📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 কারাগারে হযরত ইউসুফ (আ)

📄 কারাগারে হযরত ইউসুফ (আ)


পাপমুক্ত ও পবিত্র থাকিবার কারণে হযরত ইউসুফ (আ) চক্রান্তমূলকভাবে মিসরের কারাগারে প্রেরিত হন। জেলখানায় আগত অপর দুই বন্দীর স্বপ্নের ব্যাখ্যা প্রদান, যাহা পরবর্তীতে ইউসুফ (আ)-এর কারামুক্তির উপলক্ষ ও মিসরের ক্ষমতা সর্বোচ্চ মসনদে আরোহণের সূত্র হইয়াছিল, তাহার বিবরণ কুরআন মজীদে প্রদান করা হইয়াছে:
فَدَخَلَ مَعَهُ السِّجْنَ فَتَيْنِ قَالَ أَحَدُهُمَا إِنِّي أَرَانِي أَعْصِرُ خَمْرًا وَقَالَ الْآخَرُ إِنِّي أَرَانِي أَحْمِلُ فَوْقَ رَأْسِي خُبْرًا تَأْكُلُ الطَّيْرُ مِنْهُ نَبِّئْنَا بِتَأْوِيلِهِ إِنَّا نَرَاكَ مِنَ الْمُحْسِنِينَ.
"তাহার সহিত দুইজন যুবক কারাগারে প্রবেশ করিল। তাহাদের একজন বলিল, 'আমি স্বপ্নে দেখিলাম, আমি আংগুর নিংড়াইয়া রস বাহির করিতেছি', এবং অপরজন বলিল, 'আমি স্বপ্নে দেখিলাম আমি আমার মস্তকে রুটি বহন করিতেছি এবং পাখি উহা হইতে খাইতেছে', আমাদিগকে তুমি ইহার তাৎপর্য জানাইয়া দাও, আমরা তো তোমাকে সৎকর্মপরায়ণ দেখিতেছি" (১২: ৩৬)।
পবিত্র কুরআনের এই আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসীর গ্রন্থাদিতে বলা হইয়াছে যে, ইউসুফ (আ)-এর কারাগারে যাওয়ার সমসাময়িক কালে আরও দুই যুবক কারাগারে প্রবেশ করিয়াছিল। ইবন আব্বাস (রা), দাহ্হাক, মুজাহিদ, মুকাতিল হইতে উদ্ধৃত এবং কালবী প্রমুখের বর্ণনায় ইউসুফ (আ) কারারুদ্ধ হওয়ার বেশ কিছু দিন পরে (৫ বৎসর/৭ বৎসর-কুরতুবী, মাজহারী) দুই যুবকের কারারুদ্ধ হওয়ার কথা বলা হইয়াছে। তবে অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে যুবকদ্বয় ইউসুফ (আ)-এর নিকটবর্তী সময়ই কারারুদ্ধ হইয়াছিল। পবিত্র কুরআনের বর্ণনায় 'তাহার সংগে' শব্দ নিকটকবর্তী সময় হওয়ার ইংগিত বহন করে (মাজহারী, ৫খ, পৃ. ১৬১; মা'আরিফ, ৫খ, ৫৩, ৫৫)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বন্দীদ্বয়ের পরিচয় ও তাহাদের কারাগারে কারারুদ্ধ হওয়ার কারণ

📄 বন্দীদ্বয়ের পরিচয় ও তাহাদের কারাগারে কারারুদ্ধ হওয়ার কারণ


বাগাবী ও ইবন কাছীর প্রমুখের বর্ণনামতে এই যুবকদ্বয় ছিল মিসর সম্রাট ওয়ালীদ ইবন ছারাওয়ানের কর্মচারী। ইহাদের একজন ছিল সম্রাটের সাকী (পানীয় পরিবেশনকারী) এবং তাহার নাম 'বানু'; অপরজন ছিল রাজভবনের প্রধান পাচক এবং তাহার নাম মিজলাছ (বিদায়া, ১খ, ২০৬; মাজহারী, ৫খ, ১৬)। সম্রাটের শত্রুপক্ষের লোকেরা তাহাকে হত্যা করিবার ষড়যন্ত্র কার্যকর করার জন্য এই দুই কর্মচারীর সহিত যোগ-সাজশ করিয়াছিল। তাহারা সম্রাটের খাদ্য ও শরাবে বিষ মিশাইয়া দেওয়ার জন্য এই দুই রাজকর্মচারীকে বড় ধরনের উৎকোচ প্রদানের প্রলোভন দিলে ইহারা ইহাতে সম্মত হয়। পরে কোন কারণে সাকী উহাতে অস্বীকৃত হইল এবং পাচক উৎকোচ গ্রহণ করিয়া সম্রাটের খাবারে বিষ মিশ্রিত করিয়া দিল। অতঃপর সম্রাটের সম্মুখে খাদ্য-পানীয় উপস্থিত করা হইলে সাকী বলিল, মহারাজ! এই খাবার খাইবেন না, উহাতে বিষ আছে। পাচক বলিল, পানীয় পান করিবেন না, উহাতে বিষ দেওয়া হইয়াছে। তখন সম্রাট সাকীকে বলিলেন, তুমি পানীয় পান কর। সে উহা পান করিল এবং উহাতে তাহার কোন ক্ষতি হইল না। সম্রাট পাচককে খাদ্য ভক্ষণ করিতে বলিলে সে তাহাতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করিল। সেই খাদ্য কোন পশুকে খাওয়ানো হইলে পশুটি মরিয়া গেল। সম্রাট দুইজনকেই বন্দী করিবার আদেশ দিলেন এবং তদন্ত সাপেক্ষে তাহাদের বিচার সম্পন্ন করিবার ফরমান জারী করিলেন (মাজহারী, ৫খ, ১৬১)।
