📄 কূপ হইতে ইউসুফ (আ)-এর মুক্তি এবং দাসরূপে মিসর গমন
হযরত ইউসুফ (আ) তিন দিন কূপে অবস্থান করিলেন এবং আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হইতে বিপদমুক্তির ব্যবস্থার প্রতীক্ষায় থাকিলেন। এই তিন দিন য়াহুদা অন্য ভাইদের দৃষ্টি এড়াইয়া ইউসুফের জন্য খাদ্য ও পানীয় নিয়া আসিত এবং বালতি দ্বারা কূপের ভিতরে পৌছাইয়া দিত। ইবন ইসহাকের বর্ণনামতে, ভাইয়েরা ইউসুফের কি হয় এবং সে কি করে উহা দেখিবার জন্য দিনভর কূপের কাছে বসিয়া থাকিত (মুখতাসার ইবন কাছীর, ২খ, ২৪৪)। একটি বর্ণনামতে য়াহুদার দেওয়া পরামর্শ অনুসারে বড় ভাই রাওবীন (রূবেন) অন্য ভাইদের হইতে গোপন করিয়া চুপিসারে ইউসুফকে বাহির করিয়া পিতার কাছে পৌঁছাইবার পরিকল্পনা করিয়াছিল। কেননা সে ইউসুফকে হত্যা করিবার প্রস্তাবের শক্ত বিরোধিতা করিয়াছিল। এই কারণে সে মাঝেমধ্যে কূপের কাছে আসিয়া পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ সন্ধান করিত (কাসাসুল কুরআন, ১খ, ২৮৭)। আল্লাহ তা'আলার কুদরত ইউসুফ (আ)-কে কূপ থেকে বাহির করিবার জন্য এই ব্যবস্থা করিল যে, সিরিয়া (শাম) হইতে মিসরগামী একটি বাণিজ্যিক কাফেলা পথ ভুলিয়া এই কূপের কাছে পৌঁছিল এবং তাহাদের পানির প্রয়োজন দেখা দিলে কাছেই কূপ দেখিয়া পানি তুলিবার জন্য উহাতে বালতি ফেলিল। ভাইদের দেওয়া বালতি মনে করিয়া ইউসুফ (আ) সে বালতিতে উঠিয়া বসিলে কাফেলার লোক তাঁহাকে টানিয়া উপরে তুলিল। পবিত্র কুরআনের উল্লেখ:
وَجَاءَتْ سَيَّارَةٌ فَأَرْسَلُوا وَارِدَهُمْ فَادْلَى دَلْوَهُ قَالَ يُبُشرى هذا غُلْمٌ وَأَسَرُّوهُ بِضَاعَةً وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا يَعْمَلُونَ .
"একটি যাত্রীদল আসিল, উহারা উহাদের পানি সংগ্রাহককে প্রেরণ করিল। সে তাহার পানির ডোল নামাইয়া দিল। সে বলিয়া উঠিল, কী সুখবর! এ যে এক কিশোর! অতঃপর উহারা তাহাকে পণ্যরূপে লুকাইয়া রাখিল। উহারা যাহা করিতেছিল সে বিষয়ে আল্লাহ সবিশেষ অবহিত ছিলেন" (১২: ১৯)।
পৃথিবীর বুকে প্রতিনিয়ত এমন কতক ঘটনা ঘটে যাহার বাহ্যসূত্র আমাদের অবগতির নাগালে না থাকিবার কারণে আমরা সাধারণ মানুষ, সেগুলিকে অসম্ভব, অবিশ্বাস্য, অলৌকিক অথবা 'ঘটনা-চক্রে' ইত্যাদি নামে অভিহিত করিয়া থাকি এবং দার্শনিক ও গবেষকগণ উহাদের কার্যকরণের ব্যর্থ সন্ধানে প্রবৃত্ত হইয়া অহেতুক দিগভ্রান্ত হন। ইহার মূল কারণ আল্লাহ তা'আলার মহাবিশ্ব পরিচালনার রীতিনীতি সম্বন্ধে অজ্ঞতা। অন্যথায় অদৃশ্য লোকের মহাপরিচালন কেন্দ্র হইতে পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হওয়ার কারণে কোন ঘটনাই দুর্ঘটনা বা ঘটনাচক্র নয়, বরং সব ঘটনাই একটি সুনিপুণ ও সুবিন্যস্ত ধারাবাহিকতার যোগসূত্রে গ্রথিত। হযরত ইউসুফ (আ)-কে তাঁহার ভাইয়েরা সাধারণ চলাচলের সড়ক হইতে বিচ্ছিন্ন ও নির্জন অনাবাদী কূপে নিক্ষেপ করিয়াছিল। কেননা জনবসতির কাছাকাছি ও সদাব্যবহার্য কূপে নিক্ষেপ করিলে তাহাদের চক্রান্ত ধরা পড়িবার প্রবল আশংকা ছিল। অপরদিকে ইউসুফের (আ) জীবন্ত অবস্থায় পিতার কাছে ফিরিয়া যাওয়া তাহাদের মনঃপূত ছিল না। কেননা উহাতে পিতার কাছে তাহারা মারাত্মক অপরাধে অপরাধী সাব্যস্ত হইত। আবার সর্বশেষ পরিস্থিতি ও সিদ্ধান্ত অনুসারে তাহারা, বিশেষত য়াহুদা ও রূবেন প্রমুখ মৃত্যুও কামনা করিতেছিল না। ইউসুফ বাঁচিয়া থাকুক, তবে পিতার দৃষ্টি ও অবগতি হইতে দূরে কোথাও অবস্থান করুক, ইহার একমাত্র উপায় ছিল কোন দূরদেশে ইউসুফকে লইয়া যাওয়া। তৎকালে পৃথিবীতে দাসপ্রথা প্রচলিত ছিল এবং মানুষ পণ্যরূপে বেচাকেনা হইত। সুতরাং ইউসুফের ভাইয়েরাও দাসরূপে ইউসুফের বিদেশে পাচার হওয়ার কোন একটি ব্যবস্থা কামনা করিতেছিল। অপরদিকে আল্লাহ তা'আলা তাঁহার নবী ইয়াকূব (আ)-কে দুঃখ দান করিয়া পরীক্ষা করা এবং ইউসুফ (আ)-কে জাগতিক ও আত্মিক উন্নতির উচ্চতম শিখরে উন্নীত করিবার ব্যবস্থা করিতেছিলেন। ইউসুফ (আ)-এর কাছে ভবিষ্যৎ সান্ত্বনা বাণী ও 'এক সময় তুমি তাহাদিগকে তাহাদের কৃতকর্মের বিবরণ দিবে, অথচ তাহারা বুঝিতে পারিবে না' ঘোষণার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াও প্রয়োজন ছিল। সুতরাং কুদরত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সক্রিয় হইয়া উঠিল। শাম হইতে (মতান্তরে মাদয়ান হইতে) মিসরগামী বাণিজ্য কাফেলা পথ ভুলিয়া কান'আন অঞ্চলের অনাবাদ বনাঞ্চলে পৌঁছিল, যেখানের একটি কূপে ইউসুফ (আ) তাঁহার ভবিষ্যৎ উন্নতির বিদ্যাপীঠ মিসরে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করিতেছিলেন। প্রাচীন ঐতিহাসিকগণের বর্ণনামতে এ কাফেলাটি ছিল হেজাযী ও মাদয়ানবাসীদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বাণিজ্য কাফেলা। তাহাদের এই বর্ণনার সূত্র হইতেছে তাওরাতে উপস্থাপিত কাফেলার বিবরণ। তাওরাতে কাফেলাটিকে মাদয়ানী (مدین) অথবা মিদয়ানী (مدیان) বলা হইয়াছে। এই কারণে প্রাচীন ঐতিহাসিকদের কেহ কেহ কাফেলাটির গতিপথ মাদয়ান হইতে মিসর সাব্যস্ত করিয়াছেন। আর অধিকাংশ ঐতিহাসিক কাফেলাটি হেজাযী (ইসমাঈলী) ও মাদয়ানীদের সমন্বয়ে গঠিত হওয়ার তথ্য স্বীকার করিয়া উহার গতিপথ সিরিয়া (শাম) হইতে মিসর অভিমুখে বলিয়াছেন। কিন্তু পরবর্তী গবেষণায় ইহা স্থিররূপে সাব্যস্ত হইয়াছে যে, কাফেলাটি ছিল হেজাযী ইসমাঈলী বংশের এবং তাহাদিগকে মাদয়ানী বা মিদয়ানী বলিবার কারণ তাওরাতে বর্ণিত মাদয়ান ও আরবীয় ভূগোলের হেজাযকে দুইটি ভিন্ন স্থান ধারণা করা হইতে উদ্ভূত। ইবন কাছীর লিখিয়াছেন, মাদয়ান মা'আন অঞ্চলের একটি জনপদ, ইহার অবস্থান শামের শেষ প্রান্তে দূত (সম্প্রদায়ের) উপসাগর (মৃত সাগরের) নিকটবর্তী হিজাযের সন্নিহিত অঞ্চলে (বিদায়া, ১খ, ১৮৪, পৃ.)। সায়্যিদ সুলায়মান নদবীর গবেষণামতে বংশানুক্রমে ভৌগোলিক আধুনিক গবেষণা প্রমাণ করিয়াছে যে, তাওরাতে যে অঞ্চলকে মাদয়ান (مدین) বা মিদয়ান (مدیان) বলা হইয়াছে উহা মূলত সে অঞ্চল যাহা সা'ঈর (ساعين) বা সারাত (سراة) হইতে লৌহিত সাগরের উপকূল বরাবর শাম হইতে য়ামান পর্যন্ত বিস্তৃত। এই অঞ্চলটিকে হযরত মূসা (আ)-এর যুগ হইতে ইসরাঈলীরা মাদয়ান নামে এবং ইসমাঈলীরা পূর্ব হইতেই হিজায নামে অভিহিত করিয়া আসিয়াছে। এই কারণে একই অঞ্চলের জন্য এই দুইটি নাম ব্যবহৃত হইয়াছে (আরদুল কুরআন, ২খ, পৃ. ৪৭, ৪৯; হইতে কাসাসুল কুরআন ১খ, ২৮৭, টীকাসহ)।
মোটকথা, পথভোলা কাফেলাটির পানি সংগ্রহ, অবস্থান ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত অগ্রবর্তী দল তাহাদের পানির প্রয়োজনে কূপে বালতি ফেলিয়া পানির বদলে হযরত ইউসুফ (আ)-কে উত্তোলন করিল। ঐতিহাসিকগণ তাহাদের বর্ণনায় এই উত্তোলনকারী ব্যক্তির পরিচয় প্রদান করিয়াছেন। তবে তাহাদের বর্ণনায় তাহার নামের ব্যাপারে মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। ইবন কাছীর তাহার নাম সম্পর্কে ইবন 'আব্বাস (রা) হইতে ইবন ইসহাকের তথ্যের বরাতে লিখিয়াছেন, "যে ব্যক্তি ইউসুফ (আ)-কে মিসরে নিয়া বিক্রয় করিয়াছিল অর্থাৎ যে তাঁহাকে (কূপ হইতে তুলিয়া এবং ইউসুফ ভ্রাতৃবর্গের নিকট হইতে ক্রয় করিয়া) মিসরে রফতানী করিয়াছিল তাহার নাম মালিক ইবন যু'র ইবন নুওয়ায়ব ইন 'আফকা' (অথবা আন্কা) ইব্ন মিদয়ান ইব্ন ইবরাহীম (আ) (বিদায়া, ১খ, ২০২); ইবনুল আছীরের বর্ণনায় মালিক ইবন ওয়া'র (وعر) (আল-কামিল, ১খ, ১০৭(; কুরতুবীর বর্ণনায় মালিক ইবন দু'র (ذعر - دعر নয়) বলা হইয়াছে (আল-জামি' লিআহকামিল কুরআন, ৫খ, ১৫২)। মুফতী শফী (র) নামটি মালিক ইবন দু'বুর (دعبر যদি মুদ্রণ প্রমাদ না হয়) লিখিয়াছেন (মাআরিফুল কুরআন, ৫খ, ২৭)।
