📄 কয়েকটি আলৌকিক স্বপ্ন ও উহার জওয়াব
হযরত ইউসুফ (আ)-এর ঘটনা বিশ্ব ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা আকর্ষণীয় ঘটনা। এই কারণেই পবিত্র কুরআনে ইহাকে 'আহসানুল কাসাস )احسن القصص( বলিয়া অভিহিত করা হইয়াছে। পবিত্র কুরআনে বলা হইয়াছে:
"উহাদের বৃত্তান্তে বোধশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য আছে শিক্ষা। ইহা এমন বাণী যাহা মিথ্যা রচনা নহে। কিন্তু মুমিনদিগের জন্য ইহা পূর্ব গ্রন্থে যাহা আছে তাহার সমর্থক এবং সমস্ত কিছুর বিশদ বিবরণ, হিদায়াত ও রহমত" (১২: ১১১)।
ইহা ছাড়া কোন মহৎ ব্যক্তির জীবনী হইতে শুধু ঘটনাবলী অবহিত হওয়ার মধ্যে বিশেষ কোন সার্থকতা নাই বরং জীবনী হইতে শিক্ষণীয় বিষয়সমূহ আহরণ করিয়া নিজেদের বাস্তব জীবনে উহার প্রতিফলন ঘটাইবার মধ্যেই উহার সার্থকতা নিহিত। হযরত ইউসুফ (আ)-এর ঘটনায় রহিয়াছে শিক্ষণীয় বিষয়ের বিপুল সম্ভার। ইউসুফ (আ)-এর জীবনবৃত্তান্তে কতিপয় প্রশ্ন ও উহার জবাবঃ
প্রশ্ন: ভাইয়েরা ইউসুফ (আ)-এর প্রতি চরম শত্রুতা পোষণ করিতেছে এবং তাহারা যে কোন সময় কোন মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটাইতে পারে। হযরত ইয়াকুব (আ) এই বিষয়টি বুঝিয়াও ইউসুফকে ভাইদের সহিত যাওয়ার অনুমতি দিয়াছিলেন কেন?
জবাবঃ ইয়া'কুব (আ) তাঁহার নবীসুলভ দূরদর্শিতা ও বুদ্ধিমত্তার কারণে পুত্রদিগকে স্পষ্ট করিয়া এই কথা বলিলেন না, আমি ইউসুফের ব্যাপারে সরাসরি তোমাদিগকে সন্দেহ করিতেছি। কেননা ইহাতে পিতা-পুত্র সম্পর্কের অবনতি ঘটা ছাড়াও তাহাদের হিংসা ও শত্রুতা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশংকা ছিল এবং এইবারে ইউসুফকে সাথে নেওয়ার সুযোগ না পাইলেও অন্য যে কোন সময় কোন অজুহাতে ইউসুফের জীবননাশ করা তাহাদের জন্য অসম্ভব ছিল না। সুতরাং ভাইদের হিংসা ও ক্রোধ বৃদ্ধির সুযোগ না দিয়া তিনি অনুমতি প্রদান করিলেন এবং সম্ভাব্য রক্ষাকবচস্বরূপ তাহাদের শপথযুক্ত অঙ্গীকার গ্রহণ করিলেন। উপরন্তু রুবেল ও ইয়াহুদাকে বিশেষরূপে ইউসুফকে দেখাশুনা করিবার ও অতি সত্ত্বর ফিরাইয়া আনিবার তাগিদ দিলেন। পরিস্থিতির বাস্তবতায় বৃদ্ধ পিতার জন্য ইহার অধিক উত্তম করণীয় অন্য কিছু ছিল না (মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., ২১, ২২)।
প্রশ্ন: 'নেকড়ে বাঘ ইউসুফকে খাইয়া ফেলিয়াছে', পিতার নিকট প্রত্যাবর্তন করিয়া মেকী কান্না কাঁদিয়া পুত্রদের এই তথ্য প্রদান এবং নিজেদের সত্যবাদিতার সাক্ষ্যস্বরূপ ইউসুফের রক্তমাখা জামা দেখাইবার পর জামাটি অক্ষত দেখিয়া এবং অন্তর্দৃষ্টি দ্বারা যখন ইয়া'কুব (আ) পুত্রদের মিথ্যাবাদী হওয়া বুঝিতে পারিলেন এবং ইউসুফের বাঁচিয়া থাকিবার ব্যাপারে আশান্বিত হইলেন। তখনও পুত্রদের ধমক প্রদান ও মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করিয়া ইউসুফকে খুঁজিয়া আনিতে বাধ্য করিলেন না কেন?
জবাব: ইয়াকূব (আ)-এর নবীসুলভ ইল্ম ও দূরদর্শিতা সন্তানদিগকে প্রত্যক্ষরূপে মিথ্যুক সাব্যস্ত করিয়া তাহাদিগকে উত্তেজিত করা হইতে বিরত রাখিল এবং তিনি ইহাকে আল্লাহ্র পক্ষ হইতে পরীক্ষা মনে করিয়া প্রকাশ্যে পরম ধৈর্যধারণ ও আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করিবার ঘোষণা দিলেন। তবুও 'তোমাদের অন্তর একটি চক্রান্ত করিয়াছে' বলিয়া তিনি ইঙ্গিতে বুঝাইয়া দিলেন যে, প্রকৃত ব্যাপার তোমরা আমার দৃষ্টি হইতে গোপন করিতে পার নাই (কাসাসুল কুরআন, ১খ., ২৮৬; ফী জিলালিল কুরআন, ৪খ., ৭০৫)।
প্রশ্ন: হযরত ইয়াকুব (আ) পুত্রদের বক্তব্যের জবাবে দুইটি ক্ষেত্রে (بَلْ سَوَّلَتْ لَكُمْ أَنْفُسُكُمْ أَمْرًا) (তোমাদের অন্তর কোন চক্রান্ত করিয়াছে...) বলিয়াছিলেন। প্রথমবার ইউসুফের রক্তমাখা জামা দেখিয়া বিনয়ামীনের চুরির অভিযোগের গ্রেফতার হওয়ায় পুত্রদের বক্তব্যের জবাবে। দ্বিতীয়বার পুত্ররা তাহাদের জানা মুতাবিক সত্যই বলিয়াছিল। সুতরাং ইয়াকুব (আ)-এর মন্তব্য দ্বিতীয়বারে বাস্তব সম্মত না হওয়ার কারণ কি অথবা তাঁহার এই বক্তব্যের প্রকৃত ব্যাখ্যা কি?