ইউসুফ (আ)-এর অপূর্ব রূপ ও অসাধারণ গুণাবলী জেলখানায়ও সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করিল। তাঁহার বিশ্বস্ততা, সত্যবাদিতা, সেবা ও মানবপ্রেম, ইবাদত-বন্দেগী ও স্বপ্নের ব্যাখ্যা প্রদানে পারদর্শিতা এবং কারাবন্দীদের সহিত সদ্ব্যবহারের কথা জেলের অভ্যন্তরে ছড়াইয়া পড়িল এবং কারাবন্দীরা তাঁহার প্রতি মুগ্ধ হইয়া তাঁহার ভক্তে পরিণত হইল (ইবন কাছীর, তাফসীর, ২খ, ২৪৯; বিদায়া, ১খ, ২০৬)। ইউসুফ (আ) জেলের সকল বন্দীর খোঁজ-খবর নিতেন এবং তাহাদের প্রতি মর্মবেদনা প্রকাশ করিয়া তাহাদিগকে সান্ত্বনা দিতেন ও আশ্বাসবাণী শুনাইতেন। কেহ অসুস্থ হইয়া পড়িলে তাহার সেবা-শুশ্রূষা করিতেন, কাহাকেও ধৈর্যহারা ও চিন্তামগ্ন দেখিতে পাইলে তাহাকে ধৈর্য ধারণের উপদেশ দিতেন এবং মুক্তির আশ্বাসবাণী শুনাইয়া তাহার অন্তরে স্বস্তি ও আত্মবিশ্বাস ফিরাইয়া আনিতেন। নিজে কষ্ট স্বীকার করিয়া অপরকে শান্তি দিতে চেষ্টা করিতেন। তদুপরি রাতভর আল্লাহ তা'আলার ইবাদতে নিমগ্ন থাকিতেন। তাঁহার এই গুণাবলী দেখিয়া জেলের সকল কয়েদী তাঁহার শ্রেষ্ঠত্বের ও মহত্ত্বের স্বীকৃতি দিল, এমনকি প্রধান জেলকর্তাও তাঁহার ভক্ত হইয়া গেল। সে বলিল, আমার ক্ষমতা থাকিলে আমি আপনাকে মুক্ত করিয়া দিতাম। এখন আমার সাধ্য এতটুকুই যে, এখানে আপনার কোন প্রকার কষ্ট হইবে না (মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ, ৫৬)।
বাইবেলের বর্ণনায়ও বিষয়টির প্রতি সমর্থন ব্যক্ত হইয়াছে। ইউসুফ (আ)-এর জ্ঞান-গরিমা ও সদাচারের পরিচয় জেলখানার অভ্যন্তরেও গোপন রহিল না এমন কি কারা অধ্যক্ষও তাহার ভক্ত হইয়া গেল এবং জেলখানার সকল বন্দীকে তাঁহার তত্ত্বাবধানে প্রদান করিয়া জেলের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা তাঁহার হাতে ন্যস্ত করিল। ফলে ইউসুফ (আ)-ই জেলখানার প্রকৃত কর্মকর্তা হইয়া গেলেন। আল্লাহ এই স্থানেও তাঁহাকে ভাগ্যবান করিয়া রাখিলেন" (আদিপুস্তক, ২০: ২১-২৩)।
পবিত্র কুরআনের বর্ণনাধারায়ও বিষয়টির প্রতি স্পষ্ট ইংগিত রহিয়াছে। কেননা সমসাময়িক কয়েদখানাসমূহের নিবর্তনমূলক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে জেলের অভ্যন্তরে বন্দীদের ইউসুফ (আ)-এর কাছে অবাধ গমনাগমন এবং তাহাদের সাবলীল ও স্বতঃস্ফূর্ত আলাপচারিতা এবং যুবক বন্দীদ্বয়ের মুখে ইউসুফ (আ)-এর মাহাত্ম্য ও সদাচারের স্বীকৃতিমূলক উচ্চারণ প্রমাণ করে যে, জেলখানায়ও তাঁহার গুণাবলী সর্বজনবিদিত হইয়া গিয়াছিল এবং ইউসুফ (আ) সেখানে সসম্মানে অবস্থান করিতেছিলেন (হিফজুর রহমান, ১খ, পৃ.; ৩০০ ই. বিশ্বকোষ, ২২খ, ১১৯)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বন্দীদ্বয়ের স্বপ্নের বিবরণ

📄 বন্দীদ্বয়ের স্বপ্নের বিবরণ


ইউসুফ (আ) কারাগারে আবদ্ধ হওয়ার পর তাঁহার নবুওয়াতী কর্তব্য পালনের অংশরূপে দাওয়াতের কাজ করিতেছিলেন। তিনি স্বপ্নের তা'বীর জানিতেন বলিয়া লোকজন অবহিত ছিল। তরুণ বন্দীদ্বয়ও তাঁহার স্বপ্নব্যাখ্যা বিশারদ হওয়ার কথা অবগত হয়। ইহা ছাড়া বিভিন্ন কারণে ইউসুফ (আ)-এর সহিত বন্দীদ্বয়ের ঘনিষ্ঠতা জন্মিয়াছিল। ইতোমধ্যে বন্দীদ্বয়ের প্রত্যেকে তাহার পেশা অনুযায়ী এক একটি স্বপ্ন দেখিল। সাকী দেখিল যে, সে সম্রাটের জন্য আংগুর নিংড়াইয়া মদ তৈরি করিতেছে। ইকরিমা প্রমুখের বর্ণনামতে সাকী ও বাবুর্চী ইউসুফ (আ)-এর কাছে আসিয়া বিনয়ের সহিত আরয করিল, আমরা প্রত্যেকে এক একটি স্বপ্ন দেখিয়াছি। আপনি মেহেরবানী করিয়া আমাদিগকে ইহার তা'বীর বলিয়া দিন। সাকী বলিল, আমি দেখিলাম যে, আমি একটি আংগুর-বীজ বপণ করিলাম এবং তাহা হইতে চারা গজাইয়া উঠিল এবং তাহাতে আংগুরের থোকা দেখা দিল। বর্ণনান্তরে আমি একটি বাগিচায় ছিলাম এবং আমি নিজেকে একটি আংগুর লতার গোড়ায় দেখিতে পাইলাম, যার মাথায় তিন থোকা আংগুর ছিল। সম্রাটের পানপাত্র আমার হাতে ছিল। আমি সেই পাত্রে আংগুরের রস নিংড়াইয়া সম্রাটকে পরিবেশন করিলে তিনি তাহা পান করিলেন।
