)-এর চেষ্টা ও প্রভাবের ফল হইলে মিসরীয় সমাজ কর্তৃক তাহাদের রাজার ধর্ম পরিবর্তন এবং ইউসুফ (আ)-কে আযীয পদে কোন সামাজিক বা রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না হওয়া দ্বারা একদিকে দীন প্রচারে সফলতার প্রমাণের সাথে সাথে মিসরীয় সমাজে তাওহীদ বিদ্যমান থাকা ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে সামাজিক নমনীয়তার প্রমাণ পাওয়া যায়।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মানবজীবনের জন্য শিক্ষণীয় বিষয়

📄 মানবজীবনের জন্য শিক্ষণীয় বিষয়


(১) ইউসুফ (আ)-এর স্বপ্ন বর্ণনার পর ইয়াকূব (আ) কর্তৃক তাঁহার স্বপ্ন ভাইদের নিকট বর্ণনা করিতে নিষেধ করা দ্বারা বুঝা যায় যে, স্বপ্ন যে কোন লোকের নিকট বর্ণনা করা সঙ্গত নয় (১২: ৫)। হাদীছ শরীফেও অনুরূপ নির্দেশ রহিয়াছে (মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ, ১০)।
(২) পাপাচারী মুসলিম, এমনকি অমুসলিমের স্বপ্নও সত্য হইতে পারে। ইউসুফ (আ)-এর ঘটনায় দুই বন্দীর স্বপ্ন ও বাদশাহ্র স্বপ্ন ইহার প্রমাণ।
(৩) কাহারও অনিষ্ট হইতে রক্ষা করিবার জন্য তাহার কুস্বভাব বা মন্দ ইচ্ছা সম্পর্কে কাহাকেও সতর্ক করা বৈধ, ইহা গীবত বা পরনিন্দা নয়। ইউসুফ (আ)-এর ভাইদের শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করার ঘটনা ইহার প্রমাণ।
(৪) নিজের সুখ ও উন্নতির কথা প্রকাশ পাইলে কেহ হিংসা করিতে পারে বা ক্ষতি সাধনের চেষ্টা করিতে পারে এমন আশংকা থাকিলে উহা প্রকাশ না করাই সমীচীন।
(৫) ইউসুফ (আ)-এর স্বপ্নের ব্যাখ্যা সুদীর্ঘকাল পরেও প্রকাশ পাওয়া দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, কোন কোন স্বপ্নের বাস্তবায়ন দীর্ঘকাল পরেও হইতে পারে (মাআরিফ, ৫খ., ১১, ১২)।
(৬) ইউসুফ (আ)-কে ভ্রমণ-বিনোদন ও খেলাধুলায় নিয়া যাওয়া সংক্রান্ত পুত্রদের প্রস্তাবে ইয়াকুব (আ) তাঁহার নিরাপত্তার ব্যাপারে চিন্তিত হওয়ার কথা বলিয়াছিলেন, খেলাধূলার অবৈধতার প্রশ্ন উত্থাপন করেন নাই। ইহাতে ভ্রমণ-বিনোদন ও খেলাধূলার বৈধতা সাব্যস্ত হয়। সহীহ হাদীছেও শরীআতের সীমারেখা লংঘিত না হওয়ার শর্তে ইহার বৈধতা বিবৃত হইয়াছে (ঐ, ৫খ., ২১)।
(৭) ইউসুফ (আ)-এর অক্ষত জামা দেখিয়া ইয়াকুব (আ) পুত্রদের মিথ্যা ভাষণের বিষয়টি আঁচ করিয়াছিলেন। ইহা দ্বারা বুঝা যায় যে, বিচারক ও সালিশগণকে বাদী-বিবাদীর দাবি ও প্রমাণের সহিত আনুসংগিক আলামত ও নিদর্শনের প্রতিও লক্ষ্য রাখিতে হইবে (ঐ, ৫খ., ২৫, ২৬)।
(৮) পাপের কাজ হইতে আত্মরক্ষা করিবার জন্য সর্বাধিক শক্তিশালী উপায় আল্লাহর শরণাপন্ন হওয়া ও তাঁহার সাহায্য প্রার্থনা করা। যুলায়খার আহবানকালে ইউসুফ (আ)-এর معاذ الله বলা দ্বারা ইহার প্রমাণ পাওয়া যায় (ঐ, ৫খ, ৩৩)।
