📄 মিসরে দুর্ভিক্ষ এবং উহার প্রতিকারে ইউসুফ (আ)-এর ব্যবস্থা
ক্ষমতা গ্রহণের পর হযরত ইউসুফ (আ) রাষ্ট্রের যাবতীয় কর্মকাণ্ড এমন সুচারুরূপে আঞ্জাম দিতে থাকিলেন যে, কাহারও কোন অভিযোগের অবকাশ রহিল না। সমগ্র দেশবাসী তাঁহার প্রতি অনুরক্ত হইয়া গেল এবং দেশের সর্বত্র শান্তি, সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তার পরিবেশ বিরাজ করিতে লাগিল। ইউসুফ (আ)-কেও রাষ্ট্রপরিচালনার সামগ্রিক দায়িত্ব পালনে কোন প্রকার জটিলতা বা কষ্টক্লেশের সম্মুখীন হইতে হইল না। তিনি জনসাধারণের সুখশান্তির জন্য যাহা করিয়াছিলেন পৃথিবীর ইতিহাসে উহার তুলনা বিরল (মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., ৮১)। ইউসুফ (আ) খাদ্য সংগ্রহ অভিযানের সুষ্ঠু পরিকল্পনা গ্রহণ করিলেন, এতদুদ্দেশ্যে তিনি বহু দুর্গ ও গুদামঘর নির্মাণ করাইয়া উহাতে দুর্ভিক্ষকালের জন্য খাদ্য সঞ্চয় করিতে লাগিলেন। তিনি চতুর্দশ বর্ষের জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করিয়া ভাল উৎপাদনের বৎসরগুলিতে পরিমিত ও নিয়ন্ত্রিত ব্যয়ের ব্যবস্থা করিলেন। অতঃপর অশ্রুতপূর্ব ভয়াবহতা সহকারে দুর্ভিক্ষের কাল শুরু হইয়া গেল। বর্ণিত আছে যে, দুর্ভিক্ষ শুরু হইলে ইউসুফ পেট ভরিয়া খাওয়া পরিত্যাগ করিলেন। লোকেরা বলিল, সমগ্র মিসরের ধনভাণ্ডারের কর্তৃত্ব আপনার হাতে থাকা সত্ত্বেও আপনি ক্ষুধার কষ্ট সহিতেছেন কেন? তিনি বলিলেন, আমি চাই, সাধারণ মানুষের ক্ষুধার যাতনার অনুভূতি আমার অন্তরে জাগরুক থাকুক। উদর পূর্ণ করিয়া ভক্ষণ করিয়া আমি যেন ক্ষুধার্তদের কথা ভুলিয়া না যাই। রাজভবনের বাবুর্চীদের প্রতিও তিনি এক বেলা দ্বিপ্রহরে খাদ্য তৈরির আদেশ জারী করিলেন যাহাতে বাদশাহ এবং রাজবাড়ির লোকেরাও জনতার ক্ষুধার স্বাদ আস্বাদন করিতে পারে। সুতরাং দুর্ভিক্ষের প্রথম আঘাত বাদশাহই অনুভব করিলেন। দুপুর রাতে ক্ষুধায় কাতর হইয়া তিনি ইউসুফ! ক্ষুধা, ক্ষুধা বলিয়া চিৎকার করিয়া উঠিলে ইউসুফ (আ) বলিলেন, 'দুর্ভিক্ষ শুরু হইয়া গিয়াছে'।
দুর্ভিক্ষের প্রথম বৎসরে মানুষেরা তাহাদের বিগত ভাল উৎপাদনের বৎসরগুলিতে সঞ্চিত খাদ্য খাইয়া ফেলিল। সুতরাং পরবর্তী সময়ে তাহারা ইউসুফ (আ)-এর নিকট হইতে খাদ্য ক্রয় করিতে লাগিল। প্রথম বর্ষ অতিক্রান্ত হইলে লোকেরা তাহাদের নগদ অর্থ দ্বারা খাদ্য ক্রয় করিল এবং মিসরের সকল স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা ইউসুফ (আ)-এর অধিকারে আসিয়া গেল। দ্বিতীয় বর্ষ শেষে খাদ্য বিক্রয় হইল অলংকার ও মণিমুক্তার বিনিময়ে এবং মানুষের হাতে উহার কিছুই অবশিষ্ট থাকিল না।
তৃতীয় বর্ষ শেষে বিক্রয় হইল সর্বপ্রকার পশুপালের বিনিময়ে এবং উহার সবই ইউসুফ (আ)-এর অধিকারভুক্ত হইল। চতুর্থ বর্ষ-পরিক্রমায় বিক্রয় হইল লোকদের মালিকানাভুক্ত গোলাম-বাঁদীর বিনিময়ে এবং কাহারও মালিকানায় কোন দাস-দাসী থাকিল না। পঞ্চম বর্ষ শেষে বিক্রয় হইল স্থাবর সম্পত্তি, ভিটেমাটি ও বাড়িঘরের বিনিময়ে এবং এইসব কিছুই ইউসুফ (আ)-এর দখলীভুক্ত হইল। ষষ্ঠ বর্ষের দুর্ভিক্ষ দেশবাসীকে তাহাদের সন্তান-সন্ততির বিনিময়ে খাদ্য ক্রয়ে বাধ্য করিল এবং ইহাদের সকলেই ইউসুফ (আ)-এর দাসে পরিণত হইল। সপ্তম বর্ষের দুর্ভিক্ষ উতরাইবার জন্য লোকেরা নিজেদেরকে বিক্রয় করিয়া খাদ্য সংগ্রহ করিল এবং ইউসুফ (আ) আইনত সকল স্বাধীন নরনারীর মালিকানা লাভ করলেন। (বর্ণনাটি সত্য হইলে তৎকালে দুর্ভিক্ষের পীড়নে সন্তান বিক্রয় ও আত্মবিক্রয় বৈধ ছিল। শরীআতে মুহাম্মদীতে এখন আর উহা বৈধ নহে।)
তখন লোকেরা বলাবলি করিতে লাগিল, আজিকার মত এত বিশাল ও সর্বব্যাপী রাজত্বের অধিকারী আর কোন বাদশাহ আমরা দেখি নাই। এই অবস্থার পর ইউসুফ (আ) বাদশাহকে বলিলেন, আমার প্রতি আমার প্রতিপালকের প্রতিদান তো দেখিতেছেন। এখন আপনার অভিমত কি? বাদশাহ বলিলেন, আপনার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। আমরা সকলে আপনার অনুগত। ইউসুফ (আ) বলিলেন, 'আপনার সম্মুখে আল্লাহকে সাক্ষী রাখিয়া বলিতেছি, আমি মিসরবাসীদের সকলকেই মুক্ত করিয়া দিলাম।' দুর্ভিক্ষ মিসরের সীমানা অতিক্রম করিয়া দূর-দূরান্তে ছড়াইয়া পড়িল এবং দুর্ভিক্ষ পীড়িত সকল অঞ্চল হইতে লোকেরা খাদ্য সংগ্রহের জন্য মিসরের রাজ-দরবারে ভিড় করিতে লাগিল। সকলের নিয়মিত প্রাপ্তি নিশ্চিত করিবার জন্য ইউসুফ (আ) জনপ্রতি সে যে কেহই হউক না কেন-এক উটের বোঝার অধিক না দেওয়ার বিধান জারী করিলেন (মাজহারী, ৫খ., ১৭৫-১৭৬; মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., ৮১-৮২)।
