📄 কূপের অবস্থান ও পরিচিতি
কেহ কেহ কূপটি সাধারণ চলাচলের পথ হইতে দূরে এবং ঝোপঝাড়যুক্ত ও পানিশূন্য পরিত্যক্ত কূপ বলিয়াছেন। কিন্তু অধিকাংশ মুফাসসিরের বর্ণনায় কূপটি সাধারণ কাফেলা চলাচলের পথিপার্শ্বে এবং পানিযুক্ত ও ব্যবহার্য ছিল বলিয়া বুঝা যায়। মুকাতিল বলিয়াছেন, কূপটি ইয়াকূব (আ)-এর আবাসস্থল হইতে তিন ক্রোশের দূরত্বে ছিল। কা'ব-এর মতে মাদয়ান ও মিসরের মধ্যবর্তী কোন স্থানে এবং ওয়াহব-এর মতে জর্দানের কোন অঞ্চলে ছিল। কাতাদা উহা বায়তুল মুকাদ্দাসের কাছে ছিল বলিয়া অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন। একটি বর্ণনামতে কূপের পানি লবণাক্ত ছিল। ইউসুফ (আ) নিক্ষিপ্ত হওয়ার পর উহা সুপেয় হইয়া গিয়াছিল (ইবন কাছীর, ২খ, ২৪২; মাজহারী, ৫খ, ১৪৬-১৪৭)। ভাইগণ হযরত ইউসুফ (আ)-কে Douthan নামক স্থানে লইয়া গিয়া তাঁহাকে অন্ধকার কূপের মধ্যে নিক্ষেপ করিল।... উহা একটি বাণিজ্যিক বড় রাস্তার নিকটেই অবস্থিত ছিল (ইসলামী বিশ্বকোষ, ২২খ, ১১৮)।
হযরত ইউসুফ (আ)-কে সংগ দেওয়ার জন্য এবং অতিসত্বর তাঁহার কূপ হইতে বাহির হইবার সুসংবাদ দেওয়ার জন্য জিবরীল (আ)-কে তাঁহার কাছে পাঠান হইল। জিবরীল (আ) আসিয়া তাঁহাকে সান্ত্বনা বাণী শুনাইলেন এবং তাঁহার সংগে তাবীজ আকারে রক্ষিত জামাটি বাহির করিয়া উহা তাহাকে পরিধান করাইলেন এবং একটি দোআ শিক্ষা দিলেন (কুরতুবী, ৫খ, ১৪৪)। বর্ণিত মতে ইবরাহীম (আ)-কে বস্ত্রমুক্ত করিয়া অগ্নিগহবরে নিক্ষেপ করিবার সময় জিবরীল (আ) একটি জান্নাতী রেশমী জামা আনিয়া উহা তাঁহাকে পরাইয়া দিয়াছিলেন (এবং উহার ক্রিয়ায় পার্থিব আগুনের দাহ নিষ্ক্রিয় হইয়া গিয়াছিল)। ইবরাহীম (আ) জামাটি ইসহাক (আ)-কে এবং তিনি উহা ইয়াকূব (আ)-কে দিয়াছিলেন। ইয়াকূব (আ) উহা একটি মাদুলীতে ভরিয়া ইউসুফ (আ)-এর গলায় লটকাইয়া দিয়াছিলেন (কুরতুবী, ৫খ, ১৪৩; মাজহারী, ৫খ, ১৪৭, ১৪৮)।
📄 কূপ হইতে ইউসুফ (আ)-এর মুক্তি এবং দাসরূপে মিসর গমন
হযরত ইউসুফ (আ) তিন দিন কূপে অবস্থান করিলেন এবং আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হইতে বিপদমুক্তির ব্যবস্থার প্রতীক্ষায় থাকিলেন। এই তিন দিন য়াহুদা অন্য ভাইদের দৃষ্টি এড়াইয়া ইউসুফের জন্য খাদ্য ও পানীয় নিয়া আসিত এবং বালতি দ্বারা কূপের ভিতরে পৌছাইয়া দিত। ইবন ইসহাকের বর্ণনামতে, ভাইয়েরা ইউসুফের কি হয় এবং সে কি করে উহা দেখিবার জন্য দিনভর কূপের কাছে বসিয়া থাকিত (মুখতাসার ইবন কাছীর, ২খ, ২৪৪)। একটি বর্ণনামতে য়াহুদার দেওয়া পরামর্শ অনুসারে বড় ভাই রাওবীন (রূবেন) অন্য ভাইদের হইতে গোপন করিয়া চুপিসারে ইউসুফকে বাহির করিয়া পিতার কাছে পৌঁছাইবার পরিকল্পনা করিয়াছিল। কেননা সে ইউসুফকে হত্যা করিবার প্রস্তাবের শক্ত বিরোধিতা করিয়াছিল। এই কারণে সে মাঝেমধ্যে কূপের কাছে আসিয়া পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ সন্ধান করিত (কাসাসুল কুরআন, ১খ, ২৮৭)। আল্লাহ তা'আলার কুদরত ইউসুফ (আ)-কে কূপ থেকে বাহির করিবার জন্য এই ব্যবস্থা করিল যে, সিরিয়া (শাম) হইতে মিসরগামী একটি বাণিজ্যিক কাফেলা পথ ভুলিয়া এই কূপের কাছে পৌঁছিল এবং তাহাদের পানির প্রয়োজন দেখা দিলে কাছেই কূপ দেখিয়া পানি তুলিবার জন্য উহাতে বালতি ফেলিল। ভাইদের দেওয়া বালতি মনে করিয়া ইউসুফ (আ) সে বালতিতে উঠিয়া বসিলে কাফেলার লোক তাঁহাকে টানিয়া উপরে তুলিল। পবিত্র কুরআনের উল্লেখ:
وَجَاءَتْ سَيَّارَةٌ فَأَرْسَلُوا وَارِدَهُمْ فَادْلَى دَلْوَهُ قَالَ يُبُشرى هذا غُلْمٌ وَأَسَرُّوهُ بِضَاعَةً وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا يَعْمَلُونَ .
