📄 হযরত ইউসুফ (আ)-এর ইনতিকালের পর মিসরের রাজনৈতিক অবস্থা
পূর্বেই উল্লিখিত হইয়াছে যে, ইউসুফ (আ)-কে আযীয মনোনয়নকারী বাদশাহ রাইয়্যান (ইবনুল ওয়ালীদ অথবা ওয়ালীদ ইবনুর রায়্যান) ইউসুফ (আ)-এর আহবানে সাড়া দিয়া ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন (আল-কামিল, ১খ., ১১২; বিদায়া, ১খ., ২৪২)। রাজা রায়্যানের পরে মিসরের রাজা মনোনীত হন কাবুস ইবন মুস'আব ইবন মু'আবিয়া ইবন নুমসর ইবনুস সালওয়াস ইবন কারান (قابوس بن مصعب بن معاويه بن نمسر بن السلواس بن قاران بن عمرو بن ناسر بن معاویه بن نمسر بن السلواس بن قاران بن عمرو بن ইবন আমের ইবন ইলাক) ইউসুফ (আ.) তাহাকেও ইসলামের দাওয়াত দিয়াছিলেন। কিন্তু সে উহা গ্রহণ করে নাই। এই রাজার রাজত্বকালেই ইউসুফ (আ) ইনতিকাল করেন (আল-কামিল, ১খ., ১১২)। ইউসুফ (আ)-এর ইনতিকালের পর আমালিকা গোত্রীয় ফির'আওনরা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হইতে থাকে এবং তাহারা দোর্দণ্ড প্রতাপে রাজ্য পরিচালনা করিতে থাকে। বনী ইসরাঈল এই রাজাদের শাসনাধীনে যথাসাধ্য ইউসুফ (আ.)-এর দীনের উপর থাকিয়া জীবন যাপন করিতে থাকে। ক্ষমতাসীনরা বনী ইসরাঈলকে 'বিদেশী' বিবেচনায় বিভিন্নরূপে নির্যাতন করিতে থাকে এবং তাহাদিগকে দাসে পরিণত করে। প্রায় চার শত বৎসর পর আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আ)-এর হাতে বনী ইসরাঈলের দাসত্ব হইতে মুক্তিদান ও ফিরআওনকে ধ্বংস করিবার ব্যবস্থা করেন (তাফসীরে মাজহারী, ৫খ., ২০৪; মুফতী শফী, মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., ১৩৯; কান্ধলাবী, মা'আরিফুল কুরআন, ৪খ., ৬৮)।
📄 হযরত ইউসুফ (আ)-এর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী
যে কোন মহান ও বিশিষ্ট ব্যক্তির জীবন বিশেষ গুণে গুণান্বিত ও বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হইয়া থাকে। কিন্তু ইউসুফ (আ)-এর জীবন এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। কেননা তাঁহার জীবন কাহিনী বিরল ও বিস্ময়কর হওয়ার সাথে সাথে ইহাতে বিভিন্ন গুণাবলীর অভাবনীয় সমাবেশ ঘটিয়াছে। এক কথায় ইউসুফ (আ)-এর ঘটনাটি শুধু একটি কাহিনী নহে, বরং ইহা চারিত্রিক উৎকর্ষের এমন এক স্বর্ণোজ্জ্বল উপাখ্যান যাহার প্রতিটি দিক মানবজাতির জন্য জ্ঞান, শিক্ষা ও উপদেশে পরিপূর্ণ। ঈমানী শক্তি, অবিচলতা, সংযম ও আত্মনিয়ন্ত্রণ, পবিত্রতা, সততা, বিশ্বস্ততা, ক্ষমা, আল্লাহপ্রেম, তাওয়া, আত্মিক পরিশুদ্ধি, আল্লাহ্র বাণী সমুন্নত করিবার লক্ষ্যে সঠিক ধর্মমত প্রচারে উৎসাহ-উদ্দীপনা ও সাধনার একটি সোনালী ধারা তাঁহার জীবন কাহিনীতে চিত্রিত হইয়াছে। এখানে সংক্ষেপে উহার একটি ধারাবাহিক বিবরণ পেশ করা হইল।
(১) ইউসুফ (আ)-এর ব্যক্তিগত স্বভাব ও সুরুচির সহিত পরিবেশের পবিত্রতা, পুরুষানুক্রমে ইবরাহীমী (আ) বংশধারার অভিজাত্য ও নবী পরিবারে লালিত হওয়ার সুযোগের সমন্বয় তাঁহার সত্তায় নিহিত গুণাবলীকে সুন্দরমত ও উজ্জ্বলমতরূপে বিকশিত করিয়াছে এবং শৈশব হইতে প্রৌঢ়ত্ব পর্যন্ত সমভাবে উহার প্রকাশ ঘটিয়াছে।
(২) আল্লাহ তা'আলার প্রতি প্রগাঢ় বিশ্বাস, তাঁহার প্রতি অবিচল আস্থা ও নির্ভরতা, যাহা ইউসুফ (আ)-এর সমগ্র জীবনে সমুজ্জ্বল এবং যাহার ফলে তাঁহার জীবন পথের সকল সমস্যা ও বন্ধুরতা সাবলীল ও মসৃণ হইয়াছিল।
(৩) প্রলোভন ও হুমকি, বিপদের ঘনঘটা কিংবা সুখ-সাচ্ছন্দ্য, সম্পদ, ক্ষমতা, প্রতিপত্তি ও ভোগ-বিলাসের অবাধ সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আল্লাহকে স্মরণ রাখিয়া ও তাঁহার শরণাপন্ন হইয়া অবিচল থাকা এবং সকল পরীক্ষায় পূর্ণাঙ্গরূপে উত্তীর্ণ হওয়া, আযীয পত্নী ও তাহার বান্ধবীদের আসক্তির জবাবে আল্লাহ্র আশ্রয় প্রার্থনা, কারারুদ্ধ হওয়ার বিপদকে বরণ করা এবং আযীয অথবা বাদশাহর নিকট আবেদন-নিবেদন না করা তাঁহার চরিত্রিক দৃঢ়তা ও অবিচলতার প্রমাণ বহন করে।
(৪) অন্তরে আল্লাহ প্রেমের গভীরতার কারণে ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখ ও লাভ-ক্ষতির ঊর্ধ্বে আল্লাহর দীনের জন্য নিজের দেহমন উৎসর্গ করিয়া তাঁহার সন্তুষ্টি অর্জন করা, যাহা কারাবাসের কঠিন দুঃখের সময় ও বন্ধীদ্বয়কে দীনের আহবান প্রদানে প্রস্ফুটিত হইয়াছে।