প্রথমে অপ্রত্যাশিত ঘটনা দেখিয়া এবং বালতিতে উপবিষ্ট বালকটির অপার্থিব সৌন্দর্য দেখিয়া উত্তোলনকারী লোকটি আত্মনিয়ন্ত্রণ হারাইয়া 'ওহে সুসংবাদ'! বলিয়া চিৎকার করিয়া উঠিয়াছিল। মতান্তরে 'ইয়া বুশরা' বলিয়া সে বুশরা নামে তাহার এক সাথীকে ডাক দিয়াছিল। পরক্ষণে ঘটনার বাস্তবতা অনুধাবন করিয়া এবং এই অতুলনীয় সুন্দর বালক মিসরের বাজারে অতি উচ্চ মূল্যে বিক্রয় হইবে, এই সত্য উপলব্ধি করিয়া কাফেলার অন্য লোকদেরকে ইহার মূল্যে ভাগ বসাইবার পথ রুদ্ধ করিবার জন্য বিষয়টি চাপিয়া যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। উত্তোলনকারীরা পারস্পরিক পরামর্শে স্থির করিল যে, তাহারা কাফেলার অন্য লোকদের কাছে বালকটির কথা আলোচনা করিবে না কিংবা তাহদিগকে বলিবে, আমরা উহাকে ক্রয় করিয়াছি অথবা তাহার মালিকরা তাহাকে বিক্রয় করিবার জন্য আমাদের সোপর্দ করিয়াছে। এই সিদ্ধান্তের পর তাহারা নিজেদের স্বাভাবিক তৎপরতায় লিপ্ত হইল। ওদিকে য়াহুদা নিত্যকার মত ইউসুফের জন্য খাবার আনিয়া উহা কূপের ভিতর নামাইয়া দিল। কিন্তু কেহ খাবার গ্রহণ করিতেছে না দেখিয়া সে ভয় পাইয়া গেল। কূপের অভ্যন্তরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া এবং ইউসুফকে ডাকিয়া সে তাঁহার সাড়া পাইল না। একটি বর্ণনামতে ইউসুফকে কূপ হইতে তুলিয়া গোপনে পিতার কাছে পৌঁছাইবার সুযোগ সন্ধানী রূবেন ইউসুফকে কূপে দেখিতে না পাইয়া চিন্তিত হইয়া পড়িল। য়াহুদা (অথবা রূবেন কিংবা দুইজনই) দৌড়াইয়া গিয়া অপর ভাইদের ঘটনা অবহিত করিল। ইউসুফ কোন উপায়ে পিতার কাছে পৌঁছিয়া যাইতে পারে এই আশংকায় তাহারা অবিলম্বে কূপের কাছে পৌঁছিল এবং আশপাশে ইউসুফের অস্তিত্ব সন্ধান করিতে লাগিল। কাছেই একটি কাফেলাকে অবস্থান করিতে দেখিয়া তাহাদের উপর ভাইদের সন্দেহ দৃষ্টি নিপতিত হইল এবং অনুসন্ধান ও তল্লাশীর পর ইউসুফকে তাহাদের নিকট পাওয়া গেল। ভাইয়েরা ইউসুফকে তাহাদের দুষ্ট প্রকৃতির গোলাম বলিয়া পরিচয় দিল এবং পলাতক গোলামকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য কাফেলার লোকদের অভিযুক্ত করিল। ইউসুফকে উত্তোলনকারী মালিক ও তাহার সংগীরা বিদেশ-বিভুঁইয়ে চুরির দায় হইতে রক্ষা পাওয়ার জন্য পলায়নে অভ্যস্ত গোলামটি ক্রয় করিবার প্রস্তাব করিল। ভাইয়েরা উহাকে তাহাদের স্বার্থ সিদ্ধির সহজ উপায় দেখিতে পাইয়া উহাতে সম্মতি প্রকাশ করিল। একটি বর্ণনামতে ভাইয়েরাই প্রথমে অগ্রবর্তী হইয়া পলাতক গোলামটি বিক্রয়ের প্রস্তাব করিয়াছিল। অপর একটি দুর্বল বর্ণনামতে ইউসুফের ভাইয়েরা কূপের কাছে একটি বাণিজ্যিক কাফেলাকে অবস্থান করিতে দেখিতে পাইল এবং তাহাদের সহিত আলাপ করিয়া জানিতে পারিল যে, তাহারা পেস্তা, দেবদারু ও মসলাপাতি নিয়া মিসর যাইতেছে। তখন ভাইয়েরা পরামর্শ করিয়া নিজেরাই ইউসুফকে কূপ হইতে তুলিয়া কাফেলার নিকট বিক্রয় করিল। কিন্তু তাওরাত ও কুরআনের বর্ণনা ধারায় এ বিবরণটি সমর্থিত হয় না। এই সমুদয় ঘটনা ও আলোচনায় ইউসুফ (আ) সম্পূর্ণ নীরবতা অবলম্বন করিয়া রহিলেন। কেননা তিনি বুঝিতেছিলেন যে, কোন প্রকার উচ্চবাচ্য করিলে এবং আত্মপরিচয় প্রকাশ করিলে গোলামীর অপবাদ ও দুঃখ হইতে মুক্তি পাওয়া গেলেও ভাইদের হাত হইতে নিস্তার পাওয়া ও পিতার কাছে নিরাপদে পৌঁছিবার সম্ভাবনা সুদূরপরাহত।
সর্বোপরি তিনি কূপ হইতে মুক্তির ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলার অভাবনীয় কুদরতের হাত প্রত্যক্ষ করিয়াছিলেন। সুতরাং গোলাম হইয়া মিসরে নীত হওয়ার মধ্যেও তিনি কুদরতের অপার রহস্য প্রত্যক্ষ করিবার ইংগিত অনুভব করিয়া সম্পূর্ণ নিরুদ্বিগ্ন চিত্তে আল্লাহ্র ফয়সালার কাছে আত্মসমর্পণ করিয়াছিলেন। আল্লাহ তা'আলাও ইউসুফ, তাঁহার ভ্রাতৃবর্গ ও কাফেলার লোকদের দ্বারা তাঁহার কুদরতী পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করাইয়া নিতেছিলেন। অন্যথায় ভাইদের অসৎ উদ্দেশ্য নস্যাত করিয়া দেওয়া তো আল্লাহ্ জন্য সহজ ছিল।
বিক্রয় প্রস্তাবে পারস্পরিক সম্মতির পর মূল্য নিয়া আলোচনা হইল এবং ক্রেতাদের বিস্ময় উদ্রেক করিয়া তাহাদের ধারণার চেয়ে অনেক কম মূল্যে বিক্রেতারা তাহাদের গোলাম হস্তান্তরে রাজী হইল। কুরআনের ভাষায়:
وَشَرَوْهُ بِثَمَن بَخْسٍ دَرَاهِمَ مَعْدُودَةٍ وَكَانُوا فِيهِ مِنَ الزَّاهِدِينَ .
"এবং উহারা তাহাকে বিক্রয় করিল স্বল্প মূল্যে, মাত্র কয়েক দিরহামের বিনিময়ে, উহারা ছিল তাহার ব্যাপারে নির্লোভ" (১২: ২০)।
অর্থাৎ ইউসুফের ভাইয়েরা তাহাকে বিক্রয় করিয়া দিল এবং কাফেলার লোকেরা তাহাকে ক্রয় করিল অতি নগণ্য মল্যে, গণনা করিয়া হিসাব করা হয় এমন কয়েকটি দিরহামের বিনিময়ে। মূলত তাহারা উহাতে নির্লোভ ছিল। তাফসীরকারগণ লিখিয়াছেন, তৎকালীন আরব বাণিজ্য জগতে প্রচলিত নিয়ম অনুসারের পণ্যমূল উল্লেখযোগ্য ও অধিক (চল্লিশোর্ধ) হইলে উহা ওজনের মাধ্যমে এবং অল্প ও নগণ্য হইলে গণনা করিয়া পরিশোধ করা হইত। পবিত্র কুরআন مَعْدُودَة (গণনা আওতাভুক্ত) বলিয়া অর্থের সংখ্যা নির্দিষ্ট না করিয়া উহা পরিমাণে অল্প হওয়ার প্রতি ইংগিত করিয়াছে। ইকরিমা ও ইবন ইসহাক এই পরিমাণ চল্লিশ দিরহাম বলিয়াছেন, মুজাহিদ বাইশ দিরহাম বলিয়াছেন। ইবন মাস'উদ, ইবন আব্বাস, নাওফ বাকালী, সুদ্দী, কাতাদা ও আতিয়্যা প্রমুখ বলিয়াছেন, বিশ দিরহামে বিক্রয় করিয়া দশ ভাইয়ের প্রত্যেকে দুই দিরহাম করিয়া ভাগ করিয়া নিয়াছিল (দ্র. বিদায়া, তাফসীরে ইবন কাছীর, মাজহারী, কুরতুবী ও মা'আরিফ)। মূল্য কম হওয়ার কারণ ছিল দ্বিপক্ষীয়। বিক্রেতারা জানিত যে, ইউসুফ গোলাম নয়, তাহাদেরই ভাই, তাহাকে কোনরূপে দেশান্তরিত করিতে পারিলেই তাহাদের বিদ্বেষ প্রশমিত হয় এবং পিতার কাছে ধরা পড়িয়া তাহার রোষাণলে পতিত হওয়া হইত রক্ষা পাওয়া যায়। ক্রেতারা দেখিল, পলায়নে অভ্যস্ত গোলামের জন্য অধিক মূল্য দেওয়ার প্রয়োজন নাই। ইহা ছাড়া এই গোলামের ভবিষ্যত কত উজ্জ্বল হইবে তাহা অনুধাবন করিবার সাধ্য তাহাদের ছিল না।
অতঃপর বাণিজ্য কাফেলা তাহাদের গন্তব্যস্থল মিসরের উদ্দেশ্যে প্রস্থান করিল এবং মিসর পৌঁছিয়া ইউসুফ (আ)-কে গোলামরূপে বিক্রয় করিল। কাফেলার মিসর গমন ও ইউসুফ (আ)-কে বিক্রয় করা সংক্রান্ত কাহিনীর বিশদ বিবরণ গুরুত্বের নিরিখে অপ্রয়োজনীয় অংশ হওয়ার কারণে পবিত্র কুরআন উহার উল্লেখে নীরব। তবে তাওরাত, ইতিহাস ও তাফসীরকারদের বর্ণনা হইতে জানা যায় যে, ইউসুফের ভাইয়েরা তাহাকে বিক্রয় করিবার পর কাফেলার প্রস্থান করা পর্যন্ত সে স্থানে অবস্থান করিল। কেননা তাহারা এই ব্যাপারে শংকিত ছিল যে, কাফেলার লোকেরা অজ্ঞাত বিপদের আশংকায় ইউসুফ (আ)-কে সেখানে কিংবা পথিমধ্যে কোথাও রাখিয়া যাইবে এবং ইউসুফ (আ) কোন উপায়ে পিতার কাছে ফিরিয়া আসিয়া ভাইদের সকল ষড়যন্ত্র ফাঁস করিয়া দিবে। সুতরাং কাফেলা চলিতে আরম্ভ করিলে ভাইয়েরাও কিছুদূর পর্যন্ত তাহাদের সাথে থাকিল এবং ইউসুফের পালাইবার অভ্যাসের কথা বলিয়া তাঁহাকে বাঁধিয়া রাখিবার উপদেশ দিল। এই মহামানবের মর্যাদা সম্পর্কে অজ্ঞ লোকেরা উপদেশ মানিয়া লইল এবং উক্ত অবস্থায়ই তাঁহাকে মিসর পর্যন্ত লইয়া গেল। দীর্ঘপথ পরিক্রমার পর তাহারা মিসরের বাজারে তাহাদের বিক্রয় পণ্যসমূহ উপস্থাপন করিল।
ইউসুফ (আ) সর্বাবস্থায় আল্লাহ্ ফয়সালায় রাজী থাকিয়া তাঁহার কুদরতের ধারা প্রত্যক্ষ করিতে থাকিলেন। ইউসুফ (আ)-এর জীবনের এই হৃদয়বিদারক মুহূর্তগুলির ছবি দৃষ্টির সামনে উদ্ভাসিত করিলে দেখা যাইবে যে, অতি অল্প বয়স্ক এক বালক, শিশু বয়সে মাতৃহারা, পিতার অপরিসীম স্নেহ-মমতার ক্রোড় হইতে বিচ্ছিন্ন, ভাইদের প্রতিহিংসার শিকার হইয়া বাৎসল্যপূর্ণ স্বাধীন জীবন হইতে বঞ্চিত হইয়া এক অপরাধী গোলামরূপে অজানার উদ্দেশে চলিয়াছেন। তিনি জানেন না, কোথায় তাঁহাকে নেওয়া হইতেছে, আর কোন দিন স্বাধীনতার স্বাদ ভোগ করিবেন কিনা, স্নেহময় পিতার সাথে আর কখনও সাক্ষাত ঘটিবে কিনা? কিন্তু তিনি সম্পূর্ণ নির্বিকার, মুখে নাই কোন বিমর্ষতা, উচ্চারণে নাই কোন অভিযোগ, নাই কোন প্রকার কান্নাকাটি বা অস্থিরতার প্রকাশ। বিপদে ধৈর্য ও ভাগ্যে প্রসন্নতার মূর্ত প্রতীক হইয়া তিনি চলিয়াছেন গোলামরূপে মিসরের বাজারে বিক্রয় হওয়ার জন্য।
ইউসুফ (আ)-এর সৌন্দর্য ও প্রতিভাদীপ্ত চেহারা খরিদ্দারদের প্রবল ভাবে আকর্ষণ করিল। একটি বর্ণনামতে (মাযহারী, ৫খ, ১৫১) চল্লিশ স্বর্ণমুদ্রা (দীনার) ও দুই প্রস্থ বস্ত্র ইত্যাদির বিনিময় ইউসুফ (আ)-কে বিক্রয় করা হইল। ওয়াহব ইবন মুনাব্বিহের সূত্র ও কুরতুবীর বর্ণনামতে ইউসুফ (আ)-কে বিক্রয়ের ঘোষণা দেওয়া হইলে খরিদ্দারদের ভিড় জমিয়া গেল এবং তাঁহার মূল্য বৃদ্ধিতে তাহারা প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হইল। আল্লাহ তা'আলা তাঁহার মর্ষী বাস্তবায়নের কুদরতী ব্যবস্থাপনায় মিসরের সরকারের অর্থ, খাদ্য ও বাণিজ্যের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান মন্ত্রীকে দাস ক্রয়-বিক্রয়ের বাজারে পৌঁছাইয়া দিলেন। বিক্রয় প্রস্তাবিত গোলামরূপে ইউসুফ (আ) প্রধান মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করিলেন এবং তিনিও মূল্যবৃদ্ধির প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করিলেন। সর্বশেষে ইউসুফের মূল্য স্থির হইল তাঁহার ওযনের সমপরিমাণ স্বর্ণ, অনুরূপ ও সমপরিমাণ মিশাক এবং সমপরিমাণ রেশমীবস্ত্র। ইউসুফের খরিদ্দার হওয়ার সৌভাগ্য লিপিবদ্ধ ছিল প্রধান মন্ত্রীর তথা আযীয মিসরের ললাটে এবং এত উচু মূল্য পরিশোধ করা তাহারই পক্ষে সহজসাধ্য ছিল। তিনি স্থিরীকৃত মূল্য পরিশোধ করিয়া ইউসুফ (আ)-কে ক্রয় করিলেন। বর্ণনামতে এই সময় তের বৎসর বয়স্ক ইউসুফ (আ)-এর ওযন হইয়াছিল চার শত রিত্ল বা চার শত পাউন্ডের অর্থাৎ প্রায় ১৫.০০০ তোলার সমপরিমাণ (মাজহারী, ৫খ, ১৫১; মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ, ৩১)।
📄 আযীয মিসরের পরিচয়
ইউসুফ (আ)-এর ক্রেতাকে পবিত্র কুরআন আল-আযীয (العزیز) পরিচয়ে উল্লেখ করিয়াছে। মূলত ইহা ছিল তৎকালীন বিশ্বে সমুন্নত মিসরের রাজ-দরবারে সম্রাটের সর্বোচ্চ পদাধিকারীর পদবী। বাইবেলে তাহার নাম ফুতিফার (Potiphar) বলা হইয়াছে এবং মুসলিম ঐতিহাসিকগণ তাহার নাম কিতফীর (قطفير) অথবা ইতফীর (اطفیر) ইবন রাওহীব বলিয়াছেন। তিনি সম্রাটের জ্ঞাতি সম্পর্কীয় ছিলেন। তখন মিসরে 'আমালিকা (عمالقه) সম্প্রদায়ের হিকসুস (Hgksoos) বংশীয়রা রাজত্ব করিতেছিল এবং ক্ষমতাসীন সম্রাটের নাম ছিল রায়্যান ইবনুল ওয়ালীদ (মতান্তরে রয়্যান ইবন উসায়দ)।
প্রধান মন্ত্রী কিতফীর ইউসুফ (আ)-কে ক্রয় করিয়া তাহার বাসভবনে নিয়া গেলেন। ইতোমধ্যে ইউসুফ (আ)-এর চেহারা ও আচার-আচরণ তাহাকে মুগ্ধ করিয়াছিল। তিনি বাড়ি পৌঁছিয়া ইউসুফ (আ)-কে স্ত্রীর যিম্মায় সোপর্দ করিলেন এবং সাধারণ গোলামদের তুলনায় বিশেষ মর্যাদার সহিত ইউসুফ (আ)-এর থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ প্রদান করিলেন। কুরআনের বর্ণনায়: وَقَالَ الَّذِي اشْتَرَاهُ مِنْ مِصْرَ لِامْرَأَتِهِ أَكْرِمِي مَثْوَاهُ عَسَى أَنْ يَنْفَعَنَا أَوْ نَتَّخِذَهُ وَلَدًا وَكَذَلِكَ مَكَّنَّا لِيُوسُفَ فِي الْأَرْضِ وَلِنُعَلِّمَهُ مِنْ تَأْوِيلِ الأَحَادِيثِ وَاللهُ غَالِبٌ عَلَى أَمْرِهِ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ .
"মিসরের যে ব্যক্তি তাহাকে ক্রয় করিয়াছিল সে তাহার স্ত্রীকে বলিল, ইহার থাকিবার সম্মানজনক ব্যবস্থা কর, সম্ভবত সে আমাদের উপকারে আসিবে অথবা আমরা ইহাকে পুত্ররূপেও গ্রহণ করিতে পারি। এইভাবে আমি ইউসুফকে সেই দেশে প্রতিষ্ঠিত করিলাম তাহাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষা দিবার জন্য। আল্লাহ তাঁহার কার্য সম্পাদনে অপ্রতিহত; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ ইহা অবগত নহে” (১২: ২১)।
ইতিহাসের বর্ণনামতে আযীয দম্পতি নিঃসন্তান হওয়ার কারণে 'আমরা তাহাকে আমাদের পুত্ররূপে গ্রহণ করিবার ঘোষণা প্রদান করিব'। কেননা এমন সুবোধ ছেলেকেই পুত্ররূপে গ্রহণ করা যায় এবং যেরূপে আমি তাহাকে হত্যা ষড়যন্ত্র হইতে রক্ষা করিয়া এবং অন্ধকার কূপ হইতে মুক্তির ব্যবস্থা করিয়া তাহার প্রতি আমার বিশেষ অনুগ্রহ বর্ষণ করিয়াছিলাম, তদ্রূপ ঐ (মিসর) দেশেও তাহাকে সম্মান ও প্রতিপত্তির অধিকারী করিলাম এবং ইহা এই উদ্দেশ্যে যে, তাহার জন্য বাহ্যিক ও আত্মিক নি'মাতসমূহ পরিপূর্ণ করিব, তাহাকে রাষ্ট্র পরিচালনা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার যোগ্যতা দান করিব এবং তাহাকে সব ধরনের বক্তব্য ও স্বপ্নের যথার্থ ব্যাখ্যা প্রদানের ইল্ম দান করিব। আল্লাহ তাঁহার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সক্ষম ও পরাক্রমশালী। কেহই তাহা প্রতিরোধ করিতে কিংবা বাধাগ্রস্ত করিতে পারে না। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ ঈমান ও বিশ্বাসের দৃঢ়তা না থাকিবার কারণে এই তত্ত্ব অবগত নহে। তাহারা বাহ্য কার্যকারণের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখে এবং উহাকেই চূড়ান্ত কার্যকর মনে করে। কার্যকারণ ও উপায়-উপকরণের স্রষ্টা ও নিয়ন্ত্রণকর্তার প্রতি তাহাদের দৃষ্টি ধাবিত হয় না এবং তাঁহার সূক্ষ্ম ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা তাহারা আত্মস্থ করিতে পারে না। যেমন আলোচ্য ক্ষেত্রে তিনি ইউসুফ ভ্রাতৃবর্গের সকল চক্রান্ত ভণ্ডুল করিয়া দিয়া তাহার ইচ্ছাকেই সম্পন্ন করিবার ব্যবস্থা করিলেন এবং ইউসুফের বাহ্য দাসত্বকে তাঁহার উর্ধ্বারোহণ ও মিসরের রাজ-কর্তৃত্ব লাভের উপায় করিলেন। এবং বাহ্য দাসত্বের সময়ও তাঁহাকে নামেমাত্র দাস রাখিয়া স্বাধীনেরও অধিক মর্যাদার জীবন দান করিলেন। বস্তুত আযীয পরিবারে অবস্থানের ব্যবস্থা করিয়া তাঁহার ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করিবার পথ সুগম করিলেন। প্রধান মন্ত্রীর সহঅবস্থানে থাকিয়া তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার সূক্ষ্ম কলাকৌশল রপ্ত করিতে লাগিলেন। তাওরাত ও ইতিহাসের বর্ণনামতে কিছু দিনের ব্যবধানে প্রধান মন্ত্রী তাহার ধনসম্পদ ও পারিবারিক যাবতীয় বিষয় ইউসুফ (আ)-এর দায়িত্বে ন্যস্ত করিয়া তাঁহাকে সামগ্রিক বিষয়ের তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত করিলেন (কাসাসুল কুরআন, ১খ, ২৮৯)।
