📄 যুলায়খার প্রেমাসক্তি চর্চা ও ইউসুফ (আ)-এর কারাবাস
আযীয মিসর কর্তৃক তাহার অন্দর মহলের ঘটনা চাপা দেওয়ার সার্বিক চেষ্টা সত্ত্বেও রাজ-পরিবার ও সরকারি মহলে ঘটনাটি পৌছিয়া গেল এবং স্বভাবতই অভিজাত নারী সমাজে উহার চর্চা হইতে লাগিল। এক সময় এই চর্চার প্রতিধ্বনি যুলায়খার কানেও পৌঁছিল। যুলায়খার আত্মমর্যাদায় আঘাত লাগিল এবং তাহার অন্তরে নিন্দাকারিণীদের প্রতি প্রতিশোধের আগুন জ্বলিয়া উঠিল। প্রতিশোধ গ্রহণ ও নিন্দাকারিণীদের কিঞ্চিত জব্দ করিয়া নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করিবার উদ্দেশ্যে যুলায়খা তাহার সরকারি ভবনে অভিজাত নারীদের জন্য একটি ভোজ অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করিল। অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে নিজ হাতে ফল বা অন্য কোন খাদ্য কাটিয়া খাওয়ার জন্য আমন্ত্রিতদের প্রত্যেকের হাতে ধারাল ছুরি প্রদান করা হইল এবং সে মুহূর্তে ইউসুফ (আ)-কে সেখানে উপস্থিত করা হইল। সমবেত নারীরা ইউসুফ (আ)-কে এক নজর দেখিবামাত্র খাদ্য বা ফলের পরিবর্তে তাহাদের হাতের আঙ্গুল যখম করিয়া ফেলিল। বিজয়গর্বিনী যুলায়খা তখন তাহার প্রেমের স্বীকারোক্তি করিল এবং পুনরায় নারীদের সম্মুখে ইউসুফ (আ)-কে জেলের হুমকী দিল।
কুরআনের ভাষায়: وَقَالَ نِسْوَةٌ فِي المَدِينَةِ امْرَأَةُ العَزيزِ تُرَاوِدُ فَتْهَا عَنْ نَفْسِهِ قَدْ شَغَفَهَا حَبًّا إِنَّا لَنَرْهَا فِي ضَلَلٍ مُّبِينٍ. فَلَمَّا سَمِعَتْ بِمَكْرِهِنَّ أَرْسَلَتْ إِلَيْهِنَّ وَاعْتَدَتْ لَهُنَّ مُتَكَاً وَقَالَتِ اخْرُجْ عَلَيْهِنَّ فَلَمَّا رَأَيْنَهُ أَكْبَرْتُهُ وَقَطَّعْنَ أَيْدِيَهُنَّ وَقُلْنَ حَاشَ لِلَّهِ مَا هَذَا بَشَرًا إِنْ هَذَا إِلَّا مَلَكَ كَرِيمٌ . قَالَتْ فَذُلِكُنَّ الَّذِي لَمْتُنْنِي فِيْهِ وَلَقَدْ رَاوَدْتُهُ عَنْ نَفْسِهِ فَاسْتَعْصَمَ وَلَئِنْ لَمْ يَفْعَلْ مَا أَمُرُهُ لِيُسْجَنَنَّ وَلَيَكُونَ مِّنَ الصَّغِرِينَ .
"নগরীর কতিপয় নারী বলিল, আযীযের স্ত্রী তাহার যুবক দাস হইতে অসৎ কর্ম কামনা করিতেছে। প্রেম তাহাকে উন্মত্ত করিয়াছে, আমরা তো তাহাকে দেখিতেছি স্পষ্ট ভ্রান্তিতে। স্ত্রীলোকটি যখন উহাদের ষড়যন্ত্রের কথা শুনিল তখন সে উহাদিগকে ডাকিয়া পাঠাইল, উহাদের জন্য আসন প্রস্তুত করিল, উহাদের প্রত্যেককে একটি করিয়া ছুরি দিল এবং ইউসুফকে বলিল, উহাদের সম্মুখে বাহির হও। অতঃপর উহারা যখন তাহাকে দেখিল তখন উহারা তাহার গরিমায় অভিভূত হইল এবং নিজেদের হাত কাটিয়া ফেলিল। উহারা বলিল, অদ্ভূত আল্লাহ্ মাহাত্ম্য! এ তো মানুষ নহে, এ তো এক মহিমান্বিত ফেরেশতা। সে বলিল, এ-ই সে যাহার সম্বন্ধে তোমার আমার নিন্দা করিয়াছ। আমি তো তাহা হইতে অসৎকর্ম কামনা করিয়াছি। কিন্তু সে নিজেকে পবিত্র রাখিয়াছে। আমি তাহাকে যাহা আদেশ করিয়াছি সে যদি তাহা না করে তবে সে কারারুদ্ধ হইবে এবং হীনদের অন্তর্ভুক্ত হইবে" (১২:৩০-৩২)।
তাফসীর ও ইতিহাসের বিবরণ অনুসারে (মন্ত্রী পরিষদ) আমীর-উমারা ও সরকারী উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের অন্দর মহলের নারীরা, বিশেষত আযীয মিসরের সহিত নিকট সম্পর্কযুক্ত কর্মকর্তাদের স্ত্রীদের মধ্য হইতে পাঁচ মহিলা (কুরতুবী, মাজহারী) যুলায়খার প্রেমে উন্মত্ততা ও তাহার সতীত্ব লইয়া চর্চা করিতেছিল। কেননা কোন সূত্রে এই ঘটনা তাহাদের কর্ণগোচর হইয়াছিল এবং নারী স্বভাবের বশবর্তী হইয়া তাহারা মুখরোচক নিন্দা চর্চায় লিপ্ত হইল। তাহারা এই বলিয়া নিন্দা ও সমালোচনার ঝড় তুলিল যে, একে তো বিবাহিতা নারী, তাহা ছাড়াও আবার রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পদাধিকারীর স্ত্রী। রাজ-পরিবারের কন্যা হইয়া পরকীয়া প্রেম! আচ্ছা, প্রেম যদি একান্তই করিতেই হইত তবে কোন উপযুক্ত পাত্র দেখিয়াই করিত! কস্মিনকালেও কি কেহ নিজের গোলামের সহিত কাহাকেও প্রেম করিতে শুনিয়াছে! ধিক শত ধিক! লজ্জায় আমাদেরও মাথা হেঁট করিল আযীযের স্ত্রী।
