📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বাদশাহর স্বপ্ন ইউসুফ (আ)-এর কারামুক্তির সূত্র

📄 বাদশাহর স্বপ্ন ইউসুফ (আ)-এর কারামুক্তির সূত্র


হযরত ইউসুফ (আ) সমাজের উচ্চ শ্রেণীর ষড়যন্ত্রের শিকার হইয়া কারা জীবন ত্যাগ করিতেছিলেন। অন্য কথায় তিনি পাপকর্ম হইতে আত্মরক্ষা করিবার জন্য কারাজীবনকেই অগ্রাধিকার দিয়াছিলেন। আর প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে মিসরের সর্বোচ্চ ক্ষমতায় সমাসীন করিবার পথ সুগম করিতেছিলেন। ইউসুফ (আ) নিজের নির্দোষ হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলেন এবং তিনি নিশ্চিতরূপে জানিতেন যে, এক 'বড় লোকের' স্ত্রীর বদনাম ঘুচানো ও সমাজের দৃষ্টিতে তাহার অপদস্থতা রহিত করিবার জন্যই তাঁহাকে জেলে পাঠানো হইয়াছে। সুতরাং এইরূপ ধারণা সৃষ্টি হওয়া সঙ্গত ছিল যে, হয়তো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী বাদশাহকে তাঁহার এই মোকদ্দমার ব্যাপারে অবহিত করা হয় নাই এবং ক্ষমতাব ত্যাগকারীয়া ক্ষমতার অপব্যবহার করিয়া তাঁহাকে কারারুদ্ধ করিয়াছে অথবা মিথ্যা মামলা সাজাইয়া এবং ইউসুফ (আঃ) -কে অভিযুক্ত সাব্যস্ত করিয়া সমর্থনের সুযোগ না দিয়া বাদশাহের নিকট অভিযুক্তকে অপরাধী সাব্যস্ত করিয়া তাঁহার কারাবাসের পক্ষে বাদশাহের ফরমান আদায় করা হইয়াছে। ইউসুফ (আঃ) যখন দেখিলেন যে, এই বন্দীঘরের একজন (সাকী) নির্দোষ সাব্যস্ত হইয়া পুনরায় রাজ-দরবারে তাহার সাবেক দায়িত্ব বহাল হইবে এবং বাদশাহের সহিত তাহার একান্ত কথা বলিবার সুযোগ ঘটিবে তখন তিনি সাকীকে বাদশাহের নিকট তাঁহার বিষয়টি উত্থাপন করিবার অনুরোধ করিলেন। পবিত্র কুরআনের ভাষায় :
وَقَالَ لِلَّذِي ظَنَّ اَنَّهُ نَاجٍ مِّنْهُمَا اَذْكُرْنِيْ عِنْدَ رَبِّكَ ۚ فَاَنْسٰهُ الشَّيْطٰنُ ذِكْرَ رَبِّهٖ فَلَبِثَ فِي السِّجْنِ بِضْعَ سِنِيْنَۙ
“ইউসুফ তাঁহাদের মধ্যে যে মুক্তি পাইবে মনে করিল, তাহাকে বলিল, তোমার মনিবের নিকট আমার কথা বলিও; কিন্তু শয়তান তাহাকে উহার মনিবের নিকট তাহার বিষয়টি বলিবার কথা ভুলাইয়া দিল। সুতরাং ইউসুফ কয়েক বৎসর কারাগারে রহিল” (১২ : ৪২)।
অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে এই আয়াতের ব্যাখ্যা উহার সাবলীল তরজমার অনুরূপ। অর্থাৎ ইউসুফ (আ) অন্যায় ও জুলুমের শিকাররূপে সারাজীবন বন্দী জীবন যাপন হইতে মুক্তির জন্য সম্ভাব্য মুক্তি লাভকারী বন্দীকে তাঁহার বিষয়ে আলোচনা করিবার অনুরোধ করিয়াছিলেন। এই অনুরোধ শরী’আতের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ বৈধ ছিল। তবে শয়তান কর্তৃক বন্দীকে ভুলাইয়া দেওয়ার পিছনে আল্লাহ্‌ তা’আলার নির্ধারিত অদৃশ্য হিকমতও কার্যকর ছিল। এই হিকমতেরও ছিল দুইটি ধারা। প্রথমটি প্রত্যক্ষ এবং উহা এই যে, ইউসুফ (আ)-এর এই অনুরোধ কারামুক্তি এবং একটি বৈধ প্রচেষ্টা হইলেও আল্লাহ্‌ তা’আলা তাঁহার বিশিষ্ট বান্দা ও রাসূলগণের জন্য কোন মাধ্যমরূপে মুক্তির সূত্র ও মাধ্যমরূপে গ্রহণ করা পছন্দ করেন না। কেননা আল্লাহ্‌ ও বান্দার মধ্যে কোন মধ্যসূত্র অবশিষ্ট না থাকা এবং পূর্ণাঙ্গ প্রত্যক্ষ সংযোগ সৃষ্টি হওয়াই তাওহীদের সর্বোচ্চ মাকাম। নবীগণকে আল্লাহ্‌ তা’আলা এই মাকামে উন্নীত করেন। সুতরাং আল্লাহ্‌ ইউসুফ (আ)-এর দৃষ্টি হইতে সকল ‘উসীলা’ ও মধ্যসূত্রকে বিলীন করিয়া প্রত্যক্ষভাবে আল্লাহ্‌র উপর নির্ভর করার শিক্ষা দিতে চাহিলেন। ফলে শয়তানের পক্ষে ভুলাইয়া দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হইল। বন্দীও অবিলম্বে কারাগারের এমন প্রকার পাত্র ও স্নেহভাজন ‘বন্ধু’র কথা ভুলিয়া গেল। হিকমতের দ্বিতীয় ধারাটি ছিল এই যে, কুদরতী কর্মপরিকল্পনায় ইউসুফ (আ)-এর জীবনের পরবর্তী স্তর ছিল মিসরের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় সমাসীন হওয়া। উহার সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি হওয়া ও ইউসুফ (আ)-এর রাষ্ট্রনায়কসুলভ যোগ্যতা অর্জনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া সমাপ্ত হওয়ার জন্য আরও কিছুকালের কারাবাস কুদরতী পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত ছিল। কুদরতী পরিকল্পনায় ইউসুফ (আ)-এর জন্য কারামুক্তির পর রাজক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া নির্ধারিত ছিল। অতএব এই সময় সাকী কর্তৃক বাদশাহের সকাশে ইউসুফ (আ)-এর বিষয়টি উত্থাপিত হইলে বাহ্যত তাঁহার মিসরের মসনদাসীন হওয়ার সম্ভাবনা থাকিত না (ফী জিলালিল কুরআন, ৪খ, ৭৩২, ৭৩৩; ইবন কাছীর, ২খ, ২৫১)।
আয়াতের এইরূপ ব্যাখ্যা মুজাহিদ প্রমুখ হইতে উদ্ধৃত হইয়াছে এবং ইবন কাছীরও ইহাই সমর্থন করিয়াছেন। তবে ইবন জারীর ও বাগাবী প্রমুখ আয়াতের فَأَنْشَهُ الشَّيْطَنُ অংশের ব্যাখ্যায় ভিন্নমত পোষণ করিয়াছেন এবং তাঁহারা ইবন আব্বাস (রা)-র বক্তব্য মুজাহিদ হইতে উদ্ধৃত করিয়া বলিয়াছেন, শয়তান তাহাকে ভুলাইয়া দিল বাক্যে 'তাহাকে' সর্বনাম দ্বারা মুক্তিপ্রাপ্ত সাকী উদ্দেশ্য নহে, বরং ইউসুফ (আ) উদ্দেশ্য এবং আয়াতের মর্ম এই যে, শয়তানের কারসাজিতে ইউসুফ (আ) ক্ষণিকের জন্য অমনোযোগিতার শিকার হইলেন এবং কারামুক্তির ব্যাপারে শয়তান তাঁহাকে তাঁহার রব্ব আল্লাহ তা'আলার শরণাপন্ন হওয়ার কথা ভুলাইয়া দিল। ফলে তিনি আল্লাহ ব্যতীত মাখলুকের নিকট সহায়তা কামনা করিলেন।
নবীগণের ক্ষেত্রে এরূপ সাময়িক অমনযোগিতা অত্যন্ত বিরলরূপে সম্ভাব্য হইলেও আয়াতের বর্ণনাধারা এই ব্যাখ্যার যথেষ্ট অনুকূল নহে। ইবন কাছীর প্রমুখ শ্রেষ্ঠ মুফাসসিরগণ এই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করিয়াছেন। তবে ব্যাখ্যা যাহাই হউক, এ প্রসংগে রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, ইউসুফ (আ) 'তোমার মালিকের নিকট আমার বিষয়ে আলোচনা করিও' না বলিতেন তবে অত দীর্ঘকাল তাঁহাকে কারাগারে অবস্থান করিতে হইত না (ইবনুল মুনযির, ইবন আবী হাতিম ও ইবন মারদুয়া বর্ণিত)।
এই ঘটনা প্রসঙ্গে তাওরাত প্রদত্ত বিবরণ। নিম্নরূপঃ "তখন ইউসুফ (যোশেফ) বলিল, উহার ব্যাখ্যা এই যে, তিনটি ছড়ার অর্থ তিন দিন এবং অদ্য হইতে তিন দিনের ব্যবধানে ফিরআউন তোমার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিবে এবং তোমাকে তোমার পদ ফিরাইয়া দিবে। এবং পূর্বের ন্যায় যখন তুমি ফিরআউনের সাকী ছিলে- তাহার হাতে পুনরায় মদিরাপাত্র তুলিয়া দিবে। কিন্তু যখন তুমি স্বঅবস্থায় ফিরিয়া যাইবে তখন আমার কথা স্মরণ রাখিও এবং আমাকে মুক্তি দেওয়াইও। কেননা উহারা আমাকে ইব্রীয়দের অধিকার হইতে চুরি করিয়া আনিয়াছে এবং এখানেও আমি এমন কোন কর্ম করি নাই যাহার কারণে তাহারা আমাকে কয়েদ করিয়া রাখিবে" (আদিপুস্তক, ৪০:১২-১৫)।
