📄 ইউসুফ (আ)-এর ইনতিকাল ও তাঁহার ওসিয়ত
ইয়া'কূব (আ)-এর ইনতিকালের পরে ইউসুফ (আ) কত বৎসর জীবিত ছিলেন ইহাতে বাইবেলের বর্ণনা ও ঐতিহাসিকগণের বর্ণনায় যথেষ্ট পার্থক্য রহিয়াছে এবং একই কারণে তাঁহার মোট বয়স সম্পর্কেও বিভিন্ন মত রহিয়াছে। পিতার সহিত পুনর্মিলনের পর ইউসুফ (আ) তেইশ বৎসর জীবিত ছিলেন। কেহ কেহ পুনর্মিলনের পর ষাট বৎসর কিংবা উহার অধিক জীবিত থাকিবার কথা বলিয়াছেন। হাসান (র) বলিয়াছেন, পুনর্মিলনের পর দীর্ঘদিন তিনি জীবন-যাপন করিয়াছিলেন (মাজহারী, ৫খ., ২০৪)। মোটকথা ইউসুফ (আ)-এর মোট বয়স সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনা রহিয়াছে এবং সর্বনিম্ন একশত সাত (১০৭) বৎসর বয়স হইতে এক শত দশ, এক শত বিশ ও সর্বোচ্চ এক শত ছাব্বিশ বৎসর বলা হইয়াছে (দ্র. কান্ধলাবী, মা'আরিফুল কুরআন, ১০৭ অথবা জামীল আহমদ আম্বিয়ায়ে কুরআন ও হিফজুর রহমান, কান্ধলাবী, কুরআন, ১খ., ৩৩৫; মুফতী শফী, মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ, ১৩৮; ইবনুল আছীর আল-জাযারী, আল-কামিল, ১খ., ৯৮; রূহুল মা'আনী, ১৩ পারা, পৃ. ৬৩, ৬৪; আল-বিদায়া, ১খ, পৃ. ২৫৪-১২০)।
ইউসুফ (আ) তাঁহার মৃত্যু আসন্ন অনুভব করিলে ইয়াহুদাকে তাঁহার স্বলাভিষিক্ত নিয়োগ করিলেন (আল-বিদায়া, ১খ., ২৫৪; কুরতুবী, ৫খ., ১৫০), অতঃপর ভাইদের সকলকে ডাকিয়া বলিলেন, আমার মৃত্যু আসন্ন। আল্লাহ তা'আলা তোমাদিগকে স্মরণ করিবেন এবং তোমাদিগকে সেই দেশে ফিরাইয়া নিবেন যে দেশের মালিকানা ইবরাহীম, ইসহাক ও ইয়াকূবকে দেওয়ার ওয়াদা করিয়াছেন। সুতরাং যখন আল্লাহ তা'আলা তোমাদিগকে সেই দেশে ফিরাইয়া নিবেন তখন তোমরা আমার মৃতদেহ তোমাদের সঙ্গে নিয়া যাইবে এবং পূর্বপুরুষদের নিকটে দাফন করিবে (রূহুল মা'আনী, ১৩ পারা, পৃ. ৬৪; আল-বিদায়া, ১খ., ২৫৪)।
ইউসুফ (আ)-এর ইন্তিকালের পর ভাইয়েরা তাঁহার ওসিয়াত অনুসারে তাঁহার মৃতদেহকে 'মমী' করিয়া একটি মর্মরের সিন্দুকে সংরক্ষণ করিল এবং পরবর্তী কালে মূসা (আ)-এর সহিত মিসর ত্যাগ করিবার সময় সিন্দুকটি তাহাদের সঙ্গে লইয়া গিয়া পিতৃপুরুষদের নিকটে দাফন করিল (রূহুল মা'আনী, ১৩ পারা, পৃ. ৬৪; মাজহারী, ৫খ., ২০৪)।
📄 হযরত ইউসুফ (আ)-এর কবরের অবস্থান
