📄 রাষ্ট্রীয় নির্বাহী পদে ইউসুফ (আ)
প্রথমত হযরত ইউসুফ (আ)-এর প্রতি দরবারী সাকীর অপরিসীম ভক্তি-শ্রদ্ধা এবং তাহার মুখে ইউসুফ (আ)-এর বুদ্ধিমত্তা ও গুণাবলীর কথা শুনিয়া বাদশাহর মনে ইউসুফ (আ) সম্পর্কে আগ্রহ সৃষ্টি হইয়াছিল। অতঃপর বাদশাহ্র জটিল ও দুর্বোধ্য স্বপ্নের যথার্থ ও গ্রহণযোগ্য তা'বীর এবং উহার সহিত স্বেচ্ছাপ্রণোদিতরূপে ইউসুফ (আ) কর্তৃক প্রদত্ত 'দুর্ভিক্ষ নিয়ন্ত্রণ মহাপরিকল্পনা'-র কথা শুনিয়া বাদশাহ তাঁহার প্রতি অধিক আকৃষ্ট হইয়া এবং নিজ কানে স্বপ্নের ব্যাখ্যা শুনিবার জন্য তাঁহাকে রাজ- দরবারে আসিবার আহ্বান জানান।
বাদশাহ ইউসুফ (আ)-কে রাজদরবারে বিশেষ রাজকীয় সম্মান প্রদান ও নিজের একান্ত উপদেষ্টা পদে বরণের ঘোষণাসহ তাঁহার সম্মানে কারামুক্তির ফরমান জারী করিলেন এবং ইউসুফ (আ)-কে আনিবার জন্য বিশেষ দূত পাঠাইলেন (ফী জিলালিল কুরআন, ৫খ., ১৮, ১৯; কাসাসুল কুরআন, ১খ., ৩১২)। পবিত্র কুরআনের বর্ণনায় : وَقَالَ الْمَلِكُ ائْتُونِي بِهِ أَسْتَخْلِصُهُ لِنَفْسِي فَلَمَّا كَلَّمَهُ قَالَ إِنَّكَ الْيَوْمَ لَدَيْنَا مَكِينٌ أَمِينٌ. قَالَ اجْعَلْنِي عَلَى خَزَائِنِ الْأَرْضِ إِنِّي حَفِيظٌ عَلِيمٌ. وَكَذَلِكَ مَكَّنَا لِيُوسُفَ فِي الْأَرْضِ يَتَبَوا مِنْهَا حَيْثُ يَشَاءُ نُصِيبُ بِرَحْمَتِنَا مَنْ نَشَاءُ وَلَا نُضِيعُ أَجْرَ الْمُحْسِنِينَ . وَلَأَجْرُ الآخِرَةِ خَيْرٌ لِلَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ.
"রাজা বলিল, ইউসুফকে আমার নিকট লইয়া আইস, আমি তাহাকে আমার একান্ত সহচর নিযুক্ত করিব। অতঃপর রাজা যখন তাহার সহিত কথা বলিল তখন বলিল, আজ তুমি আমাদের নিকট মর্যাদাশীল, বিশ্বাসভাজন হইলে। ইউসুফ বলিল, আমাকে দেশের ধনভাণ্ডারের উপর কর্তৃত্ব প্রদান করুন, আমি তো উত্তম রক্ষক, সুবিজ্ঞ। এইভাবে ইউসুফকে আমি সেই দেশে প্রতিষ্ঠিত করিলাম; সে সেই দেশে যথা ইচ্ছা অবস্থান করিতে পারিত। আমি যাহাকে ইচ্ছা তাহার প্রতি দয়া করি; আমি সৎকর্মপরায়ণদের শ্রমফল নষ্ট করি না। যাহারা মু'মিন এবং মুত্তাকী তাহাদের আখিরাতের পুরস্কারই উত্তম" (১২ঃ ৫৪-৫৭)।
রাজকীয় বার্তাবাহক জেলখানায় পৌঁছিয়া ইউসুফ (আ)-কে বলিল, বাদশাহের আহ্বানে সাড়া দিন। আযীযের স্ত্রী ও নারীরা এক বাক্যে আপনার পবিত্রতা স্বীকার করিয়াছে এবং বাদশাহ আপনার সসম্মান মুক্তির ফরমান সহকারে আমাকে পাঠাইয়াছেন। তিনি আপনার সাক্ষাতের জন্য অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষার প্রহর গণনা করিতেছেন। ইউসুফ (আ) গোসল করিয়া পরিচ্ছন্ন হইলেন এবং নূতন পোশাক পরিধান করিয়া রাজ-দরবারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করিলেন। বাহির হওয়ার সময় তিনি কারাগার তোরণে লিখিয়া আসলেন:
"ইহা জীবন্তদের গোরস্থান, দুঃখ-কষ্টের আবাসস্থল, বন্ধুদের পরীক্ষাগার ও শত্রুদের মনের খুশি লাভের স্থান"।
ওয়াহ্হ্ব (র) বলিয়াছেন, রাজভবনের দরজায় পৌঁছিয়া তিনি দু'আ করিলেন:
"আমার দুনিয়ার ব্যাপারে আমার পালনকর্তাই আমার জন্য যথেষ্ট; আমার পালনকর্তাই তাঁহার সমগ্র সৃষ্টির বিপরীতে আমার জন্য যথেষ্ট; তাঁহার আশ্রয় লাভই পূর্ণাঙ্গ সুরক্ষা, তাঁহার প্রশংসা মহিয়ান এবং তিনি ব্যতীত আর কোন ইলাহ নাই"।