"একটি যাত্রীদল আসিল, উহারা উহাদের পানি সংগ্রাহককে প্রেরণ করিল। সে তাহার পানির ডোল নামাইয়া দিল। সে বলিয়া উঠিল, কী সুখবর! এ যে এক কিশোর! অতঃপর উহারা তাহাকে পণ্যরূপে লুকাইয়া রাখিল। উহারা যাহা করিতেছিল সে বিষয়ে আল্লাহ সবিশেষ অবহিত ছিলেন" (১২: ১৯)।
পৃথিবীর বুকে প্রতিনিয়ত এমন কতক ঘটনা ঘটে যাহার বাহ্যসূত্র আমাদের অবগতির নাগালে না থাকিবার কারণে আমরা সাধারণ মানুষ, সেগুলিকে অসম্ভব, অবিশ্বাস্য, অলৌকিক অথবা 'ঘটনা-চক্রে' ইত্যাদি নামে অভিহিত করিয়া থাকি এবং দার্শনিক ও গবেষকগণ উহাদের কার্যকরণের ব্যর্থ সন্ধানে প্রবৃত্ত হইয়া অহেতুক দিগভ্রান্ত হন। ইহার মূল কারণ আল্লাহ তা'আলার মহাবিশ্ব পরিচালনার রীতিনীতি সম্বন্ধে অজ্ঞতা। অন্যথায় অদৃশ্য লোকের মহাপরিচালন কেন্দ্র হইতে পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হওয়ার কারণে কোন ঘটনাই দুর্ঘটনা বা ঘটনাচক্র নয়, বরং সব ঘটনাই একটি সুনিপুণ ও সুবিন্যস্ত ধারাবাহিকতার যোগসূত্রে গ্রথিত। হযরত ইউসুফ (আ)-কে তাঁহার ভাইয়েরা সাধারণ চলাচলের সড়ক হইতে বিচ্ছিন্ন ও নির্জন অনাবাদী কূপে নিক্ষেপ করিয়াছিল। কেননা জনবসতির কাছাকাছি ও সদাব্যবহার্য কূপে নিক্ষেপ করিলে তাহাদের চক্রান্ত ধরা পড়িবার প্রবল আশংকা ছিল। অপরদিকে ইউসুফের (আ) জীবন্ত অবস্থায় পিতার কাছে ফিরিয়া যাওয়া তাহাদের মনঃপূত ছিল না। কেননা উহাতে পিতার কাছে তাহারা মারাত্মক অপরাধে অপরাধী সাব্যস্ত হইত। আবার সর্বশেষ পরিস্থিতি ও সিদ্ধান্ত অনুসারে তাহারা, বিশেষত য়াহুদা ও রূবেন প্রমুখ মৃত্যুও কামনা করিতেছিল না। ইউসুফ বাঁচিয়া থাকুক, তবে পিতার দৃষ্টি ও অবগতি হইতে দূরে কোথাও অবস্থান করুক, ইহার একমাত্র উপায় ছিল কোন দূরদেশে ইউসুফকে লইয়া যাওয়া। তৎকালে পৃথিবীতে দাসপ্রথা প্রচলিত ছিল এবং মানুষ পণ্যরূপে বেচাকেনা হইত। সুতরাং ইউসুফের ভাইয়েরাও দাসরূপে ইউসুফের বিদেশে পাচার হওয়ার কোন একটি ব্যবস্থা কামনা করিতেছিল। অপরদিকে আল্লাহ তা'আলা তাঁহার নবী ইয়াকূব (আ)-কে দুঃখ দান করিয়া পরীক্ষা করা এবং ইউসুফ (আ)-কে জাগতিক ও আত্মিক উন্নতির উচ্চতম শিখরে উন্নীত করিবার ব্যবস্থা করিতেছিলেন। ইউসুফ (আ)-এর কাছে ভবিষ্যৎ সান্ত্বনা বাণী ও 'এক সময় তুমি তাহাদিগকে তাহাদের কৃতকর্মের বিবরণ দিবে, অথচ তাহারা বুঝিতে পারিবে না' ঘোষণার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াও প্রয়োজন ছিল। সুতরাং কুদরত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সক্রিয় হইয়া উঠিল। শাম হইতে (মতান্তরে মাদয়ান হইতে) মিসরগামী বাণিজ্য কাফেলা পথ ভুলিয়া কান'আন অঞ্চলের অনাবাদ বনাঞ্চলে পৌঁছিল, যেখানের একটি কূপে ইউসুফ (আ) তাঁহার ভবিষ্যৎ উন্নতির বিদ্যাপীঠ মিসরে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করিতেছিলেন। প্রাচীন ঐতিহাসিকগণের বর্ণনামতে এ কাফেলাটি ছিল হেজাযী ও মাদয়ানবাসীদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বাণিজ্য কাফেলা। তাহাদের এই বর্ণনার সূত্র হইতেছে তাওরাতে উপস্থাপিত কাফেলার বিবরণ। তাওরাতে কাফেলাটিকে মাদয়ানী (مدین) অথবা মিদয়ানী (مدیان) বলা হইয়াছে। এই কারণে প্রাচীন ঐতিহাসিকদের কেহ কেহ কাফেলাটির গতিপথ মাদয়ান হইতে মিসর সাব্যস্ত করিয়াছেন। আর অধিকাংশ ঐতিহাসিক কাফেলাটি হেজাযী (ইসমাঈলী) ও মাদয়ানীদের সমন্বয়ে গঠিত হওয়ার তথ্য স্বীকার