(৫) দীনদারী ও বিশ্বস্ততার অতুলনীয় স্তরে অবস্থান, আযীয মিসরের বাড়িতে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান এবং মিসরের রাজ-ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া ছিল এই গুণের সুফল।
(৬) আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদাবোধ ইউসুফ (আ)-এর গুণাবলীর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ইউসুফ (আ)-এর ব্যক্তিত্ব ও আত্মমর্যাদাবোধের প্রমাণ নির্দোষ হইয়াও দীর্ঘ কারাভোগের পর রাজার নিকট হইতে মুক্তির ফরমান পাওয়া সত্ত্বেও তদন্তের মাধ্যমে নিজের নির্দোষ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কারাগার হইতে বাহির হইতে স্পষ্ট ভাষায় অস্বীকার করা।
(৭) সবর ও ধৈর্য ধারণ এমন একটি মহৎ মানবিক গুণ যাহা বহুবিধ অন্যায় ও অপকর্ম হইতে আত্মরক্ষার ঢালস্বরূপ (পবিত্র কুরআনে সত্তরের অধিক স্থানে সবরের ফযীলাত ও মাহাত্ম্য ঘোষিত হইয়াছে)। অন্যায় ও গুনাহের কাজ হইতে আত্মরক্ষা করা, নৈতিকতায় সুদৃঢ় থাকা, কঠিন বিপদ ও সংকটে স্থির থাকা, সম্পদের প্রাচুর্য সত্ত্বেও আত্মম্ভরিতার পরিবর্তে আত্মনিয়ন্ত্রণ, যুদ্ধক্ষেত্রে কাপুরুষতার পরিবর্তে বীরত্ব, ক্রোধের সময়েও প্রতিপত্তি প্রকাশের সুযোগে প্রতিশোধ গ্রহণ না করিয়া আত্মসংবরণ ও ক্ষমা প্রদর্শন এবং সাহসিকতা, বদান্যতা ও অপরের দোষ চর্চায় নির্লিপ্ততা এসবই সবরের অন্তর্ভুক্ত বিষয়। হাদীছ শরীফে সবরকে ঈমানের অর্ধেক বলা হইয়াছে। সবরের সকল শাখায় ইউসুফ (আ) ছিলেন 'সমুন্নত দৃষ্টান্ত'।
📄 কয়েকটি আলৌকিক স্বপ্ন ও উহার জওয়াব
হযরত ইউসুফ (আ)-এর ঘটনা বিশ্ব ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা আকর্ষণীয় ঘটনা। এই কারণেই পবিত্র কুরআনে ইহাকে 'আহসানুল কাসাস )احسن القصص( বলিয়া অভিহিত করা হইয়াছে। পবিত্র কুরআনে বলা হইয়াছে:
"উহাদের বৃত্তান্তে বোধশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য আছে শিক্ষা। ইহা এমন বাণী যাহা মিথ্যা রচনা নহে। কিন্তু মুমিনদিগের জন্য ইহা পূর্ব গ্রন্থে যাহা আছে তাহার সমর্থক এবং সমস্ত কিছুর বিশদ বিবরণ, হিদায়াত ও রহমত" (১২: ১১১)।
ইহা ছাড়া কোন মহৎ ব্যক্তির জীবনী হইতে শুধু ঘটনাবলী অবহিত হওয়ার মধ্যে বিশেষ কোন সার্থকতা নাই বরং জীবনী হইতে শিক্ষণীয় বিষয়সমূহ আহরণ করিয়া নিজেদের বাস্তব জীবনে উহার প্রতিফলন ঘটাইবার মধ্যেই উহার সার্থকতা নিহিত। হযরত ইউসুফ (আ)-এর ঘটনায় রহিয়াছে শিক্ষণীয় বিষয়ের বিপুল সম্ভার। ইউসুফ (আ)-এর জীবনবৃত্তান্তে কতিপয় প্রশ্ন ও উহার জবাবঃ
প্রশ্ন: ভাইয়েরা ইউসুফ (আ)-এর প্রতি চরম শত্রুতা পোষণ করিতেছে এবং তাহারা যে কোন সময় কোন মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটাইতে পারে। হযরত ইয়াকুব (আ) এই বিষয়টি বুঝিয়াও ইউসুফকে ভাইদের সহিত যাওয়ার অনুমতি দিয়াছিলেন কেন?
জবাবঃ ইয়া'কুব (আ) তাঁহার নবীসুলভ দূরদর্শিতা ও বুদ্ধিমত্তার কারণে পুত্রদিগকে স্পষ্ট করিয়া এই কথা বলিলেন না, আমি ইউসুফের ব্যাপারে সরাসরি তোমাদিগকে সন্দেহ করিতেছি। কেননা ইহাতে পিতা-পুত্র সম্পর্কের অবনতি ঘটা ছাড়াও তাহাদের হিংসা ও শত্রুতা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশংকা ছিল এবং এইবারে ইউসুফকে সাথে নেওয়ার সুযোগ না পাইলেও অন্য যে কোন সময় কোন অজুহাতে ইউসুফের জীবননাশ করা তাহাদের জন্য অসম্ভব ছিল না। সুতরাং ভাইদের হিংসা ও ক্রোধ বৃদ্ধির সুযোগ না দিয়া তিনি অনুমতি প্রদান করিলেন এবং সম্ভাব্য রক্ষাকবচস্বরূপ তাহাদের শপথযুক্ত অঙ্গীকার গ্রহণ করিলেন। উপরন্তু রুবেল ও ইয়াহুদাকে বিশেষরূপে ইউসুফকে দেখাশুনা করিবার ও অতি সত্ত্বর ফিরাইয়া আনিবার তাগিদ দিলেন। পরিস্থিতির বাস্তবতায় বৃদ্ধ পিতার জন্য ইহার অধিক উত্তম করণীয় অন্য কিছু ছিল না (মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., ২১, ২২)।
প্রশ্ন: 'নেকড়ে বাঘ ইউসুফকে খাইয়া ফেলিয়াছে', পিতার নিকট প্রত্যাবর্তন করিয়া মেকী কান্না কাঁদিয়া পুত্রদের এই তথ্য প্রদান এবং নিজেদের সত্যবাদিতার সাক্ষ্যস্বরূপ ইউসুফের রক্তমাখা জামা দেখাইবার পর জামাটি অক্ষত দেখিয়া এবং অন্তর্দৃষ্টি দ্বারা যখন ইয়া'কুব (আ) পুত্রদের মিথ্যাবাদী হওয়া বুঝিতে পারিলেন এবং ইউসুফের বাঁচিয়া থাকিবার ব্যাপারে আশান্বিত হইলেন। তখনও পুত্রদের ধমক প্রদান ও মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করিয়া ইউসুফকে খুঁজিয়া আনিতে বাধ্য করিলেন না কেন?