জবাব: ইয়াকুব (আ) ইতোপূর্বে ইউসুফ (আ)-এর ঘটনায় তাঁহার এই পুত্রদের সত্যবাদিতার' নমুনা প্রত্যক্ষ করিয়াছিলেন। সুতরাং তিনি তাহাদের প্রতি অবিশ্বাসের বিষয়টি এইরূপে প্রকাশ করিলেন। তাঁহার এই উক্তির তাৎপর্য ছিল এই যে, বিনয়ামীন কখনও চুরি করিতে পারেন না (কাসাসুল কুরআন, ১খ., ৩২৫)। তিনি যেন পুত্রদের বলিলেন, বিনয়ামীনকে নিয়া যাওয়ার পিছনে তোমাদের কোন স্বার্থ কাজ করিতেছিল। অন্যথায় মিসর সম্রাট, তোমরা তাহাকে অবহিত না করিয়া থাকিলে, কিরূপে জানিতে পারিলেন যে, চুরির প্রতিবিধানস্বরূপ চোরকে আটক করিয়া রাখা যায় (মাজহারী, ৫খ., ১৮৮)। তাহা ছাড়া ফিক্হবিদ মুফাসসির লিখিয়াছেন, সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে প্রবল ধারণার পর্যায়ে অভিযুক্ত সাব্যস্ত করা যায় (তাফসীরে মাজেদী, পৃ. ৫০৩, টীকা ১৫৩)।
মোটকথা ইউসুফ (আ)-এর ঘটনায় ইয়াকুব (আ)-এর নিকট পুত্রগণ মিথ্যাবাদী বলিয়া প্রমাণিত হইয়াছিল। সুতরাং এইবারও তিনি পূর্বানুরূপ সন্দেহ পোষণ করিয়া কথাটি বলিয়াছিলেন এবং এইবার তাহারা মিথ্যা না বলিলেও তিনি তাহাদের কথা বিশ্বাস করিতে পারিলেন না। এই প্রসঙ্গে কুরতুবী বলিয়াছেন যে, নবীগণের ইজতিহাদী বক্তব্যে ত্রুটি থাকিলে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হইতে উহা সংশোধনের ব্যবস্থা করা হয় এবং অবশেষে তাঁহারা সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়া থাকেন। তবে দ্বিতীয়বারের এই বক্তব্যের অর্থ এইরূপও হইতে পারে যে, অন্তরদৃষ্টি দ্বারা বা অন্য কোন উপায়ে তিনি বিনয়ামীনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত চুরির অভিযোগ বানায়োট হওয়ার বিষয়টি বুঝিতে পারিয়াছিলেন এবং ইহার পরিণতি যে শুভ হইবে তাহাও তিনি বুঝিতে পারিয়াছিলেন। কেননা তাঁহার পরবর্তী উক্তিতে "আশা করা যায় যে, আল্লাহ তাহাদের সকলকে আমার সহিত মিলিত করিবেন” (عَسَى اللَّهُ أَنْ يَأْتِيَنِي بِهِمْ جَمِيعًا) এই দিকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় (মাআরিফুল কুরআন, ?খ., ২৬, ১১৫, ১১৬)।
প্রশ্ন: পবিত্র কুরআনের সূরা ইউসুফের ২৪ নং আয়াতে আছে, وَلَقَدْ هَمَّتْ بِهِ وَهَمَّ بِهَا ; এখানে শব্দের অর্থ ইচ্ছা এবং ইউসুফও জুলায়খার প্রতি আকৃষ্ট হইয়াছিলেন।
জবাব: এই ইচ্ছার ব্যাখ্যায় মুফাসসিরগণ যাহা বলিয়াছেন, উহার সারসংক্ষেপ নিম্নরূপ: )১( هم শব্দের আভিধানিক অর্থ ইচ্ছা করা। আয়াতের هم শব্দ দ্বারা কুকর্মের ইচ্ছা উদ্দেশ্য নহে বরং জুলায়খার 'ইচ্ছা' ছিল ইউসুফ তাহার আদেশ পালন না করিলে তাহাকে প্রহার ও নির্যাতন করিবার ইচ্ছা এবং ইউসুফ (আ.)-এর 'ইচ্ছা' ছিল পলায়ন করিয়া আত্মরক্ষা করিবার ইচ্ছা (ফী জিলালিল কুরআন, ৪খ., ৭১৩) অথবা জুলায়খার 'ইচ্ছা' ছিল অসৎর্মের ইচ্ছা এবং ইউসুফ (আ)-এর ইচ্ছা ছিল তাহাকে আঘাত করিয়া অথবা দৌড়াইয়া দূরে সরিয়া গিয়া আত্মরক্ষা করিবার ইচ্ছা (শাব্বীর আহমদ উছমানী, তাফসীর, পৃ. ৩০৮)।
কিন্তু কুরআনের বর্ণনা ধারা ও ঘটনার বাস্তবতার প্রতি লক্ষ্য করিয়া অধিকাংশ মুফাসসির বলিয়াছেন, এর অর্থ অসৎকর্মের ইচ্ছা। তবে জুলায়খার ইচ্ছা ছিল প্রচণ্ড এও চুড়ান্ত। আর ইউসুফ (আ) ইচ্ছা করিবার নিকটবর্তী হইয়াছিলেন এবং আরবী ভাষায় ও পবিত্র কুরআনে এই ধরনের ব্যবহার রহিয়াছে। যেমন উযুর বিধান সংক্রান্ত আয়াত اذا قُمْتُمْ إلى الصلاة -এর অর্থ যখন তোমরা সালাতে দাঁড়াইতে উদ্যত হও বা সালাতে দাঁড়াইবার নিকটবর্তী হও। সুতরাং আয়াতের অর্থ যুলায়খা চূড়ান্ত ইচ্ছা করিয়াছিল এবং ইউসুফ (আ)-ও ইচ্ছা করিতে উদ্যত হইতেছিলেন। তবে তাঁহার প্রতিপালকের নিদর্শন দেখিয়া তাঁহার এই ইচ্ছা করিবার ভাবটি কাটিয়া যায় (মাজহারী, ৫খ., ১৫৩, ১৫৪)। আয়াতের শব্দ চয়ন ও বর্ণনা ধারায় এই বাখ্যার প্রতি ইঙ্গিত রহিয়াছে। যুলায়খার ইচ্ছাকে ' অর্থাৎ দৃঢ়তার অর্থবোধক ও قد যুক্ত করিয়া প্রচণ্ড ও চূড়ান্ত হওয়া এবং ইউসুফ (আ)-এর ইচ্ছাকে বিহীন স্বাভাবিকভাবে দ্বারা ব্যক্ত করিয়া দুর্বল ইচ্ছা তথা ইচ্ছার প্রাথমিক স্তর অর্থে হওয়া বুঝানো হইয়াছে পক্ষান্তরে অনেক মুফাসসিরের মতে আয়াতের শব্দ বিন্যাসে অগ্রপশ্চাৎ করা হইয়াছে। অর্থাৎ وهم بها অংশটুকু পরবর্তী ১ শর্তের সহিত সংযুক্ত এবং আয়াতের মূল বিন্যাস ছিল : وَلَقَدْ هَمَّتْ بِهِ لَوْلا أَنْ رَّأْى بُرْهَانَ رَبِّم هم بها )যুলায়খা তাহা চূড়ান্ত ইচ্ছা করিয়াছিল। আর ইউসুফ (আ)-এর অবস্থা এই ছিল যে, তিনি যদি প্রতিপালকের নিদর্শন না দেখিতেন তবে তিনিও ইচ্ছা করিয়া ফেলিতেন)। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তাঁহার নিদর্শন দেখাইয়া ইউসুফ (আ)-কে ইচ্ছা করা হইতে নিবৃত্ত করিলেন। সুতরাং ইউসুফ (আ) কোন ইচ্ছা করিলেন না।
মুফাসসিরগণ এই বাখ্যার অনুকূলে পবিত্র কুরআনের অপর একটি আয়াত: ان كَادَتْ لَتُبْدِي بِهِ لَولا أَنْ رَبَطْنَا উল্লেখ করিয়াছেন এবং আয়াতের মর্ম এই যে, মূসা (আ)-এর ঘটনায় সাগরে ভাসমান শিশু মূসা (আ)-কে তুলিয়া ফিরআওনের বাড়িতে নেওয়ার পর ফিরআওন কর্তৃক তাঁহাকে হত্যা করিবার ইচ্ছা এবং ফিরআওন পত্নী (আছিয়া) কর্তৃক তাহাতে বাধাদানের পরিস্থিতিতে মূসা (আ)-এর মায়ের মনের অবস্থা ছিল এই যে, "যদি আমি তাহার অন্তরকে দৃঢ় না রাখিতাম তবে সে সব রহস্য প্রকাশ করিয়া দিয়াছিল প্রায়" (মাজহারী, ৫খ., ১৫৩, ১৫৪; মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., ৩৭; কাসাসুল কুরআন, ১খ., ২৯১, ২৯২; রূহুল মাআনী, ১২ পারা, পৃ. ২১৩)। এই ব্যাখ্যার মূল কথা এই যে, ইউসুফ (আ) মন্দ কর্মের কোন ইচ্ছাই করেন নাই।
