📄 হযরত ইউসুফ (আ)-এর স্বপ্ন ও ভাইয়ের ষড়যন্ত্র
হযরত ইউসুফ (আ)-এর শৈশবে দেখা একটি তাৎপর্যপূর্ণ স্বপ্নের উল্লেখ দ্বারা কুরআন শরীফে তাঁহার জীবনকথা শুরু করা হইয়াছে। শৈশবের অন্যান্য ঘটনাবলী জীবন-চরিত্রের মুখ্য বিষয় না হওয়ার কারণে পবিত্র কুরআনে উহার উল্লেখ করা হয় নাই। তবে ইসরাঈলী বর্ণনা হইতে জানা যায় যে, শৈশবে মাতার মৃত্যু হওয়ায় ইউসুফ ও তাঁহার কনিষ্ঠ সহোদর বিনয়ামীনের লালন-পালনের ভার কোন নিকট আত্মীয়ের হাতে সোপর্দ করিবার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। পরিবারের আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে এ কাজের জন্য সর্বাধিক যোগ্য ও অধিকারী ছিলেন তাঁহাদের ফুফু অর্থাৎ ইসহাক (আ)-এর জেষ্ঠ্যা কন্যা। ভাগ্যবতী ফুফু তাহার এই ভ্রাতৃপুত্রদ্বয়কে সযত্নে লালন-পালন করিতে লাগিলেন। দৈহিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি ভবিষ্যতের নবী শিশু ইউসুফের চাল-চলন ও স্বভাবজাত আচরণ ছিল অত্যন্ত মধুর ও হৃদয়গ্রাহী। অপরদিকে উল্লিখিত গুণাবলীর সঙ্গে ইউসুফের মুখাবয়বে যে ভবিষ্যত নবুওয়াতের আভাষ লক্ষ্য করিয়াছিলেন, দীর্ঘদিন ছেলেকে দৃষ্টির আড়ালে রাখা পিতার জন্য কষ্টকর ছিল। শিশু ইউসুফ নিজে নিজে চলাফেরা করিবার বয়সে উপনীত হইলে পিতা পুত্রকে নিজের কাছে নিয়া আসিতে চাহিলেন। ফুফু ইউসুফকে অন্তত আরও কিছুদিন নিজের কাছে রাখিয়া দেওয়ার জন্য ভাইয়ের কাছে আবদার জানাইলেন। উহাতে ইউসুফ (আ) অগত্যা সম্মতি প্রদান করিয়া সবর করিতে লাগিলেন। এই সময় ফুফু তাহার ভ্রাতুষ্পুত্রকে নিজের কাছে আটকাইয়া রাখিবার জন্য একটি কৌশল অবলম্বন করিলেন। (কোন কোন বর্ণনামতে পিত্রালয়ে আসিবার মুহূর্তে ফুফু তাহার ফন্দিটি কাজে লাগাইয়াছিলেন এবং কোন কোন বর্ণনামতে পিত্রালয়ে পাঠাইবার পূর্বে থাকালীন অবস্থানকালে ফুফু তাঁহার কৌশল কার্যকর করিয়া ইউসুফের পিত্রালয়ে আগমন রোধ করিয়াছিলেন।) কৌশলটি ছিল এই যে, ফুফু তাহার মূল্যবান একটি হার অথবা কটিবন্ধ গোপনে (কিংবা শুধু ইউসুফের জ্ঞাতসারে অপর সকল হইতে গোপন করিয়া) ইউসুফের কোমরে বাঁধিয়া দিলেন এবং পরক্ষণে তাহার অলংকার হারাইয়া যাওয়ার ঘোষণা দিলেন। অলংকারটি মূল্যবান হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল উহার ঐতিহ্য। অলংকারটি হযরত ইবরাহীম (আ)-এর প্রথমা স্ত্রী সারা (রা) হইতে হাত বদল হইয়া জ্যেষ্ঠত্বের অধিকাররূপে ইসহাক (আ)-এর এই কন্যার মালিকানায় পৌঁছিয়াছিল। অলংকারের তল্লাশি শুরু হইল এবং উহা ইউসুফ (আ) কাছে পাওয়া গেলে আইনত সে 'দোষী' সাব্যস্ত হইল। তৎকালীন শরী'আতী বিধান ছিল হারাইয়া যাওয়া কিংবা চোরাইমাল ধরা পড়িলে অভিযুক্ত ব্যক্তি শাস্তিস্বরূপ এক বৎসরের জন্য মালের মালিকের গোলাম হইয়া থাকিবে। ইউসুফ (আ) এবং সংশ্লিষ্ট সকলে এ ঘটনার রহস্য ও ফুফুর মনোবাসনা বুঝিতে পারিয়া ইহাতে কোন প্রকার বাদানুবাদ করিলেন না এবং নবী হিসাবে শরী'আতের বিধানের কাছে আত্মসমর্পণ করিয়া ইউসুফকে পুনঃ ফুফুর তত্ত্বাবধানে পাঠাইয়া দিলেন। ইয়াকূব (আ) নবুওয়াতী তাকওয়া ও পারিবারিক সম্প্রীতি রক্ষার খাতিরে আল্লাহ্ ফয়সালায় রেযামন্দী ও সবরের পথ অবলম্বন করিলেন। অতঃপর অল্প সময়ের ব্যবধানে ফুফুর মৃত্যু হইলে ইউসুফের 'শাস্তির মেয়াদ' সম্পন্ন হইল এবং তিনি অপেক্ষমাণ পিতার স্নেহ ক্রোড়ে ফিরিয়া আসিলেন।
ইউসুফের প্রতি পিতার অত্যধিক আকর্ষণ ও ভালবাসা তাঁহার বয়োজ্যেষ্ঠ সৎ ভাইদের অন্তরে তাঁহার প্রতি প্রচণ্ড ঈর্ষার জন্ম দিল এবং ক্রমান্বয়ে ইহা জিঘাংসার রূপ পরিগ্রহ করিল। তাহাদের যুক্তি ছিল এই যে, আমরা বয়োজ্যেষ্ঠ ও কর্মঠ এবং পরিবারের যাবতীয় কর্মকাণ্ড ও পিতার খেদমতে আমাদের অবদান এই বাবদ ইউসুফ ও তাঁহার কনিষ্ঠের চেয়ে অনেক বেশি। আমরা এই সংসারের প্রয়োজনীয় ও উপার্জনক্ষম সদস্য। ইউসুফ উপার্জনে অক্ষম। সুতরাং আমরাই পিতার অধিক সুদৃষ্টি, স্নেহ-ভালবাসা ও মনোযোগ প্রাপ্তির অধিকারী। ইউসুফের প্রতি তাঁহার ঐকান্তিক ভালবাসা পক্ষপাতদুষ্ট ও ইনসাফের পরিপন্থী। সুতরাং নিজেদের ন্যায় স্বার্থ হাসিল করা এবং পিতাকে ভ্রান্তি হইতে রক্ষা করিবার জন্য একটি বিহিত ব্যবস্থা অবশ্যই করিতে হইবে। প্রয়োজনে পথের কাঁটা সরাইয়া ফেলিতে হইবে। মোটকথা, তাহাদের প্রতি পিতার স্বল্প মনোযোগের সকল দায় তাহারা ইউসুফের উপর আরোপ করিল এবং তাঁহার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করিতে শুরু করিল। অধিকন্তু পথের কাঁটা ইউসুফকে বিদায় করিয়া মনের জ্বালা মিটাইবার এবং পিতার অখণ্ড মনোযোগ লাভের জন্য তাহারা বিভিন্ন ফন্দি আঁটিতে ও সলাপরামর্শ করিতে লাগিল।
এই পরিস্থিতিতে ইউসুফ (আ) তাঁহার ভবিষ্যৎ জীবনের উন্নতি ও সমৃদ্ধি এবং ভাইদের উপর তাঁহার শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রাধান্য লাভের প্রতি স্পষ্ট ইংগিতবহ একটি স্বপ্ন দেখিলেন। পবিত্র কুরআনের ভাষায়: نَحْنُ نَقُصُّ عَلَيْكَ أَحْسَنَ الْقَصَصِ بِمَا أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ هَذَا الْقُرْآنَ وَإِنْ كُنْتَ مِنْ قَبْلِهِ لَمِنَ الغُفِلِينَ، إِذْ قَالَ يُوسُفُ لِأَبِيهِ يَابَتِ إِنِّي رَأَيْتُ أَحَدَ عَشَرَ كَوكَبًا وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ رَأَيْتُهُمْ لِي سَجِدِينَ.