জবাব: ইয়াকূব (আ)-এর নবীসুলভ ইল্ম ও দূরদর্শিতা সন্তানদিগকে প্রত্যক্ষরূপে মিথ্যুক সাব্যস্ত করিয়া তাহাদিগকে উত্তেজিত করা হইতে বিরত রাখিল এবং তিনি ইহাকে আল্লাহ্র পক্ষ হইতে পরীক্ষা মনে করিয়া প্রকাশ্যে পরম ধৈর্যধারণ ও আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করিবার ঘোষণা দিলেন। তবুও 'তোমাদের অন্তর একটি চক্রান্ত করিয়াছে' বলিয়া তিনি ইঙ্গিতে বুঝাইয়া দিলেন যে, প্রকৃত ব্যাপার তোমরা আমার দৃষ্টি হইতে গোপন করিতে পার নাই (কাসাসুল কুরআন, ১খ., ২৮৬; ফী জিলালিল কুরআন, ৪খ., ৭০৫)।
প্রশ্ন: হযরত ইয়াকুব (আ) পুত্রদের বক্তব্যের জবাবে দুইটি ক্ষেত্রে (بَلْ سَوَّلَتْ لَكُمْ أَنْفُسُكُمْ أَمْرًا) (তোমাদের অন্তর কোন চক্রান্ত করিয়াছে...) বলিয়াছিলেন। প্রথমবার ইউসুফের রক্তমাখা জামা দেখিয়া বিনয়ামীনের চুরির অভিযোগের গ্রেফতার হওয়ায় পুত্রদের বক্তব্যের জবাবে। দ্বিতীয়বার পুত্ররা তাহাদের জানা মুতাবিক সত্যই বলিয়াছিল। সুতরাং ইয়াকুব (আ)-এর মন্তব্য দ্বিতীয়বারে বাস্তব সম্মত না হওয়ার কারণ কি অথবা তাঁহার এই বক্তব্যের প্রকৃত ব্যাখ্যা কি?
জবাব: ইয়াকুব (আ) ইতোপূর্বে ইউসুফ (আ)-এর ঘটনায় তাঁহার এই পুত্রদের সত্যবাদিতার' নমুনা প্রত্যক্ষ করিয়াছিলেন। সুতরাং তিনি তাহাদের প্রতি অবিশ্বাসের বিষয়টি এইরূপে প্রকাশ করিলেন। তাঁহার এই উক্তির তাৎপর্য ছিল এই যে, বিনয়ামীন কখনও চুরি করিতে পারেন না (কাসাসুল কুরআন, ১খ., ৩২৫)। তিনি যেন পুত্রদের বলিলেন, বিনয়ামীনকে নিয়া যাওয়ার পিছনে তোমাদের কোন স্বার্থ কাজ করিতেছিল। অন্যথায় মিসর সম্রাট, তোমরা তাহাকে অবহিত না করিয়া থাকিলে, কিরূপে জানিতে পারিলেন যে, চুরির প্রতিবিধানস্বরূপ চোরকে আটক করিয়া রাখা যায় (মাজহারী, ৫খ., ১৮৮)। তাহা ছাড়া ফিক্হবিদ মুফাসসির লিখিয়াছেন, সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে প্রবল ধারণার পর্যায়ে অভিযুক্ত সাব্যস্ত করা যায় (তাফসীরে মাজেদী, পৃ. ৫০৩, টীকা ১৫৩)।
মোটকথা ইউসুফ (আ)-এর ঘটনায় ইয়াকুব (আ)-এর নিকট পুত্রগণ মিথ্যাবাদী বলিয়া প্রমাণিত হইয়াছিল। সুতরাং এইবারও তিনি পূর্বানুরূপ সন্দেহ পোষণ করিয়া কথাটি বলিয়াছিলেন এবং এইবার তাহারা মিথ্যা না বলিলেও তিনি তাহাদের কথা বিশ্বাস করিতে পারিলেন না। এই প্রসঙ্গে কুরতুবী বলিয়াছেন যে, নবীগণের ইজতিহাদী বক্তব্যে ত্রুটি থাকিলে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হইতে উহা সংশোধনের ব্যবস্থা করা হয় এবং অবশেষে তাঁহারা সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়া থাকেন। তবে দ্বিতীয়বারের এই বক্তব্যের অর্থ এইরূপও হইতে পারে যে, অন্তরদৃষ্টি দ্বারা বা অন্য কোন উপায়ে তিনি বিনয়ামীনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত চুরির অভিযোগ বানায়োট হওয়ার বিষয়টি বুঝিতে পারিয়াছিলেন এবং ইহার পরিণতি যে শুভ হইবে তাহাও তিনি বুঝিতে পারিয়াছিলেন। কেননা তাঁহার পরবর্তী উক্তিতে "আশা করা যায় যে, আল্লাহ তাহাদের সকলকে আমার সহিত মিলিত করিবেন” (عَسَى اللَّهُ أَنْ يَأْتِيَنِي بِهِمْ جَمِيعًا) এই দিকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় (মাআরিফুল কুরআন, ?খ., ২৬, ১১৫, ১১৬)।
প্রশ্ন: পবিত্র কুরআনের সূরা ইউসুফের ২৪ নং আয়াতে আছে, وَلَقَدْ هَمَّتْ بِهِ وَهَمَّ بِهَا ; এখানে শব্দের অর্থ ইচ্ছা এবং ইউসুফও জুলায়খার প্রতি আকৃষ্ট হইয়াছিলেন।
জবাব: এই ইচ্ছার ব্যাখ্যায় মুফাসসিরগণ যাহা বলিয়াছেন, উহার সারসংক্ষেপ নিম্নরূপ: )১( هم শব্দের আভিধানিক অর্থ ইচ্ছা করা। আয়াতের هم শব্দ দ্বারা কুকর্মের ইচ্ছা উদ্দেশ্য নহে বরং জুলায়খার 'ইচ্ছা' ছিল ইউসুফ তাহার আদেশ পালন না করিলে তাহাকে প্রহার ও নির্যাতন করিবার ইচ্ছা এবং ইউসুফ (আ.)-এর 'ইচ্ছা' ছিল পলায়ন করিয়া আত্মরক্ষা করিবার ইচ্ছা (ফী জিলালিল কুরআন, ৪খ., ৭১৩) অথবা জুলায়খার 'ইচ্ছা' ছিল অসৎর্মের ইচ্ছা এবং ইউসুফ (আ)-এর ইচ্ছা ছিল তাহাকে আঘাত করিয়া অথবা দৌড়াইয়া দূরে সরিয়া গিয়া আত্মরক্ষা করিবার ইচ্ছা (শাব্বীর আহমদ উছমানী, তাফসীর, পৃ. ৩০৮)।