নারী মহলের এই নিন্দা ও সমালোচনার সংবাদ এক সময় যুলায়খার কানেও পৌছিল। কুরআনের ভাষায় তাহাদের নিন্দা চর্চাকে 'চক্রান্ত (مکر)' বলিবার কারণ সম্পর্কে তাফসীরকারগণ বলিয়াছেন যে, এই নিন্দাবাদ চক্রান্তকারীর কর্মের ন্যায় গোপনে গোপনে করিবার কারণে ইহাকে 'চক্রান্ত' বলা হইয়াছে। মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক বলিয়াছেন, নারীদের কাছে ইউসুফ (আ)-এর অনুপম সৌন্দর্যের বিষয়টি পৌঁছিয়াছিল। কোন কোন বর্ণনামতে যুলায়খাই তাহাদের নিকট ইউসুফ (আ)-এর রূপ-গুণের বিবরণ দিয়াছিল। সুতরাং বাহ্য নিন্দার আড়ালে তাহাদের উদ্দেশ্য ছিল প্রত্যক্ষরূপে ইউসুফ (আ)-কে দর্শন করিবার উপায় হাসিল করা এবং এভাবে নিন্দার মাধ্যমে ইউসুফ (আ)-কে প্রদর্শন করাইতে যুলায়খাকে উদ্বুদ্ধ করা। এই গোপন উদ্দেশ্যের প্রতি লক্ষ্য করিয়া তাহাদের কর্মকাণ্ডকে চক্রান্ত বলা হইয়াছে। কেহ কেহ বলিয়াছেন, যুলায়খা তাহার প্রেমের কথা এই নারীদের (বান্ধবীদের) নিকট প্রকাশ করিয়াছিল এবং তাহাদিগকে উহা গোপন রাখিবার অনুরোধ করিয়াছিল। কিন্তু তাহারা উহা ফাঁস করিয়া দিয়াছিল বলিয়া উহাকে 'চক্রান্ত' বলা হইয়াছে (ইবন কাছীর, মাজহারী)। এখানে উল্লেখ্য যে, অভিজাত সমাজের মর্যাদা অনুসারে আযীয-পত্নীর অনুমতি কিংবা আমন্ত্রণ ব্যতীত এই নারীদের পক্ষে ইউসুফ (আ)-কে দেখিবার সুযোগ গ্রহণের সম্ভাবনা ছিল অত্যন্ত ক্ষীণ। নারীদের সমালোচনা যুলায়খার অহংবোধকে নাড়া দিল এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সদিচ্ছা ছাড়াও তাহার নারী প্রবৃত্তি নিন্দাকারিনীদের মোক্ষম শিক্ষা দেওয়ার জন্য তাহাকে উদ্বুদ্ধ করিল। ইহার উপায় হিসাবে সে নিজ ভবনে একটি ভোজ অনুষ্ঠানের আয়োজন করিয়া সম্ভ্রান্ত ও অভিজাত মহিলাদের নিকট উহার আমন্ত্রণপত্র পাঠাইল। ইবন ওয়াহবের বর্ণনামতে নিন্দাচর্চায় অংশগ্রহণকারীদের চল্লিশজনকে এই অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হইয়াছিল। ভোজ অনুষ্ঠানের সাজসজ্জার জন্য যথাযোগ্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইল। ইবন আব্বাস (রা) হইতে উদ্ধৃত বর্ণনা মতে-বিলাসপ্রিয় শ্রেণীর উপযোগী গদী, হেলান-তাকিয়া ইত্যাদি এবং রকমারি সুস্বাদু খাদ্যদ্রব্য ও বিভিন্ন প্রকার ফল-ফলাদির আয়োজন করা হইল। বাগাবীর মতে, আযীয পত্নী রং-বেরংয়ের ফল ও খাদ্য দ্বারা একটি কক্ষ সজ্জিত করিল এবং উহাতে আরামদায়ক বিছানাপত্র ও হেলান-তাকিয়ার ব্যবস্থা করিয়া নারীদের আসন গ্রহণের আমন্ত্রণ জানাইল। খাদ্যদ্রব্য কিংবা ফলের তালিকায় এমন কিছু ছিল যাহা তাৎক্ষণিকভাবে চাকু দিয়া কাটিয়া খাইতে হয় এবং তৎকালীন মিসরীয় সভ্যতা অনুসারে ঐ খাদ্য বা ফল কাটিয়া পরিবেশন করা হইত না, বরং মেহমানগণ নিজেরা কাটিয়া ভক্ষণ করিত। এই খাদ্য কোন কোন মুফাসসিরের মতে গোস্ত ছিল এবং অন্যদের মতে ফল ছিল। ইবন আব্বাস (রা) ও মুজাহিদ প্রমুখের মতে উহা ছিল উতরুজ বা উতরুঞ্জ (= কমলালেবু জাতীয় কোন ফল)। ফল কাটিয়া খাওয়ার জন্য নিয়মমাফিক প্রত্যেকের পাত্রে একটি করিয়া অতিরিক্ত ধারাল চাকু সরবরাহ করা হইল।
মাওলানা আবুল কালাম আযাদের বক্তব্য অনুসারে আজ হইতে চার হাজার বৎসর পূর্বেকার মিসরীয় নগর সভ্যতা বর্তমানের উন্নত বিশ্বের যে কোন দেশের প্রগতি ও আধুনিকতার তুলনায় উন্নততর ছিল বলিয়া প্রতীয়মান হয়। কেননা আধুনিক কালে আবিষ্কৃত বহুবিধ উপকরণের উপস্থিতি ব্যতীতই মিসরীয় যে জীবনধারার পরিচয় পাওয়া যায় উহা সত্যিই বিস্ময়কর। মৃতদেহ মমি করিয়া রাখিবার বিজ্ঞান ও প্রকৌশলসহ অনেক তথ্যই এ প্রসঙ্গে উত্থাপিত হইতে পারে। আযীয-পত্নীর আয়োজিত ভোজসভা সংক্রান্ত কুরআনী ভাষ্য এখানকার নগরজীবনের প্রগতি-সমৃদ্ধ ধারা ও আয়েশ-বিলাসিতার প্রতি স্পষ্ট ইংগিত প্রদান করে (তরজমানুল কুরআন, সূরা ইউসুফ)। চাকু সরবরাহের বাহ্য লক্ষ্য ছিল খাদ্য কাটিবার ব্যবস্থা করা। কিন্তু ইহাতে আযীয-পত্নীর অন্তরে লুকায়িত ছিল কঠোর প্রতিশোধ গ্রহণের সুদূরপ্রসারী দুরভিসন্ধি। ইবন কাছীরের বর্ণনামতে আমন্ত্রিত অতিথিদের পরিতৃপ্তির সহিত আহারপর্ব সমাপ্ত করিবার শেষ পর্যায়ে তাহাদের সম্মুখে লেবু ও ফল কাটিবার চাকু সরবরাহ করা হইল।