"আমি তোমার নিকট উত্তম কাহিনী বর্ণনা করিতেছি ওহীর মাধ্যমে তোমার নিকট এই কিতাব প্রেরণ করিয়া। অবশ্যই ইহার পূর্বে তুমি ছিলে অনবহিতদের অন্তর্ভুক্ত। স্মরণ কর, ইউসুফ তাহার পিতাকে বলিয়াছিল, হে আমার পিতা! আমি তো দেখিয়াছি একদল নক্ষত্র, সূর্য এবং চন্দ্রকে, দেখিয়াছি উহাদিগকে আমার প্রতি সিজদাবনত অবস্থায়" (১২: ৩, ৪)।
অর্থাৎ আমি যে আপনার নিকট এই কুরআন প্রেরণ করিলাম উহার মাধ্যমে, আমি আপনার নিকট পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ কাহিনীটি সর্বোত্তম বর্ণনাভঙ্গী সহকারে বিবৃত করিতেছি। অর্থাৎ সাহাবীগণের সুন্দর কাহিনী শুনিবার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশের পূর্বে এবং ইয়াহুদী ও মুশরিকরা আপনাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করিবার পূর্বে আপনি অবশ্যই এ কাহিনী সম্পর্কে কিছুই অবহিত ছিলেন না। কেননা আপনি তো কোন বই-কিতাব পাঠ করেন নাই অথবা কোন শিক্ষকের নিকটে শিক্ষালাভ করেন নাই এবং ঘটনাটিও (আরবদেশে) এত প্রসিদ্ধ ছিল না যে, লোকমুখে উহা শুনিয়া থাকিবেন।"
সুতরাং আপনার উম্মী হওয়া ও কোন কিতাবীর নিকট হইতে আপনার পক্ষে ইউসুফের সবিস্তার ঘটনা জানিবার অবকাশ না থাকিবার পরিপ্রেক্ষিতে ইহা আপনার নবুওয়াতের অকাট্য প্রমাণ বহন করে।
ইউসুফের মূল কাহিনীর সূচনা ছিল এইরূপ: ইউসুফ তাঁহার পিতা ইয়াকূবকে বলিল, আমি স্বপ্নে দেখিলাম এগারটি তারকা এবং সূর্য ও চন্দ্রকে আমি দেখিলাম, উহারা আমাকে সিজদা করিতেছে (১২: ৪)। ইয়াকূব (আ) ছিলেন স্বপ্নের ব্যাখ্যা বিষয়ে অভিজ্ঞ ও পারদর্শী। ইহা ছাড়া স্বপ্নটির বিষয়বস্তু ছিল বেশ স্পষ্ট। স্বপ্নের ব্যাখ্যা সম্পর্কে ইবন আব্বাস (রা) বলিয়াছেন, এগারটি তারকা দ্বারা ইউসুফ (আ)-এর এগারজন ভাইকে এবং সূর্য ও চন্দ্র দ্বারা তাঁহার পিতা-মাতাকে বুঝানো হইয়াছে। ইতোপূর্বে ইউসুফ (আ)-এর মাতার মৃত্যু হওয়ার তথ্যকে স্বীকৃতি প্রদানকারী মুফাসসিরগণ এ ক্ষেত্রে মায়ের স্থলে খালাকে বুঝানো হইয়াছে বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। অনেক মুফাসসির মাতার মৃত্যু হওয়া সংক্রান্ত বর্ণনাকে অপ্রামাণ্য সাব্যস্ত করিয়া এ ক্ষেত্রে জন্মদাত্রী মাতা হওয়ার এবং স্বপ্নের ব্যাখ্যা বাস্তবে রূপায়িত হওয়া পর্যন্ত বাঁচিয়া থাকিবার অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন। মাতার মৃত্যু হওয়ার মত পোষণকারীদের মধ্যে কেহ কেহ স্বপ্নের ব্যাখ্যা বাস্তবায়িত হওয়ার সময় (চল্লিশ কিংবা আশি বৎসর পরে) তাহার পুনরায় জীবিত হওয়ার দাবি ব্যক্ত করিয়াছেন। অধিকাংশের মতে সূর্য দ্বারা পিতা এবং চন্দ্র দ্বারা মাতা কিংবা খালা এবং কাহারো কাহারো মতে ইহার বিপরীত উদ্দেশ্য ছিল। স্বপ্নটি দেখার সময় সম্পর্কে লায়লাতুল কদরে জুমুআর রাত্রে হওয়ার বর্ণনা পাওয়া যায় (কুরতবীর বরাতে মাআরিফুল কুরআন, ৫খ, পৃ. ৬; মাজহারী, ৫খ, ১৩৬)। ইবন কাছীর প্রমুখ এই প্রসঙ্গে জনৈক ইয়াহুদী কর্তৃক নবী সল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের কাছে ইউসুফকে সিজদাকারীরূপে স্বপ্নে দেখা এগার তারকার নাম-পরিচয় জিজ্ঞাসা করিবার বিবরণ দিয়াছেন। সাঈদ ইবন মানসুর, আবু ইয়ালা, বাযযার, উকায়লী, ইবন হিববান, হাকিম, আবু নুআয় ও বায়হাকী তাহাদের হাদীস গ্রন্থসমূহে এবং ইবন জারীর, ইবনুল মুনযির, ইবন আবু হাতিম, আবুশ শায়খ ও ইবন মারদাওয়ায়হ প্রমুখ তাঁহাদের তাফসীর গ্রন্থে জাবির (রা) সূত্রে বর্ণনা করিয়াছেন, ইয়াহুদী বুস্তানা (অথবা বুস্তান) (بستان / بستانه) প্রশ্ন করিল, হে মুহাম্মদ! ইউসুফ যে তারকাগুলি দেখিয়াছিলেন সেগুলির নাম সম্পর্কে আমাকে অবহিত করুন। নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম তখন জবাব প্রদান না করিয়া নীরবতা অবলম্বন করিলেন। ইতোমধ্যে জিবরীল (আ) নামগুলিসহ অবতরণ করিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম ইয়াহুদীকে ডাকাইয়া আনিয়া বলিলেন, আমি নামগুলি বলিয়া দিলে তুমি ইসলাম গ্রহণ করিবে তো? য়াহুদী হাঁ-সূচক জবাব দিলে তিনি বলিলেন, তারকাগুলির নাম হইল (১) জুরয়ান (২) আত্-তারিক (৩) দিয়াল (৪) ক্বাবিস (৫) আল-আমূদান (৬) আল-ফির’উ (৭) যু-নওয়াব (৮) যু-লুকতাইনি (৯) আল-ফির’উ (১০) আল-মুসবিহ (১১) আল-ফীলিক্ব। বিভিন্ন বর্ণনায় ইহার ক্রমিক পূর্বাপর হইয়াছে (দ্র. বিদায়া, ১খ, ১৯৯, ২০০; কুরতুবী, ৫খ, ১২১; মাজহারী, ৫খ, ১৩৬)।
প্রিয় পুত্রের উজ্জ্বল ভবিষৎ ও নবুওয়াত লাভের ইংগিতবাহী স্বপ্ন দর্শনে ইয়াকূব (আ)-কে অতিশয় আনন্দিত করিল (ইবন কাছীর, ২খ, ২৪০)। তিনি আনন্দাতিশয্যে পুত্রকে জড়াইয়া ধরিলেন এবং ভাইদের হিংসা ও শয়তানের চক্রান্ত হইতে হিফাজত করিবার উদ্দেশ্যে ভাইদের কাছে স্বপ্নের কথা ব্যক্ত না করিবার উপদেশ দিলেন। অতঃপর তাঁহাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা সংক্রান্ত তাঁহার সমুজ্জল ভবিষ্যতের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা প্রদান করিলেন। কুরআনের ভাষায়:
قَالَ يَبْنَى لَا تَقْصُصْ رُؤْيَاكَ عَلَى أَخْوَتِكَ فَيَكِيدُوا لَكَ كَيْدًا إِنَّ الشَّيْطَانَ الإِنْسَانِ عَدُوٌّ مُّبِينٌ. وَكَذَلِكَ يَجْتَبِيكَ رَبُّكَ وَيُعَلِّمُكَ مِنْ تَأْوِيلِ الْأَحَادِيثِ وَيُتِمُّ نِعْمَتَهُ عَلَيْكَ وَعَلَى آلِ يَعْقُوبَ كَمَا أَتَمَّهَا عَلَى أَبَوَيْكَ مِنْ قَبْلُ إِبْرَاهِيمَ وَإِسْحَقَ إِنَّ رَبَّكَ عَلِيمٌ حَكِيمٌ ...
"সে (ইয়াকূব) বলিল, হে আমার বৎস! তোমার স্বপ্ন-বৃত্তান্ত তোমার ভ্রাতাদের নিকট বর্ণনা করিও না, করিলে তাহারা তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করিবে। শয়তান তো মানুষের প্রকাশ্য শত্রু। এইভাবে তোমার প্রতিপালক তোমাকে মনোনীত করিবেন এবং তোমাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষা দিবেন এবং তোমার প্রতি ও ইয়াকুবের পরিবার-পরিজনের প্রতি তাঁহার অনুগ্রহ পূর্ণ করিবেন, যেভাবে তিনি ইহা পূর্বে পূর্ণ করিয়াছিলেন তোমার পিতৃ-পুরুষ ইবরাহীম ও ইসহাকের প্রতি। নিশ্চয় তোমার প্রতিপালক সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়" (১২ ৪-৬)।
স্বপ্নের বিষয়বস্তু অত্যন্ত স্পষ্ট ছিল যে, ভবিষ্যতের কোন এক সময় ইউসুফ (আ) নবুওয়াত ও অন্যান্য মর্যাদায় উন্নীত হইবেন যাহার কারণে সকল ভাই কনিষ্ঠ ইউসুফের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করিয়া নিয়া তাঁহার আনুগত্য করিতে বাধ্য হইবে। ভাইয়েরা নবী পরিবারের সদস্য হওয়ার কারণে স্বপ্নের এগার তারকা দ্বারা এগার ভাই উদ্দেশ্য হওয়ার ব্যাখ্যাটি বুঝিতে পারিয়া ইউসুফের ক্ষতিসাধনে সচেষ্ট হইতে পারিত এই আশংকায় ইয়াকূব (আ) ভাইদের কাছে স্বপ্নটি ব্যক্ত করিতে নিষেধ করেন। ভাইদের মধ্যে বিনয়ামীন ইউসুফের সহোদর ছিলেন। তাহার পক্ষ হইতে বিদ্বেষ বা চক্রান্তের আশংকা না থাকিলেও তাহার বয়স অত্যন্ত কম হওয়ার কারণে স্বপ্নের মর্ম সৎভাইদের বিদ্বেষ ও চক্রান্ত করিবার বিষয়টি বুঝিতে না পারিবার কারণে তাহার দ্বারা স্বপ্নের কথা প্রকাশ হইয়া যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। এই কারণে ভাইদের কাহারো কাছে স্বপ্নের কথা ব্যক্ত করিতে ইয়াকূব (আ) নিষেধ করিয়াছিলেন। সেই সঙ্গে নবীর সন্তান হইয়া ভাই ভাইয়ের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করিবার কারণ ছিল শয়তানের কুমন্ত্রণা এবং ইউসুফের অবর্তমানে পিতার প্রিয়পাত্র হওয়ার আকাংক্ষা (দ্র. ১২ঃ ৫-৯)। ইউসুফকে সর্ক করিবার কাজটি সম্পন্ন করিবার পরে ইয়াকূব পুত্রের স্বপ্নে আনন্দিত হওয়ার বিষয়টি প্রকাশ করিবার জন্য স্বপ্নের ব্যাখ্যাস্বরূপ তাঁহাকে তাঁহার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা অবহিত করিলেন। ইয়াকূব (আ)-এর এইরূপ সতর্কতা অবলম্বন সত্ত্বেও যে কোন উপায়ে ভাইয়েরা ইউসুফের স্বপ্নের কথা জানিয়া ফেলিল। কি উপায়ে তাঁহার স্বপ্নের কথা জানিয়াছিল সে সম্পর্কে ইতিহাসের বর্ণনা স্পষ্ট নয়। (আদি পুস্তক: ২৭: ১০) কাহারও মতে ইউসুফ (আ)-এর বয়স কম হওয়ার কারণে পিতার সাবধান বাণীর কথা ভুলিয়া গিয়াছিলেন এবং কোন অসতর্ক মুহূর্তে তিনি নিজেই ভাইদের কাছে স্বপ্নের কথা ব্যক্ত করিয়াছিলেন। কাহারও মতে