কিন্তু কুরআনের বর্ণনা ধারা ও ঘটনার বাস্তবতার প্রতি লক্ষ্য করিয়া অধিকাংশ মুফাসসির বলিয়াছেন, এর অর্থ অসৎকর্মের ইচ্ছা। তবে জুলায়খার ইচ্ছা ছিল প্রচণ্ড এও চুড়ান্ত। আর ইউসুফ (আ) ইচ্ছা করিবার নিকটবর্তী হইয়াছিলেন এবং আরবী ভাষায় ও পবিত্র কুরআনে এই ধরনের ব্যবহার রহিয়াছে। যেমন উযুর বিধান সংক্রান্ত আয়াত اذا قُمْتُمْ إلى الصلاة -এর অর্থ যখন তোমরা সালাতে দাঁড়াইতে উদ্যত হও বা সালাতে দাঁড়াইবার নিকটবর্তী হও। সুতরাং আয়াতের অর্থ যুলায়খা চূড়ান্ত ইচ্ছা করিয়াছিল এবং ইউসুফ (আ)-ও ইচ্ছা করিতে উদ্যত হইতেছিলেন। তবে তাঁহার প্রতিপালকের নিদর্শন দেখিয়া তাঁহার এই ইচ্ছা করিবার ভাবটি কাটিয়া যায় (মাজহারী, ৫খ., ১৫৩, ১৫৪)। আয়াতের শব্দ চয়ন ও বর্ণনা ধারায় এই বাখ্যার প্রতি ইঙ্গিত রহিয়াছে। যুলায়খার ইচ্ছাকে ' অর্থাৎ দৃঢ়তার অর্থবোধক ও قد যুক্ত করিয়া প্রচণ্ড ও চূড়ান্ত হওয়া এবং ইউসুফ (আ)-এর ইচ্ছাকে বিহীন স্বাভাবিকভাবে দ্বারা ব্যক্ত করিয়া দুর্বল ইচ্ছা তথা ইচ্ছার প্রাথমিক স্তর অর্থে হওয়া বুঝানো হইয়াছে পক্ষান্তরে অনেক মুফাসসিরের মতে আয়াতের শব্দ বিন্যাসে অগ্রপশ্চাৎ করা হইয়াছে। অর্থাৎ وهم بها অংশটুকু পরবর্তী ১ শর্তের সহিত সংযুক্ত এবং আয়াতের মূল বিন্যাস ছিল : وَلَقَدْ هَمَّتْ بِهِ لَوْلا أَنْ رَّأْى بُرْهَانَ رَبِّم هم بها )যুলায়খা তাহা চূড়ান্ত ইচ্ছা করিয়াছিল। আর ইউসুফ (আ)-এর অবস্থা এই ছিল যে, তিনি যদি প্রতিপালকের নিদর্শন না দেখিতেন তবে তিনিও ইচ্ছা করিয়া ফেলিতেন)। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তাঁহার নিদর্শন দেখাইয়া ইউসুফ (আ)-কে ইচ্ছা করা হইতে নিবৃত্ত করিলেন। সুতরাং ইউসুফ (আ) কোন ইচ্ছা করিলেন না।
মুফাসসিরগণ এই বাখ্যার অনুকূলে পবিত্র কুরআনের অপর একটি আয়াত: ان كَادَتْ لَتُبْدِي بِهِ لَولا أَنْ رَبَطْنَا উল্লেখ করিয়াছেন এবং আয়াতের মর্ম এই যে, মূসা (আ)-এর ঘটনায় সাগরে ভাসমান শিশু মূসা (আ)-কে তুলিয়া ফিরআওনের বাড়িতে নেওয়ার পর ফিরআওন কর্তৃক তাঁহাকে হত্যা করিবার ইচ্ছা এবং ফিরআওন পত্নী (আছিয়া) কর্তৃক তাহাতে বাধাদানের পরিস্থিতিতে মূসা (আ)-এর মায়ের মনের অবস্থা ছিল এই যে, "যদি আমি তাহার অন্তরকে দৃঢ় না রাখিতাম তবে সে সব রহস্য প্রকাশ করিয়া দিয়াছিল প্রায়" (মাজহারী, ৫খ., ১৫৩, ১৫৪; মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., ৩৭; কাসাসুল কুরআন, ১খ., ২৯১, ২৯২; রূহুল মাআনী, ১২ পারা, পৃ. ২১৩)। এই ব্যাখ্যার মূল কথা এই যে, ইউসুফ (আ) মন্দ কর্মের কোন ইচ্ছাই করেন নাই।
বিশিষ্ট মুফাসসিরগণ বলিয়াছেন যে, আয়াতে যুলায়খা ও ইউসুফ (আ) উভয়ের জন্য هم শব্দ ব্যবহৃত হইলেও উভয়ের জন্য উহা অভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয় নাই। কেননা আরবী ভাষায় শব্দটি যেরূপ চূড়ান্ত ইচ্ছা ও সংকল্প অর্থে তথা স্বেচ্ছার সজ্ঞানে কোন কিছু করিবার মনোভাব অর্থে ব্যবহৃত হয়, তদ্রূপ ইচ্ছাশক্তির নিয়ন্ত্রণ বহির্ভূতরূপে শুধু মনের মধ্যে কোন বিষয় আনাগোনা করা (ওয়াস-ওয়াসা) এবং নিজের এজান্তে ও অনিচ্ছায় কোন কিছুর কল্পনা ও খেয়াল মনে আগত হওয়াকেও هم বলা হয়।
কোন অসৎ কর্মের প্রতি প্রথম প্রকারের هم (অর্থাৎ চূড়ান্ত ইচ্ছা ও সংকল্প) হাদীছে বর্ণিত বার্ধ অনুসারে গোনাহ ও অপরাধরূপে পরিগণিত হয়। তবে এইরূপ সংকল্প করিবার পর কেহ বিরত থাকিলে তাহার আমলনামায় গোনাহের স্থলে একটি সওয়াব লিখিয়া দেওয়া হয়। পক্ষান্তরে দ্বিতীয় প্রকারের هم ইচ্ছাশক্তির নিয়ন্ত্রণ বহির্ভূত হওয়ার কারণে এবং উহা মানুষের স্বভাবজাত ও সাধ্যাতীত হওয়ার কারণে শরীয়াতের দৃষ্টিতে উহা গোনাহ নহে। পবিত্র কুরআনে এবং বুখারী ও মুসলিমসহ বিভিন্ন হাদীছ গ্রন্থের বহু হাদীছে বিষয়টির স্পষ্ট ও বিশদ বর্ণনা রহিয়াছে। বুদ্ধি ও যুক্তির বিচারেও দ্বিতীয় প্রকারের هم -কে অপরাধ সাব্যস্ত করা যায় না। তাফসীরে কুরতুবীতে هم শব্দের এই দ্বিবিধ অর্থ প্রমাণের জন্য আরবী সাহিত্যের গদ্য ও পদ্যের একাধিক উদ্ধৃতি উল্লেখ করা হইয়াছে।