এখন যুলায়খা তাহাদের নিকট ইউসুফ (আ)-কে দেখিবার আগ্রহ আছে কিনা জানিতে চাহিলে তাহারা সকলে হাঁ-সূচক জবাব দিল। ভিন্ন বর্ণনামতে তাহারাই স্বতঃপ্রণোদিত হইয়া ইউসুফ (আ)-কে দেখাইবার আবদার করিয়াছিল। যুলায়খা ইহারই অপেক্ষায় ছিল। সে পূর্ব হইতেই ইউসুফ (আ)-কে সর্বোত্তম আকর্ষণীয় পোশাকে সজ্জিত করিয়া পার্শ্ববর্তী কোন কক্ষে অপেক্ষমাণ রাখিয়াছিল। এক্ষণে সে তাহাকে মজলিসের সম্মুখে উপস্থিত হওয়ার আদেশ পাঠাইল। যুলায়খার অসৎ উদ্দেশ্যের কথা ইউসুফ (আ) অবহিত ছিলেন না। কোন সংগত প্রয়োজন আছে মনে করিয়া তিনি কক্ষের বাহিরে আসিলেন। নারীদের ইউসুফ (আ)-কে দর্শন করিতেই যুলায়খার কাংখিত চরম অঘটনটি ঘটিয়া গেল। তাহারা এক অকল্পনীয় ও অনুপম সৌন্দর্য দর্শনে এমন আত্মহারা ও দিশাহারা হইয়া গেল যে, কুরআনের ভাষায় তাহাকে অতি বড় বা অতি জাগতিক কিছু মনে করিল (অথবা 'আল্লাহু আকবার' ধ্বনি দিয়া উঠিল)। প্রথমে তাহাদের মুখের সকল ভাষা রুদ্ধ হইয়া গেল এবং সকল অনুভূতি অসাড় হইয়া রহিল। তাহারা 'ফল কাটিতেছি' মনে করিয়া নিজ নিজ হাত কাটিতে লাগিল। যুলায়খা তখন ইউসুফ (আ)-কে ফিরিয়া যাওয়ার নির্দেশ দিল। উদ্দেশ্য ছিল নারীদিগকে আগমন ও প্রস্থান উভয় অবস্থায় ইউসুফকে দেখানো।
ইউসুফ (আ) ফিরিয়া গেলেন। হতভম্ব দর্শণার্থীদের হাত কাটা চলিতে থাকিল। তাহারা তো ফল কাটিতেছিল আর হৃদয়মন ইউসুফ দর্শনে এমন নিমগ্ন ছিল যে, নিজের হাত কাটিবার যাতনাও অনুভব করে নাই। মুজাহিদ বলেন, রক্ত দেখিয়া তাহাদের চেতনা ফিরিয়া আসিল। এতক্ষণে বেদনা অনুভব করিয়া উহ্ আহ্ করিতে লাগিল। কাতাদার বর্ণনায় আছে, তাহারা হাত কাটিয়া সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করিয়া ফেলিয়াছিল। ইবন ওয়াহবের বর্ণনায় হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হইয়া মহিলাদের কয়েকজনের জীবনলীলা সাংগ করিবার কথাও বলা হইয়াছে। তবে প্রামাণ্য মতে তাহারা হাত যখম করিয়াছিল। এতক্ষণ তাহাদের মুখ হইতে কোন বাকস্ফুরণও হইতেছিল না। হতভম্বতার ধাক্কা সামলাইয়া প্রথম তাহারা যে কথাটি বলিল, তাহা ছিল 'অবিশ্বাস্য? আল্লাহ্র মহিমা! মানবকূলে এমন সৌন্দর্য হইতে পারে না; সে নিশ্চয় কোন মহান ফেরেশতা (জ্যোতির্ময় ঊর্ধ্ব জাগতিক কোন সৃষ্টি) হইবে, কোন কারণে যে ভূতলে পদার্পণ করিয়াছে।
নিন্দাবাণে আহত ও প্রেম দহনে ক্ষতবিক্ষত যুলায়খা এখন তাহার অন্তর্জালার কিছুটা উপশম অনুভব করিল এবং বিজয় গর্বিণীর হাসি হাসিয়া অতিথিদের বলিল, এই তো সেই 'কিনআনী গোলাম' যাহার প্রেমে হাবুডুবু খাওয়ার কথা বলিয়া তোমরা আমার বিরুদ্ধে নিন্দার ঝড় তুলিয়াছিলে। আর এখন এক নজর দেখিয়াই তোমাদের কী হাল হইয়াছে তাহা তো তোমরা দেখিতেছই। মূলত তোমাদের পক্ষে তাহার সৌন্দর্য সম্পর্কে কল্পনা করাও সম্ভব ছিল না। এক নজরেই যদি তোমাদের ফলের বদলে হাত কাটিতে হয়, তাহা হইলে যাহাকে চব্বিশ ঘণ্টা এই সৌন্দর্যের আগুন নিয়া উঠাবসা করিতে হয় তাহার কলিজার ক্ষতবিক্ষত হওয়ার অবস্থা তোমরা সহজেই ধারণা করিতে পার। নারীরা একবাক্যে বলিল, আমরা যাহা কিছু দেখিলাম ইহার পর তোমাকে আর কোন দোষ দেওয়া যায় না। কেননা মানবকুলে এই সৌন্দর্যের কোন তুলনা নেই। নারীদের এই স্বীকৃতির পর যুলায়খাও অকপট স্বীকারোক্তি করিয়া বলিল, এ কথা সত্য যে, আমিই তাহাকে ফুসলাইয়াছিলাম। কিন্তু তাহার এই বাহ্য সৌন্দর্যের ঊর্ধ্বে তাঁহার চারিত্রিক দৃঢ়তা এতই সবল যে, সে সম্পূর্ণরূপে আত্মরক্ষা করিয়া চলিয়াছে; বিন্দুমাত্র বিচলিত হয় নাই। বর্ণনামতে এই সময় যুলায়খা ইউসুফ (আ)-এর সে সব গুণের বিবরণ প্রদান করিল যাহা বাহ্য দর্শনে আগন্তুক নারীদের পক্ষে বুঝিবার উপায় ছিল না।