পবিত্র কুরআন স্বপ্নের তা'বীরের অংশরূপে দুর্ভিক্ষকালীন ব্যবস্থাপনার বর্ণনা থাকার কারণে উহার বিশদ বর্ণনা দেওয়া হয় নাই। তবে বাইবেলে উহার বিশদ বর্ণনা রহিয়াছে নিম্নরূপঃ "এবং ইউসুফ (আ) যখন মিসর সম্রাট ফিরআওনের সমীপে দণ্ডায়মান হইল তখন তাঁহার বয়স হইয়াছিল বিশ বৎসর। ইউসুফ (আ) ফিরআওনের দরবার হইতে বাহির হইয়া মিসরের সমগ্র অঞ্চলে ভ্রমণ করিলেন। অধিক উৎপাদনের সাত বৎসর ভূমি ফসলে পরিপূর্ণ হইলে তিনি এই সাত বৎসরের সমগ্র খাদ্যদ্রব্য যাহা মিসর দেশে ছিল সংগ্রহ করিলেন, তিনি খাদ্যসামগ্রী জনপদসমূহে গুদামজাত করিলেন এবং প্রত্যেক জনপদের আশপাশের জমিতে উৎপন্ন খাদ্যশস্য সেই জনপদে রাখিবার ব্যবস্থা করিলেন। ইউসুফ (আ) খাদ্যশস্য বহুল পরিমাণে যেরূপ নদীর বালুরাশি পরিমাণ, উহার হিসাব নির্ণয় না করিয়া সঞ্চয় করিলেন, কেননা তাহা ছিল হিসাবের আওতার উর্ধে।
মিসর দেশে ভাল উৎপাদনের সাত বৎসর সমাপ্ত হইল এবং দুর্মূল্যের সাত বৎসর যেরূপ ইউসুফ (আ) বলিয়াছিলেন, শুরু হইল। সকল দেশে দুর্মূল্য দেখা দিল। কিন্তু তখন পর্যন্ত মিসরের সকল অঞ্চলে রুটি (খাদ্য) ছিল। পরে যখন সমগ্র মিসর দেশ ক্ষুধায় ধ্বংস হওয়ার উপক্রম করিল তখন মানুষের খাদ্যের জন্য ফিরআওনের নিকট আকুল হইল। ফিরআওন সকল মিসরবাসীকে বলিল, তোমরা ইউসুফের নিকট গমন কর এবং সে তোমাদিগকে যেইরূপ করিতে আজ্ঞা করে সেইরূপ কর। সমস্ত পৃথিবীতে আকাল দেখা দিল। ইউসুফ (আ) সঞ্চিত ভাণ্ডারের খাতা খুলিয়া মিসরীয়দের নিকট বিক্রয় করিতে লাগিলেন। মিসর দেশে দুর্ভিক্ষ চরম হইল এবং সকলেই মিসরে খাদ্য ক্রয়ের উদ্দেশে আগমন করিতে লাগিল। কেননা সকল দেশেই দুর্ভিক্ষ ছিল (আদিপুস্তক, ৪১: ৪৬, ৪৯, ৫৩, ৫৭; বরাত, কাসাসুল কুরআন, ১খ., ৩১৫, ৩১৬)।
📄 খাদ্য শস্য সংগ্রহের উদ্দেশে ইউসুফ ভ্রাতৃবর্গের মিসর আগমন
অধিক উৎপাদনের সাত বৎসর পর দুর্ভিক্ষের কাল শুরু হইল। মিসর রাজ্যের সীমানা ছাড়াইয়া ইয়া'কূব (আ)-এর আবাস ভূমি কান'আনে (প্রচলিত 'কেনান', বর্তমান আল-খলিল) দুর্ভিক্ষ বিস্তৃত হইল। মিসর ব্যতীত কোথাও খাদ্যপণ্য মওজুদ ছিল না। দূরদেশের লোকেরাও জানিতে পারিল যে, মিসরে খাদ্যের ভাণ্ডার মওজুদ রহিয়াছে এবং আযীয মিসরের ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে উহা একটি নির্দিষ্ট পরিমাণে ন্যায্য মূল্যে বিদেশীদের নিকটও বিক্রয় করা হয়। দুর্ভিক্ষ এমন প্রচণ্ড রূপ পরিগ্রহ করিল যে, আল্লাহ্ নবী ইয়া'কূব (আ)-এর খান্দানও উহা হইতে রেহাই পাইল না। কান'আন ছিল তখনকার সিরীয় (সাম) সীমান্তবর্তী অঞ্চল। এইসব অঞ্চলের লোকেরাও দলে দলে খাদ্যশস্যের জন্য গমন করিতে লাগিল। ইয়া'কূব (আ) পুত্রদের ডাকিয়া বলিলেন, আমি শুনিতে পাইয়াছি যে, মিসরের ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ দুর্ভিক্ষপীড়িত বিদেশীদের নিকটও খাদ্য বিক্রয় করিতেছেন। সুতরাং তোমরা সেখানে গিয়া খাদ্যশস্য ক্রয় করিয়া আনিবার চেষ্টা কর। পিতার আদেশ শিরোধার্য করিয়া ইউসুফ ভ্রাতৃবর্গ একটি কান'আনী কাফেলার সহিত মিসর অভিমুখে চলিল 'রেশন' আনিবার উদ্দেশে (মাজহারী, ৫খ., ১৭৬; মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., ৮২; ফী জিলালিল কুরআন, ৫খ., ৩৯; কাসাসুল কুরআন, ১খ., ৩১৬)। পবিত্র কুরআনে ইহার বর্ণনায় ইরশাদ হইয়াছে: وَجَاءَ اخْوَةٌ يُوسُفَ فَدَخَلُوا عَلَيْهِ فَعَرَفَهُمْ وَهُمْ لَهُ مُنْكِرُونَ .
"ইউসুফের ভ্রাতাগণ আসিল এবং তাহার নিকট উপস্থিত হইল। সে উহাদিগকে চিনিল, কিন্তু তাহারা তাহাকে চিনিতে পারিল না" (১২ঃ ৫৮)।
পবিত্র কুরআন এ প্রসংগে প্রয়োজনীয় কথা সংক্ষেপে উল্লেখ করিয়াছে। জনপ্রতি এক উটের বোঝা প্রদানের নিয়মের কথা জানিতে পারিয়া বিনয়ামীন ব্যতীত ইউসুফ ভ্রাতৃবর্গের সকলেই মিসরে রওয়ানা হইল। ইউসুফ (আ)-এর সহোদর বিনয়ামীনকে পিতার সান্ত্বনা ও তাঁহার খেদমতের জন্য রাখিয়া যাওয়া হইল। মোটকথা, দশ ভাই কান'আন হইতে সফর করিয়া মিসরে পদার্পণ করিলেন। সরকারী লোকেরা বিদেশী আগন্তুক হিসাবে তাহাদিগকে রাজ-দরবারে পৌঁছাইয়া দিল। ইউসুফ (আ) তাহাদিগকে দেখিবামাত্র চিনিতে পারিলেন। কিন্তু তাহারা ইউসুফ (আ)-কে চিনিতে পারিলেন না। কেননা, ভাইদের চেহারা-সুরত, চাল-চলন, কথাবার্তার ভাবভংগী, বেশভূষা সবই ছিল মেধাবী ইউসুফ (আ)-এর পরিচিত এবং ইহাতে তেমন কোন পরিবর্তন হয় নাই। ইহা ছাড়া পরিচয় জিজ্ঞাসার মাধ্যমেও ইউসুফ তাহাদের ইয়াকূব (আ)-এর সন্তান হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত হইয়াছিলেন। তদুপরি তাঁহার মনে দুর্ভিক্ষ কবলিত ভাইদের মিসর আগমন সম্পর্কে ধারণা জন্মিয়াছিল। অপরদিকে তাহারা ইউসুফ (আ)-কে তাঁহার বাল্যকালে কূপে নিক্ষেপ করিয়াছিল, অতঃপর মিসরগামী কাফেলার হাতে বিক্রয় করিয়াছিল। সুতরাং তাহাদের ধারণা ইউসুফ (আ) বাঁচিয়া থাকিলেও কোথাও ক্রীতদাসরূপে নিপীড়িত ও অসহায় জীবন যাপন করিতেছেন। কোন ক্রীতদাসের মিসরের ন্যায় উন্নত সাম্রাজ্যের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার বিষয়টি ছিল কল্পনাতীত। তদুপরি দীর্ঘ দিনের ব্যবধানে ইউসুফ (আ)-এর দৈহিক পরিবর্তন হইয়াছিল বিপুল পরিমাণে। এখন তিনি এক সুঠাম সবল যুবক। শারীরিক গঠনের পরিবর্তন ছাড়াও সিংহাসনে উপবিষ্ট ইউসুফ (আ)-এর দেহে ছিলে শাহী পোশাক মাথায় রাজমুকুট। দরবারের পাইক-পেয়াদা ও সান্ত্রীদের সন্ত্রস্ততা ও হাঁকডাক, মন্ত্রীবর্গের সসম্ভ্রম উপস্থিতি, দরবারের জাঁকজমক ও প্রভাব ভাইদের জন্য ইউসুফ (আ)-কে চিনিতে পারিবার পথে অন্তরায় হইয়াছিল।