আলোচ্য ক্ষেত্রেও যুলায়খার هم ছিল প্রথম প্রকারের এবং ইউসুফ (আ)-এর هم ছিল দ্বিতীয় প্রকারের। সুতরাং যুলায়খার هم গোনাহ হইলেও ইউসুফ (আ)-এর هم গোনাহ ছিল না। কেননা, উহা ছিল কোন উত্তম খাদ্যের ঘ্রাণ নাকে পৌছিলে উহার প্রতি মানুষের স্বভাবজাত আকর্ষণ সৃষ্টি হওয়ার ন্যায় এবং প্রচণ্ড খরতাপের দিনে ঠাণ্ডা পানি দেখিয়া উহার প্রতি রোযাদারের স্বভাবজাত আকর্ষণের ন্যায়। অথচ এই আকর্ষণকে কেহই অপরাধ বলিবে না, বরং উহা নিয়ন্ত্রণ করিয়া আত্মরক্ষা করাকে প্রশংসাযোগ্য বিবেচিত হয়। পবিত্র কুরআনে আলোচ্য বিষয়টির বর্ণনাধারাও যুলায়খা ও ইউসুফের هم বিভিন্ন হওয়ার ইঙ্গিত প্রদান করে। কেননা উভয়ের ইচ্ছা অভিন্ন হইলে 'তাহারা একে অপরের প্রতি ইচ্ছা করিল' অথবা দ্বিবচন ক্রিয়ারূপে 'তাহারা উভয়ে ইচ্ছা করিল' বলাই সমীচীন ছিল। (পূর্বোল্লিখিত) যুলায়খার ক্ষেত্রে দৃঢ়তাবোধক (لقد) যুক্ত করা এবং ইউসুফ (আ.)-এর ক্ষেত্রে স্বাভাবিক هم বলা দ্বারা দুই هم -এর পার্থক্যের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
ইহা ছাড়া পূর্বাপর বিভিন্ন আয়াতে ইউসুফ (আ.)-এর নিষ্কলুষ থাকার স্পষ্ট ইঙ্গিত ব্যক্ত হইয়াছে। যেমন معاذ الله বলিয়া আল্লাহর শরণাপন্ন হওয়া, কুকর্মের অশুভ পরিণতির কথা স্মরণ করা إِنَّهُ لأَيُفْلِحُ الظَّالِمُونَ, মনিবের অনুগ্রহের কথা স্মরণ করা (إِنَّهُ رَبِّى أَحْسَنَ مَثْوَاىَ), সে নারীই আমাকে ফুন্সলাইয়াছে এবং আমি অসাক্ষাতে বিশ্বাসঘাতকতা করি নাই (أَنِّى لَمْ أَخُنْهُ بِالْغَيْبِ) বলিয়া আত্মবিশ্বাসের সহিত আত্মপক্ষ সমর্থন করা, তাহা ছাড়াও সবরের সুফল লাভ করিবার উদ্ধৃতি দেওয়া (أَنَّهُ مَنْ يَتَّقِ وَيَصْبِرْ) এবং আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হইতে বিশিষ্ট বান্দাদের তালিকাভুক্ত (عِبَادِنَا الْمُخْلَصِينَ) ঘোষণা করা ইত্যাদি দ্বারা ইউসুফ (আ) সম্পূর্ণ নির্দোষ হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়। তদ্রূপ لِنَصْرِفَ عَنْهُ السُّوْءَ وَالْفَحْشَاءَ 'মন্দ' ও 'অশ্লীলতা' হইতে দূরে রাখিবার জন্য' দ্বারা তো সর্বপ্রকার কবীরা ও সগীরা গোনাহ হইতে মুক্ত রাখিবার ঘোষণা দেওয়া হইয়াছে। কেননা এই আয়াতে نَحْ অর্থাৎ অশ্লীলতা) দ্বারা কবীরা ও سُرْ অর্থাৎ মন্দ) দ্বারা সগীরা গুনাহ বোঝানো হইয়াছে।
হযরত ইউসুফ (আ)-এর অপাপবিদ্ধ ও পূত-পবিত্র থাকিবার ব্যাপারে মুসলিম শরীফের একটি হাদীছে রহিয়াছে, ইউসুফ (আ) এই কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হইলে ফেরেশতারা আল্লাহ তা'আলাকে বলিলেন, আপনার এই বিশিষ্ট বান্দা গুনাহের ফিকিরে রহিয়াছে। অথচ সে উহার ধ্বংসাত্মক পরিণতরি কথা উত্তমরূপেই অবগত রহিয়াছে! আল্লাহ তা'আলা বলিলেন, তোমরা একটু প্রতীক্ষা কর। সে যদি গুনাহ করিয়াই ফেলে তবে তাহার কৃতকর্ম তাহার আমলনামায় লিখিয়া দিবে। আর যদি সে উহা পরিত্যাগ করে তবে গুনাহের স্থলে তাহার আমলনামায় নেকী লিখিয়া দিবে। কেননা সে শুধু আমার প্রতি ভয়ের কারণেই নিজের কুচাহিদা বর্জন করিয়াছে (কুরতুবীর বরাতে মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., ৩৭)।
মোটকথা, ইউসুফ (আ)-এর অন্তরে যে কল্পনা বা আকর্ষণের উদ্ভব হইয়াছিল উহা ছিল ইচ্ছা বহির্ভূত ওয়াসওয়াসা স্তরের, যাহা প্রথমত গুনাহরূপে বিবেচিত নহে। তদুপরি এই ওয়াসাওয়াসার বিপরীত আমল করিবার কারণে এবং মানবিক স্বভাবজাত রিপু ও চাহিদা সত্ত্বেও গুনাহ হইতে আত্মরক্ষা করিবার কারণে ইউসুফ (আ)-এর তাকওয়া ও পবিত্রতার স্তর এবং আল্লাহ তা'আলার নিকটে তাঁহার মর্যাদার স্তর আরও অধিক সমুন্নত হইয়া থাকিবে (মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., ৩৭)。
