📄 ইয়াকূব পুত্রগণের কান'আন প্রত্যাবর্তন
ইউসুফ ভ্রাতৃবর্গ পরবর্তী আগমন কালে কনিষ্ঠ ভ্রাতা বিনয়ামীনকে সংগে নিয়া আসিবার ব্যাপারে যথাসাধ্য চেষ্টার মাধ্যমে পিতাকে সম্মত করিবার বিষয়ে ইউসুফ (আ)-কে অংগীকার প্রদান করিল এবং উট বোঝাই খাদ্যসম্ভার নিয়া কান'আনের উদ্দেশ্য মিসর হইতে যাত্রা করিল। ইয়া'কূব পুত্রগণ রসদ-সম্ভার সহকারে কান'আনে প্রত্যাবর্তন করিল এবং সমগ্র পিতার সম্মুখে উপস্থিত হইয়া তাঁহাকে সালাম করিল এবং মিসরে অবস্থানকালীন তাহাদের সার্বিক অবস্থা, বাদশাহের তথ্যানুসন্ধান, তাঁহার সমাদর, আপ্যায়ন ও অতিশয় মহানুভবতা এবং সর্বশেষ বাদশাহ কর্তৃক পুনরায় মিসর গমনের আহবান ও তাহাদের সত্যবাদিতার প্রমাণস্বরূপ কনিষ্ঠ ভ্রাতা বিনয়ামীনকে সংগে নিয়া যাওয়ার ব্যাপারে বাদশাহের চূড়ান্ত শর্ত আরোপ এবং এতদ্বিষয়ে তাহাদের অংগীকার ইত্যাদি বৃত্তান্ত পিতাকে অবহিত করিল। কান'আন প্রত্যাবর্তনের পর পিতা ও পুত্রদের কথোপকথনের বর্ণনা পবিত্র কুরআনে নিম্নরূপ:
ফَلَمَّا رَجَعُوا إِلى أَبِيهِمْ قَالُوا بِأَبَانَا مُنِعَ مِنَّا الكَيْلُ فَأَرْسِلْ مَعَنَا أَخَانَا نَكْتَلْ وَإِنَّا لَهُ لَحٰفِظُونَ . قَالَ هَلْ امَنُكُمْ عَلَيْهِ إِلَّا كَمَا أَمِنْتُكُمْ عَلَى أَخِيهِ مِنْ قَبْلُ فَاللَّهُ خَيْرٌ حَافِظًا وَهُوَ أَرْحَمُ الرَّحِمِينَ.
"অতঃপর উহারা যখন উহাদের পিতার নিকট ফিরিয়া আসিল, তখন উহারা বলিল, হে আমাদের পিতা! আমাদের জন্য বরাদ্দ নিষিদ্ধ করা হইয়াছে। সুতরাং আমাদের ভ্রাতাকে আমাদের সহিত পাঠাইয়া দিন যাহাতে আমরা রসদ পাইতে পারি। আমরা অবশ্যই তাহার রক্ষণাবেক্ষণ করিব। সে বলিল, আমি কি তোমাদিগকে উহার সম্বন্ধে সেইরূপ বিশ্বাস করিব, যেরূপ বিশ্বাস পূর্বে তোমাদিগকে করিয়াছিলাম উহার ভ্রাতা সম্বন্ধে? আল্লাহই রক্ষণাবেক্ষণে শ্রেষ্ঠ এবং তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।”
তাফসীরবিদগণ এই সংক্ষিপ্ত বর্ণনার ব্যাখ্যায় বলিয়াছেন, পুত্ররা বলিল, আমরা এক মহান ব্যক্তির সান্নিধ্যে গিয়াছিলাম। আমাদের প্রতি তাঁহার সমাদর ও আপ্যায়ন ছিল এমন যে, ইয়া'কূব সম্প্রদায়ের কোন ব্যক্তিও আমাদিগকে তদ্রূপ আদর-আপ্যায়ন করিত না। মোটকথা, মিসরের বাদশাহ আমাদিগকে মর্যাদার সহিত বিদায় করিয়াছেন এবং আমরা রসদ নিয়া আসিয়াছি। ইয়া'কূব (আ) বলিলেন, তোমরা পুনরায় সেখানে গমন করিলে মিসর-রাজকে আমার সালাম পৌছাইবে এবং বলিবে, আমাদের পিতা আপনার মহানুভবতা ও বদ্যন্যতার জন্য আপনাকে দু'আ করিতেছেন। অতঃপর তিনি বলিলেন, তোমাদের সালামের আওয়াযে দুর্বলতা অনুভব করিতেছি কেন? শাম 'উনের আওয়ায পাইতেছি না কেন (রূহুল মা'আনী, ১৩ পারা, পৃ. ১১)? শাম'উন কোথায়? তাহারা বলিল, বাদশাহ তাহাকে আমাদের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য যামানতস্বরূপ রাখিয়া দিয়াছেন এবং পরবর্তীবারে বিনয়ামীনকে সাথে নিয়া যাওয়ার তাগিদ ও শর্ত আরোপ করিয়াছেন। অন্যথায় রসদ পাওয়া যাইবে না, বরং সমূহ বিপদের ব্যাপারে বাদশাহ আমাদিগকে সতর্ক করিয়া দিয়াছেন। এই কারণে এইবার বিনয়ামীনকে রসদ দেওয়া হয় নাই। পিতা বলিলেন, তোমরা বাদশাহকে বিনয়ামীনের কথা অবহিত করিলে কেন? তাহারা বলিল, সরকারের লোকেরা আমাদিগকে সন্দেহভাজন গুপ্তচররূপে গ্রেফতার করিয়া বাদশাহর দরবারে উপস্থিত করিয়াছিল এবং আমাদের ইবরানী ভাষাও বাদশাহকে সন্দিহান করিয়াছিল। সুতরাং আমরা আত্মরক্ষা ও. অভিযোগ মুক্তির জন্য আমাদের পারিবারিক পরিচিতি ও নবুওয়াত বংশধারার কথা এবং আমরা এক পিতার বার সন্তান হওয়ার কথাসহ আমাদের এক ভাই ইউসুফের হারাইয়া যাওয়ার কারণে পিতা কর্তৃক তাহার কনিষ্ঠ সহোদরকে নিজের নিকট রাখিয়া দেওয়া ইত্যাদি বিষয়ে বাদশাহকে অবহিত করিতে বাধ্য হইয়াছি। এখন বিনয়মীনকে সংগে নিয়া যাওয়া ব্যতীত পুনরায় রসদ পাওয়ার কোন উপায় নাই। আপনার মনের কোন শংকা তাহাকে পাঠাইবার ব্যাপারে অন্তরায় হইলে আমাদের সাধ্যের ত্রুটি করিব না এবং পথেঘাটে তাহার কোন কষ্ট-ক্লেশ হইবে না (মাজহারী, ৫খ, ১৭৭, ১৭৮; মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ, ৮৯, ৯০)। সুতরাং আপনি পুনর্গমনে তাহাকে সংগে নিয়া যাওয়ার অনুমতি দিন। বাইবেলের বর্ণনাও অনুরূপ (আদিপুস্তক, ৪২: ২৯-৩৪; বরাত তাফসীর মাজেদী, ৪৯৮, টীকা ১২০)।
পুত্রদের বক্তব্য শুনিয়া ইয়াকূব (আ) তাঁহার ধৈর্য ও অবিচলতায় স্থির থাকিয়া পুত্রদের শুধু এতটুকু বলিলেন, তোমরা তো ইতোপূর্বে ইউসুফের ব্যাপারে তোমাদের “আমরা অবশ্যই তাহার হিফাজত করিব” উক্তিটির পুনরাবৃত্তি করিলেন। অতএব তোমাদের উপর ভরসা করা যায় না। যেহেতু বিনয়ামীনকে সংগে না নিলে রসদ পাওয়া যাইবে না, তাই তিনি তাহাকে তাহাদের সঙ্গে পাঠাইতে সম্মত হইলেন এবং বলিলেন, আমি তাহার নিরাপত্তার ব্যাপারে আল্লাহর উপরই ভরসা করিতেছি (মুফতী শফী, মাআরিফুল কুরআন, ৫খ, ৯০, ৯১; ইবন কাছীর, তাফসীর, ২খ., ২৫৫)। এদিকে খাদ্যের বস্তা খুলিবার পর্ব চলিতেছিল। বস্তা খুলিবার পর তাহারা অবাক বিস্ময়ে দেখিল যে, খাদ্যশস্যের সঙ্গে উহার প্রদত্ত মূল্য ফেরত দেওয়া হইয়াছে। কুরআনের বর্ণনায় :
وَلَمَّا فَتَحُوا مَتَاعَهُمْ وَجَدُوا بِضَاعَتَهُمْ رُدَّتْ إِلَيْهِمْ قَالُوا لِأَبَانَا مَا نَبْغِى هذه بِضَاعَتُنَا رُدَّتْ إِلَيْنَا وَنَمِيرُ أَهْلَنَا وَنَحْفَظُ أَخَانَا وَنَزْدَادُ كَيْلَ بَعِيرٍ ذَلِكَ كَيْلٌ يُسِيرٌ .
