📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হযরত ইউসুফ (আ)-এর নবুওয়াত লাভ

📄 হযরত ইউসুফ (আ)-এর নবুওয়াত লাভ


আযীয মিসরের বাসভবনে অবস্থানকালে শক্তি ও বুদ্ধির পূর্ণতা প্রাপ্তির বয়ঃসন্ধিক্ষণে আল্লাহ তা'আলা ইউসুফ (আ)-কে নবুওয়াতের মর্যাদায় ভূষিত করিলেন। কুরআনের বর্ণনায়: وَلَمَّا بَلَغَ أَشُدَّهُ آتَيْنَه عِلْمًا وَحُكْمًا وَكَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ "সে যখন পূর্ণ যৌবনে উপনীত হইল তখন আমি তাহাকে হিকমত ও জ্ঞান দান করিলাম এবং এইভাবেই আমি সৎকর্মপরায়ণদিগকে পুরস্কৃত করি" (১২: ২২)।
অর্থাৎ যখন ইউসুফ (আ) শক্তি, বুদ্ধি ও যৌবনের পূর্ণতায় উপনীত হইল তখন আমি তাহাকে হিকমত ও জ্ঞান দান করিলাম। পুণ্যশীলদের অনুরূপ প্রতিদান দেওয়াই আমার বিধান। মুফাসসিরগণ হিকমত ও ইল্ম-এর অর্থ নবুওয়াত বলিয়া অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন। ব্যাপক অর্থে হিকমত দ্বারা সঠিক উক্তি করিবার প্রতিভা এবং ইলম দ্বারা দীনের যথার্থ উপলব্ধি বুঝানো হয়। স্বপ্নের ব্যাখ্যাও উহার অন্তর্ভুক্ত। আবার বিষয়বস্তুর অবগতিকে ইলম এবং তদনুসারে কর্ম সম্পাদনকে হিকমত বলা হয়। মোটকথা আয়াতে ইউসুফ (আ)-কে নবুওয়াত মর্যাদায় ভূষিত করিবার ঘোষণা দেওয়া হইয়াছে। তবে যৌবনের এই পূর্ণতা প্রাপ্তির বয়স সম্পর্কে মুফাসসিরগণের মতভেদ রহিয়াছে। ইমাম মালিক (র)-এর ব্যাখ্যায় বলিয়াছেন, উহা বয়ঃপ্রাপ্তি। সাঈদ ইবন জুবায়রের মতে আঠার বৎসর, দাহ্হাকের মতে বিশ বৎসর, ইক্রিমার মতে পঁচিশ বৎসর, সুদ্দীর মতে ত্রিশ বৎসর। ইবন আব্বাস (রা), মুজাহিদ ও কাতাদা প্রমুখের মতে তেত্রিশ বৎসর এবং ইবন আব্বাসের একটি বর্ণনায় তেত্রিশোর্ধ বৎসর। হাসান বাসরী (র)-এর মতে চল্লিশ বৎসর। ইবন কাছীর পবিত্র কুরআনের "وَلَمَّا بَلَغَ أَشُدَّهُ وَبَلَغَ أَرْبَعِينَ سَنَةً ", "যখন সে তাহার পূর্ণ যৌবনে উপনীত হইল এবং চল্লিশ বৎসর বয়সে পদার্পণ করিল" (৪৬: ১৫) আয়াতের ইংগিতে শেষোক্ত অভিমতকে অধিক গ্রহণযোগ্য বলিয়াছেন। অধিকাংশ মুফাসসির ও মনীষী নবুওয়াত প্রাপ্তির সাধারণ বয়স চল্লিশ বৎসরের প্রতি লক্ষ্য করিয়া আলোচ্য ক্ষেত্রেও চল্লিশ বৎসরের অভিমতটি গ্রহণ করিয়াছেন। তবে এ আয়াত দ্বারা এ বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত হইয়া যায় যে, কূপে নিক্ষিপ্ত হওয়ার পূর্বে বা পরে ইউসুফ (আ)-এর কাছে আগত 'ওয়াহী' নবুওয়াতের ওয়াহী ছিল না, উহা ছিল মূসা (আ)-এর মাতা ও মারয়াম (আ)-এর নিকট আগত সাধারণ ঐশীবাণী (মুখতাসার ইবন কাছীর, ২খ, ২৪৫; বিদায়া, ১খ, ২০৩; মাজহারী, ৫খ, ১৫১; মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ, ৩২-৩৩)। ইউসুফ (আ)-এর নবুওয়াতের ঘোষণার সহিত আল্লাহ তা'আলা ইহাও অবহিত করিলেন যে, উহা ছিল তাহার পূণ্যাত্মা ও জীবনধারার সর্বক্ষেত্রে সৎকর্মশীল হওয়ার প্রতিদান এবং এই প্রতিদান ব্যবস্থা একাকী ইউসুফ (আ)-এর জন্য সীমিত নহে, বরং যে কোন সৎকর্মশীলদের জন্য এই উচ্চ মর্যাদার জীবনব্যবস্থা উন্মুক্ত। ইহা ছাড়া ইহাতে ইউসুফ (আ)-এর নামে পরবর্তী সময়ে উত্থাপিত অপবাদের ব্যাপারেও এই মর্মে অগ্রিম সংবাদ দেওয়া হইল যে, উত্থাপিত অপবাদ সম্পূর্ণ মিথ্যা হইবে। কেননা আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হইতে হিকমত প্রদত্ত ও নবুওয়াত মর্যাদায় ভূষিত কোন ব্যক্তির দ্বারা কখনও কোন অশ্লীল কর্ম সংঘটিত হইতে পারে না।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আযীয মিসরের স্ত্রী ও ইউসুফ (আ)-এর কঠিন পরীক্ষা

📄 আযীয মিসরের স্ত্রী ও ইউসুফ (আ)-এর কঠিন পরীক্ষা


মহাপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া মহামর্যাদা লাভের সোপান হইয়া থাকে। ইউসুফ (আ)-এর সমগ্র জীবনে ইহারই বাস্তব প্রতিফলন ঘটিয়াছে। শৈশবের মহাসংকট তাঁহাকে কান'আনের অনুন্নত জীবনধারা হইতে সমকালীন বিশ্বের উন্নততম জীবনের ছোঁয়ায় পৌঁছাইয়াছিল এবং দাসরূপে আসিয়া তিনি আযীয মিসরের প্রাচুর্যময় রাজপ্রাসাদের 'মালিকের' অবস্থানে উন্নীত হইলেন। কিন্তু ইহাই তাঁহার দ্বিতীয় ও কঠিনতম পরীক্ষার সূত্র হইল। সৌন্দর্যে আল্লাহ তা'আলার সেরা সৃষ্টি ইউসুফ (আ) তখন পূর্ণ যৌবনে উপনীত হইয়াছেন : সুঠাম ও সুদর্শন দেহ কান্তি, জ্যোতির্ময় মুখাবয়ব, চন্দ্র-সূর্যকে হার মানানো সর্ববিধ রূপের সমাহার, শিষ্টাচার, লজ্জাশীলতা ও যাবতীয় চারিত্রিক উৎকর্ষের মূর্ত প্রতীক। এক কথায় রূপ ও গুণের পূর্ণাঙ্গ সমাহার যেন সোনায় সোহাগা। অপরদিকে আযীয মিসরের স্ত্রী পূর্ণ যৌবনা, রাজপরিবারের বিদুষী কন্যা (এবং বর্ণিত তথ্য অনুসারে স্বামী আযীযের পৌরুষ শক্তির দুর্বলতা, দিবারাত্রের অফুরন্ত অবসরে প্রতি মুহূর্তের সহঅবস্থান, পরিবেশ-পরিস্থিতির এই বাস্তবতা আযীয মিসরের স্ত্রীর হৃদয়কে আলোড়িত করিয়া তাহাকে আত্মনিয়ন্ত্রণহারা করিয়া দিল এবং মোমের আলোর প্রতি পতঙ্গের আসক্তির ন্যায় তাহাকে আসক্ত করিল।
আযীয মিসরের স্ত্রীর নাম ছিল রা'ঈল বিনত রা'আঈল 'রা'আবীল (راعيل بنت رعابيل) /(। ইহা ইবন ইসহাকের অভিমত। ছা'লাবী ইবন হিশামের বরাতে তাহার নাম ফাক্সা বিনত য়ানূস (فکسا بنت ينوس ) বলিয়াছেন। ঐতিহাসিকগণ তাহার জনপ্রচলিত নাম যুলায়খা হওয়ার কথা বলিয়াছেন। মূলত ইহা ইয়াহুদী গ্রন্থ তালমূদে বর্ণিত তাহার নাম ...... হইতে প্রচার লাভ করিয়াছে। ইবন কাছীরের মতে যুলায়খা তাহার উপাধি বা উপনাম (ডাকনাম) হওয়া অধিক সংগত (বাংলা পুঁথি সাহিত্যে 'ইউসুফ যুলায়খা' উল্লেখ্য)। ইবন ইসহাকের মতে যুলায়খা ছিল সমকালীন ক্ষমতাসীন সম্রাট রায়‍্যান ইবনুল ওয়ালীদের ভাগ্নী অথবা ভ্রাতুষ্পুত্রী (বিদায়া, ১খ, ২০০, ২০৬)।
মোটকথা, সুদর্শন ইউসুফের প্রতি প্রেম উন্মাদনায় উন্মাদিনী যুলায়খা ইউসুফকে পদস্খলিত করিবার জন্য আকার-ইংগিতে তাহার প্রতি প্রেম নিবেদন করিতে লাগিল এবং বিভিন্ন প্রকার প্রচেষ্টা ও ফন্দি-ফিকির দ্বারা তাঁহাকে আকৃষ্ট করিবার প্রয়াস চালাইল। কিন্তু এইসব প্রচেষ্টা ইউসুফের পূতপবিত্র হৃদয়ে কোনই রেখাপাত করিল না। ইউসুফ যেন অন্য জগতের মানুষ। সুন্দরী যুবতী নারীর দেহ-বল্লরীর আকর্ষণ, তাহার উপর্যুপরি প্রেম নিবেদন এবং নিরাপদ অখণ্ড সুযোগ, এ সবই যেন ইউসুফের চিন্তা ও উপলব্ধির বহির্ভূত বিষয়, যুলায়খার দৃষ্টিতে যাহা অস্বাভাবিক ও বিস্ময়কর। ইউসুফের মন-মেজাজে তাহা যেন কিছুই নহে। অবশেষে যুলায়খার প্রেম অস্থিরতা তাহার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙ্গিয়া ফেলিল এবং সহজ পন্থায় স্বার্থ সিদ্ধির কোন উপায় নাই দেখিয়া সে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়া সুযোগের অপেক্ষা করিতে লাগিল। একদিন আযীযের অনুপস্থিতিতে নিরাপদ সুযোগ পাইয়া ঘরের সকল দরজা বন্ধ করিয়া দিয়া ইউসুফকে যুলায়খার ব্যক্তিগত একান্ত কামরায় আটকাইয়া ফেলিল এবং নিজে পূর্ণাঙ্গ সাজসজ্জা করিয়া ইউসুফকে প্রচণ্ডরূপে আহবান করিল। ইউসুফ (আ) যেন এই মুহূর্তে তাহার মনীবের স্ত্রীর এত দিনের বিশেষ ভাষা ও আচরণের মর্মার্থ বুঝিতে পরিয়া এবং বাহ্যত নিজের নিরুপায় অবস্থা প্রত্যক্ষ করিয়া চমকাইয়া উঠিলেন। কিন্তু নিষ্কলুষ ও পবিত্র ইবরাহীমী রক্তধারার ধারক ও বংশধারার নবুওয়াতের বাহক মহাবিপদ সংকেতে বিচলিত বা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইলেন না। মহাপাপের জঘন্যতা ও ভয়াবহ পরিণতি এবং অন্ধকার কূপ হইতে পরিত্রাণ ও গোলামী হইতে রাজকীয় অবস্থানে সুদৃঢ় অবস্থানদাতা মহাশক্তিমান ও অসীম দয়াবান আল্লাহ্র অস্তিত্ব ও স্মরণ ইউসুফ (আ)-এর দৃষ্টি ও মানসপটে সদাভাস্বর ছিল। তিনি যুলায়খার কুপ্রস্তাব দৃঢ়বাক্যে ও আন্তরিক ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করিলেন এবং ইহাতে আল্লাহ্র আশ্রয় ও শরণ লইয়া যুলায়খাকেও এই কুকর্ম হইতে নিবৃত্ত থাকিবার জন্য মর্মস্পর্শী উপদেশ দান করিলেন। কুরআনের বর্ণনায়: وَرَاوَدَتْهُ الَّتِي هُوَ فِي بَيْتِهَا عَنْ نَفْسِهِ وَعَلَّقَتِ الأَبْوَابَ وَقَالَتْ هَيْتَ لَكَ قَالَ مَعَادَ اللَّهِ إِنَّهُ رَبِّي أَحْسَنَ مَثْوَايَ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الظَّالِمُونَ .