(৯) রুদ্ধদ্বার কক্ষ হইতে ইউসুফ (আ)-এর পলায়নের প্রচেষ্টা দ্বারা বুঝা যায় যে, কোন স্থানে পাপে লিপ্ত হওয়ার আংশকা দেখা দিলে সে স্থান ত্যাগ করিয়া অন্যত্র অবস্থান এবং সম্পূর্ণ নিরুপায় অবস্থায়ও আল্লাহ্র উপর ভরসা করিয়া নিজের ক্ষুদ্র শক্তি ও সাধ্য অনুসারে কাজ করা বাঞ্ছণীয় (ঐ, ৫খ., ৪৩)।
(১০) ইউসুফ (আ)-এর আত্মপক্ষ সমর্থন (راودَتْنيى عن نَفْسى ; ১২: ২৬) দ্বারা বুঝা যায় যে, মিথ্যা অপবাদ মাথায় পাতিয়া নেওয়া তাওয়াকুল বা বুযুর্গী নহে, বরং উহার প্রতিবাদ করিয়া নিজের সাফাই পেশ করাই নবীগণের সুন্নাত (ঐ, ৫খ., ৪৪)।
(১১) অপরাধী সনাক্তকরণ ও মোকদ্দমার ফয়সালার জন্য সাক্ষ্য-প্রমাণই মৌলিক বিষয়। তবে আনুষঙ্গিক আলামত দ্বারা ঘটনার যথার্থতা উদ্‌ঘাটন করিবার জন্য সহায়তা গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়। ইউসুফ (আ)-এর ঘটনায় জামা পিছন হইতে ছেঁড়া হওয়া যুলায়খার অপরাধের আলমতরূপে বিবেচিত হইয়াছিল (ঐ. ৫খ., ৪৫)।
(১২) إِنْ كَيْدَكُنَّ عَظِيمٌ (তোমাদের চক্রান্ত ভীষণ) এই আয়াত দ্বারা নারীদের হইতে সতর্ক থাকার ইঙ্গিত পাওয়া যায় (কুরতুবীর বরাতে মাআরিফুল কুরআন, ৫খ., পৃ. ৪৬)।
(১৩) গুনাহ ও আল্লাহ্ অসন্তুষ্টির কাজে লিপ্ত হওয়ার চেয়ে কোন পার্থিব বিপদ বরণ করা উত্তম। "তাহারা যেদিকে আমাকে আহবান করিতেছে উহার চেয়ে কারাগার আমার নিকট অধিকতর পছন্দনীয়" ইউসুফ (আ)-এর উক্তি দ্বারা বিষয়টি প্রমাণিত হয় (ঐ, ৫খ., ৫১)। হাদীছে উভয় সংকটের ক্ষেত্রে সহজতরটি গ্রহণ করিবার নির্দেশ রহিয়াছে।
(১৪) জেলখানার বন্দীদ্বয়ের স্বপ্নের ব্যাখ্যা প্রদানের সুযোগে তাহাদিগকে দীনের দাওয়াত প্রদান এবং তাহাদিগকে আকৃষ্ট করিবার জন্য ইউসুফ (আ) কর্তৃক নিজের বিশেষ গুণের উল্লেখ দ্বারা দা'ঈ ও মুবাল্লিগদের জন্য এই শিক্ষণীয় বিষয় লাভ করা যায় যে, দীনের দা'ঈ ও মুবাল্লিগ সর্বদা তাহার কর্মসূচীর জন্য সুযোগের সদ্ব্যবহার করিবেন এবং জনগণকে আকৃষ্ট করিবার জন্য প্রয়োজনে নিজের বাস্তব যোগ্যতার কথা বিনয়ের সহিত প্রকাশ করিতে পারিবেন (ঐ, ৫খ., ৪৬)।
(১৫) জেলে অবস্থানকালে ইউসুফ (আ)-এর আচরণ, বিশেষত জেলের অপরাধীদের সহিত তাঁহাদের সহমর্মিতা ও সহযাত্রী বন্দীদ্বয়ের সহিত আচার-ব্যবহারের মধ্যে শিক্ষণীয় বিষয় রহিয়াছে।
(১৬) বন্দীদ্বয়ের বক্তব্য 'আমরা আপনাকে সৎকর্মশীল দেখিতেছি' (نَرَاكَ مِنَ الْمُحْسنين : ১২: ৩৬) দ্বারা বুঝা যায় যে, স্বপ্নের ব্যাখ্যা পুণ্যবান লোকের নিকট জিজ্ঞাসা করিতে হইবে (ঐ, ৫খ, ৫৮)।
(১৭) ইউসুফ (আ) বন্দীদ্বয়ের মধ্যে মুক্তিপ্রাপ্ত সাকীকে রাজার নিকটে তাঁহার সম্পর্কে আলোচনা করিবার অনুরোধ করিয়াছিলেন। ইহা প্রমাণ করে যে, সমস্যার সমাধান ও বিপদমুক্তির জন্য কাহাকেও মাধ্যমরূপে গ্রহণ করা তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী নয় (ঐ, ৫খ, ৫৯)।
(১৮) মুক্তিপ্রাপ্ত বন্দীর ইউসুফ (আ)-এর কথা ভুলিয়া যাওয়া দ্বারা এই ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, কোন মানুষকে বিপদ মুক্তির মাধ্যমরূপে গ্রহণ করা অবৈধ না হইলেও বিশিষ্ট ব্যক্তি ও নবীগণের জন্য আল্লাহ ও তাঁহাদের মধ্যে কোন মাধ্যম থাকা বাঞ্ছনীয় নয় (ঐ, ৫খ., ৫৯)।