মোটকথা, সাকী রাজভবনের কোলাহলপূর্ণ জীবনে পৌঁছিয়া ইউসুফ (আ)-এর কথা বিস্মৃত হইয়া থাকিল এবং ইউসুফ (আ) আরও কয়েক বৎসরের জন্য কারাজীবনের মেয়াদ পূর্ণ করিলেন। এই কয়েক বৎসরের পরিমাণ ছিল অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে সাত বৎসর। ওয়াহ্ব ইবন মুনাব্বিহ বলিয়াছেন, হযরত আইয়ুব (আ) মারাত্মক ব্যাধিগ্রস্ত ছিলেন সাত বৎসর এবং হযরত ইউসুফ (আ)-ও কারাজীবন কাটাইয়াছিলেন সাত বৎসর। ইবন জুরায়জও সেই সময়কালে সাত বৎসরের অভিমতকে সমর্থন করিয়াছেন। দাহ্হাকের মতে সেই সময়কাল চৌদ্দ বৎসর। ইবন আব্বাস (রা)-এর মতে বার বৎসর। কালবী বলিয়াছেন, পাঁচ বৎসর এই ঘটনার পূর্বে এবং সাত বৎসর ইহার পরে। মূলত মতভেদ সৃষ্টি হইয়াছে بضع শব্দের অর্থে মতভেদের কারণে। কাতাদার মতে بضع শব্দ তিন হইতে নয় এবং মুজাহিদদের মতে তিন হইতে সাত বুঝায়। মুকাতিল মুজাহিদ সূত্রে ইবন আব্বাস (রা) হইতে পাঁচ বৎসরের পরে অর্থাৎ সাত বা নয় বৎসর হওয়ার বর্ণনা উদ্ধৃত করিয়াছেন। এ প্রসঙ্গে তাফসীরে মাজহারীর গ্রন্থকারের আপত্তি উল্লেখযোগ্য। তিনি বলিয়াছেন, وَدَخَلَ مَعَهُ السِّجْنَ فَسَيَنِ, বুঝা যায় আয়াত দ্বারা রাজকর্মচারীদ্বয় ও হযরত ইউসুফ (আ)-এর জেলে আগমন সমসাময়িক হওয়া বুঝা যায়। রাজকর্মচারীদ্বয়ের কারabাস ছিল তিন দিনের (কিংবা উহার কাছাকাছি সংক্ষিপ্ত সময়ের) জন্য। সুতরাং ইউসুফ (আ)-এর ইহার পূর্বে পাঁচ বৎসর অবস্থান বোধগম্য নয়। এই আপত্তির ব্যাপারে রাজকর্মচারীদ্বয়ের স্বপ্ন দেখিবার পরে তিন দিন এবং উহার (মাজহারী ৫খ., ১৬৬) পূর্বে দীর্ঘদিন থাকিবার কথা অথবা শব্দের ভিন্ন ব্যাখ্যার কথা বলা যায়। তবে তদন্ত সাপেক্ষে মামলার রাজকর্মচারীদের দীর্ঘ দিনের অবস্থানের কথা তত যুক্তিসঙ্গত নহে (কুরতুবী, ৫খ, ১৬৭; মাজহারী, ৫খ., ১৬৬)।
আল্লাহ্ তা’আলার মর্জি অনুসারে ইউসুফ (আ)-এর কারাবাসের মেয়াদ পূর্ণ হইয়া আসিলে তাঁহার মুক্তি ও রাজকীয় ক্ষমতা লাভের ব্যাপারে কুদরতী কর্মপ্রক্রিয়া সচল হইয়া উঠিল। তৎকালীন মিসর সম্রাট ফিরাওন এক রাত্রে একটি অদ্ভূত স্বপ্ন দেখিল যাহা তাহাকে অতিশয় দুশ্চিন্তাগ্রস্থ করিয়া ফেলিল। পবিত্র কুরআনের ভাষায় :
وَقَالَ الْمَلِكُ إِنِّي أَرَى سَبْعَ بَقَرَاتٍ سِمَانٍ يَأْكُلُهُنَّ سَبْعُ عِجَافٌ وَسَبْعَ سُنُبُلٍ خُضْرٍ وَأُخَرَ يَابِسَاتٍ يَا أَيُّهَا الْمَلَأُ أَفْتُونِي فِي رُؤْيَايَ إِنْ كُنْتُمْ لِلرُّؤْيَا تَعْبُرُونَ
“রাজা বলিল, আমি স্বপ্নে দেখিলাম, সাতটি হুলকায় গাভী, উহাদিগকে সাতটি শীর্ণকায় গাভী ভক্ষণ করিতেছে এবং দেখিলাম সাতটি সবুজ শীষ ও অপর সাতটি শুষ্ক। হে প্রধানগণ! যদি তোমরা স্বপ্নের ব্যাখ্যা করিতে পার তবে আমার স্বপ্ন সম্বন্ধে অভিমত দাও” (১২:৪৩)।
ঐতিহাসিকগণ লিখিয়াছেন, হযরত ইউসুফ (আ)-এর এই ঘটনাবলীর সময় মিসরের রাজন্যবর্গের অধিকারীরা ফিরাওন (বহুবচনে 'ফারা'ইনা) নামে অভিহিত হইত। তখনকার ঐ রাজবংশটি ইতিহাস প্রসিদ্ধ 'আমালিকা' গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত ছিল। মিসরের ইতিহাসে ইহারা 'হেকসোস' নামে উল্লিখিত হইয়াছে। তাহাদের মৌলিক পরিচয় উদ্ঘাটন করিয়া তাহাদিগকে একটি পশুপালনকারী সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত সাব্যস্ত করা হইয়াছে। পরবর্তী গবেষণায় এই তথ্য সংয়ুক্ত হইয়াছে যে, এই গোষ্ঠী আরব অঞ্চল হইতে যাযাবররুপে মিসরে আগমন করিয়াছিল এবং তাহারা প্রাচীন আরবগোষ্ঠী 'আল-আরাবুল আরিবা'-র একটি শাখা ছিল। তৎকালে মিসরে প্রচলিত ধর্মীয় মতবাদ অনুসারে ক্ষমতাসীন সম্রাটকে ‘ফারা’ (فراع ফিৎ'আওন) উপাধিতে ভূষিত করা হইত। কেননা মিসরীরা তখন বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজা করিত এবং এই দেবতাদের মধ্যে ‘আমান রা’ امن را (সূর্য দেবতা) ছিল সকলের উর্ধ্বে। সাধারণ জনতা ক্ষমতাসীন বাদশাহকে সূর্য দেবতার অবতার মনে করিত এবং রাজা-বাদশাহরা ‘ছোট খোদা’র মর্যাদা ভোগ করিত। বাদশাহকে সূর্য দেবতার অবতাররুপে ‘ফারা’ (فراع) বলা হইত এবং এই শব্দটি রূপান্তরিত হইয়া হিব্রু ভাষায় ‘ফারআওন’ (ফারেন) এবং আরবীতে ফির'আওন (فرعون) হইয়াছে (সুতরাং ফিরআওন অর্থ সূর্য দেবতার অবতার)। হযরত ইউসুফ (আ)-এর সমকালীন স্বপ্নদ্রষ্টা ফির'আওনের নাম রায়‍্যান (ইবনুল ওয়ালীদ; বর্ণনান্তরে ওয়ালীদ ইব্‌ন রায়‍্যান) ইবন হারাওয়ান ইবন আরাশাঃ (আরাছিয়্যাঃ) ইবন সারান ইবন 'আম্র ইবন 'ইমলাক ইবন লাওষ (১,১) ইবন সাম (শম) ইবন নূহ বলা হইয়াছে। মিসরীয় প্রত্নতাত্ত্বিক বিবরণে - তাহার নাম 'আয়ূনী' রহিয়াছে (কাসাসুল কুরআন, ১খ., পৃ. ৩০-৫, বরাত, তরজমানুল কুরআন, ২খ, পৃ. ৩৬৬, ৪৬২; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ., পৃ. ২০৮)।
বাদশাহের স্বপ্নের বিবরণ: ইসরাঈলী বর্ণনায় রহিয়াছে, স্বপ্নে বাদশাহ নিজেকে একটি নদীর তীরে দেখিতে পাইলেন। তিনি দেখিলেন যে, নদী হইতে সাতটি মোটাতাজা গরু বাহির হইয়া সেখানকার একটি বাগানে চরিতে লাগিল। অতঃপর নদী হইতে সাতটি অতিশয় শীর্ণ ও দুর্বল গরু উঠিয়া আসিয়া পূর্বের গরুগুলির সহিত চরিতে লাগিল। অতঃপর শীর্ণ গরুগুলি সবল গরুগুলিকে আক্রমণ করিল এবং সেগুলিকে গিলিয়া ফেলিল। বাদশাহ স্বপ্ন দেখিয়া ঘাবড়ানো অবস্থায় জাগ্রত হইল। বাদশাহ পুনরায় ঘুমাইয়া পড়িল এবং দেখিল যে, একটি গোছায় সাতটি সবুজ শীষ রহিয়াছে যেগুলির দানা পোক্ত হইয়াছে। হঠাৎ দেখা গেল আরও সাতটি শুষ্ক শীষ এবং এই শুষ্ক শীষগুলি সবুজ শীষগুলিকে পেচাইয়া ধরিল এবং সেগুলি আর সবুজ থাকিল না। বর্ণনান্তরে শুষ্কগুলি সবুজগুলিকে খাইয়া ফেলিল। ইহা দেখিয়া বাদশাহ ভয় পাইল এবং তাহার ঘুম ভাংগিয়া গেল। (বিদায়া, ১খ., পৃ. ২০৮; মাজহারী, ৫খ., পৃ. ১৬৬)। সকালে বাদশাহ দরবারের যাদুকর, জ্যোতিষী, বুদ্ধিজীবী ও স্বপ্ন ব্যাখ্যাকারদের একত্র করিয়া তাহাদের নিকট স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানিতে চাহিলে তাহারা বলিল, আমাদের দৃষ্টিতে এই স্বপ্ন অর্থহীন।
قَالُوا أَضْغَاتُ أَحْلَامٍ وَمَا نَحْنُ بِتَأْوِيلِ الأَحْلامِ بِعَالِمِينَ .
"উহারা বলিল, 'ইহা অর্থহীন স্বপ্ন এবং আমরা এইরূপ স্বপ্ন ব্যাখ্যায় অভিজ্ঞ নই” (১২: ৪৪)। স্বপ্ন এবং ইহা বাদশাহ্ দুশ্চিন্তার ফসল। সুতরাং ইহার কোন ব্যাখ্যা হইতে পারে না এবং ইহাতে আপনার পেরেশান হওয়ার কোন কারণ নাই। আর মূলত আমরা রাষ্ট্রীয় জটিল কর্মকাণ্ডের বিশেষজ্ঞ হইলেও এই ধরনের স্বপ্নের ব্যাখ্যা অবগত নই। সায়ি‍্যদ কুতব লিখিয়াছেন, হযরত ইউসুফ (আ)-এর জীবন-চরিতে কয়েকটি স্বপ্নের উল্লেখ রহিয়াছে। ইহাতে বুঝা যায় যে, সমসাময়িক কালে স্বপ্ন ও উহার ব্যাখ্যা একটি বিশেষ বিষয়রূপে স্বীকৃত ছিল এবং তখনকার সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পরিবেশেও স্বপ্ন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়রূপে বিবেচিত হইত। পবিত্র কুরআনের বর্ণনায় ইউসুফ (আ)- কর্তৃক স্বপ্নের তা'বীর প্রদানকে আল্লাহ প্রদত্ত 'ইলমরূপে উল্লেখ করাতে ইহা তাঁহার জন্য মু'জিযা বলা যায় (ফী জিলালিল কুরআন, উরদু তরজমা, ৪খ., পৃ. ৭৩৪)। হাদীছ শরীফে সত্য স্বপ্নকে নবুওয়াতের ছেচল্লিশ ভাগের এক ভাগ বলা হইয়াছে। ফিরআওনের দরবারীরা তাহার স্বপ্ন সম্পর্কে যে মন্তব্য করিয়াছিল উহার কারণ এই হইতে পারে যে, প্রকৃতপক্ষে তাহারা স্বপ্নের তা'বীর বিষয়ে অভিজ্ঞ ছিল না অথবা তাহাদের দৃষ্টিতে ইহা দুশ্চিন্তা প্রসূত স্বপ্ন ছিল অথবা তাহারা দরবারী মোসাহেবীর রীতি অনুসারে বাদশাহকে দুশ্চিন্তামুক্ত রাখিবার জন্য এইরূপ বলিয়াছিল (ফী জিলালিল কুরআন, ৪খ., পৃ. ৭৩৪)।
