📄 ইয়াকূব (আ)-এর সপরিবারে মিসর আগমন
ইয়াকুব (আ) পরিবার ইউসুফ (আ)-এর আহবানে সাড়া দিবার জন্য অবিলম্বে মিসর গমনের প্রস্তুতি গ্রহণ করিতে লাগিলেন। ইয়াকুব (আ) তাঁহার পুত্র-পৌত্রীদের সহকারে প্রস্তুতি গ্রহণ করিয়া মিসর অভিমুখে রওয়ানা হইলেন (মাআরিফুল কুরআন, ৫খ., ১৩২)। ইউসুফ (আ) মিসর আগমনের প্রস্তুতির জন্য তাঁহার প্রত্যেক ভাইকে এক এক সেট পূর্ণ বস্তু ও বিনয়ামীনকে পাঁচ সেট বস্তু ও তিন শত রৌপ্যমুদ্রা দিয়াছিলেন এবং পিতার জন্য দশটি গাধা বোঝাই উপহার ও অন্য দশটি গাধা বোঝাই খাদ্যদ্রব্য পাঠাইয়াছিলেন (রূহুল মা'আনী, ১৩ পারা, পৃ. ৫৭)।
বাইবেলে আছে: ফিরআওন ইউসুফ (আ)-কে বলিল, তুমি তাহাদিগকে বল যে, তোমরা এইরূপ কর যে, তোমাদের পুত্র-সন্তানগণ ও তোমাদের স্ত্রীগণের নিমিত্ত মিসর দেশ হইতে শকটযান নিয়া যাও এবং তোমাদের পিতাকে নিয়া আইস এবং তোমাদের (সেখানকার) আসবাবপত্রের জন্য কোন প্রকার দুঃখ করিও না। কেননা সমগ্র মিসর দেশের তুষ্টি তোমাদের নিমিত্ত নিবেদিত এবং ইসরাঈল পুত্রগণ তদ্রূপই কার্য করিল এবং ইয়াকুব তাহার গোষ্ঠী সহকারে মিসরে আগমন করিল। সে তাহার পুত্রগণ ও পুত্রগণের পুত্রগণ এবং তাহার কন্যাগণ ও পুত্রগণের কন্যাগণ ও নিজের সকল ঔরসজাতকে নিজের সহিত মিসরে আনিলেন। সুতরাং তাহারা সকলেই যাহারা ইয়া'কূবের পরিবারের সদস্য ছিল এবং মিসর আগমন করিয়াছিল, তাহাদের সংখ্যা ছিল সত্তর (দ্র. আদিপুস্তক ৪৬: ১৬, ২০; ৪৬: ৭, ২৭)।
যথাযোগ্য প্রস্তুতি গ্রহণের পর ইয়াকূব পরিবারের সকল সদস্যের কাফেলাটি মিসর অভিমুখে রওয়ানা করিল। তাহাদের সংখ্যা কত ছিল সে সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়: ৭২, ৯৯, ৩৮০, ৩৯০, ৬৩, ৮৩। বইবেলীয় বর্ণনায় তাহাদের সংখ্যা সত্তর জন (৭০) এবং বাইবেলে তাহাদের নামের তালিকাও রহিয়াছে (আল-বিদায়া, ২খ, ২৫১; তাফসীরে মাজেদী, পৃ. ৫০৬ টীকা ১৬৯; বরাত ৪৬: ২৭; তাবারী, ১খ, ১৮৭)।
কাফেলা সফর করিয়া মিসরের নিকটবর্তী হইলে ইউসুফ (আ) সংবাদ পাইয়া পিতাকে রাজকীয় সম্বর্ধনা প্রদানের উদ্দেশে নগরীর বাহিরে অভ্যর্থনা কেন্দ্রে আসিলেন। ইউসুফ (আ) বাদশাহকে তাঁহার পিতার আগমনের সংবাদ অবহিত করিলে বাদশাহ তাঁহার পরিষদের সদস্যবর্গ ও গণ্যমান্য লোকদিগকে সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগদানের এবং যথাযোগ্য রাজকীয় মর্যাদায় সম্বর্ধনা প্রদানের ব্যবস্থা করিবার আদেশ দিলেন এবং নিজেও সম্বর্ধনার জন্য বাহিরে জনগণের সম্বর্ধনা কেন্দ্রে গমন করিলেন। (মুখতাসার তাফসীর ইবন