"সে যে স্ত্রীলোকের গৃহে ছিল সে তাহা হইতে অসৎকর্ম কামনা করিল এবং দরজাগুলি বন্ধ করিয়া দিল ও বলিল, 'আইস'। সে বলিল, 'আমি আল্লাহ্র শরণ লইতেছি, তিনি আমার প্রভু; তিনি আমার থাকিবার সুন্দর ব্যবস্থা করিয়াছেন। নিশ্চয়ই সীমালংঘনকারিগণ সফলকাম হয় না" (১২: ২৩)
কোন কোন বর্ণনায় পরপর সাতটি দরজা তালাবদ্ধ করিয়া উহার চাবিগুচ্ছ যুলায়খা নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখিল এবং তাহার সাধ্যমত সাজগোছ করিয়া আকুল হইয়া ইউসুফকে আহবান করিল। সে বলিল, আইস! তোমাকেই বলিতেছি....... (আমার বাসনা পূরণ করিয়া আমাকে কৃতার্থ কর)। ইউসুফ বলিল, 'নাউযু বিল্লাহ! হে আল্লাহ রক্ষা কর! ইহা অন্যায়, ইহা অসম্ভব। ইহা কী করিয়া হইতে পারে! তিনি তো আমার মালিক মনিব, তিনি তো আমার জন্য সুখকর জীবন ধারণের ব্যবস্থা করিয়াছেন। এই ইহসান ও অনুগ্রহের বিপরীতে উহা মহা অন্যায়, বস্তুত অন্যায়কারী জুলুমবাজরা সফলতা অর্জন করিতে পারে না'। কুরআনী বর্ণনা ধারায় 'যুলায়খা' বা 'আযীযের স্ত্রী' না বলিয়া 'যে নারীর ঘরে' সে বসবাস করিত' বলিয়া উপস্থাপন দ্বারা এক জঘন্য কর্মে উদ্বুদ্ধকারিণীর নাম উল্লেখ হইতে বিরত থাকিবার সাথে সাথে আসল লক্ষ্য হইতেছে পরিস্থিতির বাস্তব ও স্পষ্ট রূপটি তুলিয়া ধরিয়া ইউসুফ চরিত্রের অনাবিলতাকে অতি স্বচ্ছ ও উজ্জ্বলরূপে উপস্থাপন করা। কেননা যে ঘরে চব্বিশ ঘণ্টার অবস্থান সেখানে সুযোগ-সুবিধার আনুকূল্য এবং তদুপরি খোদ কর্ত্রীর শুধু মৌন সম্মতি ও বাধাহীনতাই নহে, বরং তাহার আকুল-সকাতর আবেদন, এহেন পরিস্থিতিতে সংযম ও আত্মসম্বরণ হযরত ইউসুফ (আ)-এর পূতপবিত্রতা ও নিষ্কলুষতাকে দিবালোকের ন্যায় প্রস্ফুটিত করিয়া তোলে।
এখানে লক্ষণীয় যে, ইউসুফ (আ) মহাবিপদ হইতে পরিত্রাণ ও মহাপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য শুধু নিজের সুদৃঢ় ইচ্ছা ও প্রচণ্ড মনোবলের প্রতি আস্থাশীল হইয়া এবং উহার উপর ভরসা করিয়াই ক্ষান্ত হইলেন না, বরং সর্বাগ্রে তিনি নবীসুলভ পন্থায় সকল শক্তি ও ইচ্ছার মালিক মহান আল্লাহ্র শরণাপন্ন হইলেন। কেননা আল্লাহ্ আশ্রয় কাহারও সহযোগী হইলে কোন কিছুই তাহাকে সঠিক পথ হইতে বিচ্যুত করিতে পারে না। অতঃপর তিনি নবীসুলভ পন্থায় যুলায়খার অন্তরেও আল্লাহ্ ভয় এবং স্বামীর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা না করিবার মনোভাব জাগ্রত করিবার জন্য প্রজ্ঞাসুলভ উপদেশ বাণী উচ্চারণ করিলেন এবং অন্যায় ও গর্হিত আচরণকারীদের অশুভ পরিণতি স্মরণ করাইয়া দিয়া কোন এক সময় তাহার এই কুকীতি ফাঁস হইয়া যাওয়া এবং তখন চরমভাবে নিন্দিত ও ধিকৃত হওয়ার সতর্কবাণী উচ্চারণ করিলেন। তিনি যুলায়খাকে বুঝাইয়া দিলেন আমি যদি আযীযের অল্পদিনের অনুগ্রহ ও সদাচরণের প্রতি লক্ষ্য করিয়া তাহার অধিকারে হস্তক্ষেপকে অন্যায় ও অপরাধ মনে করি তবে তোমার জন্য তো তাহার প্রতি বিশ্বাসঘাতকাকে জঘন্যতম ও অমার্জনীয় অপরাধ মনে করা এবং আসন্ন পরিণতির প্রতি লক্ষ্য করিয়া কুমতলব হইতে নিবৃত্ত হওয়া একান্ত অপরিহার্য। এই প্রসঙ্গে সুদ্দী ও ইবন ইসহাক প্রমুখ মুফাসসিরগণ উল্লেখ করিয়াছেন যে, নির্জন ঘরে আবদ্ধ করিয়া যুলায়খা ইউসুফ (আ)-কে সম্মোহিত করিবার জন্য তাঁহার রূপ-গুণের প্রশংসা শুরু করিয়া দিল। যুলায়খা বলিল, কত সুন্দর তোমার কেশরাজি! ইউসুফ (আ) তাৎক্ষণিক জবাব দিলেন, আমার মৃত্যুর পরে সর্বাগ্রে এই চুলই আমার দেহ হইতে বিচ্ছিন্ন হইবে। যুলায়খা বলিল, এত সুন্দর তোমার নয়নযুগল! ইউসুফ (আ) বলিলেন, মৃত্যুর পর এই চোখ দু'টিই বিগলিত হইবে। যুলায়খা বলিল, কী সুন্দর তোমার মুখমণ্ডল! ইউসুফ (আ) বলিলেন, এ সবই তো মাটির খাদ্য, যাহা দিয়া মাটি তাহার বুভুক্ষা নির্বাপিত করিবে। মোটকথা যুলায়খা একের পর এক চক্রান্তের জাল ফেলিতে লাগিল। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা ইউসুফ (আ)-এর অন্তরে আখিরাতের চিন্তা এত প্রবল করিয়া দিলেন যে, রূপ ও যৌবনের সকল আস্বাদন তাঁহার নিকট বিস্বাদ প্রতিভাত হইল। পবিত্র কুরআনের বর্ণনায় :
وَلَقَدْ هَمَّتْ بِهِ وَهَمْ بِهَا لَوْلا أَنْ رَأَى بُرْهَانَ رَبِّهِ كَذَلِكَ لِنَصْرِفَ عَنْهُ السُّوءَ وَالْفَحْشَاءَ إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا المُخْلَصِينَ.