বিশিষ্ট মুফাসসিরগণ বলিয়াছেন যে, আয়াতে যুলায়খা ও ইউসুফ (আ) উভয়ের জন্য هم শব্দ ব্যবহৃত হইলেও উভয়ের জন্য উহা অভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয় নাই। কেননা আরবী ভাষায় শব্দটি যেরূপ চূড়ান্ত ইচ্ছা ও সংকল্প অর্থে তথা স্বেচ্ছার সজ্ঞানে কোন কিছু করিবার মনোভাব অর্থে ব্যবহৃত হয়, তদ্রূপ ইচ্ছাশক্তির নিয়ন্ত্রণ বহির্ভূতরূপে শুধু মনের মধ্যে কোন বিষয় আনাগোনা করা (ওয়াস-ওয়াসা) এবং নিজের এজান্তে ও অনিচ্ছায় কোন কিছুর কল্পনা ও খেয়াল মনে আগত হওয়াকেও هم বলা হয়।
কোন অসৎ কর্মের প্রতি প্রথম প্রকারের هم (অর্থাৎ চূড়ান্ত ইচ্ছা ও সংকল্প) হাদীছে বর্ণিত বার্ধ অনুসারে গোনাহ ও অপরাধরূপে পরিগণিত হয়। তবে এইরূপ সংকল্প করিবার পর কেহ বিরত থাকিলে তাহার আমলনামায় গোনাহের স্থলে একটি সওয়াব লিখিয়া দেওয়া হয়। পক্ষান্তরে দ্বিতীয় প্রকারের هم ইচ্ছাশক্তির নিয়ন্ত্রণ বহির্ভূত হওয়ার কারণে এবং উহা মানুষের স্বভাবজাত ও সাধ্যাতীত হওয়ার কারণে শরীয়াতের দৃষ্টিতে উহা গোনাহ নহে। পবিত্র কুরআনে এবং বুখারী ও মুসলিমসহ বিভিন্ন হাদীছ গ্রন্থের বহু হাদীছে বিষয়টির স্পষ্ট ও বিশদ বর্ণনা রহিয়াছে। বুদ্ধি ও যুক্তির বিচারেও দ্বিতীয় প্রকারের هم -কে অপরাধ সাব্যস্ত করা যায় না। তাফসীরে কুরতুবীতে هم শব্দের এই দ্বিবিধ অর্থ প্রমাণের জন্য আরবী সাহিত্যের গদ্য ও পদ্যের একাধিক উদ্ধৃতি উল্লেখ করা হইয়াছে।
আলোচ্য ক্ষেত্রেও যুলায়খার هم ছিল প্রথম প্রকারের এবং ইউসুফ (আ)-এর هم ছিল দ্বিতীয় প্রকারের। সুতরাং যুলায়খার هم গোনাহ হইলেও ইউসুফ (আ)-এর هم গোনাহ ছিল না। কেননা, উহা ছিল কোন উত্তম খাদ্যের ঘ্রাণ নাকে পৌছিলে উহার প্রতি মানুষের স্বভাবজাত আকর্ষণ সৃষ্টি হওয়ার ন্যায় এবং প্রচণ্ড খরতাপের দিনে ঠাণ্ডা পানি দেখিয়া উহার প্রতি রোযাদারের স্বভাবজাত আকর্ষণের ন্যায়। অথচ এই আকর্ষণকে কেহই অপরাধ বলিবে না, বরং উহা নিয়ন্ত্রণ করিয়া আত্মরক্ষা করাকে প্রশংসাযোগ্য বিবেচিত হয়। পবিত্র কুরআনে আলোচ্য বিষয়টির বর্ণনাধারাও যুলায়খা ও ইউসুফের هم বিভিন্ন হওয়ার ইঙ্গিত প্রদান করে। কেননা উভয়ের ইচ্ছা অভিন্ন হইলে 'তাহারা একে অপরের প্রতি ইচ্ছা করিল' অথবা দ্বিবচন ক্রিয়ারূপে 'তাহারা উভয়ে ইচ্ছা করিল' বলাই সমীচীন ছিল। (পূর্বোল্লিখিত) যুলায়খার ক্ষেত্রে দৃঢ়তাবোধক (لقد) যুক্ত করা এবং ইউসুফ (আ.)-এর ক্ষেত্রে স্বাভাবিক هم বলা দ্বারা দুই هم -এর পার্থক্যের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
ইহা ছাড়া পূর্বাপর বিভিন্ন আয়াতে ইউসুফ (আ.)-এর নিষ্কলুষ থাকার স্পষ্ট ইঙ্গিত ব্যক্ত হইয়াছে। যেমন معاذ الله বলিয়া আল্লাহর শরণাপন্ন হওয়া, কুকর্মের অশুভ পরিণতির কথা স্মরণ করা إِنَّهُ لأَيُفْلِحُ الظَّالِمُونَ, মনিবের অনুগ্রহের কথা স্মরণ করা (إِنَّهُ رَبِّى أَحْسَنَ مَثْوَاىَ), সে নারীই আমাকে ফুন্সলাইয়াছে এবং আমি অসাক্ষাতে বিশ্বাসঘাতকতা করি নাই (أَنِّى لَمْ أَخُنْهُ بِالْغَيْبِ) বলিয়া আত্মবিশ্বাসের সহিত আত্মপক্ষ সমর্থন করা, তাহা ছাড়াও সবরের সুফল লাভ করিবার উদ্ধৃতি দেওয়া (أَنَّهُ مَنْ يَتَّقِ وَيَصْبِرْ) এবং আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হইতে বিশিষ্ট বান্দাদের তালিকাভুক্ত (عِبَادِنَا الْمُخْلَصِينَ) ঘোষণা করা ইত্যাদি দ্বারা ইউসুফ (আ) সম্পূর্ণ নির্দোষ হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়। তদ্রূপ لِنَصْرِفَ عَنْهُ السُّوْءَ وَالْفَحْشَاءَ 'মন্দ' ও 'অশ্লীলতা' হইতে দূরে রাখিবার জন্য' দ্বারা তো সর্বপ্রকার কবীরা ও সগীরা গোনাহ হইতে মুক্ত রাখিবার ঘোষণা দেওয়া হইয়াছে। কেননা এই আয়াতে نَحْ অর্থাৎ অশ্লীলতা) দ্বারা কবীরা ও سُرْ অর্থাৎ মন্দ) দ্বারা সগীরা গুনাহ বোঝানো হইয়াছে।
হযরত ইউসুফ (আ)-এর অপাপবিদ্ধ ও পূত-পবিত্র থাকিবার ব্যাপারে মুসলিম শরীফের একটি হাদীছে রহিয়াছে, ইউসুফ (আ) এই কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হইলে ফেরেশতারা আল্লাহ তা'আলাকে বলিলেন, আপনার এই বিশিষ্ট বান্দা গুনাহের ফিকিরে রহিয়াছে। অথচ সে উহার ধ্বংসাত্মক পরিণতরি কথা উত্তমরূপেই অবগত রহিয়াছে! আল্লাহ তা'আলা বলিলেন, তোমরা একটু প্রতীক্ষা কর। সে যদি গুনাহ করিয়াই ফেলে তবে তাহার কৃতকর্ম তাহার আমলনামায় লিখিয়া দিবে। আর যদি সে উহা পরিত্যাগ করে তবে গুনাহের স্থলে তাহার আমলনামায় নেকী লিখিয়া দিবে। কেননা সে শুধু আমার প্রতি ভয়ের কারণেই নিজের কুচাহিদা বর্জন করিয়াছে (কুরতুবীর বরাতে মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., ৩৭)।
মোটকথা, ইউসুফ (আ)-এর অন্তরে যে কল্পনা বা আকর্ষণের উদ্ভব হইয়াছিল উহা ছিল ইচ্ছা বহির্ভূত ওয়াসওয়াসা স্তরের, যাহা প্রথমত গুনাহরূপে বিবেচিত নহে। তদুপরি এই ওয়াসাওয়াসার বিপরীত আমল করিবার কারণে এবং মানবিক স্বভাবজাত রিপু ও চাহিদা সত্ত্বেও গুনাহ হইতে আত্মরক্ষা করিবার কারণে ইউসুফ (আ)-এর তাকওয়া ও পবিত্রতার স্তর এবং আল্লাহ তা'আলার নিকটে তাঁহার মর্যাদার স্তর আরও অধিক সমুন্নত হইয়া থাকিবে (মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., ৩৭)。
প্রশ্ন: হযরত ইউসুফ (আ)-এর সমগ্র ঘটনায় একটি প্রশ্ন বার বার উঁকি দেয়। উহা এই যে, ইউসুফ (আ) তাঁহার প্রতি তাঁহার পিতার প্রচণ্ড ভালবাসার কথা ভালভাবেই জানিতেন ও বুঝিতেন। তদুপরি ইউসুফ (আ) নবীও ছিলেন এবং পিতার হক সম্পর্কে সম্যক অবহিতও ছিলেন। এমতাবস্থায় বিচ্ছেদের সুদীর্ঘকাল একবারও তিনি পিতার নিকট প্রত্যাবর্তন কিংবা অন্তত তাঁহাকে নিজের অবস্থা ও অবস্থান সম্পর্কে অবহিত করিলেন না কেন?