"যখন উহারা উহাদের মালপত্র খুলিল তখন উহারা দেখিতে পাইল উহাদের পণ্যমূল্য উহাদিগকে প্রত্যর্পণ করা হইয়াছে। উহারা বলিল, হে আমাদের পিতা! আমরা আর কি প্রত্যাশা করিতে পারি? ইহা আমাদের প্রদত্ত পণ্যমূল্য, আমাদিগকে প্রত্যর্পণ করা হইয়াছে। পুনরায় আমরা আমাদের পরিবারবর্গকে খাদ্য-সামগ্রী আনিয়া দিব এবং আমরা আমাদের ভ্রাতার রক্ষণাবেক্ষণ করিব এবং আমরা অতিরিক্ত আর এক উষ্ট্র- বোঝাই পণ্য আনিব; যাহা আনিয়াছি তাহা পরিমাণে অল্প।"
ইহা দেখিয়া তাহাদের বিশ্বাস জন্মিল যে, এই প্রত্যর্পণ ভুলে হয় নাই, বরং ইহা ইচ্ছাকৃতভাবে করা হইয়াছে। ইহাতে পুনরায় অবিলম্বে খাদ্য আনিবার জন্য মিসর গমন সহজসাধ্য হইবে ভাবিয়া তাহারা উৎফুল্ল ও আনন্দিত হইয়া বিনয়ামীনকে সংগে নিয়া যাওয়ার অনুমতি প্রদানের জন্য পিতাকে পুন অনুরোধ করিল। এই পুঁজি প্রত্যর্পণ বাদশাহের মহানুভবতা ও বদান্যতার প্রমাণ বলিয়া পিতার দৃষ্টি আকর্ষণ করিল এবং নগদ পুঁজি হাতে আসিবার কারণে নূতন সংগ্রহে বিলম্বের প্রয়োজন নাই। তাই তাহারা অবিলম্বে বিনয়ামীনকে সংগে লইয়া পুনরায় বিধিমতে এক উটের বোঝা অধিক আনিতে পারে (মাআরিফুল কুরআন, ৫খ, ৯১, ৯২; মাজহারী, ৫খ, ১৭৮; কাসাসুল কুরআন, ১খ, ৩১৮; তাফসীরে মাজেদী, পৃ. ৪৯৯)। বাইবেলের বর্ণনায় পুঁজি দেখিয়া ইউসুফ-ভ্রাতৃবর্গ ও ইয়াকূব (আ) এই ভাবিয়া শঙ্কিত হইয়া পড়েন যে, ইহা আবার না কোন নূতন বিপদের কারণ হয় (আদিপুস্তক, ৪২: ৩৫)। প্রকৃতপক্ষে এই ধরনের কোন আশংকার কারণ ছিল না। কুরআনুল কারীমেও ইহার কোন উল্লেখ নাই। বস্তুত ইউসুফ ভ্রাতৃবর্গ নিজ হাতেই পণ্যমূল্য প্রদান করিয়াছিল এবং লেনদেন সম্পন্ন হওয়ার পরই তাহারা মিসর হইতে প্রস্থানের অনুমতি পাইয়াছিল। ইহা ছাড়া প্রত্যেকের বস্তায় স্বতন্ত্ররূপে পুঁজি প্রত্যর্পণ যে কোন জ্ঞানবান ব্যক্তিকে ইহা বুঝাইয়া দেওয়ার জন্য যথেষ্ট যে, এই প্রত্যর্পণ মিসর অবস্থানকালে কাফেলার সদস্যদের প্রতি মিসরের শাসনকর্তার বদ্যান্যতার পরিচায়ক; বরং ভাইদেরকে প্রত্যক্ষ অনুগ্রহের গ্লানি হইতে রক্ষা করিবার জন্য ইউসুফ (আ) গোপনে পুঁজি প্রত্যর্পণের ব্যবস্থা করিয়াছিলেন (কাসাসুল কুরআন, ১খ., ৩১৮, ৩১৯)। ইহা ছাড়া পবিত্র কুরআনের “ফিরাইয়া দেওয়া হইয়াছে” প্রত্যর্পণ করা শব্দটিও প্রত্যর্পণের বিষয়টি হওয়ার প্রমাণ বহন করে (মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ, ৯০)। দুর্ভিক্ষের বাস্তব পরিস্থিতিতে পণ্যমূল্যের নগদ উপস্থিতি এবং পুত্রদের বারংবার অনুরোধে ইয়া'কূব (আ) নমনীয় হইলেন এবং বিনয়ামীনকে মিসরে নিয়া যাওয়ার অনুমতি প্রদান করিলেন। তবে বাহ্য সতর্কতাস্বরূপ তিনি পুত্রদের নিকট হইতে বিনয়ামীনকে নিরাপদে ফিরাইয়া আনিবার দৃঢ় অঙ্গীকার নিলেন এবং বলিলেন:
قَالَ لَنْ أُرْسِلَهُ مَعَكُمْ حَتَّى تُؤْتُونِ مَوْثِقًا مِّنَ اللهِ لَتَأْتُنَّنِي بِهِ إِلَّا أَنْ يُحَاطَ بِكُمْ فَلَمَّا اتَوهُ مَوْثِقَهُمْ قَالَ اللَّهُ عَلَى مَا نَقُولُ وَكِيلٌ .
"পিতা বলিল, আমি উহাকে কখনই তোমাদের সহিত পাঠাইব না যতক্ষণ না তোমরা আল্লাহর নামে অঙ্গীকার কর যে, তোমরা উহাকে আমার নিকট লইয়া আসিবেই, অবশ্য যদি তোমরা একান্ত অসহায় হইয়া না পড়। অতঃপর যখন উহারা তাহার নিকট প্রতিজ্ঞা করিল তখন সে বলিল, আমরা যে বিষয়ে কথা বলিতেছি, আল্লাহ্ তাহার বিধায়ক” (১২ঃ ৬৬)।
বাইবেলে শপথ অনুষ্ঠানটির বর্ণনা নিম্নরূপ: তাহাদের পিতা ইয়া'কূব তাহাদিগকে বলিলেন, তোমরা তো আমাকে সন্তানহারা করিয়া ফেলিলে; ইউসুফ নেই, শাম'উন নেই; আর এখন তোমরা বিনয়ামীনকেও নিয়া যাইবে। এইসব আমার ইচ্ছা বিরুদ্ধ বিষয়। তখন রুবেন পিতাকে লক্ষ্য করিয়া বলিল, আমি তাহাকে আপনার নিকট ফিরাইয়া না আনিলে আমার সন্তান দুইটিকে মারিয়া ফেলিবেন। উহাকে আমার হাতে সোপর্দ করুন, আমি তাহাকে পুনরায় আপনার নিকট নিয়া আসিব (আদিপুস্তক, ৪২: ৩৬-৩৭)।
📄 মিসর অভিমুখে ইউসুফ ভ্রাতৃবর্গের দ্বিতীয় সফর
পুত্রদের যথাযথ শপথ ও অংগীকারের পর সমগ্র বিষয়টিকে আল্লাহ তা'আলার উপর ন্যস্ত করিয়া ইয়া'কূব (আ) একদিকে আল্লাহকে সাক্ষী রাখিলেন, যাহাতে পুত্রগণ এই অংগীকার রক্ষার প্রতি যত্নবান থাকে, অন্যদিকে পুত্রদের বুঝাইয়া দিলেন যে, আল্লাহর ইচ্ছা ও তওফীক ছাড়া কাহারও নিরাপত্তা বিধান সম্ভব হয় না (মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., ৯২; তাফসীরে মাজেদী, পৃ. ৪৯৯; কাসাসুল কুরআন, ১খ., ৩১৯)। এ প্রসংগে বাইবেলের আর একটি বর্ণনা নিম্নরূপ : তখন যিহুদা স্বীয় পিতা ইসরাঈলকে কহিল, এই যুবাকে আমার সহিত প্রেরণ করুন। তবে আমরা উদ্যত হই ও প্রস্থান করি; তবেই আমরা এবং আপনি এবং আমাদের সন্তানরা বাঁচিবে, মরিবে না। আর আমি তাহার যামিন হইতেছি, আপনি আমার নিকটেই তাহাকে তলব করিবেন। আমি তাহাকে আপনার সমীপে আনয়ন না করিলে এবং তাহাকে আপনার সম্মুখে উপবিষ্ট না করিলে এই পাপ চিরকাল আমার ঘাড়ে থাকিবে। (আদিপুস্তক, ৪৩: ৮৯)।
কা'ব আহবার (রা) বলিয়াছেন, ইয়া'কূব (আ) শুধু সন্তানের শপথের উপর ভরসা না করিয়া বিষয়টি আল্লাহর উপর সোপর্দ করিলে আল্লাহ তা'আলা বলিলেন, আমার ইজ্জত ও মাহাত্ম্যের কসম! এখন যেহেতু আমার উপর ভরসা করিয়াছ, সুতরাং আমি তাহার হিফাজত করিব এবং তাহাদের দুইজনকেই (ইউসুফ ও বিনয়ামীন) তোমার নিকট ফিরাইয়া দিব (মাজহারী, ৫খ, ১৭৯; মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ, ৯৩, ৯৪)।
পিতার সম্মতি নিয়া যখন ইয়া'কূব পুত্রগণ কনিষ্ঠ ভ্রাতা বিনয়ামীনসহ দ্বিতীয়বার রসদ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে মিসর অভিমুখে প্রস্থানের প্রস্তুতি গ্রহণ করিল তখন বিদায়কালে স্নেহময় পিতা একটি বিশেষ নিয়মে মিসরে প্রবেশ করিবার জন্য উপদেশ দিলেন। তিনি বলিলেন, কুরআনের ভাষায়:
وَقَالَ يبَنِي لَا تَدْخُلُوا مِنْ بَابٍ وَاحِدٍ وَادْخُلُوا مِنْ أَبْوَابٍ مُتَفَرِّقَةٍ وَمَا أَغْنِي عَنْكُمْ مِنَ اللَّهِ مِنْ شَيْءٍ إِن الحكم إلا الله عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَعَلَيْهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُتَوَكِّلُونَ . وَلَمَّا دَخَلُوا مِنْ حَيْثُ أَمَرَهُمْ أَبُوهُمْ مَا كَانَ يُغْنِي عَنْهُمْ مِنَ اللَّهِ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا حَاجَةً فِي نَفْسٍ يَعْقُوبَ قَضْهَا وَإِنَّهُ لَذُو عِلْمٍ لِمَا عَلَّمْنْهُ وَلَكِنْ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ .
"সে বলিল, হে আমার পুত্রগণ! 'তোমরা এক দ্বার দিয়া প্রবেশ করিও না, ভিন্ন ভিন্ন দ্বার দিয়া প্রবেশ করিবে। আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধে আমি তোমাদের জন্য কিছু করিতে পারি না। বিধান আল্লাহ্রই। আমি তাঁহারই উপর নির্ভর করি এবং যাহারা নির্ভর করিতে চাহে তাহারা আল্লাহ্ই উপর নির্ভর করুক।' যখন তাহারা, তাহাদের পিতা তাহাদিগকে যেভাবে আদেশ করিয়াছিল, সেইভাবেই প্রবেশ করিল, তখন আল্লাহ্র বিধানের বিরুদ্ধে উহা তাহাদের কোন কাজে আসিল না। ইয়া'কূব কেবল তাহার মনের একটি অভিপ্রায় পূর্ণ করিয়াছিল এবং সে অবশ্যই জ্ঞানী ছিল। কারণ আমি তাহাকে শিক্ষা দিয়াছিলাম। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ ইহা অবগত নহে” (১২ঃ ৬৭-৬৮)।
তখনকার দিনে শত্রুর আক্রমণ হইতে রক্ষার জন্য নগরসমূহ প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত থাকিত এবং নগরে প্রবেশ ও যাতায়াতের জন্য প্রাচীর গাত্রে বিভিন্ন ফটক ও তোরণ থাকিত। ঐতিহাসিক বর্ণনামতে তখন মিসরে প্রবেশের জন্য প্রধান তোরণ ছিল চারটি (রূহুল মা'আনী, ১৩ পারা, পৃ. ১৯; মাজহারী, ৫খ, ১৮০)। এক তোরণ দিয়া সদলবলে প্রবেশ করিবার পবিবর্তে বিভিন্ন নগর তোরণ দিয়া প্রবেশ করিবার উপদেশ দানের কারণ ছিল পিতার মনের একটি আকুতি। তাহা ছিল সুঠামদেহী সুদর্শন পুত্রদিগকে বদ লোকদের কুদৃষ্টি' হইতে রক্ষা করা কিংবা তাহাদিগকে মিসরবাসীদের বিদ্বেষ ও হিংসার কোপানল হইতে রক্ষা করা (তাফসীরে মাজেদী, পৃ. ৪৯৯)। ইহা ছাড়া প্রথমবারের সফরে মিসরের (বিদেশী') শাসক কর্তৃক এই বিদেশী কাফেলাকে বিশেষ সমাদর ও আপ্যায়নের পর দ্বিতীয়বার মিসর প্রবেশকালে এই দর্শনীয় কাফেলাটির জোটবদ্ধ প্রবেশ দ্বারা মিসরবাসীদের হিংসার মনোবৃত্তিকে চাংগা করিয়া দেওয়ার আশংকাও বিদ্যমান ছিল। ইহা ছাড়া কাফেলার সহিত বিনয়ামীনের অবস্থান পিতার জন্য অধিক দুশ্চিন্তার কারণ ছিল। বিভিন্ন দরজা দিয়া পৃথক পৃথক প্রবেশ ছিল এইসব বিপদাপদ হইতে রক্ষামূলক ব্যবস্থা। ইহা ছাড়া এইবার প্রবেশ করিবার ক্ষেত্রে বাদশাহের দরবারে উপনীত হওয়ার পূর্বেই হিংসুটে সরকারী কর্মচারীদের দ্বারা গুপ্তচর অভিযোগে ধৃত হইয়া লাঞ্ছনা-গঞ্জনা ও গ্লানি ভোগের আশংকাও বিদ্যমান ছিল। মোটকথা, হিংসুকের কোপানল ও দুষ্ট লোকের বদনজর হইতে রক্ষা করিবার জন্য পিতার স্নেহ-বাৎসল্য তাঁহাকে এই উপদেশ দানে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিল (রূহুল মা'আনী, ১৩ পারা, ১৮; মাজহারী, ৫খ, ১৮০ তাফসীরে মাজেদী, পৃ. ৪৯৯; মাআরিফুল কুরআন, ৫খ, ৯৫-৯৯; কাসাসুল কুরআন, ১খ, ৩২০)।