"সেই নারী সে পুরুষকে ভোগ করিতে প্রচণ্ডরূপে উদ্যত হইল এবং সেই রমণী তো তাহার প্রতি আসক্ত হইয়াছিল এবং সেও উহার প্রতি আসক্ত হইয়া পড়িত যদি না সে তাহার প্রতিপালকের নিদর্শন প্রত্যক্ষ করিত। আমি তাহাকে মন্দ কর্ম ও অশ্লীলতা হইতে বিরত রাখিবার জন্য এইভাবে নিদর্শন দেখাইয়াছিলাম। সে তো ছিল আমার বিশুদ্ধ চিত্ত বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত” (১২ : ২৪)।
এখানে উল্লেখ্য যে, ইউসুফ (আ)-এর 'আকৃষ্ট হওয়ার' ব্যাপারটি ছিল একটি স্বভাবজাত মানবিক ব্যাপার। এই স্বভাব-চাহিদাকে নিয়ন্ত্রণ না করিয়া উহাকে কার্যকর করিবার প্রতি ধাবিত হওয়া এবং বাস্তবে রূপায়িত করাই আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ। তিনি সেই অপরাধ করেন নাই, বরং স্বীয় ইচ্ছাকে নিয়ন্ত্রণ করিয়া যুলায়খার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেন।
প্রতিপালকের 'বুরহান' (নিদর্শন) কি ছিল ক্ষেত্রে মুফাসসিরগণ বহু সম্ভাব্য বিষয় উল্লেখ করিয়াছেন। কোন কোন মুফাসসির বলিয়াছেন, নির্জন কক্ষে ইউসুফ (আ)-এর দৃষ্টির সম্মুখে তাঁহার মনিব আযীয মিসরের (মতান্তরে বাদশাহের) আকৃতি ভাসিয়া উঠিল! কাতাদাসহ অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে ইউসুফ (রা) তাঁহার পিতা ইয়াকুব (আ)-এর প্রতিকৃতি দেখিতে পাইলেন। তিনি তাঁহাকে বলিতেছিলেন, ইউসুফ! তোমার নাম তো নবীগণের তালিকায় লিপিবদ্ধ রহিয়াছে, এমতাবস্থায় তুমি কি নির্বোধদের ন্যায় কর্ম করিবে? হাসান বসরী, সাঈদ ইবন জুবায়র, মুজাহিদ, ইকরিমা ও দাহ্হাক প্রমুখ বলিয়াছেন, ঘরের ছাদ উন্মুক্ত হইয়া গেলে ইউসুফ (আ) পিতা ইয়াকূব (আ)-কে দেখিলেন যে, তিনি দাঁতে আঙ্গুল কামড়াইয়া রহিয়াছেন। মুহাম্মাদ ইবন সীরীনের বরাতে ইবন জারীর, ইবন আবু হাতিম ও আবুশ শায়খ বলিয়াছেন, ইউসুফ (আ) দাঁতে আঙ্গুল কামড়ানো অবস্থায় পিতার প্রতিচ্ছবি দেখিলেন, যিনি বলিতেছিলেন, ইউসুফ ইবন ইয়াকূব, ইবন ইসহাক ইবন ইবরাহীম, যিনি খলীলুর রহমান, তোমার নাম রহিয়াছে নবী তালিকায়, নির্বোধের কর্ম কি তোমাকে শোভা পায়! ইবন আব্বাস (রা)-এর বরাতে সাঈদ ইবন জুবায়র বলিয়াছেন, ইয়াকূব (আ)-এর প্রতিচ্ছবি ইউসুফ (আ)-এর বক্ষে চাপড় দিলে তাহার মনের সকল উদ্বেলতা বিদূরীত হইল। ইবন আব্বাস (রা) হইতে মুজাহিদের আহরিত বর্ণনায় ইউসুফ (আ) জিবরীল (আ)-কে দাঁতে আঙ্গুল কামড়ানো অবস্থায় দেখিলেন। তিনি বলিতেছিলেন, আপনি তো আল্লাহ তা'আলার নিকটে নবীগণের অন্তর্ভুক্ত।... অপর বর্ণনায় জিবরীল (আ) তাঁহার পাখা দ্বারা ইউসুফ (আ)-কে স্পর্শ করিলে তাঁহার মনের আকুলতা থামিয়া গেল।
'বুরহান'-এর ব্যাখ্যায় ইবন আব্বাস (রা) হইতে 'আতিয়‍্যার বর্ণনা মতে ইউসুফ (আ) বাদশাহ্ প্রতিকৃতি দেখিয়াছিলেন। ইবন জারীর কাসিম ইবন আবু নায্যাহ হইতে আহরণ করিয়াছেন, নেপথ্য হইতে আওয়ায আসিল, 'হে ইয়াকূব তনয়! সেই পাখির ন্যায় হইও না, যাহার উড়িবার পাখা ছিল এবং অশ্লীল কর্ম করিবার পর সে পাখাশূন্য হইয়া গেল!' এই আওয়াযের প্রতি তাঁহার মনোযোগ আকৃষ্ট না হওয়ায় কিংবা উহার সূত্র অনুধাবন করিতে না পারিয়া তিনি উপরের দিকে মাথা তুলিলে দাঁতে আঙ্গুল কামড়ানো অবস্থায় ইয়াকূব (আ)-এর মুখমণ্ডল দেখিতে পাইলেন। সুদ্দী বলিয়াছেন, নেপথ্য হইতে আওয়ায আসিল, ইউসুফ! তাহার (যুলায়খার) বাসনা পূর্ণ করিবে? তোমার দৃষ্টান্ত তাহার বাসনা পূরণ না করিলে শূন্য নীলিমায় ভাসমান পাখির ন্যায়, যে কাহারও করতলগত হয় না। আর তাহার বাসনা পূর্ণ করিলে তোমার দৃষ্টান্ত আকাশের সে পাখির ন্যায় যে মৃত্যুবরণ করিয়া ভূমিতে পতিত হয় এবং কোন কিছু হইতে আত্মরক্ষা করিতে পারে না এবং নিষ্কলুষ অবস্থায় তোমার দৃষ্টান্ত সেই দুর্দান্ত ষাঁড়ের ন্যায় যাহাকে কাবু করা যায় না, আর তুমি কলুষিত হইলে তোমার অবস্থা হইবে সেই মৃত ষাড়ের লাশের ন্যায় যাহার নাসাছিদ্রপথে পিপীলিকা আনাগোনা করে, কিন্তু লাশ তাহাকে কিছুই বলিতে পারে না (মাজহারী, ৫খ, ১৫৪, ১৫৫)। ইবন জারীর মুহাম্মাদ ইবন কা'ব আল-কুরাজী হইতে বর্ণনা করিয়াছেন, ইউসুফ (আ) নির্জন কক্ষের ছাদের দিকে দৃষ্টি তুলিলে দেখিলেন, কক্ষের দেয়ালে লেখা রহিয়াছে:
لَا تَقْرَبُوا الزِّنَا إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا অর্থাৎ "ব্যভিচার বৃত্তির ধারে-কাছেও ঘেঁষিও না, উহা চরম অশ্লীলতা ও জঘন্য পন্থা।" মতান্তরে তিনি আল্লাহ তাআলার কালামের তিনটি আয়াত দেখিতে পাইলেন, (মাজহারী, ৫খ, ১৫৫)।
)1( إِنَّ عَلَيْكُمْ لَحَافِظِينَ “অবশ্যই তোমাদের উপর নিযুক্ত রহিয়াছে (তত্ত্বাবধায়ক ফেরেশতা"; وَمَا تَكُونُ فِي شَأْنٍ وَلَا تَعْمَلُونَ مِنْ عَمَلٍ إِلَّا كُنَّا عَلَيْكُمْ شُهُودًا إِذْ تُفِيضُونَ فِيهِ وَمَا يَعْزُبُ عَنْ (2) رَبِّكَ مِنْ مِثْقَالِ ذَرَّةٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ وَلَا أَصْغَرَ مِنْ ذَلِكَ وَلَا أَكْبَرَ إِلَّا فِي كِتَابٍ مُّبِينٍ.
"তুমি যে অবস্থায়ই অবস্থান কর না কেন এবং তোমরা যে কোন কর্মই কর না কেন, আমি কিন্তু তোমাদিগকে প্রত্যক্ষ করিতে থাকি, যখন তোমরা উহাতে নিমগ্ন হও। তোমার প্রতিপালকের (দৃষ্টি ও অবগতি) হইতে আসমান ও যমীনের মধ্যে বিন্দু পরিমাণ কিংবা উহা হইতে ক্ষুদ্রতর কিংবা বৃহত্তর কোন কিছু লুকায়িত থাকে না। কিন্তু (তাহার রেকর্ড সুরক্ষিত) এক স্পষ্ট মহাগ্রন্থে।"
)أَفَمَنْ هُوَ قَائِمٌ عَلَى كُلِّ نَفْسٍ بِمَا كَسَبَتْ (٥ "যে সত্তা প্রতিটি প্রাণের পাশে- তাহার উপার্জন সম্পর্কে সদা দণ্ডায়মান (তত্ত্বাবধায়ক); তিনি আর কথিত শরীকরা কি সমতুল্য?"
আলী ইবন হুসায়ন ইবন আলী (রা)-এর মতে নিদর্শনটি ছিল কক্ষে বিদ্যমান একটি মূর্তিকে যুলায়খা কর্তৃক বস্ত্রাবৃত করা। ইউসুফ (আ) যুলায়খাকে ইহার কারণ জিজ্ঞাসা করিলে সে বলিল, পপকর্মে রত অবস্থায় সে আমাকে দেখিবে ইহাতে আমি লজ্জাবোধ করিতেছি। তখন ইউসুফ (আ) বলিলেন, যে কিছু শুনে না, দেখে না এবং বুঝে না তুমি তাহাকে লজ্জা পাইতেছ। সুতরাং সর্বশ্রোতা সর্বদ্রষ্টা প্রতিপালককে আমার লজ্জা করাই অধিক সমীচীন। এই কথা বলিয়াই তিনি সম্মুখে দৌড় দিলেন (মাজহারী, ৫খ, ১৫৫)। জাফর সাদিক বলিয়াছেন, 'বুরহান' ছিল তাঁহার অন্তরদেশে গচ্ছিত নবুওয়াত, যাহা মহান মহিয়ান আল্লাহর ক্রোধ সৃষ্টিকারী বিষয়ের অন্তরায়। মাওলানা হিফজুর রহমান এ প্রসঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর বলিয়াছেন, ইয়াকূব (আ)-এর প্রতিচ্ছবি ও তাঁহার সতর্কীকরণ কিংবা ফেরেশতার আগমন অথবা আযীযের স্ত্রী কর্তৃক মূর্তিকে আবৃত করা হইতে শিক্ষা গ্রহণ ইত্যাদিকে 'নিদর্শন' সাব্যস্ত করিবার বিপরীতে পবিত্র কুরআনের বর্ণনাধারা বিন্যাস শৈলীর স্পষ্ট ইংগিতে প্রাপ্ত ব্যাখ্যাই প্রতিপালকের নিদর্শন-এর সর্বোত্তম ব্যাখ্যা। উহা হইল (১) আল্লাহর প্রতি ঈমানের অন্তর্নিহিত উপলব্ধি যাহা ইউসুফ (আ)-এর مَعَاذَ اللهِ উক্তি হইতে প্রতিভাত হয় এবং অনুগ্রহ প্রবণ মালিক ও মনিবের প্রতি প্রকৃত কৃতজ্ঞাবোধ এবং আস্থা ও বিশ্বাস রক্ষা করিবার ব্রত, যাহা رَبِّي أَحْسَنَ مَثْوَىَ দ্বারা প্রতীয়মান হয় (কাসাসুল কুরআন, ১খ, ২৯২, ২৯৩)。
ইবন কাছীর তাঁহার পূর্বসূরী ইমাম ইবন জারীর তাবারীর মন্তব্য উদ্ধৃত করিয়াছেন। তিনি উপরোল্লিখিত সকল অভিমত উদ্ধৃত করিয়া অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন এবং উত্তরসুরি সকল বিদ্বান ও গবেষকের মনঃপূত অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন, সকল মনীষীর সকল বক্তব্য ও অভিমত সম্ভাবনার স্তরে রাখিয়া উহাদের কোন একটি নির্ণীত ও অকাট্য স্থির না করিয়া পবিত্র কুরআনের উন্মুক্ত বর্ণনাকে উন্মুক্ত রাখা এবং যথেষ্ট সাব্যস্ত করাই উত্তম। অর্থাৎ ইউসুফ (আ) এমন কিছু দেখিয়াছিলেন এবং নবুওয়াতী অন্তরে উপলব্ধি করিয়াছিলেন যাহা তাঁহার উদ্বেলতা ও অস্থিরতাকে সম্পূর্ণ শান্ত করিয়া দিয়াছিল (তাফসীরে ইবন কাছীর, মুখতাসার, ২খ, ২৪৬; তাফসীরে মাজহারী, ৫খ, ১৫৪, ১৫৫; মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ, ৩৭, ৩৮; কাসাসুল কুরআন, ১খ, ২৯২, ২৯৩)। পবিত্র কুরআন তাহার অলংকারপূর্ণ বর্ণনা ধারায় ইউসুফ (আ)-এর নিষ্কলুষ ও পাপমুক্ত থাকিবার প্রতি লক্ষণীয় ইংগিত প্রদান করিয়াছে। আয়াতের শেষাংশে বলা হইয়াছে, 'তাহার হইতে' মন্দ ও অশ্লীলতা দূর করিবার জন্য ..... অর্থাৎ 'তাহাকে' মন্দ ও অশ্লীল কর্ম হইতে দূরে রাখিবার জন্য لِنَصْرْفَهُ عَنْ না বলিয়া 'তাহার হইতে' মন্দ ও অশ্লীলতাকে দূরে রাখিবার জন্য لِنَصْرْفَ عَنْهُ বলা হইয়াছে। ইহা দ্বারা স্পষ্ট ইংগিত করা হইয়াছে যে, ইউসুফ (আ) তো তাঁহার নবীসুলভ চারিত্রিক পবিত্রতা ও দৃঢ়তার কারণে নিজেই মন্দ ও অশ্লীলতা (সগীরা ও কাবীরা সর্ববিধ পাপ-পংকিলতা) হইতে দূরে অবস্থান করিতেছিলেন; কিন্তু পাপ যেন তাঁহাকে ঘেরাও করিয়া ফেলিয়াছিল; তাহার সংকল্প ও দৃঢ়তার কারণে আমার সাহায্য তাঁহার প্রতি অগ্রসর হইল এবং আমি পাপের পাতানো জাল ছিঁড়িয়া দিলাম। এ আয়াতে 'মন্দ' (سُوْء) ও অশ্লীলতা (فَحْشَاً) সংযোজন দ্বারা বুঝা যায় যে, ইউসুফ (আ) এই ঘটনায় নিম্নতম কোন (সগীরা) গুনাহ দ্বারাও কলুষিত হন নাই। আর আয়াতের শেষ শব্দ مُخْلِصِينَ দ্বারাও তাঁহার পাপমুক্ত থাকার প্রতি ইংগিত ব্যক্ত হইয়াছে। কেননা ইহার অর্থ হইল, ইউসুফ (আ) আল্লাহ তা'আলার সেই বিশিষ্ট বান্দাদের তালিকাভুক্ত যাহাদিগকে তিনি তাঁহার নবুওয়াত-রিসালাত তথা মানবজাতির সংস্কার ও পথ প্রদর্শনের জন্য নির্বাচিত করিয়াছেন। সুতরাং এই শ্রেণীর নির্বাচিতগণকে সর্বপ্রকার কলুষতা হইতে সুরক্ষা করিবার জন্য বিশেষ পাহারার ব্যবস্থা রাখা হয়। বিষয়টি পবিত্র কুরআনে উদ্ধৃত শয়তানের ভাষ্য দ্বারাও সাব্যস্ত হইয়াছে। সমগ্র মানবজাতিকে জাহান্নামে পৌছাইবার আজীবন সাধনায় রত থাকিবার অহমিকাপূর্ণ ঘোষণা দেওয়ার পাশাপাশি বিশিষ্টগণের ব্যাপারে তাহার ক্ষমতা না থাকিবার স্বীকারোক্তি করিয়া সে বলিয়াছে:
فَبِعِزَّتِكَ لَأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ إِلَّا عِبَادَكَ مِنْهُمُ الْمُخْلَصِينَ.