করিয়া উহার গতিপথ সিরিয়া (শাম) হইতে মিসর অভিমুখে বলিয়াছেন। কিন্তু পরবর্তী গবেষণায় ইহা স্থিররূপে সাব্যস্ত হইয়াছে যে, কাফেলাটি ছিল হেজাযী ইসমাঈলী বংশের এবং তাহাদিগকে মাদয়ানী বা মিদয়ানী বলিবার কারণ তাওরাতে বর্ণিত মাদয়ান ও আরবীয় ভূগোলের হেজাযকে দুইটি ভিন্ন স্থান ধারণা করা হইতে উদ্ভূত। ইবন কাছীর লিখিয়াছেন, মাদয়ান মা'আন অঞ্চলের একটি জনপদ, ইহার অবস্থান শামের শেষ প্রান্তে দূত (সম্প্রদায়ের) উপসাগর (মৃত সাগরের) নিকটবর্তী হিজাযের সন্নিহিত অঞ্চলে (বিদায়া, ১খ, ১৮৪, পৃ.)। সায়্যিদ সুলায়মান নদবীর গবেষণামতে বংশানুক্রমে ভৌগোলিক আধুনিক গবেষণা প্রমাণ করিয়াছে যে, তাওরাতে যে অঞ্চলকে মাদয়ান (مدین) বা মিদয়ান (مدیان) বলা হইয়াছে উহা মূলত সে অঞ্চল যাহা সা'ঈর (ساعين) বা সারাত (سراة) হইতে লৌহিত সাগরের উপকূল বরাবর শাম হইতে য়ামান পর্যন্ত বিস্তৃত। এই অঞ্চলটিকে হযরত মূসা (আ)-এর যুগ হইতে ইসরাঈলীরা মাদয়ান নামে এবং ইসমাঈলীরা পূর্ব হইতেই হিজায নামে অভিহিত করিয়া আসিয়াছে। এই কারণে একই অঞ্চলের জন্য এই দুইটি নাম ব্যবহৃত হইয়াছে (আরদুল কুরআন, ২খ, পৃ. ৪৭, ৪৯; হইতে কাসাসুল কুরআন ১খ, ২৮৭, টীকাসহ)।
মোটকথা, পথভোলা কাফেলাটির পানি সংগ্রহ, অবস্থান ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত অগ্রবর্তী দল তাহাদের পানির প্রয়োজনে কূপে বালতি ফেলিয়া পানির বদলে হযরত ইউসুফ (আ)-কে উত্তোলন করিল। ঐতিহাসিকগণ তাহাদের বর্ণনায় এই উত্তোলনকারী ব্যক্তির পরিচয় প্রদান করিয়াছেন। তবে তাহাদের বর্ণনায় তাহার নামের ব্যাপারে মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। ইবন কাছীর তাহার নাম সম্পর্কে ইবন 'আব্বাস (রা) হইতে ইবন ইসহাকের তথ্যের বরাতে লিখিয়াছেন, "যে ব্যক্তি ইউসুফ (আ)-কে মিসরে নিয়া বিক্রয় করিয়াছিল অর্থাৎ যে তাঁহাকে (কূপ হইতে তুলিয়া এবং ইউসুফ ভ্রাতৃবর্গের নিকট হইতে ক্রয় করিয়া) মিসরে রফতানী করিয়াছিল তাহার নাম মালিক ইবন যু'র ইবন নুওয়ায়ব ইন 'আফকা' (অথবা আন্কা) ইব্ন মিদয়ান ইব্ন ইবরাহীম (আ) (বিদায়া, ১খ, ২০২); ইবনুল আছীরের বর্ণনায় মালিক ইবন ওয়া'র (وعر) (আল-কামিল, ১খ, ১০৭(; কুরতুবীর বর্ণনায় মালিক ইবন দু'র (ذعر - دعر নয়) বলা হইয়াছে (আল-জামি' লিআহকামিল কুরআন, ৫খ, ১৫২)। মুফতী শফী (র) নামটি মালিক ইবন দু'বুর (دعبر যদি মুদ্রণ প্রমাদ না হয়) লিখিয়াছেন (মাআরিফুল কুরআন, ৫খ, ২৭)।
প্রথমে অপ্রত্যাশিত ঘটনা দেখিয়া এবং বালতিতে উপবিষ্ট বালকটির অপার্থিব সৌন্দর্য দেখিয়া উত্তোলনকারী লোকটি আত্মনিয়ন্ত্রণ হারাইয়া 'ওহে সুসংবাদ'! বলিয়া চিৎকার করিয়া উঠিয়াছিল। মতান্তরে 'ইয়া বুশরা' বলিয়া সে বুশরা নামে তাহার এক সাথীকে ডাক দিয়াছিল। পরক্ষণে ঘটনার বাস্তবতা অনুধাবন করিয়া এবং এই অতুলনীয় সুন্দর বালক মিসরের বাজারে অতি উচ্চ মূল্যে বিক্রয় হইবে, এই সত্য উপলব্ধি করিয়া কাফেলার অন্য লোকদেরকে ইহার মূল্যে ভাগ বসাইবার পথ রুদ্ধ করিবার জন্য বিষয়টি চাপিয়া যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। উত্তোলনকারীরা পারস্পরিক পরামর্শে স্থির করিল যে, তাহারা কাফেলার অন্য লোকদের কাছে বালকটির কথা আলোচনা করিবে না কিংবা তাহদিগকে বলিবে, আমরা উহাকে ক্রয় করিয়াছি অথবা তাহার মালিকরা তাহাকে বিক্রয় করিবার জন্য আমাদের সোপর্দ করিয়াছে। এই সিদ্ধান্তের