দ্বিতীয় বন্দী বাবুর্চী তাহার স্বপ্নের বিবরণে বলিল, আমি দেখিলাম আমি মাথায় করিয়া তিনটি ঝুড়ি বহন করিতেছি, ইহাতে রুটি ও বিভিন্ন প্রকারের খাদ্য রহিয়াছে এবং হিংস্র পাখীরা ইহা হইতে ছো মারিয়া খাবার নিয়া যাইতেছে (মাজহারী, ৫খ, ১৬১; ইবন কাছীর, মুখতাসার, ২খ, ২৪৯)। এখানে উল্লেখ্য যে, ইবন আব্বাস (রা) ও অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে বন্দীদ্বয় বাস্তবেই এইরূপ স্বপ্ন দেখিয়া উহার তা'বীর জানিতে চাহিয়াছিল। তবে ইবন জারীর আবদুল্লাহ ইবম মাসউদ (রা) হইতে এ প্রসংগে ভিন্ন মত উদ্ধৃত করিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন, বন্দীরা বাস্তবে কোন স্বপ্ন দেখে নাই, বরং তাহারা ইউসুফ (আ)-এর তাবীরের জ্ঞান পরীক্ষা করিবার উদ্দেশে নিজেদের তৈরি স্বপ্নের বিবরণ দিয়াছিল (মুখতাসার তাফসীরে ইবন কাছীর, ২খ ২৪৯; মাজহারী, ৫খ ১৬২; মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ, ৫৬; বিদায়া, ১খ, ২০৬)। বন্দীদ্বয়ের স্বপ্নের তা'বীর অবগত হওয়ার প্রতি প্রচণ্ড আগ্রহ ও তাঁহার প্রতি তাহাদের ভক্তি লক্ষ্য করিয়া ইউসুফ (আ) ইহাকে দীনের দা'ওয়াত প্রদানের সুবর্ণ সুযোগ মনে করিলেন এবং তা'বীর প্রদানের পূর্বে দীনের দা'ওয়াত পেশ করিলেন। স্বপ্নের ব্যাখ্য সম্পর্কে তিনি একটি সুন্দর ভূমিকা উপস্থাপন করিলেন, যাহাতে তাহাদের আগ্রহ ও ভক্তি আরও বৃদ্ধি পাইয়া দীনের দা'ওয়াত অধিক হৃদয়গ্রাহী হয়। তিনি বলিলেন:
قَالَ لَا يَأْتِيْكُمَا طَعَامٌ تُرْزَقْهِ إِلَّا نَبَاتُكُمَا بِتَأْوِيلِهِ قَبْلَ أَنْ يَأْتِيَكُمَا ذَلِكُمَا مِمَّا عَلَّمَنِي رَبِّي إِنِّي تَرَكْتُ مِلَّةَ قَوْمٍ لَا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَهُمْ بِالآخِرَةِ هُمْ كَفَرُونَ ...... يصاحِبَي السِّجْنِ أَمَّا أَحَدُكُمَا فَيَسْقِي رَبُّهُ خَمْرًا وَأَمَّا لآخَرُ فَيُصْلَبُ فَتَأْكُلُ الطَّيْرُ مِنْ رَأْسِهِ قُضِيَ الْأَمْرُ الَّذِي فِيهِ تَسْتَفْتِيَانِ .
"ইউসুফ বলিল, তোমাদিগকে যে খাদ্য দেওয়া হয় তাহা আসিবার পূর্বেই আমি তোমাদিগবে স্বপ্নের তাৎপর্য জানাইয়া দিব। আমি তোমাদিগকে যাহা বলিব তাহা আমার প্রতিপালক আমাবে যাহা শিক্ষা দিয়াছেন তাহা হইতে বলিব, যে সম্প্রদায় আল্লাহতে বিশ্বাস করে না ও আখিরাতে অবিশ্বাসী আমি তাহাদের মতবাদ বর্জন করিয়াছি।..... হে কারাসংগীদ্বয়। তোমাদের দুইজনের একজন তাহার প্রভুকে মদ্য পান করাইবে এবং অপরজন শুলবিদ্ধ হইবে; অতঃপর তাহার মস্তব হইতে পাখি আহার করিবে। যে বিষয়ে তোমরা জানিতে চাহিয়াছ তাহার সিদ্ধান্ত হইয়া গিয়াছে' (১২ঃ ৩৭-৪১)।