যুলায়খার এই প্রকাশ্য স্বীকারোক্তির আর একটি সূক্ষ্ম উদ্দেশ্য ছিল ইউসুফের প্রতি প্রেমের ব্যাপারে আমন্ত্রিত নারীদের সমর্থন লাভ করা, যাহাতে তাহারা ইউসুফ (আ)-কে নমনীয় করিবার কাজে তাহাকে সহায়তা করে। ইতিহাসের বর্ণনামতে যুলায়খার এই উদ্দেশ্য হাসিল হইয়াছিল। কেননা তাহারা সকলে ইউসুফ (আ)-কে এই মর্মে বুঝাইতে চেষ্টা করিয়াছিল যে, যুলায়খা যেহেতু তোমার মালিক ও মনিব, সে তোমার প্রতি সদা অনুগ্রহশীলা এবং তোমার প্রতি তাহার প্রেম অত্যন্ত গভীর ও নিখাদ, সুতরাং তোমার উচিত মনিবের আনুগত্য করা, তাহার বিরুদ্ধাচরণ বা তাহাকে অসন্তুষ্ট করা নহে। পবিত্র কুরআনের বর্ণনাধারায়ও ইহার প্রতি ইংগিত বিদ্যমান। সূরা ইউসুফের ৩৩ নং ও ৫০ নং আয়াতে উদ্ধৃত ইউসুফ (আ)-এর ভাষ্যে 'নারীদের কূট-চক্রান্তে'র কথা বলা হইয়াছে: 'যদি আপনি (আল্লাহ) আমার হইতে 'তাহাদের চক্রান্ত' দূরে সরাইয়া না দেন' (৩০ নং আয়াত) এবং "আমার প্রতিপালক 'তাহাদের চক্রান্ত' সম্পর্কে সম্যক অবহিত” (আয়াত-৫০) শুধু যুলায়খার চক্রান্তের কথা না বলিয়া নারীদের সকলের চক্রান্তের কথা বলা হইয়াছে। নিজের দোষের স্বীকারোক্তি এবং ইউসুফ (আ)-এর পবিত্রতা ও গুণ-গরিমার বর্ণনা প্রদান করিবার পর যুলায়খা তাহার স্বার্থসিদ্ধির জন্য একটি নূতন চাল চালিল। ইউসুফ (আ)-কে কাবু করিবার জন্য সে অতিথিদের সম্মুখে এবং তাহাদের শুনাইয়া ইউসুফ (আ)-এর প্রতি এই হুমকি উচ্চারণ করিল, সে যদি আমার অবাধ্য হয় তবে তাহাকে এই রাজকীয় পরিবারে সুখ-শান্তি ও আরাম-আয়েশে বসবাসের সুবর্ণ সুযোগ হইতে বঞ্চিত হইয়া (আজীবন) জেলখানায় পচিতে হইবে এবং অনেক লাঞ্ছনা ভোগ করিতে হইবে। কেননা নারীর মনঃবাসনা পূরণ না হইলে তাহার প্রতিশোধ-স্পৃহা অত্যন্ত জঘন্য ও ভয়ংকর হইয়া থাকে।
কিন্তু নারীদের সম্মিলিত চক্রান্ত ও যুলায়খার হুমকী বাণী নবুওয়াত খান্দানের আলোকবর্তিকায় সামান্য কম্পনও সৃষ্টি করিতে পারিল না। ইউসুফ (আ) পাহাড়ের ন্যায় অবিচল থাকিলেন এবং সব বিপদের সহায় ও সব সমস্যার সমাধানদাতার দরবারে দু'আ করিলেন। কুরআনের ভাষায়: قَالَ رَبِّ السِّجْنُ أَحَبُّ إِلَى مِمَّا يَدْعُونَنِي إِلَيْهِ وَإِلَّا تَصْرِفْ عَنِّى كَيْدَهُنَّ أَصْبُ إِلَيْهِنَّ وَأَكُنْ مِنَ الْجهلِينَ، فَاسْتَجَابَ لَهُ رَبُّهُ فَصَرَفَ عَنْهُ كَيْدَهُنَّ إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ . ثُمَّ بَدَا لَهُمْ مِنْ بَعْدِ مَا رَأَوُا الأَيَتِ لَيَسْجُنُنَّهُ حَتَّى حِينٍ.
"ইউসুফ বলিল, হে আমার প্রতিপালক! এই নারীরা আমাকে যাহার প্রতি আহ্বান করিতেছে তাহা অপেক্ষা কারাগার আমার নিকট অধিক প্রিয়। আপনি যদি উহাদের ছলনা হইতে আমাকে রক্ষা না করেন, তবে আমি উহাদের প্রতি আকৃষ্ট হইয়া পড়িব এবং অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হইব। অতঃপর তাহার প্রতিপালক তাহার আহ্বানে সাড়া দিলেন এবং তাহাকে উহাদের ছলনা হইতে রক্ষা করিলেন। তিনি তো সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। নিদর্শনাবলী দেখিবার পর উহাদের মনে হইল যে, তাহাকে কিছু কালের জন্য কারারুদ্ধ করিতেই হইবে" (১২: ৩৩-৩৫)।
ঐতিহাসিক ও মুফাসসিরগণের বর্ণনামতে ইউসুফ (আ) যখন দেখিলেন যে, এই বিদেশ-বিভূঁইয়ে তাঁহার কোন সাহায্যকারী নাই এবং তাহার প্রতিপক্ষ যুলায়খার সামাজিক অবস্থান অত্যন্ত সুদৃঢ়। যুলায়খার আহবানে সমবেত নারীরা তাহার মন জয় করিবার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হইয়া বিভিন্ন ফন্দী করিতেছে এবং যুলায়খার নিন্দাকারিণীরা এখন যুলায়খাকে নির্দোষ সাব্যস্ত করিতেছে, উপরন্তু তাহারা ইউসুফ (আ)-কে নমনীয় করিবার জন্য ও যুলায়খার বাসনা পূরণ করিতে ইউসুফ (আ)-কে অনুরোধ-উপরোধ করিতেছে। কখনও প্রলোভন, কখনও হুমকি দিতেছে (মাজহারী, ৫খ, ১৬০; কাসাসুল কুরআন, ১খ, ২৯৯, ৩০০) এবং ভিন্ন বর্ণনামতে তাহাদের প্রত্যেকেই ইউসুফ (আ)-কে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করিতে চাহিতেছে। এই জটিল ও সংগীন পরিস্থিতি ইউসুফ (আ)-কে পূর্বের চাইতে অধিক ভাবাইয়া তুলিল এবং একাকী যুলায়খার চাপ এড়াইয়া মনিবগৃহে নির্লিপ্ত অবস্থান করিবার পরিস্থিতি বদলাইয়া গেল। তখন তাঁহার নবুওয়াতী বুদ্ধিমত্তা ও অন্তরদৃষ্টি জাগ্রত হইয়া উঠিল। তিনি আশংকা করিলেন যে, তাঁহারও পদস্খলন ঘটিতে পারে। সুতরাং তিনি বড় বিপদ (পাপাচারে লিপ্ত হইয়া দুনিয়া-আখিরাত বরবাদ করা) হইতে বাঁচিবার জন্য ছোট বিপদ কারাবাস বরণ করা অধিক পসন্দনীয় মনে করিয়া আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করিলেন।