সাধারণত কোন স্থানে নবাগতদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে তাহাদের পরিচয় লাভ করা যায়। পক্ষান্তরে কোন শাসক বা রাজা-বাদশাহকে কোন আগন্তুক পরিচয় জিজ্ঞাসা করিবার হিম্মত করিতে পারে না। একটি বর্ণনামতে ইউসুফ (আ) প্রথম সাক্ষাতেই ভাইদের সহিত ইচ্ছাকৃতরূপে একটি রূঢ়-ভাষায় সম্বোধন করিয়াছিলেন (বিদায়া, ১খ., ২১১)। ইবন কাছীর সুদ্দীর বরাতে উল্লেখ করিয়াছেন যে, দশ ভাই দরবারে নীত হওয়ার পর অতিরিক্ত নিশ্চয়তার জন্য ইউসুফ (আ) তাহাদিগকে এমন কতিপয় প্রশ্ন করিলেন যাহা সন্দেহভাজন লোকদিগকে করা হয়। তাঁহার উদ্দেশ্য ছিল পিতা ও পরিবারের সার্বিক অবস্থা সবিস্তার অবগত হওয়া। তিনি অপরিচিতের ন্যায় প্রশ্ন করিলেন, তোমাদের ভাষা ইবরানী, সুতরাং তোমরা মিসরের অধিবাসী নও; আমার রাজ্যে তোমাদের আগমনের হেতু কি? তোমাদের আগমন আমাকে সন্দিহান করিয়া তুলিয়াছে। ভাইয়েরা বলিল, আমাদের অঞ্চলে ব্যাপক দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়াছে। আমরা আপনার মহানুভবতা ও সদগুণের কথা শুনিয়াছি। মহান আযীয! আমরা তাই আপনার নিকট হইতে খাদ্য সংগ্রহের একান্ত উদ্দেশেই আগমন করিয়াছি। ইউসুফ (আ) বলিলেন, তোমরা যে শত্রুর চর ও গোয়েন্দা নও এবং তোমরা যাহা বলিতেছ তাহা যে সত্য, এই নিশ্চয়তা আমি কিভাবে লাভ করিব? আমি তো সন্দেহ করিতেছি যে, তোমরা আমার রাজ্যের গোপন বিষয় অবগত হওয়ার জন্য গোয়েন্দাগিরি করিতে আসিয়াছ। ভাইয়েরা একবাক্যে বলিল, না'ঊযু বিল্লাহ! আমাদের দ্বারা এহেন অপকর্ম কখনও হইতে পারে না। কেননা আমরা তো নবী পরিবারের সন্তান। ইউসুফ (আ) বলিলেন, তবে তোমাদের পরিচয় কি? তাহারা বলিল, আমরা কান'আনের অধিবাসী এবং আল্লাহ্ নবী ইয়াকূব (আ) হইলেন আমাদের পিতা। ইউসুফ (আ) তাহাদের মুখ হইতে আরও কিছু বিষয় বাহির করিবার উদ্দেশে পরবর্তী প্রশ্ন করিলেন, তোমাদের ব্যতীত তোমাদের পিতার আরও কোন সন্তান আছে কি? তাহারা বলিল, হাঁ! আমরা মোট বার ভাই ছিলাম। আমাদের ছোট এক ভাই বনে হারাইয়া গিয়াছিল, সে ছিল আমাদের পিতার সর্বাধিক প্রিয়পাত্র। তাহার নিরুদ্দেশ হওয়ার পর তাহার কনিষ্ঠ সহোদর পিতার ভালবাসা ও হারানো পুত্রের শোকে সান্ত্বনার পাত্র হইয়াছে এবং সে কারণেই পিতা তাহাকে নিজের নিকটে রাখিয়া দিয়াছেন। এই সকল জিজ্ঞাসাবাদের পর ইউসুফ (আ) আগন্তুকগণকে রাজকীয় মেহমানরূপে আদর-আপ্যায়ন করিবার এবং বিধি অনুসারে তাহাদিগকে খাদ্য-রেশন প্রদানের ফরমান জারী করিলেন (মুখতাসার ইবন কাছীর, ২খ, ২৫৫; বিদায়া, ১খ, ২১১, তাফসীরে মাজহারী, ৫খ., ১৭৬; মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., ৮৩, ৮৫, ৮৬; ফী জিলালিল কুরআন, ৫খ., ৩৯-৪০; কাসাসুল কুরআন, ১খ, ৩১৬-৩১৭)।
রাজকীয় ফরমান অনুসারে ইউসুফ ভ্রাতৃবর্গকে জনপ্রতি এক উটের বোঝা পরিমাণ খাদ্য দেওয়া হইল। এই সময় তাহারা তাহাদের অনুপস্থিত ভাইয়ের অংশ দেওয়ার আবদার করিলে ইউসুফ (আ) তাহদিগকে উপস্থিত লোকদের প্রত্যেককে এক উটের বোঝা পরিমাণ প্রদান এবং অনুপস্থিত কাহারও জন্য না দেওয়া সংক্রান্ত খাদ্য বিতরণ বিধানের কথা শুনাইয়া দিলেন এবং ভবিষ্যতে সে ভাইয়ের উপস্থিতির সাপেক্ষে তাহাকেও খাদ্য রেশন দেওয়ার ওয়াদা করিলেন। সেই সাথে রসদ প্রাপ্তির জন্য পরবর্তীবারে অনুপস্থিত ভাইকে সংগে আনিবার শর্ত আরোপ করিলেন। অন্যথায় তাহাদের কাহাকেও কোনও খাদ্য প্রদান করা হইবে না বলিয়া সতর্ক করিয়া দিলেন। একটি বর্ণনামতে তাহাদের আবদার রক্ষা করিয়া অনুপস্থিত ভাইয়ের অংশ প্রদানের পর তাহাদিগকে সতর্ক করিয়া দিয়াছিলেন (রূহুল মা'আনী, ১৩ পারা, পৃ. ৮; মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., ৮৩, ৮৬)। ভাইকে আনিবার ব্যাপারে ইউসুফ (আ)-এর এইরূপ শক্ত অবস্থান গ্রহণ করিবার কারণ ছিল এই যে, তিনি বুঝিতেছিলেন যে, পরিস্থিতি বাধ্য না করিলে পিতা কিছুতেই তাহাকে আসিবার অনুমতি দিবেন না। ইউসুফ (আ)-এর এই বক্তব্যের জবাবে ভাইয়েরা পিতাকে বুঝাইয়া-শুনাইয়া কনিষ্ঠ ভ্রাতাকে নিয়া আসিবার যথাসাধ্য চেষ্টা করিবার অংগীকার করিলেন। কেননা তাহারা জানিতেন যে, এই ব্যাপারে পিতাকে সম্মত করা অত্যন্ত কঠিন হইবে (ফী জিলালিল কুরআন, ৫খ., ৪১)। পবিত্র কুরআনের ভাষায় ভাইয়েদের এই আলোচনার বিবরণ নিম্নরূপ:
وَلَمَّا جَهَّزَهُمْ بِجَهَازِهِمْ قَالَ ائْتُونِي بِأَخٍ لَكُمْ مِنْ أَبِيكُمْ أَلَا تَرَوْنَ أَنِّي أُوفِ الكَيْلَ وَأَنَا خَيْرُ الْمُنْزِلِينَ . فَإِنْ لَّمْ تَأْتُونِي بِهِ فَلَا كَيْلَ لَكُمْ عِنْدِي وَلَا تَقْرَبُونِ . قَالُوا سَنُرَاوِدُ عَنْهُ آبَاهُ وَإِنَّا لَفَعِلُونَ.