এখন আমার কিছু কথা শোন। এই কথা বলিয়া তিনি তাহাদিগকে দীনের দাওয়াত পেশ করিলেন। মনে রাখিবে, আমার এই যোগ্যতা কোন প্রকার জ্যোতিষী বিদ্যা বা রেখা বিদ্যা নয়, বরং ইহা আল্লাহ্ প্রদত্ত আসামান্য ইল্ম। এই ইল্ম তিনি আমাকে দান করিয়াছেন এই কারণে যে, আল্লাহকে ও আখিরাতকে অবিশ্বাসকারীদের ধর্ম ও মতবাদ বর্জন করিয়া আমি আমার পূর্বপুরুষের অনুসৃত তাওহীদের ধর্ম অনুসরণ করিয়াছি। সুতরাং এইসব বিষয় আমাকে আমার মালিক প্রতিপালক আল্লাহ ওহীর মাধ্যমে অবহিত করেন (মাজহারী, ৫খ, ১৬৩; মা'আরিফ, ৫খ, ৫৬)। তোমাদের স্বপ্নের তা'বীর শোন হে আমর জেলের বন্ধুদ্বয়! তোমাদের কোন একজন এই হত্যা ষড়যন্ত্রের অভিযোগ হইতে মুক্তি পাইয়া তাহার চাকুরীতে বহাল হইবে এবং সে তাহার মালিককে মদ পান করাইবে। অপরজন দোষী সাব্যস্ত হইবে এবং তাহাকে শূলে চাড়ানো হইবে। পাখিরা তাহার মাথা ঠোকরাইয়া তাহার মগজ ও গোশ্ত খাইবে। আংগুরের তিনটি থোকা ও খাবারের তিনটি ঝুড়ির মর্ম হইল, তিন দিনের ব্যবধানে তোমাদের বিচারকার্য সম্পন্ন হইবে। তোমাদের জিজ্ঞাসিত বিষয়ের ইহাই চূড়ান্ত ফয়সালা। ইহার কোন নড়চড় হইবে না। কেননা (হাদীছের বর্ণনামতে) মানুষের স্বপ্ন ঝুলন্ত অবস্থায় থাকে, যখনই উহার তা'বীর প্রদান করা হয়, তখনই ইহা বাস্তবে সংঘটিত হয় (ইবন কাছীর, ২খ, ২৫১; মা'আরিফ, ৫খ, ৫৭-৫৮; বিদায়া, ১খ, ২০৭)।
মুফাসসিরগণের যে দলটি বন্দীদ্বয়ের স্বপ্ন ষানোয়াট হওয়ার মত পোষণ করিয়াছেন তাহারা এই ক্ষেত্রে বলিয়াছেন যে, ইউসুফ (আ) কর্তৃক স্বপ্নের তা'বীর ব্যক্ত করিবার পর বন্দীদ্বয় বলিল, আমরা তো বাস্তবে কোন স্বপ্ন দেখি নাই। আপনাকে পরীক্ষা করিবার জন্য তৈরী স্বপ্ন বর্ণনা করিয়াছিলাম। ইউসুফ (আ) বলিলেন, তোমরা কোন স্বপ্ন দেখিয়া থাক কিংবা না দেখিয়া থাক, এখন বাস্তব ঘটনা সেইভাবেই ঘটিবে যেরূপ আমি বলিয়াছি। কেননা উহা আমি নবুওয়াত সূত্রে প্রাপ্ত জ্ঞানের মাধ্যমে বলিয়াছি (মা'আরিফ, ৫খ, ৫৮; ইবন কাছীর, ২খ., ২৫১; মাজহারী, ৫খ, ১৬৫)।
এখানে ইউসুফ (আ)-এর অন্যতম নবুওয়াতী গুণ লক্ষণীয়। তাহা এই যে, মানুষের প্রতি নবীগণের অত্যন্ত মমত্ববোধের কারণে তাহারা কোন মানুষের মনে প্রত্যক্ষরূপে আঘাত সৃষ্টি হইতে দেন না। আলোচ্য ক্ষেত্রেও বন্দীদ্বয়ের মধ্যে কে মুক্তি পাইবে এবং কে অপরাধী সাব্যস্ত হইবে তাহা প্রায় স্পষ্ট থাকা সত্ত্বেও ইউসুফ (আ) সরাসরি সাকীকে বলিলেন না যে, তুমি মুক্তি পাইবে এবং বাবুর্চীকে বলিলেন না, যে তোমাকে শূলে দেওয়া হইবে। বরং তিনি নির্দিষ্টরূপে একজনের মুক্তিলাভ ও অপরজনের শূলিবিদ্ধ হওয়ার কথা বলিলেন, যাহাতে মৃত্যুদণ্ডের অপরাধী ব্যক্তি দণ্ড লাভের নির্ধারিত সময়ের পূর্ব হইতে সার্বক্ষণিক যাতনা ভোগ না করিয়া আশাবাদী থাকিতে পারে। জীবনের সর্বক্ষেত্রেই মানুষের প্রতি নবী-রাসূলগণের মমত্ববোধ এইরূপ হইয়া থাকে (মা'আরিফ, ৫খ, ৫৭; ইবন কাছীর, ২খ, ২৫১)।
পরবর্তী সময়ে মামলার তদন্তে সম্রাটকে হত্যার ষড়যন্ত্রে সাকী নিদোর্ষ ও বাবুর্চী অভিযুক্ত সাব্যস্ত হইল এবং তিন দিন পরে তাহাদিগকে আদালতে উপস্থিত করিয়া বিচারের রায় শুনাইয়া দেওয়া হইল। বিচারে সাকীকে মুক্তি প্রদান করিয়া তাহার পূর্বপদে বহাল করা হইল এবং বাবুর্চীকে শূলীকাষ্ঠে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হইল। এই ঘটনা ইউসুফ (আ)-এর প্রতি কারাবাসীদের ভক্তি-বিশ্বাস আরও বৃদ্ধি করিয়া দিল এবং পরবর্তীতে ইহাই ইউসুফ (আ)-এর জেল হইতে মুক্তি লাভের অন্যতম কারণ হইয়াছিল (কাসাসুল কুরআন, ১খ, ৩০২; মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ, ৫৪)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হযরত ইউসুফ (আ)-এর দাওয়াত ও তাবলীগ

📄 হযরত ইউসুফ (আ)-এর দাওয়াত ও তাবলীগ