ইউসুফ (আ)-এর কথা মুক্তিপ্রাপ্ত বন্দীর মনে পড়িল। আল্লাহ্র ইচ্ছায় মিসর সম্রাটের স্বপ্নকে কারাগার হইতে ইউসুফ (আ)-এর সসম্মানে মুক্তির কারণ হইয়া দেখা দিল এবং দরবারীরা উহার তা'বীরে অপারগতা প্রকাশ করিল। ইউসুফ (আ)-এর সহবন্দী মুক্তিপ্রাপ্ত সাকী দরবারীদের সহিত সম্রাটের স্বপ্ন নিয়া আলোচনার সময় উপস্থিত ছিল। শয়তানের কারসাজিতে নিত্য দিনের আনন্দ-স্ফূর্তি ও রাজপ্রাসাদের কর্ম কোলাহলে সে ইউসুফ (আ)-এর কথা ভুলিয়া গিয়াছিল। সাত বৎসরের ব্যবধানে সম্রাটের স্বপ্নের তা'বীর প্রদানে দরবারী পণ্ডিতদের অপারগতা ও সম্রাটের দুশ্চিন্তা সাকীকে স্মরণ করাইয়া দিল। তাহার মনে পড়িল যে, জেলখানার ইউসুফ নামের এক বন্দী তাহাদের দুই সংগীর স্বপ্নের তা'বীর দিয়াছিলেন এবং তাহা বাস্তবে পরিণত হইয়াছিল। সম্রাটের নিকট তাঁহার বিষয়ে আলোচনা করিবার অনুরোধের কথাও তাহার মনে পড়িল এবং এহেন মহান ব্যক্তির অনুরোধ সম্পূর্ণ ভুলিয়া যাওয়ার জন্য সে অতিশয় অনুতপ্ত ও লজ্জিত হইল। সুতরাং ঐ মুহূর্তে সে বাদশাহের নিকট নিবেদন করিল, আমাকে অনুমতি প্রদান করা হইলে আমি এই স্বপ্নের সঠিক ব্যাখ্যা সংগ্রহ করিতে পারি। জেলখানায় এমন এক বন্দী রহিয়াছেন যিনি স্বপ্নের সঠিক তা'বীর বলিতে পারেন।
وَقَالَ الَّذِي نَجَا مِنْهُمَا وَاذْكَ بَعْدَ أُمَّةٍ أَنَا أُنَبِّئُكُمْ بِتَأْوِيلِهِ فَأَرْسِلُونَ
"দুইজন কারারুদ্ধের মধ্যে যে মুক্তি পাইয়াছিল এবং দীর্ঘকাল পরে যাহার স্মরণ হইল সে বলিল, আমি ইহার তাৎপর্য তোমাদিগকে জানাইয়া দিব। সুতরাং তোমরা আমাকে পাঠাও” (১২:৪৫)।
অর্থাৎ দুই বন্দীর মধ্যে যে মুক্তি পাইয়াছিল সে দরবারে উপস্থিত ছিল। দরবারীদের অক্ষমতা দেখিয়া সে বলিল, এবং দীর্ঘ সাত বৎসর সময়কাল পরে ইউসুফ (আ)-এর তা'বীর প্রদান এবং বিদায়কালে তাঁহার অনুরোধের কথা তাহার স্মরণ হইল, আমি এই স্বপ্নের তা'বীর আনিয়া দিতে পারি। তবে সেজন্য আমাকে জেলখানায় যাইতে হইবে। সুতরাং আমাকে জেলখানায় ইউসুফ (আ)-এর নিকট পাঠাইবার ব্যবস্থা করিয়া দিন। তৎক্ষণাৎ তাহাকে কারাগারে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হইল। সাকী জেলখানায় পৌছিয়া ইউসুফ (আ)-এর সহিত সাক্ষাত করিয়া বলিল:
يُوسُفُ أَيُّهَا الصِّدِّيقُ أَفْتِنَا فِي سَبْعِ بَقَرَاتٍ سِمَانٍ يَأْكُلُهُنَّ سَبْعٌ عِجَافٌ وَسَبْعَ سُنْبُلَت خُضْرٍ وَآخَرُ يُبِسْت لعَلَى ارْجِعُ إِلَى النَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَعْلَمُونَ
"সে বলিল, হে ইউসুফ! হে সত্যবাদী। সাতটি স্থূলকায় গাভী, উহাদিগকে সাতটি শীর্ণকায় গাভী ভক্ষণ করিতেছে এবং সাতটি সবুজ শীষ ও অপর সাতটি শুষ্ক শীষ সম্বন্ধে তুমি আমাদিগকে ব্যাখ্যা দাও, যাহাতে আমি লোকদের নিকট ফিরিয়া যাইতে পারি ও যাহাতে তাহারা অবগত হইতে পারে" (১২:৪৬)।
বাদশাহর স্বপ্নের বিবরণ শুনিয়া তিনি স্পষ্ট বুঝিতে পারিলেন যে, মিসরবাসীদের উপর এক মহাদুর্ভিক্ষ অত্যাসন্ন। কেননা সাতটি মোটাতাজা গরু ও সাতটি সতেজ শীষ দ্বারা এমন সাত বৎসর বুঝানো হইয়াছে যখন দেশে বিপুল পরিমাণ ফল-ফসল উৎপাদিত হইবে। ভূমি কর্ষণ ও চাষাবাদ এবং শস্য উৎপাদনের কাজে গরুর বিশেষ ভূমিকা রহিয়াছে। তদ্রূপ সাতটি জীর্ণশীর্ণ গরু ও সাতটি শুষ্ক শীষের মর্ম এই যে, বিপুল উৎপাদনের সাত বৎসর পরের সাত বৎসর দেশে প্রচণ্ড দুর্ভিক্ষ দেখা দিবে এবং সাতটি সবল গরুকে সাতটি দুর্বল গরুর খাইয়া ফেলার এবং শুষ্ক শীষগুলির সজীব শীষগুলিকে গ্রাস করিবার ব্যাখ্যা এই যে, উৎপাদনের সাত বৎসরের উদ্বৃত্ত ফসল দুর্ভিক্ষের সাত বৎসরে নিঃশেষ হইয়া যাইবে। শুধু পরবর্তী উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় বীজস্বরূপ সামান্য কিছু শস্য থাকিবে। সুতরাং ইউসুফ (আ) সাকীকে বলিলেন (কুরআন পাকের বর্ণনায়):
قَالَ تَزْرَعُونَ سَبْعَ سِنِينَ دَابًا فَمَا حَصَدتُمْ فَذَرُوهُ فِي سُنْبُلِهِ إِلَّا قَلِيلًا مِمَّا تَأْكُلُونَ ، ثُمَّ يَأْتِي مِنْ بَعْدِ ذلِكَ سَبْعُ شِدَادٌ يَأْكُلْنَ مَا قَدَّمْتُمْ لَهُنَّ إِلا قَلِيلًا مِّمَّا تُحْصِنُونَ . ثُمَّ يَأْتِي مِنْ بَعْدِ ذلِكَ عَامٌ فِيْهِ يُغَاتُ النَّاسُ وَفِيهِ يَعْصِرُونَ .
"ইউসুফ বলিল, তোমরা সাত বৎসর একাদিক্রমে চাষ করিবে, অতঃপর তোমরা যে শস্য কর্তন করিবে উহার মধ্যে যে সামান্য পরিমাণ তোমরা ভক্ষণ করিবে, তাহা ব্যতীত সমস্ত শীষসমেত রাখিয়া দিবে। ইহার পর আসিবে সাতটি কঠিন বৎসর, এই সাত বৎসর যাহা পূর্বে সঞ্চয় করিয়া রাখিবে, লোকে তাহা খাইবে, কেবল সামান্য কিছু যাহা তোমরা সংরক্ষণ করিবে, তাহা ব্যতীত। অতঃপর আসিবে এক বৎসর, সেই বৎসর মানুষের জন্য প্রচুর বৃষ্টিপাত হইবে এবং সেই বৎসর মানুষ প্রচুর ফলের রস নিংড়াইবে" (১২:৪৭-৪৯)।
পবিত্র কুরআন উহার অলংকারপূর্ণ ভাষায় ইউসুফ (আ) কর্তৃক প্রদত্ত স্বপ্নের তা'বীর ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের বর্ণনা মাত্র একটি বাক্য দ্বারা সম্পন্ন করিয়াছে। এখানে ইউসুফ (আ) কর্তৃক দুর্ভিক্ষকালের জন্য সতর্কতামূলক ব্যবস্থার দিকনির্দেশনা ছাড়াও একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, বাদশাহের স্বপ্নে সাত বৎসর প্রচুর উৎপাদনের পর সাত বৎসর দুর্ভিক্ষকাল থাকিবার প্রতি বাহ্য ইংগিত থাকিলেও উহার পরে একটি ভাল উৎপাদনের বৎসর আসিবার প্রতি কোন ইংগিত ছিল না। আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞান দ্বারা ইউসুফ (আ) বিষয়টি বুঝিতে পারিয়াছিলেন। বায়দাবী বলিয়াছেন, সম্ভবত ওহী সূত্রে তিনি বিষয়টি অবগত হইয়াছিলেন অথবা আল্লাহ তা'আলার বিশ্বপরিচালন সংক্রান্ত এই নীতি দ্বারা উহা উপলব্ধি করিয়াছিলেন যে, আল্লাহ বান্দাদের সংকটকালের পর পুনরায় স্বচ্ছলতা দান করেন। অনেক মুফাসসিরের মতে সাতটি দুর্বল গরু, তথা দুর্ভিক্ষ সাত বৎসরে সীমিত থাকা দ্বারা তিনি পরবর্তী বৎসর প্রচুর বৃষ্টি ও উৎপাদনের কথা বুঝিতে পারিয়াছিলেন। কেননা, তেমন না হইলে দুর্ভিক্ষকাল সাত বৎসরের অধিক হইত। হযরত কাতাদা (র) বলিয়াছেন, আল্লাহ তা'আলা ওহীর মাধ্যমেই ইউসুফ (আ)-কে বিষয়টি অবহিত করিয়াছিলেন যাহাতে স্বপ্নের তা'বীরের অতিরিক্ত কিছু জ্ঞানগর্ভ বিষয় সম্রাট ও দরবারীদের কানে পৌছিয়া যায় এবং উহাতে তাহাদের অন্তরে ইউসুফ (আ)-এর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ফলে তাঁহার সসম্মান মুক্তিলাভ ত্বরান্বিত হয়। স্বপ্নের ব্যাখ্যার সহিত উৎপাদিত ফসল শীষ সহকারে সংরক্ষণের পরামর্শ দান ছিল ইউসুফ (আ)-এর বিজ্ঞতার পরিচায়ক। কেননা ফসল পুরাতন হইলে উহাতে পোকা লাগিয়া থাকে এবং অভিজ্ঞতা দ্বারা প্রমাণিত হইয়াছে যে, শীষসহ সংরক্ষিত ফসল সাধারণত পোকা দ্বারা আক্রান্ত হয় না।
ইউসুফ (আ)-এর মুক্তির ঘটনার ধারাবাহিকতায় অনুমিত হয় যে, সাকী ইউসুফ (আ)-এর নিকট স্বপ্নের তা'বীর শুনিবামাত্র অবিলম্বে শাহী দরবারে প্রত্যাবর্তন করিয়া বাদশাহকে উহা অবহিত করিল এবং প্রসঙ্গত ইউসুফ (আ)-এর জ্ঞানবত্তা, বুদ্ধিমত্তা ও অতুলনীয় গুণাবলীর কথাও বাদশাহকে শুনাইল। বাদশাহ এই গুণাবলীর কথা শুনিয়া, বিশেষত জটিল স্বপ্নের সাবলীল ব্যাখ্যা ও সতর্কতামূলক পদক্ষেপ সংক্রান্ত দিকনির্দেশনা বাদশাহকে চিন্তামুক্ত করিবার সাথে সাথে ইউসুফ (আ)-এর সাক্ষাত লাভ ও তাঁহার সহিত প্রত্যক্ষ আলাপচারিতার জন্য তাহাকে উদগ্রীব করিয়া তুলিল। সুতরাং তৎক্ষণাৎ ইউসুফ (আ)-এর কারামুক্তির শাহী ফরমান জারী করা হইল।
وَقَالَ الْمَلِكُ ائْتُونِي بِهِ فَلَمَّا جَاءَهُ الرَّسُولُ قَالَ ارْجِعْ إِلى رَبِّكَ فَاسْتَلْهُ مَا بَالُ النِّسْوَةِ الَّتِي قَطَعْنَ أَيْدِيَهُنَّ إِنَّ رَبِّي بِكَيْدِهِنَّ عَلِيمٌ .