"এবং সে যখন উহাদের সামগ্রীর ব্যবস্থা করিয়া দিল তখন বলিল, তোমরা আমার নিকট তোমাদের বৈমাত্রেয় ভ্রাতাকে লইয়া আইস। তোমরা দেখিতেছ না যে, আমি মাপে পূর্ণ মাত্রায় দেই এবং আমি উত্তম অতিথিপরায়ণ। কিন্তু তোমরা যদি তাহাকে আমার নিকট লইয়া না আইস তবে আমার নিকট তোমাদের জন্য কোন বরাদ্দ থাকিবে না এবং তোমরা আমার নিকটবর্তী হইবে না। উহারা বলিল, 'উহার বিষয়ে আমরা উহার পিতাকে সম্মত করিতে চেষ্টা করিব এবং আমরা নিশ্চয় উহা করিব" (১২: ৫৯-৬১)।
কোন কোন বর্ণনামতে তাহাদের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে ইউসুফ (আ) বলিলেন, তোমরা তোমাদের সত্যবাদিতার নিশ্চয়তাস্বরূপ তোমাদের কোন একজনকে আমার নিকট 'দায়বদ্ধ'রূপে রাখিয়া যাইবে। তখন তাহারা এ বিষয়ে ব্যক্তি নির্ধারণের জন্য লটারী করিলে লটারীতে শাম'উনের নাম উঠিল অথবা ইউসুফ নিজেই শাম'উনকে (মতান্তরে য়াহুদাকে) রাখিয়া যাওয়ার প্রস্তাব করিলেন। কেননা ভাইদের মধ্যে শাম'উন (অথবা য়াহুদা)-এর পূর্ব আচরণ ইউসুফ (আ)-এর প্রতি তুলনামূলক অধিক সহানুভূতিসম্পন্ন ছিল (রূহুল মা'আনী, ১৩ পারা, পৃ. ৮; মাজহারী, ৫খ., ১৭৭)।
ভাইদের নিকট কান'আনে দুর্ভিক্ষের বিস্তৃতি ও ইয়া'কূব (আ)-এর পরিবার উহাতে আক্রান্ত হওয়ার বিষয় অবগত হওয়ার পরে এবং বৃদ্ধ ও পুত্র বৎসল পিতার প্রতি উদ্বেলিত আবেগের কারণে ইউসুফ (আ)-এর হৃদয়ে ভাইদের পুনরায় আগমনের চাহিদা সৃষ্টি হওয়া ছিল স্বভাবজাত ব্যাপার। এই চাহিদা পূরণের জন্য তিনি নিজের বদান্যতা ও অতিথিপরায়ণতার উল্লেখপূর্বক কনিষ্ঠ ভ্রাতাসহ ভাইদের পুনরাগমনের নির্দেশ প্রদান করিয়া লক্ষ্য সাধনের জন্য ব্যবস্থা সম্পন্ন করিলেন। সেই সংগে একটি গোপন ব্যবস্থা এইরূপ অবলম্বন করিলেন যে, ভাইয়েরা পণ্যমূল্য বাবত যাহা প্রদান করিয়াছিল তাহাও তাহাদের অজ্ঞাতসারে প্রত্যেকের খাদ্যের বস্তায় রাখিয়া দেওয়ার জন্য কর্মচারীদের আদেশ প্রদান করিলেন। পবিত্র কুরআনের ভাষায়:
وَقَالَ لِفِتْيْنِهِ اجْعَلُوا بِضَاعَتَهُمْ فِي رِجَالِهِمْ لَعَلَّهُمْ يَعْرِفُونَهَا إِذَا انْقَلَبُوا إِلَى أَهْلِهِمْ لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ .
"ইউসুফ তাহার ভৃত্যগণকে বলিল, উহারা যে পণ্যমূল্য দিয়াছে তাহা উহাদের মালপত্রের মধ্যে রাখিয়া দাও, যাহাতে স্বজনগণের নিকট প্রত্যাবর্তনের পর উহারা তাহা চিনিতে পারে, তাহা হইলে উহারা পুনরায় আসিতে পারে" (১২ ৪ ৬২)।
পণ্যমূল্য ফেরত প্রদানে ইউসুফ (আ)-এর অধিকার ও বৈধতার প্রশ্নের বিভিন্ন জবাব দেওয়া হইয়াছেঃ (১) সর্বোচ্চ নির্বাহী ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার কারণে এই ধরনের বদান্যতা ও অনুদান প্রদান ইউসুফ (আ)-এর অধিকারভুক্ত ছিল; (২) বিদেশী ও বিশিষ্টদের ক্ষেত্রে এইরূপ করিবার অধিকারের বৈধতা ছিল; (৩) পিতা ও ভাইদের নিকট হইতে খাদ্যমূল্য গ্রহণকে নীচতা মনে করিয়া ইউসুফ (আ) তাঁহার ব্যক্তিগত সম্পদ হইতে পণ্যমূল্য পরিশোধের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়াছিলেন।
পণ্য মূল্য প্রত্যর্পণে ইউসুফ (আ)-এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে মুফাসসিরগণ বিভিন্ন হিকমতের কথা উল্লেখ করিয়াছেন: (১) ইউসুফ (আ) তাঁহার পিতা ও ভাইদের নিকট হইতে (দুর্ভিক্ষ কালে) খাদ্যদ্রব্যের বিনিময় গ্রহণকে মানবিক আচরণের পরিপন্থী ও লজ্জাজনক মনে করিলেন। (২) ইউসুফ (আ)-এর মনে এইরূপ ধারণা উপস্থিত হইয়াছিল যে, সম্ভবত ইয়া'কূব পরিবারের নিকট পুনরায় খাদ্য ক্রয়ের জন্য প্রয়োজনীয় অথ- সম্পদ না থাকিবার কারণে তাহারা পুনরায় মিসর আগমন করিবে না অথবা অনেক বিলম্বে আগমন করিবে। সুতরাং বিনিময় মূল্যের সংস্থানের জন্য তাহাদের অর্থসম্পদ তাহাদিগকে ফিরাইয়া দেওয়া হইল। (৩) ভাইদের লজ্জিত না করিয়া তাহাদের প্রতি অনুগ্রহ করিতে চাহিলেন। কেননা প্রকাশ্যে ফেরত প্রদানে ভাইদের আত্মসম্মানে আঘাত লাগিবে বলিয়া সম্মত না হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। (৪) ইউসুফ (আ) তাঁহার বদান্যতা ও সহানুভূতির বিষয়টি ইয়া'কূব (আ)-এর মনে উদ্রেক করাইতে চাহিলেন, যাহাতে পিতা তাঁহার কনিষ্ঠতম পুত্রকে তাঁহার সৎ ভাইদের সহিত মিসর আগমনের অনুমতি প্রদানে উদ্বুদ্ধ হন এবং প্রয়োজনীয় সম্পদ হাতের কাছে আনিবার কারণে অবিলম্বে তাহাদের ফিরিয়া আসিবার সুযোগ সৃষ্টি হয় (ইবন কাছীর-বিদায়া, ১খ, ২১১; রূহুল মা'আনী, ১৩ পারা, ৮; মাজহারী, ৫খ, ১৭৭; মাআরিফুল কুরআন, মুফতী শফী, ৫খ, ৮৭; মাআরিফুল কুরআন, কান্ধলাবী, ৪খ, ৪৭)। মোটকথা, ইউসুফ (আ)-এর এইসব ব্যবস্থাপনার মূল লক্ষ্য ছিল ভবিষ্যতে ভাইদের আগমন ধারা অব্যাহত রাখিবার সূত্র তৈরি করা এবং সহোদর কনিষ্ঠ ভ্রাতার সহিত সাক্ষাত লাভের সুযোগ সৃষ্টি করা (মুফতী শফী, মা'আরিফ, ৫খ, ৮৭)।
📄 ইয়াকূব পুত্রগণের কান'আন প্রত্যাবর্তন