ইউসুফ (আ)-এর কবরের অবস্থান নির্ণয়ে মতভেদ রহিয়াছে। সাধারণ বর্ণনামতে তাঁহার কফিন শাম (বৃহত্তর সিরীয় অঞ্চল) তথা ফিলিস্তীনের সানআনে তাঁহার পূর্বপুরুষের কবরস্থানে দাফন করা হয় (মাজহারী, ৫খ., ২০৪; মুফতী শফী, মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., ১৩৯; কান্ধলাবী, মা'আরিফুল কুরআন, ৪খ, ৬৮)। অপর বর্ণনায় হেবরনে ইবরাহীম (আ.)-এর খরিদকৃত জমিতে (পারিবারিক গোরস্তানে) তাঁহাকে দাফন করা হয় (বিদায়া, ১খ., ২৫৩, ২৫৪)। কিন্তু তাওরাতের বর্ণনা ও পরবর্তী গবেষকদের মতে ইউসুফ (আ)-কে ইদ্রাইস (আল-ফায়্যুম) অঞ্চলে দাফন করা হইয়াছিল (দ্র. ই. ফা. বিশ্বকোষ, ২২খ., ইউসুফ শিরো.)। আবদুল ওয়াহ্হাব নাজ্জার লিখিয়াছেন, "হেবরনের আল-খালীল সমাধি ক্ষেত্রের একটি গুহায় একটি কফিন (তাবৃত) রক্ষিত আছে। এই মাকবারাটি ইবরাহীম, সারা, রুদসা (রেবেকা), ইসহাক ও ইয়া'কূব (আ)-এর সমাধিরূপে পরিচিত। স্থানীয় লোকদের বক্তব্যমতে উল্লিখিত কফিনটি ইউসুফ (আ)-এর কফিন এবং তাহাদের মতে তাঁহাকে এই গুহায় দাফন করা হইয়াছে। আমার মতে এই তথ্য নির্ভুল নয়। কেননা (তাওরাতের বর্ণনামতে) ইউসুফ (আ)-কে ইসরাঈলের ভূমিতে দাফন করা হইয়াছিল। আর হেবরন হইল ইয়াহুদার করতলগত অঞ্চল। মুহাম্মাদ হাসান নাবলুসী ও নাবলুসের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় মনীষী আবদুল হাদী আমীন বেগ-এর মতে ইউসুফ (আ)-কে নাবলুসে সমাহিত করা হয়। তাহারা তাঁহার সমাধিও চিহ্নিত করিয়াছেন। এই তথ্যটির গ্রহণযোগ্যতার অনুকূলে অন্যতম যুক্তি এই যে, নাবলুস ইসরাঈলের অন্তর্গত এলাকা এবং ইহার প্রাচীন নাম শাকীম (شكيم) বা শাখীম (شخیم) এবং বাইবেলে ও ঐতিহাসিক বর্ণনায় শাকীম নামের উল্লেখ রহিয়াছে (কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ১৫৩)। অবশ্য এই সমগ্র অঞ্চলই ইউসুফ (আ)-এর পূর্বপুরুষের অবাসভূমি হওয়ার দাবি রাখে। হামাবী (حموی) বলিয়াছেন, ইউসুফ (আ)-এর কবর ফিলিস্তীনের নাবলুস অঞ্চলের অন্যতম 'বালাতা' (بلاط) নামক পল্লীর একটি গাছের তলে অবস্থিত (কাসাসুল কুরআন, ১খ., ৩৩৬)।
📄 হযরত ইউসুফ (আ)-এর সন্তান-সন্তুতি
পূর্বেই উল্লিখিত হইয়াছে যে, কারাগার হইতে বাহির হওয়ার পরে ইউসুফ (আ)-কে আযীয মিসর মনোনীত করিবার সময় বাদশাহ প্রাক্তন আযীযের স্ত্রী যুলায়খার সহিত (প্রাক্তন আযীযের সহিত বিবাহ বিচ্ছেদের পরে কিংবা অধিকাংশের মতে তাহার মৃত্যুর পরে) ইউসুফ (আ)-এর সহিত বিবাহ দিয়াছিলেন (আল-বিদায়া, ১খ., ২৪১; আল-কামিল, ১খ, ১১২, ১১৮; মাজহারী, ৫খ., ১৭৪; মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., ৭৭)। এই স্ত্রীর গর্ভে ইউসুফ (আ)-এর দুই পুত্র ইফরাইম (افرایتم) ও মনস্বী (منشا) এবং একমাত্র কন্যা রহমা (رحمة প্রচলিত রহীমা) জন্মলাভ করে। হযরত মূসা (আ)-এর খাদেম ও পরবর্তীতে নবুওয়াত মর্যাদায় ভূষিত ইয়ুশা' (بوشع) ছিলেন