প্রশ্ন: হযরত ইউসুফ (আ)-এর সমগ্র ঘটনায় একটি প্রশ্ন বার বার উঁকি দেয়। উহা এই যে, ইউসুফ (আ) তাঁহার প্রতি তাঁহার পিতার প্রচণ্ড ভালবাসার কথা ভালভাবেই জানিতেন ও বুঝিতেন। তদুপরি ইউসুফ (আ) নবীও ছিলেন এবং পিতার হক সম্পর্কে সম্যক অবহিতও ছিলেন। এমতাবস্থায় বিচ্ছেদের সুদীর্ঘকাল একবারও তিনি পিতার নিকট প্রত্যাবর্তন কিংবা অন্তত তাঁহাকে নিজের অবস্থা ও অবস্থান সম্পর্কে অবহিত করিলেন না কেন?
জবাব: এই সবই ছিল মহাবিজ্ঞ ও প্রজ্ঞাবান আল্লাহ্র মহিমার বহিঃপ্রকাশ এবং সব কিছুই আল্লাহ তা'আলার আদেশে ও প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে সংঘটিত হইতেছিল। কুরতুবী ইবন আব্বাস (রা)-এর একটি বর্ণনা উদ্ধৃত করিয়াছেন যে, মিসরে পৌঁছিবার পর আল্লাহ তা'আলা ওয়াহীর মাধ্যমে ইউসুফ (আ)-কে তাঁহার কোন প্রকার সংবাদ বাড়িতে পাঠাইতে নিষেধ করিয়া দিয়াছিলেন। বাহ্যত আল্লাহ পাকের এই নিষেধাজ্ঞার কারণ ছিল আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হইতে ইয়া'কূবকে বিপদাপন্ন করিয়া তাঁহার পরীক্ষার পূর্ণাঙ্গতা বিধান করা (কুরতুবীর বরাতে মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., পৃ. ২৪, ৮৭, ১০৫, ১১৮; মাজহারী, ৫খ., পৃ. ১৮৭; কাসাকুল কুরআন, ১খ., ৩২৩)।
প্রশ্ন: ইউসুফ (আ) নিরুদ্দেশ হওয়ার দীর্ঘকাল পর ইয়া'কূব (আ) পুত্রদিগকে তাঁহার সন্ধান লাভের চেষ্টা করিতে আদেশ দিলেন এবং সুদূর হইতে ইউসুফ (আ)-এর সুঘ্রাণ অনুভব করিলেন। অথচ তাঁহার নিরুদ্দেশ হওয়ার প্রথম ধাপে, যখন তিনি ইয়া'কূব (আ)-এর নিবাসের নিকটবর্তী কূপে তিন দিন যাবত পতিত ছিলেন তখন তাঁহার ঘ্রাণ পাইলেন না কেন এবং পুত্রদের অবিশ্বাস করিবার পরেও নিকটবর্তী স্থানে ইউসুফ (আ.)-এর সন্ধানে প্রবৃত্ত হইলেন না কেন?
জবাব: সমগ্র ঘটনাটি ছিল আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হইতে ইয়া'কূব (সা) পরীক্ষাস্বরূপ। সুতরাং ইউসুফ (আ)-এর কূপে অবস্থানকালে আল্লাহ তা'আলাই ইয়া'কূব (আ)-এর চিন্তা ও মনোযোগ ইউসুফ (আ)-কে সন্ধান করিবার প্রতি ধাবিত হওয়া থেকে বিরত রাখিয়াছেন অথবা এমন হওয়াও বিচিত্র নয় যে, ইয়া'কুব (আ) আল্লাহ্র পক্ষ হইতে তাঁহাকে পরীক্ষা করিবার বিষয়টি অনুভব করিতে পারিয়াছিলেন এবং সেজন্য সর্বাবস্থায় আল্লাহ্র উপর নির্ভরশীল থাকিবার পন্থা অবলম্বন করিয়াছিলেন। ১৮ নং আয়াতের ফাসাবরুন জামিল (আমি সবর করিয়াই যাইব) দ্বারা এই অবস্থার ইংগিত পাওয়া যায়। পরবর্তী সময় পরীক্ষার মেয়াদ সম্পূর্ণ হওয়ার আভাস লাভ করিয়া পুত্রের সন্ধানের কাজ আরম্ভ করিলেন অথবা ইউসুফ (আ) সম্পর্কে তিনি যে স্বপ্ন দেখিয়াছিলেন এবং ইউসুফ (আ) নিজে যে স্বপ্ন দেখিয়াছিলেন উহার বাস্তবায়ন অবশ্যম্ভাবী জানিয়া ইয়া'কুব (আ) ঘটনার পরিণতি পর্যন্ত অপেক্ষা করিতেছিলেন। নিকট হইতে ঘ্রাণ না পাওয়া ও সুদূর হইতে ঘ্রাণ পাওয়ার বিষয়টি ছিল একটি মু'জিযা (মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., ১১৮, ১১৯, ১২৮, ১৩১)।
এই জবাবে এই ধরনের আরও একটি প্রশ্নের সমাধান হইয়া যায়। প্রশ্নটি এই যে, ইয়া'কূব (আ) পুরুষানুক্রমে নবী ছিলেন এবং পরিবার ছিল ইবরাহীম (আ)-এর বংশধর। সুতরাং সমাজে তাঁহারা বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন ও জনপ্রিয় হওয়াই স্বাভাবিক। এই অবস্থায় ইয়া'কুব (আ)-এর প্রিয়পাত্র ও আদরের সন্তান নিরুদ্দেশ হওয়ার পর স্থানীয় জনগণ কর্তৃক নিরুদ্দেশ ইউসুফের সন্ধানে কোন প্রকার তৎপরতার উল্লেখ পবিত্র কুরআনে বা ইতিহাসে পাওয়া যায় না। তদ্রূপ দুর্ভিক্ষের পূর্বেও কানআনবাসীদের মিসরে যাতায়াত সম্ভাব্য বিষয় ছিল এবং মিসরের প্রধানমন্ত্রীর বাড়ির ঘটনা, ইউসুফের কারাগমন এবং সবশেষে এক গোলামের মিসরের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার বিষয়টি চর্চা হওয়া ও কোন কানআনবাসীর কর্ণগোচর হওয়া অস্বাভাবিক ছিল না। কিন্তু এই ধরনের কোন কিছুর আভাস পূর্ণ কাহিনীর কোথাও পাওয়া যায় না। ইহারও একমাত্র কারণ এই যে, আল্লাহ তা'আলার হুকুম ও মনজুর না হইলে কোন স্বাভাবিক বিষয়ও স্বাভাবিকরূপে সংঘটিত হয় না এবং হুকুম ও মঞ্জুরী হইয়া গেলে অস্বাভাবিক উপায়েও বহু কর্ম সংঘটিত হইয়া থাকে (রূহুল মা'আনী, ১৩ পারা, পৃ. ৫৭)