আল্লামা ইবন কাছীর ৩৩ নং আয়াতের তাফসীরে লিখিয়াছেন, "ইউসুফ (আ) পূর্ণাঙ্গরূপে আত্মরক্ষা করিবার জন্য কারাবাস পসন্দনীয় হওয়ার কথা বলিলেন। ইহা কামালিয়াতের স্তরসমূহের চূড়ান্ত পর্যায়। একদিকে তাঁহার যৌবন ও অতুলনীয় রূপ-গুণের পরিপূর্ণতা, অপরদিকে মিসরের প্রধান মন্ত্রীর স্ত্রী-মনিব ও গৃহকর্ত্রী, কর্তৃত্ব, সম্পদ ও রূপের অধিকারিণীর উদগ্র আহবান। কিন্তু তিনি তাহা প্রত্যাখ্যান করিলেন এবং আল্লাহর ভয় ও তাঁহার কাছে ছওয়াবের আশায় তিনি কারাবাস বরণ করিলেন। তিনি মূলত সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত হাদীছের ভাষ্য অনুসারে কিয়ামতে আল্লাহ্ (আরশের) ছায়ায় আশ্রয় লাভের ব্যবস্থা করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, "সাত ব্যক্তি এমন যাহাদিগকে আল্লাহ তাঁহার ছায়ায় আশ্রয় দান করিবেন-এমন একটি দিনে, যেদিন তাঁহার ছায়া ব্যতীত অন্য কোন ছায়া থাকিবে না"। এই সপ্তমের অন্যতম হইবে সেই পুরুষ যাহাকে কোন মর্যাদার অধিকারিণী রূপবতী নারী 'আহবান' করিলে সে বলিল, 'আমি তো আল্লাহকে ভয় করি' (মুখতাসার ইবন কাছীর, ২খ, ২৪৮)।
মোটকথা, আল্লাহ তা'আলা ইউসুফ (আ)-এর দু'আ কবুল করিলেন এবং তাঁহাকে নারীদের কূটচক্রান্ত হইতে হিফাজত করিলেন। যুলায়খা তাহার স্ত্রৈণ স্বামীকে ইউসুফ (আ)-কে কারাগারে নিক্ষেপ করিতে বাধ্য করিল। যুলায়খার উদ্দেশ্য ছিল জেলে নির্যাতনের মাধ্যমে ইউসুফকে আত্মসমর্পণ করিতে বাধ্য করা অথবা ইউসুফ হাতছাড়া হইয়া যাইতে পারে এবং অন্য নারীরা তাঁহার প্রতি আকৃষ্ট হইতে পারে-এই আশংকায় তাহাকে সংরক্ষিত স্থানে নিজের আওতায় রাখিবার ব্যবস্থা করিল, যাহাতে ইউসুফ (আ) সম্পূর্ণরূপে হাতছাড়া হইয়া না যান। মনের ইচ্ছা গোপন রাখিয়া সে স্বামীকে বলিল, "এই ইবরানী গোলামটি জনসমাজে আমার মর্যাদাহানি করিয়াছে। কেননা সে বলিয়া বেড়াইতেছে যে, আমি তাহাকে ফুসলাইয়াছি। সুতরাং তুমি আমাকে মানুষের কাছে গিয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিবে, অন্যথায় তাঁহাকে কারাগারে অন্তরীণ করিবে, যাহাতে মানুষের মুখ বন্ধ হইয়া যায় এবং লোকেরা তাঁহাকেই অপরাধী মনে করে। অপরদিকে আল্লাহ তা'আলা তাঁহার উপর ভরসাকারী তাঁহার প্রিয় বান্দাকে নারী চক্রান্ত হইতে রক্ষা করিবার জন্য এই কুদরতী ব্যবস্থা করিলেন। আযীয মিসর ও তাহার শুভান্যুধায়ীরা ইউসুফ (আ)-এর পবিত্রতা ও নিষ্কলুষতার সুস্পষ্ট আলামতসমূহ দেখিবার পরেও শহরময় এই ঘটনার চর্চা বন্ধ করিয়া সামাজিক মর্যাদা রক্ষা করিবার জন্য নির্দোষ ইউসুফ (আ)-কে কিছু দিনের জন্য কারাবাস সংগত মনে করিল। আল্লাহ তা'আলাও তাঁহার প্রিয় বান্দাকে কলুষতাপূর্ণ পরিবেশ হইতে সযত্নে দূরে সরাইয়া রাখিলেন (বিদায়া, ১খ, ২০৬)।
📄 কারাগারে হযরত ইউসুফ (আ)
পাপমুক্ত ও পবিত্র থাকিবার কারণে হযরত ইউসুফ (আ) চক্রান্তমূলকভাবে মিসরের কারাগারে প্রেরিত হন। জেলখানায় আগত অপর দুই বন্দীর স্বপ্নের ব্যাখ্যা প্রদান, যাহা পরবর্তীতে ইউসুফ (আ)-এর কারামুক্তির উপলক্ষ ও মিসরের ক্ষমতা সর্বোচ্চ মসনদে আরোহণের সূত্র হইয়াছিল, তাহার বিবরণ কুরআন মজীদে প্রদান করা হইয়াছে:
فَدَخَلَ مَعَهُ السِّجْنَ فَتَيْنِ قَالَ أَحَدُهُمَا إِنِّي أَرَانِي أَعْصِرُ خَمْرًا وَقَالَ الْآخَرُ إِنِّي أَرَانِي أَحْمِلُ فَوْقَ رَأْسِي خُبْرًا تَأْكُلُ الطَّيْرُ مِنْهُ نَبِّئْنَا بِتَأْوِيلِهِ إِنَّا نَرَاكَ مِنَ الْمُحْسِنِينَ.