রাজভবনে প্রবেশের পর দরবারে পৌঁছিয়াও তিনি অনুরূপ দু'আ করিলেন। বাদশাহকে দেখিয়া তিনি দু'আ করিলেন:
اسئلك بخيرك من خيره واعوذ بك من شره وشرغيره
"ইয়া আল্লাহ! আমি আপনার নিকট তাহার কল্যাণ হইতে আপনার কল্যাণ প্রার্থনা করিতেছি এবং তাহার অনিষ্ট ও অন্যদের অনিষ্ট হইতে আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করি"।
বাদশাহ তাঁহার দিকে দৃষ্টিপাত করিলে তিনি আরবী ভাষায় সালাম করিলেন। বাদশাহ জিজ্ঞাসা করিলেন, ইহা কোন ভাষা? ইউসুফ (আ) বলিলেন, আমার 'চাচা' ইসমা'ঈল (আ)-এর ভাষা। অতঃপর ইউসুফ (আ) 'ইবরানী (হিব্রু) ভাষায় বাদশাহর জন্য দু'আ করিলে বাদশাহ বলিলেন, ইহা কোন ভাষা? ইউসুফ (আ) বলিলেন, ইহা আমার পিতৃপুরুষদের ভাষা। ওয়াহ্ব (র) আরও বলিয়াছেন, বাদশাহ সত্ত্বরটি ভাষা জানিতেন এবং এইগুলির যে কোন ভাষায় বাদশাহ কথা বলিলে ইউসুফ (আ) সে ভাষায়ই জবাব দিতেন। অধিকন্তু তিনি আরবী ও 'ইবরানী ভাষায় দ্বারা তাঁহার অধিক ভাষা জ্ঞানের প্রমাণ রাখিলেন। বাদশাহ অল্পবয়সেই (৩০ বৎসর বয়সে) ইউসুফ (আ)-এর বিদ্যা-বুদ্ধি, জ্ঞান-গরিমা দৃষ্টে মুগ্ধ হইলেন। বাদশাহ বলিলেন, অদ্য হইতে তুমি আমাদের নিকট মর্যাদা ও বিশ্বস্ততার পাত্র। তোমার যোগ্যতা ও গুণাবলী দেখিয়া আমরা অভিভূত (তাফসীরে মাজহারী, ৫খ., ১৭২; মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., ৭৫; আল-কামিল, ১খ, ১১১)। ইউসুফ (আ) শুধু কারাজীবন হইতেই মুক্তিলাভ করিলেন না, বরং তিনি স্বীয় যোগ্যতা, প্রতিভা, সদগুণাবলীর অকুণ্ঠ স্বীকৃতি হিসাবে রাজকীয় সম্মান ও মর্যাদার আসনেও অভিষিক্ত হইলেন। তিনি কুরআনের ভাষায় রাজদরবারে مكين أمين অর্থাৎ মর্যাদাশীল, বিশ্বাসভাজন খেতাবেও ভূষিত হইলেন (ফী জিলালিল কুরআন, ৫খ., ২০)।
অতঃপর বাদশাহ দুর্ভিক্ষের মহাসংকট সম্পর্কে ইউসুফ (আ)-এর নিকট পরামর্শ চাহিয়া বলিলেন, এখন আমাদিগকে কি করিতে হইবে তাহা বলুন। ইউসুফ (আ) বলিলেন, প্রথম যে সাত বৎসর প্রচুর বৃষ্টি হইবে এই বৎসরগুলিতে আপনি অধিক পরিমাণ চাষাবাদ ও ফসল উৎপাদনের পরিকল্পনা গ্রহণ করুন এবং সমগ্র দেশবাসীকে তাহাদের নিজ নিজ জমিতে অধিকতর পরিমাণে চাষাবাদ করিবার আদেশ জারী করুন। অতঃপর উৎপাদিত ফসল ডাঁটা ও শীষসহ গুদামজাত করিবার ব্যবস্থা করুন। ডাঁটা ও শীষ পশুর খাবারের চাহিদা মিটাইবে এবং শস্যবীজ পোকায় ধরিয়া নষ্ট হইবে না। জনসাধারণকে আদেশ দিবেন যে, তাহারা যেন উৎপাদিত ফসলের এক-পঞ্চমাংশ সংরক্ষণ করিয়া রাখে। এইরূপ করিলে মিসর ও পার্শ্ববর্তী দেশের অধিবাসীদের নিকট দুর্ভিক্ষের বৎসরগুলির জন্য ভাণ্ডার সঞ্চিত হইবে এবং তাহাদের ব্যাপারে আপনার দুশ্চিন্তা লাঘব হইবে। আর সরকারী খাসভূমির উৎপাদন ও আদায়কৃত রাজস্ব হইতে যে ফসল সংগৃহীত হইবে উহা আপনি বহিরাগতদের জন্য খাদ্য সঞ্চিত রাখিবেন। কেননা এই দুর্ভিক্ষ মিসরের বাহিরেও দূর-দূরান্ত পর্যন্ত বিস্তার লাভ করিবে এবং ভিন দেশের লোকেরা তখন রেশন ও সাহায্য পাওয়ার জন্য আপনার শরণাপন্ন হইবে। তখন আপনি ফসল বিতরণ করিয়া আল্লাহর সৃষ্টির সেবা করিতে পারিবেন এবং যৎসামান্য বিনিময় মূল্য গ্রহণ করিয়া সরকারী কোষাগারকে সমৃদ্ধ করিতে পারিবেন। আপনার কোষাগারে তখন এত সম্পদ সঞ্চিত হইবে, যাহা ইতোপূর্বে কখনও কাহারও নিকট হয় নাই (মা'আরিফুল কুরআন, ৪খ., ৭৬; মাজহারী, ৫খ., ১৭৩)।