ইউসুফ ভ্রাতৃবর্গ পরবর্তী আগমন কালে কনিষ্ঠ ভ্রাতা বিনয়ামীনকে সংগে নিয়া আসিবার ব্যাপারে যথাসাধ্য চেষ্টার মাধ্যমে পিতাকে সম্মত করিবার বিষয়ে ইউসুফ (আ)-কে অংগীকার প্রদান করিল এবং উট বোঝাই খাদ্যসম্ভার নিয়া কান'আনের উদ্দেশ্য মিসর হইতে যাত্রা করিল। ইয়া'কূব পুত্রগণ রসদ-সম্ভার সহকারে কান'আনে প্রত্যাবর্তন করিল এবং সমগ্র পিতার সম্মুখে উপস্থিত হইয়া তাঁহাকে সালাম করিল এবং মিসরে অবস্থানকালীন তাহাদের সার্বিক অবস্থা, বাদশাহের তথ্যানুসন্ধান, তাঁহার সমাদর, আপ্যায়ন ও অতিশয় মহানুভবতা এবং সর্বশেষ বাদশাহ কর্তৃক পুনরায় মিসর গমনের আহবান ও তাহাদের সত্যবাদিতার প্রমাণস্বরূপ কনিষ্ঠ ভ্রাতা বিনয়ামীনকে সংগে নিয়া যাওয়ার ব্যাপারে বাদশাহের চূড়ান্ত শর্ত আরোপ এবং এতদ্বিষয়ে তাহাদের অংগীকার ইত্যাদি বৃত্তান্ত পিতাকে অবহিত করিল। কান'আন প্রত্যাবর্তনের পর পিতা ও পুত্রদের কথোপকথনের বর্ণনা পবিত্র কুরআনে নিম্নরূপ:
ফَلَمَّا رَجَعُوا إِلى أَبِيهِمْ قَالُوا بِأَبَانَا مُنِعَ مِنَّا الكَيْلُ فَأَرْسِلْ مَعَنَا أَخَانَا نَكْتَلْ وَإِنَّا لَهُ لَحٰفِظُونَ . قَالَ هَلْ امَنُكُمْ عَلَيْهِ إِلَّا كَمَا أَمِنْتُكُمْ عَلَى أَخِيهِ مِنْ قَبْلُ فَاللَّهُ خَيْرٌ حَافِظًا وَهُوَ أَرْحَمُ الرَّحِمِينَ.
"অতঃপর উহারা যখন উহাদের পিতার নিকট ফিরিয়া আসিল, তখন উহারা বলিল, হে আমাদের পিতা! আমাদের জন্য বরাদ্দ নিষিদ্ধ করা হইয়াছে। সুতরাং আমাদের ভ্রাতাকে আমাদের সহিত পাঠাইয়া দিন যাহাতে আমরা রসদ পাইতে পারি। আমরা অবশ্যই তাহার রক্ষণাবেক্ষণ করিব। সে বলিল, আমি কি তোমাদিগকে উহার সম্বন্ধে সেইরূপ বিশ্বাস করিব, যেরূপ বিশ্বাস পূর্বে তোমাদিগকে করিয়াছিলাম উহার ভ্রাতা সম্বন্ধে? আল্লাহই রক্ষণাবেক্ষণে শ্রেষ্ঠ এবং তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।”
তাফসীরবিদগণ এই সংক্ষিপ্ত বর্ণনার ব্যাখ্যায় বলিয়াছেন, পুত্ররা বলিল, আমরা এক মহান ব্যক্তির সান্নিধ্যে গিয়াছিলাম। আমাদের প্রতি তাঁহার সমাদর ও আপ্যায়ন ছিল এমন যে, ইয়া'কূব সম্প্রদায়ের কোন ব্যক্তিও আমাদিগকে তদ্রূপ আদর-আপ্যায়ন করিত না। মোটকথা, মিসরের বাদশাহ আমাদিগকে মর্যাদার সহিত বিদায় করিয়াছেন এবং আমরা রসদ নিয়া আসিয়াছি। ইয়া'কূব (আ) বলিলেন, তোমরা পুনরায় সেখানে গমন করিলে মিসর-রাজকে আমার সালাম পৌছাইবে এবং বলিবে, আমাদের পিতা আপনার মহানুভবতা ও বদ্যন্যতার জন্য আপনাকে দু'আ করিতেছেন। অতঃপর তিনি বলিলেন, তোমাদের সালামের আওয়াযে দুর্বলতা অনুভব করিতেছি কেন? শাম 'উনের আওয়ায পাইতেছি না কেন (রূহুল মা'আনী, ১৩ পারা, পৃ. ১১)? শাম'উন কোথায়? তাহারা বলিল, বাদশাহ তাহাকে আমাদের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য যামানতস্বরূপ রাখিয়া দিয়াছেন এবং পরবর্তীবারে বিনয়ামীনকে সাথে নিয়া যাওয়ার তাগিদ ও শর্ত আরোপ করিয়াছেন। অন্যথায় রসদ পাওয়া যাইবে না, বরং সমূহ বিপদের ব্যাপারে বাদশাহ আমাদিগকে সতর্ক করিয়া দিয়াছেন। এই কারণে এইবার বিনয়ামীনকে রসদ দেওয়া হয় নাই। পিতা বলিলেন, তোমরা বাদশাহকে বিনয়ামীনের কথা অবহিত করিলে কেন? তাহারা বলিল, সরকারের লোকেরা আমাদিগকে সন্দেহভাজন গুপ্তচররূপে গ্রেফতার করিয়া বাদশাহর দরবারে উপস্থিত করিয়াছিল এবং আমাদের ইবরানী ভাষাও বাদশাহকে সন্দিহান করিয়াছিল। সুতরাং আমরা আত্মরক্ষা ও. অভিযোগ মুক্তির জন্য আমাদের পারিবারিক পরিচিতি ও নবুওয়াত বংশধারার কথা এবং আমরা এক পিতার বার সন্তান হওয়ার কথাসহ আমাদের এক ভাই ইউসুফের হারাইয়া যাওয়ার কারণে পিতা কর্তৃক তাহার কনিষ্ঠ সহোদরকে নিজের নিকট রাখিয়া দেওয়া ইত্যাদি বিষয়ে বাদশাহকে অবহিত করিতে বাধ্য হইয়াছি। এখন বিনয়মীনকে সংগে নিয়া যাওয়া ব্যতীত পুনরায় রসদ পাওয়ার কোন উপায় নাই। আপনার মনের কোন শংকা তাহাকে পাঠাইবার ব্যাপারে অন্তরায় হইলে আমাদের সাধ্যের ত্রুটি করিব না এবং পথেঘাটে তাহার কোন কষ্ট-ক্লেশ হইবে না (মাজহারী, ৫খ, ১৭৭, ১৭৮; মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ, ৮৯, ৯০)। সুতরাং আপনি পুনর্গমনে তাহাকে সংগে নিয়া যাওয়ার অনুমতি দিন। বাইবেলের বর্ণনাও অনুরূপ (আদিপুস্তক, ৪২: ২৯-৩৪; বরাত তাফসীর মাজেদী, ৪৯৮, টীকা ১২০)।
পুত্রদের বক্তব্য শুনিয়া ইয়াকূব (আ) তাঁহার ধৈর্য ও অবিচলতায় স্থির থাকিয়া পুত্রদের শুধু এতটুকু বলিলেন, তোমরা তো ইতোপূর্বে ইউসুফের ব্যাপারে তোমাদের “আমরা অবশ্যই তাহার হিফাজত করিব” উক্তিটির পুনরাবৃত্তি করিলেন। অতএব তোমাদের উপর ভরসা করা যায় না। যেহেতু বিনয়ামীনকে সংগে না নিলে রসদ পাওয়া যাইবে না, তাই তিনি তাহাকে তাহাদের সঙ্গে পাঠাইতে সম্মত হইলেন এবং বলিলেন, আমি তাহার নিরাপত্তার ব্যাপারে আল্লাহর উপরই ভরসা করিতেছি (মুফতী শফী, মাআরিফুল কুরআন, ৫খ, ৯০, ৯১; ইবন কাছীর, তাফসীর, ২খ., ২৫৫)। এদিকে খাদ্যের বস্তা খুলিবার পর্ব চলিতেছিল। বস্তা খুলিবার পর তাহারা অবাক বিস্ময়ে দেখিল যে, খাদ্যশস্যের সঙ্গে উহার প্রদত্ত মূল্য ফেরত দেওয়া হইয়াছে। কুরআনের বর্ণনায় :
وَلَمَّا فَتَحُوا مَتَاعَهُمْ وَجَدُوا بِضَاعَتَهُمْ رُدَّتْ إِلَيْهِمْ قَالُوا لِأَبَانَا مَا نَبْغِى هذه بِضَاعَتُنَا رُدَّتْ إِلَيْنَا وَنَمِيرُ أَهْلَنَا وَنَحْفَظُ أَخَانَا وَنَزْدَادُ كَيْلَ بَعِيرٍ ذَلِكَ كَيْلٌ يُسِيرٌ .