পর তাহারা নিজেদের স্বাভাবিক তৎপরতায় লিপ্ত হইল। ওদিকে য়াহুদা নিত্যকার মত ইউসুফের জন্য খাবার আনিয়া উহা কূপের ভিতর নামাইয়া দিল। কিন্তু কেহ খাবার গ্রহণ করিতেছে না দেখিয়া সে ভয় পাইয়া গেল। কূপের অভ্যন্তরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া এবং ইউসুফকে ডাকিয়া সে তাঁহার সাড়া পাইল না। একটি বর্ণনামতে ইউসুফকে কূপ হইতে তুলিয়া গোপনে পিতার কাছে পৌঁছাইবার সুযোগ সন্ধানী রূবেন ইউসুফকে কূপে দেখিতে না পাইয়া চিন্তিত হইয়া পড়িল। য়াহুদা (অথবা রূবেন কিংবা দুইজনই) দৌড়াইয়া গিয়া অপর ভাইদের ঘটনা অবহিত করিল। ইউসুফ কোন উপায়ে পিতার কাছে পৌঁছিয়া যাইতে পারে এই আশংকায় তাহারা অবিলম্বে কূপের কাছে পৌঁছিল এবং আশপাশে ইউসুফের অস্তিত্ব সন্ধান করিতে লাগিল। কাছেই একটি কাফেলাকে অবস্থান করিতে দেখিয়া তাহাদের উপর ভাইদের সন্দেহ দৃষ্টি নিপতিত হইল এবং অনুসন্ধান ও তল্লাশীর পর ইউসুফকে তাহাদের নিকট পাওয়া গেল। ভাইয়েরা ইউসুফকে তাহাদের দুষ্ট প্রকৃতির গোলাম বলিয়া পরিচয় দিল এবং পলাতক গোলামকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য কাফেলার লোকদের অভিযুক্ত করিল। ইউসুফকে উত্তোলনকারী মালিক ও তাহার সংগীরা বিদেশ-বিভুঁইয়ে চুরির দায় হইতে রক্ষা পাওয়ার জন্য পলায়নে অভ্যস্ত গোলামটি ক্রয় করিবার প্রস্তাব করিল। ভাইয়েরা উহাকে তাহাদের স্বার্থ সিদ্ধির সহজ উপায় দেখিতে পাইয়া উহাতে সম্মতি প্রকাশ করিল। একটি বর্ণনামতে ভাইয়েরাই প্রথমে অগ্রবর্তী হইয়া পলাতক গোলামটি বিক্রয়ের প্রস্তাব করিয়াছিল। অপর একটি দুর্বল বর্ণনামতে ইউসুফের ভাইয়েরা কূপের কাছে একটি বাণিজ্যিক কাফেলাকে অবস্থান করিতে দেখিতে পাইল এবং তাহাদের সহিত আলাপ করিয়া জানিতে পারিল যে, তাহারা পেস্তা, দেবদারু ও মসলাপাতি নিয়া মিসর যাইতেছে। তখন ভাইয়েরা পরামর্শ করিয়া নিজেরাই ইউসুফকে কূপ হইতে তুলিয়া কাফেলার নিকট বিক্রয় করিল। কিন্তু তাওরাত ও কুরআনের বর্ণনা ধারায় এ বিবরণটি সমর্থিত হয় না। এই সমুদয় ঘটনা ও আলোচনায় ইউসুফ (আ) সম্পূর্ণ নীরবতা অবলম্বন করিয়া রহিলেন। কেননা তিনি বুঝিতেছিলেন যে, কোন প্রকার উচ্চবাচ্য করিলে এবং আত্মপরিচয় প্রকাশ করিলে গোলামীর অপবাদ ও দুঃখ হইতে মুক্তি পাওয়া গেলেও ভাইদের হাত হইতে নিস্তার পাওয়া ও পিতার কাছে নিরাপদে পৌঁছিবার সম্ভাবনা সুদূরপরাহত।
সর্বোপরি তিনি কূপ হইতে মুক্তির ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলার অভাবনীয় কুদরতের হাত প্রত্যক্ষ করিয়াছিলেন। সুতরাং গোলাম হইয়া মিসরে নীত হওয়ার মধ্যেও তিনি কুদরতের অপার রহস্য প্রত্যক্ষ করিবার ইংগিত অনুভব করিয়া সম্পূর্ণ নিরুদ্বিগ্ন চিত্তে আল্লাহ্র ফয়সালার কাছে আত্মসমর্পণ করিয়াছিলেন। আল্লাহ তা'আলাও ইউসুফ, তাঁহার ভ্রাতৃবর্গ ও কাফেলার লোকদের দ্বারা তাঁহার কুদরতী পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করাইয়া নিতেছিলেন। অন্যথায় ভাইদের অসৎ উদ্দেশ্য নস্যাত করিয়া দেওয়া তো আল্লাহ্ জন্য সহজ ছিল।
বিক্রয় প্রস্তাবে পারস্পরিক সম্মতির পর মূল্য নিয়া আলোচনা হইল এবং ক্রেতাদের বিস্ময় উদ্রেক করিয়া তাহাদের ধারণার চেয়ে অনেক কম মূল্যে বিক্রেতারা তাহাদের গোলাম হস্তান্তরে রাজী হইল। কুরআনের ভাষায়:
وَشَرَوْهُ بِثَمَن بَخْسٍ دَرَاهِمَ مَعْدُودَةٍ وَكَانُوا فِيهِ مِنَ الزَّاهِدِينَ .