ইউসুফ (আ)-এর পরামর্শ শুনিয়া বাদশাহ অত্যন্ত আনন্দিত ও নিশ্চিন্ত হইয়া বলিলেন, তবে এই মহা পরিকল্পনা কিরূপে বাস্তবায়িত হইবে এবং কে আমার পক্ষে এই বোঝা বহন করিবে? বাদশাহর এই আবেগপূর্ণ প্রশ্নের জবাবে তাহাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্যই ইউসুফ (আ) বলিয়াছিলেন, আমাকে রাষ্ট্রীয় ভাণ্ডারের দায়িত্ব দিতে পারেন। আমি যথাযথ সংরক্ষণ ও তত্ত্বাবধান করিতে পারিব এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিশ্বস্ততার পরিচয় দিতে পারিব। ইউসুফ (আ) তাঁহার বক্তব্যে দুইটি শব্দ حفیظ ও علیم উল্লেখ করিয়া একজন সরকারী দায়িত্বশীল, বিশেষত অর্থ-সম্পদ ও রাষ্ট্রীয় ভাণ্ডারের পদাধিকারী ব্যক্তির জন্য অপরিহার্য গুণাবলীর উল্লেখ করিয়াছিলেন। কেননা রাষ্ট্রীয় সম্পদ ভাণ্ডারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির প্রথম কর্তব্য হইতেছে সরকারী সম্পদ অহেতুক ব্যয় ও বিনষ্ট না করিয়া উহার পূর্ণাঙ্গ সংরক্ষণ করা এবং অযোগ্য পাত্রে ও ক্ষেত্রে অপচয় করা হইতে রক্ষা করা। দ্বিতীয় কর্তব্য আয়-ব্যয়ের যথাযথ হিসাব সুষ্ঠু ও সুচারুরূপে সংরক্ষণ করা। حفیظ শব্দ দ্বারা প্রথম বিষয়টি এবং علیم শব্দ দ্বারা দ্বিতীয় বিষয়টির নিশ্চয়তা বিধান করা হইয়াছে। (মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., ৭২, ৭৭)।
এই পদ ও ক্ষমতাকে আল্লাহ তা'আলার বিধান কার্যকর করা, সত্য প্রতিষ্ঠা করা, ন্যায়-ইনসাফের বিস্তার ঘটানো অর্থাৎ পৃথিবীতে নবী পাঠাইবার মুখ্য উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের পথ সুগম করিবার লক্ষ্যে হযরত ইউসুফ (আ) এ ক্ষেত্রে নিজের বিশ্বস্ততা ও কর্তব্য সম্পাদনে দক্ষতার গুণের কথা উল্লেখ করিয়া রাষ্ট্রীয় পদের প্রার্থী হইয়াছিলেন। কেননা তিনি জানিতেন যে, ঐ মুহূর্তে তাঁহার স্থলে দায়িত্ব পালনের যোগ্য অন্য কেহ নাই। সুতরাং তাঁহার ক্ষমতার পদপ্রার্থী হওয়া শুধু আল্লাহ্ সন্তুষ্টি অন্বেষণের জন্যই ছিল, পার্থিব হীন স্বার্থ বা যশ-মর্যাদা লাভের জন্য নহে। বায়দাবী বলিয়াছেন, এমনও হইতে পারে যে, ইউসুফ (আ) যখন বুঝিতে পারিলেন যে, বাদশাহ অবশ্যই তাঁহাকে কোন দায়িত্বে নিযুক্ত করিবেন, তখন তিনি সর্বাধিক জনকল্যাণমূলক দায়িত্ব গ্রহণের প্রার্থী হইলেন (মাজহারী, ৫খ, ১৭৩)।
বাদশাহ ইউসুফ (আ)-এর যোগ্যতা ও গুণাবলী এবং বিশ্বস্ততা ও পূর্ণ বুদ্ধিমত্তা দেখিয়া তাঁহার প্রতি আকৃষ্ট হইলেও রাষ্ট্র পরিচালনায় তৎক্ষণাত ইউসুফ (আ)-কে রাষ্ট্রীয় সম্পদভাণ্ডারের দায়িত্ব অর্পণ করিলেন না, বরং তাঁহাকে রাষ্ট্রীয় সম্মানিত মেহমানের মর্যাদায় রাজবাটির খাসমহলে রাখিলেন এবং নিকট হইতে তাঁহার স্বভাব-চরিত্র, আচার-আচরণ ও বাস্তব যোগ্যতা-পারদর্শিতা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করিলেন (মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., ৭৭, ৮১)। এ প্রসংগে বাগাবী ইবন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন, তিনি বলেন:
رحم الله اخي يوسف لو لم يقل اجعلني على خزائن الارض لاستعمله من ساعته