জবাব: এই সবই ছিল মহাবিজ্ঞ ও প্রজ্ঞাবান আল্লাহ্র মহিমার বহিঃপ্রকাশ এবং সব কিছুই আল্লাহ তা'আলার আদেশে ও প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে সংঘটিত হইতেছিল। কুরতুবী ইবন আব্বাস (রা)-এর একটি বর্ণনা উদ্ধৃত করিয়াছেন যে, মিসরে পৌঁছিবার পর আল্লাহ তা'আলা ওয়াহীর মাধ্যমে ইউসুফ (আ)-কে তাঁহার কোন প্রকার সংবাদ বাড়িতে পাঠাইতে নিষেধ করিয়া দিয়াছিলেন। বাহ্যত আল্লাহ পাকের এই নিষেধাজ্ঞার কারণ ছিল আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হইতে ইয়া'কূবকে বিপদাপন্ন করিয়া তাঁহার পরীক্ষার পূর্ণাঙ্গতা বিধান করা (কুরতুবীর বরাতে মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., পৃ. ২৪, ৮৭, ১০৫, ১১৮; মাজহারী, ৫খ., পৃ. ১৮৭; কাসাকুল কুরআন, ১খ., ৩২৩)।
প্রশ্ন: ইউসুফ (আ) নিরুদ্দেশ হওয়ার দীর্ঘকাল পর ইয়া'কূব (আ) পুত্রদিগকে তাঁহার সন্ধান লাভের চেষ্টা করিতে আদেশ দিলেন এবং সুদূর হইতে ইউসুফ (আ)-এর সুঘ্রাণ অনুভব করিলেন। অথচ তাঁহার নিরুদ্দেশ হওয়ার প্রথম ধাপে, যখন তিনি ইয়া'কূব (আ)-এর নিবাসের নিকটবর্তী কূপে তিন দিন যাবত পতিত ছিলেন তখন তাঁহার ঘ্রাণ পাইলেন না কেন এবং পুত্রদের অবিশ্বাস করিবার পরেও নিকটবর্তী স্থানে ইউসুফ (আ.)-এর সন্ধানে প্রবৃত্ত হইলেন না কেন?
জবাব: সমগ্র ঘটনাটি ছিল আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হইতে ইয়া'কূব (সা) পরীক্ষাস্বরূপ। সুতরাং ইউসুফ (আ)-এর কূপে অবস্থানকালে আল্লাহ তা'আলাই ইয়া'কূব (আ)-এর চিন্তা ও মনোযোগ ইউসুফ (আ)-কে সন্ধান করিবার প্রতি ধাবিত হওয়া থেকে বিরত রাখিয়াছেন অথবা এমন হওয়াও বিচিত্র নয় যে, ইয়া'কুব (আ) আল্লাহ্র পক্ষ হইতে তাঁহাকে পরীক্ষা করিবার বিষয়টি অনুভব করিতে পারিয়াছিলেন এবং সেজন্য সর্বাবস্থায় আল্লাহ্র উপর নির্ভরশীল থাকিবার পন্থা অবলম্বন করিয়াছিলেন। ১৮ নং আয়াতের ফাসাবরুন জামিল (আমি সবর করিয়াই যাইব) দ্বারা এই অবস্থার ইংগিত পাওয়া যায়। পরবর্তী সময় পরীক্ষার মেয়াদ সম্পূর্ণ হওয়ার আভাস লাভ করিয়া পুত্রের সন্ধানের কাজ আরম্ভ করিলেন অথবা ইউসুফ (আ) সম্পর্কে তিনি যে স্বপ্ন দেখিয়াছিলেন এবং ইউসুফ (আ) নিজে যে স্বপ্ন দেখিয়াছিলেন উহার বাস্তবায়ন অবশ্যম্ভাবী জানিয়া ইয়া'কুব (আ) ঘটনার পরিণতি পর্যন্ত অপেক্ষা করিতেছিলেন। নিকট হইতে ঘ্রাণ না পাওয়া ও সুদূর হইতে ঘ্রাণ পাওয়ার বিষয়টি ছিল একটি মু'জিযা (মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., ১১৮, ১১৯, ১২৮, ১৩১)।
এই জবাবে এই ধরনের আরও একটি প্রশ্নের সমাধান হইয়া যায়। প্রশ্নটি এই যে, ইয়া'কূব (আ) পুরুষানুক্রমে নবী ছিলেন এবং পরিবার ছিল ইবরাহীম (আ)-এর বংশধর। সুতরাং সমাজে তাঁহারা বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন ও জনপ্রিয় হওয়াই স্বাভাবিক। এই অবস্থায় ইয়া'কুব (আ)-এর প্রিয়পাত্র ও আদরের সন্তান নিরুদ্দেশ হওয়ার পর স্থানীয় জনগণ কর্তৃক নিরুদ্দেশ ইউসুফের সন্ধানে কোন প্রকার তৎপরতার উল্লেখ পবিত্র কুরআনে বা ইতিহাসে পাওয়া যায় না। তদ্রূপ দুর্ভিক্ষের পূর্বেও কানআনবাসীদের মিসরে যাতায়াত সম্ভাব্য বিষয় ছিল এবং মিসরের প্রধানমন্ত্রীর বাড়ির ঘটনা, ইউসুফের কারাগমন এবং সবশেষে এক গোলামের মিসরের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার বিষয়টি চর্চা হওয়া ও কোন কানআনবাসীর কর্ণগোচর হওয়া অস্বাভাবিক ছিল না। কিন্তু এই ধরনের কোন কিছুর আভাস পূর্ণ কাহিনীর কোথাও পাওয়া যায় না। ইহারও একমাত্র কারণ এই যে, আল্লাহ তা'আলার হুকুম ও মনজুর না হইলে কোন স্বাভাবিক বিষয়ও স্বাভাবিকরূপে সংঘটিত হয় না এবং হুকুম ও মঞ্জুরী হইয়া গেলে অস্বাভাবিক উপায়েও বহু কর্ম সংঘটিত হইয়া থাকে (রূহুল মা'আনী, ১৩ পারা, পৃ. ৫৭)
প্রশ্ন: সন্তানের প্রতি মানুষের স্নেহ মমতা. ও ভালবাসা সহজাত বিষয়। কিন্তু ইউসুফ (আ)-এর প্রতি ইয়া'কূব (আ)-এর আকর্ষণ ও ভালবাসা এক কথায় নজিরবিহীন। একজন নবী হইয়া কোন 'গায়রুল্লাহ'কে এই পরিমাণ ভালবাসিবার কারণ কি ছিল?