কাহারও মুখমণ্ডল ও অবয়ব দেখিয়া তাহার গুণাগুণ ও সুপ্ত যোগ্যতা বুঝিতে পারা একটি বিশেষ ধরনের অন্তর্দৃষ্টি ও সূক্ষ্ম জ্ঞান। আল্লাহ তা'আলা আযীযে মিসরকে এই অন্তর্দৃষ্টি ও অবয়ব নিরীক্ষার জ্ঞান দান করিয়াছিলেন। সুতরাং তিনি ইউসুফ (আ)-কে দেখিবামাত্র তাঁহার মুখমণ্ডলে তাঁহার গৌরবোজ্জ্বল ভবিষ্যত লিপি পাঠ করিয়াছিলেন এবং স্ত্রী (যুলায়খা)-এর কাছে উহার প্রতি ইংগিত ব্যক্ত করিয়াছিলেন। ইবন ইসহাক আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ (রা)-এর বাণী উদ্ধৃত করিয়া লিখিয়াছেন, তিনজন মনীষী তাহাদের গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও সূক্ষ্ম দূরদর্শিতার স্বাক্ষর রাখিয়াছেন। একঃ মিসরের আযীয, যিনি ইউসুফ (আ)-এর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ প্রত্যক্ষ করিয়া স্ত্রীকে বলিয়াছিলেন, তাঁহাকে মর্যাদার অবস্থানে রাখিবে। দুইঃ হযরত শু'আয়ব (আ)-এর কন্যা, যিনি স্বীয় পিতার নিকট হযরত মূসা (আ) সম্পর্কে মন্তব্য করিয়াছিলেন (হত্যার দায় হইতে রক্ষা পাওয়ার জন্য মিসর হইতে মাদয়ানে পলায়ন করিবার পরে সেখানে শু'আয়ব (আ)-এর উটগুলিকে পানি খাওয়াইবার কাজে তাঁহার কন্যাদ্বয়কে সহায়তা প্রদানের ফলশ্রুতিতে শু'আয়ব কন্যা কর্তৃক মূসা (আ)-কে পিতার নিকট ডাকিয়া নেওয়ার পরে : يَا أَبَتِ اسْتَأْجِرْهُ أَنَّ خَيْرَ مَنِ اسْتَأْجَرْتَ الْقَوِيُّ الْأَمِينُ “আব্বাজান! তাঁহাকে মজদুর নিযুক্ত করুন। কেননা সবল বিশ্বাসী ব্যক্তিই মজদুর নিযুক্ত হওয়ার জন্য সর্বাধিক উত্তম")। তিনঃ হযরত আবু বাক্স সিদ্দীক (রা), যিনি মুসলিম জাহানের পরবর্তী খলীফারূপে হযরত উমার (রা)-কে মনোনীত করিয়া ইসলামের চিরন্তন সোনালী ইতিহাস রচনার শুভ উদ্বোধন করিয়াছিলেন। (মুখতাসার ইবন কাছীর, ২খ, ২৪৫; মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ, ৩২)। অতঃপর ইউসুফ (আ) মুক্তদাসরূপে অত্যন্ত মর্যাদা ও সম্মানের সহিত আযীয মিসরের বাসভবনে জীবন যাপন করিতে লাগিলেন এবং আযীযের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও পারিবারিক সার্বিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি রাজকীয় রীতিকৌশল শিক্ষা করিতে থাকলেন।
📄 হযরত ইউসুফ (আ)-এর নবুওয়াত লাভ
আযীয মিসরের বাসভবনে অবস্থানকালে শক্তি ও বুদ্ধির পূর্ণতা প্রাপ্তির বয়ঃসন্ধিক্ষণে আল্লাহ তা'আলা ইউসুফ (আ)-কে নবুওয়াতের মর্যাদায় ভূষিত করিলেন। কুরআনের বর্ণনায়: وَلَمَّا بَلَغَ أَشُدَّهُ آتَيْنَه عِلْمًا وَحُكْمًا وَكَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ "সে যখন পূর্ণ যৌবনে উপনীত হইল তখন আমি তাহাকে হিকমত ও জ্ঞান দান করিলাম এবং এইভাবেই আমি সৎকর্মপরায়ণদিগকে পুরস্কৃত করি" (১২: ২২)।
অর্থাৎ যখন ইউসুফ (আ) শক্তি, বুদ্ধি ও যৌবনের পূর্ণতায় উপনীত হইল তখন আমি তাহাকে হিকমত ও জ্ঞান দান করিলাম। পুণ্যশীলদের অনুরূপ প্রতিদান দেওয়াই আমার বিধান। মুফাসসিরগণ হিকমত ও ইল্ম-এর অর্থ নবুওয়াত বলিয়া অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন। ব্যাপক অর্থে হিকমত দ্বারা সঠিক উক্তি করিবার প্রতিভা এবং ইলম দ্বারা দীনের যথার্থ উপলব্ধি বুঝানো হয়। স্বপ্নের ব্যাখ্যাও উহার অন্তর্ভুক্ত। আবার বিষয়বস্তুর অবগতিকে ইলম এবং তদনুসারে কর্ম সম্পাদনকে হিকমত বলা হয়। মোটকথা আয়াতে ইউসুফ (আ)-কে নবুওয়াত মর্যাদায় ভূষিত করিবার ঘোষণা দেওয়া হইয়াছে। তবে যৌবনের এই পূর্ণতা প্রাপ্তির বয়স সম্পর্কে মুফাসসিরগণের মতভেদ রহিয়াছে। ইমাম মালিক (র)-এর ব্যাখ্যায় বলিয়াছেন, উহা বয়ঃপ্রাপ্তি। সাঈদ ইবন জুবায়রের মতে আঠার বৎসর, দাহ্হাকের মতে বিশ বৎসর, ইক্রিমার মতে পঁচিশ বৎসর, সুদ্দীর মতে ত্রিশ বৎসর। ইবন আব্বাস (রা), মুজাহিদ ও কাতাদা প্রমুখের মতে তেত্রিশ বৎসর এবং ইবন আব্বাসের একটি বর্ণনায় তেত্রিশোর্ধ বৎসর। হাসান বাসরী (র)-এর মতে চল্লিশ বৎসর। ইবন কাছীর পবিত্র কুরআনের "وَلَمَّا بَلَغَ أَشُدَّهُ وَبَلَغَ أَرْبَعِينَ سَنَةً ", "যখন সে তাহার পূর্ণ যৌবনে উপনীত হইল এবং চল্লিশ বৎসর বয়সে পদার্পণ করিল" (৪৬: ১৫) আয়াতের ইংগিতে শেষোক্ত অভিমতকে অধিক গ্রহণযোগ্য বলিয়াছেন। অধিকাংশ মুফাসসির ও মনীষী নবুওয়াত প্রাপ্তির সাধারণ বয়স চল্লিশ বৎসরের প্রতি লক্ষ্য করিয়া আলোচ্য ক্ষেত্রেও চল্লিশ বৎসরের অভিমতটি গ্রহণ করিয়াছেন। তবে এ আয়াত দ্বারা এ বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত হইয়া যায় যে, কূপে নিক্ষিপ্ত হওয়ার পূর্বে বা পরে ইউসুফ (আ)-এর কাছে আগত 'ওয়াহী' নবুওয়াতের ওয়াহী ছিল না, উহা ছিল মূসা (আ)-এর মাতা ও মারয়াম (আ)-এর নিকট আগত সাধারণ ঐশীবাণী (মুখতাসার ইবন কাছীর, ২খ, ২৪৫; বিদায়া, ১খ, ২০৩; মাজহারী, ৫খ, ১৫১; মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ, ৩২-৩৩)। ইউসুফ (আ)-এর নবুওয়াতের ঘোষণার সহিত আল্লাহ তা'আলা ইহাও অবহিত করিলেন যে, উহা ছিল তাহার পূণ্যাত্মা ও জীবনধারার সর্বক্ষেত্রে সৎকর্মশীল হওয়ার প্রতিদান এবং এই প্রতিদান ব্যবস্থা একাকী ইউসুফ (আ)-এর জন্য সীমিত নহে, বরং যে কোন সৎকর্মশীলদের জন্য এই উচ্চ মর্যাদার জীবনব্যবস্থা উন্মুক্ত। ইহা ছাড়া ইহাতে ইউসুফ (আ)-এর নামে পরবর্তী সময়ে উত্থাপিত অপবাদের ব্যাপারেও এই মর্মে অগ্রিম সংবাদ দেওয়া হইল যে, উত্থাপিত অপবাদ সম্পূর্ণ মিথ্যা হইবে। কেননা আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হইতে হিকমত প্রদত্ত ও নবুওয়াত মর্যাদায় ভূষিত কোন ব্যক্তির দ্বারা কখনও কোন অশ্লীল কর্ম সংঘটিত হইতে পারে না।
📄 আযীয মিসরের স্ত্রী ও ইউসুফ (আ)-এর কঠিন পরীক্ষা
মহাপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া মহামর্যাদা লাভের সোপান হইয়া থাকে। ইউসুফ (আ)-এর সমগ্র জীবনে ইহারই বাস্তব প্রতিফলন ঘটিয়াছে। শৈশবের মহাসংকট তাঁহাকে কান'আনের অনুন্নত জীবনধারা হইতে সমকালীন বিশ্বের উন্নততম জীবনের ছোঁয়ায় পৌঁছাইয়াছিল এবং দাসরূপে আসিয়া তিনি আযীয মিসরের প্রাচুর্যময় রাজপ্রাসাদের 'মালিকের' অবস্থানে উন্নীত হইলেন। কিন্তু ইহাই তাঁহার দ্বিতীয় ও কঠিনতম পরীক্ষার সূত্র হইল। সৌন্দর্যে আল্লাহ তা'আলার সেরা সৃষ্টি ইউসুফ (আ) তখন পূর্ণ যৌবনে উপনীত হইয়াছেন : সুঠাম ও সুদর্শন দেহ কান্তি, জ্যোতির্ময় মুখাবয়ব, চন্দ্র-সূর্যকে হার মানানো সর্ববিধ রূপের সমাহার, শিষ্টাচার, লজ্জাশীলতা ও যাবতীয় চারিত্রিক উৎকর্ষের মূর্ত প্রতীক। এক কথায় রূপ ও গুণের পূর্ণাঙ্গ সমাহার যেন সোনায় সোহাগা। অপরদিকে আযীয মিসরের স্ত্রী পূর্ণ যৌবনা, রাজপরিবারের বিদুষী কন্যা (এবং বর্ণিত তথ্য অনুসারে স্বামী আযীযের পৌরুষ শক্তির দুর্বলতা, দিবারাত্রের অফুরন্ত অবসরে প্রতি মুহূর্তের সহঅবস্থান, পরিবেশ-পরিস্থিতির এই বাস্তবতা আযীয মিসরের স্ত্রীর হৃদয়কে আলোড়িত করিয়া তাহাকে আত্মনিয়ন্ত্রণহারা করিয়া দিল এবং মোমের আলোর প্রতি পতঙ্গের আসক্তির ন্যায় তাহাকে আসক্ত করিল।