হযরত ইউসুফ (আ) ছিলেন পুরুষানুক্রমে নবুওয়াত মর্যাদায় অধিষ্ঠিত। সুতরাং দীনের দাওয়াত এবং এক আল্লাহ ও আখিরাতের বিশ্বাসের প্রতি আহবান করা ছিল তাঁহার জীবনের প্রধান ও সার্বক্ষণিক ব্রত। জেলখানার নিয়ন্ত্রিত পরিসরেও তিনি যথারীতি তাঁহার দায়িত্ব পালন করিতেছিলেন। বিশেষ করিয়া তাঁহার সময়ে কারাগারে আগত রাজকর্মচারীদ্বয়ের স্বপ্নের তা'বীর জানিতে চাওয়ার পরিস্থিতিকে তিনি দীনের দাওয়াতের একটি বিশেষ সুযোগ মনে করিলেন। তাঁহার এইরূপ ধারণা করাও বিচিত্র নয় যে, মুক্তিপ্রাপ্ত রাজকর্মচারীর মাধ্যমে দীনের দাওয়াত রাজ-দরবারেও পৌছিয়া যাইবে। সুতরাং বন্দীদ্বয়ের স্বপ্নের তা'বীর প্রদানকে উপলক্ষ করিয়া তিনি দীনের দাওয়াতের এক অনন্য সারগর্ভ ও নাতিদীর্ঘ ভাষণ কহিলেন। এই ভাষণে তিনি দীনি দাওয়াতের জন্য অপরিহার্য ও আল্লাহ তা'আলা প্রদত্ত নবীসুলভ প্রজ্ঞার মাধ্যমে বক্তব্য উপস্থাপন করিলেন। প্রথমত তিনি শ্রেতার মূল কাংখিত বিষয় স্বপ্নের তা'বীরকে উপলক্ষ করিয়া স্বপ্নের ব্যাখ্যা প্রদানে তাঁহার যোগ্যতাকে 'আল্লাহ প্রদত্ত ইল্‌ম হওয়ার )ذالكما مِمَّا عَلَّمَنِى رَبِّى( কথা প্রমাণ করিলেন। এইভাবে তিনি দাওয়াতের সুফল প্রাপ্তির জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজনীয় বিষয় শ্রোতার অন্তরে আস্থা ও বিশ্বাস সৃষ্টির পথ উন্মুক্ত করিলেন। আবার স্বপ্নের তা'বীর প্রদানে অহেতুক বিলম্বের কারণে শ্রোতার অন্তরে বিরক্তিভাব সৃষ্টির সুযোগ না দিয়া তিনি স্বপ্ন ব্যাখ্যার অনুরূপ একটি বিষয় অর্থাৎ শ্রোতাদের জন্য বরাদ্দকৃত খাদ্যের আগাম সংবাদ প্রদানের ব্যাপারে তাঁহাকে আল্লাহ তা'আলা প্রদত্ত মু'জিযার কথা উল্লেখ করিলেন। যাহাতে বিলম্বে হইলে আল্লাহ প্রদত্ত ইল্‌মের মাধ্যমে নিশ্চিত তা'বীর পাওয়া যাইবে এই কথা ভাবিয়া বিলম্ব সহনীয় হইয়া যায় এবং বক্তার অন্য কথাগুলিও মনোযোগ সহকারে শুনিবার ইচ্ছা জাগ্রত হয়। এইভাবে শ্রোতাদের হৃদয়ের গভীরে রেখাপাত করিবার পরিবেশ সৃষ্টি করিয়া তিনি দাওয়াতের মূল বক্তব্য উপস্থাপনে উদ্যোগী হইলেন। হিকমত ও কুশলতার প্রতি লক্ষ্য রাখিয়া তাঁহার বক্তব্যের কোথাও তিনি শ্রোতাকে প্রত্যক্ষ আহ্বান, সরাসরি আক্রমণ বা কটাক্ষপাত করিলেন না। বরং সম্পূর্ণ বক্তব্যটি তিনি যেন প্রসঙ্গত ও কথার পিঠে কথারূপে উপস্থাপন করিলেন। প্রথম কথা তিনি বলিলেন, 'আমি সেই সম্প্রদায়ের ধর্ম পরিত্যাগ করিয়াছি যাহারা আল্লাহকে বিশ্বাস করে না এবং বিশেষ করিয়া আখিরাতকে যাহারা অস্বীকার করে। ইউসুফ (আ) তাঁহার এই বক্তব্য দ্বারা বন্দীদ্বয়কে বুঝাইয়া দিলেন যে, স্বপ্নের সঠিক তা'বীর প্রদান ও আসন্ন খাদ্য সম্পর্কে আগাম সংবাদ প্রদানের যোগ্যতার পিছনে আল্লাহকে অবিশ্বাস না করা ও আখিরাতকে অস্বীকার করিবার মতবাদ বর্জনের বিশেষ কার্যকারিতা রহিয়াছে (ইবন কাছীর, ২খ., ২৫০; ফী জিলালিল কুরআন, ৪খ.)। অতঃপর দীনের দা'ওয়াত প্রদানের মূল বক্তব্যে তিনি যাহা বলিলেন তাহা কুরআনের ভাষায়:
وَاتَّبَعْتُ مِلَّةَ أَبَائِي إِبْرَاهِيمَ وَاسْحَقَ وَيَعْقُوبَ مَا كَانَ لَنَا أَنْ تُشْرِكَ بِاللَّهِ مِنْ شَيْءٍ ذَلِكَ مِنْ فَضْلِ اللَّهِ عَلَيْنَا وَعَلَى النَّاسِ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَشْكُرُونَ . يُصَاحِبَى السَّجْنِ أَرْبَابٌ مُتَفَرِّقُونَ خَيْرٌ أَمِ اللَّهُ الْوَاحِدُ القَهَّارُ . مَا تَعْبُدُونَ مِنْ دُونِهِ إِلَّا أَسْمَاء سَمِيْتُمُوهَا أَنْتُمْ وَآبَاءَكُم مَا أَنْزَلَ اللَّهُ بِهَا مِنْ سُلْطنِ إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ أَمَرَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ ذَلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ .
"ইউসুফ বলিল, আমি আমার পিতৃপুরুষ ইবরাহীম, ইসহাক এবং ইয়া'কূবের মতবাদ অনুসরণ করি। আল্লাহর সহিত কোন বস্তুকে শরীক করা আমাদের কাজ নহে। ইহা আমাদের ও সমস্ত মানুষের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ, কিন্তু অধিকাংশ মানুষই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না। হে কারা সংগীদ্বয়! ভিন্ন ভিন্ন বহু প্রতিপালক শ্রেয়, না পরাক্রমশালী এক আল্লাহ? তাঁহাকে ছাড়িয়া তোমরা কেবল কতকগুলি নামের 'ইবাদত করিতেছ, যেই নামগুলি তোমাদের পিতৃপুরুষ ও তোমরা রাখিয়াছ; এইগুলির কোন প্রমাণ আল্লাহ পাঠান নাই। বিধান দিবার অধিকার কেবল আল্লাহ্রই। তিনি আদেশ দিয়াছেন তিনি ব্যতীত অন্য কাহারও ইবাদত না করিতে; ইহাই শাশ্বত দীন। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ ইহা অবগত নহে” (১২: ৩৮-৪০)।
হযরত ইউসুফ (আ)-এর এই সংক্ষিপ্ত সারগর্ভ ভাষণের বিশ্লেষণ করিয়া মুফাসসিরগণ লিখিয়াছেন, মিসরের পরিবেশ ছিল আল্লাহর শাশ্বত বিধান তাওহীদ ও আখিরাতের বিশ্বাস বিরোধী শিরক, কুফরী ও পৌত্তলিকতায় পরিপূর্ণ। তখনকার ক্ষমতাসীন শাসকবর্গ ও রাজা-বাদশাহ্রা নিজেদেরকে রব ও ইলাহ্ বা ইলাহের প্রতিভূ মনে করিত এবং প্রজাসাধারণ ও জনগণ রাজা-বাদশাহদের ইলাহের আসনে অধিষ্ঠিত করিয়া রাখিয়াছিল। তাহারা ক্ষমতার সম্রাটকে সিজদা করিত এবং তাহাকেই নিজেদের ভাগ্যনিয়ন্তা মনে করিত। হযরত ইবরাহীম (আ)-এর যুগে নমরূদ খোদায়ী দাবি করিয়াছিল। আর এই মিসরেই পরবর্তী কালে মূসা (আ)-এর যুগের ক্ষমতাসীন ফিরআওন নিজেকে 'বড় খোদা' (أَنَا رَبُّكُمُ الْأَعْلَى) দাবি করিয়াছিল। স্বভাবত কারাগারে আগত রাজকর্মচারী বন্দীদ্বয়ও প্রচলিত কুফরী মতবাদের অনুসারী ছিল। হযরত ইউসুফ (আ) প্রথমেই এই বিষয়টি স্পষ্ট করিয়াছিলেন যে, তিনি দাসরূপে মিসরে আগমন করিলেও এবং রাজ-দরবারের প্রধান নির্বাহী আযীয মিসরের বাড়িতে অবস্থান করিলেও পারিপার্শ্বিক কুফরী মতবাদ তাঁহাকে গ্রাস করিতে পারে নাই। আযীযের রাজকীয় ভবনের পরিবেশেও তিনি এক আল্লাহকে অস্বীকার করা ও আখিরাতকে অবিশ্বাস করার কুফরী মতবাদ হইতে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করিয়াছেন।
দীনের দা'ওয়াতে হিকমত অবলম্বনের প্রতি লক্ষ্য রাখিয়া তিনি তাঁহার শ্রোতাদের 'কাফির' আখ্যায়িত করিলেন না কিংবা তাহাদিগকে বাতিল ধর্মের অনুসারী হওয়ার অভিযোগে সরাসরি অভিযুক্ত করিলেন না। অতঃপর তিনি বন্দীদ্বয়ের সম্ভাব্য প্রশ্ন, "তবে আপনি কোন ধর্মমতের অনুসারী?” এর জবাব প্রদানের উদ্দেশে বলিলেন, 'আমি তো আমার পূর্বপুরুষ ইবরাহীম, ইসহাক ও ইয়াকুবের ধর্মমতের অনুসারী। প্রসঙ্গত তিনি আত্মপরিচয় তুলিয়া ধরিলেন। যেহেতু তিনি তাঁহার প্রতি বন্দীদ্বয়ের আস্থা ও বিশ্বাসের বিষয়টি আঁচ করিতে পারিয়াছিলেন। তাহাদের এই আস্থা ও বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করিয়া দীনের দা'ওয়াত গ্রহণে শ্রোতার হৃদয়কে উদ্বুদ্ধ করিবার মহান লক্ষ্য অর্জনে তিনি অন্তত চার পুরুষ ধরিয়া তাঁহার বংশধারায় নবুওয়ত থাকিবার অর্থাৎ প্রকৃত ইলাহ ও একমাত্র মা'বুদের পক্ষ হইতে মনোনীত ও প্রেরিতরূপে দীনের প্রতি আহ্বানকারী হওয়ার মর্যাদায় অধিষ্ঠিত থাকিবার কথাটি প্রমাণ করিয়া দিলেন। কেননা শ্রোতারা অজ্ঞ হইলে তাহাদের জ্ঞাতার্থে আহ্বানকারীর জন্য নিজের বিজ্ঞতা ও যোগ্যতার পরিচয় প্রদানও একটি অপরিহার্য বিষয় যাহাতে শ্রোতার অন্তরে আহ্বানে সাড়া দেওয়ার প্রতি উৎসাহ সৃষ্টি হয়। ইহা আত্মপরিশুদ্ধির প্রচারণা নহে।