প্রশ্ন: সন্তানের প্রতি মানুষের স্নেহ মমতা. ও ভালবাসা সহজাত বিষয়। কিন্তু ইউসুফ (আ)-এর প্রতি ইয়া'কূব (আ)-এর আকর্ষণ ও ভালবাসা এক কথায় নজিরবিহীন। একজন নবী হইয়া কোন 'গায়রুল্লাহ'কে এই পরিমাণ ভালবাসিবার কারণ কি ছিল?
জবাব: পুত্রের প্রতি ইয়া'কূব (আ)-এর ভালবাসা ছিল ইউসুফ (আ)-এর অস্তিত্বে বিদ্যমান সমুজ্জল ভবিষ্যতের ও নবুওয়াতের দীপ্তিমান সৌন্দর্যের ভালবাসা। সুতরাং এই ভালবাসাও ছিল অপার্থিব ও আখিরাতমুখী ভালবাসা। মুজাদ্দিদ আলফে ছানী (র)-এর আধ্যাত্মিক গবেষণা অনুযায়ী, ইহা জাগতিক কোন বিষয়, উহা যতই আকর্ষণীয় ও সুন্দর হউক, উহার প্রতি ভালবাসা অবশ্যই গর্হিত ও নিন্দনীয় বিষয়। তবে পৃথিবীতে এমন কিছু বিষয় রহিয়াছে যাহা মূলত আখিরাতের সহিত সম্পৃক্ত এবং উহার প্রতি ভালবাসা প্রকৃত বিচারে আখিরাতের ভালবাসারূপেই বিবেচিত। মুজাদ্দিদ (র)-এর মতে, হযরত ইউসুফ (আ)-এর সমগ্র অস্তিত্ব ছিল পৃথিবীর বুকে একটি আখিরাতের বিষয় তথা একটি জান্নাতী অস্তিত্ব। ইয়া'কূব (আ)-এর প্রচণ্ড ভালবাসা ছিল পৃথিবীর বুকে বিদ্যমান এই আখিরাতী বিষয় ও জান্নাতী বস্তুর প্রতি ভালবাসা। সুতরাং উহা নবুওয়াতী মর্যাদার পরিপন্থী নহে (তাফসীরে মাজহারী, ৫খ., ১৮৮-১৯০; মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., ১১৭, ১১৮)।
📄 হযরত ইউসুফ (আ)-এর জীবন চরিতে শিক্ষণীয় বিষয়
ইতিহাসের তথ্য মানবজীবনের ঘাত-প্রতিঘাত, সুখ-দুঃখ আনন্দ-বেদনা, সুযোগ-দুর্যোগ ও সংকট সমাধানের ক্ষেত্রে মানুষের বিভিন্নমুখী স্বভাব-চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ এবং উল্লিখিত পরিস্থিতিসমূহে মানুষের করণীয় সম্পর্কে শিক্ষার বহুল উপকরণ।
(ক) ঐতিহাসিক তথ্য- উপকরণ: ইউসুফ (আ)-এর ঘটনায় কানআনবাসী বনী ইসরাঈলের মিসর গমনের পটভূমি বিবৃত হইয়াছে। সেই সাথে ইতিহাসের জন্য প্রয়োজনীয় সমকালীন বিশ্বের রাষ্ট্রীয় তথা রাজনৈতিক, সামাজিক, নৈতিক ও ধর্মীয় রীতিনীতি ও মূল্যবোধের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ রহিয়াছে। ইয়া'কূব ও ইউসুফ (আ)-এর সমকালে বর্তমান যুগের ন্যায় একদিকে নগর সভ্যতা ও অপরদিকে অবহেলিত ও পশ্চাদপদ অথবা নিরুপদ্রব কোলাহলমুক্ত পল্লী জীবনের আভাস ইহাতে পাওয়া যায়। রাষ্ট্র ব্যবস্থায় নিরংকুশ রাজতন্ত্রের সাথে সক্রিয় মন্ত্রী পরিষদের অস্তিত্ব মোটামুটি সুশৃঙ্খল ও সংহত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি স্বেচ্ছাচারিতার উপস্থিতি ও আযীয মিসর কর্তৃক পারিবারিক মান-মর্যাদা রক্ষার খাতিরে নির্দোষ ইউসুফকে কারাগারে প্রেরণ দ্বারা প্রমাণিত হয়। আবার উচ্চতর আদালতে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে কারারুদ্ধ ব্যক্তির মুক্তি লাভ এবং তাঁহার যোগ্যতা ও গুণের কদর করিয়া তাঁহার বিগত জীবনে গোলাম থাকিবার বিষয়টি উপেক্ষা করিয়া শাসন-প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদে আসীন করা দ্বারা একদিকে যোগ্যতার কদর ও অপরদিকে রাজার নিরংকুশ ক্ষমতার আভাসও পাওয়া যায়। ইহা ছাড়া পূর্বাপর ঘটনাবলীর বিবরণে উপর তলায় ক্ষমতার অপব্যবহারের অস্তিত্ব থাকিলেও সাধারণভাবে ব্যাপক দুর্নীতিমুক্ত আইনের শাসন প্রচলিত থাকিবার, নাগরিক কল্যাণ ও প্রজা পালনে রাষ্ট্রের কর্তব্যপরায়ণতা, নাগরিক অধিকার রক্ষা, সাধারণভাবে জনতার আইন মানিয়া চলা, খাদ্য সংগ্রহ ও বণ্টনের নীতিমালা প্রতিপালন, চুরির