"আপনার ইজ্জতের কসম! আমি অবশ্যই তাহাদের সকলকে পথহারা করিব; তাহাদের মধ্য হইতে আপনার বিশুদ্ধচিত্ত বান্দাগণ ব্যতীত”।
সুতরাং পবিত্র কুরআনের বর্ণনাধারা বিভিন্ন আংগিকে ইউসুফ (আ)-এর পাপমুক্ত ও পূতপবিত্র থাকিবার ঘোষণা দিয়াছে। পরবর্তী ঘটনা সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের ভাষ্য নিম্নরূপঃ
واسْتَبَقَا البَابَ وَقَدَّتْ قَمِيصَهُ مِنْ دُبُرٍ وَالْفَيَا سَيِّدَهَا لَدَى الْبَابِ قَالَتْ مَا جَزَاءُ مَنْ أَرَادَ بِأَهْلِكَ سُوْء إِلا أَنْ يُسْجَنَ أَوْ عَذَابٌ أَلِيمٌ. قَالَ هِيَ رَا وَدَتْنِي عَنْ نَفْسِي وَشَهِدَ شَاهِدٌ مِّنْ أَهْلِهَا إِنْ كَانَ قَمِيصُهُ قُدَّ مِنْ قَبْلِ فَصَدَقَتْ وَهُوَ مِنَ الْكَاذِبِينَ وَإِنْ كَانَ قَمِيصُهُ قُدَّ مِنْ دُبُرٍ فَكَذَبَتْ وَهُوَ مِنَ الصَّادِقِينَ .
"উহারা উভয়ে দৌড়াইয়া দরজার দিকে গেল এবং স্ত্রীলোকটি পিছন দিক হইতে তাহার জামা ছিঁড়িয়া ফেলিল। তাহারা স্ত্রীলোকটির স্বামীকে দরজার নিকট পাইল। স্ত্রীলোকটি বলিল, 'যে তোমার পরিবারের সহিত কুকর্ম কামনা করে তাহার জন্য কারাগারে প্রেরণ অথবা অন্য কোন মর্মন্তুদ শান্তি ব্যতীত আর কি দণ্ড হইতে পারে? ইউসুফ বলিল, সে-ই আমা হইতে অসৎকর্ম কামনা করিয়াছিল। স্ত্রীলোকটির পরিবারের একজন সাক্ষী সাক্ষ্য দিল, যদি উহার জামার সম্মুখ দিক ছিন্ন করা হইয়া থাকে তবে স্ত্রীলোকটি সত্য কথা বলিয়াছে এবং পুরুষটি মিথ্যাবাদী। কিন্তু উহার জামা যদি পিছন দিক হইতে ছিন্ন করা হইয়া থাকে তবে স্ত্রীলোকটি মিথ্যা বলিয়াছে এবং পুরুষটি সত্যবাদী" (১২: ২৫-২৭)।
ঐতিহাসিকগণ ও মুফাসসিরগণ লিখিয়াছেন, ইউসুফ (আ)-এর উপদেশ যুলায়খার পাপ-প্রলুব্ধ অন্তরে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করিল না এবং সে যথারীতি তাহার কামনা সিদ্ধির ফিকিরে লাগিয়া থাকিল।
ইউসুফ (আ) অনন্যোপায় হইয়া পাপ হইতে সাধ্য পরিমাণ আত্মরক্ষার করিবার সংকল্প করিয়া এবং আল্লাহর অপরিসীম রহমতের উপর ভরসা করিয়া দরজার দিকে দৌড় শুরু করিলেন এবং তাঁহাকে ধরিয়া ফেলিবার জন্য যুলায়খাও তাঁহার পিছনে দৌড় দিল। ঐতিহাসিক বর্ণনামতে আল্লাহ তা'আলার কুদরতে বদ্ধ দরজাসমূহের কপাট আপনাআপনি খুলিয়া যাইতে লাগিল এবং ইউসুফ (আ) দৌড়াইয়া ভবনের সদর দরজার বাহিরে পৌছিলেন। যুলায়খা পিছন হইতে ইউসুফ (আ)-এর জামায় থাবা মারিয়া তাঁহাকে থামাইবার চেষ্টা করিল। কিন্তু ইহাতে ইউসুফ (আ)-এর সংকল্প দমিত হইল না এবং তাঁহার জামার পিছন দিক ছিঁড়িয়া গেল। কিন্তু ইউসুফ (আ) উহার পরোয়া করিলেন না। যুলায়খাও দৌড়ের গতিতে ইউসুফের পিছনে পিছনে দরজার বাহিরে পৌঁছিল। কিন্তু কী আশ্চর্য! এই অসময় গৃহকর্তা দরজার সামনে দণ্ডায়মান! যুলায়খা চমকাইয়া গেল এবং মুহূর্তে নিজেকে সামলাইয়া নিজেকে সতী ও নিষ্পাপ এবং প্রতিপক্ষকে সম্পূর্ণ দোষী সাব্যস্ত করিবার জন্য গম্ভীর ভাষায় বলিয়া উঠিল, 'গৃহকর্তার অনুপস্থিতির সুযোগে যে লোক (গোলাম হইয়া এবং আশকারা পাইয়া এতদূর স্পর্ধা দেখায় যে) মালিকের স্ত্রীর সহিত মন্দ কর্ম করিবার বাসনা পোষণ করে, অত্যন্ত কঠোর ও শিক্ষনীয় শাস্তিই তাহার প্রাপ্য। জেলখানায় অন্তরীণ করা কিংবা দৈহিক মর্মন্তুদ শাস্তি তাহাকে দেওয়া উচিত। হযরত ইউসুফ (আ) সম্ভবত নবীসুলভ উদারতা ও আভিজাত্যের কারণে আযীযের স্ত্রীকে অভিযুক্ত করিবার ব্যাপারে নীরবতা অবলম্বন করিলেন। কিন্তু যুলায়খার কূটকৌশলের কারণে পরিস্থিতি পাল্টাইয়া গেল। নির্দোষ ইউসুফ (আ) নিজেকে অভিযুক্ত দেখিয়া অনন্যোপায় হইয়া সত্য প্রকাশে বাধ্য হইলেন। তিনি বলিলেন, (যুলায়খার বক্তব্য সত্য নহে, বরং) সে-ই তাহার কামনা সিদ্ধির জন্য আমাকে ফুসলাইতেছিল এবং রুদ্ধদ্বার কক্ষে আমাকে আটকাইয়াছিল। আমি আত্মরক্ষা ও মনিবের প্রতি কৃতজ্ঞতার দাবি পূরণে দৌড়াইয়া বাহিরে আসিয়াছি।
এই অপ্রত্যাশিত ও নাযুক বিষয়ে কে সত্যবাদী তাহা নির্ণয় করিয়া সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া ও প্রকৃত অপরাধীকে দোষী সাব্যস্ত করা ছিল আযীয মিসরের জন্য অত্যন্ত জটিল। সাক্ষ্য ও স্বাভাবিক প্রমাণ দ্বারা সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার কোন বাহ্য ব্যবস্থা ছিল না। এইরূপ নাযুক মুহূর্তেই আল্লাহ তা'আলার কুদরতী ব্যবস্থা তাঁহার মনোনীত ও নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দাদের মান রক্ষার জন্য অগ্রবর্তী হইয়া থাকে। আলোচ্য ক্ষেত্রে সেই কুদরতী ব্যবস্থা ছিল এই যে, আল্লাহ তা'আলা অলৌকিকভাবে একজন সাক্ষী দাঁড় করাইয়া দিলেন এবং তাহার মুখ হইতে এমন একটি মীমাংসাসূচক বক্তব্য প্রকাশ করাইলেন যাহার আলোকে সত্য-মিথ্যা নির্ণয় সূর্যালোকের ন্যায় স্পষ্ট হইয়া গেল এবং অপরাধীর পক্ষে উহা খণ্ডন করিবার কোন প্রকার অবকাশ রহিল না। সাক্ষী বলিল, ইউসুফের ছেঁড়া জামা দেখিয়া অপরাধী নির্ণয়ের সূত্র বাহির করা যাইতে পারে। যদি জামাটি সম্মুখ দিকে ছিঁড়িয়া থাকে তবে নারীর অভিযোগ সত্য হইবে এবং পুরুষের অপরাধ প্রমাণিত হইবে। কেননা জামা সম্মুখে ছেঁড়া হওয়া এই কথার প্রমাণ বহন করে যে, পুরুষ নারীকে ভোগ করিতে চাহিয়াছিল, নারী আত্মরক্ষার জন্য পুরুষকে ধাক্কা দিয়াছে এবং বুকে আঘাত হানিবার কারণে জামা ছিঁড়িয়া গিয়াছে। আর যদি জামার পিছন দিক ছিঁড়িয়া থাকে তবে নারীর অভিযোগ মিথ্যা হইবে এবং পুরুষ নির্দোষ সাব্যস্ত হইবে। কেননা তখন বুঝা যাইবে যে, পুরুষ পাপমুক্ত থাকিবার জন্য তাহার সম্মুখ দিকে দৌড় দিয়াছে এবং নারী তাহাকে ধরিয়া রাখিবার জন্য পিছন দিক হইতে তাহার জামা আঁকড়াইয়া ধরিবার কারণে জামার পিছন দিক ছিঁড়িয়া গিয়াছে।
এই সাক্ষীর পরিচয় নির্ধারণে মুফাসসিরগণের বক্তব্যে কিছুটা মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। পবিত্র কুরআনের ভাষ্যে এতটুকু ইংগিত পাওয়া যায় যে, সাক্ষী যুলায়খার কোন আপনজন (شَاهِدٌ مِّنْ أَهْلِهَا) ছিল। ইবন আব্বাস (রা) হইতে একটি বর্ণনামতে সে ছিল বাদশাহর ঘনিষ্ঠজনদের অন্যতম এবং শ্মশ্রুধারী এক পুরুষ। কাহারও মতে সে ছিল যুলায়খার স্বামী আযীয মিসরের আত্মীয়। অন্যদের মতে যুলায়খার নিকটাত্মীয় এবং তাহার চাচাত অথবা মামাত ভাই। ইবন আব্বাস (রা), ইকরিমা, মুজাহিদ, হাসান, কাতাদা, সুদ্দী, মুহাম্মদ ইবন ইসহাক ও যায়দ ইবন আসলাম (রা) প্রমুখ হইতে উদ্ধৃত বর্ণনায় তাহাকে বয়স্ক পুরুষ এবং যুলায়খা অথবা তাহার স্বামীর নিকটাত্মীয় কিংবা বাদশাহর ঘনিষ্ঠ লোক বলা হইয়াছে। একটি বর্ণনায় ইউসুফ ও যুলায়খার দৌড়াইয়া বাহির হওয়ার সময়টিতে আযীয মিসর 'কিতফীর' যুলায়খার এক চাচাত ভাইয়ের সহিত কথা বলিতেছিল এবং সে-ই আযীযকে মীমাংসার এই সূত্র প্রদর্শন করিয়াছিল। অধিকাংশ বিজ্ঞ মুফাসসিরের মতে এই সাক্ষী ছিল যুলায়খার ঘরে বসবাসকারী তাহার কোন আত্মীয় (অথবা গৃহপরিচারিকা)-এর দুগ্ধপোষ্য সন্তান, যে দোলনায় অবস্থান করিয়া নিষ্পাপ শিশু চোখে যুলায়খা ও ইউসুফের কার্যাবলী নিরীক্ষণ করিতেছিল এবং দুগ্ধপোষ্য শিশু হওয়ার কারণে স্বভাবতই যুলায়খা তাহাকে গোপন করিবার কোন প্রয়োজন অনুভব করে নাই। সাঈদ ইবন জুবায়র ও দাহ্হাক তাহার শিশু হওয়ার অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন। হাসান বসরী হইতেও তাহার এই বাড়িতে অবস্থানরত শিশু হওয়ার কথা বর্ণিত হইয়াছে। ইবন আব্বাস (রা) হইতে আওফীর আহরিত বর্ণনায়ও তাহাকে শিশু বলা হইয়াছে। ইবন জারীর ও ইবন কাছীর প্রমুখ মুফাসসির সাক্ষীর শিশু হওয়ার অভিমতকে অধিক প্রামাণ্য বলিয়াছেন। কেননা আহমদের মুসনাদ, ইবন হিববানের সহীহ ও হাকেমের মুসতাদরাক গ্রন্থে আবু হুরায়রা, হিলাল ইবন য়াসাফ ও ইবন আব্বাস (রা) প্রমুখ সাহাবী হইতে এ প্রসঙ্গে সহীহ হাদীছ বর্ণিত হইয়াছে (ইবন আব্বাস হইতে মারফু ও মাওকৃষ্ণ উভয় রূপে) যাহাতে ইউসুফ (আ)-এর ঘটনার সাক্ষীকে দোলনায় ও শিশু অবস্থায় কথা বলিয়াছে এমন চার (কিংবা ততোধিক, সুয়ূতীর বর্ণনামতে এগারজন) শিশুর অন্যতম বলা হইয়াছে।