(১৯) অন্যায়ভাবে কারারুদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও ইউসুফ (আ) বাদশাহর স্বপ্নের ব্যাখ্যার সহিত দুর্ভিক্ষের কবল হইতে দেশবাসীকে রক্ষা করিবার উপায়ও স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হইয়া ব্যক্ত করিয়াছিলেন। একজন আদর্শ মুমিনের করণীয়ও অনুরূপ (ঐ, ৫খ., ৬৪)।
(২০) মুক্তিপ্রাপ্ত বন্দী কর্তৃক ইউসুফ (আ) সম্পর্কে অবহিত হইবার পর বাদশাহর স্বপ্নের সূত্রে ইউসুফ (আ)-এর মুক্তি লাভের দ্বারা বুঝা যায় যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁহার বিশিষ্ট বান্দাগণকে কাহারও অনুগ্রহ বা উপকারের পাত্র না বানাইয়া নিজের পক্ষ হইতে তাহাদের পরিত্রাণের ব্যবস্থা করিয়া থাকেন (ঐ, ৫খ., ৬৯)。
(২১) মুক্তিপ্রাপ্ত বন্দী দীর্ঘদিন পরে রাজার স্বপ্নের ব্যাখ্যা আনিবার জন্য কারাগারে আসিলে ইউসুফ (আ) তাঁহার কথা ভুলিয়া যাওয়ায় সাকীকে কোনরূপ ভর্ৎসনাও করিলেন না। ইহা দ্বারা এইরূপ ক্ষেত্রে করণীয় আদর্শের শিক্ষা লাভ করা যায়।
(২২) দুর্ভিক্ষ সংক্রান্ত ইউসুফ (আ)-এর পরামর্শ ও কর্মকাণ্ড দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, আম্বিয়ায়ে কেরাম এবং সমাজের নেতৃত্বদানকারী আলিমগণকে জনসাধারণের দীনী কল্যাণ ও জাহান্নাম হইতে বাঁচাইবার দায়িত্ব পালনের সহিত তাহাদের পার্থিব জীবন-জীবিকা ও অর্থনৈতিক বিষয়েও সুপরামর্শ দিতে হইবে। (ঐ, ৫খ., ৭০)
(২৩) কারাগার হইতে মুক্তি লাভের জন্য নারী সংক্রান্ত বিষয়ে তদন্তের ব্যাপারে ইউসুফ (আ)-এর জোর দাবি দ্বারা এই শিক্ষা লাভ করা যায় যে সমাজের নেতৃত্বধানকারী 'আলিম ও দা'ঈগণকে নিজেদেরকে দোষমুক্ত ও অপবাদমুক্ত রাখিবার ব্যাপারে যত্নবান থাকিতে হইবে। যাহাতে সাধারণ জনতার পক্ষে তাহাদিগকে মান্য করা সহজ হয়। (ঐ, ৫খ., ৭০,৭১)।
(২৪) তদন্ত দাবীতে ইউসুফ (আ.) কর্তৃক যুলায়খার কোন প্রকার উল্লেখ না করা হইতে এই শিক্ষা লাভ করা যায় যে, সম্মানিত ব্যক্তিদের বিপক্ষে কোন অভিযোগ উত্থাপনে যথাসাধ্য ভদ্রতা রক্ষা করা উচিত (ঐ, ৫খ., ৭০,৭১)।
(২৫) তদন্তে নির্দোষ সাব্যস্ত হওয়ার পরেও প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কোন প্রতিশোধ গ্রহণ না করিয়া নিরবতা অবলম্বন করা উচিৎ।
(২৬) পবিত্র ও দোষমুক্ত থাকাকে নিজের যোগ্যতা মনে না করিবার শিক্ষা রহিয়াছে। ইউসুফ (আ.) (وَمَا أَبَرِّئُ نَفْسِي) দ্বারা নিজেকে নির্দোষ বলিয়া প্রকাশ করেন নাই। ইহা হইতে বুঝা যায় যে, দোষমুক্ত থাকা নিজের কৃতিত্ব নহে, বরং আল্লাহ্র অনুগ্রহ (মাআরিফ, ৫খ., ৭২)।
(২৭) আমারকে দেশের ভাণ্ডারের দায়িত্বে নিয়োগ করুন (اجْعَلْنِي عَلَى خَزَائِنِ الْأَرْضِ) ইউসুফ (আ)-এর এই বক্তব্য দ্বারা বুঝা যায় যে, একান্ত প্রয়োজনে বিশেষ ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থে নিজের যোগ্যতা ও দক্ষতার কথা প্রকাশ করা দূষীয় নহে।