"রাজা বলিল, তোমরা ইউসুফকে আমার নিকট লইয়া আইস। যখন দূত তাহার নিকট উপস্থিত হইল তখন সে বলিল, তুমি তোমার প্রভুর নিকট ফিরিয়া যাও এবং তাহাকে জিজ্ঞাসা কর, যে নারীগণ হাত কাটিয়া ফেলিয়াছিল তাহাদের অবস্থা কী? নিশ্চয় আমার প্রতিপালক তাহাদের ছলনা সম্যক অবগত" (১২:৫০)।
সেই নারীদের তলব করিয়া আমাকে কারারুদ্ধ করিবার অভিযোগ সম্পর্কে তদন্ত করিয়া উহার সত্যাসত্য নিরূপণ করা হউক। সেই নারীদের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করিবার কারণ এই হইতে পারে যে, যুলায়খা তাহাদের সম্মুখেই وَلَقَدْ رَأَوْدَتْهُ عَنْ نَفْسِمِ (আমিই তাহাকে ফুসলাইয়াছি এবং সে নিজেকে পবিত্র রাখিয়াছে) বলিয়া নিজের অপরাধ ও ইউসুফ (আ)-এর নির্দোষ থাকিবার স্বীকারোক্তি করিয়াছিল। ইহার পরও নারীরা যুলায়খার পক্ষাবলম্বন করিয়াছিল এবং তাহারাও ইউসুফ (আ)-কে পদস্খলিত করিবার ফন্দি করিয়াছিল। আল্লাহ তা'আলা অবহিত আছেন কথাটির মর্ম এই যে, যুলায়খার অপবাদ যে চক্রান্ত ছিল তাহা আমার পালনকর্তা আল্লাহ তো জানেনই, তবে সংশ্লিষ্ট সকলের নিকটও বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া বাঞ্ছনীয়। নিরাপরাধ ইউসুফ (আ) দীর্ঘকাল ধরিয়া কারারুদ্ধ জীবন যাপন করিতেছিলেন। বিদেশ বিভূঁইয়ে মাঝে মধ্যে জেলখানায় গিয়া তাঁহার অবস্থা অবগত হওয়ার এবং সান্ত্বনা দেওয়ার কোন আপনজনও তাঁহার ছিল না। মানুষের দৃষ্টিতে তিনি একজন কয়েদী মাত্র। বাহ্যত এহেন পরিস্থিতিতে জেলখানার জীবনে অতিষ্ঠ হওয়ার কারণে মুক্তির যে কোন উপায় অন্বেষণ করা এবং মুক্তির ফরমানের সুসংবাদ শুনিবামাত্র আনন্দে উদ্বেলিত হইয়া বাহিরের মুক্ত বাতাসে ছুটিয়া আসাই ছিল তাঁহার জন্য স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু হযরত ইউসুফ (আ) ছিলেন ইহার সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। বার্তাবাহকের নিকট তাঁহার কারামুক্তির ব্যাপারে বাদশাহের সাগ্রহ ও স্বতঃপ্রবৃত্ত ফরমানের কথা শুনিয়া তিনি ধীরস্থির জবাব দিলেন, মুক্তি অবশ্যই আমার কাম্য তবে তাহা সরকারী ফরমান বলে নয়, বরং তদন্ত সাপেক্ষে অভিযোগ হইতে এবং নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার মাধ্যমে বিগত কারাবাসকে ক্ষমতাসীনদের জুলুম সাব্যস্ত করিয়া মুক্তি লাভই আমার কাম্য। ইতোপূর্বে তাঁহার আত্মপক্ষ সমর্থনের কোন সুযোগ আসে নাই। যেহেতু ক্ষমতাসীনরা নারীর মন রক্ষার জন্য ক্ষমতার দাপট দেখাইয়া বিচারের নামে প্রহসন করিয়া তাঁহাকে কারাবাসে নির্যাতিত করিয়াছিল এবং সমাজে তাঁহার নামে মিথ্যা অপবাদ রটাইয়াছিল। এখন আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ লাভ করিয়া সমগ্র ঘটনার তদন্ত দাবি করিলেন এবং মুক্তির বার্তাবাহক রাজকীয় দূতকে এই বলিয়া রাজদরবারে ফেরত পাঠাইলেন যে, তুমি বাদশাহের নিকট গিয়া আমার বিরুদ্ধে অভিযোগের সহিত সংশ্লিষ্ট নারীদের উপস্থিত করিয়া আমার সম্পর্কে তাহাদের বক্তব্য শ্রবণ করিতে বল। তাহাদের বক্তব্য, সাক্ষ্যপ্রমাণ ও রাজকীয় তদন্তে নির্দোষ সাব্যস্ত হইবার পরই কেবল আমি কারাগারের বাহিরে পা রাখিতে চাই। হযরত ইউসুফ (আ)-এর এই অবিচলিত জবাব দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, মিথ্যা অপবাদ প্রতিহত করা এবং উহা হইতে দায়মুক্ত হওয়ার জন্য প্রচেষ্টা চালানো অভিযুক্ত ব্যক্তির জন্য, বিশেষত বিশিষ্ট ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তির জন্য বাঞ্ছনীয়।
সায়্যিদ কুতবের মতে, যদি ইউসুফ (আ) বাদশাহের আহ্বানে সাড়া দিয়া আযীযের স্ত্রী ও অভিজাত নারী সমাজ এবং তাঁহার মধ্যকার ঘটনার আবরণ উন্মুক্ত না করিয়াই (তাঁহার নির্দোষ হওয়া প্রমাণিত না করিয়া) কারাগার হইতে বাহির হইয়া আসিতেন তবে অনেক মানুষের মনে এই সংশয় অবশিষ্ট থাকিবার আশংকা ছিল যে, হয়তো বা তাহাকে কোন অপরাধ ও পাপের শাস্তিস্বরূপ কারারুদ্ধ করা হইয়াছিল। সুতরাং শাহী ফরমানের পরেও ইউসুফ (আ) এই দাবি উত্থাপন করিলেন যে, আমার বিরুদ্ধে যে ভিত্তিহীন অভিযোগ ছিল, যাহার শাস্তিস্বরূপ আমাকে এই দীর্ঘকাল কয়েদীর জীবন কাটাইতে হইল আমি উহার তদন্ত হওয়া জরুরী মনে করিতেছি। তাঁহার এই তদন্তের দাবি ছিল সমকালীন প্রশাসন ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি একটি প্রচণ্ড চপেটাঘাত এবং সাথে সাথে উহা ছিল মিসরের সামাজিক পরিবেশ, বিশেষত তথাকার অভিজাত শ্রেণী ও তাহাদের বেগমদের লাগামহীন বেলেল্লাপনার বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদ, যাহাতে সমগ্র দেশ, নগর ও নগর সমাজ প্রকম্পিত হইয়া থাকিবে এবং তাহাদের এই উপলব্ধি জাগ্রত হইয়া থাকিবে যে, জুলুম, স্বৈরশাসন ও অসভ্যতার বিরুদ্ধে স্থৈর্য, অবিচলতা, নৈতিকতা ও আদর্শের বিজয় একটু বিলম্ব হইলেও অবশ্যম্ভাবী। আল্লাহ তা'আলার প্রত্যক্ষ তরবিয়াত ইউসুফ (আ)কে নৈতিকতা ও চারিত্রিক দৃঢ়তার এক সমুচ্চ স্তরে উন্নীত করিয়া তাঁহাকে সবর, স্থৈর্য, আল্লাহতে নির্ভরতা, আত্মবিশ্বাস ও আত্মিক প্রশান্তির প্রতীকে পরিণত করিয়াছিল। এই কারণে বাদশাহর পক্ষ হইতে আহ্বান আসা সত্ত্বেও তিনি তদন্তের পূর্বশর্ত আরোপ করিতে পারিয়াছিলেন। তদন্তের মাধ্যমে নির্দোষ প্রমাণিত না হইলে পরবর্তী কালে জনসাধারণের মুখে এই সমালোচনা উচ্চারিত হইতে পারিত যে, একজন কারাভোগী ও দোষীকে রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পদে আসীন করা হইয়াছে। অধীনস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ এবং রাজভবনের একান্ত কর্মচারীদের মধ্যে তাহাদের উর্ধতন সর্বোচ্চ নির্বাহীর প্রতি সম্ভ্রম ও শ্রদ্ধার অভাব দেখা দিত। বিশেষত মন্ত্রীবর্গ ও উচ্চপদস্থ গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারীদের মধ্যে এক ধরনের ক্ষোভ ও ঈর্ষা সৃষ্টির আশঙ্কা থাকিত। এসব কারণে পূর্বাহ্নেই এ বিষয়টির চূড়ান্ত ফয়সালা জরুরী ছিল (ফী জিলালিল কুরআন, ৪খ., ৭৩৬)।
এখানে এই প্রশ্ন উত্থাপিত হইতে পারে যে, হযরত ইউসুফ (আ) বাদশাহর আহ্বান প্রত্যাখ্যান করিয়া মুক্তির পূর্বেই তাঁহার মোকদ্দমার তদন্তের জন্য ব্যস্ত হইয়া পড়িলেন কেন? কারাগারের বাহিরে আসিয়াও তো তদন্তের দাবি করিতে পারিতেন। ইহার জবাব এই যে, ইহা ছিল হযরত ইউসুফ (আ)-এর প্রজ্ঞা ও নবীসুলভ দূরদর্শিতার পরিচায়ক। মূলত আল্লাহ তাআলা তাঁহার নবীগণকে যেরূপ পূর্ণাঙ্গ দীন দান করিয়া থাকেন তদ্রূপ তাঁহাদিগকে পূর্ণাঙ্গ পার্থিব বুদ্ধিমত্তাও দান করিয়া থাকেন। ইউসুফ (আ) শাহী ফরমান দ্বারা এই বিষয়টি আঁচ করিতে পারিয়াছিলেন যে, কারাগার হইতে ডাকিয়া মুক্তি প্রদানের পর মিসর সম্রাট আমাকে কোন সম্মাননা প্রদান কিংবা কোন রাজকীয় পদে বহাল করিতে পারেন। এইরূপ পরিস্থিতিতে বুদ্ধিমত্তার দাবি ইহাই যে, তাঁহার বিরুদ্ধে যেই অভিযোগ উত্থাপন করা হইয়াছিল এবং যাহার অজুহাতে তাঁহাকে কারারুদ্ধ করা হইয়াছিল উহার অসারতা বাদশাহ ও সংশ্লিষ্ট সকলের নিকট পরিপূর্ণরূপে প্রমাণিত হউক এবং তাঁহার দায়মুক্ত ও নির্দোষ হওয়ার ব্যাপারে কোন সন্দেহ অবশিষ্ট না থাকুক। মুক্তি লাভের পর কোন রাজকীয় মর্যাদায় ভূষিত হওয়ার কারণে মানুষের মুখ তো বন্ধ হইয়া যাইত। কিন্তু তাহাদের অন্তরে এইরূপ ধারণা আনাগোনা করিত যে, এই উচ্চপদের অধিকারী লোকটি সেই লোক যে তাহার মনিবের সম্ভ্রমে আঘাত করিয়াছিল।
এই প্রসঙ্গে হযরত ইউসুফ (আ)-এর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে একাধিক হাদীছ বর্ণিত হইয়াছে। সহীহ বুখারী, মুসলিম ও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হইয়াছে, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন : لو لبثت في السجن ما لبث يوسف لاجبت الداعي . "ইউসুফ (আ)-এর ন্যায় দীর্ঘকাল আমি কারাগারে থাকিলে আহ্বান পাওয়া মাত্র উহাতে সাড়া দিতাম"। মুসনাদে আহমাদের একটি বর্ণনায় আছে .... فاسئله ما بال النسوة
এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, لو كنت انا لاسرعت الاجابة وما ابتغيت العذر "আমি হইলে তো অবিলম্বে আহ্বানে সাড়া দিতাম এবং ওজর-আপত্তি করিতাম না" (মুখতাসার ইবন কাছীর, ২খ., পৃ. ২৫২, ২৫৩)। ইসহাক ইবন রাহাওয়ায়হ তাঁহার মুসনাদে, তাবারানী তাঁহার মু'জামে এবং ইবন মারদাওয়ায়হ ইবন 'আব্বাস (রা) সূত্রের হাদীছরূপে নবী (স) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন : عجبت لصبر اخي يوسف وكرمه والله يغفر له حيث ارسل اليه ليستفتى في الرؤيا ولو كنت انا لم افعل حتى اخرج وعجبت لصبره وكرمه والله يغفر له اتى ليخرج فلم يخرج حتي اخبرهم بعذره ولو كنت انا لبادرت الباب ولولا الكلمة لما لبث في السجن حيث يبتغى الفرج من عند غير الله عز وجل .