অবশেষে সাক্ষীর নির্দেশিত পন্থায় ইউসুফ (আ)-এর জামাটি পরখ করা হইল এবং উহার পিছন দিকে ছেঁড়া দেখিয়া গৃহকর্তা ঘটনার বাস্তবতা সম্পর্কে নিশ্চিত হইলেন এবং স্ত্রীকে অপরাধ-স্বীকার করিয়া ক্ষমা প্রার্থনার আদেশ দিলেন এবং অভিজাত পরিবারের মান-মর্যাদার খাতিরে ইউসুফ (আ)-কে এ বিষয়ে সম্পূর্ণ নীরবতা অবলম্বনের অনুরোধ করিলেন। পবিত্র কুরআনের বর্ণনায় :
فَلَمَّا رَأَ قَمِيصَهُ قُدَّ مِنْ دُبُرٍ قَالَ إِنَّهُ مِنْ كَيْدِكُنْ إِنْ كَيْدَكُنَّ عَظِيمٌ يُوسُفُ أَعْرِضْ عَنْ هَذَا وَاسْتَغْفِرِي لِذَنبِكَ أَنَّكَ كُنْتَ مِنَ الْخَاطِئِينَ.
"গৃহস্বামী যখন দেখিল যে, তাহার জামা পিছন দিক হইতে ছিন্ন করা হইয়াছে তখন সে বলিল, নিশ্চয় ইহা তোমাদের নারীদের ছলনা, তোমাদের ছলনা তো ভীষণ। হে ইউসুফ! তুমি ইহা উপেক্ষা কর এবং হে নারী! তুমি তোমার অপরাধের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর, তুমিই তো অপরাধী" (১২: ২৮, ২৯)।
অর্থাৎ জামা পরখ করিয়া গৃহকর্তার দৃষ্টিতে ইউসুফের নির্দোষ হওয়া প্রতিভাত হইল। কিন্তু একটু পূর্বেই তাহারই ঘরের স্ত্রীর আচরণ ও বাকচাতুর্য তাহাকে নারী চক্রান্তের স্বরূপ দেখাইয়া দিলে সে উল্লিখিত মন্তব্য করিল। তাফসীরে কুরতুবীতে এ প্রসঙ্গে আবু হুরায়রা (রা) সূত্রের একটি হাদীছ উদ্ধৃত করা হইয়াছে। উহাতে রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, নারীর চক্রান্ত ও কূটকৌশল শয়তানের চক্রান্ত হইতেও জটিল হইয়া থাকে। কেননা আল্লাহ তা'আলা শয়তানের চক্রান্ত সম্পর্কে বলিয়াছেন, إِنْ كَيْدَ الشَّيْطَانَ كَانَ ضَعِيفًا "শয়তানের চক্রান্ত দুর্বল"। পক্ষান্তরে নারী চক্রান্ত সম্পর্কে বলিয়াছেন, إِنْ كَيْدَكُنَّ عَظِيمٌ "তোমাদের নারীদের চক্রান্ত ভয়ংকর"। বলা বাহুল্য ইহা চক্রান্তবাজ নারীর জন্যই প্রযোজ্য এবং নারীদের মধ্যেও উহার ব্যতিক্রম রহিয়াছে। নিরপরাধ ইউসুফকে অন্যায়ভাবে দোষী সাব্যস্ত করিবার চক্রান্তের কারণে আযীয মিসর স্ত্রীকে অপরাধ স্বীকার করিয়া ইউসুফের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিতে বলিলেন। ইবন কাছীরের মতে, মিসরবাসীরা পৌত্তলিক হইলেও তাহাদের দৃষ্টিতে পাপ মার্জনা করিবার অধিকার আল্লাহর জন্য স্বীকৃত ছিল। সুতরাং যুলায়খাকে ইসতিগফার করিতে বলা হইয়াছিল (বিদায়া, ১খ, ২০৪)।
এখানে পাঠক মনে একটি প্রশ্ন জাগিতে পারে যে, স্ত্রীর এহেন বিশ্বাসঘাতকতা ও নির্লজ্জতা প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও স্বামীর পক্ষে উত্তেজিত না হইয়া আদালতের বিচারকের ন্যায় শান্ত ও স্থির থাকিবার কারণ কি ছিল? ইহা তো মানব স্বভাবের জন্য অত্যন্ত বিস্ময়কর ব্যাপার। মুফাসসিরগণ ইহার বিভিন্ন সম্ভাব্য কারণ বর্ণনা করিয়াছেন। তাহাদের মতে আযীয মিসরের স্বভাব কোমলতা ছিল উহার কারণ। কাহারও মতে তাহার মর্যাদাবোধ ছিল অত্যন্ত শিথিল (তাহার সম্পর্কে পৌরুষ শক্তির দুর্বলতার তথ্য স্মর্তব্য)। তথাকথিত অভিজাত সমাজে সর্বযুগেই এই ধরনের ক্ষেত্রে লোকমুখে নিন্দা চর্চার ভয়ে নীরবতা অবলম্বন ও ঘটনা হজম করিয়া যাওয়ার রীতিও ইহার কারণ হইতে পারে। কুরতুবীর মতে উল্লিখিত কারণ ব্যতীত একটি সম্ভাব্য কারণ ইহাও হইতে পারে যে, আল্লাহ তা'আলা ইউসুফ (আ)-কে পাপ হইতে, অতঃপর অপবাদ ও অপমান হইতে রক্ষা করিবার জন্য যে অতি জাগতিক ও অলৌকিক ব্যবস্থা গ্রহণ করিয়াছিলেন উহারই পরিপূরক অংশরূপে আযীয মিসরকে উত্তেজনার বশবর্তী হইয়া কোন অঘটন ঘটানো হইতে শান্ত রাখিবার ব্যবস্থা করা হইয়াছিল। অন্যথায় এই ধরনের পরিস্থিতিতে মানুষ স্বভাবত আত্মনিয়ন্ত্রণ হারাইয়া ফেলে এবং তদন্ত ও সত্য উদঘাটনের অপেক্ষা না করিয়াই গালাগালি করিতে ও কাণ্ডজ্ঞানহীনরূপে পেশীশক্তি প্রয়োগে উদ্যত হয়। আলোচ্য ক্ষেত্রে আযীয মিসরের পক্ষে উত্তেজিত হইয়া ইউসুফ (আ)-এর সহিত কোন সাংঘাতিক ধরনের দুর্ব্যবহার করা বিচিত্র ছিল না। কিন্তু কুদরতী ব্যবস্থাপনা তাহার প্রিয় ও বিশিষ্ট বান্দার সুরক্ষা ব্যবস্থার অংগরূপে মানুষের স্বভাব আচরণের ঊর্ধ্বে আযীয মিসরকে শান্ত রাখিবার অলৌকিক পন্থা গ্রহণ করিয়াছিল (মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ, ৪৬)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 যুলায়খার প্রেমাসক্তি চর্চা ও ইউসুফ (আ)-এর কারাবাস

📄 যুলায়খার প্রেমাসক্তি চর্চা ও ইউসুফ (আ)-এর কারাবাস


আযীয মিসর কর্তৃক তাহার অন্দর মহলের ঘটনা চাপা দেওয়ার সার্বিক চেষ্টা সত্ত্বেও রাজ-পরিবার ও সরকারি মহলে ঘটনাটি পৌছিয়া গেল এবং স্বভাবতই অভিজাত নারী সমাজে উহার চর্চা হইতে লাগিল। এক সময় এই চর্চার প্রতিধ্বনি যুলায়খার কানেও পৌঁছিল। যুলায়খার আত্মমর্যাদায় আঘাত লাগিল এবং তাহার অন্তরে নিন্দাকারিণীদের প্রতি প্রতিশোধের আগুন জ্বলিয়া উঠিল। প্রতিশোধ গ্রহণ ও নিন্দাকারিণীদের কিঞ্চিত জব্দ করিয়া নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করিবার উদ্দেশ্যে যুলায়খা তাহার সরকারি ভবনে অভিজাত নারীদের জন্য একটি ভোজ অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করিল। অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে নিজ হাতে ফল বা অন্য কোন খাদ্য কাটিয়া খাওয়ার জন্য আমন্ত্রিতদের প্রত্যেকের হাতে ধারাল ছুরি প্রদান করা হইল এবং সে মুহূর্তে ইউসুফ (আ)-কে সেখানে উপস্থিত করা হইল। সমবেত নারীরা ইউসুফ (আ)-কে এক নজর দেখিবামাত্র খাদ্য বা ফলের পরিবর্তে তাহাদের হাতের আঙ্গুল যখম করিয়া ফেলিল। বিজয়গর্বিনী যুলায়খা তখন তাহার প্রেমের স্বীকারোক্তি করিল এবং পুনরায় নারীদের সম্মুখে ইউসুফ (আ)-কে জেলের হুমকী দিল।
কুরআনের ভাষায়: وَقَالَ نِسْوَةٌ فِي المَدِينَةِ امْرَأَةُ العَزيزِ تُرَاوِدُ فَتْهَا عَنْ نَفْسِهِ قَدْ شَغَفَهَا حَبًّا إِنَّا لَنَرْهَا فِي ضَلَلٍ مُّبِينٍ. فَلَمَّا سَمِعَتْ بِمَكْرِهِنَّ أَرْسَلَتْ إِلَيْهِنَّ وَاعْتَدَتْ لَهُنَّ مُتَكَاً وَقَالَتِ اخْرُجْ عَلَيْهِنَّ فَلَمَّا رَأَيْنَهُ أَكْبَرْتُهُ وَقَطَّعْنَ أَيْدِيَهُنَّ وَقُلْنَ حَاشَ لِلَّهِ مَا هَذَا بَشَرًا إِنْ هَذَا إِلَّا مَلَكَ كَرِيمٌ . قَالَتْ فَذُلِكُنَّ الَّذِي لَمْتُنْنِي فِيْهِ وَلَقَدْ رَاوَدْتُهُ عَنْ نَفْسِهِ فَاسْتَعْصَمَ وَلَئِنْ لَمْ يَفْعَلْ مَا أَمُرُهُ لِيُسْجَنَنَّ وَلَيَكُونَ مِّنَ الصَّغِرِينَ .