" আমার ভাই ইউসুফ (আ)-কে আল্লাহ রহম করুন। তিনি "আমাকে ভূমিজাত সম্পদের দায়িত্ব দিন" না বলিলে বাদশাহ ঐ সময়ই তাঁহাকে মন্ত্রিত্বে নিযুক্ত করিত" কিন্তু তিনি উহা এক বৎসর বিলম্বিত করিয়া রাখিলেন এবং বাদশাহের ভবনে নিজের সহিত তাঁহাকে রাখিয়া দিলেন।
📄 মিসরের সম্পদ ভাণ্ডারের মন্ত্রিত্ব পদে ইউসুফ (আ)
এক বৎসর পর্যবেক্ষণের পর ইউসুফ (আ)-এর চারিত্রিক গুণাবলী সম্পর্কে সম্পূর্ণ নিশ্চিত হইয়া বাদশাহ তাঁহাকে রাষ্ট্রীয় ভাণ্ডারের দায়িত্বে নিযুক্ত করিলেন এবং এতদুদ্দেশে একটি অভিষেক অনুষ্ঠানের আয়োজন করিলেন। এই অনুষ্ঠানে সকল উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মচারী ও রাষ্ট্রের বরেণ্য ব্যক্তিবর্গকে আমন্ত্রণ করা হইল। ইউসুফ (আ)-এর মাথায় মুকুট পরাইয়া তাঁহাকে অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত করা হইল এবং শুধু ভাণ্ডারের দায়িত্ব নয়, বরং বাদশাহ সমস্ত রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব তাঁহার উপর অর্পণ করিয়া অবসর জীবন যাপন করিতে লাগিলেন (কুরতুবীর বরাতে মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ, ৮১)। বাগাবী ইবন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণনা করেন যে, বাদশাহ ইউসুফ (আ)-এর কাঁধে তরবারি ঝুলাইয়া দিলেন এবং মুক্তা ও পান্না খচিত স্বর্ণের সিংহাসন স্থাপন করিয়া উহাকে রেশমীবস্ত্রের ঝালর দ্বারা আচ্ছাদিত করিলেন। অতঃপর ইউসুফ (আ)-কে দরবার হলে উপস্থিত হইতে বলা হইলে তিনি মুকুট পরিহিত অবস্থায় বাহির হইলেন। তখন তাঁহার বর্ণ ছিল বরফের ন্যায় এবং মুখমণ্ডল ছিল চাঁদের ন্যায়, দর্শকরা তাঁহার উজ্জ্বল মুখমণ্ডলে নিজেদের চেহারা দেখিতে পাইত। তিনি আসিয়া সিংহাসনে উপবেশন করিলে অধীনস্ত রাজন্যবর্গ তাঁহার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করিল। ইবন যায়দ বলিয়াছেন, মিসর সম্রাট রায়্যানের অনেক অনেক ধনভাণ্ডার ছিল। সম্রাট সবকিছুর কর্তৃত্ব ইউসুফ -এর হাতে তুলিয়া দিলেন এবং তাঁহার ফরমান ও আদেশকে কার্যকর ঘোষণা করিলেন (মাজহারী, ৫খ., ১৭৪)।
এ প্রসঙ্গে প্রচলিত বাইবেলের বর্ণনা নিম্নরূপ: স্বপ্নের তা'বীর ফিরআওনের ও তাহার কর্মচারীদের মনপুত হইল। ফিরআওন তাহার কর্মচারী (দাস)-দিগকে কহিল, আমরা কী ইহার ন্যায়, যাহার মধ্যে মহাপ্রভুর আত্মা রহিয়াছে, পাইতে পারি। ফিরআওন ইউসুফ (আ)-কে বলিল, মহাপ্রভু তোমাকে এই সকল বিষয়ে দূরদৃষ্টি দান করিয়াছেন। সুতরাং তোমার মত কোন জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান নাই। তুমি আমার বাটির অধিপতি হইলে। তোমার আদেশ আমার সকল প্রজার প্রতি জারী কর। শুধু সিংহাসনের অধিকারে আমি তোমার হইতে উর্ধে থাকিব। অতঃপর ফিরআওন ইউসুফ (আ)-কে বলিল, দৃষ্টি কর যে, আমি তোমাকে সমগ্র মিসর রাজ্যের রাজত্ব দিয়া দিলাম। ফিরআওন তাহার আংটি নিজের হস্ত হইতে খুলিয়া ইউসুফের হস্তে পরাইয়া দিল এবং তাহাকে রেশমী বস্ত্র পরিধান করাইল, স্বর্ণের গলাবন্ধ তাহার গলায় পরাইয়া দিল এবং তাহাকে সমগ্র মিসর দেশের শাসক করিল। ফিরআওন ইউসুফ (আ)-কে বলিল, আমি ফির'আওন থাকিব এবং সমগ্র মিসর দেশের কেহই তোমার হুকুম ব্যতীত হস্তপদ সঞ্চালন করিবে