📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মিসর অভিমুখে ইউসুফ ভ্রাতৃবর্গের তৃতীয় সফর

📄 মিসর অভিমুখে ইউসুফ ভ্রাতৃবর্গের তৃতীয় সফর


ইউসুফের সুদীর্ঘ দিনের অনুপস্থিতির সহিত বিনয়ামীন ও তাঁহার কারণে বড় ভাইয়ের অনুপস্থিতি যুক্ত হইয়া ই'য়াকূব (আ)-এর পরিবারে গভীরতর শোকের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। অপরদিকে বিরাজমান দুর্ভিক্ষকালে শোকাবহ পরিবেশ সৃষ্টি করে। ইয়া'কূব পরিবারের নিকট মিসর হইতে খাদ্যসামগ্রী সংগ্রহের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের ব্যবস্থা ছিল না। এইরূপ সঙ্কটময় পরিস্থিতিতেও আল্লাহ্র প্রিয় বান্দা ও নবী ইয়া'কূব (আ) একটি আশার আলো দেখিতে পান। ঘটনা প্রবাহ তাঁহার অন্তরে এই বিশ্বাস জন্মায় যে, পরীক্ষা ও দুঃখের দিন ফুরাইয়া আসিয়াছে এবং সুখ-শান্তির দিন সমাগত প্রায়। আল্লাহ তা'আলা যেন তাঁহার প্রিয় বান্দাকে ইংগিত দেন যে, বিনয়ামীনের ঘটনায় ইউসুফের সহিত পুনর্মিলনের রহস্য লুক্কায়িত রহিয়াছে (কাসাসুল কুরআন, ১খ., ৩২৮)। ইবন আবূ হাতিম বর্ণনা করিয়াছেন, ইয়া'কূব (আ) চব্বিশ বৎসর (মতান্তরে চল্লিশ বৎসর) পর্যন্ত জানিতেন না যে, ইউসুফ জীবিত আছেন না মৃত। প্রচণ্ড খাদ্য সমস্যার সমাধানের জন্য মিসরে যাওয়া ব্যতীত গত্যন্তর ছিল না। ইহা ছাড়া বিনয়ামীনকে মুক্ত করা এবং বড় ভাইকে ফিরাইয়া আনার জন্যও মিসর যাওয়ার প্রয়োজন ছিল। মোটকথা, পারিবারিক প্রয়োজন পূরণ এবং আশাহত পুত্রদের অন্তরে আশার সঞ্চারের উদ্দেশে ইয়া'কূব (আ) যৎকিঞ্চিত পুঁজি নিয়াই পুনরায় মিসর গমনের উপদেশ প্রদান করিয়া বলিলেন (কুরআনের ভাষায়):
يُبَنِيَّ اذْهَبُوا فَتَحَسَّسُوا مِنْ يُوسُفَ وَآخِيْهِ وَلَا تَابْنَسُوا مِنْ رُوْحِ اللَّهِ إِنَّهُ لَا يَابْنَسُ مِنْ رُوحِ اللَّهِ إِلَّا القَوْمُ الكفرُونَ .
"হে আমার পুত্রগণ! তোমরা যাও, ইউসুফ ও তাহার সহোদরের অনুসন্ধান কর এবং আল্লাহর আশিস হইতে তোমরা নিরাশ হইও না। কারণ আল্লাহর আশিস হইতে কেহই নিরাশ হয় না, কাফির সম্প্রদায় ব্যতীত" (১২:৮৭)।
পিতার উৎসাহদানে ইউসুফ ভ্রাতৃবর্গ তৃতীয়বার মিসর অভিমুখে রওয়ানা হইলেন (তাফসীরে মাজেদী, পৃ. ৫০৪, টীকা ১৫৯; ফী জিলালিল কুরআন, ২খ., ৬৪, ৬৫)। সেখানে বিনয়ামীনের উপস্থিতি নিশ্চিত ছিল বিধায় তাহারা চিন্তা করিল যে, যাহার হদিস জানা আছে তাহাকে পাওয়ার চেষ্টা করাই বাঞ্ছনীয় হইবে। তাহারা ভাবিল যে, কোমলপ্রাণ বাদশাহের নিকট হইতে বিনয়ামীনকে ফেরত পাওয়া সহজ হইতে পারে। খাদ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ইউসুফ ভ্রাতৃবর্গ তৃতীয়বারের মত মিসরে পদার্পণ করিল। তাহারা খাদ্যশস্য বরাদ্দ প্রাপ্তির জন্য আযীয মিসরের দরবারে উপস্থিতির সুযোগকে বিনয়ামীনের মুক্তির ব্যাপারে আবেদন-নিবেদনের উপায়রূপে কাজে লাগাইল। তাহারা আযীযের দরবারে উপস্থিত হইয়া তাহাদের পারিবারিক বিপন্ন অবস্থা তুলিয়া ধরিল এবং তাঁহার সহানুভূতি কামনা করিল। কুরআনের বর্ণনায়:
فَلَمَّا دَخَلُوا عَلَيْهِ قَالُوا يَأَيُّهَا الْعَزِيزُ مَسَّنَا وَأَهْلَنَا الضُّرُّ وَجِئْنَا بِبِضَاعَةٍ مُزْجُةٍ فَأَوْفِ لَنَا الْكَيْلَ وَتَصَدِّقُ عَلَيْنَا إِنَّ اللَّهَ يَجْزِي الْمُتَصَدِّقِيْنَ .