জবাব: পুত্রের প্রতি ইয়া'কূব (আ)-এর ভালবাসা ছিল ইউসুফ (আ)-এর অস্তিত্বে বিদ্যমান সমুজ্জল ভবিষ্যতের ও নবুওয়াতের দীপ্তিমান সৌন্দর্যের ভালবাসা। সুতরাং এই ভালবাসাও ছিল অপার্থিব ও আখিরাতমুখী ভালবাসা। মুজাদ্দিদ আলফে ছানী (র)-এর আধ্যাত্মিক গবেষণা অনুযায়ী, ইহা জাগতিক কোন বিষয়, উহা যতই আকর্ষণীয় ও সুন্দর হউক, উহার প্রতি ভালবাসা অবশ্যই গর্হিত ও নিন্দনীয় বিষয়। তবে পৃথিবীতে এমন কিছু বিষয় রহিয়াছে যাহা মূলত আখিরাতের সহিত সম্পৃক্ত এবং উহার প্রতি ভালবাসা প্রকৃত বিচারে আখিরাতের ভালবাসারূপেই বিবেচিত। মুজাদ্দিদ (র)-এর মতে, হযরত ইউসুফ (আ)-এর সমগ্র অস্তিত্ব ছিল পৃথিবীর বুকে একটি আখিরাতের বিষয় তথা একটি জান্নাতী অস্তিত্ব। ইয়া'কূব (আ)-এর প্রচণ্ড ভালবাসা ছিল পৃথিবীর বুকে বিদ্যমান এই আখিরাতী বিষয় ও জান্নাতী বস্তুর প্রতি ভালবাসা। সুতরাং উহা নবুওয়াতী মর্যাদার পরিপন্থী নহে (তাফসীরে মাজহারী, ৫খ., ১৮৮-১৯০; মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., ১১৭, ১১৮)।
📄 হযরত ইউসুফ (আ)-এর জীবন চরিতে শিক্ষণীয় বিষয়
ইতিহাসের তথ্য মানবজীবনের ঘাত-প্রতিঘাত, সুখ-দুঃখ আনন্দ-বেদনা, সুযোগ-দুর্যোগ ও সংকট সমাধানের ক্ষেত্রে মানুষের বিভিন্নমুখী স্বভাব-চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ এবং উল্লিখিত পরিস্থিতিসমূহে মানুষের করণীয় সম্পর্কে শিক্ষার বহুল উপকরণ।
(ক) ঐতিহাসিক তথ্য- উপকরণ: ইউসুফ (আ)-এর ঘটনায় কানআনবাসী বনী ইসরাঈলের মিসর গমনের পটভূমি বিবৃত হইয়াছে। সেই সাথে ইতিহাসের জন্য প্রয়োজনীয় সমকালীন বিশ্বের রাষ্ট্রীয় তথা রাজনৈতিক, সামাজিক, নৈতিক ও ধর্মীয় রীতিনীতি ও মূল্যবোধের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ রহিয়াছে। ইয়া'কূব ও ইউসুফ (আ)-এর সমকালে বর্তমান যুগের ন্যায় একদিকে নগর সভ্যতা ও অপরদিকে অবহেলিত ও পশ্চাদপদ অথবা নিরুপদ্রব কোলাহলমুক্ত পল্লী জীবনের আভাস ইহাতে পাওয়া যায়। রাষ্ট্র ব্যবস্থায় নিরংকুশ রাজতন্ত্রের সাথে সক্রিয় মন্ত্রী পরিষদের অস্তিত্ব মোটামুটি সুশৃঙ্খল ও সংহত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি স্বেচ্ছাচারিতার উপস্থিতি ও আযীয মিসর কর্তৃক পারিবারিক মান-মর্যাদা রক্ষার খাতিরে নির্দোষ ইউসুফকে কারাগারে প্রেরণ দ্বারা প্রমাণিত হয়। আবার উচ্চতর আদালতে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে কারারুদ্ধ ব্যক্তির মুক্তি লাভ এবং তাঁহার যোগ্যতা ও গুণের কদর করিয়া তাঁহার বিগত জীবনে গোলাম থাকিবার বিষয়টি উপেক্ষা করিয়া শাসন-প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদে আসীন করা দ্বারা একদিকে যোগ্যতার কদর ও অপরদিকে রাজার নিরংকুশ ক্ষমতার আভাসও পাওয়া যায়। ইহা ছাড়া পূর্বাপর ঘটনাবলীর বিবরণে উপর তলায় ক্ষমতার অপব্যবহারের অস্তিত্ব থাকিলেও সাধারণভাবে ব্যাপক দুর্নীতিমুক্ত আইনের শাসন প্রচলিত থাকিবার, নাগরিক কল্যাণ ও প্রজা পালনে রাষ্ট্রের কর্তব্যপরায়ণতা, নাগরিক অধিকার রক্ষা, সাধারণভাবে জনতার আইন মানিয়া চলা, খাদ্য সংগ্রহ ও বণ্টনের নীতিমালা প্রতিপালন, চুরির শাস্তি প্রদানে রাষ্ট্রীয় বিধান লংঘনের সুযোগ না থাকা ইত্যাদির প্রতি ইউসুফ (আ)-এর ঘটনায় আলোকপাত হইয়াছে। আধুনিক নগর সভ্যতার উপকরণসমূহ রাজ-প্রাসাদ, অভিজাত আবাসিক এলাকা, হাটবাজার ও বাণিজ্য কেন্দ্র, আইন-শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদের জন্য কারাগার ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশের সুরক্ষার জন্য নগর পরিধির বাহিরে কারাগারের অবস্থান, আধুনিক আপ্যায়ন ভোজ সভা, সোফাসেট, ছুরি, চাকুর ব্যবহারমুক্ত সুখী সমৃদ্ধ বিলাসী জীবন ইত্যাদির প্রতিও স্পষ্ট ইংগিত পাওয়া যায়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বাণিজ্য কাফেলাসমূহের দূর-দূরান্তে গমনাগমন, মিসরের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্র হওয়ার সাথে সাথে সহজেই মানুষকে গোলাম-বাঁদী বানানো এবং পশুপালের ন্যায় মানুষ ক্রয়-বিক্রয়ের হাটবাজারের অস্তিত্বের সন্ধান ইহাতে পাওয়া যায়। বাণিজ্যিক কাফেলা ছাড়া দুর্ভিক্ষকালে দেশে-বিদেশে বহু কাফেলার মিসরমুখী অভিযাত্রাও লক্ষণীয়।
রাষ্ট্রীয় জীবনের ক্ষেত্রে আরও একটি বিষয় লক্ষণীয়। উহা এই যে, আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার ভৌগোলিক সীমান্ত চিহ্নিতকরণ, সীমান্ত রক্ষা ব্যবস্থা ও তদুদ্দেশ্যে বাহিনী গঠন এবং রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা রক্ষার জন্য পূর্ণাঙ্গ পাসপোর্ট ও ভিসা ব্যবস্থার প্রচলন না থাকিলেও দেশী-বিদেশী পরিচয় যাচাইয়ের ব্যবস্থা বহুলাংশে বিদ্যমান ছিল এবং ইউসুফ ভ্রাতৃবর্গকে গুপ্তচর বৃত্তির অভিযোগের সম্মুখীন হইতে হইয়াছিল। এই ক্ষেত্রে সর্বাধিক লক্ষণীয় বিষয় ইয়া'কুব (আ) ও তাঁহার পুত্রদের অভিবাসন ও 'নাগরিকত্ব' প্রদান প্রক্রিয়া যাহা রাজার প্রত্যক্ষ নির্দেশ বা অনুমোদনে সম্পন্ন হইয়াছিল। ইহা ছাড়াও বিদেশী ইউসুফ (আ)-কে রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে গ্রহণের স্বীকৃতিও লক্ষণীয়। আবার বনী ইসরাঈলের সুদীর্ঘ কাল (প্রায় চার শত বৎসর) মিসরে অবস্থান এবং সেখানকার জন-জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হওয়ার পরেও নাগরিক অধিকারে বৈষম্য, তাহাদের উপর 'বিদেশী' ছাপ অব্যাহত থাকা ও দাসসুলভ জীবন-যাপন করা এবং অবশেষে মিসর ত্যাগে বাধ্য হওয়া বর্তমান যুগের আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রীয় পরিস্থিতির সহিত তুলনীয়।