(২৮) তদ্রুপ নিজের যোগ্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হইলে রাষ্ট্রীয় পদে প্রার্থী হওয়া উত্তম।
(২৯) অনুরূপভাবে এই শিক্ষাও পাওয়া যায় যে, কোন অমুসলিম সরকারের অধীনে দায়িত্ব পালনে স্বাধিকার লাভের সুযোগ থাকিলে সাধারণ জনতার সেবা ও কল্যাণের উদ্দেশে উচ্চ পদের দায়িত্ব গ্রহণ বৈধ (কুরতুবীর বরাতে, মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., ৭৮-৮০, মাজহারী, ৫খ., ১৭৩)।
(৩০) দুর্ভিক্ষকালে ইউসুফ (আ) খাদ্য মূল্য বাঁধিয়া দিয়াছিলেন এবং জনপ্রতি এক উটের বোঝা পরিমাণ রেশন প্রদানের বিধান করিয়াছিলেন। ইহা দ্বারা খাদ্যাভাবের সময় এবং জাতীয় দুর্যোগ মুহূর্তে জনস্বার্থ ও খাদ্য সরবরাহে শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য সরকারের পক্ষ হইতে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের নিয়ন্ত্রণ ভার গ্রহণ এবং মূল্য নির্ধারণ তথা রেশন পদ্ধতির বৈধতা প্রমাণিত হয় (মাআরিফুল কুরআন, ৫খ., ৮৭)।
(৩১) পুত্রদের সহিত ইয়াকুব (আ)-এর আচরণে অপরাধী ও অবাধ্য সন্তানের প্রতি পিতা ও অভিভাবকের কাঙ্খিত আচরণের আদর্শ রহিয়াছে। পুত্রদের বহুবিধ অপরাধ সত্ত্বেও তিনি তাহাদিগকে বিতাড়িত বা ত্যাজ্য না করিয়া নিজের সহিত সহ অবস্থানের সুযোগ দিলেন। উপরন্তু, এই পুত্রগণকেই খাদ্য সংগ্রহের জন্য মিসরে পাঠাইলেন এবং বিনয়ামীনকেও তাহাদের সহিত যাওয়ার অনুমতি দিলেন ও সর্বশেষে তাহাদিগকেই ইউসুফকে সন্ধান করিবার দায়িত্ব প্রদান করিলেন। ইহা দ্বারা বুঝা যায় যে, সন্তান কোন অপরাধ করিয়া ফেলিলে পিতার কর্তব্য তাহাদিগকে সংশোধন করিবার চেষ্টা করা এবং সংশোধিত হওয়ার ব্যাপারে নিরাশ না হওয়া পর্যন্ত সম্পর্ক কর্তন না করা। অন্যথায় হিতে বিপরীত হইতে পারে। বস্তুত ইয়াকূব (আ)-এর এই কর্মপন্থায় সুফল হইয়াছিল এবং পুত্রগণ অনুতপ্ত ও সংশোধিত হইয়াছিল (মাআরিফ, ৫খ., ৯২, ৯৩)।
(৩২) ইয়াকুব (আ)-এর আচরণে আর একটি শিক্ষণীয় বিষয় এই যে, বিনয়ামীনকে অপরাধী পুত্রদের সহিত যাওয়ার অনুমতি প্রদানকালে তাহাদের পূর্ব-অপরাধের কথা স্মরণ করাইয়া দিয়া তাহাদিগকে অনুতপ্ত হওয়ার প্রতি উদ্বুদ্ধ করিয়াছিলেন।
(৩৩) ইয়াকুব (আ) পুত্রদের নিকট হইতে অঙ্গীকার গ্রহণ সত্ত্বেও আল্লাহ তা'আলার উপর সম্পূর্ণ ভরসা রাখিয়াছিলেন (ঐ, ৫খ., ৯৩)।
(৩৪) দ্বিতীয়বার পুত্রদের মিসর প্রেরণকালে ইয়াকূব (আ)-এর উপদেশ ও কর্মপদ্ধতিতে কয়েকটি শিক্ষণীয় বিষয় রহিয়াছে (বিস্তারিত বিবরণের জন্য দ্র. মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ. পৃ. ৮৭-১৩৪)। মোটকথা ইউসুফ (আ)-এর জীবনী ও ঘটনাবলী শুধু জীবনবৃত্তান্ত নহে, বরং ইহার প্রতি পদে পদে রহিয়াছে মানব জীবনের সুখ-দুঃখ এ উত্থান-পতন তথা সার্বিক অবস্থা ও পরিস্থিতির জন্য আদর্শ ও চিরন্তন শিক্ষণীয় বিষয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00