পিতার আদেশ অনুসারে এগার ভাইয়ের এই কাফেলা নগরের বিভিন্ন তোরণ দিয়া মিসরে প্রবেশ করিল এবং রাজদরবারে উপস্থিত হইয়া ইউসুফ (আ)-এর নিকট নিবেদন করিল, মহাত্মন! এই আমাদের সেই ভাইটি, যাহাকে সাথে আনার জন্য আপনি আদেশ দিয়াছিলেন। ইউসুফ (আ) বলিলেন, তোমরা যথার্থ ও উত্তম কাজ করিয়াছ; তোমরা আমার পক্ষ হইতে উহার সুফল লাভ করিবে। এই সময় তাহারা বাদশাহকে তাহাদের পিতার সালাম ও দু'আসম্বলিত পয়গাম পৌছাইল। কোন কোন বর্ণনামতে এই পয়গাম লিখিত পত্ররূপে ছিল এবং ইউসুফ (আ) উহা পাঠ করিয়া ক্রন্দন করিয়াছিলেন (রূহুল মা'আনী, ১৩ পারা, পৃ. ২৩)。 অতঃপর মিসর শাসকের আদেশে এই কাফেলাকে রাজকীয় মেহমানের মর্যাদায় অবস্থানের ব্যবস্থা করা হইল। আপ্যায়ন কালে একসংগে দুইজনের বসিবার ব্যবস্থা করা হইলে দশ ভাই জোড়ায় জোড়ায় উপবেশন করিল এবং বিনয়ামীন একাকী রহিয়া গেল। সে কাঁদিতে কাঁদিতে বলিল, আজ আমার ভাই বাঁচিয়া থাকিলে আমরা দুইজন একসংগে বসিতাম। এই সময় ইউসুফ (আ) বলিলেন, তোমাদের এই ভাইটি তো একা পড়িয়া গেল। ভাইয়েরা বলিল, তাহারও একটি সহোদর ভাই ছিল, যে নিরুদ্দেশ হইয়া গিয়াছে। তখন ইউসুফ (আ) বিনয়ামীনকে নিজের সহিত বসাইয়া একত্রে আহার করিলেন। রাত্রি যাপনের জন্যও অনুরূপ ব্যবস্থা গৃহীত হইল এবং দুই দুইজনের জন্য একটি করিয়া কক্ষ বরাদ্দ করা হইলে বিনয়ামীন একাকী রহিয়া গেল। ইউসুফ (আ) বলিলেন, ঠিক আছে, সে আমার সহিত রাত্রি যাপন করিবে। সুতরাং বিনয়ামীন ইউসুফ (আ)-এর সহিত রাত্রিযাপন করিল। ইউসুফ (আ) তাঁহার স্নেহের সহোদর ভাইকে আলিংগন করিলেন এবং তাহার ঘ্রাণ নিতে লাগিলেন। পরদিন সকালে ইউসুফ (আ) মেহমানদের অবস্থান ও আপ্যায়নের স্বতন্ত্র ব্যবস্থা করিবার আদেশ প্রদান করিলেন এবং বিনয়ামীনের ব্যাপারে ভাইদিগকে বলিলেন, তোমাদের এই লোকটি দেখছি সংগীহীন; সুতরাং সে আমার সহিতই অবস্থান করিবে। অবস্থা দেখিয়া রূবেন মন্তব্য করিল, এমন তাজ্জব ঘটনা তো কখনও দেখি নাই। পরবর্তী সময়ে ইউসুফ (আ) বিনয়ামীনের সহিত একান্তে আলাপ করিলেন এবং আত্মপরিচয় প্রকাশ করিয়া ছোট ভাইকে সান্ত্বনা প্রদান করিলেন। পবিত্র কুরআনের ভাষায় :
وَلَمَّا دَخَلُوا عَلَى يُوسُفَ أَوَى إِلَيْهِ أَخَاهُ قَالَ إِنِّي أَنَا أَخُوكَ فَلَا تَبْتَئِسُ بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ .
"উহারা যখন ইউসুফের সম্মুখে উপস্থিত হইল, তখন ইউসুফ তাহার সহোদরকে নিজের কাছে রাখিল এবং বলিল, নিশ্চয় আমিই তোমার সহোদর। সুতরাং উহারা যাহা করিত তাহার জন্য দুঃখ করিও না" (১২ঃ ৬৯)।
ইউসুফ (আ) বিনয়ামীনের নিকট তাহার সন্তান-সন্তুতি সম্পর্কে জানিতে চাহিলেন। বিনয়ামীন বলিল, আমার দশ পুত্র। আমি আমার হারানো ভাইয়ের নামের সহিত মিল রাখিয়া তাহাদের প্রত্যেকের নাম রাখিয়াছি। ইউসুফ (আ) বলিলেন, তোমার হারানো ভাইয়ের স্থানে আমাকে ভাইরূপে বরণ করিতে তুমি পছন্দ করিবে? বিনয়ামীন বলিল, হৃদয়বান বাদশাহ! আপনার ন্যায় ভাই পাওয়া যে কোন মানুষের জন্য সৌভাগ্যের ব্যাপার। কিন্তু আপনি তো আর ইয়া'কূবের ঔরসে ও রাহীলের গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন নাই! তখন ইউসুফ (আ) কাঁদিয়া ফেলিলেন এবং দাঁড়াইয়া ভাইকে বুকে জড়াইয়া ধরিয়া আত্মপরিচয় প্রকাশ করিয়া বলিলেন, আমিই তোমার সেই ভাই... আমাদের প্রতি আল্লাহ তা'আলার পরম অনুগ্রহ যে, অপ্রত্যাশিতরূপে তিনি আমাদের সম্মিলন ঘটাইয়াছেন। সুতরাং আমাদের কর্তব্য তাঁহার শোকর আদায় করা এবং ভাইদের কৃত সকল দুর্ব্যবহার ও নির্যাতনের কথা ভুলিয়া যাওয়া। তবে তুমি তাহাদিগকে বিষয়টি এখনই অবহিত করিও না (রূহুল মা'আনী, ১৩ পারা, পৃ. ২৩; মাজহারী, ৫খ, ১৮০, ১৮১; মুফতী শফী, মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ, ৯৬, ৯৯; কান্ধলাবী, মা'আরিফুল কুরআন, ৪খ, ৫১)।
ভাইদের দুর্ব্যবহার সম্পর্কে মুফাসসির ও ঐতিহাসিকগণ বলিয়াছেন যে, ইউসুফ (আ)-এর প্রতি নির্যাতন ও দুর্ব্যবহারের বিষয়টি তো সর্বজনবিদিত। আর বিনয়ামীনের জন্য প্রিয়তম ও স্নেহপ্রবণ ভাইয়ের নিরুদ্দেশ হওয়া কম দুঃখের বিষয় নয়। তদুপরি বিনয়ামীনকে সব সময় ভাইদের ব্যাপারে শংকিত থাকিতে হইত এবং পিতার অতিরিক্ত ভালবাসার জন্য গালমন্দ শুনিতে হইত। মিসর যাওয়ার পথেও ভাইয়েরা তাহাকে 'পিতার আদরের ধন', 'নয়নের পুত্তলি' এবং 'মিসর সম্রাটের কাংখিত ব্যক্তি', 'রাজকীয় বিশেষ মেহমান' ইত্যকার কটাক্ষপূর্ণ উক্তির মাধ্যমে উত্যক্ত করিত (মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ, ১০৮; কাসাসুল কুরআন, ১খ, ৩২১)। বিনয়ামীনের এ সব উক্তির কোন জবাব দিত না।
📄 ইউসুফ ভ্রাতৃবর্গের পুনরায় কিনআন প্রত্যাবর্তন
কিছু দিন রাজকীয় আতিথ্যে মিসর অবস্থানের পর ইউসুফ ভ্রাতৃবর্গ রসদ নিয়া কান্'আনে প্রত্যাবর্তনের প্রস্তুতি গ্রহণ করিল। ইউসুফ (আ)-এর আদেশে খাদ্য বিভাগীয় কর্মচারিগণ ভাইদের প্রত্যেককে তাহার উট বোঝাই খাদ্যদ্রব্য প্রদান করিল (কাসাসুল কুরআন, ১খ, ৩২১; রূহুল মা'আনী, ১৩ পারা, পৃ. ২৪)। ইউসুফ ভ্রাতৃবর্গ তাহাদের প্রথমবারের ফেরতপ্রাপ্ত পণ্য মূল্য দ্বিতীয়বারের পণ্যের বিনিময়রূপে প্রদান করিয়াছিল। তবে বাইবেলের বর্ণনামতে তাহারা প্রথমবারের পণ্যমূল্যসহ নূতন বিনিময় মূল্য নিয়া গিয়াছিল এবং সাথে বাদশাহের পণ্যের হাদিয়াস্বরূপ পেস্তা, বাদাম, দেবদারু ও মধু ইত্যাদি নিয়া গিয়াছিল।
বর্ণনামতে অন্য ভাইদের অসাক্ষাতে বিনয়ামীন তাহার সহোদর ইউসুফকে অত্যন্ত আবেগের সহিত বলিয়াছিল, 'আমি আপনাকে ছাড়িয়া যাইব না'। ইহাতে ইউসুফ (আ) পিতার দুঃখ বৃদ্ধির কথা বলিয়া আপত্তি করিলেও বিনয়ামীন তাহার সিদ্ধান্তে অনড় রহিল এবং ভাইকে ইহার উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করিবার জন্য অনুরোধ করিল। ইউসুফ (আ) বলিলেন, কোন কঠিন অপবাদে অভিযুক্ত করা ব্যতীত তোমাকে আটকাইয়া রাখিবার কোন ব্যবস্থা নাই। ইহাতে বিনয়মীন সম্মতি প্রদান করিলে ইউসুফ (আ) বলিলেন, তাহা হইলে আমি আমার পানপাত্র তোমার মালপত্রের মধ্যে লুকাইয়া রাখিয়া দিব এবং তোমরা রওয়ানা করিয়া যাওয়ার পর তল্লাশির মাধ্যমে তোমার বিরুদ্ধে চুরির অপরাধ সাব্যস্ত করিয়া তোমাকে আটকাইয়া রাখিবার ব্যবস্থা করিব (রূহুল মাআনী; ১৩ পারা, পৃ. ২১; মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ, ৯৯; কান্ধলাবী, মাআরিফুল কুরআন, ৪খ, ৫১; মাজহারী, ৫খ, ৪৯)। ভিন্নমত অনুসারে ইউসুফ (আ) নিজেই তাঁহার কনিষ্ঠ ভাইকে নিজের নিকট রাখিবার ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু হৃদয়ের প্রচণ্ড আবেগ সত্ত্বেও তাঁহার পক্ষে ঐরূপ করিবার কোন উপায় ছিল না। কেননা মিসরের রাষ্ট্রীয় বিধানে কোন অমিসরীয়কে সংগত কারণ ব্যতীত আটক রাখা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল। অপরদিকে এই মুহূর্তে জনসমক্ষে কিংবা ভাইদের নিকট আত্মপরিচয় প্রকাশ করাও ইউসুফ (আ)-এর মনঃপূত ছিল না। এই দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যে থাকা অবস্থায় আল্লাহ তা'আলা তাঁহার প্রিয় বান্দার মনোবাঞ্ছা পূরণের জন্য এইরূপ ব্যবস্থা করিলেন যে, কাফেলা রওয়ানা করিবার প্রাক্কালে ইউসুফ (আ) তাঁহার স্মৃতিচিহ্নস্বরূপ তাঁহার নিজের পানপাত্রটি সকলের অজ্ঞাতসারে বিনয়ামীনের পণ্যের ভিতরে রাখিয়া দিলেন। পরবর্তী পর্যায়ে ইহা দ্বারা বিনয়ামীনকে আটকাইয়া রাখিবার বৈধ ও সুচারু পন্থা সম্পন্ন হইয়াছিল (কাসাসুল কুরআন, ১খ, ৩২১, ৩২২)। তবে অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে দুই ভাই পরামর্শ করিয়া উদ্দেশ্যে সাধনে একটি কৌশল অবলম্বনে সম্মত হইয়াছিল (ইবনে কাছীর, ২খ, ২৫৬)। পবিত্র কুরআনে বিষয়টি এইভাবে উল্লিখিত হইয়াছে:
فَلَمَّا جَهْزَهُمْ بِجَهَازِهِمْ جَعَلَ السَّقَايَةَ فِي رَحْلِ أَخِيهِ ثُمَّ أَذْنَ مُؤَذِّنٌ أَيَّتُهَا الْعِيْرُ إِنَّكُمْ لَسْرِقُوْنَ . قَالُوا وَأَقْبَلُوا عَلَيْهِمْ مَاذَا تَفْقِدُونَ . قَالُوا نَفْقِدُ صُرَاعَ الْمَلِكِ وَلِمَنْ جَاءَ بِهِ حِمْلُ بَعِيرٍ وَأَنَا بِهِ زَعِيمٌ. قَالُوا تَاللَّهِ لَقَدْ عَلِمْتُمْ مَا جِئْنَا لِنَفْسِدَ فِي الْأَرْضِ وَمَا كُنَّا شَرِقِينَ. قَالُوا فَمَا جَزَاؤُهُ إِنْ كُنْتُمْ كَذِبِينَ. قَالُوا جَزَاؤُهُ مَنْ وجِدَ فِي رِحْلِهِ فَهُوَ جَزَاؤُهُ كَذَلِكَ نَجْزِي الظَّلِمِينَ . فَبَدَا بِأَوْعِيَتِهِمْ قَبْلَ وَعَاءِ أَخِيهِ ثُمَّ اسْتَخْرَجَهَا مِنْ وَعَاءِ أَخِيهِ كَذلِكَ كَدْنَا لِيُوسُفَ مَا كَانَ لِيَأْخُذَ أَخَاهُ فِي دِينِ الْمَلِكِ إِلا أَنْ يُشَاءَ اللَّهُ نَرْفَعُ دَرَجَتٍ مِّنْ نَشَاءُ وَفَوْقَ كُلِّ ذِي عِلْمٍ عَلِيمٌ .