না (আদিপুস্তক, ৪১: ৩৭-৪৪; বরাত কাসাসুল কুরআন, ১খ, ৩১৩; বিদায়া, ১খ., ২১০)। কোন কোন বর্ণনায় এই সময় ইউসুফ (আ)-এর বয়স ত্রিশ বৎসর হওয়ার কথা বলা হইয়াছে (বিদায়া, ১খ., ২০)। সম্রাট নামেমাত্র সম্রাট থাকিলেন এবং ইউসুফ (আ)-ই মিসরের প্রকৃত বাদশাহ হইলেন এবং তিনি আযীয উপাধিতে পরিচিতি লাভ করিলেন। ছা'লাবীর বর্ণনামতে বাদশাহ তখনকার আযীয মিসর কিতফীরকে বরখাস্ত করিয়া তদস্থলে ইউসুফ (আ)-কে আযীয নিয়োগ করিয়াছিলেন এবং অনেকের মতে এই সময় আযীয কিতফীরের মৃত্যু হইলে ইউসুফ (আ)-কে তাহার স্থলবর্তী করা হইয়াছিল (বিদায়া, ১খ., ২১০; মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., ৭৭; আল-কামিল, ১খ, ১১২)।
পবিত্র কুরআনে উহার ভাবগম্ভীর ভাষায় ইউসুফ (আ)-এর এই ক্ষমতারোহণের সমগ্র বিষয়টিকে সংক্ষিপ্তরূপে এইভাবে উল্লেখ রহিয়াছে, وَكَذَلِكَ مَكَّنَّا لِيُوسُفَ فِي الْأَرْضِ "এইভাবে আমি ইউসুফকে সেই দেশে প্রতিষ্ঠিত করিলাম" (১২ঃ ৫৬)। অর্থাৎ সমগ্র মিসর দেশের সর্বময় ক্ষমতা তাঁহাকে প্রদান করা হইল... "ইহা ছিল তাঁহার সৎকর্মশীলতার পার্থিব প্রতিদানের বহিঃপ্রকাশ।" আল্লাহ তা'আলার অসীম কুদরতের কি বিস্ময়কর মহিমা, যে ব্যক্তি ছিলেন মিসরের প্রগতি সমৃদ্ধ সমাজের দৃষ্টিতে অনগ্রসর ও একজন ক্রীতদাস, প্রথম ধাপে তিনি এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের তত্ত্বাবধায়ক মনোনীত হইলেন এবং পরিবারের সদস্যদের দৃষ্টিতে ধীমান ও বিশ্বস্ত হওয়ার মর্যাদা লাভ করিলেন। আবার ভাগ্যচক্রে কথিত অভিযোগের কবলে কারারুদ্ধ হইলেন এবং নির্দোষ প্রমাণিত হইয়া কারাগার হইতে বাহির হইয়া মিসরের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হইলেন। আল্লাহ যাহাকে কবুল করিয়া নেন, তাহার পথের সকল কণ্টক এইরূপেই দূরীভূত করেন (কাসাসুল কুরআন, ১খ., ৩১৩)。
পবিত্র কুরআনে ইউসুফ (আ) সম্পর্কে "পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত করিলাম" (مَكْنَا فِي الْأَرْضِ) এই আয়াত দুইবার বলা হইয়াছে। মাওলানা আবুল কালাম আযাদ ইহার হৃদয়গ্রাহী বিশ্লেষণে বলিয়াছেন, "হযরত ইউসুফ (আ)-এর মিসরীয় জীবনে দুইটি বিপ্লবাত্মক স্তর সূচিত হইয়াছিল। প্রথমত, তিনি দাসরূপে বিক্রয় হওয়ার পর আযীয মিসরের এইরূপে সুনজরে পড়িলেন যে, আযীযের কর্তৃত্বাধীন ক্ষেত্রের জন্য তাঁহাকে অধিকর্তা করিয়া দেওয়া হইল। দ্বিতীয়ত, কারাগার হইতে মুক্তি লাভ করিয়াই তিনি শাসনকর্তার মসনদারোহী হইলেন। প্রথম স্তরে পদার্পণের বিবরণ প্রদানে সূরা ইউসুফের ২১নং আয়াতে আল্লাহ্ কুদরত ও হিকমতের কারিশমার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়া যেমন বলা হইয়াছে كذلكَ مَكَّنَّا لِيُوسُفَ فِي الْأَرْضِ, অদ্রূপ দ্বিতীয় স্তরে পদার্পণের বিবরণেও ৫৬ নং আয়াতেও বলা হইয়াছে وكذلكَ مَكَّنَّا لِيُوسُفَ فِي الْأَرْضِ , কিন্তু প্রথম স্তরে উন্নীত হওয়ার পরে যেহেতু ভবিষ্যতে জীবনে শাসনকার্য পরিচালনার প্রশিক্ষণ লাভ ও অভিজ্ঞতা অর্জন অবশিষ্ট ছিল, সুতরাং সেখানে IC (107710 from the 1010 বলা হইয়াছেولنعلمه من تأويل الاحاديث والله غالب على امره ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ শিখাইবার জন্য এবং আল্লাহ তাঁহার কর্মসূচী বাস্তবায়ন করিয়াই থাকেন।) আর দ্বিতীয় স্তরে উন্নীত হওয়া ছিল প্রশিক্ষণ সমাপ্তির পরে উহার সম্মাননা প্রদান। সুতরাং এখানে বলা হয়েছে لَا نُضِيعُ أَجْرَ الْمُحْسِنِينَ (আমি সৎকর্মপরায়ণদের শ্রম ফল নষ্ট করি না)। (কাসাসুল কুরআন, ১খ., ৩১৪; বরাত, তরজমানুল কুরআন, ২খ., ২৩৫, টীকা)।