"যখন উহারা উহাদের মালপত্র খুলিল তখন উহারা দেখিতে পাইল উহাদের পণ্যমূল্য উহাদিগকে প্রত্যর্পণ করা হইয়াছে। উহারা বলিল, হে আমাদের পিতা! আমরা আর কি প্রত্যাশা করিতে পারি? ইহা আমাদের প্রদত্ত পণ্যমূল্য, আমাদিগকে প্রত্যর্পণ করা হইয়াছে। পুনরায় আমরা আমাদের পরিবারবর্গকে খাদ্য-সামগ্রী আনিয়া দিব এবং আমরা আমাদের ভ্রাতার রক্ষণাবেক্ষণ করিব এবং আমরা অতিরিক্ত আর এক উষ্ট্র- বোঝাই পণ্য আনিব; যাহা আনিয়াছি তাহা পরিমাণে অল্প।"
ইহা দেখিয়া তাহাদের বিশ্বাস জন্মিল যে, এই প্রত্যর্পণ ভুলে হয় নাই, বরং ইহা ইচ্ছাকৃতভাবে করা হইয়াছে। ইহাতে পুনরায় অবিলম্বে খাদ্য আনিবার জন্য মিসর গমন সহজসাধ্য হইবে ভাবিয়া তাহারা উৎফুল্ল ও আনন্দিত হইয়া বিনয়ামীনকে সংগে নিয়া যাওয়ার অনুমতি প্রদানের জন্য পিতাকে পুন অনুরোধ করিল। এই পুঁজি প্রত্যর্পণ বাদশাহের মহানুভবতা ও বদান্যতার প্রমাণ বলিয়া পিতার দৃষ্টি আকর্ষণ করিল এবং নগদ পুঁজি হাতে আসিবার কারণে নূতন সংগ্রহে বিলম্বের প্রয়োজন নাই। তাই তাহারা অবিলম্বে বিনয়ামীনকে সংগে লইয়া পুনরায় বিধিমতে এক উটের বোঝা অধিক আনিতে পারে (মাআরিফুল কুরআন, ৫খ, ৯১, ৯২; মাজহারী, ৫খ, ১৭৮; কাসাসুল কুরআন, ১খ, ৩১৮; তাফসীরে মাজেদী, পৃ. ৪৯৯)। বাইবেলের বর্ণনায় পুঁজি দেখিয়া ইউসুফ-ভ্রাতৃবর্গ ও ইয়াকূব (আ) এই ভাবিয়া শঙ্কিত হইয়া পড়েন যে, ইহা আবার না কোন নূতন বিপদের কারণ হয় (আদিপুস্তক, ৪২: ৩৫)। প্রকৃতপক্ষে এই ধরনের কোন আশংকার কারণ ছিল না। কুরআনুল কারীমেও ইহার কোন উল্লেখ নাই। বস্তুত ইউসুফ ভ্রাতৃবর্গ নিজ হাতেই পণ্যমূল্য প্রদান করিয়াছিল এবং লেনদেন সম্পন্ন হওয়ার পরই তাহারা মিসর হইতে প্রস্থানের অনুমতি পাইয়াছিল। ইহা ছাড়া প্রত্যেকের বস্তায় স্বতন্ত্ররূপে পুঁজি প্রত্যর্পণ যে কোন জ্ঞানবান ব্যক্তিকে ইহা বুঝাইয়া দেওয়ার জন্য যথেষ্ট যে, এই প্রত্যর্পণ মিসর অবস্থানকালে কাফেলার সদস্যদের প্রতি মিসরের শাসনকর্তার বদ্যান্যতার পরিচায়ক; বরং ভাইদেরকে প্রত্যক্ষ অনুগ্রহের গ্লানি হইতে রক্ষা করিবার জন্য ইউসুফ (আ) গোপনে পুঁজি প্রত্যর্পণের ব্যবস্থা করিয়াছিলেন (কাসাসুল কুরআন, ১খ., ৩১৮, ৩১৯)। ইহা ছাড়া পবিত্র কুরআনের “ফিরাইয়া দেওয়া হইয়াছে” প্রত্যর্পণ করা শব্দটিও প্রত্যর্পণের বিষয়টি হওয়ার প্রমাণ বহন করে (মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ, ৯০)। দুর্ভিক্ষের বাস্তব পরিস্থিতিতে পণ্যমূল্যের নগদ উপস্থিতি এবং পুত্রদের বারংবার অনুরোধে ইয়া'কূব (আ) নমনীয় হইলেন এবং বিনয়ামীনকে মিসরে নিয়া যাওয়ার অনুমতি প্রদান করিলেন। তবে বাহ্য সতর্কতাস্বরূপ তিনি পুত্রদের নিকট হইতে বিনয়ামীনকে নিরাপদে ফিরাইয়া আনিবার দৃঢ় অঙ্গীকার নিলেন এবং বলিলেন:
قَالَ لَنْ أُرْسِلَهُ مَعَكُمْ حَتَّى تُؤْتُونِ مَوْثِقًا مِّنَ اللهِ لَتَأْتُنَّنِي بِهِ إِلَّا أَنْ يُحَاطَ بِكُمْ فَلَمَّا اتَوهُ مَوْثِقَهُمْ قَالَ اللَّهُ عَلَى مَا نَقُولُ وَكِيلٌ .