"যখন উহারা তাহার নিকট উপস্থিত হইল তখন বলিল, হে আযীয! আমরা ও আমাদের পরিবার-পরিজন বিপন্ন হইয়া পড়িয়াছি এবং আমরা তুচ্ছ পুঁজি লইয়া আসিয়াছি। আপনি আমাদের রসদ পূর্ণ মাত্রায় দিন এবং আমাদিগকে দান করুন; আল্লাহ দাতাগণকে পুরস্কৃত করিয়া থাকেন" (১২:৮৮)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ইউসুফ ভ্রাতৃবর্গের অপরাধ স্বীকার এবং ইউসুফ (আ)-এর ক্ষমা ঘোষণা

📄 ইউসুফ ভ্রাতৃবর্গের অপরাধ স্বীকার এবং ইউসুফ (আ)-এর ক্ষমা ঘোষণা


ইউসুফ ভ্রাতৃগণের এই তুচ্ছ পুঁজি কি ছিল সে সম্পর্কে মুফাসসিরগণ বিভিন্ন বস্তুর নাম উল্লেখ করিয়াছেন। পবিত্র কুরআনের مزجاة শব্দের অর্থ “প্রত্যাখ্যানযোগ্য” অর্থাৎ যাহা স্বাভাবিকভাবে ও প্রচলিত ব্যবস্থায় বিনিময় মূল্যরূপে গ্রহণযোগ্য নহে। মুফাসসিরদের বিভিন্ন মতে উহা ছিল অচল মুদ্রা, অধিক খাদযুক্ত মুদ্রা, প্রয়োজনের তুলনায় অতি তুচ্ছ ও নগণ্য পরিমাণের মুদ্রা, তৈজসপত্র, পশম ও ঘি, পশম ও পনির, দেবদারু ফল, বন্য পেস্তা, চামড়া ও চামড়াজাত দ্রব্য কিংবা বাজারে চাহিদা নাই এমন কোন পণ্য (মাজহারী, ৫খ., ১৯৫; মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., ১২৩; ইবন কাছীর, ২খ., ২৬১; বিদায়া, ১খ., ২১৫)।
ইউসুফ (আ) তাঁহার ভাইদের অহংবোধ সম্পর্কে পূর্ণরূপে অবহিত ছিলেন। কিন্তু আজ তাহাদের ভাষায় এভাবে এবং স্বরে ও সুরে আমূল পরিবর্তন লক্ষ্য করিলেন। নবীর অন্তর তো অন্যের দুঃখে কাতর হইয়াই থাকে, আর ইহারা তো ভাই। ইউসুফ (আ)-এর দৃষ্টির সম্মুখে সমগ্র ইতিহাস ভাসিয়া উঠিল। সেই সাথে সম্মুখে উপস্থিত তাঁহার হত্যা প্রচেষ্টাকারী ভাইয়েরা করুণাপ্রার্থী। পিতার মুখচ্ছবি এবং তাহাতে সন্তান হারানোর দুঃখ-ক্লিষ্টতার ছাপ ও দুর্ভিক্ষের ছোবল এবং উহার বিপরীতে তাঁহার নিজের রাজকীয় ক্ষমতা-প্রতিপত্তি ও প্রাচুর্যের কথা ভাবিতে লাগিলেন। এই পরিস্থিতি তাঁহাকে উদ্বেলিত করিয়া তুলিল। ভাইদিগকে আরও কিছু শিক্ষা দেওয়ার ইচ্ছা স্তিমিত হইয়া গেল। পিতা ও ভাইদের করুণ অবস্থা তাঁহার কোমল অন্তরকে সমবেদনার দোলায় তরংগায়িত করিয়া তুলিল। এখন আপন পরিচয়ে আত্মপ্রকাশে আর বিলম্ব করিতে চাহিলেন না। ইউসুফ (আ) আর আত্মসম্বরণ করিতে পারিলেন না। বেদনাপ্লুত হৃদয়ের আবেগ তাঁহার চক্ষুদ্বয়ের অশ্রুধারারূপে প্রকাশ পাইল। তখন তিনি আত্মপরিচয় প্রকাশের ভূমিকাস্বরূপ বলিলেন (কুরআনের ভাষায়): قَالَ هَلْ عَلِمْتُمْ مَا فَعَلْتُمْ بِيُوسُفَ وَآخِيهِ إِذْ أَنْتُمْ جُهَلُونَ .