কাছীর, ২খ, ২৬২; বিদায়া, ১খ, ২৫০, ২৫১; মাজহারী, ৫খ., ২০১; মাআরিফুল কুরআন, মুফতী শফী, ৫খ., ১৩২; ফী জিলালিল কুরআন, ৫খ, ৭১, ৭২; কাসাসুল কুরআন, ১খ, ৩৬৩)। বাইবেলের বর্ণনায়, "ইউসুফ তাহার গাড়ি তৈরি করিল এবং পিতাকে স্বাগত জানাইবার জন্য সম্বর্ধনা অনুষ্ঠান কেন্দ্রের দিকে চলিল। নিজেকে তাহার নিকট করিল এবং তাঁহার গলা জড়াইয়া ধরিয়া ক্রন্দন করিল (তাফসীর মাজেদী, পৃ. ৫০৭, টীকা ১৭৭; বরাত বাইবেলের আদি পুস্তক, ৪৬: ২৮, ২৯)।
মুফাসসিরগণ বর্ণনা করিয়াছেন যে, সম্বর্ধনার জন্য ইউসুফ (আ) নগরীর বাহিরে এতদুদ্দেশে নির্মিত রাজকীয় তাঁবু বহর অথবা কোন প্রাসাদে সেনাবাহিনী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে সঙ্গে লইয়া অপেক্ষমাণ ছিলেন। অপর দিক হইতে ইয়াকূব (আ) পুত্র ইয়াহুদার কাঁধে ভর করিয়া আগাইয়া আসিতেছিলেন। ইয়াকুব (আ) তাঁহার সম্মুখ দিকে অশ্ববাহিনী ও জনতার সমাগম দেখিয়া ইয়াহুদাকে বলিলেন, ঐ কি মিসর সম্রাট ফিরআওনের বাহিনী? ইয়াহুদা বলিল, আব্বাজান! ফিরআওন নয়, আপনার পুত্র ইউসুফ। আপনাকে অভ্যর্থনা করিবার জন্য লোকজন নিয়া আসিয়াছে। পিতা ইয়াকুব (আ) বলিলেন, اَلسّلامُ عَلَيْكَ يَا مُذْهِبَ الْأَحْزَانِ 'হে দুঃখ-যাতনার অবসানকারী! তোমাকে সালাম।' ইয়াকূব (আ) ইউসুফকে বুকে জড়াইয়া নিলেন এবং তাহাকে চুমু খাইলেন। তখন তাঁহাদের উভয়ের চক্ষু হইতে গড়াইয়া পড়িতেছিল পুনর্মিলনের অরূন্দাশ্রু (রূহুল মাআনী, ১৩ পারা, ৫৭; মাজহারী, ৫খ, ২০১)।
📄 হযরত ইউসুফ (আ)-এর বর্গের বাস্তবায়ন
সাক্ষাত পর্ব শেষ হইলে ইউসুফ (আ) পিতার নিকট আবদার করিলেন, মেহেরবানী পূর্বক সসম্মানে নগর অভ্যন্তরে চলুন। এই সময় মিসরের রাজধানীর নাম ছিল রামাসীস ( رعمسیس ) যাহা 'উৎসবের শহর' নামে অভিহিত হইত। ইউসুফ (আ) তাঁহার পিতা ও পরিবারবর্গের সকলকে রাজকীয় বাহনে আরোহণ করাইয়া জাঁকজমকের সহিত নগর অভ্যন্তরে নিয়া গেলেন এবং রাজভবনে তাঁহাদের অবস্থানের ব্যবস্থা করিলেন" (কাসাসুল কুরআন, ১খ, ৩৩৩)।
অধিকাংশ ঐতিহাসিক ও মুফাসাসিরের বর্ণনামতে ইউসুফ (আ) ও বিনয়ামীনের মাতা রাহীল ইতোপূর্বে ইন্তিকাল করেন। তাঁহাদের মতে, এই আয়াতে "মা" বলিতে ইউসুফ (আ)-এর খালা লায়্যাকে বুঝানো হইয়াছে। কেননা তখন চাচাকে পিতা বলার ন্যায় খালাকে মাতা বলিবার প্রচলন ছিল। ইহা ছাড়া এই খালা পিতা ইয়াকূবের স্ত্রী হওয়ার কারণে স্বভাবতই তাহাকে মাতা বলা যায়। ইবন আব্বাস হইতে এই অভিমত বর্ণিত হইয়াছে (রূহুল মা'আনী, ১৫ পারা, পৃ. ৫৭)। ইউসুফ (আ)-এর নিরুদ্দেশ হওয়ার পর কত বৎসর পরে পিতা-পুত্রের পুনর্মিলন ঘটিয়াছিল সে সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনা রহিয়াছে। ইবনে কাছীরের মতে এই সময়কাল ২৭/২৮ বৎসর ছিল (বিদায়া, ১খ., ২৫৩)।