"নগরীর কতিপয় নারী বলিল, আযীযের স্ত্রী তাহার যুবক দাস হইতে অসৎ কর্ম কামনা করিতেছে। প্রেম তাহাকে উন্মত্ত করিয়াছে, আমরা তো তাহাকে দেখিতেছি স্পষ্ট ভ্রান্তিতে। স্ত্রীলোকটি যখন উহাদের ষড়যন্ত্রের কথা শুনিল তখন সে উহাদিগকে ডাকিয়া পাঠাইল, উহাদের জন্য আসন প্রস্তুত করিল, উহাদের প্রত্যেককে একটি করিয়া ছুরি দিল এবং ইউসুফকে বলিল, উহাদের সম্মুখে বাহির হও। অতঃপর উহারা যখন তাহাকে দেখিল তখন উহারা তাহার গরিমায় অভিভূত হইল এবং নিজেদের হাত কাটিয়া ফেলিল। উহারা বলিল, অদ্ভূত আল্লাহ্ মাহাত্ম্য! এ তো মানুষ নহে, এ তো এক মহিমান্বিত ফেরেশতা। সে বলিল, এ-ই সে যাহার সম্বন্ধে তোমার আমার নিন্দা করিয়াছ। আমি তো তাহা হইতে অসৎকর্ম কামনা করিয়াছি। কিন্তু সে নিজেকে পবিত্র রাখিয়াছে। আমি তাহাকে যাহা আদেশ করিয়াছি সে যদি তাহা না করে তবে সে কারারুদ্ধ হইবে এবং হীনদের অন্তর্ভুক্ত হইবে" (১২:৩০-৩২)।
তাফসীর ও ইতিহাসের বিবরণ অনুসারে (মন্ত্রী পরিষদ) আমীর-উমারা ও সরকারী উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের অন্দর মহলের নারীরা, বিশেষত আযীয মিসরের সহিত নিকট সম্পর্কযুক্ত কর্মকর্তাদের স্ত্রীদের মধ্য হইতে পাঁচ মহিলা (কুরতুবী, মাজহারী) যুলায়খার প্রেমে উন্মত্ততা ও তাহার সতীত্ব লইয়া চর্চা করিতেছিল। কেননা কোন সূত্রে এই ঘটনা তাহাদের কর্ণগোচর হইয়াছিল এবং নারী স্বভাবের বশবর্তী হইয়া তাহারা মুখরোচক নিন্দা চর্চায় লিপ্ত হইল। তাহারা এই বলিয়া নিন্দা ও সমালোচনার ঝড় তুলিল যে, একে তো বিবাহিতা নারী, তাহা ছাড়াও আবার রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পদাধিকারীর স্ত্রী। রাজ-পরিবারের কন্যা হইয়া পরকীয়া প্রেম! আচ্ছা, প্রেম যদি একান্তই করিতেই হইত তবে কোন উপযুক্ত পাত্র দেখিয়াই করিত! কস্মিনকালেও কি কেহ নিজের গোলামের সহিত কাহাকেও প্রেম করিতে শুনিয়াছে! ধিক শত ধিক! লজ্জায় আমাদেরও মাথা হেঁট করিল আযীযের স্ত্রী।
নারী মহলের এই নিন্দা ও সমালোচনার সংবাদ এক সময় যুলায়খার কানেও পৌছিল। কুরআনের ভাষায় তাহাদের নিন্দা চর্চাকে 'চক্রান্ত (مکر)' বলিবার কারণ সম্পর্কে তাফসীরকারগণ বলিয়াছেন যে, এই নিন্দাবাদ চক্রান্তকারীর কর্মের ন্যায় গোপনে গোপনে করিবার কারণে ইহাকে 'চক্রান্ত' বলা হইয়াছে। মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক বলিয়াছেন, নারীদের কাছে ইউসুফ (আ)-এর অনুপম সৌন্দর্যের বিষয়টি পৌঁছিয়াছিল। কোন কোন বর্ণনামতে যুলায়খাই তাহাদের নিকট ইউসুফ (আ)-এর রূপ-গুণের বিবরণ দিয়াছিল। সুতরাং বাহ্য নিন্দার আড়ালে তাহাদের উদ্দেশ্য ছিল প্রত্যক্ষরূপে ইউসুফ (আ)-কে দর্শন করিবার উপায় হাসিল করা এবং এভাবে নিন্দার মাধ্যমে ইউসুফ (আ)-কে প্রদর্শন করাইতে যুলায়খাকে উদ্বুদ্ধ করা। এই গোপন উদ্দেশ্যের প্রতি লক্ষ্য করিয়া তাহাদের কর্মকাণ্ডকে চক্রান্ত বলা হইয়াছে। কেহ কেহ বলিয়াছেন, যুলায়খা তাহার প্রেমের কথা এই নারীদের (বান্ধবীদের) নিকট প্রকাশ করিয়াছিল এবং তাহাদিগকে উহা গোপন রাখিবার অনুরোধ করিয়াছিল। কিন্তু তাহারা উহা ফাঁস করিয়া দিয়াছিল বলিয়া উহাকে 'চক্রান্ত' বলা হইয়াছে (ইবন কাছীর, মাজহারী)। এখানে উল্লেখ্য যে, অভিজাত সমাজের মর্যাদা অনুসারে আযীয-পত্নীর অনুমতি কিংবা আমন্ত্রণ ব্যতীত এই নারীদের পক্ষে ইউসুফ (আ)-কে দেখিবার সুযোগ গ্রহণের সম্ভাবনা ছিল অত্যন্ত ক্ষীণ। নারীদের সমালোচনা যুলায়খার অহংবোধকে নাড়া দিল এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সদিচ্ছা ছাড়াও তাহার নারী প্রবৃত্তি নিন্দাকারিনীদের মোক্ষম শিক্ষা দেওয়ার জন্য তাহাকে উদ্বুদ্ধ করিল। ইহার উপায় হিসাবে সে নিজ ভবনে একটি ভোজ অনুষ্ঠানের আয়োজন করিয়া সম্ভ্রান্ত ও অভিজাত মহিলাদের নিকট উহার আমন্ত্রণপত্র পাঠাইল। ইবন ওয়াহবের বর্ণনামতে নিন্দাচর্চায় অংশগ্রহণকারীদের চল্লিশজনকে এই অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হইয়াছিল। ভোজ অনুষ্ঠানের সাজসজ্জার জন্য যথাযোগ্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইল। ইবন আব্বাস (রা) হইতে উদ্ধৃত বর্ণনা মতে-বিলাসপ্রিয় শ্রেণীর উপযোগী গদী, হেলান-তাকিয়া ইত্যাদি এবং রকমারি সুস্বাদু খাদ্যদ্রব্য ও বিভিন্ন প্রকার ফল-ফলাদির আয়োজন করা হইল। বাগাবীর মতে, আযীয পত্নী রং-বেরংয়ের ফল ও খাদ্য দ্বারা একটি কক্ষ সজ্জিত করিল এবং উহাতে আরামদায়ক বিছানাপত্র ও হেলান-তাকিয়ার ব্যবস্থা করিয়া নারীদের আসন গ্রহণের আমন্ত্রণ জানাইল। খাদ্যদ্রব্য কিংবা ফলের তালিকায় এমন কিছু ছিল যাহা তাৎক্ষণিকভাবে চাকু দিয়া কাটিয়া খাইতে হয় এবং তৎকালীন মিসরীয় সভ্যতা অনুসারে ঐ খাদ্য বা ফল কাটিয়া পরিবেশন করা হইত না, বরং মেহমানগণ নিজেরা কাটিয়া ভক্ষণ করিত। এই খাদ্য কোন কোন মুফাসসিরের মতে গোস্ত ছিল এবং অন্যদের মতে ফল ছিল। ইবন আব্বাস (রা) ও মুজাহিদ প্রমুখের মতে উহা ছিল উতরুজ বা উতরুঞ্জ (= কমলালেবু জাতীয় কোন ফল)। ফল কাটিয়া খাওয়ার জন্য নিয়মমাফিক প্রত্যেকের পাত্রে একটি করিয়া অতিরিক্ত ধারাল চাকু সরবরাহ করা হইল।
মাওলানা আবুল কালাম আযাদের বক্তব্য অনুসারে আজ হইতে চার হাজার বৎসর পূর্বেকার মিসরীয় নগর সভ্যতা বর্তমানের উন্নত বিশ্বের যে কোন দেশের প্রগতি ও আধুনিকতার তুলনায় উন্নততর ছিল বলিয়া প্রতীয়মান হয়। কেননা আধুনিক কালে আবিষ্কৃত বহুবিধ উপকরণের উপস্থিতি ব্যতীতই মিসরীয় যে জীবনধারার পরিচয় পাওয়া যায় উহা সত্যিই বিস্ময়কর। মৃতদেহ মমি করিয়া রাখিবার বিজ্ঞান ও প্রকৌশলসহ অনেক তথ্যই এ প্রসঙ্গে উত্থাপিত হইতে পারে। আযীয-পত্নীর আয়োজিত ভোজসভা সংক্রান্ত কুরআনী ভাষ্য এখানকার নগরজীবনের প্রগতি-সমৃদ্ধ ধারা ও আয়েশ-বিলাসিতার প্রতি স্পষ্ট ইংগিত প্রদান করে (তরজমানুল কুরআন, সূরা ইউসুফ)। চাকু সরবরাহের বাহ্য লক্ষ্য ছিল খাদ্য কাটিবার ব্যবস্থা করা। কিন্তু ইহাতে আযীয-পত্নীর অন্তরে লুকায়িত ছিল কঠোর প্রতিশোধ গ্রহণের সুদূরপ্রসারী দুরভিসন্ধি। ইবন কাছীরের বর্ণনামতে আমন্ত্রিত অতিথিদের পরিতৃপ্তির সহিত আহারপর্ব সমাপ্ত করিবার শেষ পর্যায়ে তাহাদের সম্মুখে লেবু ও ফল কাটিবার চাকু সরবরাহ করা হইল।