পিতার কাছে স্বপ্নের বর্ণনা দেওয়ার সময় ইয়াকুব (আ)-এর স্ত্রী লায়্যা উহা শুনিয়া ফেলিয়াছিলেন। তিনি স্বামীর কাছে কিংবা পর্দার আড়ালে ছিলেন। ইয়াকূব (আ) তাহাকে তাহার পুত্রদের কাছে স্বপ্নের বিষয় ব্যক্ত করিতে নিষেধ করিয়াছিলেন। কিন্তু লায়্যা নিজ সন্তানের প্রতি ভালবাসার কারণে এ নিষেধাজ্ঞা অমান্য করিয়া পুত্রদের কাছে ইউসুফের স্বপ্নের কথা ফাঁস করিয়া দিয়াছিলেন এবং পুত্রদেরকে এই বলিয়া উত্তেজিত করিয়াছিলেন যে, ইহার অর্থ তো এই যে, এক সময় তোমরা ও তোমাদের মাতা ইউসুফের করতলগত হইবে। কোন কোন বর্ণনায় ইউসুফ কর্তৃক তাহার সহোদর ভাই বিনয়ামীনকে এবং অবুঝ বিনয়ামীন কর্তৃক সৎভাইদেরকে স্বপ্ন ব্যক্ত করিবার কথা বলা হইয়াছে (মা'আরিফ, ৫খ, পৃ. ১৮; আল-কামিল, ১খ, ১০৫)। এ সম্পর্কে তাওরাতের বর্ণনা ভ্রান্তিপূর্ণ। উহাতে বলা হইয়াছে যে, ইউসুফ (আ) ভাইদের উপস্থিতিতেই পিতাকে স্বপ্নের কথা শুনাইয়াছিলেন। তাওরাতে ইয়াহুদীদের বিকৃতি সাধনের বিষয়টি সর্বজনবিদিত। পবিত্র কুরআনের স্পষ্ট ভাষ্যও "তোমার ভাইদের কাছে তোমার স্বপ্ন ব্যক্ত করিও না" তাওরাতের বর্ণনা খণ্ডন করে। ইউসুফ (আ) তাঁহার এই গুরুত্বপূর্ণ স্বপ্নের কথা ভাইদের অসাক্ষাতে একাকী পিতার কাছে বর্ণনা করাই যুক্তিযুক্ত। এক্ষেত্রে তাওরাতের আরও একটি ভ্রান্তি এই যে, উহাতে স্বপ্নের বর্ণনা শুনিয়া ইয়াকূব (আ)-এর ইউসুফের প্রতি ক্রুদ্ধ হওয়ার কথা বলা হইয়াছে। অথচ পবিত্র কুরআনে উহার কোন উল্লেখ নাই, বরং ভাইদের নিকট ব্যক্ত করিতে নিষেধ করা এবং ইউসুফ (আ)-এর স্বর্ণোজ্জল ভবিষ্যতের বর্ণনা প্রদান ইয়াকুব (আ)-এর আনন্দিত হওয়াই প্রমাণ করে। তদুপরি পুত্রের ভবিষ্যৎ উন্নতিতে, বিশেষত একজন নবী পিতার পক্ষে তাঁহার প্রিয়তম পুত্রের ভবিষ্যৎ নবুওয়ত প্রাপ্তিতে ক্ষুব্ধ ও ব্যথিত না হইয়া বরং পরম আনন্দিত হওয়াই স্বাভাবিক।
মোটকথা, হিংসার বশবর্তী সৎভাইয়েরা এখন ইউসুফ (আ)-এর ব্যাপারে একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌছিবার জন্য গোপন বৈঠকে বসিল। তাহারা এইরূপ সম্মিলিত সিদ্ধান্তে উপনীত হইল যে, আমরা বয়োজ্যেষ্ঠ ভাইয়েরা একটি শক্ত-সমর্থ সংঘবদ্ধ দল হওয়া সত্ত্বেও ইউসুফ ও তাঁহার সহোদরকে অধিক ভালবাসা আমাদের পিতার একটি ভ্রান্ত কাজ। সুতরাং উহার প্রতিকারের কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করিয়া পিতার অখণ্ড মনোযোগ লাভের চেষ্টা করা আমাদের কর্তব্য। লক্ষ্য হাসিলের জন্য বৈঠকে প্রথমে চরম পন্থারূপে ইউসুফকে একেবারে খুন করিয়া ফেলা অথবা দূর-দূরান্তে কোথাও ফেলিয়া রাখিয়া আসার প্রস্তাব উত্থাপিত হইল। এই জঘন্য কর্ম মহাপাপ হইবার ব্যাপারে তাহারা পাপ সম্পাদনের পরে তওবা করিয়া সদাচারী হইবার কথাও উল্লেখ করিল (দ্র. ১২: ৯)। তবে তুলনামূলক স্বভাব কোমলতার অধিকারী এবং খুনের ন্যায় মারাত্মক পাপ সম্পাদনে ভীত এক ভাই ইউসুফকে কোন কূপে ফেলিয়া দিয়া একদিকে পথের কাঁটা সরাইবার লক্ষ্য অর্জন এবং অপরদিকে প্রত্যক্ষ খুনের দায় হইতে রক্ষা পাইবার বিকল্প প্রস্তাব পেশ করিল। আলোচনার পর শেষোক্ত প্রস্তাব চূড়ান্ত সিদ্ধান্তরূপে গৃহীত হইল। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য ইউসুফকে পিতার দৃষ্টি ও সন্নিকট হইতে দূরে লইয়া যাওয়া প্রয়োজনীয় ছিল। ইউসুফের প্রতি ভাইদের মনোভাব উপলব্ধি করিয়া এবং বিশেষত স্বপ্ন দেখিবার পরে ইয়াকূব (আ) ইউসুফ (আ)-কে কখনও চোখের আড়াল করিতেন না এবং সৎ ভাইদের সঙ্গেও কোথাও বেড়াইতে কিংবা পশু চরাইবার স্থানে যাইতে দিতেন না। কুরআন কারীমের বর্ণনা দ্বারায় ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, ইতোপূর্বে ও ইউসুফকে বাড়ির বাহিরে নিয়া যাইবার ব্যাপারে পিতা ইয়াকুব (আ) ইউসুফের নিরাপত্তার ব্যাপারে শঙ্কিত হওয়ার কথা প্রকাশ করিয়াছিলেন (দ্র. ১২:৪০)। সুতরাং এইবার সহোদরেরা ইউসুফকে বিনোদন ভ্রমণে সঙ্গে নিয়া যাইবার ব্যাপারে পিতার কাছে বাকচাতুর্যে জোরদার ও সম্মিলিত অনুরোধ জানাইবার পরামর্শ করিয়া একত্রে পিতার কাছে উপস্থিত হইল এবং ভাব ও ভাষায় পিতাকে নিশ্চিত করিবার অভিনয় করিয়া বিনোদন ভ্রমণে ইউসুফকে তাহাদের সঙ্গে যাওয়ার অনুমতি প্রদানের প্রার্থনা জানাইল। কুরআন শরীফের ভাষায় :
لَقَدْ كَانَ فِي يُوسُفَ وَاٰيٰتٌ لِّلسَّائِلِيْنَ. اِذْ قَالُوْا لَيُوْسُفُ وَاَخُوْهُ اَحَبُّ اِلٰى اَبِيْنَا مِنَّا وَنَحْنُ عُصْبَةٌ اِنَّ اَبَانَا لَفِيْ ضَلٰلٍ مُّبِيْنٍ. اُقْتُلُوْا يُوْسُفَ اَوِ اطْرَحُوْهُ اَرْضًا يَّخْلُ لَـكُمْ وَجْهُ اَبِيْكُمْ وَتَكُوْنُوْا مِنْ بَعْدِه قَوْمًا صَالِحِيْنَ. قَالَ قَائِلٌ مِّنْهُمْ لَا تَقْتُلُوْا يُوسُفَ وَاَلْقُوْهُ فِيْ غَيٰبَةِ الْجُبِّ يَلْتَقِطْهُ بَعْضُ السَّيَّارَةِ اِنْ كُنْتُمْ فٰعِلِيْنَ. قَالُوْا يٰاَبَانَا مَا لَكَ لَا تَاْمَنَّا عَلٰى يُوْسُفَ وَاِنَّا لَـهُ لَنَاصِحُوْنَ. اَرْسِلْهُ مَعَنَا غَدًا يَّرْتَعْ وَيَلْعَبْ وَاِنَّا لَـهُ لَحٰفِظُوْنَ.
“ইউসুফ ও তাহার ভ্রাতাদের ঘটনায় জিজ্ঞাসুদের জন্য অবশ্যই নিদর্শন রহিয়াছে। স্মরণ কর, তাঁহারা বলিয়াছিল, আমাদের পিতার নিকট ইউসুফ এবং তাহার ভ্রাতাই আমাদের অপেক্ষা অধিক প্রিয়, অথচ আমরা একটি সংহত দল; আমাদের পিতা স্পষ্ট বিভ্রান্তিতেই আছে। তোমরা ইউসুফকে হত্যা কর অথবা তাহাকে কোন স্থানে ফেলিয়া আস, ফলে তোমাদের পিতার দৃষ্টি শুধু তোমাদের প্রতিই নিবিষ্ট হইবে এবং তাহার পর তোমরা ভাল লোক হইয়া যাইবে। উহাদের মধ্যে একজন বলিল, তোমরা ইউসুফকে হত্যা করিও না এবং যদি কিছু করিতেই চাহ তবে তাহাকে কোন কূপের গভীরে নিক্ষেপ কর, যাত্রীদলের কেহ তাহাকে তুলিয়া লইয়া যাইবে। উহারা বলিল, হে আমাদের পিতা! ইউসুফের ব্যাপারে তুমি আমাদিগকে বিশ্বাস করিতেছ না কেন, অথচ আমরা তো উহার শুভাকাঙ্ক্ষী? তুমি আগামী কল্য তাহাকে আমাদের সঙ্গে প্রেরণ কর, সে তৃপ্তি সহকারে খাইবে ও খেলাধুলা করিবে। আমরা অবশ্যই তাহার রক্ষণাবেক্ষণ করিব” (১২:৭-১২)।
ভাইদের পরামর্শকালে ইউসুফকে হত্যা করিবার কিংবা দেশান্তরিত করিবার প্রস্তাবকারী কে ছিল এবং ভিন্নমত পোষণ করিয়া তাহাকে কূপে নিক্ষেপ করিবার প্রস্তাব কে করিয়াছিল এবং পিতার কাছে তাহাদের বক্তব্য কে উপস্থাপন করিয়াছিল—এই ব্যাপারে মুফাসসির ও ঐতিহাসিকগণের মধ্যে মতভেদ রহিয়াছে। হত্যা প্রস্তাবের উপস্থাপন সম্পর্কে ওয়াহব (র), কাব (র) এবং মুকাতিল (র) যথাক্রমে শামউন দান ও বাগবীর মতে রুবেন-এর নাম উল্লেখ করিয়াছেন (মাজহারী, ৫খ, ১৪৩)। কিন্তু ইবন আব্বাস (রা) ও সুদ্দীর মতে কূপে নিক্ষেপের প্রস্তাবকারী ছিলেন তাহাদের বড় ভাই ইয়াহুদা। বাগবী এই মতকে বিশুদ্ধ বলিয়া মন্তব্য করিয়াছেন। কাতাদা (র)-এর মতে রুবেন এই প্রস্তাবকারী ছিলেন। মুজাহিদ ইবন ইসহাকও অনুরূপ অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন। মুজাহিদ (র)-এর মতে এই প্রস্তাবকারী ছিলেন শাম'উন (তাফসীরে ইবন কাছীর, ২খ, ২৪১; বিদায়া-নিহায়া, ১খ, ২০০; মাজহারী, ৫খ, ১৪৪; মাআরিফুল কুরআন, ৫খ, ১৯)। পিতার কাছে বক্তব্য উপস্থাপনের কাজটি তাহারা এককভাবে না করিয়া সম্মিলিতরূপে করিয়াছিলেন।
পুত্রদের এইরূপ বক্তব্যের পর ইয়াকূব (আ) তাহাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করিতে পারিলেন না। কেননা সে ক্ষেত্রে ইউসুফের নিরাপত্তার ব্যাপারে তাঁহার ভাইদের অবিশ্বাস করার প্রশ্ন দেখা দিত এবং সেই সাথে ইউসুফের প্রতি ভাইদের প্রকাশ্য শত্রুতায় অবতীর্ণ হওয়ার প্রবল আশংকাও ছিল। আবার ইউসুফকে ভাইদের সাথে যাইতে দেওয়ার ব্যাপারেও ইয়াকুব (আ) উদ্বেগমুক্ত ছিলেন না। সুতরাং তিনি উভয় দিক রক্ষা করিবার জন্য ইউসুফের ব্যাপারে ভাইদের প্রতি আস্থা না থাকিবার বিষয়টিতে প্রচ্ছন্ন ইংগিতে শুধু নিজের দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগ ব্যক্ত করিলেন এবং ইউসুফকে চোখের আড়াল করিতে সম্মত না হওয়ার ব্যাপারে একটি আশংকার প্রতি পুত্রদের দৃষ্টি আকর্ষণ করিলেন। এইভাবে তাহাদিগকে অবিশ্বাস করিবার অভিযোগটি লঘু ও অমূলক করিবার প্রয়াস পাইলেন। তিনি বলিলেন:
قَالَ إِنِّي لَيَحْزُنُنِي أَنْ تَذْهَبُوا بِهِ وَأَخَافُ أَنْ يَأْكُلَهُ الذِّئْبُ وَأَنْتُمْ عَنْهُ غَافِلُونَ .