আযীয মিসরের স্ত্রীর নাম ছিল রা'ঈল বিনত রা'আঈল 'রা'আবীল (راعيل بنت رعابيل) /(। ইহা ইবন ইসহাকের অভিমত। ছা'লাবী ইবন হিশামের বরাতে তাহার নাম ফাক্সা বিনত য়ানূস (فکسا بنت ينوس ) বলিয়াছেন। ঐতিহাসিকগণ তাহার জনপ্রচলিত নাম যুলায়খা হওয়ার কথা বলিয়াছেন। মূলত ইহা ইয়াহুদী গ্রন্থ তালমূদে বর্ণিত তাহার নাম ...... হইতে প্রচার লাভ করিয়াছে। ইবন কাছীরের মতে যুলায়খা তাহার উপাধি বা উপনাম (ডাকনাম) হওয়া অধিক সংগত (বাংলা পুঁথি সাহিত্যে 'ইউসুফ যুলায়খা' উল্লেখ্য)। ইবন ইসহাকের মতে যুলায়খা ছিল সমকালীন ক্ষমতাসীন সম্রাট রায়্যান ইবনুল ওয়ালীদের ভাগ্নী অথবা ভ্রাতুষ্পুত্রী (বিদায়া, ১খ, ২০০, ২০৬)।
মোটকথা, সুদর্শন ইউসুফের প্রতি প্রেম উন্মাদনায় উন্মাদিনী যুলায়খা ইউসুফকে পদস্খলিত করিবার জন্য আকার-ইংগিতে তাহার প্রতি প্রেম নিবেদন করিতে লাগিল এবং বিভিন্ন প্রকার প্রচেষ্টা ও ফন্দি-ফিকির দ্বারা তাঁহাকে আকৃষ্ট করিবার প্রয়াস চালাইল। কিন্তু এইসব প্রচেষ্টা ইউসুফের পূতপবিত্র হৃদয়ে কোনই রেখাপাত করিল না। ইউসুফ যেন অন্য জগতের মানুষ। সুন্দরী যুবতী নারীর দেহ-বল্লরীর আকর্ষণ, তাহার উপর্যুপরি প্রেম নিবেদন এবং নিরাপদ অখণ্ড সুযোগ, এ সবই যেন ইউসুফের চিন্তা ও উপলব্ধির বহির্ভূত বিষয়, যুলায়খার দৃষ্টিতে যাহা অস্বাভাবিক ও বিস্ময়কর। ইউসুফের মন-মেজাজে তাহা যেন কিছুই নহে। অবশেষে যুলায়খার প্রেম অস্থিরতা তাহার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙ্গিয়া ফেলিল এবং সহজ পন্থায় স্বার্থ সিদ্ধির কোন উপায় নাই দেখিয়া সে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়া সুযোগের অপেক্ষা করিতে লাগিল। একদিন আযীযের অনুপস্থিতিতে নিরাপদ সুযোগ পাইয়া ঘরের সকল দরজা বন্ধ করিয়া দিয়া ইউসুফকে যুলায়খার ব্যক্তিগত একান্ত কামরায় আটকাইয়া ফেলিল এবং নিজে পূর্ণাঙ্গ সাজসজ্জা করিয়া ইউসুফকে প্রচণ্ডরূপে আহবান করিল। ইউসুফ (আ) যেন এই মুহূর্তে তাহার মনীবের স্ত্রীর এত দিনের বিশেষ ভাষা ও আচরণের মর্মার্থ বুঝিতে পরিয়া এবং বাহ্যত নিজের নিরুপায় অবস্থা প্রত্যক্ষ করিয়া চমকাইয়া উঠিলেন। কিন্তু নিষ্কলুষ ও পবিত্র ইবরাহীমী রক্তধারার ধারক ও বংশধারার নবুওয়াতের বাহক মহাবিপদ সংকেতে বিচলিত বা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইলেন না। মহাপাপের জঘন্যতা ও ভয়াবহ পরিণতি এবং অন্ধকার কূপ হইতে পরিত্রাণ ও গোলামী হইতে রাজকীয় অবস্থানে সুদৃঢ় অবস্থানদাতা মহাশক্তিমান ও অসীম দয়াবান আল্লাহ্র অস্তিত্ব ও স্মরণ ইউসুফ (আ)-এর দৃষ্টি ও মানসপটে সদাভাস্বর ছিল। তিনি যুলায়খার কুপ্রস্তাব দৃঢ়বাক্যে ও আন্তরিক ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করিলেন এবং ইহাতে আল্লাহ্র আশ্রয় ও শরণ লইয়া যুলায়খাকেও এই কুকর্ম হইতে নিবৃত্ত থাকিবার জন্য মর্মস্পর্শী উপদেশ দান করিলেন। কুরআনের বর্ণনায়: وَرَاوَدَتْهُ الَّتِي هُوَ فِي بَيْتِهَا عَنْ نَفْسِهِ وَعَلَّقَتِ الأَبْوَابَ وَقَالَتْ هَيْتَ لَكَ قَالَ مَعَادَ اللَّهِ إِنَّهُ رَبِّي أَحْسَنَ مَثْوَايَ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الظَّالِمُونَ .
"সে যে স্ত্রীলোকের গৃহে ছিল সে তাহা হইতে অসৎকর্ম কামনা করিল এবং দরজাগুলি বন্ধ করিয়া দিল ও বলিল, 'আইস'। সে বলিল, 'আমি আল্লাহ্র শরণ লইতেছি, তিনি আমার প্রভু; তিনি আমার থাকিবার সুন্দর ব্যবস্থা করিয়াছেন। নিশ্চয়ই সীমালংঘনকারিগণ সফলকাম হয় না" (১২: ২৩)
কোন কোন বর্ণনায় পরপর সাতটি দরজা তালাবদ্ধ করিয়া উহার চাবিগুচ্ছ যুলায়খা নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখিল এবং তাহার সাধ্যমত সাজগোছ করিয়া আকুল হইয়া ইউসুফকে আহবান করিল। সে বলিল, আইস! তোমাকেই বলিতেছি....... (আমার বাসনা পূরণ করিয়া আমাকে কৃতার্থ কর)। ইউসুফ বলিল, 'নাউযু বিল্লাহ! হে আল্লাহ রক্ষা কর! ইহা অন্যায়, ইহা অসম্ভব। ইহা কী করিয়া হইতে পারে! তিনি তো আমার মালিক মনিব, তিনি তো আমার জন্য সুখকর জীবন ধারণের ব্যবস্থা করিয়াছেন। এই ইহসান ও অনুগ্রহের বিপরীতে উহা মহা অন্যায়, বস্তুত অন্যায়কারী জুলুমবাজরা সফলতা অর্জন করিতে পারে না'। কুরআনী বর্ণনা ধারায় 'যুলায়খা' বা 'আযীযের স্ত্রী' না বলিয়া 'যে নারীর ঘরে' সে বসবাস করিত' বলিয়া উপস্থাপন দ্বারা এক জঘন্য কর্মে উদ্বুদ্ধকারিণীর নাম উল্লেখ হইতে বিরত থাকিবার সাথে সাথে আসল লক্ষ্য হইতেছে পরিস্থিতির বাস্তব ও স্পষ্ট রূপটি তুলিয়া ধরিয়া ইউসুফ চরিত্রের অনাবিলতাকে অতি স্বচ্ছ ও উজ্জ্বলরূপে উপস্থাপন করা। কেননা যে ঘরে চব্বিশ ঘণ্টার অবস্থান সেখানে সুযোগ-সুবিধার আনুকূল্য এবং তদুপরি খোদ কর্ত্রীর শুধু মৌন সম্মতি ও বাধাহীনতাই নহে, বরং তাহার আকুল-সকাতর আবেদন, এহেন পরিস্থিতিতে সংযম ও আত্মসম্বরণ হযরত ইউসুফ (আ)-এর পূতপবিত্রতা ও নিষ্কলুষতাকে দিবালোকের ন্যায় প্রস্ফুটিত করিয়া তোলে।
এখানে লক্ষণীয় যে, ইউসুফ (আ) মহাবিপদ হইতে পরিত্রাণ ও মহাপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য শুধু নিজের সুদৃঢ় ইচ্ছা ও প্রচণ্ড মনোবলের প্রতি আস্থাশীল হইয়া এবং উহার উপর ভরসা করিয়াই ক্ষান্ত হইলেন না, বরং সর্বাগ্রে তিনি নবীসুলভ পন্থায় সকল শক্তি ও ইচ্ছার মালিক মহান আল্লাহ্র শরণাপন্ন হইলেন। কেননা আল্লাহ্ আশ্রয় কাহারও সহযোগী হইলে কোন কিছুই তাহাকে সঠিক পথ হইতে বিচ্যুত করিতে পারে না। অতঃপর তিনি নবীসুলভ পন্থায় যুলায়খার অন্তরেও আল্লাহ্ ভয় এবং স্বামীর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা না করিবার মনোভাব জাগ্রত করিবার জন্য প্রজ্ঞাসুলভ উপদেশ বাণী উচ্চারণ করিলেন এবং অন্যায় ও গর্হিত আচরণকারীদের অশুভ পরিণতি স্মরণ করাইয়া দিয়া কোন এক সময় তাহার এই কুকীতি ফাঁস হইয়া যাওয়া এবং তখন চরমভাবে নিন্দিত ও ধিকৃত হওয়ার সতর্কবাণী উচ্চারণ করিলেন। তিনি যুলায়খাকে বুঝাইয়া দিলেন আমি যদি আযীযের অল্পদিনের অনুগ্রহ ও সদাচরণের প্রতি লক্ষ্য করিয়া তাহার অধিকারে হস্তক্ষেপকে অন্যায় ও অপরাধ মনে করি তবে তোমার জন্য তো তাহার প্রতি বিশ্বাসঘাতকাকে জঘন্যতম ও অমার্জনীয় অপরাধ মনে করা এবং আসন্ন পরিণতির প্রতি লক্ষ্য করিয়া কুমতলব হইতে নিবৃত্ত হওয়া একান্ত অপরিহার্য। এই প্রসঙ্গে সুদ্দী ও ইবন ইসহাক প্রমুখ মুফাসসিরগণ উল্লেখ করিয়াছেন যে, নির্জন ঘরে আবদ্ধ করিয়া যুলায়খা ইউসুফ (আ)-কে সম্মোহিত করিবার জন্য তাঁহার রূপ-গুণের প্রশংসা শুরু করিয়া দিল। যুলায়খা বলিল, কত সুন্দর তোমার কেশরাজি! ইউসুফ (আ) তাৎক্ষণিক জবাব দিলেন, আমার মৃত্যুর পরে সর্বাগ্রে এই চুলই আমার দেহ হইতে বিচ্ছিন্ন হইবে। যুলায়খা বলিল, এত সুন্দর তোমার নয়নযুগল! ইউসুফ (আ) বলিলেন, মৃত্যুর পর এই চোখ দু'টিই বিগলিত হইবে। যুলায়খা বলিল, কী সুন্দর তোমার মুখমণ্ডল! ইউসুফ (আ) বলিলেন, এ সবই তো মাটির খাদ্য, যাহা দিয়া মাটি তাহার বুভুক্ষা নির্বাপিত করিবে। মোটকথা যুলায়খা একের পর এক চক্রান্তের জাল ফেলিতে লাগিল। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা ইউসুফ (আ)-এর অন্তরে আখিরাতের চিন্তা এত প্রবল করিয়া দিলেন যে, রূপ ও যৌবনের সকল আস্বাদন তাঁহার নিকট বিস্বাদ প্রতিভাত হইল। পবিত্র কুরআনের বর্ণনায় :
وَلَقَدْ هَمَّتْ بِهِ وَهَمْ بِهَا لَوْلا أَنْ رَأَى بُرْهَانَ رَبِّهِ كَذَلِكَ لِنَصْرِفَ عَنْهُ السُّوءَ وَالْفَحْشَاءَ إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا المُخْلَصِينَ.
