📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হযরত ইউসুফ (আ)-এর কবরের অবস্থান

📄 হযরত ইউসুফ (আ)-এর কবরের অবস্থান


ইউসুফ (আ)-এর কবরের অবস্থান নির্ণয়ে মতভেদ রহিয়াছে। সাধারণ বর্ণনামতে তাঁহার কফিন শাম (বৃহত্তর সিরীয় অঞ্চল) তথা ফিলিস্তীনের সানআনে তাঁহার পূর্বপুরুষের কবরস্থানে দাফন করা হয় (মাজহারী, ৫খ., ২০৪; মুফতী শফী, মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., ১৩৯; কান্ধলাবী, মা'আরিফুল কুরআন, ৪খ, ৬৮)। অপর বর্ণনায় হেবরনে ইবরাহীম (আ.)-এর খরিদকৃত জমিতে (পারিবারিক গোরস্তানে) তাঁহাকে দাফন করা হয় (বিদায়া, ১খ., ২৫৩, ২৫৪)। কিন্তু তাওরাতের বর্ণনা ও পরবর্তী গবেষকদের মতে ইউসুফ (আ)-কে ইদ্রাইস (আল-ফায়্যুম) অঞ্চলে দাফন করা হইয়াছিল (দ্র. ই. ফা. বিশ্বকোষ, ২২খ., ইউসুফ শিরো.)। আবদুল ওয়াহ্হাব নাজ্জার লিখিয়াছেন, "হেবরনের আল-খালীল সমাধি ক্ষেত্রের একটি গুহায় একটি কফিন (তাবৃত) রক্ষিত আছে। এই মাকবারাটি ইবরাহীম, সারা, রুদসা (রেবেকা), ইসহাক ও ইয়া'কূব (আ)-এর সমাধিরূপে পরিচিত। স্থানীয় লোকদের বক্তব্যমতে উল্লিখিত কফিনটি ইউসুফ (আ)-এর কফিন এবং তাহাদের মতে তাঁহাকে এই গুহায় দাফন করা হইয়াছে। আমার মতে এই তথ্য নির্ভুল নয়। কেননা (তাওরাতের বর্ণনামতে) ইউসুফ (আ)-কে ইসরাঈলের ভূমিতে দাফন করা হইয়াছিল। আর হেবরন হইল ইয়াহুদার করতলগত অঞ্চল। মুহাম্মাদ হাসান নাবলুসী ও নাবলুসের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় মনীষী আবদুল হাদী আমীন বেগ-এর মতে ইউসুফ (আ)-কে নাবলুসে সমাহিত করা হয়। তাহারা তাঁহার সমাধিও চিহ্নিত করিয়াছেন। এই তথ্যটির গ্রহণযোগ্যতার অনুকূলে অন্যতম যুক্তি এই যে, নাবলুস ইসরাঈলের অন্তর্গত এলাকা এবং ইহার প্রাচীন নাম শাকীম (شكيم) বা শাখীম (شخیم) এবং বাইবেলে ও ঐতিহাসিক বর্ণনায় শাকীম নামের উল্লেখ রহিয়াছে (কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ১৫৩)। অবশ্য এই সমগ্র অঞ্চলই ইউসুফ (আ)-এর পূর্বপুরুষের অবাসভূমি হওয়ার দাবি রাখে। হামাবী (حموی) বলিয়াছেন, ইউসুফ (আ)-এর কবর ফিলিস্তীনের নাবলুস অঞ্চলের অন্যতম 'বালাতা' (بلاط) নামক পল্লীর একটি গাছের তলে অবস্থিত (কাসাসুল কুরআন, ১খ., ৩৩৬)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হযরত ইউসুফ (আ)-এর সন্তান-সন্তুতি