"সে বলিল, তোমরা কি জান, তোমরা ইউসুফ ও তাহার সহোদরের প্রতি কিরূপ, আচরণ করিয়াছিলে, যখন তোমরা ছিলে অজ্ঞ" (১২ঃ ৮৯)।
ইউসুফ (আ)-এর এই আকস্মিক প্রশ্নে ভ্রাতৃবর্গ হতভম্ব হইয়া পড়িল। তাহারা ভাবিল, আমরা তো মিসরের রাজ-দরবারে আযীয মিসরের সম্মুখে দাঁড়াইয়া আছি। তবে তাঁহার মুখে ইউসুফের ব্যাপারে এ কি কথা শুনিতেছি! আবার তাঁহার ভাইয়ের কথা! তবে কি ইনিই ইউসুফ? তাহা কি করিয়া হয়? পিছনের সব ঘটনা তাহাদের হৃদয়পটে ভাসিয়া উঠিতে লাগিল। তাহারা ভাবিল, হইতেও পারে। কেননা ইউসুফের স্বপ্ন তো এখনও বাস্তবায়িত হয় নাই। তাই নিশ্চিত হওয়ার জন্য তাহারা বলিল:
قَالُوا إِنَّكَ لَأَنْتَ يُوسُفُ قَالَ أَنَا يُوسُفُ وَهَذَا أَخِي قَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَيْنَا إِنَّهُ مَنْ يَتَّقِ وَيَصْبِرْ فَإِنَّ اللَّهَ لَا يُضِيعُ أَجْرَ الْمُحْسِنِينَ.
"উহারা বলিল, তবে কি তুমিই ইউসুফ? সে বলিল, আমিই ইউসুফ এবং এই আমার সহোদর; আল্লাহ তো আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করিয়াছেন। নিশ্চয়ই যে ব্যক্তি মুত্তাকী এবং ধৈর্যশীল, আল্লাহ সেইরূপ সৎকর্মপরায়ণদের শ্রমফল নষ্ট করেন না" (১২ঃ ৯০)।
সায়্যিদ কুতব শহীদ লিখেন, "এখন তাহারা তাঁহার স্বরধ্বনি ও মুখমণ্ডলের কিছু কিছু আলামত দেখিয়া তাঁহাকে ইউসুফ বলিয়া ধারণা করিল" (ফী জিলালিল কুরআন, ৫খ., ৬৬)।
সেই মুহূর্তে অনুতাপ ও লজ্জায় ইউসুফ (আ)-এর অপরাধী বড় ভাইদের মাথা হেঁট হইয়া গেল। বিগত দিনের অসহায় মজলুম আজ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত, অপরাধীদের দণ্ডমুণ্ডের অধিকারী। বিগত দিনের প্রতাপশালী জালিম আজ আসামীর কাঠগড়ায়। কাল যাহাকে নিক্ষেপ করা হইয়াছিল কানআনের অন্ধকূপে, আজ তিনি আযীয মিসর। বিগত জীবনের সকল অপকর্মের ছবি একের পর এক তাহাদের মানসপটে ভাসিয়া উঠিতে লাগিল। অপরাধ বোধে ও লজ্জায় মাটিতে মিশিয়া যাইতে ইচ্ছুক ভাইয়েরা অবনত মস্তকে স্বীকারোক্তি করিল:
قَالُوا تَاللهِ لَقَدْ أَثَرَكَ اللهُ عَلَيْنَا وَإَنْ كُنَّا لَخَطِئِينَ.