"সে বলিল, ইহা আমাকে কষ্ট দিবে যে, তোমরা তাহাকে লইয়া যাইবে এবং আমি আশংকা করি তোমরা তাহার প্রতি অমনোযোগী হইলে তাহাকে নেকড়ে বাঘ খাইয়া ফেলিবে" (১২: ১৩)।
পিতার এই জবাবের পর তাঁহার সন্দেহকে অমূলক বলিয়া তাঁহার সান্ত্বনার জন্য তাহারা সমস্বরে বলিয়া উঠিল:
قَالُوا لَئِنْ أَكَلَهُ الذِّئْبُ وَنَحْنُ عُصْبَةٌ إِنَّا إِذًا لَخَاسِرُونَ .
"আমরা একটি সুসংহত দল হওয়া সত্ত্বেও আমাদের ছোট ভাইকে বাঘে খাইয়া ফেলিলে তো আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হইব" ১২: ১৪।
সুতরাং আপনি নিশ্চিন্তে তাহাকে আমাদের সঙ্গে যাইতে দিন, তাহাতে আপনি আমাদের যোগ্যতা ও আস্থাভাজন হওয়ার এবং আপনার সন্দেহ অমূলক হওয়ার প্রমাণ পাইবেন।
তাফসীরবিদগণ ইয়াকুব (আ)-এর দুশ্চিন্তা ও ভীতির ব্যাখ্যায় লিখিয়াছেন যে, আশপাশের বনজঙ্গলে নেকড়ে বাঘের আধিক্য ছিল এবং ইয়াকূব (আ) বাস্তবেই পুত্রদের অমনযোগতিার কারণে দুর্ঘটনার আশংকা করিয়াছিলেন। বাগাবী এ প্রসঙ্গে ইয়াকূব (আ)-এর একটি স্বপ্নের কথা উল্লেখ করিয়াছেন, যাহাতে তিনি একটি নেকড়েকে ইউসুফ (আ)-এর উপর আক্রমণ করিতে দেখিয়াছিলেন। তাফসীরে মাজহারীতে বাগবীর এ বক্তব্য নবীগণের স্বপ্ন অকাট্য হওয়ার যুক্তিতে প্রত্যাখ্যান করা হইয়াছে। আমাদের মতে এ যুক্তি এ কারণে গ্রহণযোগ্য নয় যে, নবীগণের স্বপ্ন অকাট্য বটে। কিন্তু স্বপ্নের বাস্তব রূপায়ন স্বপ্নে দেখা আকৃতি ও পন্থা হইতে ভিন্নতর হইতে পারে। ইয়াকূব (আ)-এর দেখা স্বপ্নের বিবরণে অন্য একটি বর্ণনায় আছে, তিনি নিজেকে একটি পাহাড়ের উপর এবং ইউসুফ (আ)-কে উহার পাদদেশে দেখিতে পাইলেন। হঠাৎ দশটি নেকড়ে ইউসুফকে বেষ্টন করিয়া ফেলিল এবং তাহাকে আক্রমণ করিতে উদ্যত হইল। কিন্তু উহাদের মধ্য হইতে একটি নেকড়ে আক্রমণ প্রতিহত করিয়া ইউসুফকে রক্ষা করিল। অতঃপর ইউসুফ (আ) মাটির মধ্যে আত্মগোপন করিলেন। এই স্বপ্নেরই ব্যাখ্যা পরবর্তী সময়ে এইভাবে বাস্তব রূপ লাভ করিয়াছিল যে, দশ ভাই ছিল দশটি নেকড়ে এবং যে নেকড়েটি আক্রমণ প্রতিহত করিয়া ইউসুফ (আ)-কে রক্ষা করিয়াছিল সে ছিল বড় ভাই য়াহুদা (মতান্তরে রূবেন বা শাম'উন)। আর মাটির মধ্যে আত্মগোপন করার ব্যাখ্যা কূপের অন্ধকার বা গভীরতা।
হযরত আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা) হইতে প্রাপ্ত একটি রিওয়ায়াতে আছে যে, এই স্বপ্নের কারণে ইয়াকূব (আ) ইউসুফের ভাইদের সম্পর্কেই শংকিত ছিলেন এবং নেকড়ে খাইয়া ফেলিবে বলিয়া ইংগিতে তাহাদিগকেই বুঝাইতে চাহিয়াছিলেন। তবে সংগত কারণেই সব কথা খুলিয়া বলা সমীচীন মনে করেন নাই (মাআরিফুল কুরআন, ৫খ, ৩১, বরাত কুরতুবী)।
মোটকথা, সব দিক বিবেচনা করিয়া ইয়াকূব (আ) ইউসুফ (আ)-কে ভাইদের সংগে যাওয়ার অনুমতি প্রদান করিলেন। তিনি তাঁহার নবুওয়তী জ্ঞানের কারণে নিজ সন্তানদের সম্পর্কে তাঁহার শংকিত হওয়ার কথা প্রকাশ করিলেন না। কেননা ইহাতে তাহাদের ক্ষুব্ধ হইয়া ইউসুফ (আ)-এর প্রতি আরও অধিক শত্রুতাপ্রবণ হইয়া পরবর্তী কোন সুযোগে ইউসুফ (আ)-কে হত্যা করিবার প্রবল আশংকা ছিল। সুতরাং তিনি অনুমতি প্রদান করিলেন এবং সম্ভাব্য সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসাবে ভাইদের নিকট হইতে ইউসুফকে কোন প্রকার পীড়ন না করিবার শপথযুক্ত অংগীকার গ্রহণ করিলেন এবং বিশেষভাবে বড় ভাই রূবেন অথবা য়াহুদাকে ইউসুফকে দেখাশুনা করা, তাহার ক্ষুধা-পিপাসা ও অন্যান্য প্রয়োজনের প্রতি লক্ষ্য রাখা এবং অতিসত্বর ফিরাইয়া নিয়া আসার দায়িত্ব অর্পণ করিলেন। ভাইয়েরা অত্যন্ত স্নেহ-মমতার সহিত পালাক্রমে তাঁহাকে কাঁধে বহন করিতে লাগিল। তাহাদিগকে বিদায় করিবার জন্য ইয়াকূব (আ)-ও বাড়ি হইতে কিছু দূর পর্যন্ত তাহাদের সহিত অগ্রসর হইয়াছিলেন। ভাইদের এইসব আদর-যত্ন ছিল পিতার মনের দ্বিধা দূর করিয়া বাহ্যত তাহাকে নিশ্চিন্ত ও আনন্দিত করিবার জন্য। ইয়াকুব (আ) প্রিয় পুত্রকে আলিংগন করিলেন এবং তাহাকে চুমু খাইয়া বিদায় করিলেন।
ইসরাঈলী বর্ণনামতে পিতা স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হইয়া ইউসুফ (আ)-কে অন্য পুত্রদের সহিত পাঠাইয়াছিলেন। অপর এক বর্ণনামতে পিতার অসম্মতিতে ইউসুফ নিজেই ভাইদের সংগে চলিয়া গিয়াছিলেন। আর একটি বর্ণনায় পুত্রদের চলিয়া যাওয়ার পর ইয়াকূব (আ) একাকী ইউসুফ (আ)-কে তাহাদের পিছনে পাঠাইয়াছিলেন এবং ইউসুফ (আ) পথ হারাইয়া ফেলিলে এক ব্যক্তি তাহাকে ভাইদের পর্যন্ত পৌঁছিতে সাহায্য করিয়াছিল। পবিত্র কুরআনের বর্ণনাধারা এবং বাস্তব অবস্থার বিচারে এই সকল বর্ণনা ত্রুটিপূর্ণ (দ্র কাসাসুল কুরআন, ১খ, ২৮৫; আল-বিদায়া, ১খ, ২০০)।
কুরতুবী উল্লেখ করিয়াছেন যে, ইয়াকূব (আ) দৃষ্টির আড়াল হওয়ার পরই ইউসুফকে কাঁধে বহনকারী ভাই তাঁহাকে সজোরে আছাড় দিয়া মাটিতে ফেলিয়া দিল। অতঃপর ইউসুফ (আ) পায়ে হাঁটিয়া ভাইদের সংগে চলিতে লাগিলেন। কিন্তু ছোট্ট ইউসুফের পক্ষে দীর্ঘক্ষণ হাঁটা সম্ভব হইল না। ভাইদের চলার গতির সহিত তাল রাখিয়া দৌড়াইতে অপারগ হইয়া ইউসুফ (আ) অপর এক ভাইয়ের আশ্রয় গ্রহণ করিয়া তাহার মমতা উদ্রেক করিতে চাহিলে সেও তাহাকে ধাক্কা দিয়া সরাইয়া দিল। ইউসুফ (আ) একে একে সকল ভাইয়ের আশ্রয় প্রার্থনা করিলেন। কিন্তু কেহই তাঁহার প্রতি সামান্য সহানুভূতি বা সমবেদনা ও প্রকাশ করিল না বরং তাহারা তাঁহাকে গালাগালি ও মারধর করিতে লাগিল এবং তাঁহাকে মারিয়া ফেলিবার উপক্রম করিল। ইউসুফ (আ) চিৎকার করিয়া কাঁদিতে ও পিতাকে ডাকিতে লাগিলেন। ভাইয়েরা ব্যাংগ করিয়া বলিল, যে এগারটি তারকা ও চন্দ্র-সূর্যকে সিজদা করিতে দেখিয়াছিলে তাহাদেরকেই ডাক, তাহারা তোমাকে সাহায্য করিবে ও কোলে তুলিয়া নিবে। প্রসঙ্গত কুরতুবী বলিয়াছেন, তাহাদের এই জবাবে বুঝা যায় যে, যে কোন সূত্রে তাহারা ইউসুফ (আ)-এর স্বপ্নের ব্যাপারে অবহিত হইয়াছিল এবং এই স্বপ্ন তাহাদের বিদ্বেষ ও ক্রোধ প্রচণ্ড রূপ ধারণ করিবার কারণ হইয়াছিল।