ইহা ছাড়া বংশধারার আভিজাত্যের বিষয়টিও মানুষের মনকে স্বভাবত আকৃষ্ট ও আস্থাবান করিয়া তোলে (ফী জিলালিল কুরআন, ৪খ., ৭৩১)। অতঃপর তিনি পিতৃপুরুষের ধর্মমতের মৌলিক পরিচয়রূপে বলিলেন, এই ধর্মমতের মূল বৈশিষ্ট্য হইল আল্লাহ তা'আলার সহিত তাঁহার সত্তায় ও গুণাবলীতে কোন কিছুকে শরীক না করা। "আমাদের জন্য সমীচীন ও বৈধ নয় তাঁহার সহিত কোন কিছুকে শরীক করা"। ইহাতে কোন কিছু (من شيئ) বলিয়া পৃথিবীর সর্বকালের সর্বসম্প্রদায়ের পৌত্তলিকতা বর্জনের কথা বলা হইয়াছে। এই বিষয়টিতেও তিনি "তোমরা তো মুশরিক অথবা মূর্তিপূজারী" ধরনের দোষারোপমূলক কোন বাক্য না বলিয়া তিনি কথাটি নিজের উপর রাখিলেন। এই উক্তি দ্বারা তিনি ইহাও বুঝাইয়া দিলেন যে, একত্ববাদ মানুষের স্বভাবগত চাহিদার বিষয়। তাওহীদের মূল কথা গ্রথিত রহিয়াছে মানব হৃদয়ের গভীরে এবং উহার অনুকূল বহুবিধ নিদর্শন ও প্রমাণ বিশ্বচরাচরে ছড়াইয়া রহিয়াছে।
আর সর্বযুগের নবী-রাসূলগণ বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছাইয়াছেন উহার অভিন্ন আহ্বান। তিনি বলিলেন, একত্ববাদের এই সত্য ধর্ম গ্রহণ করার তাওফীক প্রদান আমাদের প্রতি আল্লাহ তা'আলার বিশেষ করুণা। কেননা তিনি নবী-রাসূল প্রেরণ ও ওহীর ধারা প্রবর্তন করিয়া মানুষের জন্য সত্য ধর্ম গ্রহণকে সহজ করিয়া দিয়াছেন। কিন্তু আক্ষেপের বিষয় এই যে, অধিকাংশ মানুষ নিদর্শনাবলীতে মনোযোগ প্রদান করে না, আল্লাহ প্রদত্ত 'ফিতরাত' ও সত্য গ্রহণের ক্ষমতাকে কাজে লাগায় না এবং আল্লাহ্ তা'আলার নি'মাতের শুকরিয়া আদায়স্বরূপ তাওহীদকে গ্রহণ করে না বরং তাহারা কুফর ও শিরকে নিমগ্ন হয়। অতঃপর তিনি মূল আহ্বান পেশ করিলেন। ইহাতে তিনি 'তোমরা শিরক বর্জন করিয়া এক আল্লাহ্র প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর'-এইরূপে সরাসরি না বলিয়া আহ্বানটি একটি প্রশ্নের আকারে উত্থাপন করিলেন, যাহাতে প্রশ্নের যথার্থ উত্তররূপে তাহারা একত্ববাদের স্বীকারোক্তি স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রদান করে। ইহা ছাড়া তিনি সম্বোধন করিবার জন্য 'এমন একটি শব্দ চয়ন করিলেন যাহা যে কোন কঠোর প্রকৃতির শ্রোতার হৃদয়কেও কোমল করিয়া তাহাকে আহ্বানে সাড়া দিতে উদ্বুদ্ধ করিয়া তোলে। তিনি বলিলেন, 'হে জেলখানার বন্ধুদ্বয়'! অর্থাৎ আমি ও তোমরা বাহ্যত নির্যাতিত অবস্থায় একত্র হইয়াছি। এইরূপ পরিস্থিতিতে সংগীদের মধ্যে পারস্পরিক মমত্ববোধ ও সহমর্মিতা পূর্ণরূপে জাগরুক থাকে এবং সুখে-দুঃখে ও সুযোগে-দুর্যোগে একে অপরের অন্তরঙ্গ বন্ধু হইয়া যায়। সেই অন্তরঙ্গতার দাবিতে তোমাদের কল্যাণ কামনায় আমি জিজ্ঞাসা করিতেছি, মানুষের স্বভাবে যেহেতু এই চাহিদা বিদ্যমান যে, বিপদে শরণাপন্ন হওয়ার জন্য সে একটি আশ্রয় ক্ষেত্র পাইতে চায় এবং সে এমন একটি নির্ভরযোগ্য স্থান চায় যাহাতে নির্ভর করিয়া সে নিজের সার্বিক ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হইতে পারে এবং এমন কিছু পাইলে সে পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ করিয়া নিজেকে অনুগত রাখিতেও প্রস্তুত থাকে। মানুষের এই স্বভাব-চাহিদার কারণেই সে কাহাকেও তাহার মা'বৃদরূপে বরণ করে এবং তাহাকে নিজের কল্যাণ-অকল্যাণ ও মঙ্গলামঙ্গলের নিয়ন্ত্রণকর্তা মালিক ও 'প্রভু'-র আসনে আসীন করিয়া তাঁহার 'ইবাদতে' নিমগ্ন হওয়াকে নিজের জন্য পরম সার্থকতা মনে করে। এখন তোমরা বল তো, এইরূপ ত্রাণকর্তারূপে মা'বৃদ ও প্রভুর আসনে আসীন করিবার জন্য একাধিক 'রব্ব' ও বিভিন্ন কাজের জন্য বিভিন্ন 'প্রভু'-যাহারা মূলত অনিত্য ও অসক্ষমও বটে-তাহারা স্বর্ণ, রৌপ্য, লৌহ প্রভৃতি ধাতবের তৈরী কিংবা-মাটি পাথরের তৈরী মূর্তি-প্রতিমাই হউক অথবা মানব-জিন্ন-ফেরেশতা কিংবা তাহাদের কথিত প্রতিকৃতিই হউক অথবা অসুর, দৈত্য-দানব কিংবা যিনি অনাদি অনন্ত অক্ষয় অব্যয় সত্তা ও গুণাবলীতে একক; অস্তিত্ব, গুণাবলী ও কর্মে যিনি তুলনাহীন উপমাহীন এবং যিনি 'কাহ্হার'-সার্বভৌম শক্তি, প্রতিপত্তি ও পরাক্রমশীলতায় যিনি সকল শক্তির আধার মা'বুদ, ইলাহ ও প্রভুরূপে বরণ করিবার জন্য তিনিই উত্তম?