"অতঃপর সে যখন উহাদের সামগ্রীর ব্যবস্থা করিয়া দিল, তখন সে তাহার সহোদরের মালপত্রের মধ্যে পানপাত্র রাখিয়া দিল। অতঃপর এক আহ্বায়ক চীৎকার করিয়া বলিল, হে যাত্রীদল! তোমরা নিশ্চয়ই চোর। উহারা তাহাদের দিকে চাহিয়া বলিল, তোমরা কী হারাইয়াছ? তাহারা বলিল, আমরা রাজার পানপাত্র হারাইয়াছি। যে উহা আনিয়া দিবে সে এক উষ্ট্র বোঝাই মাল পাইবে এবং আমি উহার জামিন। উহারা বলিল, আল্লাহ্র শপথ! তোমরা তো জান আমরা এই দেশে দুষ্কৃতি করিতে আসি নাই এবং আমরা চোরও নহি। তাহারা বলিল, যদি তোমরা মিথ্যাবাদী হও তবে তাহার শাস্তি কী? উহারা বলিল, ইহার শাস্তি যাহার মালপত্রের মধ্যে পাত্রটি পাওয়া যাইবে সে-ই তাহার বিনিময়। এইভাবে আমরা সীমালংঘনকারীদিগকে শাস্তি দিয়া থাকি। অতঃপর সে তাহার সহোদরের মালপত্র তল্লাশির পূর্বে উহাদের মালপত্র তল্লাশি করিতে লাগিল, পরে তাহার সহোদরের মালপত্রের মধ্য হইতে পাত্রটি বাহির করিল। এইভাবে আমি ইউসুফের জন্য কৌশল করিয়াছিলাম। রাজার আইনে তাহার সহোদরকে সে আটক করিতে পারিত না, আল্লাহ ইচ্ছা না করিলে। আমি যাহাকে ইচ্ছা মর্যাদায় উন্নীত করি। প্রত্যেক জ্ঞানবান ব্যক্তির উপর আছে সর্বজ্ঞানী" (১২ : ৭০-৭৬)।
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় মুফাসসিরগণ বলিয়াছেন, তিনি বিনয়ামীনের আবদারের প্রেক্ষিতে ঘটনাটি সংঘটিত হওয়ায়, সবকিছু নির্বিকার চিত্তে অবলোকন করিতেছিলেন। সুদ্দীর মতে, বিনয়ামীনের অজ্ঞাতসারে তাহার বস্তায় পাত্রটি রাখা হইয়াছিল (মাজহারী, ৫খ, ১৮১)। কাহারও মতে ভাইয়ের আবদার রক্ষায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় ইউসুফ (আ) যখন কোন উপায় খুঁজিয়া পাইতেছিলেন না, তখন অবচেতন মনের তাগিদে স্মৃতি চিহ্নরূপে পাত্রটি ভাইয়ের বস্তায় রাখিয়াছিলেন এবং পরিকল্পিত ব্যবস্থা না হওয়া সত্ত্বেও পরবর্তীতে ইহাই বিনয়ামীনকে আটক রাখিবার উপায়রূপে পরিগণিত হইয়াছিল। মূলত সূক্ষ্ম বিশ্লেষণে বিষয়টি ছিল সম্পূর্ণ আসমানী ব্যবস্থাপনা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। আল্লাহ তা'আলা তাঁহার প্রিয় বান্দা ইয়াকুব (আ)-এর পরীক্ষার অবশিষ্টাংশ পূরণ করিয়া তাঁহাকে উত্তীর্ণ হওয়ার পুরস্কার প্রদানের জন্য বিনয়ামীনের মনে পিতার মনঃকষ্ট আগ্রহ্য করিয়া সহোদরের নিকট থাকিবার প্রবল বাসনা সৃষ্টি করিয়া দিলেন এবং ইউসুফ (আ)-এর অন্তরে ভাইয়ের বস্তায় পানপাত্র রাখিবার ইচ্ছা বা বুদ্ধি জাগ্রত করিয়া দিলেন কিংবা প্রত্যক্ষ ওহীর মাধ্যমে ইউসুফ (আ)-কে পাত্র রাখিবার আদেশ প্রদান করিয়া এইসব ব্যবস্থা সম্পন্ন করিলেন। মোটকথা, ইউসুফ (আ) নিজের ইচ্ছায় অথবা আল্লাহ্ তা'আলার প্রত্যাদেশে আদিষ্ট হইয়া ভাইয়ের জ্ঞাতসারে কিংবা অজ্ঞাতসারে নিজ হাতে (কুরতুবী, ৯খ, ২২৯-এর বরাতে মা'আরিফুল কুরআন, কান্ধলাবী, ৪খ, ৫১) অথবা কোন নির্ভরযোগ্য কর্মচারী বা বিশ্বস্ত খাদেমের দ্বারা পানপাত্রটি বিনয়ামীনের পণ্য-সম্ভারের বস্তায় ঢুকাইয়া দিলেন এবং তাহার পণ্য মূল্যও সেই সাথে ফেরৎ দিলেন (মাজহারী, ৫খ, ১৮১; মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ, ১০১)।
বাইবেলের বর্ণনায় সে (ইউসুফ) তাঁহার ভবনের তত্ত্বাবধায়ককে এই মর্মে আদেশ প্রদান করিল যে, ঐ লোকগুলির বস্তাগুলি, খাদ্য দ্বারা যেই পরিমাণ তাহাদের লইয়া যাওয়ার সামর্থ্য আছে পূর্ণ করিয়া দাও; আর প্রত্যেকের বিনিময় মূল্যও তাহার বস্তায় ভিতরে রাখিয়া দিবে। আর আমার রূপার পাত্রটি কনিষ্ঠের বস্তার উপর দিবে এবং তাহার খাদ্যের মূল্য সহকারে রাখিয়া দিবে। সুতরাং সে ইউসুফ (আ)-এর আদেশ মুতাবিক কার্য করিল (আদিপুস্তক, ৪৪ঃ ১-২)।
কান'আনী কাফেলা রাজভবন হইতে বিদায় গ্রহণ করিল এবং মিসর হইতে প্রস্থানের উদ্দেশে নগর প্রাচীরের বাহিরে চলিয়া গেল। ইতোমধ্যে রাজদরবারের লোক ছুটিয়া আসিয়া 'তোমরা চোর' বলিয়া চিৎকার করিয়া কাফেলার গতি থামাইয়া দিল। পাত্রটি এত গুরুত্বের সহিত সন্ধান করিবার কারণ এই ছিল যে, উহা ছিল বাদশাহের বিশেষ পানপাত্র। কুরআন শরীফে পাত্রটিকে السقاية (পানপাত্র) এবং صُواع الملك (বাদশাহর পানপাত্র) বলিয়া অভিহিত করা হইয়াছে। খাদ্য বিভাগের কর্মচারিগণ অথবা রাজবাটির খাদেমগণ তাহাদের কাজের জন্য কিংবা কর্মশেষে গুছাইয়া রাখিবার জন্য পাত্রটির সন্ধান করিলে সম্ভাব্য স্থানসমূহের কোথাও পাত্রটি পাওয়া গেল না। তাহারা দেখিল যে, রাজভবনে কান'আন কাফেলা অবস্থান করিয়াছিল এবং অন্য কাহারও পক্ষে এই সংরক্ষিত এলাকায় প্রবেশের সুযোগ ছিল না। সুতরাং পাত্রটি নিরুদ্দেশ হওয়ার ব্যাপারে রাজভবনের অতিথি মহলে বিশেষ মর্যাদায় অবস্থানকারী কাফেলাটির প্রতিই তাহাদের সন্দেহ ঘনীভূত হইল এবং তাহারা নিজেদের দায়িত্ববোধ ও কর্তব্যপরায়ণতায় গাফিলতির অভিযোগ হইতে মুক্তি পাওয়ার জন্য নিজেদের গরজেই ছুটিয়া গিয়া কাফেলার গতিরোধ করিল এবং তাহাদের বিরুদ্ধে রাজকীয় পানপাত্র চুরির অভিযোগ উত্থাপন করিল।
কান'আন কাফেলা এই অচিন্তনীয় অভিযোগ শুনিয়া হতচকিত হইয়া গেল এবং নিজেদের নির্দোষ হওয়ার মনোবল থাকিবার কারণে সন্ধানকারী কর্মকর্তাদের নিকট আগাইয়া আসিয়া বিস্ময়ের সহিত বলিতে লাগিল, আমাদের বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ তো যথার্থ হইতে পারে না, তবে হয়তো তোমাদের কোন জিনিস হারাইয়া থাকিবে। আচ্ছা, তোমরা কোন বস্তুটি পাইতেছ না বলিয়া এত হাঁকডাক করিতেছ? সরকারী কর্মকর্তা রাজকীয় পেয়ালা হারাইবার কথা বলিয়া উহার সহজ প্রাপ্তি ও বিষয়টির সহজ সুরাহার জন্য একটি অতিরিক্ত সুযোগের ঘোষণা প্রদান করিয়া বলিল, 'তোমরা চোর হও বা নাই হও, আমার পেয়ালাটি পাওয়া দরকার। সুতরাং যে কেহ পেয়ালাটির সন্ধান দিতে পারিবে, এমনকি চোর নিজেও যদি পেয়ালাটি ফিরাইয়া দেয় তবে আমি এই দায়িত্ব গ্রহণ করিতেছি যে, তাহাকে চুরির শাস্তি হইতে রেহাই দেওয়া হইবে। উপরন্তু এই দুর্ভিক্ষ কালে সর্বাধিক মূল্যবান ও আকর্ষণীয়রূপে বিবেচিত পুরস্কারস্বরূপ এক উটের বোঝা পরিমাণ খাদ্য তাহাকে দেওয়া হইবে। ইউসুফ ভ্রাতৃবর্গ বিষয়টি সম্পূর্ণ অজ্ঞাত ও অভাবনীয় হওয়ার কারণে তখনও বিস্ময়ের ঘোর কাটাইয়া উঠিতে পারিতেছিল না। তবুও নিজেদের ক্ষোভ সংবরণ করিয়া তাহারা বলিল, আল্লাহর কসম! আমরা অরাজকতা বা বিশৃংখলা সৃষ্টি করিতে পারে এমন কোন কাজ করিবার জন্য এই বিদেশ- বিভূঁইয়ে পদার্পণ করি নাই। আমাদের দাবির প্রমাণ এই যে, প্রথমত আমরা এক মহান নবী পরিবারের সদস্য এবং পার্থিব বিচারেও সমাজের অভিজাত শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং চুরি করা আমাদের কাজ নয়। দুর্ভিক্ষের যাতাকালে নিষ্পেষিত হইয়া খাদ্য সংগ্রহের জন্য আমরা বিদেশে আসিতে বাধ্য হইয়াছি। দ্বিতীয়ত আমরা তো এই দেশে ইতোপূর্বেও আসিয়াছি এবং মিসরবাসী আমাদের আচরণ, বিশেষত আমাদের আমানতদারি ও বিশ্বস্ততা সম্পর্কে অবহিত রহিয়াছে। যেমন প্রথমবারের পণ্যমূল্য ফিরাইয়া দেওয়া এবং আমাদের বাহনগুলি মানুষের ক্ষেত-খামারে মুখ লাগাইয়া ফসলের ক্ষতি না করে সে উদ্দেশে তাহাদের মুখ বাঁধিয়া রাখা ইত্যাদি (মাজহারী, ৫খ ১৮২ ও অন্যান্য)।
ঘোষক ও তাহার সহযোগীরা যখন দেখিল যে, চুরির অভিযোগের হুমকি অথবা আকর্ষণীয় পুরস্কারের ঘোষণা দ্বারা উদ্দেশ্য হাসিল হইবে না তখন তাহারা বলিল, তোমরা যখন নিজেদের নির্দোষ দাবি করিতেছ তখন তো আমরা তোমাদের আসবাবপত্র তল্লাশী করিতে বাধ্য হইব। তখন তো আমাদের মাল বাহির হইয়া পড়িতে পারে। সে ক্ষেত্রে তোমরাই বল, তোমরা যদি নির্দোষ হওয়ার দাবিতে মিথ্যাবাদী প্রমাণিত হও তোমাদের সিদ্ধান্ত অনুসারে অপরাধীর শাস্তি কি হইবে? ইউসুফ ভ্রাতৃবর্গ মূল ঘটনা অজ্ঞাত থাকিবার কারণে নির্ভাবনায় বলিল, ইসরাঈলী শরী'আতে চুরির শাস্তি হইতেছে এই যে, চোর চুরিকৃত মালের মালিকের গোলামী করিবে। সুতরাং যে দোষী সাব্যস্ত হইবে তাহাকে এইরূপ শাস্তিই দেওয়া হইবে, ইহাই আমাদের বক্তব্য। রাজভবনের কর্মচারীরা বলিল, তাহা হইলে অগ্যতা তোমাদের আসবাবপত্র তল্লাশী করিতেই হয়। উল্লেখ্য যে, ইবরাহীমী ও ইসরাঈলী শরী'আতে চুরির শাস্তি বিধান এইরূপেই করা হইত যে, চোরাই মালের মালিক চোরকে এক বৎসরের জন্য গোলাম করিয়া রাখিতে পারিত (ইবন কাছীর, বিদায়া, মাজহারী, মুফতী শফী ও কান্ধলাবী মা'আরিফুল কুরআন)।
বাইবেলে বলা হইয়াছে, 'ঊষার আলো উদিত হইলে তাহারা সকলে নিজ নিজ গাধা নিয়া প্রস্থান করিল এবং নগরী হইতে অল্প দূরে যাওয়ার পর ইউসুফ তাহার ভবনের তত্ত্ববধায়ককে বলিল, 'যাও, উহাদিগকে পশ্চাদ্ধাবন কর। তাহাদিগকে দেখিতে পাইলে বলিবে, তোমরা সদাচরণের বিনিময়ে এইরূপ দুর্ব্যবহার করিলে কেন (আদিপুস্তক, ৪৪ : ৪; তাফসীরে মাজেদী, পৃ. ৫০১, টীকা ১৩৪)?
মোটকথা, কাংখিত শাস্তির স্বীকারোক্তি তাহাদের মুখ হইতে আদায় করিবার পর কর্মচারীরা তাহদের আসবাবপত্রের তল্লাশী শুরু করিল (মajহারী, ৫খ, ১৮২; কাসাসুল কুরআন, ১খ., ৩২২)।
ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র হওয়ার অভিযোগ এড়াইবার জন্য আল্লাহ প্রদত্ত বুদ্ধিবলে একের পর একজনের আসবাবের তল্লাশী করা হইল এবং বিনয়ামীনের আসবাবের তল্লাশীর পূর্বে অন্যান্য ভাইদের আসবাবের তল্লাশী করা হইল। সর্বশেষে বিনয়ামীনের পাত্রও খোলা হইল। আশ্চর্য! রাজকীয় পানপাত্রটি তাহার বস্তার মধ্যে পাওয়া গেল। ঘটনার আকস্মিকতায় লজ্জায়-গ্লানিতে ইউসুফ ভ্রাতৃবর্গের মাথা হেট হইয়া গেল। প্রথমে তাহাদের মুখে কোন কথা সরিল না। এই তল্লাশীর পূর্ণাংগ সময় বিনয়ামীন ছিল সম্পূর্ণ নির্বিকার, বরং ভাইয়ের নিকট থাকিবার সুযোগের আশা পূরণের সম্ভাবনায় আন্তরিকভাবে আনন্দিত। ভাইদের সম্পূর্ণ ক্ষোভ পড়িল বিনয়ামীনের উপর। তাহারা বলিল, এই তোমার কাণ্ড! আমাদের অপমান করিলে ও আমাদের মুখে চুণকালি দিলে? তোমরা রাহীলের গর্ভজাতরা আমাদিগকে একের পর এক বিপদে ফেলিয়াছ। বিনয়ামীন বলিল, বরং তোমরা রাহীলের গর্ভজাতদের বিপদগ্রস্ত করিয়াছ। তোমরাই না আমার ভাইকে নিয়া গিয়া কোন প্রান্তরে তাঁহাকে ধ্বংসের হাতে ছাড়িয়া দিয়াছ! আর শুনিয়া রাখ, পাত্রটি সেই রাখিয়া থাকিবে যে তোমাদের পণ্যমূল্য তোমাদের পাত্রে রাখিয়াছিল। চুরির সাথে আদৌ আমার কোন সম্পর্ক নাই।
অবশেষে বিনয়ামীনকে (গ্রেফতার করিয়া) ইউসুফ (আ)-এর হাতে তুলিয়া দেওয়া হইল। আল্লাহর কুদরতে দুই ভাই একত্র হইয়া আনন্দিত হইলেন। ইহা কুরআন মাজীদে এইভাবে বর্ণিত হইয়াছে- "এইরূপে আমিই ইউসুফের জন্য চাতুর্যপূর্ণ কৌশল অবলম্বন করিলাম"। ইহাতে ইংগিত পাওয়া যায় যে, আগাগোড়া সম্পূর্ণ বিষয়টি ছিল ইউসুফ (আ)-এর আদেশে এবং ওহীর মাধ্যমে।
ভাইদের সততার দাবি যখন মিথ্যা প্রমাণিত হইয়া তাহাদের মানমর্যাদা ধুলায় লুণ্ঠিত হইল এবং লজ্জায় মাটিতে মিশিয়া যাওয়ার উপক্রম হইল তখন তাহারা আত্মরক্ষার ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করিল এবং রাগে ও ক্ষোভে বিনয়ামীনের গ্রেফতার হওয়ার পরিণতির কথা সাময়িক বিস্তৃত হইয়া গেল। পুরাতন বিদ্বেষ তাহাদের অন্তরে মাথাচাড়া দিয়া উঠিল। তাহারা এই বলিয়া মিথ্যা অপবাদ দিল যে, 'হাঁ, সে যদি চুরি করিয়া থাকে তবে বিস্ময়ের কিছু নাই। কারণ ইতোপূর্বে তাহার ভাই (ইউসুফ)-ও চুরি করিয়াছিল'। মূলত ইহা ছিল ইউসুফ (আ)-এর নামে মিথ্যা অপবাদ এবং তাহা ভাইয়েরা আনুপূর্বিক অবগত ছিল।