রূবেন ও অন্য ভাইদের নিকট হইতে নিরাশ হওয়ার পর ইউসুফ (আ) সবশেষে অপেক্ষাকৃত দয়াবান ভাই রাহুদার মমতা উদ্রেক করিবার জন্য বলিলেন (মাআরিফুল কুরআন, ৫খ, ২২, ২৩), ভাইজান! অসহায় পিতা ও তাঁহার অসহায় সন্তান আপনার ছোট ভাইয়ের প্রতি দয়া করুন এবং পিতার সংগে কৃত আপনাদের অংগীকারের কথা স্মরণ করুন। এত অল্প সময়ের ব্যবধানেই আপনারা অংগীকারের কথা ভুলিয়া গেলেন! ইহাতে আল্লাহ তা'আলা য়াহুদার অন্তরে মমতার উদ্রেক করিলেন। সে ইউসুফ (আ)-কে সান্ত্বনা দিয়া বলিল, 'আল্লাহ্র কসম! আমার জীবন থাকিতে তাহারা তোমার কিছু করিতে পারিবে না। অতঃপর য়াহুদা তাহার অন্য ভাইদের লক্ষ্য করিয়া বলিল, তোমরা জান, কোন নিরপরাধকে হত্যা করা কত বড় ভয়ংকর পাপ। আল্লাহকে ভয় কর এবং এই শিশুটিকে তাহার পিতার কাছে পৌছাইয়া দাও। তোমাদের আত্মরক্ষার জন্য অবশ্য তাহার নিকট হইতে পিতার কাছে কোন কথা প্রকাশ না করিবার অঙ্গীকার নিয়া নিতে পার। ভাইয়েরা সমস্বরে বলিল, আমরা তোমার মতলব বুঝিতে পারিতেছি। তোমার ইচ্ছা হইতেছে, তুমি আমাদের সকলের উপর টেক্কা মারিয়া একাকী পিতার প্রিয়পাত্র হইবে। সাবধান! ভাল করিয়া শুনিয়া রাখ, তুমি আমাদের অভিপ্রায়ে বাধা সৃষ্টি করিলে তোমাকেও ইউসুফের ন্যায় অভিন্ন পরিণতি ভোগ করিতে হইবে এবং পিতার কাছে আর ফিরিয়া যাইতে হইবে না। য়াহুদা দেখিল, নয় ভাইয়ের সম্মিলিত শক্তির বিরুদ্ধে রুখিয়া দাঁড়ানো তাহার পক্ষে সম্ভব হইবে না। তখন সে আপোষকামিতার পন্থা অবলম্বন করিয়া বলিল, তোমরা তো ইউসুফকে জীবনে মারিয়া না ফেলিবার ব্যাপারে অংগীকার করিয়াছিলে (আল-কামিল, ১খ, পৃ. ১০৬)। সুতরাং তোমরা যদি ইউসুফের ব্যাপারে কিছু করিবার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়া থাক তবে আমার একটি কথা শোন। নিকটেই একটি পুরাতন কূপ আছে যাহার আশপাশে এখন ঝোপঝাড় জন্মাইয়াছে এবং সাপ, বিচ্ছু ও অন্যান্য হিংস্র প্রাণী সেখানে বাসা বাঁধিয়াছে। ইউসুফকে সে কূপে ফেলিয়া দাও। কোন সাপ তাহাকে দংশন করিয়া মারিয়া ফেলিলে তোমাদের মতলবও হাসিল হইবে এবং তোমরা নিজ হাতে খুন করার পংকিলতা হইতে রক্ষা পাইবে। আর অলৌকিকভাবে কোনক্রমে সে বাঁচিয়া গেলে এই পথে যাতায়াতকারী কোন কাফেলা পানি তুলিবার জন্য কূপে বালতি ফেলিলে সে বালতি বাহিয়া উপরে উঠিয়া আসিবে এবং কাফেলার লোকেরা (প্রচলিত নিয়ম অনুসারে গোলামরূপে) তাহাকে কোন দূর দেশে পৌঁছাইয়া দিবে। তাহাতেও তোমাদের স্বার্থসিদ্ধি ঘটিবে (মাআরিফুল কুরআন, ৫খ, পৃ. ২২, ২৩)।
তখন পূর্ব আলোচনার সূত্র ধরিয়া সকলে একমত হইয়া ইউসুফকে কূপের নিকটে নিয়া গেল এবং তাঁহার গায়ের জামা খুলিয়া উহা দ্বারা (মতান্তরে জামা পরবর্তী প্রয়োজনের জন্য তাহাদের কাছে রাখিয়া দিল এবং রশি দ্বারা) তাঁহার হাত বাঁধিয়া ফেলিল। অতঃপর তাঁহাকে রশি দ্বারা ঝুলাইয়া কিংবা তাঁহাকে কোন বালতিতে বসাইয়া বালতিটি রশি দ্বারা কূপের মধ্যে ঝুলাইয়া দিল। তাফসীরকারগণ লিখিয়াছেন, ভাইয়েরা ইউসুফকে কূপে ফেলিবার উপক্রম করিলে সে কূপের পাড় আঁকড়াইয়া ধরিল। তখন তাহারা তাঁহার জামা খুলিয়া উহা দ্বারা (কিংবা দড়ি দ্বারা) তাঁহার হাত বাঁধিয়াছিল। তখন ইউসুফ পুনরায় ভাইদের কাছে কাকুতি মিনতি করিল এবং কূপের ভিতরে লজ্জা নিবারণের জন্য জামাটি ফেরত চাহিল। নির্দয় ভাইয়েরা এবারও তাঁহাকে স্বপ্নে দেখা সিজদারত চন্দ্র-সূর্য ও এগার তারকাকে সাহায্যের জন্য ডাকিবার পরামর্শ দিল। মোটকথা ঝুলন্ত অবস্থায় কূপের গভীরতার মাঝামাঝি পৌঁছিলে তাহারা (শাম'উন বা অন্য কেহ) রশিটি কাটিয়া দিল। ইউসুফ পানির ভিতরে পড়িয়া গেলেন, কিন্তু আল্লাহ তা'আলার রহমতে কোনরূপ আঘাত পাইলেন না। কূপটির উপরের মুখ সংকীর্ণ হইলেও নিচের দিকে উহা বেশ প্রশস্ত ছিল (মাজহারী)। ইউসুফ (আ) কাছেই একটি বড় পাথর দেখিতে পাইয়া নিরাপদে উহার উপর উঠিয়া বসিলেন। কোন কোন ঐতিহাসিক দীর্ঘদিনের পানিশূন্য একটি পরিত্যক্ত কূপ হওয়ার তথ্য পরিবেশন করিয়াছেন (কাসাসুল কুরআন)। একটি বর্ণনামতে আল্লাহ তা'আলার হুকুমে জিবরীল (আ) পানিতে পড়িবার পূর্বে মাঝপথে ইউসুফ (আ)-কে ধরিয়া ফেলিলেন এবং সযত্নে পাথরটির উপর বসাইয়া দিলেন (মাআরিফুল কুরআন, ৫খ, পৃ. ২২, ২৩, ১৪৬, ১৪৭; মাজহারী ও অন্যান্য)। একটি দুর্বল বর্ণনামতে কূপের অভ্যন্তর হইতে ইউসুফের কান্নার আওয়ায পাইয়া ভাইয়েরা তাঁহাকে ডাকিল। ইউসুফ (আ) ভাইদের মমতা ফিরিয়া আসিবার কথা চিন্তা করিয়া তাহাদের ডাকে সাড়া দিলেন। তখন ভাইয়েরা ইউসুফ সুস্থ ও নিরাপদ রহিয়াছে ভাবিয়া পাথর ছুড়িয়া তাহার মাথা গুড়াইয়া দেওয়ার ইচ্ছা করিলে য়াহুদা তাহাদিগকে উহা হইতে নিবৃত্ত করিল। একটি বর্ণনামতে ইউসুফ (আ) কূপের ভিতর হইতে ভাইদের কাছে তাঁহার জামাটি ফেরত চাহিলে তাহারা পূর্ববৎ সিজদাকারী চন্দ্র-সূর্য ও এগার তারকাকে ডাকিতে বলিল। পবিত্র কুরআন শুধু মূল ঘটনাটি সংক্ষেপে বিবৃত করিয়াছে:
فَلَمَّا ذَهَبُوا بِهِ وَاجْمَعُوا أَنْ يَجْعَلُوهُ فِي غَيْبَتِ الْجُبِّ وَأَوْحَيْنَا إِلَيْهِ لَتُنَبِّئُنَّهُمْ بِأَمْرِهِمْ هُذَا وَهُمْ لَا يَشْعُرُونَ .