"আমার ভাই ইউসুফের (আ) সবর ও অভিজাত্য দেখিয়া আমি অভিভূত হইয়া পড়ি! আল্লাহ তাঁহাকে মাফ করুন (তাঁহার মর্যাদায় উন্নীত করুন)। যখন স্বপ্নের তা'বীরের জন্য তাঁহার কাছে দূত পাঠানো হইয়াছিল; আমি হইলে বাহির না হওয়া পর্যন্ত (তা'বীর প্রদান) করিতাম না। আমি অভিভূত হই তাঁহার সবর ও বদান্যতা দেখিয়া! আল্লাহ তাঁহাকে মাফ করুন। তাঁহার নিকট কারাগার হইতে বাহির হওয়ার পয়গাম আসিল, কিন্তু তিনি তাঁহার নির্দোষিতা প্রতিষ্ঠিত না করিয়া বাহির হইলেন না। আমি হইলে তো কারা তোরণের দিকে ছুটিয়া যাইতাম। আর সেই কথাটি না হইলে-তিনি যে মহান মহিয়ান আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নিকট সংকটমুক্তি অন্বেষণ করিয়াছিলেন-কারাগারে থাকিতে হইত না” (মাজহারী, ৫খ., ১৬৯)।
'ইকরিমা (র) হইতে মুরসাল হাদীছরূপে বর্ণিত হইয়াছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন:
لقد عجبت من يوسف وبره وكرمه والله يغفر له حسين سئل عن البقرات العجاف والسمان ولو كنت مكانه ما اجبتهم حتى اشرط ان يخرجونى ولقد عجبت من يوسف وصبره وكرمه والله يغفر له حين اتاه الرسول فقال ارجع الي ربك ولو كنت مكانه ولبثت في السجن ما لبث لاسرعت الاجابة لبادرتهم الباب ولكنه اراد ان يكون له العذر ولما ابتغيت العذر ان كان الحليما ذا اتاه
"আমি অভিভূত হইয়া যাই ইউসুফ (আ) এবং তাঁহার বদান্যতা ও সবর দেখিয়া। আল্লাহ তাঁহাকে মাফ করুন- যখন তাঁহাকে দুর্বল ও সবল গরু সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হইল। আমি তাঁহার স্থানে থাকিলে পূর্বে আমাকে বাহির করিয়া আনিবার শর্ত আরোপ করিতাম। আমি পুনরায় অভিভূত হই ইউসুফ (আ) এবং তাঁহার সবর ও মর্যাদায় যখন (রাজকীয়) দূত তাঁহার নিকট আসিল (তখন তিনি বলিলেন, তোমার মালিকের নিকট ফিরিয়া যাও)। আমি তাহার স্থানে থাকিলে (এবং তাঁহার মত কারাভোগ করিলে দ্রুত সাড়া দিতাম এবং) দরজার দিকে ছুটিয়া যাইতাম, কিন্তু তিনি নিজের আপত্তি প্রকাশ করিতে ইচ্ছা করিলেন (আমি অবশ্যই আপত্তি করিতাম না; তিনি ছিলেন সহনশীল ও স্থৈর্যবান) (মুখতাসার ইবন কাছীর, ২খ., ২৫৩; মাজহারী, ৫খ., ১৬৯)। নবী (স)-এর এই উক্তি মূলত তাঁহার অতুলনীয় বিনয়, ইউসুফ (আ)-এর ধৈর্য ও সহনশীলতার প্রশংসা এবং তাঁহার উম্মত ও সাধারণ মানুষের জন্য শিক্ষামূলক (মajহারী, ৫খ., ১৬৯; মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., ৬৫, ৬৬)।
ইউসুফ (আ) তাঁহার তদন্ত দাবির বক্তব্য পেশ করিয়াছিলেন آن ربي بكيدهن علیم বলিয়া। ইহাতে নারীদের প্রতি প্রচ্ছন্ন সতর্কবাণী ছিল যাহাতে তাহারা পুনরায় মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণের সাহস না পায় (মাজহারী, ৫খ., ১৭০; মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., ৬৫)। কেহ কেহ বলিয়াছেন, এখানে আমার মনিব বলিতে আযীযে মিসরকে বুঝানো হইয়াছে, যিনি নারীদের চক্রান্তের কথা অবগত ছিলেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ., ২০৯)।
হযরত ইউসুফ (আ)-এর জবাব নিয়া শাহী দূত বাদশাহর নিকট প্রত্যাবর্তন করিল এবং কারাগারের বাহিরে আসিবার পূর্বে বিষয়টি তদন্তের দাবির কথা তাহাকে অবহিত করিল। বাদশাহ ইউসুফ (আ)-এর দৃঢ়তা ব্যঞ্জক ও স্পষ্ট জবাব শুনিয়া স্বভাবতই তাঁহার প্রতি আরও অধিক আকৃষ্ট ও তাঁহার যোগ্যতার প্রতি অধিক আস্থাবান হইলেন। তিনি আযীয পত্নীসহ নারীদিগকে দরবারে তলব করিয়া এই ব্যাপারে তাহাদের বক্তব্য পেশ করিতে বলিলেন। এই প্রসঙ্গে কুরআনুল করীমের বর্ণনা নিম্নরূপ:
قَالَ مَا خَطْبُكُنَّ إِذْ رَاوَدْتُنَّ يُوسُفَ عَنْ نَفْسِهِ قُلْنَ حَاشَ لِلَّهِ مَا عَلِمْنَا عَلَيْهِ مِنْ سُوْءٍ قَالَتِ امْرَأَتُ الْعَزِيزِ التن حَصْحَصَ الْحَقُّ أَنَا رَاوَدَتُهُ عَنْ نَفْسِهِ وَإِنَّهُ لَمِنَ الصَّادِقِينَ . ذَلِكَ لِيَعْلَمَ أَنِّي لَمْ أَخُنْهُ بِالْغَيْبِ وَأَنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي كَيْدَ الْخَائِنِينَ. وَمَا أَبْرِّئُ نَفْسِي إِنَّ النَّفْسَ لَأَمَّارَةٌ بِالسَّوْءِ إِلا مَا رَحِمَ رَبِّي إِنْ رَبِّي رَغَفُورٌ رَّحِيمٌ .
"রাজা নারিগণকে বলিল, যখন তোমরা ইউসুফ হইতে অসৎ কর্ম কামনা করিয়াছিলে, তখন তোমাদিগের কী হইয়াছিল? তাহারা বলিল, অদ্ভূত আল্লাহর মাহাত্ম্য! আমরা উহার মধ্যে কোন দোষ দেখি নাই। আযীযের স্ত্রী বলিল, এক্ষণে সত্য প্রকাশ হইল, আমিই তাহাকে ফুসলাইয়াছিলাম, সে তো সত্যবাদী। (সে বলিল) ইহা এইজন্য যে, যাহাতে সে জানিতে পারে যে, তাহার অনুপস্থিতিতে আমি তাহার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করি নাই এবং নিশ্চয় আল্লাহ বিশ্বাসঘাতকদের ষড়যন্ত্র সফল করেন না। (সে বলিল,) আমি নিজেকে নির্দোষ মনে করি না, মানুষের মন অবশ্যই মন্দ কর্মপ্রবণ, কিন্তু সে নহে, যাহার প্রতি আমার প্রতিপালক দয়া করেন। আমার প্রতিপালক অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু" (১২ঃ ৫১-৫৩)।
বাদশাহ্ দরবারে উপস্থিত আযীযের স্ত্রী ও তাহার বাড়িতে আমন্ত্রিত নারীদের সকলকেই সম্বোধন করিয়া তাহার প্রশ্নটি রাখিলেন এবং 'তোমরা অসৎকর্ম কামনা করিয়াছিলে' বলিয়া সম্বোধন করিলেন (ইবন কাছীর, ২খ., ২৫৩; মাজহারী, ৫খ., ১৭০; মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., ৬৭)।
মোটকথা, বাদশাহ নারীদের জিজ্ঞাসা করিলেন যে, তোমরা যখন ইউসুফ (আ)-কে ফুসলাইয়াছিলে তখন কি তোমরা তাঁহার পক্ষ হইতে তোমাদের কাহারো প্রতি কোন আকর্ষণ অনুভব করিয়াছিলে (মাজহারী, ৫খ., ১৭০)? তখন নারীদের সকলে একবাক্যে ও সম্মিলিতরূপে বলিল, আল্লাহ্রই মহিমা ও মাহাত্ম্য! আমরা তো তাঁহার মধ্যে কোনই দোষ দেখিতে পাই নাই। কোন পাপ বা বিশ্বাসঘাতকতা দেখি নাই (মাজহারী, ৫খ., ১৭০; ইবন কাছীর, ২খ., ২৫৩। নারীরা ইউসুফ (আ)-এর পূত পবিত্র হওয়ার স্বীকৃতি দিল, তবে তাহারা যুলায়খার পূর্ব স্বীকারোক্তি উল্লেখ করিল না। ইহার কারণ এই হইতে পারে যে, উদ্দেশ্য ছিল ইউসুফ (আ)-এর পবিত্রতা প্রকাশ করা এবং সেজন্য যুলায়খার স্বীকারোক্তি উল্লেখের প্রয়োজন ছিল না অথবা যুলায়খা সম্মুখে উপস্থিত থাকার কারণে তাহার নাম উল্লেখ তাহারা লজ্জাবোধ করিয়াছিল (মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., ৬৭); (ইবন কাছীর, ২খ., ২৫৩; বিদায়া, ২খ., ২০৯; মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., ৬৭)।
তাঁহার পরবর্তী উক্তিতে ইউসুফ (আ) আরও বলিলেন, আমি যে নিজের নির্দোষ হওয়ার ও বিশ্বাসঘাতকতা না করিবার দাবি করিলাম এবং তদন্তের দাবি করিয়া'শক্ত অবস্থান গ্রহণ করিলাম, ইহা আমি শুধু আত্মরক্ষার জন্য করিতে বাধ্য হইয়াছি, কাহাকেও আঘাত করার জন্য কিংবা আত্মগতির জন্য নহে। 'আমি প্রত্যক্ষ ও স্বকীয়রূপে নিজেকে পবিত্র দাবি করিতেছি না। কেননা, প্রত্যেক মানুষের মন ও প্রবৃত্তি মন্দ কাজেই অতিশয় উদ্বুদ্ধকারী। তবে যখন আমার পালনকর্তা আল্লাহ কাহারও প্রতি অনুগ্রহ করেন এবং তাহার ভিতরে বিদ্যমান মন্দের মৌলিক উপকরণকে বিলুপ্ত ও অথবা প্রদর্শিত করিয়া দেন- যেরূপ অবস্থা নবীগণের প্রবৃত্তির হইয়া থাকে যে, আল্লাহ তাআলার বিশেষ রহমতে উহা স্থির ও প্রশান্ত (মুতমাইন্নাঃ) হইয়া যায় এবং তাঁহাদের সত্তায় মানবসুলভ প্রবৃত্তির সহিত নবীসুলভ সুপ্রবৃত্তি সহঅবস্থান করে, তখনই সে পাপ ও অপবিত্রতা হইতে সুরক্ষা লাভ করিয়া থাকে [বলা অনাবশ্যক যে, ইউসুফ (আ)-এর প্রবৃত্তিও স্থির ও প্রশান্ত পর্যায়ের ছিল। (মা'আরিফুল কুরআন ৫খ., ৭২, তাফসীরে মাজেদী, পৃ. ৪৯৭)।
বক্তব্যের শেষাংশে তিনি বলিলেন, আমার প্রতিপালক অতিশয় ক্ষমাশীল ও দয়াবান অর্থাৎ কেহ ভুল ভ্রান্তি করিয়া অপরাধ স্বীকার করিলে এবং তওবা করিলে আল্লাহ তাহাকে ক্ষমা করিয়া দেন। আর যাহারা পূর্ব হইতেই নিষ্পাপ থাকে তাঁহাদিগকে মনে রাখিতে হইবে যে উহা তাঁহার নিজস্ব ও ব্যক্তিগত কোন গুণ বা অর্জন নহে, বরং উহা আল্লাহর রহমতেরই বহিঃপ্রকাশ (মা'আরিফ, ঐ মাজহারী, ৫খ., ১৭২)।
মুফাসসিরগণ লিখিয়াছেন, হযরত ইউসুফ (আ)-এর এই উক্তির কারণস্বরূপ হাদীছে বর্ণিত হইয়াছে যে, ইউসুফ (আ) যখন বলিলেন, ذَلِكَ لِيَعْلَمَ তখন জিবরীল (আ) বলিলেন, إِنِّي لَمْ أَخُنْهُ بِالْغَيْبِ যখন আপনার মনে আকর্ষণ সৃষ্টি হইয়াছিল তখনও নয় কি ولا يوم هممت بما هممت به ইবন কাছীর, ২খ., ২৫৩(?