এখন যুলায়খা তাহাদের নিকট ইউসুফ (আ)-কে দেখিবার আগ্রহ আছে কিনা জানিতে চাহিলে তাহারা সকলে হাঁ-সূচক জবাব দিল। ভিন্ন বর্ণনামতে তাহারাই স্বতঃপ্রণোদিত হইয়া ইউসুফ (আ)-কে দেখাইবার আবদার করিয়াছিল। যুলায়খা ইহারই অপেক্ষায় ছিল। সে পূর্ব হইতেই ইউসুফ (আ)-কে সর্বোত্তম আকর্ষণীয় পোশাকে সজ্জিত করিয়া পার্শ্ববর্তী কোন কক্ষে অপেক্ষমাণ রাখিয়াছিল। এক্ষণে সে তাহাকে মজলিসের সম্মুখে উপস্থিত হওয়ার আদেশ পাঠাইল। যুলায়খার অসৎ উদ্দেশ্যের কথা ইউসুফ (আ) অবহিত ছিলেন না। কোন সংগত প্রয়োজন আছে মনে করিয়া তিনি কক্ষের বাহিরে আসিলেন। নারীদের ইউসুফ (আ)-কে দর্শন করিতেই যুলায়খার কাংখিত চরম অঘটনটি ঘটিয়া গেল। তাহারা এক অকল্পনীয় ও অনুপম সৌন্দর্য দর্শনে এমন আত্মহারা ও দিশাহারা হইয়া গেল যে, কুরআনের ভাষায় তাহাকে অতি বড় বা অতি জাগতিক কিছু মনে করিল (অথবা 'আল্লাহু আকবার' ধ্বনি দিয়া উঠিল)। প্রথমে তাহাদের মুখের সকল ভাষা রুদ্ধ হইয়া গেল এবং সকল অনুভূতি অসাড় হইয়া রহিল। তাহারা 'ফল কাটিতেছি' মনে করিয়া নিজ নিজ হাত কাটিতে লাগিল। যুলায়খা তখন ইউসুফ (আ)-কে ফিরিয়া যাওয়ার নির্দেশ দিল। উদ্দেশ্য ছিল নারীদিগকে আগমন ও প্রস্থান উভয় অবস্থায় ইউসুফকে দেখানো।
ইউসুফ (আ) ফিরিয়া গেলেন। হতভম্ব দর্শণার্থীদের হাত কাটা চলিতে থাকিল। তাহারা তো ফল কাটিতেছিল আর হৃদয়মন ইউসুফ দর্শনে এমন নিমগ্ন ছিল যে, নিজের হাত কাটিবার যাতনাও অনুভব করে নাই। মুজাহিদ বলেন, রক্ত দেখিয়া তাহাদের চেতনা ফিরিয়া আসিল। এতক্ষণে বেদনা অনুভব করিয়া উহ্ আহ্ করিতে লাগিল। কাতাদার বর্ণনায় আছে, তাহারা হাত কাটিয়া সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করিয়া ফেলিয়াছিল। ইবন ওয়াহবের বর্ণনায় হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হইয়া মহিলাদের কয়েকজনের জীবনলীলা সাংগ করিবার কথাও বলা হইয়াছে। তবে প্রামাণ্য মতে তাহারা হাত যখম করিয়াছিল। এতক্ষণ তাহাদের মুখ হইতে কোন বাকস্ফুরণও হইতেছিল না। হতভম্বতার ধাক্কা সামলাইয়া প্রথম তাহারা যে কথাটি বলিল, তাহা ছিল 'অবিশ্বাস্য? আল্লাহ্র মহিমা! মানবকূলে এমন সৌন্দর্য হইতে পারে না; সে নিশ্চয় কোন মহান ফেরেশতা (জ্যোতির্ময় ঊর্ধ্ব জাগতিক কোন সৃষ্টি) হইবে, কোন কারণে যে ভূতলে পদার্পণ করিয়াছে।
নিন্দাবাণে আহত ও প্রেম দহনে ক্ষতবিক্ষত যুলায়খা এখন তাহার অন্তর্জালার কিছুটা উপশম অনুভব করিল এবং বিজয় গর্বিণীর হাসি হাসিয়া অতিথিদের বলিল, এই তো সেই 'কিনআনী গোলাম' যাহার প্রেমে হাবুডুবু খাওয়ার কথা বলিয়া তোমরা আমার বিরুদ্ধে নিন্দার ঝড় তুলিয়াছিলে। আর এখন এক নজর দেখিয়াই তোমাদের কী হাল হইয়াছে তাহা তো তোমরা দেখিতেছই। মূলত তোমাদের পক্ষে তাহার সৌন্দর্য সম্পর্কে কল্পনা করাও সম্ভব ছিল না। এক নজরেই যদি তোমাদের ফলের বদলে হাত কাটিতে হয়, তাহা হইলে যাহাকে চব্বিশ ঘণ্টা এই সৌন্দর্যের আগুন নিয়া উঠাবসা করিতে হয় তাহার কলিজার ক্ষতবিক্ষত হওয়ার অবস্থা তোমরা সহজেই ধারণা করিতে পার। নারীরা একবাক্যে বলিল, আমরা যাহা কিছু দেখিলাম ইহার পর তোমাকে আর কোন দোষ দেওয়া যায় না। কেননা মানবকুলে এই সৌন্দর্যের কোন তুলনা নেই। নারীদের এই স্বীকৃতির পর যুলায়খাও অকপট স্বীকারোক্তি করিয়া বলিল, এ কথা সত্য যে, আমিই তাহাকে ফুসলাইয়াছিলাম। কিন্তু তাহার এই বাহ্য সৌন্দর্যের ঊর্ধ্বে তাঁহার চারিত্রিক দৃঢ়তা এতই সবল যে, সে সম্পূর্ণরূপে আত্মরক্ষা করিয়া চলিয়াছে; বিন্দুমাত্র বিচলিত হয় নাই। বর্ণনামতে এই সময় যুলায়খা ইউসুফ (আ)-এর সে সব গুণের বিবরণ প্রদান করিল যাহা বাহ্য দর্শনে আগন্তুক নারীদের পক্ষে বুঝিবার উপায় ছিল না।
যুলায়খার এই প্রকাশ্য স্বীকারোক্তির আর একটি সূক্ষ্ম উদ্দেশ্য ছিল ইউসুফের প্রতি প্রেমের ব্যাপারে আমন্ত্রিত নারীদের সমর্থন লাভ করা, যাহাতে তাহারা ইউসুফ (আ)-কে নমনীয় করিবার কাজে তাহাকে সহায়তা করে। ইতিহাসের বর্ণনামতে যুলায়খার এই উদ্দেশ্য হাসিল হইয়াছিল। কেননা তাহারা সকলে ইউসুফ (আ)-কে এই মর্মে বুঝাইতে চেষ্টা করিয়াছিল যে, যুলায়খা যেহেতু তোমার মালিক ও মনিব, সে তোমার প্রতি সদা অনুগ্রহশীলা এবং তোমার প্রতি তাহার প্রেম অত্যন্ত গভীর ও নিখাদ, সুতরাং তোমার উচিত মনিবের আনুগত্য করা, তাহার বিরুদ্ধাচরণ বা তাহাকে অসন্তুষ্ট করা নহে। পবিত্র কুরআনের বর্ণনাধারায়ও ইহার প্রতি ইংগিত বিদ্যমান। সূরা ইউসুফের ৩৩ নং ও ৫০ নং আয়াতে উদ্ধৃত ইউসুফ (আ)-এর ভাষ্যে 'নারীদের কূট-চক্রান্তে'র কথা বলা হইয়াছে: 'যদি আপনি (আল্লাহ) আমার হইতে 'তাহাদের চক্রান্ত' দূরে সরাইয়া না দেন' (৩০ নং আয়াত) এবং "আমার প্রতিপালক 'তাহাদের চক্রান্ত' সম্পর্কে সম্যক অবহিত” (আয়াত-৫০) শুধু যুলায়খার চক্রান্তের কথা না বলিয়া নারীদের সকলের চক্রান্তের কথা বলা হইয়াছে। নিজের দোষের স্বীকারোক্তি এবং ইউসুফ (আ)-এর পবিত্রতা ও গুণ-গরিমার বর্ণনা প্রদান করিবার পর যুলায়খা তাহার স্বার্থসিদ্ধির জন্য একটি নূতন চাল চালিল। ইউসুফ (আ)-কে কাবু করিবার জন্য সে অতিথিদের সম্মুখে এবং তাহাদের শুনাইয়া ইউসুফ (আ)-এর প্রতি এই হুমকি উচ্চারণ করিল, সে যদি আমার অবাধ্য হয় তবে তাহাকে এই রাজকীয় পরিবারে সুখ-শান্তি ও আরাম-আয়েশে বসবাসের সুবর্ণ সুযোগ হইতে বঞ্চিত হইয়া (আজীবন) জেলখানায় পচিতে হইবে এবং অনেক লাঞ্ছনা ভোগ করিতে হইবে। কেননা নারীর মনঃবাসনা পূরণ না হইলে তাহার প্রতিশোধ-স্পৃহা অত্যন্ত জঘন্য ও ভয়ংকর হইয়া থাকে।
কিন্তু নারীদের সম্মিলিত চক্রান্ত ও যুলায়খার হুমকী বাণী নবুওয়াত খান্দানের আলোকবর্তিকায় সামান্য কম্পনও সৃষ্টি করিতে পারিল না। ইউসুফ (আ) পাহাড়ের ন্যায় অবিচল থাকিলেন এবং সব বিপদের সহায় ও সব সমস্যার সমাধানদাতার দরবারে দু'আ করিলেন। কুরআনের ভাষায়: قَالَ رَبِّ السِّجْنُ أَحَبُّ إِلَى مِمَّا يَدْعُونَنِي إِلَيْهِ وَإِلَّا تَصْرِفْ عَنِّى كَيْدَهُنَّ أَصْبُ إِلَيْهِنَّ وَأَكُنْ مِنَ الْجهلِينَ، فَاسْتَجَابَ لَهُ رَبُّهُ فَصَرَفَ عَنْهُ كَيْدَهُنَّ إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ . ثُمَّ بَدَا لَهُمْ مِنْ بَعْدِ مَا رَأَوُا الأَيَتِ لَيَسْجُنُنَّهُ حَتَّى حِينٍ.