ইয়াকূব (আ) এই সময় বাদশাহর জন্য দু'আ করিয়াছিলেন এবং তাঁহার আগমনের বরকতে আল্লাহ তা'আলা মিসরবাসীকে দুর্ভিক্ষের পরবর্তী বৎসরগুলি হইতে পরিত্রাণ দান করিয়াছিলেন (বিদায়া; ১খ, ২৪১)।
ইয়াকূব (আ) ও তাঁহার পরিবারবর্গের মিসর আগমন উপলক্ষে রাজকীয় সম্বর্ধনার ব্যস্ততা সমাপ্ত হওয়ার পর ইউসুফ (আ) একটি মজলিস অনুষ্ঠানের ইচ্ছা করিলেন, যাহাতে মিসরবাসী তাঁহার সম্মানিত পিতা ও পরিবারের সদস্যদের পরিচিত লাভ করিতে পারে। সুতরাং একটি দরবারের আয়োজন করা হইল এবং নিয়ম অনুযায়ী দরবারের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ আসন গ্রহণ করিলেন। ইউসুফ (আ)-এর হুকুমে তাঁহার পিতা-মাতাকে রাজকীয় মঞ্চে উচ্চাসনে উপবিষ্ট করানো হইল এবং পরিবারের অন্য সদস্যদেরকে তাহাদের মর্যাদা অনুসারে আসন প্রদান করা হইল। এই সকল ব্যবস্থার পর ইউসুফ (আ) শাহী মহল হইতে বাহির হইয়া সিংহাসনে উপবেশন করিলেন। দরবারী সদস্যরা দরবারের নিয়মানুসারে তাঁহার সম্মানে সিজদা করিল। পরিবেশ-পরিস্থিতি দরবারে উপস্থিত ইউসুফ (আ)-এর পিতা-মাতা ও ইউসুফ ভ্রাতৃবর্গকে এমনভাবে অভিভূত করিল যে, তাহারাও দরবারীদের অনুসরণে সিজদায় পতিত হইল। কুরআনের বর্ণনায়:
وَرَفَعَ أَبَوَيْهِ عَلَى الْعَرْشِ وَخَرُّوا لَهُ سُجَّدًا .
"এবং ইউসুফ তাহার পিতা-মাতাকে উচ্চাসনে বসাইল এবং উহারা সকলে তাহার সম্মানে সিজদায় লুটাইয়া পড়িল" (১২: ১০০)।
এই সিজদা সম্পর্কে বিভিন্ন মনীষী বিভিন্ন মত ব্যক্ত করিয়াছেন। তবে তাঁহারা সকলে এই বিষয়ে একমত যে, এই সিজদা ইবাদতের সিজদা ছিল না। কেহ কেহ বলিয়াছেন, ইহা আক্ষরিক অর্থে ভুলুণ্ঠিত হওয়া ও মস্তক মাটিতে স্পর্শ করাইবার সিজদা ছিল না। ইহা ছিল মাথা ঝুঁকাইয়া কাহাকেও অভিবাদন ও সম্মান করিবার তৎকালে প্রচলিত প্রথা। সুতরাং ইহাকে রূপক অর্থে সিজদা বলা হইয়াছে। অধিকাংশের মতে এই সিজদা কপাল মাটিতে লাগাইয়াই করা হইয়াছিল। তবে উহা ইবাদতের জন্য ছিল না। উহা ছিল সম্মান প্রদর্শনের জন্য। শরীআতে মুহাম্মাদীতে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাহারো জন্য কোন প্রকার সিজদা করা হারাম করা হইয়াছে। আতা (র) সূত্রে ইবন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত হইয়াছে, তাহারা ইউসুফকে ফিরিয়া পাওয়ার আনন্দে (এবং অভাবনীয় ও অপরিসীম নি'মাত লাভের) শুকরিয়া আদায়ের উদ্দেশ্যে আল্লাহ তা'আলার জন্য সিজদাবনত হইয়াছিল (তাফসীর কাবীরের বরাতে তাফসীরে মাজেদী, ১খ., পৃ. ৫০৭, টীকা, ১৭৮; মুখতাসার ইবন কাছীর, ২খ, ২৬২; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ., ২৫১; রূহুল মা'আনী, ১৩ পারা, পৃ. ৫৮; মাজহারী, ৫খ, ২০২; মুফতী শফী, মা'আরিফুল কুরআন, ১খ., ১৩৩; কান্ধলাবী, মা'আরিফুল কুরআন, ৪খ., ৬৬; ফী জিলালিল কুরআন, ৫খ, ৭২; কাসাসুল কুরআন, ১খ, ৩৩৩। বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ ও বিশদ আলোচনার জন্য দ্র. তাফসীরে কবীর, ইমাম রাযী, ১৮ খ., পৃ. ২১২-২১৩)।
দরবারীদের অনুসরণে পিতা-মাতা ও ভাইগণকে সিজদাবনত হইতে দেখিয়া এই সুদীর্ঘ কাল পরে শৈশবে দেখা স্বপ্নটির কথা ইউসুফ (আ)-এর মনে পড়িয়া গেল। তিনি আল্লাহ তা'আলার মহিমার বর্ণনা প্রদান এবং তাঁহার জীবনের একের পরে এক কঠিন হইতে কঠিনতর সংকট হইতে মুক্তি লাভ ও সকল পরীক্ষায় সফলতার সহিত উত্তীর্ণ হওয়ার শুকরিয়া প্রকাশ করিয়া একটি অতি সংক্ষিপ্ত ভাষণ দিলেন (কুরআনের ভাষায়):
وَقَالَ يَا بَتِ هَذَا تَأْوِيلُ رُؤْيَايَ مِنْ قَبْلُ قَدْ جَعَلَهُ رَبِّي حَقًّا وَقَدْ أَحْسَنَ بِي إِذْ أَخْرَجَنِي مِنَ السِّجْنِ مِنْ بَعْدِ أَنْ نَزَغَ الشَّيْطَانُ بَيْنِي وَبَيْنَ اخْوَتِي إِنَّ رَبِّي لَطِيفٌ لِمَا يَشَاءُ إِنَّهُ هُوَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ
"সে বলিল, হে আমার পিতা! ইহাই আমার পূর্বেকার স্বপ্নের ব্যাখ্যা। আমার প্রতিপালক উহা সত্যে পরিণত করিয়াছেন এবং তিনি আমাকে কারাগার হইতে মুক্ত করিয়া এবং শয়তান আমার ও আমার ভ্রাতাদের সম্পর্ক নষ্ট করিবার পর আপনাদিগকে মরু অঞ্চল হইতে এখানে আনিয়া দিয়া আমার প্রতি অনুগ্রহ করিয়াছেন। আমার প্রতিপালক যাহা ইচ্ছা তাহা নিপুণতার সহিত করেন। তিনি তো সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়" (১২:১০০)।
এই নাতিদীর্ঘ ভাষণের পরবর্তী অংশে ইউসুফ (আ) তাঁহার প্রতি আল্লাহর মহাঅনুগ্রহ, বিশেষত ইলম ও নবুওয়াত এবং পার্থিব রাজত্ব প্রাপ্তির শুকরিয়া আদায় করিলেন এবং মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়া বলিলেন:
رَبِّ قَدْ آتَيْتَنِي مِنَ الْمُلْكِ وَعَلَّمْتَنِي مِنْ تَأْوِيلِ الأَحَادِيثِ فَاطِرَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ أَنْتَ وَلِي فِي الدُّنْيَا وَالآخِرَةِ تَوَفَّنِي مُسْلِمًا وَالْحِقْنِي بِالصَّلِحِينَ.
"হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাকে রাজ্য দান করিয়াছ এবং আমাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষা দিয়াছ। হে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর স্রষ্টা! তুমিই ইহলোক ও পরলোকে আমার অভিভাবক। তুমি আমাকে মুসলিম হিসাবে মৃত্যু দাও এবং আমাকে সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত কর” (১২:১০১)।
যুগে যুগে পৃথিবীর বুকে প্রতিপত্তি ও দাপটের সহিত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মসনদারোহী দাম্ভিকদের বক্তৃতা-বিবৃতির সহিত তৎকালীন বিশ্বের সর্বাধিক উন্নত ও শ্রেষ্ঠ রাজ্য মিসরের মসনদারোহী ইউসুফ (আ)-এর এই সংক্ষিপ্ত ভাষণের মৌলিক পার্থক্য স্রষ্টাতে আত্মসমর্পণ, অবনত মস্তকে তাঁহার শুকরিয়া আদায়, পরম বিনয় প্রকাশের সহিত মৃত্যু ও আখিরাতের স্মরণ এবং সৎসংগ লাভের বাসনার ভাবাদর্শে অত্যন্ত সমুজ্জ্বল।
মুফাসসিরগণ এই ভাষণের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে যাহা বলিয়াছেন উহার মর্ম এই যে, ভাইদের নিকট হইতে দুর্ব্যবহার, এমনকি তাঁহার জীবন নাশের চেষ্টা, গোলামী জীবন যাপন, মিথ্যা অভিযোগে কারারুদ্ধ জীবন-যাপন, সুদীর্ঘ কাল পিতৃ-মাতৃ বিচ্ছেদের পর পুনর্মিলন এবং প্রতিশোধ গ্রহণের নিরংকুশ ক্ষমতা ও সুযোগ থাকিলে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে প্রতিশোধ-স্পৃহা পরিলক্ষিত হয় এবং দুঃখ-ভরা জীবনের মর্মস্পর্শী বিশদ বিবরণ প্রদানের প্রবণতা দেখা যায়, আলোচ্য ক্ষেত্রে পিতা-পুত্রের মধ্যে উহার বিন্দুমাত্রও বিদ্যমান নাই, বরং পিতা-পুত্রের এই সুদীর্ঘ সময়ের ঘটনাবলী যেন অত্যন্ত সাধারণ কোন বিষয়। সুতরাং শৈশবে পিতার সান্নিধ্য হইতে বিচ্ছিন্ন ইউসুফ (আ) বিপদের মহাসাগর পাড়ি দিয়া মুক্তির সৈকতে অবতীর্ণ হওয়ার পরও যে কথা বলিলেন উহাতে বিপদের বিবরণ গৌণ হইয়া মুক্তিলাভ ও উহাতে স্রষ্টার অনুগ্রহের বিবরণ মুখ্যরূপে প্রকাশিত হইয়াছে।
ইউসুফ (আ)-এর দুঃখময় জীবনকে তিনটি স্তরে বিভক্ত করা যায়। প্রথমত, ভাইদের বিদ্বেষ ও নিপীড়ন; দ্বিতীয়ত, পিতা-মাতার সহিত সুদীর্ঘ কালের বিচ্ছেদ এবং তৃতীয়ত, কারাগারের কঠিন জীবন। কিন্তু আল্লাহ তা'আলার এই মহান নবী তাঁহার ভাষণে ঘটনার এই ক্রমবিন্যাস পরিবর্তন করিয়া প্রথমেই কারাগার প্রসঙ্গ উত্থাপন করিলেন এবং উহাতে ও কারারুদ্ধ হওয়ার কারণস্বরূপ আযীয পত্নী ও নিজের গোলামী জীবনের গৃহকর্ত্রীই যে উহার উৎস ছিল সে কথা উল্লেখ করিয়া আযীয, আযীয-পত্নী ও সংশ্লিষ্টদের লজ্জিত করিলেন না এবং সেখানে দুঃখ-কষ্ট ভোগের আলোচনাও করিলেন না, বরং কারাগার হইতে মুক্তি লাভের বিষয়টি আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহ হওয়াকেই মুখ্যরূপে উপস্থাপন করিলেন, তবে পরোক্ষভাবে এ সময় কারাজীবন যাপনের প্রতি ইংগিত করিলেন। আরও লক্ষণীয় যে, কারামুক্তি প্রসঙ্গে কারারুদ্ধ থাকিবার প্রতি ইঙ্গিত করিলেও কূপ হইতে মুক্তিলাভের উল্লেখ একেবারেই করিলেন না। কেননা উহাতে ভাইদের কূপে নিক্ষেপের বিষয়টির প্রতি পরোক্ষ ইঙ্গিত হইত। অথচ تَشْرِيْبَ عَلَيْكُمْ বলিয়া ভাইদিগকে সম্পূর্ণ ও নিঃশর্তরূপে দায়মুক্তি ঘোষণা করিবার পর বিষয়টির প্রতি পরোক্ষ ইঙ্গিত প্রদান করা তাঁহার রুচিসম্মত ছিল না। অতঃপর পিতা-মাতার সহিত সুদীর্ঘ কালের বিচ্ছেদ ও দুঃখ-দুর্যোগময় জীবনের বিবরণ প্রদান না করিয়া এই সবের পরিণতি এবং পিতা-মাতার সহিত পুনর্মিলনের বিষয়টিও আল্লাহ তা'আলার এক বিশেষ অনুগ্রহরূপে উপস্থাপন করিলেন যে, আল্লাহ তাহাদিগকে মরু অঞ্চলের অভাব-অনটন ও কষ্টকর জীবন হইতে নগর সভ্যতার মর্যাদাসম্পন্ন ও প্রাচুর্যময় জীবনে পৌছাইয়া দিয়াছেন। অতঃপর প্রথম বিষয় অর্থাৎ ভাইদের দুর্ব্যবহার ও নিপীড়নের বিষয়টিতে শয়তানকে দায়ী করিয়া ভাইদিগকে সম্পূর্ণ দায়মুক্ত করিয়া দিলেন। যেন তিনি বলিলেন, আমরা এক পিতার সন্তান ভাই ভাই-ই ছিলাম। শয়তানই আমাদের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটাইয়াছিল। এই ব্যাপারে ভাইদের কোন দোষ নাই। শয়তানের প্রতারণা না হইলে আমার ভাইয়েরা কোন অপকর্ম করিত না।
অবশেষে তিনি বিগত সকল ঘটনাকে মানুষের চিন্তা-চেতনা ও কর্তৃত্ব বহির্ভূতরূপে মহা প্রজ্ঞাবলে আল্লাহ তা'আলার সুদূরপ্রসারী সূক্ষ্ম পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, তাঁহার অনুগ্রহ ও হিকমতের বহিঃপ্রকাশ হওয়ার কথা ব্যক্ত করিয়া বলিলেন, أن ربى لطيف (মাজহারী, ৫খ, ২০২; মুফতী শফী, মাআরিফুল কুরআন, ৫খ., ১৩৫, ১৩৬; বরাত, কুরতুবী কান্ধলাবী, মা'আরিফুল কুরআন, ৪খ., ৬৬)।
ভাষণের সমাপ্তি অংশে ইউসুফ (আ) আল্লাহ তা'আলার প্রদত্ত বাহ্য ও পার্থিব নি'মত রাজত্ব এবং আত্মিক ও অপার্থিব নি'মত স্বপ্নের ব্যাখ্যা জ্ঞান তথা নবুওয়াতী ইল্ম দানের শুকরিয়া আদায় করিলেন। কেননা রাজত্ব এবং পার্থিব জীবনে প্রাচুর্য ও ক্ষমতাও একটি উল্লেখযোগ্য নি'মত (মাজেদী, ৫০৭, টীকা ১৮১)। সুতরাং শুক্রিয়া প্রকাশের ক্ষেত্রে উহার উল্লেখ ইউসুফ (আ)-এর দৃষ্টিতেও প্রয়োজনীয় ও বাঞ্ছনীয় ছিল। কিন্তু এই সবই ক্ষয়িষ্ণু ও সাময়িক হওয়ার কারণে একজন মুমিনের নিকট আখিরাতই প্রধান ও মুখ্য বিষয় এবং পৃথিবীর অঢেল প্রাচুর্য ও ক্ষমতা লাভ করিয়াও আখিরাতের কথা বিস্তৃত না হইয়া সদাসর্বদা আখিরাতের প্রবেশদ্বার মৃত্যুকে স্মরণে রাখাই মুমিনের কর্তব্য। সুতরাং ইউসুফ (আ) মুসলিমরূপে মৃত্যু কামনা এবং মৃত্যু পরবর্তী কালে আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভের ক্ষেত্র জান্নাত তথা জান্নাতের অধিকারপ্রাপ্ত নবী-রাসূলগণের সান্নিধ্য কামনার মাধ্যমে দু'আ (ও ভাষণ) সমাপ্ত করিলেন। অবশ্য মুফাসসিরদের অনেকে মৃত্যু সংক্রান্ত দু'আটি পরবর্তী কালে ইউসুফ (আ)-এর মৃত্যু সন্নিকট হওয়ার সময় করিবার অভিমতও ব্যক্ত করিয়াছেন (মুখতাসার ইবন কাছীর, ২খ, ২৬৩; আল-বিদায়া, ১খ., ২৫২, ২৫৩; মাজহারী, ৫খ., ২০৩; আরদুল কুরআন, ৫খ, ১৩৭; রূহুল মাআনী, ১৩ পারা, পৃ. ৬১, ৬২)।
বায়দাবীর বর্ণনামতে, (অনুষ্ঠান সমাপ্তির পর) এক সময় ইউসুফ (আ) পিতাকে রাজকীয় ভবনসমূহ ঘুরাইয়া দেখাইলেন। একটি ভবনে কাগজপত্রের বিশাল ভাণ্ডার দেখিয়া ইয়া'কূব (আ) বলিলেন, ইউসুফ! তোমার হাতের নাগালে এত কাগজ থাকা সত্ত্বেও এত দিনে আমাকে চিঠি লিখিলে না কেন? ইউসুফ (আ) বলিলেন, জিবরাঈল (আ) আমাকে নিষেধ করিয়াছিলেন। জিবরাঈল (আ) বলিলেন, আল্লাহ-ই আমাকে এইরূপ হুকুম করিয়াছিলেন (রূহুল মা'আনী, ১৩ পারা, পৃ. ৬০, ৬১; তাফসীরে মাজহারী, বায়দাবীর বরাতে, ৫খ., পৃ. ২০২, ২০৩)।
📄 মিসরে ইয়াকূব (আ) পরিবার (বনী ইসরাঈল)-এর আবাসন
তাওরাতের বর্ণনামতে ইউসুফ (আ) তাঁহার পিতা ও ভাইদেরকে 'সাদীদ' (سدید) অঞ্চলের অন্তর্গত 'আয়ন-শাম্স' (عين شمس) নামক স্থানে বসবাসের ব্যবস্থা করিয়াছিলেন (রূহুল মা'আনী, ১৩ পারা, পৃ. ৬১)। পবিত্র কুরআনের আয়াত নং ১০০ (رَبِّ قَدْ أَتَيْتَنِى مِنَ الْمُلْكِ) দ্বারা বুঝা যায় যে, আলোচ্য সময়ে ফিরআওন সাংবিধানিকভাবে মিসরের সম্রাট হইলেও প্রকৃত রাজক্ষমতা ইউসুফ (আ)-এর নিকট অর্পিত হইয়াছিল। বাইবেলের বর্ণনায় রহিয়াছে, তাঁহাকে সমগ্র মিসর দেশের শাসক করিলেন। ফিরআওন ইউসুফকে বলিল, 'আমি ফিরআওন রহিয়াছি এবং তোমার আদেশ ব্যতীত সমগ্র মিসরে কোন মানব তাহার হাত-পা উত্তোলন করিবে না। ফিরআওন ইউসুফকে 'জাহাঁপানাহ' (বিশ্বত্রাতা) উপাধিতে ভূষিত করিল" (আদিপুস্তক, ৪১: ৪০, ৪৪)।
ইউসুফ (আ) পিতা ও ভাইদেরকে বলিলেন যে, ফিরআওন তাহাদিগকে মিসরে স্থায়ীরূপে বসবাসের অনুরোধ করিলে এবং ভূমি ও স্থান নির্বাচন করিতে বলিলে তাহারা যেন অমুক অঞ্চল প্রদানের দাবি করেন এবং উহার অনুকূলে এই যুক্তি উপস্থাপন করেন যে, আমরা যেহেতু পল্লী জীবনে ও পশু চারণে অভ্যস্ত, সুতরাং আমরা নগরের কোলাহলপূর্ণ জীবন হইতে একটু দূরে অবস্থান করা স্বস্তিদায়ক মনে করি। সুতরাং ফিরআওন তাহাদিগকে তাহাদের কাঙ্ক্ষত ভূ-অঞ্চল 'জায়গীর' প্রদান করিলেন এবং এইরূপে মিসরে বনী ইসরাঈলীদের স্থায়ী নিবাসের গোড়াপত্তন হইল।
📄 ইয়াকূব (আ)-এর ওফাত ও তাঁহার ওসিয়ত
হযরত ইয়াকূব (আ)" শীর্ষক নিবন্ধে "হযরত ইয়াকূব (আ)-এর মিসর গমন ও অন্তিম জীবন" এবং 'অন্তিম উপদেশ' অনুচ্ছেদদ্বয় দ্রষ্টব্য।