"উহারা বলিল, আল্লাহর শপথ! আল্লাহ নিশ্চয়ই তোমাকে আমাদের উপর প্রাধান্য দিয়াছেন এবং আমরা তো অপরাধী ছিলাম" (১২ঃ ৯১)।
অর্থাৎ অহং ও আত্মমর্যাদাবোধে অনমনীয় ও শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার বড় ভাইয়েরা তাহাদেরই ছোট ভাইয়ের কাছে আজ অনুনয় বিনয় করিয়া নিজেদের অপরাধ স্বীকার করিতেছে। এই দৃশ্য ইউসুফ (আ)-এর হৃদয়ে প্রচণ্ড আলোড়ন সৃষ্টি করে। তিনি অবিলম্বে, পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ক্ষমা আদর্শের নির্মল ঘোষণা দিয়া বলিলেন (আল কুরআনের ভাষায়):
قَالَ لَا تَثْرِيبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ يَغْفِرُ اللَّهُ لَكُمْ وَهُوَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ.
"সে বলিল, আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নাই। আল্লাহ তোমাদিগকে ক্ষমা করুন এবং তিনিই শ্রেষ্ঠ দয়ালু" (১২ঃ ৯২)।
ইউসুফ (আ)-এর অন্তরে সর্বাগ্রে পিতার সাক্ষাত লাভের চিন্তা উদিত হইল। বাগাবী বলেন, পরিচয় পর্ব সমাপ্তির পর ইউসুফ (আ) ভাইদের নিকট পিতার অবস্থা জিজ্ঞাসা করিলে তাহারা বলিল, তোমার জন্য কাঁদিয়া কাঁদিয়া তিনি দৃষ্টিশক্তি হারাইয়া ফেলিয়াছেন। তখন ইউসুফ (আ) নিজের জামা খুলিয়া ভাইদের হাতে দিলেন এবং পরিবারের সকলকেসহ পিতাকে মিসরে নিয়া আসিতে বলিলেন (কুরআনের ভাষায়):
اذْهَبُوا بِقَمِيصِي هَذَا فَالْقُوهُ عَلَى وَجْهِ أَبِي يَأْتِ بَصِيرًا وَاتُونِي بِأَهْلِكُمْ أَجْمَعِينَ .
"তোমরা আমার এই জামাটি লইয়া যাও এবং ইহা আমার পিতার মুখমণ্ডলের উপর রাখিও; তিনি দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়া পাইবেন। আর তোমাদের পরিবারের সকলকেই আমার নিকট লইয়া আসিও" (১২ঃ ৯৩)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 জামা লইয়া ইউসুফ (আ) ভ্রাতৃবর্গের কান'আনে প্রত্যাবর্তন

📄 জামা লইয়া ইউসুফ (আ) ভ্রাতৃবর্গের কান'আনে প্রত্যাবর্তন


ইউসুফ-ভ্রাতৃবর্গের এই কাফেলা মিসর হইতে কান'আন প্রত্যাবর্তনের প্রস্তুতি গ্রহণ করিল। এইবার তাঁহার পিতার জন্য সুসংবাদ নিয়া যাইতেছিল। ইমাম নববীর বর্ণনামতে ইয়া'কূব (আ) ও সমগ্র পরিবারবর্গকে সসম্মানে ও রাজকীয় মর্যাদায় নিয়া আসিবার লক্ষ্যে ইউসুফ (আ) এই কাফেলার সহিত দুই শতটি বাহন ও উহাদের জন্য প্রয়োজনীয় ভ্রমণ উপকরণ প্রেরণ করিয়াছিলেন (মাজহারী, ৫খ., ২০১)। ইউসুফ (আ)-এর আদেশ মুতাবিক তাহারা জামা লইয়া কান'আনের উদ্দেশে মিসর ত্যাগ করিল। একদিকে কাফেলা মিসরের শহরতলী অতিক্রম করিতেছিল, আর অপরদিকে কান'আনে ইয়া'কূব (আ) উপস্থিত পৌত্র-পৌত্রী ও পরিবারের অন্য লোকদিগকে ডাকিয়া বলিতে লাগিলেন (কুরআনের বর্ণনায়):
وَلَمَّا فَصَلَتِ الْعِبْرُ قَالَ أَبُوهُمْ إِنِّي لَأَجِدُ رِيحَ يُوسُفَ لَوْلا أَنْ تُفَنِّدُونَ، قَالُوا تَاللَّهِ إِنَّكَ لَفِي ضَلَلِكَ القديم.