"এবং উহারা তাহাকে বিক্রয় করিল স্বল্প মূল্যে, মাত্র কয়েক দিরহামের বিনিময়ে, উহারা ছিল তাহার ব্যাপারে নির্লোভ" (১২: ২০)।
অর্থাৎ ইউসুফের ভাইয়েরা তাহাকে বিক্রয় করিয়া দিল এবং কাফেলার লোকেরা তাহাকে ক্রয় করিল অতি নগণ্য মল্যে, গণনা করিয়া হিসাব করা হয় এমন কয়েকটি দিরহামের বিনিময়ে। মূলত তাহারা উহাতে নির্লোভ ছিল। তাফসীরকারগণ লিখিয়াছেন, তৎকালীন আরব বাণিজ্য জগতে প্রচলিত নিয়ম অনুসারের পণ্যমূল উল্লেখযোগ্য ও অধিক (চল্লিশোর্ধ) হইলে উহা ওজনের মাধ্যমে এবং অল্প ও নগণ্য হইলে গণনা করিয়া পরিশোধ করা হইত। পবিত্র কুরআন مَعْدُودَة (গণনা আওতাভুক্ত) বলিয়া অর্থের সংখ্যা নির্দিষ্ট না করিয়া উহা পরিমাণে অল্প হওয়ার প্রতি ইংগিত করিয়াছে। ইকরিমা ও ইবন ইসহাক এই পরিমাণ চল্লিশ দিরহাম বলিয়াছেন, মুজাহিদ বাইশ দিরহাম বলিয়াছেন। ইবন মাস'উদ, ইবন আব্বাস, নাওফ বাকালী, সুদ্দী, কাতাদা ও আতিয়্যা প্রমুখ বলিয়াছেন, বিশ দিরহামে বিক্রয় করিয়া দশ ভাইয়ের প্রত্যেকে দুই দিরহাম করিয়া ভাগ করিয়া নিয়াছিল (দ্র. বিদায়া, তাফসীরে ইবন কাছীর, মাজহারী, কুরতুবী ও মা'আরিফ)। মূল্য কম হওয়ার কারণ ছিল দ্বিপক্ষীয়। বিক্রেতারা জানিত যে, ইউসুফ গোলাম নয়, তাহাদেরই ভাই, তাহাকে কোনরূপে দেশান্তরিত করিতে পারিলেই তাহাদের বিদ্বেষ প্রশমিত হয় এবং পিতার কাছে ধরা পড়িয়া তাহার রোষাণলে পতিত হওয়া হইত রক্ষা পাওয়া যায়। ক্রেতারা দেখিল, পলায়নে অভ্যস্ত গোলামের জন্য অধিক মূল্য দেওয়ার প্রয়োজন নাই। ইহা ছাড়া এই গোলামের ভবিষ্যত কত উজ্জ্বল হইবে তাহা অনুধাবন করিবার সাধ্য তাহাদের ছিল না।
অতঃপর বাণিজ্য কাফেলা তাহাদের গন্তব্যস্থল মিসরের উদ্দেশ্যে প্রস্থান করিল এবং মিসর পৌঁছিয়া ইউসুফ (আ)-কে গোলামরূপে বিক্রয় করিল। কাফেলার মিসর গমন ও ইউসুফ (আ)-কে বিক্রয় করা সংক্রান্ত কাহিনীর বিশদ বিবরণ গুরুত্বের নিরিখে অপ্রয়োজনীয় অংশ হওয়ার কারণে পবিত্র কুরআন উহার উল্লেখে নীরব। তবে তাওরাত, ইতিহাস ও তাফসীরকারদের বর্ণনা হইতে জানা যায় যে, ইউসুফের ভাইয়েরা তাহাকে বিক্রয় করিবার পর কাফেলার প্রস্থান করা পর্যন্ত সে স্থানে অবস্থান করিল। কেননা তাহারা এই ব্যাপারে শংকিত ছিল যে, কাফেলার লোকেরা অজ্ঞাত বিপদের আশংকায় ইউসুফ (আ)-কে সেখানে কিংবা পথিমধ্যে কোথাও রাখিয়া যাইবে এবং ইউসুফ (আ) কোন উপায়ে পিতার কাছে ফিরিয়া আসিয়া ভাইদের সকল ষড়যন্ত্র ফাঁস করিয়া দিবে। সুতরাং কাফেলা চলিতে আরম্ভ করিলে ভাইয়েরাও কিছুদূর পর্যন্ত তাহাদের সাথে থাকিল এবং ইউসুফের পালাইবার অভ্যাসের কথা বলিয়া তাঁহাকে বাঁধিয়া রাখিবার উপদেশ দিল। এই মহামানবের মর্যাদা সম্পর্কে অজ্ঞ লোকেরা উপদেশ মানিয়া লইল এবং উক্ত অবস্থায়ই তাঁহাকে মিসর পর্যন্ত লইয়া গেল। দীর্ঘপথ পরিক্রমার পর তাহারা মিসরের বাজারে তাহাদের বিক্রয় পণ্যসমূহ উপস্থাপন করিল।
ইউসুফ (আ) সর্বাবস্থায় আল্লাহ্ ফয়সালায় রাজী থাকিয়া তাঁহার কুদরতের ধারা প্রত্যক্ষ করিতে থাকিলেন। ইউসুফ (আ)-এর জীবনের এই হৃদয়বিদারক মুহূর্তগুলির ছবি দৃষ্টির সামনে উদ্ভাসিত করিলে দেখা যাইবে যে, অতি অল্প বয়স্ক এক বালক, শিশু বয়সে মাতৃহারা, পিতার অপরিসীম স্নেহ-মমতার ক্রোড় হইতে বিচ্ছিন্ন, ভাইদের প্রতিহিংসার শিকার হইয়া বাৎসল্যপূর্ণ স্বাধীন জীবন হইতে বঞ্চিত হইয়া এক অপরাধী গোলামরূপে অজানার উদ্দেশে চলিয়াছেন। তিনি জানেন না, কোথায় তাঁহাকে নেওয়া হইতেছে, আর কোন দিন স্বাধীনতার স্বাদ ভোগ করিবেন কিনা, স্নেহময় পিতার সাথে আর কখনও সাক্ষাত ঘটিবে কিনা? কিন্তু তিনি সম্পূর্ণ নির্বিকার, মুখে নাই কোন বিমর্ষতা, উচ্চারণে নাই কোন অভিযোগ, নাই কোন প্রকার কান্নাকাটি বা অস্থিরতার প্রকাশ। বিপদে ধৈর্য ও ভাগ্যে প্রসন্নতার মূর্ত প্রতীক হইয়া তিনি চলিয়াছেন গোলামরূপে মিসরের বাজারে বিক্রয় হওয়ার জন্য।