হাদীছটি ইবন মারদাওয়ায়হ আনাস (রা) হইতে মারফু'রূপে রিওয়ায়াত করিয়াছেন এবং বায়দাবী ইবন 'আব্বাস (রা) হইতে মাওকূফরূপে রিওয়ায়াত করিয়াছেন (দ্র. ইবন কাছীর, ২খ., ২৫৩; রূহুল মা'আনী, ১৩ পারা, ২; মাজহারী, ৫খ., ১৭১)।
তখন ইউসুফ (আ) বলিয়াছিলেন, وَمَا أُبَرِّئُ نَفْسِي হাদীছটি প্রামাণ্য হইলে উহাতে 'আকর্ষণ'-এর অর্থ হইবে মানবের স্বভাব সুলভ অনিচ্ছাকৃত দোদুল্যমানতা; কোনক্রমেই উহা ইচ্ছা ও সংকল্প (عزم) স্তরের ছিল না। অনেকের মতে ইহা ছিল ইউসুফ (আ)-এর নবুওয়াত-পূর্ব সময়ের ঘটনা (রূহুল মা'আনী, ঐ)। তবে মুফাসসিরগণের বৃহদাংশ হাদীছটির উল্লেখ হইতে বিরত থাকিয়া ইউসুফ (আ)-এর উক্তির মর্ম সম্পর্কে বলিয়াছেন যে, ইউসুফ (আ) তাঁহার ذَلِكَ لِيَعْلَمَ উক্তিতে আত্মস্তুতি ও আত্মপরিশুদ্ধির দাবির (যাহা আল্লাহ তা'আলার বিধান فلا تزكوا انفسكم তোমরা নিজেদের পরিশুদ্ধি ঘোষণা করিও না” দ্বারা নিষিদ্ধ করা হইয়াছে) ধারণা নিরসনকল্পে বলিলেন, وَمَا أُبَرِّئُ نَفْسِي আমার পূর্বোক্ত বক্তব্য শুধু পবিত্র থাকিবার বাস্তব কথাটি প্রকাশ করিবার উদ্দেশে বলিয়াছি, উহা আমার তাকওয়া ও আত্মপরিশুদ্ধির ঘোষণা হিসাবে বলি নাই। এইরূপ মহা সঙ্কটকালে পাপের কলুষতা হইতে রক্ষা পাওয়া আমার ব্যক্তিগত ও স্বকীয় কোন যোগ্যতা নয়, বরং আল্লাহ তা'আলার দয়া, তাওফীক ও সাহায্যের ফলশ্রুতিতেই উহা সম্ভব। হইয়াছে। কাজেই আমি যে নিজের পবিত্রতার কথা বলিতেছি উহা আমার প্রতি আল্লাহ তা'আলার বিশেষ অনুগ্রহ ও নি'মাতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশস্বরূপ বলিতেছি যে, তিনি পাপ-পংকিলতা হইতে পূর্ণরূপে রক্ষা করিবার সাথে সাথে আমাকে গৌরব, অহং ও আত্মম্ভরিতার বদগুণ হইতেও রক্ষা করিয়াছেন (মাজহারী, ৫খ., ১৭১; মুফতী শফী, মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., ৭৩, ৭৪; তাফসীরে মাজেদী, পৃ. ৪৯৭; কান্ধলাবী, মা'আরিফুল কুরআন, ৪খ., ৪০-৪১, বরাত কুরতুবী, ৯খ., ২১; তাফসীরে কাবীর, ৫খ., ১৪২)। কোন কোন রিওয়ায়াত দ্বারা জানা যায় যে, ইউসুফ (আ)-এর অন্তরে এক ধরনের আকর্ষণের দোলা লাগিয়াছিল, যদিও উহা অনিচ্ছাকৃত ও মনের উস্ উস্ (ওয়াস্তয়াসা) পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু নবুওয়াত মর্যাদার বিপরীতে উহাকে এক ধরনের বিচ্যুতি বিবেচনা করিয়া তিনি নিজের সম্পর্কে প্রকাশ করিয়া দিলেন যে, আমি আমার মনকে সম্পূর্ণরূপে নির্দোষ ও পবিত্র মনে করি না (মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., ৭৪)। পবিত্র কুরআনের সূরা ইউসুফের এই আয়াতদ্বয় (৫২-৫৩) হযরত ইউসুফ (আ)-এর উক্তি হওয়ার অভিমতই সাধারণভাবে মুফাসসিরগণ গ্রহণ করিয়াছেন। তাঁহাদের মতে, এই ধরনের ঈমানদীপ্ত ও তাকওয়াপূর্ণ উক্তি ইউসুফ (আ)-এর ন্যায় একজন পয়গম্বরের মুখেই শোভা পায় এবং ইহার পূর্বের উক্তিটি জুলায়খার হওয়ার কারণে এবং বাদশাহ্ দরবারে সে সময় ইউসুফ (আ) উপস্থিত না থাকার কারণে পরবর্তী উক্তি ইউসুফ (আ)-এর হইতে না হওয়ার দাবি গ্রহণযোগ্য নহে। কেননা ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ উহ্য রহিয়াছে। পবিত্র কুরআনের বহু স্থানে এই ধরনের উহ্য রাখিবার নজীর রহিয়াছে। পক্ষান্তরে কয়েকজন বিশিষ্ট মুফাসসির উক্ত আয়াতদ্বয়কে ইউসুফ (আ)-এর উক্তি বলিয়া ভিন্ন মত পোষণ করিয়াছেন। তাঁহাদের মতে আয়াতের অর্থ হইবে, ইহা এইজন্য করিয়াছি যাহাতে বাদশাহও জানিতে পারেন যে, আমি (ইউসুফ) তাহার উযীর আযীযের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করি নাই অথবা বাদশাহর সহিত বিশ্বাসঘাতকতা করি নাই।
ইমাম রাযী (র) এ প্রসঙ্গটির চমৎকার ও তাৎপর্যপূর্ণ বিশ্লেষণে বলিয়াছেন, "ইউসুফ (আ) আল্লাহ তা'আলার সত্য পয়গাম্বর ও নিষ্পাপ নবী ছিলেন। সুতরাং তাঁহার পবিত্রতা সর্বপ্রকার পঙ্কিলতা হইতে মুক্ত ছিল এবং তাঁহার জীবনের কোন মুহূর্তই কালিমালিপ্ত হয় নাই। এই কারণেই আল্লাহ তা'আলার কুদরতের মহিমায় ইউসুফ (আ)-এর ঘটনার সহিত সংশ্লিষ্ট প্রতিটি চরিত্রের মুখ হইতে তাঁহার পবিত্রতা ও অপাপবিদ্ধতার স্বীকারোক্তি উচ্চারিত হইয়াছে। কেননা আরবীতে একটি প্রবাদ আছে (افضل ماشهد به الاعداء শত্রুর সাক্ষ্য বড় সাক্ষ্য)। ইউসুফ (আ)-এর ঘটনায় তিনি ব্যতীত আর যাহারা ছিল তাহাদের তালিকায় ছিল আযীযে মিসরের স্ত্রী-জুলায়খা, তাহার বান্ধবী নগরীর অভিজীত বেগমগণ, আযীযে মিসর স্বয়ং এবং আযীয পত্নীর (অথবা মতান্তরে আযীযের) আত্মীয় (বয়স্ক অথবা দুগ্ধপোষ্য শিশু)। সর্বাগ্রে আযীয পত্নীর আত্মীয় উপস্থিত হইল এবং জামা ছিঁড়িবার ব্যাপারে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত প্রদান করিয়া নারীকে অপরাধী ও ইউসুফ (আ)-কে নির্দোষ সাব্যস্ত করিল। বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করিয়া আযীযও ইউসুফ (আ)-এর নির্দোষ ও নিষ্পাপ হওয়ার স্বীকারোক্তি করিলেন। কেননা তিনি বলিলেন, 'ইহা নারী চক্রান্ত (জুলায়খা!) তুমি পাপের জন্য 'ইসতিগফার কর'! এবং সাথে সাথে ইউসুফকে বলিলেন, 'বিষয়টি উপেক্ষা কর' এই বলিয়া... তিনি নিজের মান-সম্ভ্রম রক্ষার খাতিরে ব্যাপারটি সেখানেই শেষ করিয়া দেওয়ার অনুরোধ করিলেন।
اَلْنَ حَصْحَصَ الْحَقُّ اَنَا رَاوَدَتُهُ عَنْ نَفْسِهِ وَاَنَّهُ لَمِنَ الصَّدِقِيْنَ . (কাসাসুল কুরআন, ১খ., ৩১০, ৩১১; বরাত তাফসীরে কাবীর, সূরা ইউসুফ)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 রাষ্ট্রীয় নির্বাহী পদে ইউসুফ (আ)

📄 রাষ্ট্রীয় নির্বাহী পদে ইউসুফ (আ)


প্রথমত হযরত ইউসুফ (আ)-এর প্রতি দরবারী সাকীর অপরিসীম ভক্তি-শ্রদ্ধা এবং তাহার মুখে ইউসুফ (আ)-এর বুদ্ধিমত্তা ও গুণাবলীর কথা শুনিয়া বাদশাহর মনে ইউসুফ (আ) সম্পর্কে আগ্রহ সৃষ্টি হইয়াছিল। অতঃপর বাদশাহ্র জটিল ও দুর্বোধ্য স্বপ্নের যথার্থ ও গ্রহণযোগ্য তা'বীর এবং উহার সহিত স্বেচ্ছাপ্রণোদিতরূপে ইউসুফ (আ) কর্তৃক প্রদত্ত 'দুর্ভিক্ষ নিয়ন্ত্রণ মহাপরিকল্পনা'-র কথা শুনিয়া বাদশাহ তাঁহার প্রতি অধিক আকৃষ্ট হইয়া এবং নিজ কানে স্বপ্নের ব্যাখ্যা শুনিবার জন্য তাঁহাকে রাজ- দরবারে আসিবার আহ্বান জানান।
বাদশাহ ইউসুফ (আ)-কে রাজদরবারে বিশেষ রাজকীয় সম্মান প্রদান ও নিজের একান্ত উপদেষ্টা পদে বরণের ঘোষণাসহ তাঁহার সম্মানে কারামুক্তির ফরমান জারী করিলেন এবং ইউসুফ (আ)-কে আনিবার জন্য বিশেষ দূত পাঠাইলেন (ফী জিলালিল কুরআন, ৫খ., ১৮, ১৯; কাসাসুল কুরআন, ১খ., ৩১২)। পবিত্র কুরআনের বর্ণনায় : وَقَالَ الْمَلِكُ ائْتُونِي بِهِ أَسْتَخْلِصُهُ لِنَفْسِي فَلَمَّا كَلَّمَهُ قَالَ إِنَّكَ الْيَوْمَ لَدَيْنَا مَكِينٌ أَمِينٌ. قَالَ اجْعَلْنِي عَلَى خَزَائِنِ الْأَرْضِ إِنِّي حَفِيظٌ عَلِيمٌ. وَكَذَلِكَ مَكَّنَا لِيُوسُفَ فِي الْأَرْضِ يَتَبَوا مِنْهَا حَيْثُ يَشَاءُ نُصِيبُ بِرَحْمَتِنَا مَنْ نَشَاءُ وَلَا نُضِيعُ أَجْرَ الْمُحْسِنِينَ . وَلَأَجْرُ الآخِرَةِ خَيْرٌ لِلَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ.