"সেই নারী সে পুরুষকে ভোগ করিতে প্রচণ্ডরূপে উদ্যত হইল এবং সেই রমণী তো তাহার প্রতি আসক্ত হইয়াছিল এবং সেও উহার প্রতি আসক্ত হইয়া পড়িত যদি না সে তাহার প্রতিপালকের নিদর্শন প্রত্যক্ষ করিত। আমি তাহাকে মন্দ কর্ম ও অশ্লীলতা হইতে বিরত রাখিবার জন্য এইভাবে নিদর্শন দেখাইয়াছিলাম। সে তো ছিল আমার বিশুদ্ধ চিত্ত বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত” (১২ : ২৪)।
এখানে উল্লেখ্য যে, ইউসুফ (আ)-এর 'আকৃষ্ট হওয়ার' ব্যাপারটি ছিল একটি স্বভাবজাত মানবিক ব্যাপার। এই স্বভাব-চাহিদাকে নিয়ন্ত্রণ না করিয়া উহাকে কার্যকর করিবার প্রতি ধাবিত হওয়া এবং বাস্তবে রূপায়িত করাই আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ। তিনি সেই অপরাধ করেন নাই, বরং স্বীয় ইচ্ছাকে নিয়ন্ত্রণ করিয়া যুলায়খার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেন।
প্রতিপালকের 'বুরহান' (নিদর্শন) কি ছিল ক্ষেত্রে মুফাসসিরগণ বহু সম্ভাব্য বিষয় উল্লেখ করিয়াছেন। কোন কোন মুফাসসির বলিয়াছেন, নির্জন কক্ষে ইউসুফ (আ)-এর দৃষ্টির সম্মুখে তাঁহার মনিব আযীয মিসরের (মতান্তরে বাদশাহের) আকৃতি ভাসিয়া উঠিল! কাতাদাসহ অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে ইউসুফ (রা) তাঁহার পিতা ইয়াকুব (আ)-এর প্রতিকৃতি দেখিতে পাইলেন। তিনি তাঁহাকে বলিতেছিলেন, ইউসুফ! তোমার নাম তো নবীগণের তালিকায় লিপিবদ্ধ রহিয়াছে, এমতাবস্থায় তুমি কি নির্বোধদের ন্যায় কর্ম করিবে? হাসান বসরী, সাঈদ ইবন জুবায়র, মুজাহিদ, ইকরিমা ও দাহ্হাক প্রমুখ বলিয়াছেন, ঘরের ছাদ উন্মুক্ত হইয়া গেলে ইউসুফ (আ) পিতা ইয়াকূব (আ)-কে দেখিলেন যে, তিনি দাঁতে আঙ্গুল কামড়াইয়া রহিয়াছেন। মুহাম্মাদ ইবন সীরীনের বরাতে ইবন জারীর, ইবন আবু হাতিম ও আবুশ শায়খ বলিয়াছেন, ইউসুফ (আ) দাঁতে আঙ্গুল কামড়ানো অবস্থায় পিতার প্রতিচ্ছবি দেখিলেন, যিনি বলিতেছিলেন, ইউসুফ ইবন ইয়াকূব, ইবন ইসহাক ইবন ইবরাহীম, যিনি খলীলুর রহমান, তোমার নাম রহিয়াছে নবী তালিকায়, নির্বোধের কর্ম কি তোমাকে শোভা পায়! ইবন আব্বাস (রা)-এর বরাতে সাঈদ ইবন জুবায়র বলিয়াছেন, ইয়াকূব (আ)-এর প্রতিচ্ছবি ইউসুফ (আ)-এর বক্ষে চাপড় দিলে তাহার মনের সকল উদ্বেলতা বিদূরীত হইল। ইবন আব্বাস (রা) হইতে মুজাহিদের আহরিত বর্ণনায় ইউসুফ (আ) জিবরীল (আ)-কে দাঁতে আঙ্গুল কামড়ানো অবস্থায় দেখিলেন। তিনি বলিতেছিলেন, আপনি তো আল্লাহ তা'আলার নিকটে নবীগণের অন্তর্ভুক্ত।... অপর বর্ণনায় জিবরীল (আ) তাঁহার পাখা দ্বারা ইউসুফ (আ)-কে স্পর্শ করিলে তাঁহার মনের আকুলতা থামিয়া গেল।
'বুরহান'-এর ব্যাখ্যায় ইবন আব্বাস (রা) হইতে 'আতিয়্যার বর্ণনা মতে ইউসুফ (আ) বাদশাহ্ প্রতিকৃতি দেখিয়াছিলেন। ইবন জারীর কাসিম ইবন আবু নায্যাহ হইতে আহরণ করিয়াছেন, নেপথ্য হইতে আওয়ায আসিল, 'হে ইয়াকূব তনয়! সেই পাখির ন্যায় হইও না, যাহার উড়িবার পাখা ছিল এবং অশ্লীল কর্ম করিবার পর সে পাখাশূন্য হইয়া গেল!' এই আওয়াযের প্রতি তাঁহার মনোযোগ আকৃষ্ট না হওয়ায় কিংবা উহার সূত্র অনুধাবন করিতে না পারিয়া তিনি উপরের দিকে মাথা তুলিলে দাঁতে আঙ্গুল কামড়ানো অবস্থায় ইয়াকূব (আ)-এর মুখমণ্ডল দেখিতে পাইলেন। সুদ্দী বলিয়াছেন, নেপথ্য হইতে আওয়ায আসিল, ইউসুফ! তাহার (যুলায়খার) বাসনা পূর্ণ করিবে? তোমার দৃষ্টান্ত তাহার বাসনা পূরণ না করিলে শূন্য নীলিমায় ভাসমান পাখির ন্যায়, যে কাহারও করতলগত হয় না। আর তাহার বাসনা পূর্ণ করিলে তোমার দৃষ্টান্ত আকাশের সে পাখির ন্যায় যে মৃত্যুবরণ করিয়া ভূমিতে পতিত হয় এবং কোন কিছু হইতে আত্মরক্ষা করিতে পারে না এবং নিষ্কলুষ অবস্থায় তোমার দৃষ্টান্ত সেই দুর্দান্ত ষাঁড়ের ন্যায় যাহাকে কাবু করা যায় না, আর তুমি কলুষিত হইলে তোমার অবস্থা হইবে সেই মৃত ষাড়ের লাশের ন্যায় যাহার নাসাছিদ্রপথে পিপীলিকা আনাগোনা করে, কিন্তু লাশ তাহাকে কিছুই বলিতে পারে না (মাজহারী, ৫খ, ১৫৪, ১৫৫)। ইবন জারীর মুহাম্মাদ ইবন কা'ব আল-কুরাজী হইতে বর্ণনা করিয়াছেন, ইউসুফ (আ) নির্জন কক্ষের ছাদের দিকে দৃষ্টি তুলিলে দেখিলেন, কক্ষের দেয়ালে লেখা রহিয়াছে:
لَا تَقْرَبُوا الزِّنَا إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا অর্থাৎ "ব্যভিচার বৃত্তির ধারে-কাছেও ঘেঁষিও না, উহা চরম অশ্লীলতা ও জঘন্য পন্থা।" মতান্তরে তিনি আল্লাহ তাআলার কালামের তিনটি আয়াত দেখিতে পাইলেন, (মাজহারী, ৫খ, ১৫৫)।
)1( إِنَّ عَلَيْكُمْ لَحَافِظِينَ “অবশ্যই তোমাদের উপর নিযুক্ত রহিয়াছে (তত্ত্বাবধায়ক ফেরেশতা"; وَمَا تَكُونُ فِي شَأْنٍ وَلَا تَعْمَلُونَ مِنْ عَمَلٍ إِلَّا كُنَّا عَلَيْكُمْ شُهُودًا إِذْ تُفِيضُونَ فِيهِ وَمَا يَعْزُبُ عَنْ (2) رَبِّكَ مِنْ مِثْقَالِ ذَرَّةٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ وَلَا أَصْغَرَ مِنْ ذَلِكَ وَلَا أَكْبَرَ إِلَّا فِي كِتَابٍ مُّبِينٍ.
"তুমি যে অবস্থায়ই অবস্থান কর না কেন এবং তোমরা যে কোন কর্মই কর না কেন, আমি কিন্তু তোমাদিগকে প্রত্যক্ষ করিতে থাকি, যখন তোমরা উহাতে নিমগ্ন হও। তোমার প্রতিপালকের (দৃষ্টি ও অবগতি) হইতে আসমান ও যমীনের মধ্যে বিন্দু পরিমাণ কিংবা উহা হইতে ক্ষুদ্রতর কিংবা বৃহত্তর কোন কিছু লুকায়িত থাকে না। কিন্তু (তাহার রেকর্ড সুরক্ষিত) এক স্পষ্ট মহাগ্রন্থে।"
)أَفَمَنْ هُوَ قَائِمٌ عَلَى كُلِّ نَفْسٍ بِمَا كَسَبَتْ (٥ "যে সত্তা প্রতিটি প্রাণের পাশে- তাহার উপার্জন সম্পর্কে সদা দণ্ডায়মান (তত্ত্বাবধায়ক); তিনি আর কথিত শরীকরা কি সমতুল্য?"
আলী ইবন হুসায়ন ইবন আলী (রা)-এর মতে নিদর্শনটি ছিল কক্ষে বিদ্যমান একটি মূর্তিকে যুলায়খা কর্তৃক বস্ত্রাবৃত করা। ইউসুফ (আ) যুলায়খাকে ইহার কারণ জিজ্ঞাসা করিলে সে বলিল, পপকর্মে রত অবস্থায় সে আমাকে দেখিবে ইহাতে আমি লজ্জাবোধ করিতেছি। তখন ইউসুফ (আ) বলিলেন, যে কিছু শুনে না, দেখে না এবং বুঝে না তুমি তাহাকে লজ্জা পাইতেছ। সুতরাং সর্বশ্রোতা সর্বদ্রষ্টা প্রতিপালককে আমার লজ্জা করাই অধিক সমীচীন। এই কথা বলিয়াই তিনি সম্মুখে দৌড় দিলেন (মাজহারী, ৫খ, ১৫৫)। জাফর সাদিক বলিয়াছেন, 'বুরহান' ছিল তাঁহার অন্তরদেশে গচ্ছিত নবুওয়াত, যাহা মহান মহিয়ান আল্লাহর ক্রোধ সৃষ্টিকারী বিষয়ের অন্তরায়। মাওলানা হিফজুর রহমান এ প্রসঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর বলিয়াছেন, ইয়াকূব (আ)-এর প্রতিচ্ছবি ও তাঁহার সতর্কীকরণ কিংবা ফেরেশতার আগমন অথবা আযীযের স্ত্রী কর্তৃক মূর্তিকে আবৃত করা হইতে শিক্ষা গ্রহণ ইত্যাদিকে 'নিদর্শন' সাব্যস্ত করিবার বিপরীতে পবিত্র কুরআনের বর্ণনাধারা বিন্যাস শৈলীর স্পষ্ট ইংগিতে প্রাপ্ত ব্যাখ্যাই প্রতিপালকের নিদর্শন-এর সর্বোত্তম ব্যাখ্যা। উহা হইল (১) আল্লাহর প্রতি ঈমানের অন্তর্নিহিত উপলব্ধি যাহা ইউসুফ (আ)-এর مَعَاذَ اللهِ উক্তি হইতে প্রতিভাত হয় এবং অনুগ্রহ প্রবণ মালিক ও মনিবের প্রতি প্রকৃত কৃতজ্ঞাবোধ এবং আস্থা ও বিশ্বাস রক্ষা করিবার ব্রত, যাহা رَبِّي أَحْسَنَ مَثْوَىَ দ্বারা প্রতীয়মান হয় (কাসাসুল কুরআন, ১খ, ২৯২, ২৯৩)。