ইউসুফ (আ)-এর নামে এই অপবাদের বিষয়টি কি ছিল সে সম্পর্কে মুফাসসির ও ইতিহাসবিদগণ একাধিক বিষয় উল্লেখ করিয়াছেন। ইউসুফ (আ) শিশু বয়সের ও কোমলপ্রাণ থাকিবার কারণে ঘরের লোকদের অজ্ঞাতসারে ঘর হইতে খাদ্যদ্রব্য ইত্যাদি তুলিয়া নিয়া গরীব-দুঃখীদের দান করিতেন। স্বভাবত ঘরের মালিক ইয়া'কূব (আ) ইহাতে সন্তুষ্টই ছিলেন। সুতরাং ইহাকে চুরি বলা যায় না। কিন্তু ভাইয়েরা বিদ্বেষের কারণ উহাকে চুরি বলিয়াছিল। কেহ কেহ বলিয়াছেন, ইউসুফ (আ)-এর নানা মূর্তিপূজা করিত। সুতরাং তাঁহার আম্মা তাঁহাকে নানার মূর্তিগুলি গোপনে আনিয়া ভাংগিয়া ফেলিতে বলিলেন, যাহাতে সে মূর্তিপূজা পরিত্যাগ করে (তাফসীরে মাজেদী, পৃ. ৫০২, টীকা, ১৪৩; বরাত সা'ঈদ ইবন জুবায়র সূত্রে তাফসীরে কাবীর)। তবে অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে, শিশু বয়সে ইউসুফ (আ) তাঁহার ফুফীর নিকট লালিত-পালিত হইয়াছিলেন। ফুফী তাঁহাকে অত্যন্ত ভালবাসিতেন। এক সময় ইয়া'কূব (আ) ইউসুফ (আ)-কে নিজের নিকটে নিয়া আসিতে চাহিলে ফুফী প্রথমে আপত্তি করিয়া পরে পিতৃত্বের দাবির কাছে হার মানিলেন। তবে কৌশলস্বরূপ একটি হার (অথবা কোমরবন্ধ) যাহা হযরত ইসহাক (আ) হইতে জ্যেষ্ঠাধিকারক্রমে তাঁহার নিকট পৌঁছিয়াছিল-গোপনে ইউসুফ (আ)-এর দেহে লুকাইয়া রাখিয়া হারটি হারাইয়া যাওয়ার ঘোষণা দিলেন। পরে সন্ধান করিয়া হারটি ইউসুফ (আ)-এর নিকট পাওয়া গেলে ইহাতে ইবরাহীমী শরী'আতের বিধান অনুসারে ফুফু ইউসুফ (আ)-কে নিজের নিকট রাখিবার অধিকার লাভ করিলেন। সুতরাং ইউসুফ (আ)-কে ফুফুর জীবনকাল পর্যন্ত (মতান্তরে অতিরিক্ত এক বৎসর) তাঁহার নিকট রহিলেন (তাফসীরে মাজহারী, ৫খ, ১৮৪; মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ, ১০৮, ১১০)।
মোটকথা, এই ছিল ইউসুফ (আ)-এর বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগের ভিত্তি। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, প্রকৃত বিচারে ইহার কোনটিকেই চুরি বলা যায় না। ইউসুফ (আ)-এর সৎ ভাইয়েরাও বাস্তব ব্যাপার অবহিত ছিল। কিন্তু তাহাদের বিদ্বেষ তাহাদিগকে এই অভিযোগ উত্থাপনে বাধ্য করিয়াছিল। পবিত্র কুরআনের বর্ণনায়: قَالُوا إِنْ يَسْرِقُ فَقَدْ سَرَقَ أَخٌ لَهُ مِنْ قَبْلُ فَأَسَرَّهَا يُوسُفُ فِي نَفْسِهِ وَلَمْ يُبْدِهَا لَهُمْ قَالَ أَنْتُمْ شَرٌّ مِّكَانًا وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا تَصْفُونَ
"উহারা বলিল, সে যদি চুরি করিয়া থাকে তবে তাহার সহোদরও তো পূর্বে চুরি করিয়াছিল। কিন্তু ইউসুফ প্রকৃত ব্যাপার নিজের মনে গোপন রাখিল এবং উহাদের নিকট প্রকাশ করিল না। সে মনে মনে বলিল, তোমাদের অবস্থা তো হীনতর এবং তোমরা যাহা বলিতেছ সে সম্বন্ধে আল্লাহ সবিশেষ অবহিত" (১২ঃ ৭৭)।
অর্থাৎ মিথ্যা অপবাদ শুনিয়া স্বভাবত ইউসুফ (আ)-এর মনে ক্রোধের উদ্রেক হইলেও তিনি নিজেকে সংবরণ করিলেন। তিনি বুঝিতে পারিলেন যে, সুদীর্ঘ কাল পরেও এই লোকগুলি তাঁহার পিছনে লাগিয়া রহিয়াছে। এতক্ষণে ইউসুফ ভ্রাতৃবর্গ বিনয়ামীনকে গ্রেফতার হইতে দেখিয়া কঠোর বাস্তবতা উপলব্ধি করিল এবং বিনয়ামীন ব্যতীত পিতার সম্মুখে উপস্থিত হওয়ার বিষয়ে শংকিত হইয়া পড়িল। তাহারা বিনয় ও খোশামোদ তোষামোদের পথ অবলম্বন করিল। পবিত্র কুরআনের ভাষায়: قَالُوا يَأَيُّهَا الْعَزِيزُ إِنَّ لَهُ أَبًا شَيْخًا كَبِيرًا فَخُذْ أَحَدَنَا مَكَانَهُ إِنَّا نَرَكَ مِنَ الْمُحْسِنِينَ . قَالَ مَعَاذَ اللَّهِ أَنْ نَأْخُذَ إِلَّا مَنْ وَجَدْنَا مَتَاعَنَا عَنْدَهُ إِنَّا إِذا تَظَلَّمُونَ
"উহারা বলিল, হে আযীয! ইহার পিতা তো অতিশয় বৃদ্ধ। সুতরাং ইহার স্থলে আপনি আমাদের একজনকে রাখুন। আমরা তো আপনাকে দেখিতেছি মহানুভব ব্যক্তিদের একজন। সে বলল, যাহার নিকট আমরা আমাদের মাল পাইয়াছি, তাহাকে ছাড়া অন্যকে রাখার অপরাধ হইতে আমরা আল্লাহ্র শরণ লইতেছি। এরূপ করিলে আমরা অবশ্যই সীমালংঘনকারী হইব" (১২: ৭৮-৭৯)।
ইউসুফ ভ্রাতৃবর্গ পিতার অত্যন্ত বৃদ্ধ হওয়া এবং নিরুদ্দেশ পুত্র ইউসুফের দুঃখ ভুলিবার জন্য তাহাদের কনিষ্ঠ সহোদর বিনয়ামীন পিতার সান্ত্বনার ধন হওয়ার কথা এবং তাহার অনুপস্থিতিতে দুর্বল বৃদ্ধ পিতার জন্য চরম অসহনীয় হওয়ার কথা বলিয়া করজোড়ে নিবেদন করিল, আপনি তো সদাশয় ব্যক্তি, মানুষের দুঃখ-বেদনা আপনাকে মর্মাহত করে। সুতরাং দয়া করিয়া আপনি আমাদের প্রতি আরও এতটুকু করুণা করুন যে, বিনয়ামীনের পরিবর্তে আমাদের মধ্যে হইতে যাহাকে আপনার ইচ্ছা হয় তাহাকে গোলাম বানাইয়া রাখুন। ইহাতে আমাদের ও আমাদের দুর্বল বৃদ্ধ পিতার প্রতি অত্যন্ত করুণা করা হইবে। এইবার ইউসুফ (আ) আইনের ধারায় জবাব দিয়া বলিলেন, তোমাদের বক্তব্য হয়তো যথার্থ, কিন্তু আমার পক্ষে তো এইরূপ করিবার কোন উপায় নাই। কেননা তোমরাই বলিয়াছ, যাহার নিকট মাল পাওয়া যাইবে, সেই গোলামী করিবে। এখন ইহার বিপরীত করিলে উহা অত্যন্ত জুলুম হইবে। তোমাদের পিতার প্রতি আমার একান্ত মর্মবেদনা সত্ত্বেও আমি কি অপরাধীকে ছাড়িয়া দিয়া ও নিরপরাধকে আটক রাখিয়া অবিচার করিতে পারি?
ইউসুফ (আ)-এর ভাইয়েরা যখন বিনয়ামীনকে পিতার নিকট ফিরাইয়া নিতে ব্যর্থ হইল তখন তাহারা নিরাশ হইয়া রাজ-দরবার হইতে বাহিরে আসিয়া উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নিজেদের করণীয় স্থির করিবার জন্য একান্ত বৈঠকে বসিল। বৈঠকে প্রথমে তাহারা পিতাকে প্রদত্ত শপথ ও অংগীকারের কথা আলোচনা করিল এবং এই পরিস্থিতিতে তাহারা বিনয়ামীনের ব্যাপারে পিতাকে কি জবাব দিবে তাহা স্থির করিতে চেষ্টা করিল। আলোচনার এক পর্যায়ে তাহাদের মধ্যকার প্রবীণ ব্যক্তি এই সিদ্ধান্ত দিল যে, তোমরা পিতার নিকট ফিরিয়া গিয়া তোমাদের চোখের সম্মুখে ঘটিয়া যাওয়া ঘটনা আনুপূর্বিক তাঁহাকে অবহিত করিবে এবং আমাদের সহযাত্রী কান'আনী কাফেলা ও প্রত্যক্ষদর্শী মিসরবাসীদের সাক্ষী মানিবে। আর আমি তোমাদের সংগে না গিয়া এখানেই থাকিয়া যাইব, যাহাতে পিতা আমাদের সকলকে দোষারোপ না করেন এবং আমি বিনয়ামীনকে মুক্ত করিবার চেষ্টায় নিরত রহিয়াছি মনে করিয়া সান্ত্বনা লাভ করিতে পারেন। এইরূপ সিদ্ধান্তের পর ভাইদের একজন ব্যতীত অন্য সকলে স্বদেশের উদ্দেশে মিসর ত্যাগ করিল। পবিত্র কুরআনের বর্ণনায়:
فَلَمَّا اسْتَيْنَسُوا مِنْهُ خَلَصُوا نَجِيًّا قَالَ كَبِيرُهُمْ أَلَمْ تَعْلَمُوا أَنْ أَبَاكُمْ قَدْ أَخَذَ عَلَيْكُمْ مَوْثِقًا مِّنَ اللَّهِ وَمِنْ قَبْلُ مَا فَرَّطْتُمْ فِي يُوسُفَ فَلَنْ أَبْرَحَ الأَرْضَ حَتَّى يَأْذَنَ لِي أَبِي أَوْ يَحْكُمَ اللَّهُ لِي وَهُوَ خَيْرُ الْحَكِمِينَ. ارْجِعُوا إِلَى أَبِيكُمْ فَقُولُوا يَاأَبَانَا إِنَّ ابْنَكَ سَرَقَ وَمَا شَهِدْنَا إِلَّا بِمَا عَلِمْنَا وَمَا كُنَّا لِلْغَيْبِ حَافِظِينَ. وَاسْتَلِ القَرْيَةَ الَّتِي كُنَّا فِيهَا وَالْعِيرَ الَّتِي أَقْبَلَنَا فِيهَا وَإِنَّا لَصَادِقُونَ .