📄 হযরত ইউসুফ (আ)-এর সন্তান-সন্তুতি


পূর্বেই উল্লিখিত হইয়াছে যে, কারাগার হইতে বাহির হওয়ার পরে ইউসুফ (আ)-কে আযীয মিসর মনোনীত করিবার সময় বাদশাহ প্রাক্তন আযীযের স্ত্রী যুলায়খার সহিত (প্রাক্তন আযীযের সহিত বিবাহ বিচ্ছেদের পরে কিংবা অধিকাংশের মতে তাহার মৃত্যুর পরে) ইউসুফ (আ)-এর সহিত বিবাহ দিয়াছিলেন (আল-বিদায়া, ১খ., ২৪১; আল-কামিল, ১খ, ১১২, ১১৮; মাজহারী, ৫খ., ১৭৪; মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., ৭৭)। এই স্ত্রীর গর্ভে ইউসুফ (আ)-এর দুই পুত্র ইফরাইম (افرایتم) ও মনস্বী (منشا) এবং একমাত্র কন্যা রহমা (رحمة প্রচলিত রহীমা) জন্মলাভ করে। হযরত মূসা (আ)-এর খাদেম ও পরবর্তীতে নবুওয়াত মর্যাদায় ভূষিত ইয়ুশা' (بوشع) ছিলেন ইফরাইমের বংশধর (ইয়ূশা' ইবন নূন ইবন ইফরাইম ইবন ইউসুফ) এবং কন্যা রহমা ছিলেন নবী আইয়ুব (আ)-এর স্ত্রী। মুসলিম ঐতিহাসিকগণ ইফরাইমকে জ্যেষ্ঠ ও মনস্বীকে কনিষ্ঠ বলিয়াছেন। পক্ষান্তরে বাইবেলের বর্ণনায় ইহার বিপরীত বলা হইয়াছে (দ্র. রূহুল মা'আনী, ১৩ পারা, পৃ. ৬৩; আদিপুস্তক, ৪১: ৫১-৫২)। বাইবেলে বিবাহ ও সন্তান-সন্তুতির বর্ণনার নিম্নরূপ “কারাগার হইতে মুক্তি প্রদানের পর রাজা ইউসুফের নাম জাফনাত ফা'নী'সা (ZAPHNATH PAANEAH) রাখিল এবং যাজক পোটিগের (POTEPHERAH)-এর কন্যা আসনাথ (ASENATH)-এর সহিত তাহার বিবাহ বন্ধন সম্পন্ন করিল। ইউসুফের বয়স ছিল তখন ত্রিশ বৎসর। এই বিবাহে তাহাদের দুইটি পুত্র সন্তান (১) মনস্বী (MANASSEA) ও (২) ইফরাঈম (EPHRAIM) জন্মলাভ করে। মিসরে দুর্ভিক্ষ শুরু হওয়ার পূর্বেই ইহাদের জন্ম হইয়াছিল (আদিপুস্তক ৫০:৪৫, ৫১, ৫২)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হযরত ইউসুফ (আ)-এর ইনতিকালের পর মিসরের রাজনৈতিক অবস্থা