"ইউসুফ বলিল, হে আমার প্রতিপালক! এই নারীরা আমাকে যাহার প্রতি আহ্বান করিতেছে তাহা অপেক্ষা কারাগার আমার নিকট অধিক প্রিয়। আপনি যদি উহাদের ছলনা হইতে আমাকে রক্ষা না করেন, তবে আমি উহাদের প্রতি আকৃষ্ট হইয়া পড়িব এবং অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হইব। অতঃপর তাহার প্রতিপালক তাহার আহ্বানে সাড়া দিলেন এবং তাহাকে উহাদের ছলনা হইতে রক্ষা করিলেন। তিনি তো সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। নিদর্শনাবলী দেখিবার পর উহাদের মনে হইল যে, তাহাকে কিছু কালের জন্য কারারুদ্ধ করিতেই হইবে" (১২: ৩৩-৩৫)।
ঐতিহাসিক ও মুফাসসিরগণের বর্ণনামতে ইউসুফ (আ) যখন দেখিলেন যে, এই বিদেশ-বিভূঁইয়ে তাঁহার কোন সাহায্যকারী নাই এবং তাহার প্রতিপক্ষ যুলায়খার সামাজিক অবস্থান অত্যন্ত সুদৃঢ়। যুলায়খার আহবানে সমবেত নারীরা তাহার মন জয় করিবার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হইয়া বিভিন্ন ফন্দী করিতেছে এবং যুলায়খার নিন্দাকারিণীরা এখন যুলায়খাকে নির্দোষ সাব্যস্ত করিতেছে, উপরন্তু তাহারা ইউসুফ (আ)-কে নমনীয় করিবার জন্য ও যুলায়খার বাসনা পূরণ করিতে ইউসুফ (আ)-কে অনুরোধ-উপরোধ করিতেছে। কখনও প্রলোভন, কখনও হুমকি দিতেছে (মাজহারী, ৫খ, ১৬০; কাসাসুল কুরআন, ১খ, ২৯৯, ৩০০) এবং ভিন্ন বর্ণনামতে তাহাদের প্রত্যেকেই ইউসুফ (আ)-কে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করিতে চাহিতেছে। এই জটিল ও সংগীন পরিস্থিতি ইউসুফ (আ)-কে পূর্বের চাইতে অধিক ভাবাইয়া তুলিল এবং একাকী যুলায়খার চাপ এড়াইয়া মনিবগৃহে নির্লিপ্ত অবস্থান করিবার পরিস্থিতি বদলাইয়া গেল। তখন তাঁহার নবুওয়াতী বুদ্ধিমত্তা ও অন্তরদৃষ্টি জাগ্রত হইয়া উঠিল। তিনি আশংকা করিলেন যে, তাঁহারও পদস্খলন ঘটিতে পারে। সুতরাং তিনি বড় বিপদ (পাপাচারে লিপ্ত হইয়া দুনিয়া-আখিরাত বরবাদ করা) হইতে বাঁচিবার জন্য ছোট বিপদ কারাবাস বরণ করা অধিক পসন্দনীয় মনে করিয়া আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করিলেন।
আল্লামা ইবন কাছীর ৩৩ নং আয়াতের তাফসীরে লিখিয়াছেন, "ইউসুফ (আ) পূর্ণাঙ্গরূপে আত্মরক্ষা করিবার জন্য কারাবাস পসন্দনীয় হওয়ার কথা বলিলেন। ইহা কামালিয়াতের স্তরসমূহের চূড়ান্ত পর্যায়। একদিকে তাঁহার যৌবন ও অতুলনীয় রূপ-গুণের পরিপূর্ণতা, অপরদিকে মিসরের প্রধান মন্ত্রীর স্ত্রী-মনিব ও গৃহকর্ত্রী, কর্তৃত্ব, সম্পদ ও রূপের অধিকারিণীর উদগ্র আহবান। কিন্তু তিনি তাহা প্রত্যাখ্যান করিলেন এবং আল্লাহর ভয় ও তাঁহার কাছে ছওয়াবের আশায় তিনি কারাবাস বরণ করিলেন। তিনি মূলত সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত হাদীছের ভাষ্য অনুসারে কিয়ামতে আল্লাহ্ (আরশের) ছায়ায় আশ্রয় লাভের ব্যবস্থা করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, "সাত ব্যক্তি এমন যাহাদিগকে আল্লাহ তাঁহার ছায়ায় আশ্রয় দান করিবেন-এমন একটি দিনে, যেদিন তাঁহার ছায়া ব্যতীত অন্য কোন ছায়া থাকিবে না"। এই সপ্তমের অন্যতম হইবে সেই পুরুষ যাহাকে কোন মর্যাদার অধিকারিণী রূপবতী নারী 'আহবান' করিলে সে বলিল, 'আমি তো আল্লাহকে ভয় করি' (মুখতাসার ইবন কাছীর, ২খ, ২৪৮)।
মোটকথা, আল্লাহ তা'আলা ইউসুফ (আ)-এর দু'আ কবুল করিলেন এবং তাঁহাকে নারীদের কূটচক্রান্ত হইতে হিফাজত করিলেন। যুলায়খা তাহার স্ত্রৈণ স্বামীকে ইউসুফ (আ)-কে কারাগারে নিক্ষেপ করিতে বাধ্য করিল। যুলায়খার উদ্দেশ্য ছিল জেলে নির্যাতনের মাধ্যমে ইউসুফকে আত্মসমর্পণ করিতে বাধ্য করা অথবা ইউসুফ হাতছাড়া হইয়া যাইতে পারে এবং অন্য নারীরা তাঁহার প্রতি আকৃষ্ট হইতে পারে-এই আশংকায় তাহাকে সংরক্ষিত স্থানে নিজের আওতায় রাখিবার ব্যবস্থা করিল, যাহাতে ইউসুফ (আ) সম্পূর্ণরূপে হাতছাড়া হইয়া না যান। মনের ইচ্ছা গোপন রাখিয়া সে স্বামীকে বলিল, "এই ইবরানী গোলামটি জনসমাজে আমার মর্যাদাহানি করিয়াছে। কেননা সে বলিয়া বেড়াইতেছে যে, আমি তাহাকে ফুসলাইয়াছি। সুতরাং তুমি আমাকে মানুষের কাছে গিয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিবে, অন্যথায় তাঁহাকে কারাগারে অন্তরীণ করিবে, যাহাতে মানুষের মুখ বন্ধ হইয়া যায় এবং লোকেরা তাঁহাকেই অপরাধী মনে করে। অপরদিকে আল্লাহ তা'আলা তাঁহার উপর ভরসাকারী তাঁহার প্রিয় বান্দাকে নারী চক্রান্ত হইতে রক্ষা করিবার জন্য এই কুদরতী ব্যবস্থা করিলেন। আযীয মিসর ও তাহার শুভান্যুধায়ীরা ইউসুফ (আ)-এর পবিত্রতা ও নিষ্কলুষতার সুস্পষ্ট আলামতসমূহ দেখিবার পরেও শহরময় এই ঘটনার চর্চা বন্ধ করিয়া সামাজিক মর্যাদা রক্ষা করিবার জন্য নির্দোষ ইউসুফ (আ)-কে কিছু দিনের জন্য কারাবাস সংগত মনে করিল। আল্লাহ তা'আলাও তাঁহার প্রিয় বান্দাকে কলুষতাপূর্ণ পরিবেশ হইতে সযত্নে দূরে সরাইয়া রাখিলেন (বিদায়া, ১খ, ২০৬)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 কারাগারে হযরত ইউসুফ (আ)

📄 কারাগারে হযরত ইউসুফ (আ)


পাপমুক্ত ও পবিত্র থাকিবার কারণে হযরত ইউসুফ (আ) চক্রান্তমূলকভাবে মিসরের কারাগারে প্রেরিত হন। জেলখানায় আগত অপর দুই বন্দীর স্বপ্নের ব্যাখ্যা প্রদান, যাহা পরবর্তীতে ইউসুফ (আ)-এর কারামুক্তির উপলক্ষ ও মিসরের ক্ষমতা সর্বোচ্চ মসনদে আরোহণের সূত্র হইয়াছিল, তাহার বিবরণ কুরআন মজীদে প্রদান করা হইয়াছে:
فَدَخَلَ مَعَهُ السِّجْنَ فَتَيْنِ قَالَ أَحَدُهُمَا إِنِّي أَرَانِي أَعْصِرُ خَمْرًا وَقَالَ الْآخَرُ إِنِّي أَرَانِي أَحْمِلُ فَوْقَ رَأْسِي خُبْرًا تَأْكُلُ الطَّيْرُ مِنْهُ نَبِّئْنَا بِتَأْوِيلِهِ إِنَّا نَرَاكَ مِنَ الْمُحْسِنِينَ.
"তাহার সহিত দুইজন যুবক কারাগারে প্রবেশ করিল। তাহাদের একজন বলিল, 'আমি স্বপ্নে দেখিলাম, আমি আংগুর নিংড়াইয়া রস বাহির করিতেছি', এবং অপরজন বলিল, 'আমি স্বপ্নে দেখিলাম আমি আমার মস্তকে রুটি বহন করিতেছি এবং পাখি উহা হইতে খাইতেছে', আমাদিগকে তুমি ইহার তাৎপর্য জানাইয়া দাও, আমরা তো তোমাকে সৎকর্মপরায়ণ দেখিতেছি" (১২: ৩৬)।
পবিত্র কুরআনের এই আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসীর গ্রন্থাদিতে বলা হইয়াছে যে, ইউসুফ (আ)-এর কারাগারে যাওয়ার সমসাময়িক কালে আরও দুই যুবক কারাগারে প্রবেশ করিয়াছিল। ইবন আব্বাস (রা), দাহ্হাক, মুজাহিদ, মুকাতিল হইতে উদ্ধৃত এবং কালবী প্রমুখের বর্ণনায় ইউসুফ (আ) কারারুদ্ধ হওয়ার বেশ কিছু দিন পরে (৫ বৎসর/৭ বৎসর-কুরতুবী, মাজহারী) দুই যুবকের কারারুদ্ধ হওয়ার কথা বলা হইয়াছে। তবে অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে যুবকদ্বয় ইউসুফ (আ)-এর নিকটবর্তী সময়ই কারারুদ্ধ হইয়াছিল। পবিত্র কুরআনের বর্ণনায় 'তাহার সংগে' শব্দ নিকটকবর্তী সময় হওয়ার ইংগিত বহন করে (মাজহারী, ৫খ, পৃ. ১৬১; মা'আরিফ, ৫খ, ৫৩, ৫৫)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00