ইউসুফ (আ)-এর সৌন্দর্য ও প্রতিভাদীপ্ত চেহারা খরিদ্দারদের প্রবল ভাবে আকর্ষণ করিল। একটি বর্ণনামতে (মাযহারী, ৫খ, ১৫১) চল্লিশ স্বর্ণমুদ্রা (দীনার) ও দুই প্রস্থ বস্ত্র ইত্যাদির বিনিময় ইউসুফ (আ)-কে বিক্রয় করা হইল। ওয়াহব ইবন মুনাব্বিহের সূত্র ও কুরতুবীর বর্ণনামতে ইউসুফ (আ)-কে বিক্রয়ের ঘোষণা দেওয়া হইলে খরিদ্দারদের ভিড় জমিয়া গেল এবং তাঁহার মূল্য বৃদ্ধিতে তাহারা প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হইল। আল্লাহ তা'আলা তাঁহার মর্ষী বাস্তবায়নের কুদরতী ব্যবস্থাপনায় মিসরের সরকারের অর্থ, খাদ্য ও বাণিজ্যের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান মন্ত্রীকে দাস ক্রয়-বিক্রয়ের বাজারে পৌঁছাইয়া দিলেন। বিক্রয় প্রস্তাবিত গোলামরূপে ইউসুফ (আ) প্রধান মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করিলেন এবং তিনিও মূল্যবৃদ্ধির প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করিলেন। সর্বশেষে ইউসুফের মূল্য স্থির হইল তাঁহার ওযনের সমপরিমাণ স্বর্ণ, অনুরূপ ও সমপরিমাণ মিশাক এবং সমপরিমাণ রেশমীবস্ত্র। ইউসুফের খরিদ্দার হওয়ার সৌভাগ্য লিপিবদ্ধ ছিল প্রধান মন্ত্রীর তথা আযীয মিসরের ললাটে এবং এত উচু মূল্য পরিশোধ করা তাহারই পক্ষে সহজসাধ্য ছিল। তিনি স্থিরীকৃত মূল্য পরিশোধ করিয়া ইউসুফ (আ)-কে ক্রয় করিলেন। বর্ণনামতে এই সময় তের বৎসর বয়স্ক ইউসুফ (আ)-এর ওযন হইয়াছিল চার শত রিত্ল বা চার শত পাউন্ডের অর্থাৎ প্রায় ১৫.০০০ তোলার সমপরিমাণ (মাজহারী, ৫খ, ১৫১; মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ, ৩১)।
📄 আযীয মিসরের পরিচয়
ইউসুফ (আ)-এর ক্রেতাকে পবিত্র কুরআন আল-আযীয (العزیز) পরিচয়ে উল্লেখ করিয়াছে। মূলত ইহা ছিল তৎকালীন বিশ্বে সমুন্নত মিসরের রাজ-দরবারে সম্রাটের সর্বোচ্চ পদাধিকারীর পদবী। বাইবেলে তাহার নাম ফুতিফার (Potiphar) বলা হইয়াছে এবং মুসলিম ঐতিহাসিকগণ তাহার নাম কিতফীর (قطفير) অথবা ইতফীর (اطفیر) ইবন রাওহীব বলিয়াছেন। তিনি সম্রাটের জ্ঞাতি সম্পর্কীয় ছিলেন। তখন মিসরে 'আমালিকা (عمالقه) সম্প্রদায়ের হিকসুস (Hgksoos) বংশীয়রা রাজত্ব করিতেছিল এবং ক্ষমতাসীন সম্রাটের নাম ছিল রায়্যান ইবনুল ওয়ালীদ (মতান্তরে রয়্যান ইবন উসায়দ)।
প্রধান মন্ত্রী কিতফীর ইউসুফ (আ)-কে ক্রয় করিয়া তাহার বাসভবনে নিয়া গেলেন। ইতোমধ্যে ইউসুফ (আ)-এর চেহারা ও আচার-আচরণ তাহাকে মুগ্ধ করিয়াছিল। তিনি বাড়ি পৌঁছিয়া ইউসুফ (আ)-কে স্ত্রীর যিম্মায় সোপর্দ করিলেন এবং সাধারণ গোলামদের তুলনায় বিশেষ মর্যাদার সহিত ইউসুফ (আ)-এর থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ প্রদান করিলেন। কুরআনের বর্ণনায়: وَقَالَ الَّذِي اشْتَرَاهُ مِنْ مِصْرَ لِامْرَأَتِهِ أَكْرِمِي مَثْوَاهُ عَسَى أَنْ يَنْفَعَنَا أَوْ نَتَّخِذَهُ وَلَدًا وَكَذَلِكَ مَكَّنَّا لِيُوسُفَ فِي الْأَرْضِ وَلِنُعَلِّمَهُ مِنْ تَأْوِيلِ الأَحَادِيثِ وَاللهُ غَالِبٌ عَلَى أَمْرِهِ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ .
"মিসরের যে ব্যক্তি তাহাকে ক্রয় করিয়াছিল সে তাহার স্ত্রীকে বলিল, ইহার থাকিবার সম্মানজনক ব্যবস্থা কর, সম্ভবত সে আমাদের উপকারে আসিবে অথবা আমরা ইহাকে পুত্ররূপেও গ্রহণ করিতে পারি। এইভাবে আমি ইউসুফকে সেই দেশে প্রতিষ্ঠিত করিলাম তাহাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষা দিবার জন্য। আল্লাহ তাঁহার কার্য সম্পাদনে অপ্রতিহত; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ ইহা অবগত নহে” (১২: ২১)।
ইতিহাসের বর্ণনামতে আযীয দম্পতি নিঃসন্তান হওয়ার কারণে 'আমরা তাহাকে আমাদের পুত্ররূপে গ্রহণ করিবার ঘোষণা প্রদান করিব'। কেননা এমন সুবোধ ছেলেকেই পুত্ররূপে গ্রহণ করা যায় এবং যেরূপে আমি তাহাকে হত্যা ষড়যন্ত্র হইতে রক্ষা করিয়া এবং অন্ধকার কূপ হইতে মুক্তির ব্যবস্থা করিয়া তাহার প্রতি আমার বিশেষ অনুগ্রহ বর্ষণ করিয়াছিলাম, তদ্রূপ ঐ (মিসর) দেশেও তাহাকে সম্মান ও প্রতিপত্তির অধিকারী করিলাম এবং ইহা এই উদ্দেশ্যে যে, তাহার জন্য বাহ্যিক ও আত্মিক নি'মাতসমূহ পরিপূর্ণ করিব, তাহাকে রাষ্ট্র পরিচালনা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার যোগ্যতা দান করিব এবং তাহাকে সব ধরনের বক্তব্য ও স্বপ্নের যথার্থ ব্যাখ্যা প্রদানের ইল্ম দান করিব। আল্লাহ তাঁহার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সক্ষম ও পরাক্রমশালী। কেহই তাহা প্রতিরোধ করিতে কিংবা বাধাগ্রস্ত করিতে পারে না। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ ঈমান ও বিশ্বাসের দৃঢ়তা না থাকিবার কারণে এই তত্ত্ব অবগত নহে। তাহারা বাহ্য কার্যকারণের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখে এবং উহাকেই চূড়ান্ত কার্যকর মনে করে। কার্যকারণ ও উপায়-উপকরণের স্রষ্টা ও নিয়ন্ত্রণকর্তার প্রতি তাহাদের দৃষ্টি ধাবিত হয় না এবং তাঁহার সূক্ষ্ম ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা তাহারা আত্মস্থ করিতে পারে না। যেমন আলোচ্য ক্ষেত্রে তিনি ইউসুফ ভ্রাতৃবর্গের সকল চক্রান্ত ভণ্ডুল করিয়া দিয়া তাহার ইচ্ছাকেই সম্পন্ন করিবার ব্যবস্থা করিলেন এবং ইউসুফের বাহ্য দাসত্বকে তাঁহার উর্ধ্বারোহণ ও মিসরের রাজ-কর্তৃত্ব লাভের উপায় করিলেন। এবং বাহ্য দাসত্বের সময়ও তাঁহাকে নামেমাত্র দাস রাখিয়া স্বাধীনেরও অধিক মর্যাদার জীবন দান করিলেন। বস্তুত আযীয পরিবারে অবস্থানের ব্যবস্থা করিয়া তাঁহার ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করিবার পথ সুগম করিলেন। প্রধান মন্ত্রীর সহঅবস্থানে থাকিয়া তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার সূক্ষ্ম কলাকৌশল রপ্ত করিতে লাগিলেন। তাওরাত ও ইতিহাসের বর্ণনামতে কিছু দিনের ব্যবধানে প্রধান মন্ত্রী তাহার ধনসম্পদ ও পারিবারিক যাবতীয় বিষয় ইউসুফ (আ)-এর দায়িত্বে ন্যস্ত করিয়া তাঁহাকে সামগ্রিক বিষয়ের তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত করিলেন (কাসাসুল কুরআন, ১খ, ২৮৯)।
কাহারও মুখমণ্ডল ও অবয়ব দেখিয়া তাহার গুণাগুণ ও সুপ্ত যোগ্যতা বুঝিতে পারা একটি বিশেষ ধরনের অন্তর্দৃষ্টি ও সূক্ষ্ম জ্ঞান। আল্লাহ তা'আলা আযীযে মিসরকে এই অন্তর্দৃষ্টি ও অবয়ব নিরীক্ষার জ্ঞান দান করিয়াছিলেন। সুতরাং তিনি ইউসুফ (আ)-কে দেখিবামাত্র তাঁহার মুখমণ্ডলে তাঁহার গৌরবোজ্জ্বল ভবিষ্যত লিপি পাঠ করিয়াছিলেন এবং স্ত্রী (যুলায়খা)-এর কাছে উহার প্রতি ইংগিত ব্যক্ত করিয়াছিলেন। ইবন ইসহাক আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ (রা)-এর বাণী উদ্ধৃত করিয়া লিখিয়াছেন, তিনজন মনীষী তাহাদের গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও সূক্ষ্ম দূরদর্শিতার স্বাক্ষর রাখিয়াছেন। একঃ মিসরের আযীয, যিনি ইউসুফ (আ)-এর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ প্রত্যক্ষ করিয়া স্ত্রীকে বলিয়াছিলেন, তাঁহাকে মর্যাদার অবস্থানে রাখিবে। দুইঃ হযরত শু'আয়ব (আ)-এর কন্যা, যিনি স্বীয় পিতার নিকট হযরত মূসা (আ) সম্পর্কে মন্তব্য করিয়াছিলেন (হত্যার দায় হইতে রক্ষা পাওয়ার জন্য মিসর হইতে মাদয়ানে পলায়ন করিবার পরে সেখানে শু'আয়ব (আ)-এর উটগুলিকে পানি খাওয়াইবার কাজে তাঁহার কন্যাদ্বয়কে সহায়তা প্রদানের ফলশ্রুতিতে শু'আয়ব কন্যা কর্তৃক