"যখন উহারা তাহার নিকট হইতে সম্পূর্ণ নিরাশ হইল, তখন উহারা নির্জনে গিয়া পরামর্শ করিতে লাগিল। উহাদের বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি বলিল, তোমরা কি জান না যে, তোমাদের পিতা তোমাদের নিকট হইতে আল্লাহ্ নামে অঙ্গীকার লইয়াছেন এবং পূর্বেও তোমরা ইউসুফের ব্যাপারে ত্রুটি করিয়াছিলে। সুতরাং আমি কিছুতেই এই দেশ ত্যাগ করিব না যতক্ষণ না আমার পিতা আমাকে অনুমতি দেন অথবা আল্লাহ আমার জন্য কোন ব্যবস্থা করেন এবং তিনিই শ্রেষ্ঠ বিচারক। তোমরা তোমাদের পিতার নিকট ফিরিয়া যাও এবং বল, হে আমাদের পিতা! আপনার পুত্র তো চুরি করিয়াছে এবং আমরা যাহা জানি তাহারই প্রত্যক্ষ বিবরণ দিলাম। আর অজানা ব্যাপারে আমরা সংরক্ষণকারী নই। যে জনপদে আমরা ছিলাম উহার অধিবাসিগণকে জিজ্ঞাসা করুন এবং যে যাত্রীদের সহিত আমরা আসিয়াছি তাহাদিগকেও। আমরা অবশ্যই সত্য বলিতেছি" (১২:৮০-৮২)।
এই প্রবীণজন কে ছিল সে ব্যাপারে মুফাসসিরগণ বিভিন্ন ব্যক্তির নাম বলিয়াছেন। বাইবেলে নির্দিষ্টরূপে 'য়াহুদা' নামটি উল্লিখিত হইয়াছে। অথচ য়াহুদা বয়সে ভাইদের মধ্যে চতুর্থ ছিল, জ্যেষ্ঠ ছিল না। তবে সে বিদ্যা ও গুণে শ্রেষ্ঠ ছিল। পবিত্র কুরআন 'বড়' (كبيرهم) শব্দ দ্বারা বিভিন্ন বিচারে বড় হওয়ার পথ উন্মুক্ত করিয়া দিয়াছে। এই কারণে মুফাসসিরগণের গরিষ্ঠ অংশ বড় দ্বারা বিদ্যা ও গুণে বড় য়াহুদা হওয়ার কথা বলিয়াছেন এবং তাহাদের মতে এই য়াহুদাই ইউসুফকে হত্যা করিবার ব্যাপারে ভাইদের সহিত দ্বিমত পোষণ করিয়া তাঁহার জীবন রক্ষার ব্যবস্থা করিয়াছিল। কোন কোন মুফাসসির বড় দ্বারা শাম'ঊন বুঝাইয়াছেন, কারণ সে বয়সে বড় না হইলেও ভাইদের মধ্যে সর্বাধিক মান-মর্যাদার অধিকারী ও নেতৃত্ব গুণসম্পন্ন ছিল। আবার কেহ কেহ বড় বলিতে বয়োজ্যেষ্ঠ রূবেলের নাম উল্লেখ করিয়াছেন এবং তাহাকেই ইউসুফের হত্যা পরিকল্পনার ব্যাপারে দ্বিমত পোষণকারী সাব্যস্ত করিয়াছেন।
ইউসুফ ভ্রাতৃবর্গ যেহেতু একবার পিতার সহিত প্রতারণা করিয়া অবিশ্বাসের পাত্র হইয়াছিল, তাই তাহারা ভাবিল যে, তাহাদের বক্তব্য তিনি বিশ্বাস করিবেন না এবং ইহাতে তিনি নিশ্চিন্ত হইবেন না। কাজেই নিজেদের সত্যবাদিতা ও বক্তব্যের যথার্থতা প্রমাণ করিবার জন্য বড় ভাই তাহাদের এই উপদেশ প্রদান করিল যে, তাহারা যেন পিতাকে বলে, "আপনি বিশ্বাস না করিলে মিসরে আপনার বিশ্বাসভাজন কোন লোক পাঠাইয়া আমাদের বক্তব্যের সত্যাসত্য যাচাই করিতে অথবা আমাদের কাফেলার অন্যান্য লোকজনের নিকট হইতেও আপনি প্রকৃত ঘটনা অবহিত হইতে পারেন। ইহাতে আমরা সত্যবাদী বলিয়া প্রমাণিত হইব" (মাজহারী, ৫খ, ১৮৭; মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ, ১০৬, ১১০)।
অতঃপর সিদ্ধান্ত মোতাবেক ইউসুফ ভ্রাতৃবর্গ 'বড়' ভাইকে মিসরে রাখিয়া স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করিল এবং বড় ভাই যেভাবে বলিয়া দিয়াছিল সেইভাবে সমগ্র ঘটনা পিতাকে অবহিত করিল। পিতা যেহেতু ইতোপূর্বে ইউসুফ (আ)-এর ঘটনার পুত্রদের সত্যবাদিতার নমুনা প্রত্যক্ষ করিয়া তাহাদের প্রতি আস্থা হারাইয়া ফেলিয়াছিলেন। তাই তিনি বিনয়ামীনের অনুপস্থিতিকেও তাহাদের কারসাজি বলিয়া মনে করিলেন। বিনয়ামীনের অনুপস্থিতি নূতন করিয়া ইয়া'কূব (আ)-এর হৃদয়ে ইউসুফের স্মৃতি পুনরায় জাগরুক করিয়া দিল। তিনি এইবারও ধৈর্য ধারণের পথ অবলম্বন করিলেন এবং বলিলেন:
قَالَ بَلْ سَوَّلَتْ لَكُمْ أَنْفُسُكُمْ أَمْرًا فَصَبْرٌ جَمِيلٌ عَسَى الله أَنْ يَأْتِيَنِي بِهِمْ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْعَلِيمُ الحَكِيمُ. وَتَوَلَّى عَنْهُمْ وَقَالَ يَاسَفَى عَلَى يُوسُفَ وَابْيَضَّتْ عَيْنَهُ مِنَ الْحُزْنِ فَهُوَ كَظِيمٌ. قَالُوا تَاللَّهِ تَفْتَوْا تَذْكُرُ يُوسُفَ حَتَّى تَكُونَ حَرَضًا أَوْ تَكُونَ مِنَ الْهَلِكِينَ . قَالَ إِنَّمَا أَشْكُوا بَنِى وَحُزْنِي إِلَى اللَّهِ وَأَعْلَمُ مِنَ اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ .
"ইয়া'কূব বলিল, না, তোমাদের মন তোমাদের জন্য একটি কাহিনী সাজাইয়া দিয়াছে। সুতরাং পূর্ন ধৈর্যই শ্রেয়; হয়তো আল্লাহ্ উহাদিগকে একসংগে আমার নিকট আনিয়া দিবেন। অবশ্য তিনিই সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। সে উহাদিগ হইতে মুখ ফিরাইয়া লইল এবং বলিল, আফসোস ইউসুফের জন্য! শোকে তাহার চক্ষুদ্বয় সাদা হইয়া গিয়াছিল এবং সে ছিল অসহনীয় মনস্তাপে ক্লিষ্ট। উহারা বলিল, আল্লাহর শপথ! আপনি তো ইউসুফের কথা সদা স্মরণ করিতে থাকিবেন যতক্ষণ না আপনি মুমূর্ষু হইবেন, অথবা মৃত্যুবরণ করিবেন। সে বলিল, আমি আমার অসহনীয় বেদনা, আমার দুঃখ শুধু আল্লাহ্র নিকট নিবেদন করিতেছি এবং আমি আল্লাহ্র নিকট হইতে জানি যাহা তোমরা জান না" (১২ঃ ৮৩-৮৬)।
অর্থাৎ ইয়া'কূব (আ) পুত্র বিনয়ামীনের বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ মানিয়া নিলেন না। তিনি পুত্রদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ করিয়া বলিলেন, আচ্ছা! সে যদি চুরি করিয়াই থাকে তবে চুরির অপরাধে চোরকে গোলাম বানাইয়া রাখা যায় এই কথা বাদশাহ জানিলেন কি করিয়া (মাজহারী, ৫খ, ১৮৮)। ঠিক আছে, তোমাদের বিরুদ্ধে আমার কোন অভিযোগ নাই। আমি সবর করিয়াই যাইব। তবে এই উপর্যুপরি বিপদের পর আমার আশা হইতেছে যে, আল্লাহ্ পক্ষ হইতে আমার কঠিন পরীক্ষার মেয়াদ ফুরাইয়া আসিয়াছে এবং অতিসত্বর আল্লাহ তাহাদের সকলকে ইউসুফ, বিনয়ামীন ও য়াহুদা (অথবা রূবেল অথবা শাম 'উনকে) আমার নিকট ফিরাইয়া দিবেন এবং আমার সকল দুঃখের অবসান হইবে। অতঃপর বিনয়ামীনের অনুপস্থিতির দুঃখ ও ইউসুফের পুরাতন দুঃখ তাজা হইয়া উঠিলে ইয়া'কূব (আ) উপস্থিত পুত্রদের হইতে মুখ ফিরাইয়া কাঁদিতে লাগিলেন। কাঁদিতে কাঁদিতে তাঁহার চক্ষু নিষ্প্রভ হইয়া যাইতে লাগিল এবং প্রচণ্ড দুঃখ চাপিয়া রাখিবার কারণে তিনি দৃষ্টিহীন অথবা মতান্তরে ক্ষীণদৃষ্টি হইয়া গিয়াছিলেন। মুকাতিলের মতে তাঁহার এই অবস্থা ছয় বৎসর পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল (মাজহারী, ৫খ ১৮৮; মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ, ১৭৭)।
ইয়া'কূব (আ)-এর পুত্রশোকের সহিত বর্ধিত দুঃখরূপে দেখা দিল তাঁহার উপস্থিত পুত্রদের অবহেলা। তাহারা বৃদ্ধ পিতার দুঃখে দুঃখিত ও ব্যথায় ব্যথিত হইয়া তাঁহাকে সান্ত্বনা দেওয়ার পরিবর্তে সকল পুত্রকে বাদ দিয়া একমাত্র ইউসুফের প্রতি অতিরিক্ত মমতার অভিযোগে পিতাকে অভিযুক্ত করিল। (কুরআনের ভাষায়): قَالُوا تَاللَّهِ تَفْتَؤُا تَذْكُرُ يُوسُفَ حَتَّى تَكُونَ حَرَضًا أَوْ تَكُونَ مِنَ الْهَلِكِينَ.