এই প্রশ্নের জবাব একক সত্তার স্বীকারোক্তি ব্যতীত অন্য কিছু হইতে পারে না। কেননা যে কোন সাধারণ বুদ্ধির মানুষও এই সহজ কথাটি বুঝে যে, দশজনের গোলামী করার চাইতে একজনের গোলামী করা, বিশেষত যদি তিনি সব মালিকের সেরা মালিক ও সকলের উপর একচ্ছত্র নিরংকুশ ক্ষমতার অধিকারী হন, ইহাই কল্যাণ ও নিরাপত্তার সহজ ও একমাত্র পথ।
পরবর্তী বাক্যে হযরত ইউসুফ (আ) শ্রোতার সত্য গ্রহেণে আগ্রহী মনের অবশিষ্ট সংশয় ও দ্বিধা-দন্দু দূর করিবার জন্য যৌক্তিক ভাষায় সরাসরি সম্বোধন করিয়া বাতিলের বিরুদ্ধে বক্তব্য পেশ করিলেন। মানুষের স্বভাব এই যে, কোন কিছুর প্রতি দীর্ঘ দিনের ঘনিষ্ঠতা ও পুরুষানুক্রমিক সম্পৃক্তি বাতিল ও অসার হইলেও উহার প্রতি একটি আসক্তি জন্মিয়া যায় এবং এই আসক্তি অগ্রাহ্য করিয়া উহা পরিত্যাগ করিতে সে শেষ মুহূর্তের দ্বিধা-দ্বন্দ্বে দুলিতে থাকে। তখনকার জন্য কুশলী প্রাজ্ঞ আহবানকারীর কর্তব্য হইল বাতিলের বিরুদ্ধে সবল যুক্তি প্রদর্শন করিয়া সত্য গ্রহেণে উন্মুখ হৃদয়ের কাছে বাতিলের অন্ধকারাচ্ছন্নতা ও সত্যের আলোকোজ্জ্বলতা তুলিয়া ধরা। তাই ইউসুফ (আ) বলিলেন, পুরুষানুক্রমে যাহাদের পূজা-অর্চনা করা হইতেছে উহাতে কি কোন সত্যতা নাই? এই দ্বিধা-দ্বন্দ্বের অবসানকল্পে ইউসুফ (আ) সুস্পষ্টভাবে বলেন, প্রকৃত বিচারেই উহাতে কোন সত্যতা নাই। কেননা আমার বক্তব্যে বিঘোষিত পরাক্রমশালী এক আল্লাহ ব্যতীত আর যাহা কিছুকে তোমরা মা'বুদ বানাইয়া রাখিয়াছ উহাদের স্বরূপ আমার কাছে শোন। ঐগুলি শুধুই নাম, যেসব নামের ধারকরূপে কোন কিছুরই অস্তিত্ব নাই এবং আরও মজার ব্যাপার এই যে, ঐ নামগুলিও তোমাদের ও তোমাদের পূর্বপুরুষের রচিত। তোমরাই নিজেদের হাতে মূর্তি তৈয়ার করিয়া উহাদের এক একটিকে এক এক নামে আখ্যায়িত করিয়াছ। এখন এই দাবি যে, উহারা তো মূল খোদা নয়, উহারা আল্লাহ্ কাছে আমাদের জন্য সুপারিশ করিবে মাত্র অথবা এই ধারণা যে, হয়তো আল্লাহই উহাদিগকে তাঁহার প্রতিভূ মনোনীত করিয়াছেন, এই সম্পর্কে আমার বক্তব্য যে, আল্লাহ উহাদের সপক্ষে কোন প্রমাণ পাঠান নাই। সুতরাং যুক্তি ও বিবেক-বুদ্ধির বিচারে ইহাদের মা'বুদ হওয়া স্বীকৃত হইতে পারে না।
আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করিয়াছেন যে, হুকুম ও হুকুমত, রাজত্ব, ক্ষমতা, সার্বভৌমত্ব ও বিধান প্রদানের অধিকার একমাত্র আল্লাহর জন্যই সংরক্ষিত। কেননা অনাদি অনন্ত চিরঞ্জীব সত্তারূপে নিরংকুশ সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার কারণে এবং গুণাবলীর বিচারেও একমাত্র তিনি সমগ্র সৃষ্টির ইবাদত প্রাপ্তির অধিকার রাখেন। অর্থাৎ তিনি শুধু হুকুম প্রদানের অধিকার সংরক্ষণের ঘোষণা প্রদান করিয়াই ক্ষান্ত হন নাই, বরং সকল সংশয় ও সম্ভাবনার অবসান ঘটাইয়া একমাত্র তাঁহাকেই মা'বুদ বানাইবার আদেশও জারী করিয়াছেন এবং ইহাকেই একমাত্র সঠিক দীন সাব্যস্ত করিয়াছেন। আর যাহারা ইহার বিপরীত করিবে তাহাদিগকে 'অজ্ঞ' বলিয়াছেন— যাহারা হক ও বাতিলের পার্থক্য নির্ণয়ে অক্ষম হওয়ার কারণে অজ্ঞতার অন্ধকারে হাবুডুবু খায়।
হযরত ইউসুফ (আ) তাঁহার এই দা'ওয়াতী ভাষণে দীনেরস্বরূপ তুলিয়া ধরিয়াছেন। ইহাতে তিনি দীনের মৌলিক আকীদা উপস্থাপন করিয়াছেন, কুফরী ও অংশীবাদের বিরুদ্ধে প্রবল যুক্তি উত্থাপন করিয়া বাতিলের ভিত নড়াইয়া দিয়াছেন। বায়দাবী বলিয়াছেন, এই ভাষণে দা'ওয়াত প্রদান ও প্রমাণ প্রতিষ্ঠার ক্রমোন্নতির পন্থা অবলম্বন করা হইয়াছে। প্রথমে তিনি অংশীবাদের বিপরীতে একত্ববাদের প্রাধান্য ও শ্রেষ্ঠত্ব উপস্থাপন করিয়াছেন। অতঃপর কথিত মা'বুদদের অসারতার প্রমাণ পেশ করিয়াছেন। কেননা সত্তাগত অথবা গুণাবলীর বিচারে এই কথিত মা'বুদদের মধ্যে ইবাদত প্রাপ্তির কোন যোগ্যতা নাই। অতঃপর তিনি স্পষ্ট ভাষায় যুক্তিগ্রাহ্য ও বুদ্ধি সমর্থিত একমাত্র সঠিক দীনের পরিচয় প্রদান করিলেন (ফী জিলালিল কুরআন, উরদু, ৪খ., ৭২৭...; মা'আরিফ, ৫খ., ৫৭; মাজহারী, ৫খ., ১৬৩, ১৬৪)। দীনের দা'ওয়াত সম্পর্কে এই সারগর্ভ ভাষণের পর ইউসুফ (আ) বন্দীদ্বয়ের মধ্যে একজনের আসন্ন জীবনাবসনের কথা বুঝিতে পারিয়াও উভয়ের নিকট দাওয়াত পেশ করিলেন। কেননা আদালতের বিচারে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হওয়া ছিল অস্থায়ী পার্থিব জীবনের ব্যাপার। আর এক আল্লাহ্র প্রতি ঈমান আনিয়া মৃত্যুর কোলে আশ্রয় নেওয়া ছিল চিরস্থায়ী জীবনে পরম সাফল্য লাভের ব্যাপার। নবী-রাসূলগণ ও তাঁহাদের অনুসারী দীনের দা'ঈগণের কাছে ব্যক্তির পরকালীন কল্যাণই মুখ্য বিষয়। এই কারণে ইউসুফ (আ) লোকটির আসন্ন মৃত্যু অবধারিত জানিয়াও তাহাকে দীনের দাওয়াত দিয়াছিলেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00