ইবন কাছীর তাঁহার পূর্বসূরী ইমাম ইবন জারীর তাবারীর মন্তব্য উদ্ধৃত করিয়াছেন। তিনি উপরোল্লিখিত সকল অভিমত উদ্ধৃত করিয়া অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন এবং উত্তরসুরি সকল বিদ্বান ও গবেষকের মনঃপূত অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন, সকল মনীষীর সকল বক্তব্য ও অভিমত সম্ভাবনার স্তরে রাখিয়া উহাদের কোন একটি নির্ণীত ও অকাট্য স্থির না করিয়া পবিত্র কুরআনের উন্মুক্ত বর্ণনাকে উন্মুক্ত রাখা এবং যথেষ্ট সাব্যস্ত করাই উত্তম। অর্থাৎ ইউসুফ (আ) এমন কিছু দেখিয়াছিলেন এবং নবুওয়াতী অন্তরে উপলব্ধি করিয়াছিলেন যাহা তাঁহার উদ্বেলতা ও অস্থিরতাকে সম্পূর্ণ শান্ত করিয়া দিয়াছিল (তাফসীরে ইবন কাছীর, মুখতাসার, ২খ, ২৪৬; তাফসীরে মাজহারী, ৫খ, ১৫৪, ১৫৫; মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ, ৩৭, ৩৮; কাসাসুল কুরআন, ১খ, ২৯২, ২৯৩)। পবিত্র কুরআন তাহার অলংকারপূর্ণ বর্ণনা ধারায় ইউসুফ (আ)-এর নিষ্কলুষ ও পাপমুক্ত থাকিবার প্রতি লক্ষণীয় ইংগিত প্রদান করিয়াছে। আয়াতের শেষাংশে বলা হইয়াছে, 'তাহার হইতে' মন্দ ও অশ্লীলতা দূর করিবার জন্য ..... অর্থাৎ 'তাহাকে' মন্দ ও অশ্লীল কর্ম হইতে দূরে রাখিবার জন্য لِنَصْرْفَهُ عَنْ না বলিয়া 'তাহার হইতে' মন্দ ও অশ্লীলতাকে দূরে রাখিবার জন্য لِنَصْرْفَ عَنْهُ বলা হইয়াছে। ইহা দ্বারা স্পষ্ট ইংগিত করা হইয়াছে যে, ইউসুফ (আ) তো তাঁহার নবীসুলভ চারিত্রিক পবিত্রতা ও দৃঢ়তার কারণে নিজেই মন্দ ও অশ্লীলতা (সগীরা ও কাবীরা সর্ববিধ পাপ-পংকিলতা) হইতে দূরে অবস্থান করিতেছিলেন; কিন্তু পাপ যেন তাঁহাকে ঘেরাও করিয়া ফেলিয়াছিল; তাহার সংকল্প ও দৃঢ়তার কারণে আমার সাহায্য তাঁহার প্রতি অগ্রসর হইল এবং আমি পাপের পাতানো জাল ছিঁড়িয়া দিলাম। এ আয়াতে 'মন্দ' (سُوْء) ও অশ্লীলতা (فَحْشَاً) সংযোজন দ্বারা বুঝা যায় যে, ইউসুফ (আ) এই ঘটনায় নিম্নতম কোন (সগীরা) গুনাহ দ্বারাও কলুষিত হন নাই। আর আয়াতের শেষ শব্দ مُخْلِصِينَ দ্বারাও তাঁহার পাপমুক্ত থাকার প্রতি ইংগিত ব্যক্ত হইয়াছে। কেননা ইহার অর্থ হইল, ইউসুফ (আ) আল্লাহ তা'আলার সেই বিশিষ্ট বান্দাদের তালিকাভুক্ত যাহাদিগকে তিনি তাঁহার নবুওয়াত-রিসালাত তথা মানবজাতির সংস্কার ও পথ প্রদর্শনের জন্য নির্বাচিত করিয়াছেন। সুতরাং এই শ্রেণীর নির্বাচিতগণকে সর্বপ্রকার কলুষতা হইতে সুরক্ষা করিবার জন্য বিশেষ পাহারার ব্যবস্থা রাখা হয়। বিষয়টি পবিত্র কুরআনে উদ্ধৃত শয়তানের ভাষ্য দ্বারাও সাব্যস্ত হইয়াছে। সমগ্র মানবজাতিকে জাহান্নামে পৌছাইবার আজীবন সাধনায় রত থাকিবার অহমিকাপূর্ণ ঘোষণা দেওয়ার পাশাপাশি বিশিষ্টগণের ব্যাপারে তাহার ক্ষমতা না থাকিবার স্বীকারোক্তি করিয়া সে বলিয়াছে:
فَبِعِزَّتِكَ لَأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ إِلَّا عِبَادَكَ مِنْهُمُ الْمُخْلَصِينَ.
"আপনার ইজ্জতের কসম! আমি অবশ্যই তাহাদের সকলকে পথহারা করিব; তাহাদের মধ্য হইতে আপনার বিশুদ্ধচিত্ত বান্দাগণ ব্যতীত”।
সুতরাং পবিত্র কুরআনের বর্ণনাধারা বিভিন্ন আংগিকে ইউসুফ (আ)-এর পাপমুক্ত ও পূতপবিত্র থাকিবার ঘোষণা দিয়াছে। পরবর্তী ঘটনা সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের ভাষ্য নিম্নরূপঃ
واسْتَبَقَا البَابَ وَقَدَّتْ قَمِيصَهُ مِنْ دُبُرٍ وَالْفَيَا سَيِّدَهَا لَدَى الْبَابِ قَالَتْ مَا جَزَاءُ مَنْ أَرَادَ بِأَهْلِكَ سُوْء إِلا أَنْ يُسْجَنَ أَوْ عَذَابٌ أَلِيمٌ. قَالَ هِيَ رَا وَدَتْنِي عَنْ نَفْسِي وَشَهِدَ شَاهِدٌ مِّنْ أَهْلِهَا إِنْ كَانَ قَمِيصُهُ قُدَّ مِنْ قَبْلِ فَصَدَقَتْ وَهُوَ مِنَ الْكَاذِبِينَ وَإِنْ كَانَ قَمِيصُهُ قُدَّ مِنْ دُبُرٍ فَكَذَبَتْ وَهُوَ مِنَ الصَّادِقِينَ .
"উহারা উভয়ে দৌড়াইয়া দরজার দিকে গেল এবং স্ত্রীলোকটি পিছন দিক হইতে তাহার জামা ছিঁড়িয়া ফেলিল। তাহারা স্ত্রীলোকটির স্বামীকে দরজার নিকট পাইল। স্ত্রীলোকটি বলিল, 'যে তোমার পরিবারের সহিত কুকর্ম কামনা করে তাহার জন্য কারাগারে প্রেরণ অথবা অন্য কোন মর্মন্তুদ শান্তি ব্যতীত আর কি দণ্ড হইতে পারে? ইউসুফ বলিল, সে-ই আমা হইতে অসৎকর্ম কামনা করিয়াছিল। স্ত্রীলোকটির পরিবারের একজন সাক্ষী সাক্ষ্য দিল, যদি উহার জামার সম্মুখ দিক ছিন্ন করা হইয়া থাকে তবে স্ত্রীলোকটি সত্য কথা বলিয়াছে এবং পুরুষটি মিথ্যাবাদী। কিন্তু উহার জামা যদি পিছন দিক হইতে ছিন্ন করা হইয়া থাকে তবে স্ত্রীলোকটি মিথ্যা বলিয়াছে এবং পুরুষটি সত্যবাদী" (১২: ২৫-২৭)।
ঐতিহাসিকগণ ও মুফাসসিরগণ লিখিয়াছেন, ইউসুফ (আ)-এর উপদেশ যুলায়খার পাপ-প্রলুব্ধ অন্তরে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করিল না এবং সে যথারীতি তাহার কামনা সিদ্ধির ফিকিরে লাগিয়া থাকিল।
ইউসুফ (আ) অনন্যোপায় হইয়া পাপ হইতে সাধ্য পরিমাণ আত্মরক্ষার করিবার সংকল্প করিয়া এবং আল্লাহর অপরিসীম রহমতের উপর ভরসা করিয়া দরজার দিকে দৌড় শুরু করিলেন এবং তাঁহাকে ধরিয়া ফেলিবার জন্য যুলায়খাও তাঁহার পিছনে দৌড় দিল। ঐতিহাসিক বর্ণনামতে আল্লাহ তা'আলার কুদরতে বদ্ধ দরজাসমূহের কপাট আপনাআপনি খুলিয়া যাইতে লাগিল এবং ইউসুফ (আ) দৌড়াইয়া ভবনের সদর দরজার বাহিরে পৌছিলেন। যুলায়খা পিছন হইতে ইউসুফ (আ)-এর জামায় থাবা মারিয়া তাঁহাকে থামাইবার চেষ্টা করিল। কিন্তু ইহাতে ইউসুফ (আ)-এর সংকল্প দমিত হইল না এবং তাঁহার জামার পিছন দিক ছিঁড়িয়া গেল। কিন্তু ইউসুফ (আ) উহার পরোয়া করিলেন না। যুলায়খাও দৌড়ের গতিতে ইউসুফের পিছনে পিছনে দরজার বাহিরে পৌঁছিল। কিন্তু কী আশ্চর্য! এই অসময় গৃহকর্তা দরজার সামনে দণ্ডায়মান! যুলায়খা চমকাইয়া গেল এবং মুহূর্তে নিজেকে সামলাইয়া নিজেকে সতী ও নিষ্পাপ এবং প্রতিপক্ষকে সম্পূর্ণ দোষী সাব্যস্ত করিবার জন্য গম্ভীর ভাষায় বলিয়া উঠিল, 'গৃহকর্তার অনুপস্থিতির সুযোগে যে লোক (গোলাম হইয়া এবং আশকারা পাইয়া এতদূর স্পর্ধা দেখায় যে) মালিকের স্ত্রীর সহিত মন্দ কর্ম করিবার বাসনা পোষণ করে, অত্যন্ত কঠোর ও শিক্ষনীয় শাস্তিই তাহার প্রাপ্য। জেলখানায় অন্তরীণ করা কিংবা দৈহিক মর্মন্তুদ শাস্তি তাহাকে দেওয়া উচিত। হযরত ইউসুফ (আ) সম্ভবত নবীসুলভ উদারতা ও আভিজাত্যের কারণে আযীযের স্ত্রীকে অভিযুক্ত করিবার ব্যাপারে নীরবতা অবলম্বন করিলেন। কিন্তু যুলায়খার কূটকৌশলের কারণে পরিস্থিতি পাল্টাইয়া গেল। নির্দোষ ইউসুফ (আ) নিজেকে অভিযুক্ত দেখিয়া অনন্যোপায় হইয়া সত্য প্রকাশে বাধ্য হইলেন। তিনি বলিলেন, (যুলায়খার বক্তব্য সত্য নহে, বরং) সে-ই তাহার কামনা সিদ্ধির জন্য আমাকে ফুসলাইতেছিল এবং রুদ্ধদ্বার কক্ষে আমাকে আটকাইয়াছিল। আমি আত্মরক্ষা ও মনিবের প্রতি কৃতজ্ঞতার দাবি পূরণে দৌড়াইয়া বাহিরে আসিয়াছি।