হযরত ইউসুফ (আ)-এর বিস্ময়কর ঘটনা কুরআন শরীফে উল্লিখিত হওয়ার পটভূমি এই যে, মক্কার মুশরিকরা ইয়াহুদীদের উত্থাপিত ইবরাহীম (আ)-এর বংশধরদের মিসরে আগমনের কারণ জানিতে চাহিয়াছিল। শাহ আবদুল কাদির (র) এই আয়াতের তাফসীরে লিখিয়াছেন, "ইহা তাহাদের সেই প্রশ্নের জবাব যে, 'ইবরাহীমের সন্তানরা কীরূপে মিসরে পৌছিল? সারকথা এই যে, ভাইদের চক্রান্তে ইউসুফ (আ) দেশান্তরিত হন। কিন্তু আল্লাহ তাঁহাকে মিসরের রাজ-ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করিলেন।" রাসূলুল্লাহ (স)-এর অবস্থাও অনুরূপ ছিল (মক্কা হইতে দেশান্তরিত হইয়া মদীনায় প্রতিষ্ঠা লাভ) (মুদিহুল কুরআনের বরাতে কাসাসুল কুরআন, ১খ., ৩১৪, ৩১৫)।
📄 হযরত ইউসুফ (আ)-এর বিবাহ ও দাম্পত্য জীবন
ঐতিহাসিক ও মুফাসসিরদের বর্ণনামতে বাদশাহ ইউসুফ (আ)-কে আযীয পদে নিয়োগ করেন ও তাঁহার বিবাহের ব্যবস্থা করেন। তবে তিনি কাহাকে বিবাহ করিয়াছিলেন এ ব্যাপারে দুটি ভিন্নমত দেখা যায়। কাহারও মতে তিনি স্থানীয় এক নেতার কন্যা 'আসনান' (Asenian)-কে বিবাহ করিয়া পারিবারিক জীবন শুরু করিয়া দিলেন (ই. ফা. ইসলামী বিশ্বকোষ, ২২খ., ১২০)। এই সময় তাঁহার বয়স হইয়াছিল ৩০ বৎসর। কাহারও মতে বাদশাহ এক উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন নারীর সহিত তাঁহার বিবাহ সম্পন্ন করেন (বিদায়া, ১খ., ২১০)。 অনেকের মতে এই সময় যুলায়খার স্বামী আযীয মিসর কিতফীরের মৃত্যুর পর মিসর সম্রাট ইউসুফ (আ)-এর সহিত তাহার স্ত্রীর বিবাহ বন্ধন করিয়া দিলেন। ইবন জারীর ও ইবন আবু হাতিম ইবন ইসহাক হইতে এই বর্ণনা উদ্ধৃত করিয়াছেন। এই বর্ণনায় আরও আছে যে, সাক্ষাতের সময় ইউসুফ (আ) যুলায়খাকে বলিলেন, 'তুমি যাহা চাহিতেছিলে উহার চাইতে ইহা কি উত্তম নয়'? যুলায়খা অপরাধ স্বীকার করিয়া বলিল, 'আমাকে ভর্ৎসনা করিও না। তুমি যেমন দেখিতে পাইতেছ, আমি ছিলাম এক সুন্দরী, রূপবতী ও বিলাসী নারী; অথচ আমার স্বামীর স্ত্রী-সম্ভোগের ক্ষমতা-ছিল না। অপরদিকে তোমার সৌন্দর্য ও গুণের কথা তো বলিবার অপেক্ষা রাখে না। সুতরাং আমার প্রবৃত্তি আমাকে কাবু করিয়া ফেলিয়াছিল এবং আমি আত্মনিয়ন্ত্রণ হারাইয়া ফেলিয়াছিলাম'। বর্ণনামতে ইউসুফ (আ) যুলায়খাকে কুমারীরূপে পাইয়াছিলেন (মাজহারী, ৫খ., ১৭৪)। কোন কোন রিওয়ায়াতে আছে, ইউসুফ (আ)-এর প্রতি যুলায়খার যে পরিমাণ আসক্তি ছিল বিবাহের পর আল্লাহ তা'আলা ইউসুফ (আ)-এর হৃদয়ে যুলায়খার প্রতি উহার চাইতে অধিক প্রেম সৃষ্টি করিয়া দিলেন। এমনকি এক সময় ইউসুফ (আ) এই অভিযোগ উত্থাপন করিলেন, ইতোপূর্বে আমার প্রতি তোমার যে পরিমাণ আকর্ষণ ছিল এখন উহা হ্রাস পাওয়ার কারণ কি? যুলায়খা নিবেদন করিল, আপনার উসীলায় আমার অন্তরে আল্লাহ্র মহব্বত জাগরূক হইয়াছে। ফলে অন্য সব সম্পর্ক ও ধ্যান-ধারণা এখন স্তিমিত হইয়া গিয়াছে (মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., ৭৭; বরাত কুরতুবী ও মাজহারী)।