"তাহার সহিত দুইজন যুবক কারাগারে প্রবেশ করিল। তাহাদের একজন বলিল, 'আমি স্বপ্নে দেখিলাম, আমি আংগুর নিংড়াইয়া রস বাহির করিতেছি', এবং অপরজন বলিল, 'আমি স্বপ্নে দেখিলাম আমি আমার মস্তকে রুটি বহন করিতেছি এবং পাখি উহা হইতে খাইতেছে', আমাদিগকে তুমি ইহার তাৎপর্য জানাইয়া দাও, আমরা তো তোমাকে সৎকর্মপরায়ণ দেখিতেছি" (১২: ৩৬)।
পবিত্র কুরআনের এই আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসীর গ্রন্থাদিতে বলা হইয়াছে যে, ইউসুফ (আ)-এর কারাগারে যাওয়ার সমসাময়িক কালে আরও দুই যুবক কারাগারে প্রবেশ করিয়াছিল। ইবন আব্বাস (রা), দাহ্হাক, মুজাহিদ, মুকাতিল হইতে উদ্ধৃত এবং কালবী প্রমুখের বর্ণনায় ইউসুফ (আ) কারারুদ্ধ হওয়ার বেশ কিছু দিন পরে (৫ বৎসর/৭ বৎসর-কুরতুবী, মাজহারী) দুই যুবকের কারারুদ্ধ হওয়ার কথা বলা হইয়াছে। তবে অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে যুবকদ্বয় ইউসুফ (আ)-এর নিকটবর্তী সময়ই কারারুদ্ধ হইয়াছিল। পবিত্র কুরআনের বর্ণনায় 'তাহার সংগে' শব্দ নিকটকবর্তী সময় হওয়ার ইংগিত বহন করে (মাজহারী, ৫খ, পৃ. ১৬১; মা'আরিফ, ৫খ, ৫৩, ৫৫)।
📄 বন্দীদ্বয়ের পরিচয় ও তাহাদের কারাগারে কারারুদ্ধ হওয়ার কারণ
বাগাবী ও ইবন কাছীর প্রমুখের বর্ণনামতে এই যুবকদ্বয় ছিল মিসর সম্রাট ওয়ালীদ ইবন ছারাওয়ানের কর্মচারী। ইহাদের একজন ছিল সম্রাটের সাকী (পানীয় পরিবেশনকারী) এবং তাহার নাম 'বানু'; অপরজন ছিল রাজভবনের প্রধান পাচক এবং তাহার নাম মিজলাছ (বিদায়া, ১খ, ২০৬; মাজহারী, ৫খ, ১৬)। সম্রাটের শত্রুপক্ষের লোকেরা তাহাকে হত্যা করিবার ষড়যন্ত্র কার্যকর করার জন্য এই দুই কর্মচারীর সহিত যোগ-সাজশ করিয়াছিল। তাহারা সম্রাটের খাদ্য ও শরাবে বিষ মিশাইয়া দেওয়ার জন্য এই দুই রাজকর্মচারীকে বড় ধরনের উৎকোচ প্রদানের প্রলোভন দিলে ইহারা ইহাতে সম্মত হয়। পরে কোন কারণে সাকী উহাতে অস্বীকৃত হইল এবং পাচক উৎকোচ গ্রহণ করিয়া সম্রাটের খাবারে বিষ মিশ্রিত করিয়া দিল। অতঃপর সম্রাটের সম্মুখে খাদ্য-পানীয় উপস্থিত করা হইলে সাকী বলিল, মহারাজ! এই খাবার খাইবেন না, উহাতে বিষ আছে। পাচক বলিল, পানীয় পান করিবেন না, উহাতে বিষ দেওয়া হইয়াছে। তখন সম্রাট সাকীকে বলিলেন, তুমি পানীয় পান কর। সে উহা পান করিল এবং উহাতে তাহার কোন ক্ষতি হইল না। সম্রাট পাচককে খাদ্য ভক্ষণ করিতে বলিলে সে তাহাতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করিল। সেই খাদ্য কোন পশুকে খাওয়ানো হইলে পশুটি মরিয়া গেল। সম্রাট দুইজনকেই বন্দী করিবার আদেশ দিলেন এবং তদন্ত সাপেক্ষে তাহাদের বিচার সম্পন্ন করিবার ফরমান জারী করিলেন (মাজহারী, ৫খ, ১৬১)।
ইউসুফ (আ)-এর অপূর্ব রূপ ও অসাধারণ গুণাবলী জেলখানায়ও সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করিল। তাঁহার বিশ্বস্ততা, সত্যবাদিতা, সেবা ও মানবপ্রেম, ইবাদত-বন্দেগী ও স্বপ্নের ব্যাখ্যা প্রদানে পারদর্শিতা এবং কারাবন্দীদের সহিত সদ্ব্যবহারের কথা জেলের অভ্যন্তরে ছড়াইয়া পড়িল এবং কারাবন্দীরা তাঁহার প্রতি মুগ্ধ হইয়া তাঁহার ভক্তে পরিণত হইল (ইবন কাছীর, তাফসীর, ২খ, ২৪৯; বিদায়া, ১খ, ২০৬)। ইউসুফ (আ) জেলের সকল বন্দীর খোঁজ-খবর নিতেন এবং তাহাদের প্রতি মর্মবেদনা প্রকাশ করিয়া তাহাদিগকে সান্ত্বনা দিতেন ও আশ্বাসবাণী শুনাইতেন। কেহ অসুস্থ হইয়া পড়িলে তাহার সেবা-শুশ্রূষা করিতেন, কাহাকেও ধৈর্যহারা ও চিন্তামগ্ন দেখিতে পাইলে তাহাকে ধৈর্য ধারণের উপদেশ দিতেন এবং মুক্তির আশ্বাসবাণী শুনাইয়া তাহার অন্তরে স্বস্তি ও আত্মবিশ্বাস ফিরাইয়া আনিতেন। নিজে কষ্ট স্বীকার করিয়া অপরকে শান্তি দিতে চেষ্টা করিতেন। তদুপরি রাতভর আল্লাহ তা'আলার ইবাদতে নিমগ্ন থাকিতেন। তাঁহার এই গুণাবলী দেখিয়া জেলের সকল কয়েদী তাঁহার শ্রেষ্ঠত্বের ও মহত্ত্বের স্বীকৃতি দিল, এমনকি প্রধান জেলকর্তাও তাঁহার ভক্ত হইয়া গেল। সে বলিল, আমার ক্ষমতা থাকিলে আমি আপনাকে মুক্ত করিয়া দিতাম। এখন আমার সাধ্য এতটুকুই যে, এখানে আপনার কোন প্রকার কষ্ট হইবে না (মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ, ৫৬)।