মূসা (আ)-কে পিতার নিকট ডাকিয়া নেওয়ার পরে : يَا أَبَتِ اسْتَأْجِرْهُ أَنَّ خَيْرَ مَنِ اسْتَأْجَرْتَ الْقَوِيُّ الْأَمِينُ “আব্বাজান! তাঁহাকে মজদুর নিযুক্ত করুন। কেননা সবল বিশ্বাসী ব্যক্তিই মজদুর নিযুক্ত হওয়ার জন্য সর্বাধিক উত্তম")। তিনঃ হযরত আবু বাক্স সিদ্দীক (রা), যিনি মুসলিম জাহানের পরবর্তী খলীফারূপে হযরত উমার (রা)-কে মনোনীত করিয়া ইসলামের চিরন্তন সোনালী ইতিহাস রচনার শুভ উদ্বোধন করিয়াছিলেন। (মুখতাসার ইবন কাছীর, ২খ, ২৪৫; মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ, ৩২)। অতঃপর ইউসুফ (আ) মুক্তদাসরূপে অত্যন্ত মর্যাদা ও সম্মানের সহিত আযীয মিসরের বাসভবনে জীবন যাপন করিতে লাগিলেন এবং আযীযের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও পারিবারিক সার্বিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি রাজকীয় রীতিকৌশল শিক্ষা করিতে থাকলেন।
📄 হযরত ইউসুফ (আ)-এর নবুওয়াত লাভ
আযীয মিসরের বাসভবনে অবস্থানকালে শক্তি ও বুদ্ধির পূর্ণতা প্রাপ্তির বয়ঃসন্ধিক্ষণে আল্লাহ তা'আলা ইউসুফ (আ)-কে নবুওয়াতের মর্যাদায় ভূষিত করিলেন। কুরআনের বর্ণনায়: وَلَمَّا بَلَغَ أَشُدَّهُ آتَيْنَه عِلْمًا وَحُكْمًا وَكَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ "সে যখন পূর্ণ যৌবনে উপনীত হইল তখন আমি তাহাকে হিকমত ও জ্ঞান দান করিলাম এবং এইভাবেই আমি সৎকর্মপরায়ণদিগকে পুরস্কৃত করি" (১২: ২২)।
অর্থাৎ যখন ইউসুফ (আ) শক্তি, বুদ্ধি ও যৌবনের পূর্ণতায় উপনীত হইল তখন আমি তাহাকে হিকমত ও জ্ঞান দান করিলাম। পুণ্যশীলদের অনুরূপ প্রতিদান দেওয়াই আমার বিধান। মুফাসসিরগণ হিকমত ও ইল্ম-এর অর্থ নবুওয়াত বলিয়া অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন। ব্যাপক অর্থে হিকমত দ্বারা সঠিক উক্তি করিবার প্রতিভা এবং ইলম দ্বারা দীনের যথার্থ উপলব্ধি বুঝানো হয়। স্বপ্নের ব্যাখ্যাও উহার অন্তর্ভুক্ত। আবার বিষয়বস্তুর অবগতিকে ইলম এবং তদনুসারে কর্ম সম্পাদনকে হিকমত বলা হয়। মোটকথা আয়াতে ইউসুফ (আ)-কে নবুওয়াত মর্যাদায় ভূষিত করিবার ঘোষণা দেওয়া হইয়াছে। তবে যৌবনের এই পূর্ণতা প্রাপ্তির বয়স সম্পর্কে মুফাসসিরগণের মতভেদ রহিয়াছে। ইমাম মালিক (র)-এর ব্যাখ্যায় বলিয়াছেন, উহা বয়ঃপ্রাপ্তি। সাঈদ ইবন জুবায়রের মতে আঠার বৎসর, দাহ্হাকের মতে বিশ বৎসর, ইক্রিমার মতে পঁচিশ বৎসর, সুদ্দীর মতে ত্রিশ বৎসর। ইবন আব্বাস (রা), মুজাহিদ ও কাতাদা প্রমুখের মতে তেত্রিশ বৎসর এবং ইবন আব্বাসের একটি বর্ণনায় তেত্রিশোর্ধ বৎসর। হাসান বাসরী (র)-এর মতে চল্লিশ বৎসর। ইবন কাছীর পবিত্র কুরআনের "وَلَمَّا بَلَغَ أَشُدَّهُ وَبَلَغَ أَرْبَعِينَ سَنَةً ", "যখন সে তাহার পূর্ণ যৌবনে উপনীত হইল এবং চল্লিশ বৎসর বয়সে পদার্পণ করিল" (৪৬: ১৫) আয়াতের ইংগিতে শেষোক্ত অভিমতকে অধিক গ্রহণযোগ্য বলিয়াছেন। অধিকাংশ মুফাসসির ও মনীষী নবুওয়াত প্রাপ্তির সাধারণ বয়স চল্লিশ বৎসরের প্রতি লক্ষ্য করিয়া আলোচ্য ক্ষেত্রেও চল্লিশ বৎসরের অভিমতটি গ্রহণ করিয়াছেন। তবে এ আয়াত দ্বারা এ বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত হইয়া যায় যে, কূপে নিক্ষিপ্ত হওয়ার পূর্বে বা পরে ইউসুফ (আ)-এর কাছে আগত 'ওয়াহী' নবুওয়াতের ওয়াহী ছিল না, উহা ছিল মূসা (আ)-এর মাতা ও মারয়াম (আ)-এর নিকট আগত সাধারণ ঐশীবাণী (মুখতাসার ইবন কাছীর, ২খ, ২৪৫; বিদায়া, ১খ, ২০৩; মাজহারী, ৫খ, ১৫১; মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ, ৩২-৩৩)। ইউসুফ (আ)-এর নবুওয়াতের ঘোষণার সহিত আল্লাহ তা'আলা ইহাও অবহিত করিলেন যে, উহা ছিল তাহার পূণ্যাত্মা ও জীবনধারার সর্বক্ষেত্রে সৎকর্মশীল হওয়ার প্রতিদান এবং এই প্রতিদান ব্যবস্থা একাকী ইউসুফ (আ)-এর জন্য সীমিত নহে, বরং যে কোন সৎকর্মশীলদের জন্য এই উচ্চ মর্যাদার জীবনব্যবস্থা উন্মুক্ত। ইহা ছাড়া ইহাতে ইউসুফ (আ)-এর নামে পরবর্তী সময়ে উত্থাপিত অপবাদের ব্যাপারেও এই মর্মে অগ্রিম সংবাদ দেওয়া হইল যে, উত্থাপিত অপবাদ সম্পূর্ণ মিথ্যা হইবে। কেননা আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হইতে হিকমত প্রদত্ত ও নবুওয়াত মর্যাদায় ভূষিত কোন ব্যক্তির দ্বারা কখনও কোন অশ্লীল কর্ম সংঘটিত হইতে পারে না।