"অতঃপর যাত্রীদল যখন বাহির হইয়া পড়িল তখন উহাদিগের পিতা বলিল, তোমরা যদি আমাকে অপ্রকৃতিস্থ মনে না কর তবে বলি, আমি ইউসুফের ঘ্রাণ পাইতেছি। তাহারা বলিল, আল্লাহ্র শপথ! আপনি তো আপনার পূর্ব বিভ্রান্তিতেই রহিয়াছেন" (১২: ৯৪-৯৫)।
অপ্রকৃতস্থ হওয়ার ধারণা ছিল অবান্তর; বরং আল্লাহ তা'আলার সহিত ঘনিষ্ঠ সংযোগ থাকিবার কারণে ইউসুফের বাঁচিয়া থাকা ও তাঁহার সহিত পুনর্মিলন এবং সুদূর হইতে তাঁহার অস্তিত্বের ঘ্রাণ অনুভব করা তাঁহার জন্য কোন অবাস্তব ছিল না। কিন্তু সাধারণ মানুষের পক্ষে আল্লাহ্র কুদরতী বিষয়সমূহ অনুধাবন অসম্ভব বা কঠিন হওয়ার কারণে তাহারা অনেক বাস্তবকেও উপহাসে উড়াইয়া দেয়। ইয়া'কূব (আ) কর্তৃক ইউসুফ (আ)-এর সুঘ্রাণ পাওয়ার ঘটনাটিও ছিল অনুরূপ। মুজাহিদ বলিয়াছেন, ইয়া'কূব (আ) তিন দিনের দূরত্ব হইতে ইউসুফের ঘ্রাণ পাইয়াছিলেন, ইবন আব্বাস (রা)-এর বর্ণনামতে আট দিনের দূরত্ব হইতে। হাসান (র) বলিয়াছেন, মিসর হইতে কান'আনের দূরত্ব আশি ফরসাখ বা প্রায় দুই শত পঞ্চাশ মাইল। কেহ কেহ বলিয়াছেন যে, পবিত্র কুরআনে 'ইউসুফের সুঘ্রাণ' বলা হইয়াছে, ইউসুফের 'জামার' সুঘ্রাণ বলা হয় নাই। ইহা দ্বারা বুঝা যায় যে, সুঘ্রাণ মূলত ইউসুফের ছিল, তাঁহার জামার নহে (মাজহারী, ৪খ., ১৯৯; মা'আরিফুল কুরআন, ৪খ, ১৩১)। উপস্থিত ব্যক্তিবর্গের বিরূপ মন্তব্য শুনিয়া ইয়া'কূব (আ) নিরবতা অবলম্বন করিলেন। কাফেলা পৌছিবার সাথে সাথে সুসংবাদবাহক ইউসুফ (আ)-এর নির্দেশমত ইয়া'কূব (আ)-এর মুখমণ্ডলের উপর জামাটি রাখিল। তৎক্ষণাৎ তিনি দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়া পাইলেন। পুত্ররা তাহাদের জন্য আল্লাহ্র নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিলে ইয়া'কূব (আ) দু'আ করিবার ওয়াদা করিয়া তাহাদিগকে সান্ত্বনা দিলেন (কুরআনের ভাষায়):
فَلَمَّا أَنْ جَاءَ الْبَشِيرُ أَلْقَهُ عَلَى وَجْهِهِ فَارْتَدْ بَصِيرًا قَالَ أَلَمْ أَقُلْ لَكُمْ إِنِّي أَعْلَمُ مِنَ اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ . قَالُوا يُأَبَانَا اسْتَغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا إِنَّا كُنَّا خَطَئِينَ . قَالَ سَوْفَ اسْتَغْفِرُ لَكُمْ رَبِّي إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ.
অতঃপর যখন সুসংবাদবাহক উপস্থিত হইল এবং তাহার মুখমণ্ডলের উপর জামাটি রাখিল তখন সে দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়া পাইল। সে বলিল, আমি কি তোমাদিগকে বলি নাই যে, আমি আল্লাহ্র নিকট হইতে জানি যাহা তোমরা জান না" (১২:৯৬)?