"রাজা বলিল, ইউসুফকে আমার নিকট লইয়া আইস, আমি তাহাকে আমার একান্ত সহচর নিযুক্ত করিব। অতঃপর রাজা যখন তাহার সহিত কথা বলিল তখন বলিল, আজ তুমি আমাদের নিকট মর্যাদাশীল, বিশ্বাসভাজন হইলে। ইউসুফ বলিল, আমাকে দেশের ধনভাণ্ডারের উপর কর্তৃত্ব প্রদান করুন, আমি তো উত্তম রক্ষক, সুবিজ্ঞ। এইভাবে ইউসুফকে আমি সেই দেশে প্রতিষ্ঠিত করিলাম; সে সেই দেশে যথা ইচ্ছা অবস্থান করিতে পারিত। আমি যাহাকে ইচ্ছা তাহার প্রতি দয়া করি; আমি সৎকর্মপরায়ণদের শ্রমফল নষ্ট করি না। যাহারা মু'মিন এবং মুত্তাকী তাহাদের আখিরাতের পুরস্কারই উত্তম" (১২ঃ ৫৪-৫৭)।
রাজকীয় বার্তাবাহক জেলখানায় পৌঁছিয়া ইউসুফ (আ)-কে বলিল, বাদশাহের আহ্বানে সাড়া দিন। আযীযের স্ত্রী ও নারীরা এক বাক্যে আপনার পবিত্রতা স্বীকার করিয়াছে এবং বাদশাহ আপনার সসম্মান মুক্তির ফরমান সহকারে আমাকে পাঠাইয়াছেন। তিনি আপনার সাক্ষাতের জন্য অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষার প্রহর গণনা করিতেছেন। ইউসুফ (আ) গোসল করিয়া পরিচ্ছন্ন হইলেন এবং নূতন পোশাক পরিধান করিয়া রাজ-দরবারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করিলেন। বাহির হওয়ার সময় তিনি কারাগার তোরণে লিখিয়া আসলেন:
"ইহা জীবন্তদের গোরস্থান, দুঃখ-কষ্টের আবাসস্থল, বন্ধুদের পরীক্ষাগার ও শত্রুদের মনের খুশি লাভের স্থান"।
ওয়াহ্হ্ব (র) বলিয়াছেন, রাজভবনের দরজায় পৌঁছিয়া তিনি দু'আ করিলেন:
"আমার দুনিয়ার ব্যাপারে আমার পালনকর্তাই আমার জন্য যথেষ্ট; আমার পালনকর্তাই তাঁহার সমগ্র সৃষ্টির বিপরীতে আমার জন্য যথেষ্ট; তাঁহার আশ্রয় লাভই পূর্ণাঙ্গ সুরক্ষা, তাঁহার প্রশংসা মহিয়ান এবং তিনি ব্যতীত আর কোন ইলাহ নাই"।
রাজভবনে প্রবেশের পর দরবারে পৌঁছিয়াও তিনি অনুরূপ দু'আ করিলেন। বাদশাহকে দেখিয়া তিনি দু'আ করিলেন:
اسئلك بخيرك من خيره واعوذ بك من شره وشرغيره
"ইয়া আল্লাহ! আমি আপনার নিকট তাহার কল্যাণ হইতে আপনার কল্যাণ প্রার্থনা করিতেছি এবং তাহার অনিষ্ট ও অন্যদের অনিষ্ট হইতে আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করি"।
বাদশাহ তাঁহার দিকে দৃষ্টিপাত করিলে তিনি আরবী ভাষায় সালাম করিলেন। বাদশাহ জিজ্ঞাসা করিলেন, ইহা কোন ভাষা? ইউসুফ (আ) বলিলেন, আমার 'চাচা' ইসমা'ঈল (আ)-এর ভাষা। অতঃপর ইউসুফ (আ) 'ইবরানী (হিব্রু) ভাষায় বাদশাহর জন্য দু'আ করিলে বাদশাহ বলিলেন, ইহা কোন ভাষা? ইউসুফ (আ) বলিলেন, ইহা আমার পিতৃপুরুষদের ভাষা। ওয়াহ্ব (র) আরও বলিয়াছেন, বাদশাহ সত্ত্বরটি ভাষা জানিতেন এবং এইগুলির যে কোন ভাষায় বাদশাহ কথা বলিলে ইউসুফ (আ) সে ভাষায়ই জবাব দিতেন। অধিকন্তু তিনি আরবী ও 'ইবরানী ভাষায় দ্বারা তাঁহার অধিক ভাষা জ্ঞানের প্রমাণ রাখিলেন। বাদশাহ অল্পবয়সেই (৩০ বৎসর বয়সে) ইউসুফ (আ)-এর বিদ্যা-বুদ্ধি, জ্ঞান-গরিমা দৃষ্টে মুগ্ধ হইলেন। বাদশাহ বলিলেন, অদ্য হইতে তুমি আমাদের নিকট মর্যাদা ও বিশ্বস্ততার পাত্র। তোমার যোগ্যতা ও গুণাবলী দেখিয়া আমরা অভিভূত (তাফসীরে মাজহারী, ৫খ., ১৭২; মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., ৭৫; আল-কামিল, ১খ, ১১১)। ইউসুফ (আ) শুধু কারাজীবন হইতেই মুক্তিলাভ করিলেন না, বরং তিনি স্বীয় যোগ্যতা, প্রতিভা, সদগুণাবলীর অকুণ্ঠ স্বীকৃতি হিসাবে রাজকীয় সম্মান ও মর্যাদার আসনেও অভিষিক্ত হইলেন। তিনি কুরআনের ভাষায় রাজদরবারে مكين أمين অর্থাৎ মর্যাদাশীল, বিশ্বাসভাজন খেতাবেও ভূষিত হইলেন (ফী জিলালিল কুরআন, ৫খ., ২০)।
অতঃপর বাদশাহ দুর্ভিক্ষের মহাসংকট সম্পর্কে ইউসুফ (আ)-এর নিকট পরামর্শ চাহিয়া বলিলেন, এখন আমাদিগকে কি করিতে হইবে তাহা বলুন। ইউসুফ (আ) বলিলেন, প্রথম যে সাত বৎসর প্রচুর বৃষ্টি হইবে এই বৎসরগুলিতে আপনি অধিক পরিমাণ চাষাবাদ ও ফসল উৎপাদনের পরিকল্পনা গ্রহণ করুন এবং সমগ্র দেশবাসীকে তাহাদের নিজ নিজ জমিতে অধিকতর পরিমাণে চাষাবাদ করিবার আদেশ জারী করুন। অতঃপর উৎপাদিত ফসল ডাঁটা ও শীষসহ গুদামজাত করিবার ব্যবস্থা করুন। ডাঁটা ও শীষ পশুর খাবারের চাহিদা মিটাইবে এবং শস্যবীজ পোকায় ধরিয়া নষ্ট হইবে না। জনসাধারণকে আদেশ দিবেন যে, তাহারা যেন উৎপাদিত ফসলের এক-পঞ্চমাংশ সংরক্ষণ করিয়া রাখে। এইরূপ করিলে মিসর ও পার্শ্ববর্তী দেশের অধিবাসীদের নিকট দুর্ভিক্ষের বৎসরগুলির জন্য ভাণ্ডার সঞ্চিত হইবে এবং তাহাদের ব্যাপারে আপনার দুশ্চিন্তা লাঘব হইবে। আর সরকারী খাসভূমির উৎপাদন ও আদায়কৃত রাজস্ব হইতে যে ফসল সংগৃহীত হইবে উহা আপনি বহিরাগতদের জন্য খাদ্য সঞ্চিত রাখিবেন। কেননা এই দুর্ভিক্ষ মিসরের বাহিরেও দূর-দূরান্ত পর্যন্ত বিস্তার লাভ করিবে এবং ভিন দেশের লোকেরা তখন রেশন ও সাহায্য পাওয়ার জন্য আপনার শরণাপন্ন হইবে। তখন আপনি ফসল বিতরণ করিয়া আল্লাহর সৃষ্টির সেবা করিতে পারিবেন এবং যৎসামান্য বিনিময় মূল্য গ্রহণ করিয়া সরকারী কোষাগারকে সমৃদ্ধ করিতে পারিবেন। আপনার কোষাগারে তখন এত সম্পদ সঞ্চিত হইবে, যাহা ইতোপূর্বে কখনও কাহারও নিকট হয় নাই (মা'আরিফুল কুরআন, ৪খ., ৭৬; মাজহারী, ৫খ., ১৭৩)।
ইউসুফ (আ)-এর পরামর্শ শুনিয়া বাদশাহ অত্যন্ত আনন্দিত ও নিশ্চিন্ত হইয়া বলিলেন, তবে এই মহা পরিকল্পনা কিরূপে বাস্তবায়িত হইবে এবং কে আমার পক্ষে এই বোঝা বহন করিবে? বাদশাহর এই আবেগপূর্ণ প্রশ্নের জবাবে তাহাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্যই ইউসুফ (আ) বলিয়াছিলেন, আমাকে রাষ্ট্রীয় ভাণ্ডারের দায়িত্ব দিতে পারেন। আমি যথাযথ সংরক্ষণ ও তত্ত্বাবধান করিতে পারিব এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিশ্বস্ততার পরিচয় দিতে পারিব। ইউসুফ (আ) তাঁহার বক্তব্যে দুইটি শব্দ حفیظ ও علیم উল্লেখ করিয়া একজন সরকারী দায়িত্বশীল, বিশেষত অর্থ-সম্পদ ও রাষ্ট্রীয় ভাণ্ডারের পদাধিকারী ব্যক্তির জন্য অপরিহার্য গুণাবলীর উল্লেখ করিয়াছিলেন। কেননা রাষ্ট্রীয় সম্পদ ভাণ্ডারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির প্রথম কর্তব্য হইতেছে সরকারী সম্পদ অহেতুক ব্যয় ও বিনষ্ট না করিয়া উহার পূর্ণাঙ্গ সংরক্ষণ করা এবং অযোগ্য পাত্রে ও ক্ষেত্রে অপচয় করা হইতে রক্ষা করা। দ্বিতীয় কর্তব্য আয়-ব্যয়ের যথাযথ হিসাব সুষ্ঠু ও সুচারুরূপে সংরক্ষণ করা। حفیظ শব্দ দ্বারা প্রথম বিষয়টি এবং علیم শব্দ দ্বারা দ্বিতীয় বিষয়টির নিশ্চয়তা বিধান করা হইয়াছে। (মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., ৭২, ৭৭)।
এই পদ ও ক্ষমতাকে আল্লাহ তা'আলার বিধান কার্যকর করা, সত্য প্রতিষ্ঠা করা, ন্যায়-ইনসাফের বিস্তার ঘটানো অর্থাৎ পৃথিবীতে নবী পাঠাইবার মুখ্য উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের পথ সুগম করিবার লক্ষ্যে হযরত ইউসুফ (আ) এ ক্ষেত্রে নিজের বিশ্বস্ততা ও কর্তব্য সম্পাদনে দক্ষতার গুণের কথা উল্লেখ করিয়া রাষ্ট্রীয় পদের প্রার্থী হইয়াছিলেন। কেননা তিনি জানিতেন যে, ঐ মুহূর্তে তাঁহার স্থলে দায়িত্ব পালনের যোগ্য অন্য কেহ নাই। সুতরাং তাঁহার ক্ষমতার পদপ্রার্থী হওয়া শুধু আল্লাহ্ সন্তুষ্টি অন্বেষণের জন্যই ছিল, পার্থিব হীন স্বার্থ বা যশ-মর্যাদা লাভের জন্য নহে। বায়দাবী বলিয়াছেন, এমনও হইতে পারে যে, ইউসুফ (আ) যখন বুঝিতে পারিলেন যে, বাদশাহ অবশ্যই তাঁহাকে কোন দায়িত্বে নিযুক্ত করিবেন, তখন তিনি সর্বাধিক জনকল্যাণমূলক দায়িত্ব গ্রহণের প্রার্থী হইলেন (মাজহারী, ৫খ, ১৭৩)।
বাদশাহ ইউসুফ (আ)-এর যোগ্যতা ও গুণাবলী এবং বিশ্বস্ততা ও পূর্ণ বুদ্ধিমত্তা দেখিয়া তাঁহার প্রতি আকৃষ্ট হইলেও রাষ্ট্র পরিচালনায় তৎক্ষণাত ইউসুফ (আ)-কে রাষ্ট্রীয় সম্পদভাণ্ডারের দায়িত্ব অর্পণ করিলেন না, বরং তাঁহাকে রাষ্ট্রীয় সম্মানিত মেহমানের মর্যাদায় রাজবাটির খাসমহলে রাখিলেন এবং নিকট হইতে তাঁহার স্বভাব-চরিত্র, আচার-আচরণ ও বাস্তব যোগ্যতা-পারদর্শিতা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করিলেন (মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., ৭৭, ৮১)। এ প্রসংগে বাগাবী ইবন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন, তিনি বলেন:
رحم الله اخي يوسف لو لم يقل اجعلني على خزائن الارض لاستعمله من ساعته
" আমার ভাই ইউসুফ (আ)-কে আল্লাহ রহম করুন। তিনি "আমাকে ভূমিজাত সম্পদের দায়িত্ব দিন" না বলিলে বাদশাহ ঐ সময়ই তাঁহাকে মন্ত্রিত্বে নিযুক্ত করিত" কিন্তু তিনি উহা এক বৎসর বিলম্বিত করিয়া রাখিলেন এবং বাদশাহের ভবনে নিজের সহিত তাঁহাকে রাখিয়া দিলেন।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মিসরের সম্পদ ভাণ্ডারের মন্ত্রিত্ব পদে ইউসুফ (আ)

📄 মিসরের সম্পদ ভাণ্ডারের মন্ত্রিত্ব পদে ইউসুফ (আ)