ইফরাইমের বংশধর (ইয়ূশা' ইবন নূন ইবন ইফরাইম ইবন ইউসুফ) এবং কন্যা রহমা ছিলেন নবী আইয়ুব (আ)-এর স্ত্রী। মুসলিম ঐতিহাসিকগণ ইফরাইমকে জ্যেষ্ঠ ও মনস্বীকে কনিষ্ঠ বলিয়াছেন। পক্ষান্তরে বাইবেলের বর্ণনায় ইহার বিপরীত বলা হইয়াছে (দ্র. রূহুল মা'আনী, ১৩ পারা, পৃ. ৬৩; আদিপুস্তক, ৪১: ৫১-৫২)। বাইবেলে বিবাহ ও সন্তান-সন্তুতির বর্ণনার নিম্নরূপ “কারাগার হইতে মুক্তি প্রদানের পর রাজা ইউসুফের নাম জাফনাত ফা'নী'সা (ZAPHNATH PAANEAH) রাখিল এবং যাজক পোটিগের (POTEPHERAH)-এর কন্যা আসনাথ (ASENATH)-এর সহিত তাহার বিবাহ বন্ধন সম্পন্ন করিল। ইউসুফের বয়স ছিল তখন ত্রিশ বৎসর। এই বিবাহে তাহাদের দুইটি পুত্র সন্তান (১) মনস্বী (MANASSEA) ও (২) ইফরাঈম (EPHRAIM) জন্মলাভ করে। মিসরে দুর্ভিক্ষ শুরু হওয়ার পূর্বেই ইহাদের জন্ম হইয়াছিল (আদিপুস্তক ৫০:৪৫, ৫১, ৫২)।
📄 হযরত ইউসুফ (আ)-এর ইনতিকালের পর মিসরের রাজনৈতিক অবস্থা
পূর্বেই উল্লিখিত হইয়াছে যে, ইউসুফ (আ)-কে আযীয মনোনয়নকারী বাদশাহ রাইয়্যান (ইবনুল ওয়ালীদ অথবা ওয়ালীদ ইবনুর রায়্যান) ইউসুফ (আ)-এর আহবানে সাড়া দিয়া ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন (আল-কামিল, ১খ., ১১২; বিদায়া, ১খ., ২৪২)। রাজা রায়্যানের পরে মিসরের রাজা মনোনীত হন কাবুস ইবন মুস'আব ইবন মু'আবিয়া ইবন নুমসর ইবনুস সালওয়াস ইবন কারান (قابوس بن مصعب بن معاويه بن نمسر بن السلواس بن قاران بن عمرو بن ناسر بن معاویه بن نمسر بن السلواس بن قاران بن عمرو بن ইবন আমের ইবন ইলাক) ইউসুফ (আ.) তাহাকেও ইসলামের দাওয়াত দিয়াছিলেন। কিন্তু সে উহা গ্রহণ করে নাই। এই রাজার রাজত্বকালেই ইউসুফ (আ) ইনতিকাল করেন (আল-কামিল, ১খ., ১১২)। ইউসুফ (আ)-এর ইনতিকালের পর আমালিকা গোত্রীয় ফির'আওনরা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হইতে থাকে এবং তাহারা দোর্দণ্ড প্রতাপে রাজ্য পরিচালনা করিতে থাকে। বনী ইসরাঈল এই রাজাদের শাসনাধীনে যথাসাধ্য ইউসুফ (আ.)-এর দীনের উপর থাকিয়া জীবন যাপন করিতে থাকে। ক্ষমতাসীনরা বনী ইসরাঈলকে 'বিদেশী' বিবেচনায় বিভিন্নরূপে নির্যাতন করিতে থাকে এবং তাহাদিগকে দাসে পরিণত করে। প্রায় চার শত বৎসর পর আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আ)-এর হাতে বনী ইসরাঈলের দাসত্ব হইতে মুক্তিদান ও ফিরআওনকে ধ্বংস করিবার ব্যবস্থা করেন (তাফসীরে মাজহারী, ৫খ., ২০৪; মুফতী শফী, মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., ১৩৯; কান্ধলাবী, মা'আরিফুল কুরআন, ৪খ., ৬৮)।