"অতঃপর উহারা যখন তাহাকে লইয়া গেল এবং তাহাকে কূপের গভীরে নিক্ষেপ করিতে একমত হইল, এমতাবস্থায় আমি তাহাকে জানাইয়া দিলাম, তুমি উহাদিগকে উহাদের এই কর্মের কথা অবশ্যই বলিয়া দিবে যখন উহারা তোমাকে চিনিবে না" (১২: ১৫)।
বস্তুত অদৃশ্য ও অলৌকিক পন্থায় আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হইতে এই সান্ত্বনা বাণী আসিবার কারণে ভাইদের পক্ষে উহা জানিবার বা বুঝিবার কোন উপায় ছিল না। আল্লাহ তা'আলা ইউসুফ (আ)-কে এ কথাও অগ্রিম জানাইয়া দিলেন যে, সময়ের ব্যবধানে এমন একদিন আসিবে যখন তোমাকে হত্যার ষড়যন্ত্রকারী ভাইয়েরা আমার কুদরতে সাহায্যপ্রার্থী ও অবনতমস্তক হইয়া তোমার সকাশে উপস্থিত হইবে। তোমার অভাবনীয় উন্নতি তাহাদের কল্পনা বহির্ভূত হওয়ার কারণে এবং তখন তোমার রাজকীয় অবস্থান ও বেশভূষার কারণে তাহারা তোমাকে কূপে নিক্ষিপ্ত ও গোলামরূপে বিক্রিত ইউসুফ বলিয়া চিনিতে পারিবে না এবং সে অবস্থায় তোমার নিজ মুখেই তুমি তাহাদের কাছে আজিকার এই দুর্ঘটনার বর্ণনা দিবে। পরবর্তী ঘটনা অনুরূপই ঘটিয়াছিল।
📄 কূপে নিক্ষিপ্ত হওয়ার সময় ইউসুফ (আ)-এর বয়স
নবুওয়াতের সাধারণ বিধান মতে সাধারণত চল্লিশ বৎসর বয়সে আল্লাহ তা'আলা কাহাকেও নবুওয়াত দান করিয়া থাকেন। অবশ্য হযরত ঈসা ও ইয়াহইয়া (আ)-এর ক্ষেত্রে তিনি ইহার ব্যতিক্রম ঘটাইয়াছেন। কূপে নিক্ষিপ্ত হওয়ার সময় ইউসুফ (আ)-এর কাছে আগত ওয়াহী (যাহা অধিকাংশের মতে কূপে নিক্ষিপ্ত হওয়ার পরে এবং অনেকের মতে নিক্ষিপ্ত হওয়ার পূর্ব মুহূর্তে তাঁহার সান্ত্বনার জন্য পাঠানো হইয়াছিল; দ্র. তাফসীরে কুরতুবী) ইহা নবুওয়াতের ওয়াহী ছিল, না ইলহাম ছিল, ইহাতে তাফসীরবিদ ও মুসলিম মনীষীদের মধ্যে মতভেদ রহিয়াছে। কেননা এই সময় ইউসুফ (আ) ছিলেন বালক অথবা কিশোর। এই সময় তাঁহার বয়স ছয় বৎসর হইতে আঠার বৎসরের মধ্যে হওয়ার বিভিন্ন মত রহিয়াছে। মুজাহিদ (র) প্রমুখের মতে ইউসুফ (আ) তখন ছয় বৎসরের শিশু ছিলেন, তখনও তাঁহার দাঁত পড়ে নাই। তাফসীরে মাআরিফুল কুরআনে একাধিক মনীষীর বরাতে এই সময় তাঁহার বয়স সাত বৎসর হওয়ার কথা বলা হইয়াছে (দ্র. মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ, ১৯, ২০)। তাফসীরে মাজহারীতে (৫খ, ১৪৬, ১৪৭) বার বৎসর কিংবা আঠার বৎসর (কালবীর বরাতে) এবং ইবন আবূ শায়বা, আহমাদ, ইবন আবদুল হাকাম, ইবন জারীর, ইবন আবু হাতিম, আবুশ শায়খ, হাকিম, ইবন মারদাওয়ায়হ প্রমুখের সূত্রে হাসান (র)-এর বরাতে সতর বৎসর বলা হইয়াছে কুরতুবী (৫খ, ১২১, ১২২)। ইবন ওয়াহব, মালিক প্রমুখের বরাতে এই সময় ইউসুফ (আ) অপ্রাপ্তবয়স্ক (এবং সাত বৎসরের শিশু) হওয়ার অভিমতকে প্রাধান্য দিয়া উহার অনুকূলে পবিত্র কুরআনের কয়েকটি আয়াতের ভাষ্য ইংগিত হইতে প্রাপ্ত যুক্তি উপস্থাপন করিয়াছেন। যেমন কূপে ফেলিয়া দেওয়া, পিতার কাছে ইউসুফকে তাহাদের সাথে পাঠাইবার আবেদন করা এবং তাঁহাকে হিফাজত করিবার অংগীকার প্রদান (وَأَنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ 12:12); কোন কাফেলা কর্তৃক তাঁহাকে কুড়াইয়া পাওয়া হারানো শিশু (লাকীত) রূপে তুলিয়া নেওয়ার কথা (يَلْتَقِطْهُ 12:10); ইয়াকূব (আ) কর্তৃক ইউসুফকে বাঘে খাইয়া ফেলিবার আশংকা প্রকাশ (أَخَافُ أَنْ يَأْكُلَهُ الذِّئْبُ 12:13) এবং ভ্রাতাগণ কর্তৃক বাঘে খাওয়ার তথ্য প্রদান (فَأَكَلَهُ الذِّئْبُ 12:17) প্রভৃতি আয়াতসমূহ এই সময় ইউসুফ (আ) বেশ ছোট হওয়ার ইংগিত বহন করে। মোটকথা, নবুওয়াতের সাধারণ প্রচলিত বয়স না হওয়ার কারণে মনীষিগণ তাঁহার কাছে আগত ওয়াহীর স্বরূপ সম্পর্কে মতভেদ করিয়াছেন। ইবন জারীর, ইবনুল মুনযির, ইবন আবু হাতিম প্রমুখ কতিপয় মনীষী মুজাহিদ, কাতাদা, হাসান, দাহ্হাক প্রমুখের বরাতে ইহাকে নবুওয়াতী ওয়াহী সাব্যস্ত করিয়াছেন এবং বয়সে ইউসুফ (আ)-এর নবুওয়াত লাভকে হযরত ঈসা ও ইয়াহইয়া (আ)-এর নবুওয়াত লাভের ন্যায় ব্যতিক্রমী ঘটনা বলিয়াছেন। ইবন আব্বাস (রা) প্রমুখ এবং অন্য সকল তাফসীরবিদ, বিদ্বান ও মনীষিগণ এই ওয়াহীকে মূসা (আ)-এর মাতার নিকট আগত ওয়াহ أَرْضِعِيه( )وَأَوْحَيْنَا إِلى أَمْ مُوسَى أَنْ “এবং আমি মূসার মাতার কাছে ওয়াহী পাঠাইলাম যে, তুমি তাহাকে স্তন্য পান করাইতে থাক"....২৮ঃ৭)-এর ন্যায় ইলহাম ছিল এবং পরবর্তী সময় মিসরে অবস্থানকালে পূর্ণ বয়সে পৌঁছিবার পর ইউসুফ (আ)-এর কাছে নবুওয়াতী ওয়াহী পাঠান হইয়াছিল, যাহার উল্লেখ ১২: ২২ আয়াতে রহিয়াছে (আল-জামি লি-আহকামিল কুরআন, কুরতুবী, ৫খ, ১৩৩-১৩৪; তাফসীরে মাজহারী ৫খ, ১৪৬, ১৪৭; মাআরিফুল কুরআন, ৫খ, ১৯, ২০, ২৩; আল-কামিল, ১খ, ১০৬; কাসাসুল আম্বিয়া, ১২১, ১২২ পৃ.)।
📄 কূপের অবস্থান ও পরিচিতি
কেহ কেহ কূপটি সাধারণ চলাচলের পথ হইতে দূরে এবং ঝোপঝাড়যুক্ত ও পানিশূন্য পরিত্যক্ত কূপ বলিয়াছেন। কিন্তু অধিকাংশ মুফাসসিরের বর্ণনায় কূপটি সাধারণ কাফেলা চলাচলের পথিপার্শ্বে এবং পানিযুক্ত ও ব্যবহার্য ছিল বলিয়া বুঝা যায়। মুকাতিল বলিয়াছেন, কূপটি ইয়াকূব (আ)-এর আবাসস্থল হইতে তিন ক্রোশের দূরত্বে ছিল। কা'ব-এর মতে মাদয়ান ও মিসরের মধ্যবর্তী কোন স্থানে এবং ওয়াহব-এর মতে জর্দানের কোন অঞ্চলে ছিল। কাতাদা উহা বায়তুল মুকাদ্দাসের কাছে ছিল বলিয়া অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন। একটি বর্ণনামতে কূপের পানি লবণাক্ত ছিল। ইউসুফ (আ) নিক্ষিপ্ত হওয়ার পর উহা সুপেয় হইয়া গিয়াছিল (ইবন কাছীর, ২খ, ২৪২; মাজহারী, ৫খ, ১৪৬-১৪৭)। ভাইগণ হযরত ইউসুফ (আ)-কে Douthan নামক স্থানে লইয়া গিয়া তাঁহাকে অন্ধকার কূপের মধ্যে নিক্ষেপ করিল।... উহা একটি বাণিজ্যিক বড় রাস্তার নিকটেই অবস্থিত ছিল (ইসলামী বিশ্বকোষ, ২২খ, ১১৮)।
হযরত ইউসুফ (আ)-কে সংগ দেওয়ার জন্য এবং অতিসত্বর তাঁহার কূপ হইতে বাহির হইবার সুসংবাদ দেওয়ার জন্য জিবরীল (আ)-কে তাঁহার কাছে পাঠান হইল। জিবরীল (আ) আসিয়া তাঁহাকে সান্ত্বনা বাণী শুনাইলেন এবং তাঁহার সংগে তাবীজ আকারে রক্ষিত জামাটি বাহির করিয়া উহা তাহাকে পরিধান করাইলেন এবং একটি দোআ শিক্ষা দিলেন (কুরতুবী, ৫খ, ১৪৪)। বর্ণিত মতে ইবরাহীম (আ)-কে বস্ত্রমুক্ত করিয়া অগ্নিগহবরে নিক্ষেপ করিবার সময় জিবরীল (আ) একটি জান্নাতী রেশমী জামা আনিয়া উহা তাঁহাকে পরাইয়া দিয়াছিলেন (এবং উহার ক্রিয়ায় পার্থিব আগুনের দাহ নিষ্ক্রিয় হইয়া গিয়াছিল)। ইবরাহীম (আ) জামাটি ইসহাক (আ)-কে এবং তিনি উহা ইয়াকূব (আ)-কে দিয়াছিলেন। ইয়াকূব (আ) উহা একটি মাদুলীতে ভরিয়া ইউসুফ (আ)-এর গলায় লটকাইয়া দিয়াছিলেন (কুরতুবী, ৫খ, ১৪৩; মাজহারী, ৫খ, ১৪৭, ১৪৮)।
📄 কূপ হইতে ইউসুফ (আ)-এর মুক্তি এবং দাসরূপে মিসর গমন
হযরত ইউসুফ (আ) তিন দিন কূপে অবস্থান করিলেন এবং আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হইতে বিপদমুক্তির ব্যবস্থার প্রতীক্ষায় থাকিলেন। এই তিন দিন য়াহুদা অন্য ভাইদের দৃষ্টি এড়াইয়া ইউসুফের জন্য খাদ্য ও পানীয় নিয়া আসিত এবং বালতি দ্বারা কূপের ভিতরে পৌছাইয়া দিত। ইবন ইসহাকের বর্ণনামতে, ভাইয়েরা ইউসুফের কি হয় এবং সে কি করে উহা দেখিবার জন্য দিনভর কূপের কাছে বসিয়া থাকিত (মুখতাসার ইবন কাছীর, ২খ, ২৪৪)। একটি বর্ণনামতে য়াহুদার দেওয়া পরামর্শ অনুসারে বড় ভাই রাওবীন (রূবেন) অন্য ভাইদের হইতে গোপন করিয়া চুপিসারে ইউসুফকে বাহির করিয়া পিতার কাছে পৌঁছাইবার পরিকল্পনা করিয়াছিল। কেননা সে ইউসুফকে হত্যা করিবার প্রস্তাবের শক্ত বিরোধিতা করিয়াছিল। এই কারণে সে মাঝেমধ্যে কূপের কাছে আসিয়া পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ সন্ধান করিত (কাসাসুল কুরআন, ১খ, ২৮৭)। আল্লাহ তা'আলার কুদরত ইউসুফ (আ)-কে কূপ থেকে বাহির করিবার জন্য এই ব্যবস্থা করিল যে, সিরিয়া (শাম) হইতে মিসরগামী একটি বাণিজ্যিক কাফেলা পথ ভুলিয়া এই কূপের কাছে পৌঁছিল এবং তাহাদের পানির প্রয়োজন দেখা দিলে কাছেই কূপ দেখিয়া পানি তুলিবার জন্য উহাতে বালতি ফেলিল। ভাইদের দেওয়া বালতি মনে করিয়া ইউসুফ (আ) সে বালতিতে উঠিয়া বসিলে কাফেলার লোক তাঁহাকে টানিয়া উপরে তুলিল। পবিত্র কুরআনের উল্লেখ:
وَجَاءَتْ سَيَّارَةٌ فَأَرْسَلُوا وَارِدَهُمْ فَادْلَى دَلْوَهُ قَالَ يُبُشرى هذا غُلْمٌ وَأَسَرُّوهُ بِضَاعَةً وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا يَعْمَلُونَ .