"পিতা বলিল, আমি উহাকে কখনই তোমাদের সহিত পাঠাইব না যতক্ষণ না তোমরা আল্লাহর নামে অঙ্গীকার কর যে, তোমরা উহাকে আমার নিকট লইয়া আসিবেই, অবশ্য যদি তোমরা একান্ত অসহায় হইয়া না পড়। অতঃপর যখন উহারা তাহার নিকট প্রতিজ্ঞা করিল তখন সে বলিল, আমরা যে বিষয়ে কথা বলিতেছি, আল্লাহ্ তাহার বিধায়ক” (১২ঃ ৬৬)।
বাইবেলে শপথ অনুষ্ঠানটির বর্ণনা নিম্নরূপ: তাহাদের পিতা ইয়া'কূব তাহাদিগকে বলিলেন, তোমরা তো আমাকে সন্তানহারা করিয়া ফেলিলে; ইউসুফ নেই, শাম'উন নেই; আর এখন তোমরা বিনয়ামীনকেও নিয়া যাইবে। এইসব আমার ইচ্ছা বিরুদ্ধ বিষয়। তখন রুবেন পিতাকে লক্ষ্য করিয়া বলিল, আমি তাহাকে আপনার নিকট ফিরাইয়া না আনিলে আমার সন্তান দুইটিকে মারিয়া ফেলিবেন। উহাকে আমার হাতে সোপর্দ করুন, আমি তাহাকে পুনরায় আপনার নিকট নিয়া আসিব (আদিপুস্তক, ৪২: ৩৬-৩৭)।
📄 মিসর অভিমুখে ইউসুফ ভ্রাতৃবর্গের দ্বিতীয় সফর
পুত্রদের যথাযথ শপথ ও অংগীকারের পর সমগ্র বিষয়টিকে আল্লাহ তা'আলার উপর ন্যস্ত করিয়া ইয়া'কূব (আ) একদিকে আল্লাহকে সাক্ষী রাখিলেন, যাহাতে পুত্রগণ এই অংগীকার রক্ষার প্রতি যত্নবান থাকে, অন্যদিকে পুত্রদের বুঝাইয়া দিলেন যে, আল্লাহর ইচ্ছা ও তওফীক ছাড়া কাহারও নিরাপত্তা বিধান সম্ভব হয় না (মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., ৯২; তাফসীরে মাজেদী, পৃ. ৪৯৯; কাসাসুল কুরআন, ১খ., ৩১৯)। এ প্রসংগে বাইবেলের আর একটি বর্ণনা নিম্নরূপ : তখন যিহুদা স্বীয় পিতা ইসরাঈলকে কহিল, এই যুবাকে আমার সহিত প্রেরণ করুন। তবে আমরা উদ্যত হই ও প্রস্থান করি; তবেই আমরা এবং আপনি এবং আমাদের সন্তানরা বাঁচিবে, মরিবে না। আর আমি তাহার যামিন হইতেছি, আপনি আমার নিকটেই তাহাকে তলব করিবেন। আমি তাহাকে আপনার সমীপে আনয়ন না করিলে এবং তাহাকে আপনার সম্মুখে উপবিষ্ট না করিলে এই পাপ চিরকাল আমার ঘাড়ে থাকিবে। (আদিপুস্তক, ৪৩: ৮৯)।
কা'ব আহবার (রা) বলিয়াছেন, ইয়া'কূব (আ) শুধু সন্তানের শপথের উপর ভরসা না করিয়া বিষয়টি আল্লাহর উপর সোপর্দ করিলে আল্লাহ তা'আলা বলিলেন, আমার ইজ্জত ও মাহাত্ম্যের কসম! এখন যেহেতু আমার উপর ভরসা করিয়াছ, সুতরাং আমি তাহার হিফাজত করিব এবং তাহাদের দুইজনকেই (ইউসুফ ও বিনয়ামীন) তোমার নিকট ফিরাইয়া দিব (মাজহারী, ৫খ, ১৭৯; মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ, ৯৩, ৯৪)।
পিতার সম্মতি নিয়া যখন ইয়া'কূব পুত্রগণ কনিষ্ঠ ভ্রাতা বিনয়ামীনসহ দ্বিতীয়বার রসদ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে মিসর অভিমুখে প্রস্থানের প্রস্তুতি গ্রহণ করিল তখন বিদায়কালে স্নেহময় পিতা একটি বিশেষ নিয়মে মিসরে প্রবেশ করিবার জন্য উপদেশ দিলেন। তিনি বলিলেন, কুরআনের ভাষায়:
وَقَالَ يبَنِي لَا تَدْخُلُوا مِنْ بَابٍ وَاحِدٍ وَادْخُلُوا مِنْ أَبْوَابٍ مُتَفَرِّقَةٍ وَمَا أَغْنِي عَنْكُمْ مِنَ اللَّهِ مِنْ شَيْءٍ إِن الحكم إلا الله عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَعَلَيْهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُتَوَكِّلُونَ . وَلَمَّا دَخَلُوا مِنْ حَيْثُ أَمَرَهُمْ أَبُوهُمْ مَا كَانَ يُغْنِي عَنْهُمْ مِنَ اللَّهِ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا حَاجَةً فِي نَفْسٍ يَعْقُوبَ قَضْهَا وَإِنَّهُ لَذُو عِلْمٍ لِمَا عَلَّمْنْهُ وَلَكِنْ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ .
"সে বলিল, হে আমার পুত্রগণ! 'তোমরা এক দ্বার দিয়া প্রবেশ করিও না, ভিন্ন ভিন্ন দ্বার দিয়া প্রবেশ করিবে। আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধে আমি তোমাদের জন্য কিছু করিতে পারি না। বিধান আল্লাহ্রই। আমি তাঁহারই উপর নির্ভর করি এবং যাহারা নির্ভর করিতে চাহে তাহারা আল্লাহ্ই উপর নির্ভর করুক।' যখন তাহারা, তাহাদের পিতা তাহাদিগকে যেভাবে আদেশ করিয়াছিল, সেইভাবেই প্রবেশ করিল, তখন আল্লাহ্র বিধানের বিরুদ্ধে উহা তাহাদের কোন কাজে আসিল না। ইয়া'কূব কেবল তাহার মনের একটি অভিপ্রায় পূর্ণ করিয়াছিল এবং সে অবশ্যই জ্ঞানী ছিল। কারণ আমি তাহাকে শিক্ষা দিয়াছিলাম। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ ইহা অবগত নহে” (১২ঃ ৬৭-৬৮)।
তখনকার দিনে শত্রুর আক্রমণ হইতে রক্ষার জন্য নগরসমূহ প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত থাকিত এবং নগরে প্রবেশ ও যাতায়াতের জন্য প্রাচীর গাত্রে বিভিন্ন ফটক ও তোরণ থাকিত। ঐতিহাসিক বর্ণনামতে তখন মিসরে প্রবেশের জন্য প্রধান তোরণ ছিল চারটি (রূহুল মা'আনী, ১৩ পারা, পৃ. ১৯; মাজহারী, ৫খ, ১৮০)। এক তোরণ দিয়া সদলবলে প্রবেশ করিবার পবিবর্তে বিভিন্ন নগর তোরণ দিয়া প্রবেশ করিবার উপদেশ দানের কারণ ছিল পিতার মনের একটি আকুতি। তাহা ছিল সুঠামদেহী সুদর্শন পুত্রদিগকে বদ লোকদের কুদৃষ্টি' হইতে রক্ষা করা কিংবা তাহাদিগকে মিসরবাসীদের বিদ্বেষ ও হিংসার কোপানল হইতে রক্ষা করা (তাফসীরে মাজেদী, পৃ. ৪৯৯)। ইহা ছাড়া প্রথমবারের সফরে মিসরের (বিদেশী') শাসক কর্তৃক এই বিদেশী কাফেলাকে বিশেষ সমাদর ও আপ্যায়নের পর দ্বিতীয়বার মিসর প্রবেশকালে এই দর্শনীয় কাফেলাটির জোটবদ্ধ প্রবেশ দ্বারা মিসরবাসীদের হিংসার মনোবৃত্তিকে চাংগা করিয়া দেওয়ার আশংকাও বিদ্যমান ছিল। ইহা ছাড়া কাফেলার সহিত বিনয়ামীনের অবস্থান পিতার জন্য অধিক দুশ্চিন্তার কারণ ছিল। বিভিন্ন দরজা দিয়া পৃথক পৃথক প্রবেশ ছিল এইসব বিপদাপদ হইতে রক্ষামূলক ব্যবস্থা। ইহা ছাড়া এইবার প্রবেশ করিবার ক্ষেত্রে বাদশাহের দরবারে উপনীত হওয়ার পূর্বেই হিংসুটে সরকারী কর্মচারীদের দ্বারা গুপ্তচর অভিযোগে ধৃত হইয়া লাঞ্ছনা-গঞ্জনা ও গ্লানি ভোগের আশংকাও বিদ্যমান ছিল। মোটকথা, হিংসুকের কোপানল ও দুষ্ট লোকের বদনজর হইতে রক্ষা করিবার জন্য পিতার স্নেহ-বাৎসল্য তাঁহাকে এই উপদেশ দানে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিল (রূহুল মা'আনী, ১৩ পারা, ১৮; মাজহারী, ৫খ, ১৮০ তাফসীরে মাজেদী, পৃ. ৪৯৯; মাআরিফুল কুরআন, ৫খ, ৯৫-৯৯; কাসাসুল কুরআন, ১খ, ৩২০)।