"উহারা বলিল, আল্লাহ্ শপথ! আপনি তো ইউসুফের কথা সদা স্মরণ করিতে থাকিবেন যতক্ষণ না আপনি মুমূর্ষু হইবেন অথবা মৃত্যু বরণ করিবেন" (১২ঃ ৮৫)।
পুত্রদের এই বক্তব্যের জবাবে পিতা বলিলেন, তোমাদের আপত্তি কেন? আমি তো আর তোমাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ করিতেছি না কিংবা তোমাদিগকে জ্বালাতন করিতেছি না কিংবা অন্য মানুষের নিকটও বলিতেছি না। আমি তো আমার দুঃখ শুধু আল্লাহর দরবারেই নিবেদন করিতেছি। ইহাতেও তোমরা বাধা দিবে কেন? সুতরাং তোমরা আমাকে আমার অবস্থায় থাকিতে দাও। সেই সাথে তিনি এ কথাও বলিলেন, আমার ইউসুফকে স্মরণে রাখা বৃথা যাইবে না। কেননা আমি (নবী হিসাবে) আল্লাহ্র পক্ষ হইতে এমন কিছু বিষয় জানি যাহা তোমরা জান না। সে বিষয় হইল আল্লাহ্র সীমাহীন দয়া ও করুণার প্রতি ভরসা অথবা ইউসুফ (আ)-এর দেখা স্বপ্নের চূড়ান্ত ব্যাখ্যা, যাহা এখনও সংঘটিত হয় নাই, অথচ উহা একদিন অবশ্যই বাস্তবায়িত হইবে। অথবা ইহার অর্থ এমনও হইতে পারে যে, আল্লাহ তা'আলা তো তাহাদের সহিত আমার পুনর্মিলনের ওয়াদা দিয়াছেন। সুতারাং তোমাদের আংশকা অমূলক হওয়াই স্বাভাবিক (মাজহারী, ৫খ, ১৯৩; মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ, ১৯৯; কাসাসুল কুরআন, ১খ, ৩২৫)।
একটি বর্ণনামতেই ইয়া'কূব (আ)-এর জনৈক প্রতিবেশী তাঁহার নিকট আসিয়া বলিল, 'কি ব্যাপার ইয়া'কূব! আপনি জীর্ণশীর্ণ হইয়া গিয়াছেন এবং নিঃশেষ হইয়া যাইতেছেন, অথচ এখন আপনার বয়স আপনার পিতার বয়স পর্যন্ত পৌঁছায় নাই'। ইয়াকুব (আ) বলিলেন, আল্লাহ আমাকে ইউসুফের ব্যাপারে যে পরীক্ষায় ফেলিয়াছেন উহা আমাকে চূর্ণ করিয়া দিয়াছে এবং নিঃশেষ করিয়া ফেলিতেছে। ই'য়াকুব (আ) (اِنَّمَا اَشْكُوا بَتِّي وَحُزْنِيَّ إِلَى الله) (আমি আমার অসহনীয় বেদনা, আমার দুঃখ শুধু আল্লাহ্র নিকট নিবেদন করিতেছি) বলিলে, আল্লাহ তাআলা তাঁহার নিকট ওহী পাঠাইলেন, আমার ইজ্জাতের কসম! ইউসুফ ও বিনয়ামীন মৃত হইলেও আমি উহাদিগকে তোমার জন্য পুনরায় জীবিত করিয়া দিব।
ওয়াহ্ত্ব ও সুদ্দী প্রমুখ বলিয়াছেন, ইউসুফ (আ)-এর জেলে অবস্থানকালে জিবরীল (আ) তাঁহার নিকট আসিয়া বলিলেন, হে সিদ্দীক! আপনি আমাকে চিনিতে পারিতেছেন কি? ইউসুফ (আ) বলিলেন, 'আমি এক পবিত্র অবয়ব দেখিতে পাইতেছি ও পবিত্র সুঘ্রাণ'। জিবরীল (আ) বলিলেন, আমি রাব্বুল আলামীনের দূত, আমি রুহুল আমীন জিবরীল। ইউসুফ (আ) বলিলেন, আপনি হইলেন সকল পবিত্রদের সেরা পবিত্র, সান্নিধ্যপ্রাপ্ত (ফেরেশতা)-দের সর্দার ও রাব্বুল আলামীনের বিশ্বাসভাজন। এই পাপীদের নিবাসে আপনার আগমনের হেতু কি? জিবরীল (আ) বলিলেন, হে ইউসুফ! আপনি কি জানেন না যে, আল্লাহ নবীগণের পবিত্রতা দ্বারা নিবাসসমূহ পবিত্র করেন এবং তাঁহারা যে ভূমিতে অবস্থান করেন উহা পবিত্রতম ভূমি হইয়া যায়। হে পবিত্রগণের সেরা পবিত্র ও মনোনীত পুণ্যবানদের সন্তান! আল্লাহ আপনার বরকতে জেলখানা ও উহার সংলগ্ন অঞ্চলকে পবিত্র করিয়া দিয়াছেন। ইউসুফ (আ) বলিলেন, কিন্তু আমার নাম সিদ্দীক তালিকাভুক্ত হইবে কীরূপে এবং কি করিয়া আমাকে পবিত্রদের মধ্যে গণ্য করিলেন, অথচ আমাকে তো অপরাধীদের নিবাসে প্রবেশ করানো হইয়াছে? জিবরীল বলিলেন, 'ইহা এই কারণে যে, আপনার হৃদয় পাপাচারে আক্রান্ত হয় নাই এবং আপনার প্রতিপালকের প্রতি অবাধ্যতার কাজে আপনি আপনার গৃহকর্ত্রীর আনুগত্য করেন নাই। এই কারণে আল্লাহ আপনাকে 'সিদ্দীক' (সত্যনিষ্ঠ) খেতাবে ভূষিত করিয়াছেন, আপনাকে মনোনীতদের তালিকাভুক্ত করিয়াছেন এবং আপনাকে আপনার পূর্বপুরুষ পূণ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত করিয়াছেন। তখন ইউসুফ (আ) বলিলেন, হে রূহুল আমীন! ইয়া'কূব (আ) সম্পর্কে আপনার কোন কিছু জানা আছে কি? জিবরীল (আ) বলিলেন, হাঁ, আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে সবরে জামীল' তথা পূর্ণ ধৈর্য ধারণ করিবার তাওফীক দান করিয়াছেন এবং তাঁহাকে দুঃখ সহনের পরীক্ষায় ফেলিয়াছেন; এখন তিনি উহাতে ক্লিষ্ট হইতেছেন। ইউসুফ (আ) বলিলেন, তাঁহার দুঃখের পরিমাণ কত? জিবরীল (আ) বলিলেন, সত্তরজন পুত্রহারার শোকের সমপরিমাণ। ইউসুফ (আ) বলিলেন, হে জিবরীল! ইহাতে তিনি কি পরিমাণ ছওয়াব পাইবেন? জিবরীল (আ) বলিলেন, এক শত শহীদের ছওয়াব। এবার ইউসুফ (আ) বলিলেন, আপনার কি মনে হয়, তাঁহার সহিত কি আমার পুনঃসাক্ষাত ঘটিবে? জিবরীল বলিলেন, হাঁ। তখন ইউসুফ (আ)-এর অন্তর শান্ত হইল এবং তিনি বলিলেন, তাঁহাকে দেখিতে পাইলে আমার আর কোন দুঃখ থাকিবে না (মাজহারী, ৫খ, ১৯৪)।
একটি বর্ণনায় আছে, মালাকুল মওত ইয়া'কূব (আ)-এর সহিত সাক্ষাত করিলে তিনি তাঁহাকে বলিলেন, হে পবিত্র সুঘ্রাণ ও সুন্দর আকৃতির অধিকারী ফেরেশতা! আপনি কি আমার পুত্রের রূহ কবজ করিয়াছেন? মালাকুল মওত (আ) বলিলেন, না। ইহাতে ইয়া'কূব (আ)-এর মন শান্ত ও সুস্থির হইল এবং তিনি পুত্রের সাক্ষাত লাভে আশাবাদী হইলেন। (মাজহারী, ৫খ., ১৯৫)।
৮৬নং আয়াত হইতে ইংগিত পাওয়া যায় যে, ইয়া'কূব (আ) ওহীর মাধ্যমে ইউসুফ (আ)-এর বাঁচিয়া থাকিবার বিষয়ে অবহিত হইয়াছিলেন। তাঁহার পরীক্ষার বিষয় ছিল এই যে, তিনি ইউসুফের অবস্থান স্থল অবগত ছিলেন না। যাঁহার হৃদয়ে আল্লাহর রহমত ও তাজাল্লী জ্যোতির্ময় হইয়া উঠে, প্রকৃত ঈমান ও য়াকীনের স্বাদ যিনি আস্বাদন করেন, বিপদের ঘনঘটা ও দুঃখ-যাতনার পাহাড় তাঁহার হৃদয়কে নিরাশাগ্রস্ত করিতে পারে না। সুতরাং আল্লাহ্র অপরিসীম রহমতের ভরসায় বলীয়ান হইয়া তিনি বলিতে পারেন وَأَعْلَمُ مِنَ اللَّهِ مَالَا تَعْلَمُونَ (ফী যিলালিল কুরআন, উরদু, ৫খ., ৬১, ৬৩-৬৪)।
📄 মিসর অভিমুখে ইউসুফ ভ্রাতৃবর্গের তৃতীয় সফর
ইউসুফের সুদীর্ঘ দিনের অনুপস্থিতির সহিত বিনয়ামীন ও তাঁহার কারণে বড় ভাইয়ের অনুপস্থিতি যুক্ত হইয়া ই'য়াকূব (আ)-এর পরিবারে গভীরতর শোকের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। অপরদিকে বিরাজমান দুর্ভিক্ষকালে শোকাবহ পরিবেশ সৃষ্টি করে। ইয়া'কূব পরিবারের নিকট মিসর হইতে খাদ্যসামগ্রী সংগ্রহের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের ব্যবস্থা ছিল না। এইরূপ সঙ্কটময় পরিস্থিতিতেও আল্লাহ্র প্রিয় বান্দা ও নবী ইয়া'কূব (আ) একটি আশার আলো দেখিতে পান। ঘটনা প্রবাহ তাঁহার অন্তরে এই বিশ্বাস জন্মায় যে, পরীক্ষা ও দুঃখের দিন ফুরাইয়া আসিয়াছে এবং সুখ-শান্তির দিন সমাগত প্রায়। আল্লাহ তা'আলা যেন তাঁহার প্রিয় বান্দাকে ইংগিত দেন যে, বিনয়ামীনের ঘটনায় ইউসুফের সহিত পুনর্মিলনের রহস্য লুক্কায়িত রহিয়াছে (কাসাসুল কুরআন, ১খ., ৩২৮)। ইবন আবূ হাতিম বর্ণনা করিয়াছেন, ইয়া'কূব (আ) চব্বিশ বৎসর (মতান্তরে চল্লিশ বৎসর) পর্যন্ত জানিতেন না যে, ইউসুফ জীবিত আছেন না মৃত। প্রচণ্ড খাদ্য সমস্যার সমাধানের জন্য মিসরে যাওয়া ব্যতীত গত্যন্তর ছিল না। ইহা ছাড়া বিনয়ামীনকে মুক্ত করা এবং বড় ভাইকে ফিরাইয়া আনার জন্যও মিসর যাওয়ার প্রয়োজন ছিল। মোটকথা, পারিবারিক প্রয়োজন পূরণ এবং আশাহত পুত্রদের অন্তরে আশার সঞ্চারের উদ্দেশে ইয়া'কূব (আ) যৎকিঞ্চিত পুঁজি নিয়াই পুনরায় মিসর গমনের উপদেশ প্রদান করিয়া বলিলেন (কুরআনের ভাষায়):
يُبَنِيَّ اذْهَبُوا فَتَحَسَّسُوا مِنْ يُوسُفَ وَآخِيْهِ وَلَا تَابْنَسُوا مِنْ رُوْحِ اللَّهِ إِنَّهُ لَا يَابْنَسُ مِنْ رُوحِ اللَّهِ إِلَّا القَوْمُ الكفرُونَ .
"হে আমার পুত্রগণ! তোমরা যাও, ইউসুফ ও তাহার সহোদরের অনুসন্ধান কর এবং আল্লাহর আশিস হইতে তোমরা নিরাশ হইও না। কারণ আল্লাহর আশিস হইতে কেহই নিরাশ হয় না, কাফির সম্প্রদায় ব্যতীত" (১২:৮৭)।
পিতার উৎসাহদানে ইউসুফ ভ্রাতৃবর্গ তৃতীয়বার মিসর অভিমুখে রওয়ানা হইলেন (তাফসীরে মাজেদী, পৃ. ৫০৪, টীকা ১৫৯; ফী জিলালিল কুরআন, ২খ., ৬৪, ৬৫)। সেখানে বিনয়ামীনের উপস্থিতি নিশ্চিত ছিল বিধায় তাহারা চিন্তা করিল যে, যাহার হদিস জানা আছে তাহাকে পাওয়ার চেষ্টা করাই বাঞ্ছনীয় হইবে। তাহারা ভাবিল যে, কোমলপ্রাণ বাদশাহের নিকট হইতে বিনয়ামীনকে ফেরত পাওয়া সহজ হইতে পারে। খাদ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ইউসুফ ভ্রাতৃবর্গ তৃতীয়বারের মত মিসরে পদার্পণ করিল। তাহারা খাদ্যশস্য বরাদ্দ প্রাপ্তির জন্য আযীয মিসরের দরবারে উপস্থিতির সুযোগকে বিনয়ামীনের মুক্তির ব্যাপারে আবেদন-নিবেদনের উপায়রূপে কাজে লাগাইল। তাহারা আযীযের দরবারে উপস্থিত হইয়া তাহাদের পারিবারিক বিপন্ন অবস্থা তুলিয়া ধরিল এবং তাঁহার সহানুভূতি কামনা করিল। কুরআনের বর্ণনায়:
فَلَمَّا دَخَلُوا عَلَيْهِ قَالُوا يَأَيُّهَا الْعَزِيزُ مَسَّنَا وَأَهْلَنَا الضُّرُّ وَجِئْنَا بِبِضَاعَةٍ مُزْجُةٍ فَأَوْفِ لَنَا الْكَيْلَ وَتَصَدِّقُ عَلَيْنَا إِنَّ اللَّهَ يَجْزِي الْمُتَصَدِّقِيْنَ .
"যখন উহারা তাহার নিকট উপস্থিত হইল তখন বলিল, হে আযীয! আমরা ও আমাদের পরিবার-পরিজন বিপন্ন হইয়া পড়িয়াছি এবং আমরা তুচ্ছ পুঁজি লইয়া আসিয়াছি। আপনি আমাদের রসদ পূর্ণ মাত্রায় দিন এবং আমাদিগকে দান করুন; আল্লাহ দাতাগণকে পুরস্কৃত করিয়া থাকেন" (১২:৮৮)।