ইবন মাস'উদ (রা) বলিয়াছেন, সুসংবাদ বাহক কাফেলার পূর্বেই ছুটিয়া আসিয়াছিলেন। এই সুসংবাদ বাহক কে ছিলেন? ইবন আব্বাস (রা)-এর মতে তিনি ছিলেন 'বড় ভাই' ইয়াহুদা। সুদ্দী বলেন, ইয়াহুদা তাহার অন্য ভাইদিগকে বলিলেন, আমিই ইউসুফের রক্তমাখা জামা পিতার নিকট নিয়া গিয়াছিলাম এবং ইউসুফকে নেকড়ে বাঘে খাওয়ার কথা বলিয়াছিলাম। সুতরাং আজও আমিই জামাটি নিয়া গিয়া তাঁহাকে বলিব যে, ইউসুফ বাঁচিয়া আছে। সেদিন যেমন আমি তাঁহাকে দুঃখ দিয়াছিলাম, আজ আমিই তাঁহাকে আনন্দ দান করিয়া প্রতিবিধান করিব। ইবন 'আব্বাস (রা) বলেন, ইয়াহুদা জামাটি নিয়া উর্ধশ্বাসে ছুটিতে লাগিল। পথিমধ্যে ক্ষুধা নিবারণের জন্য সে সাতটি রুটি সংগে নিয়াছিল, কিন্তু সেগুলি শেষ করিবার পূর্বেই সে পিতার নিকট পৌছিয়া গেল। এই আড়াই শত মাইল পথ সে পদব্রজে অতিক্রম করিয়াছিল। (মাজহারী, ৫খ., ২০০; মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., ১২৮, ১২৯, ১৩১)।
সুসংবাদ বাহক কাফেলা সিরিয়া আসিয়া ইয়া'কূব (আ)-কে তাহাদের মিশনের পূর্ণ সফলতা সম্পর্কে অবহিত করিল। তাহারা ইউসুফ (আ)-এর সার্বিক অবস্থা বর্ণনা করিল এবং বিশেষত পরিবারের সকলকে মিসরে নিয়া যাওয়ার ব্যাপারে ইউসুফ (আ)-এর অনুরোধের বিষয়ে অবহিত করিল। ইয়া'কুব (আ) এইবার পুত্র পৌত্রদের বিগত সকল মন্তব্যের সংক্ষিপ্ত জবাব দিলেন, "আমি তো বলিয়াছিলাম যে, আমি আল্লাহর পক্ষ হইতে এমন কিছু জানি যাহা তোমরা জান না"। আমি বলিয়াছিলাম, আল্লাহ্র রহমত সম্বন্ধে নিরাশ হইও না; ইউসুফকে সন্ধান কর। বলিয়াছিলাম, ইউসুফ বাঁচিয়া আছে এবং আল্লাহ আমাদের পুনর্মিলন ঘটাইবেন। সর্বশেষ বলিয়াছিলাম, আমি ইউসুফের সুঘ্রাণ পাইতেছি। তোমরা তখন এইসব কথা বিশ্বাস করিতে পার নাই। এখন তো তোমরা উহার বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করিলে। বাইবেলে আছে, "যখন সে (ইয়াকূব) সেই সকল শকট দেখিল, যাহা ইউসুফ তাঁহাকে নিয়া যাওয়ার জন্য পাঠাইয়াছিল, তখন তাহাদের পিতা ইয়াকূবের জীবন পুনরায় হইল এবং ইসরাঈল বলিল, ইহাই যথেষ্ট যে, আমার পুত্র ইউসুফ এখন বাঁচিয়া রহিয়াছে। আমি যাইব এবং আমার মৃত্যুর পূর্বে তাহাকে দেখিব" (আদিপুস্তক, ৪৫: ২৭, ২৮)।
হাসান (র) হইতে বর্ণিত আছে, সুসংবাদদাতা ইউসুফের জামা নিয়া আসিলে ইয়াকূব (আ) তাহাকে কিছু পুরস্কার দিতে চাহিলেন। কিন্তু পরিস্থিতি অনুকূল না হওয়ার কারণে তিনি এই বলিয়া দুঃখ ও অপারগতা প্রকাশ করিলেন, সাত দিন পর্যন্ত আমাদের বাড়িতে খাদ্য তৈরি হইতেছে না। কোন বস্তু পুরস্কার দিতে আমি অপারগ। তবে আমি দু'আ করি, আল্লাহ যেন তোমাদের মৃত্যুষাতনা লাঘব করিয়া দেন। কুরতুবী বলেন, এই দু'আই ছিল তাহাদের জন্য উৎকৃষ্ট পুরস্কার (মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ, ১১৮)।