📄 মিসরে দুর্ভিক্ষ এবং উহার প্রতিকারে ইউসুফ (আ)-এর ব্যবস্থা
ক্ষমতা গ্রহণের পর হযরত ইউসুফ (আ) রাষ্ট্রের যাবতীয় কর্মকাণ্ড এমন সুচারুরূপে আঞ্জাম দিতে থাকিলেন যে, কাহারও কোন অভিযোগের অবকাশ রহিল না। সমগ্র দেশবাসী তাঁহার প্রতি অনুরক্ত হইয়া গেল এবং দেশের সর্বত্র শান্তি, সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তার পরিবেশ বিরাজ করিতে লাগিল। ইউসুফ (আ)-কেও রাষ্ট্রপরিচালনার সামগ্রিক দায়িত্ব পালনে কোন প্রকার জটিলতা বা কষ্টক্লেশের সম্মুখীন হইতে হইল না। তিনি জনসাধারণের সুখশান্তির জন্য যাহা করিয়াছিলেন পৃথিবীর ইতিহাসে উহার তুলনা বিরল (মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., ৮১)। ইউসুফ (আ) খাদ্য সংগ্রহ অভিযানের সুষ্ঠু পরিকল্পনা গ্রহণ করিলেন, এতদুদ্দেশ্যে তিনি বহু দুর্গ ও গুদামঘর নির্মাণ করাইয়া উহাতে দুর্ভিক্ষকালের জন্য খাদ্য সঞ্চয় করিতে লাগিলেন। তিনি চতুর্দশ বর্ষের জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করিয়া ভাল উৎপাদনের বৎসরগুলিতে পরিমিত ও নিয়ন্ত্রিত ব্যয়ের ব্যবস্থা করিলেন। অতঃপর অশ্রুতপূর্ব ভয়াবহতা সহকারে দুর্ভিক্ষের কাল শুরু হইয়া গেল। বর্ণিত আছে যে, দুর্ভিক্ষ শুরু হইলে ইউসুফ পেট ভরিয়া খাওয়া পরিত্যাগ করিলেন। লোকেরা বলিল, সমগ্র মিসরের ধনভাণ্ডারের কর্তৃত্ব আপনার হাতে থাকা সত্ত্বেও আপনি ক্ষুধার কষ্ট সহিতেছেন কেন? তিনি বলিলেন, আমি চাই, সাধারণ মানুষের ক্ষুধার যাতনার অনুভূতি আমার অন্তরে জাগরুক থাকুক। উদর পূর্ণ করিয়া ভক্ষণ করিয়া আমি যেন ক্ষুধার্তদের কথা ভুলিয়া না যাই। রাজভবনের বাবুর্চীদের প্রতিও তিনি এক বেলা দ্বিপ্রহরে খাদ্য তৈরির আদেশ জারী করিলেন যাহাতে বাদশাহ এবং রাজবাড়ির লোকেরাও জনতার ক্ষুধার স্বাদ আস্বাদন করিতে পারে। সুতরাং দুর্ভিক্ষের প্রথম আঘাত বাদশাহই অনুভব করিলেন। দুপুর রাতে ক্ষুধায় কাতর হইয়া তিনি ইউসুফ! ক্ষুধা, ক্ষুধা বলিয়া চিৎকার করিয়া উঠিলে ইউসুফ (আ) বলিলেন, 'দুর্ভিক্ষ শুরু হইয়া গিয়াছে'।
দুর্ভিক্ষের প্রথম বৎসরে মানুষেরা তাহাদের বিগত ভাল উৎপাদনের বৎসরগুলিতে সঞ্চিত খাদ্য খাইয়া ফেলিল। সুতরাং পরবর্তী সময়ে তাহারা ইউসুফ (আ)-এর নিকট হইতে খাদ্য ক্রয় করিতে লাগিল। প্রথম বর্ষ অতিক্রান্ত হইলে লোকেরা তাহাদের নগদ অর্থ দ্বারা খাদ্য ক্রয় করিল এবং মিসরের সকল স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা ইউসুফ (আ)-এর অধিকারে আসিয়া গেল। দ্বিতীয় বর্ষ শেষে খাদ্য বিক্রয় হইল অলংকার ও মণিমুক্তার বিনিময়ে এবং মানুষের হাতে উহার কিছুই অবশিষ্ট থাকিল না।