বাইবেলের বর্ণনায়ও বিষয়টির প্রতি সমর্থন ব্যক্ত হইয়াছে। ইউসুফ (আ)-এর জ্ঞান-গরিমা ও সদাচারের পরিচয় জেলখানার অভ্যন্তরেও গোপন রহিল না এমন কি কারা অধ্যক্ষও তাহার ভক্ত হইয়া গেল এবং জেলখানার সকল বন্দীকে তাঁহার তত্ত্বাবধানে প্রদান করিয়া জেলের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা তাঁহার হাতে ন্যস্ত করিল। ফলে ইউসুফ (আ)-ই জেলখানার প্রকৃত কর্মকর্তা হইয়া গেলেন। আল্লাহ এই স্থানেও তাঁহাকে ভাগ্যবান করিয়া রাখিলেন" (আদিপুস্তক, ২০: ২১-২৩)।
পবিত্র কুরআনের বর্ণনাধারায়ও বিষয়টির প্রতি স্পষ্ট ইংগিত রহিয়াছে। কেননা সমসাময়িক কয়েদখানাসমূহের নিবর্তনমূলক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে জেলের অভ্যন্তরে বন্দীদের ইউসুফ (আ)-এর কাছে অবাধ গমনাগমন এবং তাহাদের সাবলীল ও স্বতঃস্ফূর্ত আলাপচারিতা এবং যুবক বন্দীদ্বয়ের মুখে ইউসুফ (আ)-এর মাহাত্ম্য ও সদাচারের স্বীকৃতিমূলক উচ্চারণ প্রমাণ করে যে, জেলখানায়ও তাঁহার গুণাবলী সর্বজনবিদিত হইয়া গিয়াছিল এবং ইউসুফ (আ) সেখানে সসম্মানে অবস্থান করিতেছিলেন (হিফজুর রহমান, ১খ, পৃ.; ৩০০ ই. বিশ্বকোষ, ২২খ, ১১৯)।
📄 বন্দীদ্বয়ের স্বপ্নের বিবরণ
ইউসুফ (আ) কারাগারে আবদ্ধ হওয়ার পর তাঁহার নবুওয়াতী কর্তব্য পালনের অংশরূপে দাওয়াতের কাজ করিতেছিলেন। তিনি স্বপ্নের তা'বীর জানিতেন বলিয়া লোকজন অবহিত ছিল। তরুণ বন্দীদ্বয়ও তাঁহার স্বপ্নব্যাখ্যা বিশারদ হওয়ার কথা অবগত হয়। ইহা ছাড়া বিভিন্ন কারণে ইউসুফ (আ)-এর সহিত বন্দীদ্বয়ের ঘনিষ্ঠতা জন্মিয়াছিল। ইতোমধ্যে বন্দীদ্বয়ের প্রত্যেকে তাহার পেশা অনুযায়ী এক একটি স্বপ্ন দেখিল। সাকী দেখিল যে, সে সম্রাটের জন্য আংগুর নিংড়াইয়া মদ তৈরি করিতেছে। ইকরিমা প্রমুখের বর্ণনামতে সাকী ও বাবুর্চী ইউসুফ (আ)-এর কাছে আসিয়া বিনয়ের সহিত আরয করিল, আমরা প্রত্যেকে এক একটি স্বপ্ন দেখিয়াছি। আপনি মেহেরবানী করিয়া আমাদিগকে ইহার তা'বীর বলিয়া দিন। সাকী বলিল, আমি দেখিলাম যে, আমি একটি আংগুর-বীজ বপণ করিলাম এবং তাহা হইতে চারা গজাইয়া উঠিল এবং তাহাতে আংগুরের থোকা দেখা দিল। বর্ণনান্তরে আমি একটি বাগিচায় ছিলাম এবং আমি নিজেকে একটি আংগুর লতার গোড়ায় দেখিতে পাইলাম, যার মাথায় তিন থোকা আংগুর ছিল। সম্রাটের পানপাত্র আমার হাতে ছিল। আমি সেই পাত্রে আংগুরের রস নিংড়াইয়া সম্রাটকে পরিবেশন করিলে তিনি তাহা পান করিলেন।
দ্বিতীয় বন্দী বাবুর্চী তাহার স্বপ্নের বিবরণে বলিল, আমি দেখিলাম আমি মাথায় করিয়া তিনটি ঝুড়ি বহন করিতেছি, ইহাতে রুটি ও বিভিন্ন প্রকারের খাদ্য রহিয়াছে এবং হিংস্র পাখীরা ইহা হইতে ছো মারিয়া খাবার নিয়া যাইতেছে (মাজহারী, ৫খ, ১৬১; ইবন কাছীর, মুখতাসার, ২খ, ২৪৯)। এখানে উল্লেখ্য যে, ইবন আব্বাস (রা) ও অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে বন্দীদ্বয় বাস্তবেই এইরূপ স্বপ্ন দেখিয়া উহার তা'বীর জানিতে চাহিয়াছিল। তবে ইবন জারীর আবদুল্লাহ ইবম মাসউদ (রা) হইতে এ প্রসংগে ভিন্ন মত উদ্ধৃত করিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন, বন্দীরা বাস্তবে কোন স্বপ্ন দেখে নাই, বরং তাহারা ইউসুফ (আ)-এর তাবীরের জ্ঞান পরীক্ষা করিবার উদ্দেশে নিজেদের তৈরি স্বপ্নের বিবরণ দিয়াছিল (মুখতাসার তাফসীরে ইবন কাছীর, ২খ ২৪৯; মাজহারী, ৫খ ১৬২; মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ, ৫৬; বিদায়া, ১খ, ২০৬)। বন্দীদ্বয়ের স্বপ্নের তা'বীর অবগত হওয়ার প্রতি প্রচণ্ড আগ্রহ ও তাঁহার প্রতি তাহাদের ভক্তি লক্ষ্য করিয়া ইউসুফ (আ) ইহাকে দীনের দা'ওয়াত প্রদানের সুবর্ণ সুযোগ মনে করিলেন এবং তা'বীর প্রদানের পূর্বে দীনের দা'ওয়াত পেশ করিলেন। স্বপ্নের ব্যাখ্য সম্পর্কে তিনি একটি সুন্দর ভূমিকা উপস্থাপন করিলেন, যাহাতে তাহাদের আগ্রহ ও ভক্তি আরও বৃদ্ধি পাইয়া দীনের দা'ওয়াত অধিক হৃদয়গ্রাহী হয়। তিনি বলিলেন:
قَالَ لَا يَأْتِيْكُمَا طَعَامٌ تُرْزَقْهِ إِلَّا نَبَاتُكُمَا بِتَأْوِيلِهِ قَبْلَ أَنْ يَأْتِيَكُمَا ذَلِكُمَا مِمَّا عَلَّمَنِي رَبِّي إِنِّي تَرَكْتُ مِلَّةَ قَوْمٍ لَا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَهُمْ بِالآخِرَةِ هُمْ كَفَرُونَ ...... يصاحِبَي السِّجْنِ أَمَّا أَحَدُكُمَا فَيَسْقِي رَبُّهُ خَمْرًا وَأَمَّا لآخَرُ فَيُصْلَبُ فَتَأْكُلُ الطَّيْرُ مِنْ رَأْسِهِ قُضِيَ الْأَمْرُ الَّذِي فِيهِ تَسْتَفْتِيَانِ .