ইউসুফ ভ্রাতৃবর্গ এতক্ষণ পিতাকে ইউসুফের সুংসবাদ প্রদানে ব্যস্ত থাকিলেও ভিতরে ভিতরে তাহারা লজ্জায় মরিয়া যাইতেছিল। কেননা পিতাকে প্রতারণা করিবার এবং ইউসুফ (আ)-এর প্রতি নির্যাতনের মাধ্যমে পিতার মনে অপরিসীম দুঃখ দেওয়া, কথায় কথায় পিতাকে ইউসুফ প্রেমের ব্যাপারে কটাক্ষ করিয়া ব্যথিত করিবার সকল ঘটনা ও চিত্র তাহাদের মনের মধ্যে আন্দোলিত হইতে থাকিল। তাহারা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধের কথা স্বীকার করিয়া অত্যন্ত অনুতাপ ও বিনয়ের সহিত ক্ষমা প্রার্থনা করিয়া বলিল, আব্বাজান! আমাদের জন্য আল্লাহ্র নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করুন। পুত্রদের আবেদনের জবাবে পিতা ইয়াকূব (আ) পরে ক্ষমা প্রার্থনার ওয়াদা করিলেন।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ইয়াকূব (আ)-এর সপরিবারে মিসর আগমন

📄 ইয়াকূব (আ)-এর সপরিবারে মিসর আগমন


ইয়াকুব (আ) পরিবার ইউসুফ (আ)-এর আহবানে সাড়া দিবার জন্য অবিলম্বে মিসর গমনের প্রস্তুতি গ্রহণ করিতে লাগিলেন। ইয়াকুব (আ) তাঁহার পুত্র-পৌত্রীদের সহকারে প্রস্তুতি গ্রহণ করিয়া মিসর অভিমুখে রওয়ানা হইলেন (মাআরিফুল কুরআন, ৫খ., ১৩২)। ইউসুফ (আ) মিসর আগমনের প্রস্তুতির জন্য তাঁহার প্রত্যেক ভাইকে এক এক সেট পূর্ণ বস্তু ও বিনয়ামীনকে পাঁচ সেট বস্তু ও তিন শত রৌপ্যমুদ্রা দিয়াছিলেন এবং পিতার জন্য দশটি গাধা বোঝাই উপহার ও অন্য দশটি গাধা বোঝাই খাদ্যদ্রব্য পাঠাইয়াছিলেন (রূহুল মা'আনী, ১৩ পারা, পৃ. ৫৭)।
বাইবেলে আছে: ফিরআওন ইউসুফ (আ)-কে বলিল, তুমি তাহাদিগকে বল যে, তোমরা এইরূপ কর যে, তোমাদের পুত্র-সন্তানগণ ও তোমাদের স্ত্রীগণের নিমিত্ত মিসর দেশ হইতে শকটযান নিয়া যাও এবং তোমাদের পিতাকে নিয়া আইস এবং তোমাদের (সেখানকার) আসবাবপত্রের জন্য কোন প্রকার দুঃখ করিও না। কেননা সমগ্র মিসর দেশের তুষ্টি তোমাদের নিমিত্ত নিবেদিত এবং ইসরাঈল পুত্রগণ তদ্রূপই কার্য করিল এবং ইয়াকুব তাহার গোষ্ঠী সহকারে মিসরে আগমন করিল। সে তাহার পুত্রগণ ও পুত্রগণের পুত্রগণ এবং তাহার কন্যাগণ ও পুত্রগণের কন্যাগণ ও নিজের সকল ঔরসজাতকে নিজের সহিত মিসরে আনিলেন। সুতরাং তাহারা সকলেই যাহারা ইয়া'কূবের পরিবারের সদস্য ছিল এবং মিসর আগমন করিয়াছিল, তাহাদের সংখ্যা ছিল সত্তর (দ্র. আদিপুস্তক ৪৬: ১৬, ২০; ৪৬: ৭, ২৭)।