তৃতীয় বর্ষ শেষে বিক্রয় হইল সর্বপ্রকার পশুপালের বিনিময়ে এবং উহার সবই ইউসুফ (আ)-এর অধিকারভুক্ত হইল। চতুর্থ বর্ষ-পরিক্রমায় বিক্রয় হইল লোকদের মালিকানাভুক্ত গোলাম-বাঁদীর বিনিময়ে এবং কাহারও মালিকানায় কোন দাস-দাসী থাকিল না। পঞ্চম বর্ষ শেষে বিক্রয় হইল স্থাবর সম্পত্তি, ভিটেমাটি ও বাড়িঘরের বিনিময়ে এবং এইসব কিছুই ইউসুফ (আ)-এর দখলীভুক্ত হইল। ষষ্ঠ বর্ষের দুর্ভিক্ষ দেশবাসীকে তাহাদের সন্তান-সন্ততির বিনিময়ে খাদ্য ক্রয়ে বাধ্য করিল এবং ইহাদের সকলেই ইউসুফ (আ)-এর দাসে পরিণত হইল। সপ্তম বর্ষের দুর্ভিক্ষ উতরাইবার জন্য লোকেরা নিজেদেরকে বিক্রয় করিয়া খাদ্য সংগ্রহ করিল এবং ইউসুফ (আ) আইনত সকল স্বাধীন নরনারীর মালিকানা লাভ করলেন। (বর্ণনাটি সত্য হইলে তৎকালে দুর্ভিক্ষের পীড়নে সন্তান বিক্রয় ও আত্মবিক্রয় বৈধ ছিল। শরীআতে মুহাম্মদীতে এখন আর উহা বৈধ নহে।)
তখন লোকেরা বলাবলি করিতে লাগিল, আজিকার মত এত বিশাল ও সর্বব্যাপী রাজত্বের অধিকারী আর কোন বাদশাহ আমরা দেখি নাই। এই অবস্থার পর ইউসুফ (আ) বাদশাহকে বলিলেন, আমার প্রতি আমার প্রতিপালকের প্রতিদান তো দেখিতেছেন। এখন আপনার অভিমত কি? বাদশাহ বলিলেন, আপনার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। আমরা সকলে আপনার অনুগত। ইউসুফ (আ) বলিলেন, 'আপনার সম্মুখে আল্লাহকে সাক্ষী রাখিয়া বলিতেছি, আমি মিসরবাসীদের সকলকেই মুক্ত করিয়া দিলাম।' দুর্ভিক্ষ মিসরের সীমানা অতিক্রম করিয়া দূর-দূরান্তে ছড়াইয়া পড়িল এবং দুর্ভিক্ষ পীড়িত সকল অঞ্চল হইতে লোকেরা খাদ্য সংগ্রহের জন্য মিসরের রাজ-দরবারে ভিড় করিতে লাগিল। সকলের নিয়মিত প্রাপ্তি নিশ্চিত করিবার জন্য ইউসুফ (আ) জনপ্রতি সে যে কেহই হউক না কেন-এক উটের বোঝার অধিক না দেওয়ার বিধান জারী করিলেন (মাজহারী, ৫খ., ১৭৫-১৭৬; মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., ৮১-৮২)।
পবিত্র কুরআন স্বপ্নের তা'বীরের অংশরূপে দুর্ভিক্ষকালীন ব্যবস্থাপনার বর্ণনা থাকার কারণে উহার বিশদ বর্ণনা দেওয়া হয় নাই। তবে বাইবেলে উহার বিশদ বর্ণনা রহিয়াছে নিম্নরূপঃ "এবং ইউসুফ (আ) যখন মিসর সম্রাট ফিরআওনের সমীপে দণ্ডায়মান হইল তখন তাঁহার বয়স হইয়াছিল বিশ বৎসর। ইউসুফ (আ) ফিরআওনের দরবার হইতে বাহির হইয়া মিসরের সমগ্র অঞ্চলে ভ্রমণ করিলেন। অধিক উৎপাদনের সাত বৎসর ভূমি ফসলে পরিপূর্ণ হইলে তিনি এই সাত বৎসরের সমগ্র খাদ্যদ্রব্য যাহা মিসর দেশে ছিল সংগ্রহ করিলেন, তিনি খাদ্যসামগ্রী জনপদসমূহে গুদামজাত করিলেন এবং প্রত্যেক জনপদের আশপাশের জমিতে উৎপন্ন খাদ্যশস্য সেই জনপদে রাখিবার ব্যবস্থা করিলেন। ইউসুফ (আ) খাদ্যশস্য বহুল পরিমাণে যেরূপ নদীর বালুরাশি পরিমাণ, উহার হিসাব নির্ণয় না করিয়া সঞ্চয় করিলেন, কেননা তাহা ছিল হিসাবের আওতার উর্ধে।
মিসর দেশে ভাল উৎপাদনের সাত বৎসর সমাপ্ত হইল এবং দুর্মূল্যের সাত বৎসর যেরূপ ইউসুফ (আ) বলিয়াছিলেন, শুরু হইল। সকল দেশে দুর্মূল্য দেখা দিল। কিন্তু তখন পর্যন্ত মিসরের সকল অঞ্চলে রুটি (খাদ্য) ছিল। পরে যখন সমগ্র মিসর দেশ ক্ষুধায় ধ্বংস হওয়ার উপক্রম করিল তখন মানুষের খাদ্যের জন্য ফিরআওনের নিকট আকুল হইল। ফিরআওন সকল মিসরবাসীকে বলিল, তোমরা ইউসুফের নিকট গমন কর এবং সে তোমাদিগকে যেইরূপ করিতে আজ্ঞা করে সেইরূপ কর। সমস্ত পৃথিবীতে আকাল দেখা দিল। ইউসুফ (আ) সঞ্চিত ভাণ্ডারের খাতা খুলিয়া মিসরীয়দের নিকট বিক্রয় করিতে লাগিলেন। মিসর দেশে দুর্ভিক্ষ চরম হইল এবং সকলেই মিসরে খাদ্য ক্রয়ের উদ্দেশে আগমন করিতে লাগিল। কেননা সকল দেশেই দুর্ভিক্ষ ছিল (আদিপুস্তক, ৪১: ৪৬, ৪৯, ৫৩, ৫৭; বরাত, কাসাসুল কুরআন, ১খ., ৩১৫, ৩১৬)।