সামাজিক জীবন, সংস্কৃতি ও নৈতিকতার ক্ষেত্রে আধুনিকতা ও প্রাচুর্যপূর্ণ বিলাসী জীবন যাপনের অপরিহার্য পরিণতিরূপে নৈতিকতা ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, নারী স্বাধীনতার নামে যথেচ্ছাচারিতা ও বল্লাহীনতা, বিশেষত উপর তলার সমাজে অশ্লীলতা ও অধিকারের নামে নারীর লজ্জাহীনতা, পরকীয়া প্রেমের চর্চা, নারীর উপর পুরুষের নিয়ন্ত্রণহীনতা এবং নারীর কাছে পুরুষের এক ধরনের 'বশীভূত' জীবন যাপন দ্বারা সমকালীন মিসরীয় সমাজে প্রচলিত থাকার প্রমাণ ইউসুফ বৃত্তান্তে বিদ্যমান। জুলায়খা ও তাহার সখীদের আচরণ হইতে ইহার প্রমাণ পাওয়া যায় (দ্র. ফী জিলালিল কুরআন, ৪খ., ৬৬৩, ৬৬৯, ৬৭০)। ইউসুফ (আ)-এর জীবন কাহিনী হইতে তখনকার মিসরীয় সমাজে মদের বহুল ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়। রাজাকে সূরা পরিবেশনের জন্য স্বতন্ত্র কর্মচারী বা সাকী ছিল। সাকীর দেখা স্বপ্নে মদ তৈরীর (اعصر خمرا) উল্লেখ রহিয়াছে।
তখনকার কানআনী ও মিসরীয় সমাজে এবং নবী পরিবার ও রাজপরিবারে স্বপ্নের ব্যাখ্যা সংক্রান্ত জ্ঞানের চর্চা বিদ্যমান ছিল। প্রসঙ্গত ইয়াকুব (আ), ইউসুফ (আ), বন্দীদ্বয় ও রাজার স্বপ্ন এবং ইউসুফ (আ)-কে স্বপ্নের ব্যাখ্যার ইল্ম প্রদান এবং ইউসুফ (আ) কর্তৃক আল্লাহ প্রদত্ত এই যোগ্যতার জন্য শুকরিয়া আদায় প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য (দ্র. ১২:৪, ২১, ৩৬, ১০১)。
📄 সমকালীন ধর্মীয় অবস্থা
কানআন ইবরাহীমী বংশধরদের প্রভাবিত অঞ্চল হইলেও ইহার আশপাশে তখনও মূর্তি পূজার প্রচলন ছিল। এ প্রসঙ্গে ইউসুফ (আ.)-এর মাতা কর্তৃক ইউসুফের নানার মূর্তি সরাইয়া ফেলিবার পরামর্শ প্রদান উল্লেখযোগ্য। মিসরে তখন পৌত্তলিকতা ও আখিরাতের প্রতি অবিশ্বাস বিরাজ করিতেছিল। কারাগারে বন্দীদ্বয়ের স্বপ্ন ব্যাখ্যার প্রাক্কালে ইউসুফ (আ)-এর ভাষণে ইহার উল্লেখ রহিয়াছে (تَرَكْتُ مِلَّةَ قَوْمٍ لا يُؤْمِنُونَ بالآخرة) - ১২ : ৩৭ ; (أَرْبَابُ مُتَفَرِّقُونَ) - ১২ : ৩৯ ; (أَسْمَاءُ سَمَّيْتُمُوهَا) রাজা ও ক্ষমতাসীনরা অবতারের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত ছিল (পূর্ব আলোচনা দ্র.)। এমনকি পরবর্তী ফির'আওন নিজেকে 'বড় খোদা' বলিয়া দাবি করিয়াছিল। তবে সন্নিকটে ইবরাহীম একত্ববাদের প্রভাব অথবা মিসর অঞ্চলে পূর্ববর্তী নবীগণের সঠিক ধর্মের অবশিষ্ট প্রভাবরূপে একত্ববাদ, আখিরাত, আল্লাহ্র ভয় ইত্যাদি বিষয় সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয় নাই। যুলায়খার ফুসলানোর জবাবে 'মাআযাল্লাহ' বলা, অনাচারীরা সফলকাম হয় না বলা (১২ঃ ২৩), আল্লাহ বিশ্বাস ভঙ্গকারীদের সার্থকতা দান করেন না (১২: ৫২) বলা, আযীয মিসর কর্তৃক যুলায়খাকে অপরাধী সাব্যস্ত করিয়া ইসতিগফার করিতে বলা (১২: ২৯), চুরির অভিযোগ খশুনে ইউসুফ ভ্রাতৃবৃর্গের 'আল্লাহর নামে কসম খাওয়া (১২ঃ ৭৩) এবং আল্লাহর নামে দোহাই দিয়া ইউসুফ ভ্রাতৃবৃর্গের অপরিচিত ও ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে অপরিজ্ঞাত আযীয— ইউসুফের নিকট ব্যাখ্যা চাওয়া ইত্যাদি দ্বারা সামগ্রিকভাবে আল্লাহ্র অস্তিত্বে বিশ্বাসের আভাস পাওয়া যায়। ইহা ছাড়া কারাগারে তাওহীদের অনুকূলে ইউসুফ (আ)-এর ভাষণ ও ইউসুফ (আ)-এর আহবানে রাজার ইসলাম গ্রহণ দ্বারা অন্তত ধর্মীয় ব্যাপারে নমনীয়তার আভাস পাওয়া যায়। রাজার ইসলাম গ্রহণ ইউসুফ (আ)-এর চেষ্টা ও প্রভাবের ফল হইলে মিসরীয় সমাজ কর্তৃক তাহাদের রাজার ধর্ম পরিবর্তন এবং ইউসুফ (আ)-কে আযীয পদে কোন সামাজিক বা রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না হওয়া দ্বারা একদিকে দীন প্রচারে সফলতার প্রমাণের সাথে সাথে মিসরীয় সমাজে তাওহীদ বিদ্যমান থাকা ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে সামাজিক নমনীয়তার প্রমাণ পাওয়া যায়।
📄 মানবজীবনের জন্য শিক্ষণীয় বিষয়
(১) ইউসুফ (আ)-এর স্বপ্ন বর্ণনার পর ইয়াকূব (আ) কর্তৃক তাঁহার স্বপ্ন ভাইদের নিকট বর্ণনা করিতে নিষেধ করা দ্বারা বুঝা যায় যে, স্বপ্ন যে কোন লোকের নিকট বর্ণনা করা সঙ্গত নয় (১২: ৫)। হাদীছ শরীফেও অনুরূপ নির্দেশ রহিয়াছে (মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ, ১০)।
(২) পাপাচারী মুসলিম, এমনকি অমুসলিমের স্বপ্নও সত্য হইতে পারে। ইউসুফ (আ)-এর ঘটনায় দুই বন্দীর স্বপ্ন ও বাদশাহ্র স্বপ্ন ইহার প্রমাণ।
(৩) কাহারও অনিষ্ট হইতে রক্ষা করিবার জন্য তাহার কুস্বভাব বা মন্দ ইচ্ছা সম্পর্কে কাহাকেও সতর্ক করা বৈধ, ইহা গীবত বা পরনিন্দা নয়। ইউসুফ (আ)-এর ভাইদের শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করার ঘটনা ইহার প্রমাণ।