📄 হযরত ইউসুফ (আ)-এর ইনতিকালের পর মিসরের রাজনৈতিক অবস্থা


পূর্বেই উল্লিখিত হইয়াছে যে, ইউসুফ (আ)-কে আযীয মনোনয়নকারী বাদশাহ রাইয়‍্যান (ইবনুল ওয়ালীদ অথবা ওয়ালীদ ইবনুর রায়‍্যান) ইউসুফ (আ)-এর আহবানে সাড়া দিয়া ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন (আল-কামিল, ১খ., ১১২; বিদায়া, ১খ., ২৪২)। রাজা রায়‍্যানের পরে মিসরের রাজা মনোনীত হন কাবুস ইবন মুস'আব ইবন মু'আবিয়া ইবন নুমসর ইবনুস সালওয়াস ইবন কারান (قابوس بن مصعب بن معاويه بن نمسر بن السلواس بن قاران بن عمرو بن ناسر بن معاویه بن نمسر بن السلواس بن قاران بن عمرو بن ইবন আমের ইবন ইলাক) ইউসুফ (আ.) তাহাকেও ইসলামের দাওয়াত দিয়াছিলেন। কিন্তু সে উহা গ্রহণ করে নাই। এই রাজার রাজত্বকালেই ইউসুফ (আ) ইনতিকাল করেন (আল-কামিল, ১খ., ১১২)। ইউসুফ (আ)-এর ইনতিকালের পর আমালিকা গোত্রীয় ফির'আওনরা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হইতে থাকে এবং তাহারা দোর্দণ্ড প্রতাপে রাজ্য পরিচালনা করিতে থাকে। বনী ইসরাঈল এই রাজাদের শাসনাধীনে যথাসাধ্য ইউসুফ (আ.)-এর দীনের উপর থাকিয়া জীবন যাপন করিতে থাকে। ক্ষমতাসীনরা বনী ইসরাঈলকে 'বিদেশী' বিবেচনায় বিভিন্নরূপে নির্যাতন করিতে থাকে এবং তাহাদিগকে দাসে পরিণত করে। প্রায় চার শত বৎসর পর আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আ)-এর হাতে বনী ইসরাঈলের দাসত্ব হইতে মুক্তিদান ও ফিরআওনকে ধ্বংস করিবার ব্যবস্থা করেন (তাফসীরে মাজহারী, ৫খ., ২০৪; মুফতী শফী, মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., ১৩৯; কান্ধলাবী, মা'আরিফুল কুরআন, ৪খ., ৬৮)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হযরত ইউসুফ (আ)-এর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী

📄 হযরত ইউসুফ (আ)-এর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী


যে কোন মহান ও বিশিষ্ট ব্যক্তির জীবন বিশেষ গুণে গুণান্বিত ও বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হইয়া থাকে। কিন্তু ইউসুফ (আ)-এর জীবন এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। কেননা তাঁহার জীবন কাহিনী বিরল ও বিস্ময়কর হওয়ার সাথে সাথে ইহাতে বিভিন্ন গুণাবলীর অভাবনীয় সমাবেশ ঘটিয়াছে। এক কথায় ইউসুফ (আ)-এর ঘটনাটি শুধু একটি কাহিনী নহে, বরং ইহা চারিত্রিক উৎকর্ষের এমন এক স্বর্ণোজ্জ্বল উপাখ্যান যাহার প্রতিটি দিক মানবজাতির জন্য জ্ঞান, শিক্ষা ও উপদেশে পরিপূর্ণ। ঈমানী শক্তি, অবিচলতা, সংযম ও আত্মনিয়ন্ত্রণ, পবিত্রতা, সততা, বিশ্বস্ততা, ক্ষমা, আল্লাহপ্রেম, তাওয়া, আত্মিক পরিশুদ্ধি, আল্লাহ্র বাণী সমুন্নত করিবার লক্ষ্যে সঠিক ধর্মমত প্রচারে উৎসাহ-উদ্দীপনা ও সাধনার একটি সোনালী ধারা তাঁহার জীবন কাহিনীতে চিত্রিত হইয়াছে। এখানে সংক্ষেপে উহার একটি ধারাবাহিক বিবরণ পেশ করা হইল।
(১) ইউসুফ (আ)-এর ব্যক্তিগত স্বভাব ও সুরুচির সহিত পরিবেশের পবিত্রতা, পুরুষানুক্রমে ইবরাহীমী (আ) বংশধারার অভিজাত্য ও নবী পরিবারে লালিত হওয়ার সুযোগের সমন্বয় তাঁহার সত্তায় নিহিত গুণাবলীকে সুন্দরমত ও উজ্জ্বলমতরূপে বিকশিত করিয়াছে এবং শৈশব হইতে প্রৌঢ়ত্ব পর্যন্ত সমভাবে উহার প্রকাশ ঘটিয়াছে।
(২) আল্লাহ তা'আলার প্রতি প্রগাঢ় বিশ্বাস, তাঁহার প্রতি অবিচল আস্থা ও নির্ভরতা, যাহা ইউসুফ (আ)-এর সমগ্র জীবনে সমুজ্জ্বল এবং যাহার ফলে তাঁহার জীবন পথের সকল সমস্যা ও বন্ধুরতা সাবলীল ও মসৃণ হইয়াছিল।
(৩) প্রলোভন ও হুমকি, বিপদের ঘনঘটা কিংবা সুখ-সাচ্ছন্দ্য, সম্পদ, ক্ষমতা, প্রতিপত্তি ও ভোগ-বিলাসের অবাধ সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আল্লাহকে স্মরণ রাখিয়া ও তাঁহার শরণাপন্ন হইয়া অবিচল থাকা এবং সকল পরীক্ষায় পূর্ণাঙ্গরূপে উত্তীর্ণ হওয়া, আযীয পত্নী ও তাহার বান্ধবীদের আসক্তির জবাবে আল্লাহ্র আশ্রয় প্রার্থনা, কারারুদ্ধ হওয়ার বিপদকে বরণ করা এবং আযীয অথবা বাদশাহর নিকট আবেদন-নিবেদন না করা তাঁহার চরিত্রিক দৃঢ়তা ও অবিচলতার প্রমাণ বহন করে।
(৪) অন্তরে আল্লাহ প্রেমের গভীরতার কারণে ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখ ও লাভ-ক্ষতির ঊর্ধ্বে আল্লাহর দীনের জন্য নিজের দেহমন উৎসর্গ করিয়া তাঁহার সন্তুষ্টি অর্জন করা, যাহা কারাবাসের কঠিন দুঃখের সময় ও বন্ধীদ্বয়কে দীনের আহবান প্রদানে প্রস্ফুটিত হইয়াছে।
(৫) দীনদারী ও বিশ্বস্ততার অতুলনীয় স্তরে অবস্থান, আযীয মিসরের বাড়িতে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান এবং মিসরের রাজ-ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া ছিল এই গুণের সুফল।
(৬) আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদাবোধ ইউসুফ (আ)-এর গুণাবলীর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ইউসুফ (আ)-এর ব্যক্তিত্ব ও আত্মমর্যাদাবোধের প্রমাণ নির্দোষ হইয়াও দীর্ঘ কারাভোগের পর রাজার নিকট হইতে মুক্তির ফরমান পাওয়া সত্ত্বেও তদন্তের মাধ্যমে নিজের নির্দোষ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কারাগার হইতে বাহির হইতে স্পষ্ট ভাষায় অস্বীকার করা।
(৭) সবর ও ধৈর্য ধারণ এমন একটি মহৎ মানবিক গুণ যাহা বহুবিধ অন্যায় ও অপকর্ম হইতে আত্মরক্ষার ঢালস্বরূপ (পবিত্র কুরআনে সত্তরের অধিক স্থানে সবরের ফযীলাত ও মাহাত্ম্য ঘোষিত হইয়াছে)। অন্যায় ও গুনাহের কাজ হইতে আত্মরক্ষা করা, নৈতিকতায় সুদৃঢ় থাকা, কঠিন বিপদ ও সংকটে স্থির থাকা, সম্পদের প্রাচুর্য সত্ত্বেও আত্মম্ভরিতার পরিবর্তে আত্মনিয়ন্ত্রণ, যুদ্ধক্ষেত্রে কাপুরুষতার পরিবর্তে বীরত্ব, ক্রোধের সময়েও প্রতিপত্তি প্রকাশের সুযোগে প্রতিশোধ গ্রহণ না করিয়া আত্মসংবরণ ও ক্ষমা প্রদর্শন এবং সাহসিকতা, বদান্যতা ও অপরের দোষ চর্চায় নির্লিপ্ততা এসবই সবরের অন্তর্ভুক্ত বিষয়। হাদীছ শরীফে সবরকে ঈমানের অর্ধেক বলা হইয়াছে। সবরের সকল শাখায় ইউসুফ (আ) ছিলেন 'সমুন্নত দৃষ্টান্ত'।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00