এই অপ্রত্যাশিত ও নাযুক বিষয়ে কে সত্যবাদী তাহা নির্ণয় করিয়া সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া ও প্রকৃত অপরাধীকে দোষী সাব্যস্ত করা ছিল আযীয মিসরের জন্য অত্যন্ত জটিল। সাক্ষ্য ও স্বাভাবিক প্রমাণ দ্বারা সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার কোন বাহ্য ব্যবস্থা ছিল না। এইরূপ নাযুক মুহূর্তেই আল্লাহ তা'আলার কুদরতী ব্যবস্থা তাঁহার মনোনীত ও নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দাদের মান রক্ষার জন্য অগ্রবর্তী হইয়া থাকে। আলোচ্য ক্ষেত্রে সেই কুদরতী ব্যবস্থা ছিল এই যে, আল্লাহ তা'আলা অলৌকিকভাবে একজন সাক্ষী দাঁড় করাইয়া দিলেন এবং তাহার মুখ হইতে এমন একটি মীমাংসাসূচক বক্তব্য প্রকাশ করাইলেন যাহার আলোকে সত্য-মিথ্যা নির্ণয় সূর্যালোকের ন্যায় স্পষ্ট হইয়া গেল এবং অপরাধীর পক্ষে উহা খণ্ডন করিবার কোন প্রকার অবকাশ রহিল না। সাক্ষী বলিল, ইউসুফের ছেঁড়া জামা দেখিয়া অপরাধী নির্ণয়ের সূত্র বাহির করা যাইতে পারে। যদি জামাটি সম্মুখ দিকে ছিঁড়িয়া থাকে তবে নারীর অভিযোগ সত্য হইবে এবং পুরুষের অপরাধ প্রমাণিত হইবে। কেননা জামা সম্মুখে ছেঁড়া হওয়া এই কথার প্রমাণ বহন করে যে, পুরুষ নারীকে ভোগ করিতে চাহিয়াছিল, নারী আত্মরক্ষার জন্য পুরুষকে ধাক্কা দিয়াছে এবং বুকে আঘাত হানিবার কারণে জামা ছিঁড়িয়া গিয়াছে। আর যদি জামার পিছন দিক ছিঁড়িয়া থাকে তবে নারীর অভিযোগ মিথ্যা হইবে এবং পুরুষ নির্দোষ সাব্যস্ত হইবে। কেননা তখন বুঝা যাইবে যে, পুরুষ পাপমুক্ত থাকিবার জন্য তাহার সম্মুখ দিকে দৌড় দিয়াছে এবং নারী তাহাকে ধরিয়া রাখিবার জন্য পিছন দিক হইতে তাহার জামা আঁকড়াইয়া ধরিবার কারণে জামার পিছন দিক ছিঁড়িয়া গিয়াছে।
এই সাক্ষীর পরিচয় নির্ধারণে মুফাসসিরগণের বক্তব্যে কিছুটা মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। পবিত্র কুরআনের ভাষ্যে এতটুকু ইংগিত পাওয়া যায় যে, সাক্ষী যুলায়খার কোন আপনজন (شَاهِدٌ مِّنْ أَهْلِهَا) ছিল। ইবন আব্বাস (রা) হইতে একটি বর্ণনামতে সে ছিল বাদশাহর ঘনিষ্ঠজনদের অন্যতম এবং শ্মশ্রুধারী এক পুরুষ। কাহারও মতে সে ছিল যুলায়খার স্বামী আযীয মিসরের আত্মীয়। অন্যদের মতে যুলায়খার নিকটাত্মীয় এবং তাহার চাচাত অথবা মামাত ভাই। ইবন আব্বাস (রা), ইকরিমা, মুজাহিদ, হাসান, কাতাদা, সুদ্দী, মুহাম্মদ ইবন ইসহাক ও যায়দ ইবন আসলাম (রা) প্রমুখ হইতে উদ্ধৃত বর্ণনায় তাহাকে বয়স্ক পুরুষ এবং যুলায়খা অথবা তাহার স্বামীর নিকটাত্মীয় কিংবা বাদশাহর ঘনিষ্ঠ লোক বলা হইয়াছে। একটি বর্ণনায় ইউসুফ ও যুলায়খার দৌড়াইয়া বাহির হওয়ার সময়টিতে আযীয মিসর 'কিতফীর' যুলায়খার এক চাচাত ভাইয়ের সহিত কথা বলিতেছিল এবং সে-ই আযীযকে মীমাংসার এই সূত্র প্রদর্শন করিয়াছিল। অধিকাংশ বিজ্ঞ মুফাসসিরের মতে এই সাক্ষী ছিল যুলায়খার ঘরে বসবাসকারী তাহার কোন আত্মীয় (অথবা গৃহপরিচারিকা)-এর দুগ্ধপোষ্য সন্তান, যে দোলনায় অবস্থান করিয়া নিষ্পাপ শিশু চোখে যুলায়খা ও ইউসুফের কার্যাবলী নিরীক্ষণ করিতেছিল এবং দুগ্ধপোষ্য শিশু হওয়ার কারণে স্বভাবতই যুলায়খা তাহাকে গোপন করিবার কোন প্রয়োজন অনুভব করে নাই। সাঈদ ইবন জুবায়র ও দাহ্হাক তাহার শিশু হওয়ার অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন। হাসান বসরী হইতেও তাহার এই বাড়িতে অবস্থানরত শিশু হওয়ার কথা বর্ণিত হইয়াছে। ইবন আব্বাস (রা) হইতে আওফীর আহরিত বর্ণনায়ও তাহাকে শিশু বলা হইয়াছে। ইবন জারীর ও ইবন কাছীর প্রমুখ মুফাসসির সাক্ষীর শিশু হওয়ার অভিমতকে অধিক প্রামাণ্য বলিয়াছেন। কেননা আহমদের মুসনাদ, ইবন হিববানের সহীহ ও হাকেমের মুসতাদরাক গ্রন্থে আবু হুরায়রা, হিলাল ইবন য়াসাফ ও ইবন আব্বাস (রা) প্রমুখ সাহাবী হইতে এ প্রসঙ্গে সহীহ হাদীছ বর্ণিত হইয়াছে (ইবন আব্বাস হইতে মারফু ও মাওকৃষ্ণ উভয় রূপে) যাহাতে ইউসুফ (আ)-এর ঘটনার সাক্ষীকে দোলনায় ও শিশু অবস্থায় কথা বলিয়াছে এমন চার (কিংবা ততোধিক, সুয়ূতীর বর্ণনামতে এগারজন) শিশুর অন্যতম বলা হইয়াছে।
অবশেষে সাক্ষীর নির্দেশিত পন্থায় ইউসুফ (আ)-এর জামাটি পরখ করা হইল এবং উহার পিছন দিকে ছেঁড়া দেখিয়া গৃহকর্তা ঘটনার বাস্তবতা সম্পর্কে নিশ্চিত হইলেন এবং স্ত্রীকে অপরাধ-স্বীকার করিয়া ক্ষমা প্রার্থনার আদেশ দিলেন এবং অভিজাত পরিবারের মান-মর্যাদার খাতিরে ইউসুফ (আ)-কে এ বিষয়ে সম্পূর্ণ নীরবতা অবলম্বনের অনুরোধ করিলেন। পবিত্র কুরআনের বর্ণনায় :
فَلَمَّا رَأَ قَمِيصَهُ قُدَّ مِنْ دُبُرٍ قَالَ إِنَّهُ مِنْ كَيْدِكُنْ إِنْ كَيْدَكُنَّ عَظِيمٌ يُوسُفُ أَعْرِضْ عَنْ هَذَا وَاسْتَغْفِرِي لِذَنبِكَ أَنَّكَ كُنْتَ مِنَ الْخَاطِئِينَ.
"গৃহস্বামী যখন দেখিল যে, তাহার জামা পিছন দিক হইতে ছিন্ন করা হইয়াছে তখন সে বলিল, নিশ্চয় ইহা তোমাদের নারীদের ছলনা, তোমাদের ছলনা তো ভীষণ। হে ইউসুফ! তুমি ইহা উপেক্ষা কর এবং হে নারী! তুমি তোমার অপরাধের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর, তুমিই তো অপরাধী" (১২: ২৮, ২৯)।
অর্থাৎ জামা পরখ করিয়া গৃহকর্তার দৃষ্টিতে ইউসুফের নির্দোষ হওয়া প্রতিভাত হইল। কিন্তু একটু পূর্বেই তাহারই ঘরের স্ত্রীর আচরণ ও বাকচাতুর্য তাহাকে নারী চক্রান্তের স্বরূপ দেখাইয়া দিলে সে উল্লিখিত মন্তব্য করিল। তাফসীরে কুরতুবীতে এ প্রসঙ্গে আবু হুরায়রা (রা) সূত্রের একটি হাদীছ উদ্ধৃত করা হইয়াছে। উহাতে রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, নারীর চক্রান্ত ও কূটকৌশল শয়তানের চক্রান্ত হইতেও জটিল হইয়া থাকে। কেননা আল্লাহ তা'আলা শয়তানের চক্রান্ত সম্পর্কে বলিয়াছেন, إِنْ كَيْدَ الشَّيْطَانَ كَانَ ضَعِيفًا "শয়তানের চক্রান্ত দুর্বল"। পক্ষান্তরে নারী চক্রান্ত সম্পর্কে বলিয়াছেন, إِنْ كَيْدَكُنَّ عَظِيمٌ "তোমাদের নারীদের চক্রান্ত ভয়ংকর"। বলা বাহুল্য ইহা চক্রান্তবাজ নারীর জন্যই প্রযোজ্য এবং নারীদের মধ্যেও উহার ব্যতিক্রম রহিয়াছে। নিরপরাধ ইউসুফকে অন্যায়ভাবে দোষী সাব্যস্ত করিবার চক্রান্তের কারণে আযীয মিসর স্ত্রীকে অপরাধ স্বীকার করিয়া ইউসুফের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিতে বলিলেন। ইবন কাছীরের মতে, মিসরবাসীরা পৌত্তলিক হইলেও তাহাদের দৃষ্টিতে পাপ মার্জনা করিবার অধিকার আল্লাহর জন্য স্বীকৃত ছিল। সুতরাং যুলায়খাকে ইসতিগফার করিতে বলা হইয়াছিল (বিদায়া, ১খ, ২০৪)।
এখানে পাঠক মনে একটি প্রশ্ন জাগিতে পারে যে, স্ত্রীর এহেন বিশ্বাসঘাতকতা ও নির্লজ্জতা প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও স্বামীর পক্ষে উত্তেজিত না হইয়া আদালতের বিচারকের ন্যায় শান্ত ও স্থির থাকিবার কারণ কি ছিল? ইহা তো মানব স্বভাবের জন্য অত্যন্ত বিস্ময়কর ব্যাপার। মুফাসসিরগণ ইহার বিভিন্ন সম্ভাব্য কারণ বর্ণনা করিয়াছেন। তাহাদের মতে আযীয মিসরের স্বভাব কোমলতা ছিল উহার কারণ। কাহারও মতে তাহার মর্যাদাবোধ ছিল অত্যন্ত শিথিল (তাহার সম্পর্কে পৌরুষ শক্তির দুর্বলতার তথ্য স্মর্তব্য)। তথাকথিত অভিজাত সমাজে সর্বযুগেই এই ধরনের ক্ষেত্রে লোকমুখে নিন্দা চর্চার ভয়ে নীরবতা অবলম্বন ও ঘটনা হজম করিয়া যাওয়ার রীতিও ইহার কারণ হইতে পারে। কুরতুবীর মতে উল্লিখিত কারণ ব্যতীত একটি সম্ভাব্য কারণ ইহাও হইতে পারে যে, আল্লাহ তা'আলা ইউসুফ (আ)-কে পাপ হইতে, অতঃপর অপবাদ ও অপমান হইতে রক্ষা করিবার জন্য যে অতি জাগতিক ও অলৌকিক ব্যবস্থা গ্রহণ করিয়াছিলেন উহারই পরিপূরক অংশরূপে আযীয মিসরকে উত্তেজনার বশবর্তী হইয়া কোন অঘটন ঘটানো হইতে শান্ত রাখিবার ব্যবস্থা করা হইয়াছিল। অন্যথায় এই ধরনের পরিস্থিতিতে মানুষ স্বভাবত আত্মনিয়ন্ত্রণ হারাইয়া ফেলে এবং তদন্ত ও সত্য উদঘাটনের অপেক্ষা না করিয়াই গালাগালি করিতে ও কাণ্ডজ্ঞানহীনরূপে পেশীশক্তি প্রয়োগে উদ্যত হয়। আলোচ্য ক্ষেত্রে আযীয মিসরের পক্ষে উত্তেজিত হইয়া ইউসুফ (আ)-এর সহিত কোন সাংঘাতিক ধরনের দুর্ব্যবহার করা বিচিত্র ছিল না। কিন্তু কুদরতী ব্যবস্থাপনা তাহার প্রিয় ও বিশিষ্ট বান্দার সুরক্ষা ব্যবস্থার অংগরূপে মানুষের স্বভাব আচরণের ঊর্ধ্বে আযীয মিসরকে শান্ত রাখিবার অলৌকিক পন্থা গ্রহণ করিয়াছিল (মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ, ৪৬)।