"একটি যাত্রীদল আসিল, উহারা উহাদের পানি সংগ্রাহককে প্রেরণ করিল। সে তাহার পানির ডোল নামাইয়া দিল। সে বলিয়া উঠিল, কী সুখবর! এ যে এক কিশোর! অতঃপর উহারা তাহাকে পণ্যরূপে লুকাইয়া রাখিল। উহারা যাহা করিতেছিল সে বিষয়ে আল্লাহ সবিশেষ অবহিত ছিলেন" (১২: ১৯)।
পৃথিবীর বুকে প্রতিনিয়ত এমন কতক ঘটনা ঘটে যাহার বাহ্যসূত্র আমাদের অবগতির নাগালে না থাকিবার কারণে আমরা সাধারণ মানুষ, সেগুলিকে অসম্ভব, অবিশ্বাস্য, অলৌকিক অথবা 'ঘটনা-চক্রে' ইত্যাদি নামে অভিহিত করিয়া থাকি এবং দার্শনিক ও গবেষকগণ উহাদের কার্যকরণের ব্যর্থ সন্ধানে প্রবৃত্ত হইয়া অহেতুক দিগভ্রান্ত হন। ইহার মূল কারণ আল্লাহ তা'আলার মহাবিশ্ব পরিচালনার রীতিনীতি সম্বন্ধে অজ্ঞতা। অন্যথায় অদৃশ্য লোকের মহাপরিচালন কেন্দ্র হইতে পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হওয়ার কারণে কোন ঘটনাই দুর্ঘটনা বা ঘটনাচক্র নয়, বরং সব ঘটনাই একটি সুনিপুণ ও সুবিন্যস্ত ধারাবাহিকতার যোগসূত্রে গ্রথিত। হযরত ইউসুফ (আ)-কে তাঁহার ভাইয়েরা সাধারণ চলাচলের সড়ক হইতে বিচ্ছিন্ন ও নির্জন অনাবাদী কূপে নিক্ষেপ করিয়াছিল। কেননা জনবসতির কাছাকাছি ও সদাব্যবহার্য কূপে নিক্ষেপ করিলে তাহাদের চক্রান্ত ধরা পড়িবার প্রবল আশংকা ছিল। অপরদিকে ইউসুফের (আ) জীবন্ত অবস্থায় পিতার কাছে ফিরিয়া যাওয়া তাহাদের মনঃপূত ছিল না। কেননা উহাতে পিতার কাছে তাহারা মারাত্মক অপরাধে অপরাধী সাব্যস্ত হইত। আবার সর্বশেষ পরিস্থিতি ও সিদ্ধান্ত অনুসারে তাহারা, বিশেষত য়াহুদা ও রূবেন প্রমুখ মৃত্যুও কামনা করিতেছিল না। ইউসুফ বাঁচিয়া থাকুক, তবে পিতার দৃষ্টি ও অবগতি হইতে দূরে কোথাও অবস্থান করুক, ইহার একমাত্র উপায় ছিল কোন দূরদেশে ইউসুফকে লইয়া যাওয়া। তৎকালে পৃথিবীতে দাসপ্রথা প্রচলিত ছিল এবং মানুষ পণ্যরূপে বেচাকেনা হইত। সুতরাং ইউসুফের ভাইয়েরাও দাসরূপে ইউসুফের বিদেশে পাচার হওয়ার কোন একটি ব্যবস্থা কামনা করিতেছিল। অপরদিকে আল্লাহ তা'আলা তাঁহার নবী ইয়াকূব (আ)-কে দুঃখ দান করিয়া পরীক্ষা করা এবং ইউসুফ (আ)-কে জাগতিক ও আত্মিক উন্নতির উচ্চতম শিখরে উন্নীত করিবার ব্যবস্থা করিতেছিলেন। ইউসুফ (আ)-এর কাছে ভবিষ্যৎ সান্ত্বনা বাণী ও 'এক সময় তুমি তাহাদিগকে তাহাদের কৃতকর্মের বিবরণ দিবে, অথচ তাহারা বুঝিতে পারিবে না' ঘোষণার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াও প্রয়োজন ছিল। সুতরাং কুদরত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সক্রিয় হইয়া উঠিল। শাম হইতে (মতান্তরে মাদয়ান হইতে) মিসরগামী বাণিজ্য কাফেলা পথ ভুলিয়া কান'আন অঞ্চলের অনাবাদ বনাঞ্চলে পৌঁছিল, যেখানের একটি কূপে ইউসুফ (আ) তাঁহার ভবিষ্যৎ উন্নতির বিদ্যাপীঠ মিসরে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করিতেছিলেন। প্রাচীন ঐতিহাসিকগণের বর্ণনামতে এ কাফেলাটি ছিল হেজাযী ও মাদয়ানবাসীদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বাণিজ্য কাফেলা। তাহাদের এই বর্ণনার সূত্র হইতেছে তাওরাতে উপস্থাপিত কাফেলার বিবরণ। তাওরাতে কাফেলাটিকে মাদয়ানী (مدین) অথবা মিদয়ানী (مدیان) বলা হইয়াছে। এই কারণে প্রাচীন ঐতিহাসিকদের কেহ কেহ কাফেলাটির গতিপথ মাদয়ান হইতে মিসর সাব্যস্ত করিয়াছেন। আর অধিকাংশ ঐতিহাসিক কাফেলাটি হেজাযী (ইসমাঈলী) ও মাদয়ানীদের সমন্বয়ে গঠিত হওয়ার তথ্য স্বীকার করিয়া উহার গতিপথ সিরিয়া (শাম) হইতে মিসর অভিমুখে বলিয়াছেন। কিন্তু পরবর্তী গবেষণায় ইহা স্থিররূপে সাব্যস্ত হইয়াছে যে, কাফেলাটি ছিল হেজাযী ইসমাঈলী বংশের এবং তাহাদিগকে মাদয়ানী বা মিদয়ানী বলিবার কারণ তাওরাতে বর্ণিত মাদয়ান ও আরবীয় ভূগোলের হেজাযকে দুইটি ভিন্ন স্থান ধারণা করা হইতে উদ্ভূত। ইবন কাছীর লিখিয়াছেন, মাদয়ান মা'আন অঞ্চলের একটি জনপদ, ইহার অবস্থান শামের শেষ প্রান্তে দূত (সম্প্রদায়ের) উপসাগর (মৃত সাগরের) নিকটবর্তী হিজাযের সন্নিহিত অঞ্চলে (বিদায়া, ১খ, ১৮৪, পৃ.)। সায়্যিদ সুলায়মান নদবীর গবেষণামতে বংশানুক্রমে ভৌগোলিক আধুনিক গবেষণা প্রমাণ করিয়াছে যে, তাওরাতে যে অঞ্চলকে মাদয়ান (مدین) বা মিদয়ান (مدیان) বলা হইয়াছে উহা মূলত সে অঞ্চল যাহা সা'ঈর (ساعين) বা সারাত (سراة) হইতে লৌহিত সাগরের উপকূল বরাবর শাম হইতে য়ামান পর্যন্ত বিস্তৃত। এই অঞ্চলটিকে হযরত মূসা (আ)-এর যুগ হইতে ইসরাঈলীরা মাদয়ান নামে এবং ইসমাঈলীরা পূর্ব হইতেই হিজায নামে অভিহিত করিয়া আসিয়াছে। এই কারণে একই অঞ্চলের জন্য এই দুইটি নাম ব্যবহৃত হইয়াছে (আরদুল কুরআন, ২খ, পৃ. ৪৭, ৪৯; হইতে কাসাসুল কুরআন ১খ, ২৮৭, টীকাসহ)।
মোটকথা, পথভোলা কাফেলাটির পানি সংগ্রহ, অবস্থান ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত অগ্রবর্তী দল তাহাদের পানির প্রয়োজনে কূপে বালতি ফেলিয়া পানির বদলে হযরত ইউসুফ (আ)-কে উত্তোলন করিল। ঐতিহাসিকগণ তাহাদের বর্ণনায় এই উত্তোলনকারী ব্যক্তির পরিচয় প্রদান করিয়াছেন। তবে তাহাদের বর্ণনায় তাহার নামের ব্যাপারে মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। ইবন কাছীর তাহার নাম সম্পর্কে ইবন 'আব্বাস (রা) হইতে ইবন ইসহাকের তথ্যের বরাতে লিখিয়াছেন, "যে ব্যক্তি ইউসুফ (আ)-কে মিসরে নিয়া বিক্রয় করিয়াছিল অর্থাৎ যে তাঁহাকে (কূপ হইতে তুলিয়া এবং ইউসুফ ভ্রাতৃবর্গের নিকট হইতে ক্রয় করিয়া) মিসরে রফতানী করিয়াছিল তাহার নাম মালিক ইবন যু'র ইবন নুওয়ায়ব ইন 'আফকা' (অথবা আন্কা) ইব্ন মিদয়ান ইব্ন ইবরাহীম (আ) (বিদায়া, ১খ, ২০২); ইবনুল আছীরের বর্ণনায় মালিক ইবন ওয়া'র (وعر) (আল-কামিল, ১খ, ১০৭(; কুরতুবীর বর্ণনায় মালিক ইবন দু'র (ذعر - دعر নয়) বলা হইয়াছে (আল-জামি' লিআহকামিল কুরআন, ৫খ, ১৫২)। মুফতী শফী (র) নামটি মালিক ইবন দু'বুর (دعبر যদি মুদ্রণ প্রমাদ না হয়) লিখিয়াছেন (মাআরিফুল কুরআন, ৫খ, ২৭)।