শাস্তি প্রদানে রাষ্ট্রীয় বিধান লংঘনের সুযোগ না থাকা ইত্যাদির প্রতি ইউসুফ (আ)-এর ঘটনায় আলোকপাত হইয়াছে। আধুনিক নগর সভ্যতার উপকরণসমূহ রাজ-প্রাসাদ, অভিজাত আবাসিক এলাকা, হাটবাজার ও বাণিজ্য কেন্দ্র, আইন-শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদের জন্য কারাগার ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশের সুরক্ষার জন্য নগর পরিধির বাহিরে কারাগারের অবস্থান, আধুনিক আপ্যায়ন ভোজ সভা, সোফাসেট, ছুরি, চাকুর ব্যবহারমুক্ত সুখী সমৃদ্ধ বিলাসী জীবন ইত্যাদির প্রতিও স্পষ্ট ইংগিত পাওয়া যায়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বাণিজ্য কাফেলাসমূহের দূর-দূরান্তে গমনাগমন, মিসরের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্র হওয়ার সাথে সাথে সহজেই মানুষকে গোলাম-বাঁদী বানানো এবং পশুপালের ন্যায় মানুষ ক্রয়-বিক্রয়ের হাটবাজারের অস্তিত্বের সন্ধান ইহাতে পাওয়া যায়। বাণিজ্যিক কাফেলা ছাড়া দুর্ভিক্ষকালে দেশে-বিদেশে বহু কাফেলার মিসরমুখী অভিযাত্রাও লক্ষণীয়।
রাষ্ট্রীয় জীবনের ক্ষেত্রে আরও একটি বিষয় লক্ষণীয়। উহা এই যে, আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার ভৌগোলিক সীমান্ত চিহ্নিতকরণ, সীমান্ত রক্ষা ব্যবস্থা ও তদুদ্দেশ্যে বাহিনী গঠন এবং রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা রক্ষার জন্য পূর্ণাঙ্গ পাসপোর্ট ও ভিসা ব্যবস্থার প্রচলন না থাকিলেও দেশী-বিদেশী পরিচয় যাচাইয়ের ব্যবস্থা বহুলাংশে বিদ্যমান ছিল এবং ইউসুফ ভ্রাতৃবর্গকে গুপ্তচর বৃত্তির অভিযোগের সম্মুখীন হইতে হইয়াছিল। এই ক্ষেত্রে সর্বাধিক লক্ষণীয় বিষয় ইয়া'কুব (আ) ও তাঁহার পুত্রদের অভিবাসন ও 'নাগরিকত্ব' প্রদান প্রক্রিয়া যাহা রাজার প্রত্যক্ষ নির্দেশ বা অনুমোদনে সম্পন্ন হইয়াছিল। ইহা ছাড়াও বিদেশী ইউসুফ (আ)-কে রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে গ্রহণের স্বীকৃতিও লক্ষণীয়। আবার বনী ইসরাঈলের সুদীর্ঘ কাল (প্রায় চার শত বৎসর) মিসরে অবস্থান এবং সেখানকার জন-জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হওয়ার পরেও নাগরিক অধিকারে বৈষম্য, তাহাদের উপর 'বিদেশী' ছাপ অব্যাহত থাকা ও দাসসুলভ জীবন-যাপন করা এবং অবশেষে মিসর ত্যাগে বাধ্য হওয়া বর্তমান যুগের আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রীয় পরিস্থিতির সহিত তুলনীয়।
সামাজিক জীবন, সংস্কৃতি ও নৈতিকতার ক্ষেত্রে আধুনিকতা ও প্রাচুর্যপূর্ণ বিলাসী জীবন যাপনের অপরিহার্য পরিণতিরূপে নৈতিকতা ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, নারী স্বাধীনতার নামে যথেচ্ছাচারিতা ও বল্লাহীনতা, বিশেষত উপর তলার সমাজে অশ্লীলতা ও অধিকারের নামে নারীর লজ্জাহীনতা, পরকীয়া প্রেমের চর্চা, নারীর উপর পুরুষের নিয়ন্ত্রণহীনতা এবং নারীর কাছে পুরুষের এক ধরনের 'বশীভূত' জীবন যাপন দ্বারা সমকালীন মিসরীয় সমাজে প্রচলিত থাকার প্রমাণ ইউসুফ বৃত্তান্তে বিদ্যমান। জুলায়খা ও তাহার সখীদের আচরণ হইতে ইহার প্রমাণ পাওয়া যায় (দ্র. ফী জিলালিল কুরআন, ৪খ., ৬৬৩, ৬৬৯, ৬৭০)। ইউসুফ (আ)-এর জীবন কাহিনী হইতে তখনকার মিসরীয় সমাজে মদের বহুল ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়। রাজাকে সূরা পরিবেশনের জন্য স্বতন্ত্র কর্মচারী বা সাকী ছিল। সাকীর দেখা স্বপ্নে মদ তৈরীর (اعصر خمرا) উল্লেখ রহিয়াছে।
তখনকার কানআনী ও মিসরীয় সমাজে এবং নবী পরিবার ও রাজপরিবারে স্বপ্নের ব্যাখ্যা সংক্রান্ত জ্ঞানের চর্চা বিদ্যমান ছিল। প্রসঙ্গত ইয়াকুব (আ), ইউসুফ (আ), বন্দীদ্বয় ও রাজার স্বপ্ন এবং ইউসুফ (আ)-কে স্বপ্নের ব্যাখ্যার ইল্ম প্রদান এবং ইউসুফ (আ) কর্তৃক আল্লাহ প্রদত্ত এই যোগ্যতার জন্য শুকরিয়া আদায় প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য (দ্র. ১২:৪, ২১, ৩৬, ১০১)。