(৪) নিজের সুখ ও উন্নতির কথা প্রকাশ পাইলে কেহ হিংসা করিতে পারে বা ক্ষতি সাধনের চেষ্টা করিতে পারে এমন আশংকা থাকিলে উহা প্রকাশ না করাই সমীচীন।
(৫) ইউসুফ (আ)-এর স্বপ্নের ব্যাখ্যা সুদীর্ঘকাল পরেও প্রকাশ পাওয়া দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, কোন কোন স্বপ্নের বাস্তবায়ন দীর্ঘকাল পরেও হইতে পারে (মাআরিফ, ৫খ., ১১, ১২)।
(৬) ইউসুফ (আ)-কে ভ্রমণ-বিনোদন ও খেলাধুলায় নিয়া যাওয়া সংক্রান্ত পুত্রদের প্রস্তাবে ইয়াকুব (আ) তাঁহার নিরাপত্তার ব্যাপারে চিন্তিত হওয়ার কথা বলিয়াছিলেন, খেলাধূলার অবৈধতার প্রশ্ন উত্থাপন করেন নাই। ইহাতে ভ্রমণ-বিনোদন ও খেলাধূলার বৈধতা সাব্যস্ত হয়। সহীহ হাদীছেও শরীআতের সীমারেখা লংঘিত না হওয়ার শর্তে ইহার বৈধতা বিবৃত হইয়াছে (ঐ, ৫খ., ২১)।
(৭) ইউসুফ (আ)-এর অক্ষত জামা দেখিয়া ইয়াকুব (আ) পুত্রদের মিথ্যা ভাষণের বিষয়টি আঁচ করিয়াছিলেন। ইহা দ্বারা বুঝা যায় যে, বিচারক ও সালিশগণকে বাদী-বিবাদীর দাবি ও প্রমাণের সহিত আনুসংগিক আলামত ও নিদর্শনের প্রতিও লক্ষ্য রাখিতে হইবে (ঐ, ৫খ., ২৫, ২৬)।
(৮) পাপের কাজ হইতে আত্মরক্ষা করিবার জন্য সর্বাধিক শক্তিশালী উপায় আল্লাহর শরণাপন্ন হওয়া ও তাঁহার সাহায্য প্রার্থনা করা। যুলায়খার আহবানকালে ইউসুফ (আ)-এর معاذ الله বলা দ্বারা ইহার প্রমাণ পাওয়া যায় (ঐ, ৫খ, ৩৩)।
(৯) রুদ্ধদ্বার কক্ষ হইতে ইউসুফ (আ)-এর পলায়নের প্রচেষ্টা দ্বারা বুঝা যায় যে, কোন স্থানে পাপে লিপ্ত হওয়ার আংশকা দেখা দিলে সে স্থান ত্যাগ করিয়া অন্যত্র অবস্থান এবং সম্পূর্ণ নিরুপায় অবস্থায়ও আল্লাহ্র উপর ভরসা করিয়া নিজের ক্ষুদ্র শক্তি ও সাধ্য অনুসারে কাজ করা বাঞ্ছণীয় (ঐ, ৫খ., ৪৩)।
(১০) ইউসুফ (আ)-এর আত্মপক্ষ সমর্থন (راودَتْنيى عن نَفْسى ; ১২: ২৬) দ্বারা বুঝা যায় যে, মিথ্যা অপবাদ মাথায় পাতিয়া নেওয়া তাওয়াকুল বা বুযুর্গী নহে, বরং উহার প্রতিবাদ করিয়া নিজের সাফাই পেশ করাই নবীগণের সুন্নাত (ঐ, ৫খ., ৪৪)।
(১১) অপরাধী সনাক্তকরণ ও মোকদ্দমার ফয়সালার জন্য সাক্ষ্য-প্রমাণই মৌলিক বিষয়। তবে আনুষঙ্গিক আলামত দ্বারা ঘটনার যথার্থতা উদ্ঘাটন করিবার জন্য সহায়তা গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়। ইউসুফ (আ)-এর ঘটনায় জামা পিছন হইতে ছেঁড়া হওয়া যুলায়খার অপরাধের আলমতরূপে বিবেচিত হইয়াছিল (ঐ. ৫খ., ৪৫)।
(১২) إِنْ كَيْدَكُنَّ عَظِيمٌ (তোমাদের চক্রান্ত ভীষণ) এই আয়াত দ্বারা নারীদের হইতে সতর্ক থাকার ইঙ্গিত পাওয়া যায় (কুরতুবীর বরাতে মাআরিফুল কুরআন, ৫খ., পৃ. ৪৬)।
(১৩) গুনাহ ও আল্লাহ্ অসন্তুষ্টির কাজে লিপ্ত হওয়ার চেয়ে কোন পার্থিব বিপদ বরণ করা উত্তম। "তাহারা যেদিকে আমাকে আহবান করিতেছে উহার চেয়ে কারাগার আমার নিকট অধিকতর পছন্দনীয়" ইউসুফ (আ)-এর উক্তি দ্বারা বিষয়টি প্রমাণিত হয় (ঐ, ৫খ., ৫১)। হাদীছে উভয় সংকটের ক্ষেত্রে সহজতরটি গ্রহণ করিবার নির্দেশ রহিয়াছে।
(১৪) জেলখানার বন্দীদ্বয়ের স্বপ্নের ব্যাখ্যা প্রদানের সুযোগে তাহাদিগকে দীনের দাওয়াত প্রদান এবং তাহাদিগকে আকৃষ্ট করিবার জন্য ইউসুফ (আ) কর্তৃক নিজের বিশেষ গুণের উল্লেখ দ্বারা দা'ঈ ও মুবাল্লিগদের জন্য এই শিক্ষণীয় বিষয় লাভ করা যায় যে, দীনের দা'ঈ ও মুবাল্লিগ সর্বদা তাহার কর্মসূচীর জন্য সুযোগের সদ্ব্যবহার করিবেন এবং জনগণকে আকৃষ্ট করিবার জন্য প্রয়োজনে নিজের বাস্তব যোগ্যতার কথা বিনয়ের সহিত প্রকাশ করিতে পারিবেন (ঐ, ৫খ., ৪৬)।
(১৫) জেলে অবস্থানকালে ইউসুফ (আ)-এর আচরণ, বিশেষত জেলের অপরাধীদের সহিত তাঁহাদের সহমর্মিতা ও সহযাত্রী বন্দীদ্বয়ের সহিত আচার-ব্যবহারের মধ্যে শিক্ষণীয় বিষয় রহিয়াছে।
(১৬) বন্দীদ্বয়ের বক্তব্য 'আমরা আপনাকে সৎকর্মশীল দেখিতেছি' (نَرَاكَ مِنَ الْمُحْسنين : ১২: ৩৬) দ্বারা বুঝা যায় যে, স্বপ্নের ব্যাখ্যা পুণ্যবান লোকের নিকট জিজ্ঞাসা করিতে হইবে (ঐ, ৫খ, ৫৮)।
(১৭) ইউসুফ (আ) বন্দীদ্বয়ের মধ্যে মুক্তিপ্রাপ্ত সাকীকে রাজার নিকটে তাঁহার সম্পর্কে আলোচনা করিবার অনুরোধ করিয়াছিলেন। ইহা প্রমাণ করে যে, সমস্যার সমাধান ও বিপদমুক্তির জন্য কাহাকেও মাধ্যমরূপে গ্রহণ করা তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী নয় (ঐ, ৫খ, ৫৯)।
(১৮) মুক্তিপ্রাপ্ত বন্দীর ইউসুফ (আ)-এর কথা ভুলিয়া যাওয়া দ্বারা এই ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, কোন মানুষকে বিপদ মুক্তির মাধ্যমরূপে গ্রহণ করা অবৈধ না হইলেও বিশিষ্ট ব্যক্তি ও নবীগণের জন্য আল্লাহ ও তাঁহাদের মধ্যে কোন মাধ্যম থাকা বাঞ্ছনীয় নয় (ঐ, ৫খ., ৫৯)।
(১৯) অন্যায়ভাবে কারারুদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও ইউসুফ (আ) বাদশাহর স্বপ্নের ব্যাখ্যার সহিত দুর্ভিক্ষের কবল হইতে দেশবাসীকে রক্ষা করিবার উপায়ও স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হইয়া ব্যক্ত করিয়াছিলেন। একজন আদর্শ মুমিনের করণীয়ও অনুরূপ (ঐ, ৫খ., ৬৪)।
(২০) মুক্তিপ্রাপ্ত বন্দী কর্তৃক ইউসুফ (আ) সম্পর্কে অবহিত হইবার পর বাদশাহর স্বপ্নের সূত্রে ইউসুফ (আ)-এর মুক্তি লাভের দ্বারা বুঝা যায় যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁহার বিশিষ্ট বান্দাগণকে কাহারও অনুগ্রহ বা উপকারের পাত্র না বানাইয়া নিজের পক্ষ হইতে তাহাদের পরিত্রাণের ব্যবস্থা করিয়া থাকেন (ঐ, ৫খ., ৬৯)。