পিতার আদেশ অনুসারে এগার ভাইয়ের এই কাফেলা নগরের বিভিন্ন তোরণ দিয়া মিসরে প্রবেশ করিল এবং রাজদরবারে উপস্থিত হইয়া ইউসুফ (আ)-এর নিকট নিবেদন করিল, মহাত্মন! এই আমাদের সেই ভাইটি, যাহাকে সাথে আনার জন্য আপনি আদেশ দিয়াছিলেন। ইউসুফ (আ) বলিলেন, তোমরা যথার্থ ও উত্তম কাজ করিয়াছ; তোমরা আমার পক্ষ হইতে উহার সুফল লাভ করিবে। এই সময় তাহারা বাদশাহকে তাহাদের পিতার সালাম ও দু'আসম্বলিত পয়গাম পৌছাইল। কোন কোন বর্ণনামতে এই পয়গাম লিখিত পত্ররূপে ছিল এবং ইউসুফ (আ) উহা পাঠ করিয়া ক্রন্দন করিয়াছিলেন (রূহুল মা'আনী, ১৩ পারা, পৃ. ২৩)。 অতঃপর মিসর শাসকের আদেশে এই কাফেলাকে রাজকীয় মেহমানের মর্যাদায় অবস্থানের ব্যবস্থা করা হইল। আপ্যায়ন কালে একসংগে দুইজনের বসিবার ব্যবস্থা করা হইলে দশ ভাই জোড়ায় জোড়ায় উপবেশন করিল এবং বিনয়ামীন একাকী রহিয়া গেল। সে কাঁদিতে কাঁদিতে বলিল, আজ আমার ভাই বাঁচিয়া থাকিলে আমরা দুইজন একসংগে বসিতাম। এই সময় ইউসুফ (আ) বলিলেন, তোমাদের এই ভাইটি তো একা পড়িয়া গেল। ভাইয়েরা বলিল, তাহারও একটি সহোদর ভাই ছিল, যে নিরুদ্দেশ হইয়া গিয়াছে। তখন ইউসুফ (আ) বিনয়ামীনকে নিজের সহিত বসাইয়া একত্রে আহার করিলেন। রাত্রি যাপনের জন্যও অনুরূপ ব্যবস্থা গৃহীত হইল এবং দুই দুইজনের জন্য একটি করিয়া কক্ষ বরাদ্দ করা হইলে বিনয়ামীন একাকী রহিয়া গেল। ইউসুফ (আ) বলিলেন, ঠিক আছে, সে আমার সহিত রাত্রি যাপন করিবে। সুতরাং বিনয়ামীন ইউসুফ (আ)-এর সহিত রাত্রিযাপন করিল। ইউসুফ (আ) তাঁহার স্নেহের সহোদর ভাইকে আলিংগন করিলেন এবং তাহার ঘ্রাণ নিতে লাগিলেন। পরদিন সকালে ইউসুফ (আ) মেহমানদের অবস্থান ও আপ্যায়নের স্বতন্ত্র ব্যবস্থা করিবার আদেশ প্রদান করিলেন এবং বিনয়ামীনের ব্যাপারে ভাইদিগকে বলিলেন, তোমাদের এই লোকটি দেখছি সংগীহীন; সুতরাং সে আমার সহিতই অবস্থান করিবে। অবস্থা দেখিয়া রূবেন মন্তব্য করিল, এমন তাজ্জব ঘটনা তো কখনও দেখি নাই। পরবর্তী সময়ে ইউসুফ (আ) বিনয়ামীনের সহিত একান্তে আলাপ করিলেন এবং আত্মপরিচয় প্রকাশ করিয়া ছোট ভাইকে সান্ত্বনা প্রদান করিলেন। পবিত্র কুরআনের ভাষায় :
وَلَمَّا دَخَلُوا عَلَى يُوسُفَ أَوَى إِلَيْهِ أَخَاهُ قَالَ إِنِّي أَنَا أَخُوكَ فَلَا تَبْتَئِسُ بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ .
"উহারা যখন ইউসুফের সম্মুখে উপস্থিত হইল, তখন ইউসুফ তাহার সহোদরকে নিজের কাছে রাখিল এবং বলিল, নিশ্চয় আমিই তোমার সহোদর। সুতরাং উহারা যাহা করিত তাহার জন্য দুঃখ করিও না" (১২ঃ ৬৯)।
ইউসুফ (আ) বিনয়ামীনের নিকট তাহার সন্তান-সন্তুতি সম্পর্কে জানিতে চাহিলেন। বিনয়ামীন বলিল, আমার দশ পুত্র। আমি আমার হারানো ভাইয়ের নামের সহিত মিল রাখিয়া তাহাদের প্রত্যেকের নাম রাখিয়াছি। ইউসুফ (আ) বলিলেন, তোমার হারানো ভাইয়ের স্থানে আমাকে ভাইরূপে বরণ করিতে তুমি পছন্দ করিবে? বিনয়ামীন বলিল, হৃদয়বান বাদশাহ! আপনার ন্যায় ভাই পাওয়া যে কোন মানুষের জন্য সৌভাগ্যের ব্যাপার। কিন্তু আপনি তো আর ইয়া'কূবের ঔরসে ও রাহীলের গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন নাই! তখন ইউসুফ (আ) কাঁদিয়া ফেলিলেন এবং দাঁড়াইয়া ভাইকে বুকে জড়াইয়া ধরিয়া আত্মপরিচয় প্রকাশ করিয়া বলিলেন, আমিই তোমার সেই ভাই... আমাদের প্রতি আল্লাহ তা'আলার পরম অনুগ্রহ যে, অপ্রত্যাশিতরূপে তিনি আমাদের সম্মিলন ঘটাইয়াছেন। সুতরাং আমাদের কর্তব্য তাঁহার শোকর আদায় করা এবং ভাইদের কৃত সকল দুর্ব্যবহার ও নির্যাতনের কথা ভুলিয়া যাওয়া। তবে তুমি তাহাদিগকে বিষয়টি এখনই অবহিত করিও না (রূহুল মা'আনী, ১৩ পারা, পৃ. ২৩; মাজহারী, ৫খ, ১৮০, ১৮১; মুফতী শফী, মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ, ৯৬, ৯৯; কান্ধলাবী, মা'আরিফুল কুরআন, ৪খ, ৫১)।
ভাইদের দুর্ব্যবহার সম্পর্কে মুফাসসির ও ঐতিহাসিকগণ বলিয়াছেন যে, ইউসুফ (আ)-এর প্রতি নির্যাতন ও দুর্ব্যবহারের বিষয়টি তো সর্বজনবিদিত। আর বিনয়ামীনের জন্য প্রিয়তম ও স্নেহপ্রবণ ভাইয়ের নিরুদ্দেশ হওয়া কম দুঃখের বিষয় নয়। তদুপরি বিনয়ামীনকে সব সময় ভাইদের ব্যাপারে শংকিত থাকিতে হইত এবং পিতার অতিরিক্ত ভালবাসার জন্য গালমন্দ শুনিতে হইত। মিসর যাওয়ার পথেও ভাইয়েরা তাহাকে 'পিতার আদরের ধন', 'নয়নের পুত্তলি' এবং 'মিসর সম্রাটের কাংখিত ব্যক্তি', 'রাজকীয় বিশেষ মেহমান' ইত্যকার কটাক্ষপূর্ণ উক্তির মাধ্যমে উত্যক্ত করিত (মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ, ১০৮; কাসাসুল কুরআন, ১খ, ৩২১)। বিনয়ামীনের এ সব উক্তির কোন জবাব দিত না।