"ইউসুফ বলিল, তোমাদিগকে যে খাদ্য দেওয়া হয় তাহা আসিবার পূর্বেই আমি তোমাদিগবে স্বপ্নের তাৎপর্য জানাইয়া দিব। আমি তোমাদিগকে যাহা বলিব তাহা আমার প্রতিপালক আমাবে যাহা শিক্ষা দিয়াছেন তাহা হইতে বলিব, যে সম্প্রদায় আল্লাহতে বিশ্বাস করে না ও আখিরাতে অবিশ্বাসী আমি তাহাদের মতবাদ বর্জন করিয়াছি।..... হে কারাসংগীদ্বয়। তোমাদের দুইজনের একজন তাহার প্রভুকে মদ্য পান করাইবে এবং অপরজন শুলবিদ্ধ হইবে; অতঃপর তাহার মস্তব হইতে পাখি আহার করিবে। যে বিষয়ে তোমরা জানিতে চাহিয়াছ তাহার সিদ্ধান্ত হইয়া গিয়াছে' (১২ঃ ৩৭-৪১)।
এখন আমার কিছু কথা শোন। এই কথা বলিয়া তিনি তাহাদিগকে দীনের দাওয়াত পেশ করিলেন। মনে রাখিবে, আমার এই যোগ্যতা কোন প্রকার জ্যোতিষী বিদ্যা বা রেখা বিদ্যা নয়, বরং ইহা আল্লাহ্ প্রদত্ত আসামান্য ইল্ম। এই ইল্ম তিনি আমাকে দান করিয়াছেন এই কারণে যে, আল্লাহকে ও আখিরাতকে অবিশ্বাসকারীদের ধর্ম ও মতবাদ বর্জন করিয়া আমি আমার পূর্বপুরুষের অনুসৃত তাওহীদের ধর্ম অনুসরণ করিয়াছি। সুতরাং এইসব বিষয় আমাকে আমার মালিক প্রতিপালক আল্লাহ ওহীর মাধ্যমে অবহিত করেন (মাজহারী, ৫খ, ১৬৩; মা'আরিফ, ৫খ, ৫৬)। তোমাদের স্বপ্নের তা'বীর শোন হে আমর জেলের বন্ধুদ্বয়! তোমাদের কোন একজন এই হত্যা ষড়যন্ত্রের অভিযোগ হইতে মুক্তি পাইয়া তাহার চাকুরীতে বহাল হইবে এবং সে তাহার মালিককে মদ পান করাইবে। অপরজন দোষী সাব্যস্ত হইবে এবং তাহাকে শূলে চাড়ানো হইবে। পাখিরা তাহার মাথা ঠোকরাইয়া তাহার মগজ ও গোশ্ত খাইবে। আংগুরের তিনটি থোকা ও খাবারের তিনটি ঝুড়ির মর্ম হইল, তিন দিনের ব্যবধানে তোমাদের বিচারকার্য সম্পন্ন হইবে। তোমাদের জিজ্ঞাসিত বিষয়ের ইহাই চূড়ান্ত ফয়সালা। ইহার কোন নড়চড় হইবে না। কেননা (হাদীছের বর্ণনামতে) মানুষের স্বপ্ন ঝুলন্ত অবস্থায় থাকে, যখনই উহার তা'বীর প্রদান করা হয়, তখনই ইহা বাস্তবে সংঘটিত হয় (ইবন কাছীর, ২খ, ২৫১; মা'আরিফ, ৫খ, ৫৭-৫৮; বিদায়া, ১খ, ২০৭)।
মুফাসসিরগণের যে দলটি বন্দীদ্বয়ের স্বপ্ন ষানোয়াট হওয়ার মত পোষণ করিয়াছেন তাহারা এই ক্ষেত্রে বলিয়াছেন যে, ইউসুফ (আ) কর্তৃক স্বপ্নের তা'বীর ব্যক্ত করিবার পর বন্দীদ্বয় বলিল, আমরা তো বাস্তবে কোন স্বপ্ন দেখি নাই। আপনাকে পরীক্ষা করিবার জন্য তৈরী স্বপ্ন বর্ণনা করিয়াছিলাম। ইউসুফ (আ) বলিলেন, তোমরা কোন স্বপ্ন দেখিয়া থাক কিংবা না দেখিয়া থাক, এখন বাস্তব ঘটনা সেইভাবেই ঘটিবে যেরূপ আমি বলিয়াছি। কেননা উহা আমি নবুওয়াত সূত্রে প্রাপ্ত জ্ঞানের মাধ্যমে বলিয়াছি (মা'আরিফ, ৫খ, ৫৮; ইবন কাছীর, ২খ., ২৫১; মাজহারী, ৫খ, ১৬৫)।
এখানে ইউসুফ (আ)-এর অন্যতম নবুওয়াতী গুণ লক্ষণীয়। তাহা এই যে, মানুষের প্রতি নবীগণের অত্যন্ত মমত্ববোধের কারণে তাহারা কোন মানুষের মনে প্রত্যক্ষরূপে আঘাত সৃষ্টি হইতে দেন না। আলোচ্য ক্ষেত্রেও বন্দীদ্বয়ের মধ্যে কে মুক্তি পাইবে এবং কে অপরাধী সাব্যস্ত হইবে তাহা প্রায় স্পষ্ট থাকা সত্ত্বেও ইউসুফ (আ) সরাসরি সাকীকে বলিলেন না যে, তুমি মুক্তি পাইবে এবং বাবুর্চীকে বলিলেন না, যে তোমাকে শূলে দেওয়া হইবে। বরং তিনি নির্দিষ্টরূপে একজনের মুক্তিলাভ ও অপরজনের শূলিবিদ্ধ হওয়ার কথা বলিলেন, যাহাতে মৃত্যুদণ্ডের অপরাধী ব্যক্তি দণ্ড লাভের নির্ধারিত সময়ের পূর্ব হইতে সার্বক্ষণিক যাতনা ভোগ না করিয়া আশাবাদী থাকিতে পারে। জীবনের সর্বক্ষেত্রেই মানুষের প্রতি নবী-রাসূলগণের মমত্ববোধ এইরূপ হইয়া থাকে (মা'আরিফ, ৫খ, ৫৭; ইবন কাছীর, ২খ, ২৫১)।
পরবর্তী সময়ে মামলার তদন্তে সম্রাটকে হত্যার ষড়যন্ত্রে সাকী নিদোর্ষ ও বাবুর্চী অভিযুক্ত সাব্যস্ত হইল এবং তিন দিন পরে তাহাদিগকে আদালতে উপস্থিত করিয়া বিচারের রায় শুনাইয়া দেওয়া হইল। বিচারে সাকীকে মুক্তি প্রদান করিয়া তাহার পূর্বপদে বহাল করা হইল এবং বাবুর্চীকে শূলীকাষ্ঠে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হইল। এই ঘটনা ইউসুফ (আ)-এর প্রতি কারাবাসীদের ভক্তি-বিশ্বাস আরও বৃদ্ধি করিয়া দিল এবং পরবর্তীতে ইহাই ইউসুফ (আ)-এর জেল হইতে মুক্তি লাভের অন্যতম কারণ হইয়াছিল (কাসাসুল কুরআন, ১খ, ৩০২; মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ, ৫৪)।