(২১) মুক্তিপ্রাপ্ত বন্দী দীর্ঘদিন পরে রাজার স্বপ্নের ব্যাখ্যা আনিবার জন্য কারাগারে আসিলে ইউসুফ (আ) তাঁহার কথা ভুলিয়া যাওয়ায় সাকীকে কোনরূপ ভর্ৎসনাও করিলেন না। ইহা দ্বারা এইরূপ ক্ষেত্রে করণীয় আদর্শের শিক্ষা লাভ করা যায়।
(২২) দুর্ভিক্ষ সংক্রান্ত ইউসুফ (আ)-এর পরামর্শ ও কর্মকাণ্ড দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, আম্বিয়ায়ে কেরাম এবং সমাজের নেতৃত্বদানকারী আলিমগণকে জনসাধারণের দীনী কল্যাণ ও জাহান্নাম হইতে বাঁচাইবার দায়িত্ব পালনের সহিত তাহাদের পার্থিব জীবন-জীবিকা ও অর্থনৈতিক বিষয়েও সুপরামর্শ দিতে হইবে। (ঐ, ৫খ., ৭০)
(২৩) কারাগার হইতে মুক্তি লাভের জন্য নারী সংক্রান্ত বিষয়ে তদন্তের ব্যাপারে ইউসুফ (আ)-এর জোর দাবি দ্বারা এই শিক্ষা লাভ করা যায় যে সমাজের নেতৃত্বধানকারী 'আলিম ও দা'ঈগণকে নিজেদেরকে দোষমুক্ত ও অপবাদমুক্ত রাখিবার ব্যাপারে যত্নবান থাকিতে হইবে। যাহাতে সাধারণ জনতার পক্ষে তাহাদিগকে মান্য করা সহজ হয়। (ঐ, ৫খ., ৭০,৭১)।
(২৪) তদন্ত দাবীতে ইউসুফ (আ.) কর্তৃক যুলায়খার কোন প্রকার উল্লেখ না করা হইতে এই শিক্ষা লাভ করা যায় যে, সম্মানিত ব্যক্তিদের বিপক্ষে কোন অভিযোগ উত্থাপনে যথাসাধ্য ভদ্রতা রক্ষা করা উচিত (ঐ, ৫খ., ৭০,৭১)।
(২৫) তদন্তে নির্দোষ সাব্যস্ত হওয়ার পরেও প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কোন প্রতিশোধ গ্রহণ না করিয়া নিরবতা অবলম্বন করা উচিৎ।
(২৬) পবিত্র ও দোষমুক্ত থাকাকে নিজের যোগ্যতা মনে না করিবার শিক্ষা রহিয়াছে। ইউসুফ (আ.) (وَمَا أَبَرِّئُ نَفْسِي) দ্বারা নিজেকে নির্দোষ বলিয়া প্রকাশ করেন নাই। ইহা হইতে বুঝা যায় যে, দোষমুক্ত থাকা নিজের কৃতিত্ব নহে, বরং আল্লাহ্র অনুগ্রহ (মাআরিফ, ৫খ., ৭২)।
(২৭) আমারকে দেশের ভাণ্ডারের দায়িত্বে নিয়োগ করুন (اجْعَلْنِي عَلَى خَزَائِنِ الْأَرْضِ) ইউসুফ (আ)-এর এই বক্তব্য দ্বারা বুঝা যায় যে, একান্ত প্রয়োজনে বিশেষ ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থে নিজের যোগ্যতা ও দক্ষতার কথা প্রকাশ করা দূষীয় নহে।
(২৮) তদ্রুপ নিজের যোগ্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হইলে রাষ্ট্রীয় পদে প্রার্থী হওয়া উত্তম।
(২৯) অনুরূপভাবে এই শিক্ষাও পাওয়া যায় যে, কোন অমুসলিম সরকারের অধীনে দায়িত্ব পালনে স্বাধিকার লাভের সুযোগ থাকিলে সাধারণ জনতার সেবা ও কল্যাণের উদ্দেশে উচ্চ পদের দায়িত্ব গ্রহণ বৈধ (কুরতুবীর বরাতে, মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., ৭৮-৮০, মাজহারী, ৫খ., ১৭৩)।
(৩০) দুর্ভিক্ষকালে ইউসুফ (আ) খাদ্য মূল্য বাঁধিয়া দিয়াছিলেন এবং জনপ্রতি এক উটের বোঝা পরিমাণ রেশন প্রদানের বিধান করিয়াছিলেন। ইহা দ্বারা খাদ্যাভাবের সময় এবং জাতীয় দুর্যোগ মুহূর্তে জনস্বার্থ ও খাদ্য সরবরাহে শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য সরকারের পক্ষ হইতে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের নিয়ন্ত্রণ ভার গ্রহণ এবং মূল্য নির্ধারণ তথা রেশন পদ্ধতির বৈধতা প্রমাণিত হয় (মাআরিফুল কুরআন, ৫খ., ৮৭)।
(৩১) পুত্রদের সহিত ইয়াকুব (আ)-এর আচরণে অপরাধী ও অবাধ্য সন্তানের প্রতি পিতা ও অভিভাবকের কাঙ্খিত আচরণের আদর্শ রহিয়াছে। পুত্রদের বহুবিধ অপরাধ সত্ত্বেও তিনি তাহাদিগকে বিতাড়িত বা ত্যাজ্য না করিয়া নিজের সহিত সহ অবস্থানের সুযোগ দিলেন। উপরন্তু, এই পুত্রগণকেই খাদ্য সংগ্রহের জন্য মিসরে পাঠাইলেন এবং বিনয়ামীনকেও তাহাদের সহিত যাওয়ার অনুমতি দিলেন ও সর্বশেষে তাহাদিগকেই ইউসুফকে সন্ধান করিবার দায়িত্ব প্রদান করিলেন। ইহা দ্বারা বুঝা যায় যে, সন্তান কোন অপরাধ করিয়া ফেলিলে পিতার কর্তব্য তাহাদিগকে সংশোধন করিবার চেষ্টা করা এবং সংশোধিত হওয়ার ব্যাপারে নিরাশ না হওয়া পর্যন্ত সম্পর্ক কর্তন না করা। অন্যথায় হিতে বিপরীত হইতে পারে। বস্তুত ইয়াকূব (আ)-এর এই কর্মপন্থায় সুফল হইয়াছিল এবং পুত্রগণ অনুতপ্ত ও সংশোধিত হইয়াছিল (মাআরিফ, ৫খ., ৯২, ৯৩)।
(৩২) ইয়াকুব (আ)-এর আচরণে আর একটি শিক্ষণীয় বিষয় এই যে, বিনয়ামীনকে অপরাধী পুত্রদের সহিত যাওয়ার অনুমতি প্রদানকালে তাহাদের পূর্ব-অপরাধের কথা স্মরণ করাইয়া দিয়া তাহাদিগকে অনুতপ্ত হওয়ার প্রতি উদ্বুদ্ধ করিয়াছিলেন।
(৩৩) ইয়াকুব (আ) পুত্রদের নিকট হইতে অঙ্গীকার গ্রহণ সত্ত্বেও আল্লাহ তা'আলার উপর সম্পূর্ণ ভরসা রাখিয়াছিলেন (ঐ, ৫খ., ৯৩)।
(৩৪) দ্বিতীয়বার পুত্রদের মিসর প্রেরণকালে ইয়াকূব (আ)-এর উপদেশ ও কর্মপদ্ধতিতে কয়েকটি শিক্ষণীয় বিষয় রহিয়াছে (বিস্তারিত বিবরণের জন্য দ্র. মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ. পৃ. ৮৭-১৩৪)। মোটকথা ইউসুফ (আ)-এর জীবনী ও ঘটনাবলী শুধু জীবনবৃত্তান্ত নহে, বরং ইহার প্রতি পদে পদে রহিয়াছে মানব জীবনের সুখ-দুঃখ এ উত্থান-পতন তথা সার্বিক অবস্থা ও পরিস্থিতির জন্য আদর্শ ও চিরন্তন শিক্ষণীয় বিষয়।