এক বৎসর পর্যবেক্ষণের পর ইউসুফ (আ)-এর চারিত্রিক গুণাবলী সম্পর্কে সম্পূর্ণ নিশ্চিত হইয়া বাদশাহ তাঁহাকে রাষ্ট্রীয় ভাণ্ডারের দায়িত্বে নিযুক্ত করিলেন এবং এতদুদ্দেশে একটি অভিষেক অনুষ্ঠানের আয়োজন করিলেন। এই অনুষ্ঠানে সকল উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মচারী ও রাষ্ট্রের বরেণ্য ব্যক্তিবর্গকে আমন্ত্রণ করা হইল। ইউসুফ (আ)-এর মাথায় মুকুট পরাইয়া তাঁহাকে অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত করা হইল এবং শুধু ভাণ্ডারের দায়িত্ব নয়, বরং বাদশাহ সমস্ত রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব তাঁহার উপর অর্পণ করিয়া অবসর জীবন যাপন করিতে লাগিলেন (কুরতুবীর বরাতে মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ, ৮১)। বাগাবী ইবন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণনা করেন যে, বাদশাহ ইউসুফ (আ)-এর কাঁধে তরবারি ঝুলাইয়া দিলেন এবং মুক্তা ও পান্না খচিত স্বর্ণের সিংহাসন স্থাপন করিয়া উহাকে রেশমীবস্ত্রের ঝালর দ্বারা আচ্ছাদিত করিলেন। অতঃপর ইউসুফ (আ)-কে দরবার হলে উপস্থিত হইতে বলা হইলে তিনি মুকুট পরিহিত অবস্থায় বাহির হইলেন। তখন তাঁহার বর্ণ ছিল বরফের ন্যায় এবং মুখমণ্ডল ছিল চাঁদের ন্যায়, দর্শকরা তাঁহার উজ্জ্বল মুখমণ্ডলে নিজেদের চেহারা দেখিতে পাইত। তিনি আসিয়া সিংহাসনে উপবেশন করিলে অধীনস্ত রাজন্যবর্গ তাঁহার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করিল। ইবন যায়দ বলিয়াছেন, মিসর সম্রাট রায়‍্যানের অনেক অনেক ধনভাণ্ডার ছিল। সম্রাট সবকিছুর কর্তৃত্ব ইউসুফ -এর হাতে তুলিয়া দিলেন এবং তাঁহার ফরমান ও আদেশকে কার্যকর ঘোষণা করিলেন (মাজহারী, ৫খ., ১৭৪)।
এ প্রসঙ্গে প্রচলিত বাইবেলের বর্ণনা নিম্নরূপ: স্বপ্নের তা'বীর ফিরআওনের ও তাহার কর্মচারীদের মনপুত হইল। ফিরআওন তাহার কর্মচারী (দাস)-দিগকে কহিল, আমরা কী ইহার ন্যায়, যাহার মধ্যে মহাপ্রভুর আত্মা রহিয়াছে, পাইতে পারি। ফিরআওন ইউসুফ (আ)-কে বলিল, মহাপ্রভু তোমাকে এই সকল বিষয়ে দূরদৃষ্টি দান করিয়াছেন। সুতরাং তোমার মত কোন জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান নাই। তুমি আমার বাটির অধিপতি হইলে। তোমার আদেশ আমার সকল প্রজার প্রতি জারী কর। শুধু সিংহাসনের অধিকারে আমি তোমার হইতে উর্ধে থাকিব। অতঃপর ফিরআওন ইউসুফ (আ)-কে বলিল, দৃষ্টি কর যে, আমি তোমাকে সমগ্র মিসর রাজ্যের রাজত্ব দিয়া দিলাম। ফিরআওন তাহার আংটি নিজের হস্ত হইতে খুলিয়া ইউসুফের হস্তে পরাইয়া দিল এবং তাহাকে রেশমী বস্ত্র পরিধান করাইল, স্বর্ণের গলাবন্ধ তাহার গলায় পরাইয়া দিল এবং তাহাকে সমগ্র মিসর দেশের শাসক করিল। ফিরআওন ইউসুফ (আ)-কে বলিল, আমি ফির'আওন থাকিব এবং সমগ্র মিসর দেশের কেহই তোমার হুকুম ব্যতীত হস্তপদ সঞ্চালন করিবে না (আদিপুস্তক, ৪১: ৩৭-৪৪; বরাত কাসাসুল কুরআন, ১খ, ৩১৩; বিদায়া, ১খ., ২১০)। কোন কোন বর্ণনায় এই সময় ইউসুফ (আ)-এর বয়স ত্রিশ বৎসর হওয়ার কথা বলা হইয়াছে (বিদায়া, ১খ., ২০)। সম্রাট নামেমাত্র সম্রাট থাকিলেন এবং ইউসুফ (আ)-ই মিসরের প্রকৃত বাদশাহ হইলেন এবং তিনি আযীয উপাধিতে পরিচিতি লাভ করিলেন। ছা'লাবীর বর্ণনামতে বাদশাহ তখনকার আযীয মিসর কিতফীরকে বরখাস্ত করিয়া তদস্থলে ইউসুফ (আ)-কে আযীয নিয়োগ করিয়াছিলেন এবং অনেকের মতে এই সময় আযীয কিতফীরের মৃত্যু হইলে ইউসুফ (আ)-কে তাহার স্থলবর্তী করা হইয়াছিল (বিদায়া, ১খ., ২১০; মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., ৭৭; আল-কামিল, ১খ, ১১২)।
পবিত্র কুরআনে উহার ভাবগম্ভীর ভাষায় ইউসুফ (আ)-এর এই ক্ষমতারোহণের সমগ্র বিষয়টিকে সংক্ষিপ্তরূপে এইভাবে উল্লেখ রহিয়াছে, وَكَذَلِكَ مَكَّنَّا لِيُوسُفَ فِي الْأَرْضِ "এইভাবে আমি ইউসুফকে সেই দেশে প্রতিষ্ঠিত করিলাম" (১২ঃ ৫৬)। অর্থাৎ সমগ্র মিসর দেশের সর্বময় ক্ষমতা তাঁহাকে প্রদান করা হইল... "ইহা ছিল তাঁহার সৎকর্মশীলতার পার্থিব প্রতিদানের বহিঃপ্রকাশ।" আল্লাহ তা'আলার অসীম কুদরতের কি বিস্ময়কর মহিমা, যে ব্যক্তি ছিলেন মিসরের প্রগতি সমৃদ্ধ সমাজের দৃষ্টিতে অনগ্রসর ও একজন ক্রীতদাস, প্রথম ধাপে তিনি এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের তত্ত্বাবধায়ক মনোনীত হইলেন এবং পরিবারের সদস্যদের দৃষ্টিতে ধীমান ও বিশ্বস্ত হওয়ার মর্যাদা লাভ করিলেন। আবার ভাগ্যচক্রে কথিত অভিযোগের কবলে কারারুদ্ধ হইলেন এবং নির্দোষ প্রমাণিত হইয়া কারাগার হইতে বাহির হইয়া মিসরের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হইলেন। আল্লাহ যাহাকে কবুল করিয়া নেন, তাহার পথের সকল কণ্টক এইরূপেই দূরীভূত করেন (কাসাসুল কুরআন, ১খ., ৩১৩)。
পবিত্র কুরআনে ইউসুফ (আ) সম্পর্কে "পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত করিলাম" (مَكْنَا فِي الْأَرْضِ) এই আয়াত দুইবার বলা হইয়াছে। মাওলানা আবুল কালাম আযাদ ইহার হৃদয়গ্রাহী বিশ্লেষণে বলিয়াছেন, "হযরত ইউসুফ (আ)-এর মিসরীয় জীবনে দুইটি বিপ্লবাত্মক স্তর সূচিত হইয়াছিল। প্রথমত, তিনি দাসরূপে বিক্রয় হওয়ার পর আযীয মিসরের এইরূপে সুনজরে পড়িলেন যে, আযীযের কর্তৃত্বাধীন ক্ষেত্রের জন্য তাঁহাকে অধিকর্তা করিয়া দেওয়া হইল। দ্বিতীয়ত, কারাগার হইতে মুক্তি লাভ করিয়াই তিনি শাসনকর্তার মসনদারোহী হইলেন। প্রথম স্তরে পদার্পণের বিবরণ প্রদানে সূরা ইউসুফের ২১নং আয়াতে আল্লাহ্ কুদরত ও হিকমতের কারিশমার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়া যেমন বলা হইয়াছে كذلكَ مَكَّنَّا لِيُوسُفَ فِي الْأَرْضِ, অদ্রূপ দ্বিতীয় স্তরে পদার্পণের বিবরণেও ৫৬ নং আয়াতেও বলা হইয়াছে وكذلكَ مَكَّنَّا لِيُوسُفَ فِي الْأَرْضِ , কিন্তু প্রথম স্তরে উন্নীত হওয়ার পরে যেহেতু ভবিষ্যতে জীবনে শাসনকার্য পরিচালনার প্রশিক্ষণ লাভ ও অভিজ্ঞতা অর্জন অবশিষ্ট ছিল, সুতরাং সেখানে IC (107710 from the 1010 বলা হইয়াছেولنعلمه من تأويل الاحاديث والله غالب على امره ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ শিখাইবার জন্য এবং আল্লাহ তাঁহার কর্মসূচী বাস্তবায়ন করিয়াই থাকেন।) আর দ্বিতীয় স্তরে উন্নীত হওয়া ছিল প্রশিক্ষণ সমাপ্তির পরে উহার সম্মাননা প্রদান। সুতরাং এখানে বলা হয়েছে لَا نُضِيعُ أَجْرَ الْمُحْسِنِينَ (আমি সৎকর্মপরায়ণদের শ্রম ফল নষ্ট করি না)। (কাসাসুল কুরআন, ১খ., ৩১৪; বরাত, তরজমানুল কুরআন, ২খ., ২৩৫, টীকা)।
হযরত ইউসুফ (আ)-এর বিস্ময়কর ঘটনা কুরআন শরীফে উল্লিখিত হওয়ার পটভূমি এই যে, মক্কার মুশরিকরা ইয়াহুদীদের উত্থাপিত ইবরাহীম (আ)-এর বংশধরদের মিসরে আগমনের কারণ জানিতে চাহিয়াছিল। শাহ আবদুল কাদির (র) এই আয়াতের তাফসীরে লিখিয়াছেন, "ইহা তাহাদের সেই প্রশ্নের জবাব যে, 'ইবরাহীমের সন্তানরা কীরূপে মিসরে পৌছিল? সারকথা এই যে, ভাইদের চক্রান্তে ইউসুফ (আ) দেশান্তরিত হন। কিন্তু আল্লাহ তাঁহাকে মিসরের রাজ-ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করিলেন।" রাসূলুল্লাহ (স)-এর অবস্থাও অনুরূপ ছিল (মক্কা হইতে দেশান্তরিত হইয়া মদীনায় প্রতিষ্ঠা লাভ) (মুদিহুল কুরআনের বরাতে কাসাসুল কুরআন, ১খ., ৩১৪, ৩১৫)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হযরত ইউসুফ (আ)-এর বিবাহ ও দাম্পত্য জীবন

📄 হযরত ইউসুফ (আ)-এর বিবাহ ও দাম্পত্য জীবন


ঐতিহাসিক ও মুফাসসিরদের বর্ণনামতে বাদশাহ ইউসুফ (আ)-কে আযীয পদে নিয়োগ করেন ও তাঁহার বিবাহের ব্যবস্থা করেন। তবে তিনি কাহাকে বিবাহ করিয়াছিলেন এ ব্যাপারে দুটি ভিন্নমত দেখা যায়। কাহারও মতে তিনি স্থানীয় এক নেতার কন্যা 'আসনান' (Asenian)-কে বিবাহ করিয়া পারিবারিক জীবন শুরু করিয়া দিলেন (ই. ফা. ইসলামী বিশ্বকোষ, ২২খ., ১২০)। এই সময় তাঁহার বয়স হইয়াছিল ৩০ বৎসর। কাহারও মতে বাদশাহ এক উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন নারীর সহিত তাঁহার বিবাহ সম্পন্ন করেন (বিদায়া, ১খ., ২১০)。 অনেকের মতে এই সময় যুলায়খার স্বামী আযীয মিসর কিতফীরের মৃত্যুর পর মিসর সম্রাট ইউসুফ (আ)-এর সহিত তাহার স্ত্রীর বিবাহ বন্ধন করিয়া দিলেন। ইবন জারীর ও ইবন আবু হাতিম ইবন ইসহাক হইতে এই বর্ণনা উদ্ধৃত করিয়াছেন। এই বর্ণনায় আরও আছে যে, সাক্ষাতের সময় ইউসুফ (আ) যুলায়খাকে বলিলেন, 'তুমি যাহা চাহিতেছিলে উহার চাইতে ইহা কি উত্তম নয়'? যুলায়খা অপরাধ স্বীকার করিয়া বলিল, 'আমাকে ভর্ৎসনা করিও না। তুমি যেমন দেখিতে পাইতেছ, আমি ছিলাম এক সুন্দরী, রূপবতী ও বিলাসী নারী; অথচ আমার স্বামীর স্ত্রী-সম্ভোগের ক্ষমতা-ছিল না। অপরদিকে তোমার সৌন্দর্য ও গুণের কথা তো বলিবার অপেক্ষা রাখে না। সুতরাং আমার প্রবৃত্তি আমাকে কাবু করিয়া ফেলিয়াছিল এবং আমি আত্মনিয়ন্ত্রণ হারাইয়া ফেলিয়াছিলাম'। বর্ণনামতে ইউসুফ (আ) যুলায়খাকে কুমারীরূপে পাইয়াছিলেন (মাজহারী, ৫খ., ১৭৪)। কোন কোন রিওয়ায়াতে আছে, ইউসুফ (আ)-এর প্রতি যুলায়খার যে পরিমাণ আসক্তি ছিল বিবাহের পর আল্লাহ তা'আলা ইউসুফ (আ)-এর হৃদয়ে যুলায়খার প্রতি উহার চাইতে অধিক প্রেম সৃষ্টি করিয়া দিলেন। এমনকি এক সময় ইউসুফ (আ) এই অভিযোগ উত্থাপন করিলেন, ইতোপূর্বে আমার প্রতি তোমার যে পরিমাণ আকর্ষণ ছিল এখন উহা হ্রাস পাওয়ার কারণ কি? যুলায়খা নিবেদন করিল, আপনার উসীলায় আমার অন্তরে আল্লাহ্র মহব্বত জাগরূক হইয়াছে। ফলে অন্য সব সম্পর্ক ও ধ্যান-ধারণা এখন স্তিমিত হইয়া গিয়াছে (মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., ৭৭; বরাত কুরতুবী ও মাজহারী)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00