যথাযোগ্য প্রস্তুতি গ্রহণের পর ইয়াকূব পরিবারের সকল সদস্যের কাফেলাটি মিসর অভিমুখে রওয়ানা করিল। তাহাদের সংখ্যা কত ছিল সে সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়: ৭২, ৯৯, ৩৮০, ৩৯০, ৬৩, ৮৩। বইবেলীয় বর্ণনায় তাহাদের সংখ্যা সত্তর জন (৭০) এবং বাইবেলে তাহাদের নামের তালিকাও রহিয়াছে (আল-বিদায়া, ২খ, ২৫১; তাফসীরে মাজেদী, পৃ. ৫০৬ টীকা ১৬৯; বরাত ৪৬: ২৭; তাবারী, ১খ, ১৮৭)।
কাফেলা সফর করিয়া মিসরের নিকটবর্তী হইলে ইউসুফ (আ) সংবাদ পাইয়া পিতাকে রাজকীয় সম্বর্ধনা প্রদানের উদ্দেশে নগরীর বাহিরে অভ্যর্থনা কেন্দ্রে আসিলেন। ইউসুফ (আ) বাদশাহকে তাঁহার পিতার আগমনের সংবাদ অবহিত করিলে বাদশাহ তাঁহার পরিষদের সদস্যবর্গ ও গণ্যমান্য লোকদিগকে সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগদানের এবং যথাযোগ্য রাজকীয় মর্যাদায় সম্বর্ধনা প্রদানের ব্যবস্থা করিবার আদেশ দিলেন এবং নিজেও সম্বর্ধনার জন্য বাহিরে জনগণের সম্বর্ধনা কেন্দ্রে গমন করিলেন। (মুখতাসার তাফসীর ইবন কাছীর, ২খ, ২৬২; বিদায়া, ১খ, ২৫০, ২৫১; মাজহারী, ৫খ., ২০১; মাআরিফুল কুরআন, মুফতী শফী, ৫খ., ১৩২; ফী জিলালিল কুরআন, ৫খ, ৭১, ৭২; কাসাসুল কুরআন, ১খ, ৩৬৩)। বাইবেলের বর্ণনায়, "ইউসুফ তাহার গাড়ি তৈরি করিল এবং পিতাকে স্বাগত জানাইবার জন্য সম্বর্ধনা অনুষ্ঠান কেন্দ্রের দিকে চলিল। নিজেকে তাহার নিকট করিল এবং তাঁহার গলা জড়াইয়া ধরিয়া ক্রন্দন করিল (তাফসীর মাজেদী, পৃ. ৫০৭, টীকা ১৭৭; বরাত বাইবেলের আদি পুস্তক, ৪৬: ২৮, ২৯)।
মুফাসসিরগণ বর্ণনা করিয়াছেন যে, সম্বর্ধনার জন্য ইউসুফ (আ) নগরীর বাহিরে এতদুদ্দেশে নির্মিত রাজকীয় তাঁবু বহর অথবা কোন প্রাসাদে সেনাবাহিনী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে সঙ্গে লইয়া অপেক্ষমাণ ছিলেন। অপর দিক হইতে ইয়াকূব (আ) পুত্র ইয়াহুদার কাঁধে ভর করিয়া আগাইয়া আসিতেছিলেন। ইয়াকুব (আ) তাঁহার সম্মুখ দিকে অশ্ববাহিনী ও জনতার সমাগম দেখিয়া ইয়াহুদাকে বলিলেন, ঐ কি মিসর সম্রাট ফিরআওনের বাহিনী? ইয়াহুদা বলিল, আব্বাজান! ফিরআওন নয়, আপনার পুত্র ইউসুফ। আপনাকে অভ্যর্থনা করিবার জন্য লোকজন নিয়া আসিয়াছে। পিতা ইয়াকুব (আ) বলিলেন, اَلسّلامُ عَلَيْكَ يَا مُذْهِبَ الْأَحْزَانِ 'হে দুঃখ-যাতনার অবসানকারী! তোমাকে সালাম।' ইয়াকূব (আ) ইউসুফকে বুকে জড়াইয়া নিলেন এবং তাহাকে চুমু খাইলেন। তখন তাঁহাদের উভয়ের চক্ষু হইতে গড়াইয়া পড়িতেছিল পুনর্মিলনের অরূন্দাশ্রু (রূহুল মাআনী, ১৩ পারা, ৫৭; মাজহারী, ৫খ, ২০১)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00