প্রথমে অপ্রত্যাশিত ঘটনা দেখিয়া এবং বালতিতে উপবিষ্ট বালকটির অপার্থিব সৌন্দর্য দেখিয়া উত্তোলনকারী লোকটি আত্মনিয়ন্ত্রণ হারাইয়া 'ওহে সুসংবাদ'! বলিয়া চিৎকার করিয়া উঠিয়াছিল। মতান্তরে 'ইয়া বুশরা' বলিয়া সে বুশরা নামে তাহার এক সাথীকে ডাক দিয়াছিল। পরক্ষণে ঘটনার বাস্তবতা অনুধাবন করিয়া এবং এই অতুলনীয় সুন্দর বালক মিসরের বাজারে অতি উচ্চ মূল্যে বিক্রয় হইবে, এই সত্য উপলব্ধি করিয়া কাফেলার অন্য লোকদেরকে ইহার মূল্যে ভাগ বসাইবার পথ রুদ্ধ করিবার জন্য বিষয়টি চাপিয়া যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। উত্তোলনকারীরা পারস্পরিক পরামর্শে স্থির করিল যে, তাহারা কাফেলার অন্য লোকদের কাছে বালকটির কথা আলোচনা করিবে না কিংবা তাহদিগকে বলিবে, আমরা উহাকে ক্রয় করিয়াছি অথবা তাহার মালিকরা তাহাকে বিক্রয় করিবার জন্য আমাদের সোপর্দ করিয়াছে। এই সিদ্ধান্তের পর তাহারা নিজেদের স্বাভাবিক তৎপরতায় লিপ্ত হইল। ওদিকে য়াহুদা নিত্যকার মত ইউসুফের জন্য খাবার আনিয়া উহা কূপের ভিতর নামাইয়া দিল। কিন্তু কেহ খাবার গ্রহণ করিতেছে না দেখিয়া সে ভয় পাইয়া গেল। কূপের অভ্যন্তরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া এবং ইউসুফকে ডাকিয়া সে তাঁহার সাড়া পাইল না। একটি বর্ণনামতে ইউসুফকে কূপ হইতে তুলিয়া গোপনে পিতার কাছে পৌঁছাইবার সুযোগ সন্ধানী রূবেন ইউসুফকে কূপে দেখিতে না পাইয়া চিন্তিত হইয়া পড়িল। য়াহুদা (অথবা রূবেন কিংবা দুইজনই) দৌড়াইয়া গিয়া অপর ভাইদের ঘটনা অবহিত করিল। ইউসুফ কোন উপায়ে পিতার কাছে পৌঁছিয়া যাইতে পারে এই আশংকায় তাহারা অবিলম্বে কূপের কাছে পৌঁছিল এবং আশপাশে ইউসুফের অস্তিত্ব সন্ধান করিতে লাগিল। কাছেই একটি কাফেলাকে অবস্থান করিতে দেখিয়া তাহাদের উপর ভাইদের সন্দেহ দৃষ্টি নিপতিত হইল এবং অনুসন্ধান ও তল্লাশীর পর ইউসুফকে তাহাদের নিকট পাওয়া গেল। ভাইয়েরা ইউসুফকে তাহাদের দুষ্ট প্রকৃতির গোলাম বলিয়া পরিচয় দিল এবং পলাতক গোলামকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য কাফেলার লোকদের অভিযুক্ত করিল। ইউসুফকে উত্তোলনকারী মালিক ও তাহার সংগীরা বিদেশ-বিভুঁইয়ে চুরির দায় হইতে রক্ষা পাওয়ার জন্য পলায়নে অভ্যস্ত গোলামটি ক্রয় করিবার প্রস্তাব করিল। ভাইয়েরা উহাকে তাহাদের স্বার্থ সিদ্ধির সহজ উপায় দেখিতে পাইয়া উহাতে সম্মতি প্রকাশ করিল। একটি বর্ণনামতে ভাইয়েরাই প্রথমে অগ্রবর্তী হইয়া পলাতক গোলামটি বিক্রয়ের প্রস্তাব করিয়াছিল। অপর একটি দুর্বল বর্ণনামতে ইউসুফের ভাইয়েরা কূপের কাছে একটি বাণিজ্যিক কাফেলাকে অবস্থান করিতে দেখিতে পাইল এবং তাহাদের সহিত আলাপ করিয়া জানিতে পারিল যে, তাহারা পেস্তা, দেবদারু ও মসলাপাতি নিয়া মিসর যাইতেছে। তখন ভাইয়েরা পরামর্শ করিয়া নিজেরাই ইউসুফকে কূপ হইতে তুলিয়া কাফেলার নিকট বিক্রয় করিল। কিন্তু তাওরাত ও কুরআনের বর্ণনা ধারায় এ বিবরণটি সমর্থিত হয় না। এই সমুদয় ঘটনা ও আলোচনায় ইউসুফ (আ) সম্পূর্ণ নীরবতা অবলম্বন করিয়া রহিলেন। কেননা তিনি বুঝিতেছিলেন যে, কোন প্রকার উচ্চবাচ্য করিলে এবং আত্মপরিচয় প্রকাশ করিলে গোলামীর অপবাদ ও দুঃখ হইতে মুক্তি পাওয়া গেলেও ভাইদের হাত হইতে নিস্তার পাওয়া ও পিতার কাছে নিরাপদে পৌঁছিবার সম্ভাবনা সুদূরপরাহত।
সর্বোপরি তিনি কূপ হইতে মুক্তির ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলার অভাবনীয় কুদরতের হাত প্রত্যক্ষ করিয়াছিলেন। সুতরাং গোলাম হইয়া মিসরে নীত হওয়ার মধ্যেও তিনি কুদরতের অপার রহস্য প্রত্যক্ষ করিবার ইংগিত অনুভব করিয়া সম্পূর্ণ নিরুদ্বিগ্ন চিত্তে আল্লাহ্র ফয়সালার কাছে আত্মসমর্পণ করিয়াছিলেন। আল্লাহ তা'আলাও ইউসুফ, তাঁহার ভ্রাতৃবর্গ ও কাফেলার লোকদের দ্বারা তাঁহার কুদরতী পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করাইয়া নিতেছিলেন। অন্যথায় ভাইদের অসৎ উদ্দেশ্য নস্যাত করিয়া দেওয়া তো আল্লাহ্ জন্য সহজ ছিল।
বিক্রয় প্রস্তাবে পারস্পরিক সম্মতির পর মূল্য নিয়া আলোচনা হইল এবং ক্রেতাদের বিস্ময় উদ্রেক করিয়া তাহাদের ধারণার চেয়ে অনেক কম মূল্যে বিক্রেতারা তাহাদের গোলাম হস্তান্তরে রাজী হইল। কুরআনের ভাষায়:
وَشَرَوْهُ بِثَمَن بَخْسٍ دَرَاهِمَ مَعْدُودَةٍ وَكَانُوا فِيهِ مِنَ الزَّاهِدِينَ .
"এবং উহারা তাহাকে বিক্রয় করিল স্বল্প মূল্যে, মাত্র কয়েক দিরহামের বিনিময়ে, উহারা ছিল তাহার ব্যাপারে নির্লোভ" (১২: ২০)।
অর্থাৎ ইউসুফের ভাইয়েরা তাহাকে বিক্রয় করিয়া দিল এবং কাফেলার লোকেরা তাহাকে ক্রয় করিল অতি নগণ্য মল্যে, গণনা করিয়া হিসাব করা হয় এমন কয়েকটি দিরহামের বিনিময়ে। মূলত তাহারা উহাতে নির্লোভ ছিল। তাফসীরকারগণ লিখিয়াছেন, তৎকালীন আরব বাণিজ্য জগতে প্রচলিত নিয়ম অনুসারের পণ্যমূল উল্লেখযোগ্য ও অধিক (চল্লিশোর্ধ) হইলে উহা ওজনের মাধ্যমে এবং অল্প ও নগণ্য হইলে গণনা করিয়া পরিশোধ করা হইত। পবিত্র কুরআন مَعْدُودَة (গণনা আওতাভুক্ত) বলিয়া অর্থের সংখ্যা নির্দিষ্ট না করিয়া উহা পরিমাণে অল্প হওয়ার প্রতি ইংগিত করিয়াছে। ইকরিমা ও ইবন ইসহাক এই পরিমাণ চল্লিশ দিরহাম বলিয়াছেন, মুজাহিদ বাইশ দিরহাম বলিয়াছেন। ইবন মাস'উদ, ইবন আব্বাস, নাওফ বাকালী, সুদ্দী, কাতাদা ও আতিয়্যা প্রমুখ বলিয়াছেন, বিশ দিরহামে বিক্রয় করিয়া দশ ভাইয়ের প্রত্যেকে দুই দিরহাম করিয়া ভাগ করিয়া নিয়াছিল (দ্র. বিদায়া, তাফসীরে ইবন কাছীর, মাজহারী, কুরতুবী ও মা'আরিফ)। মূল্য কম হওয়ার কারণ ছিল দ্বিপক্ষীয়। বিক্রেতারা জানিত যে, ইউসুফ গোলাম নয়, তাহাদেরই ভাই, তাহাকে কোনরূপে দেশান্তরিত করিতে পারিলেই তাহাদের বিদ্বেষ প্রশমিত হয় এবং পিতার কাছে ধরা পড়িয়া তাহার রোষাণলে পতিত হওয়া হইত রক্ষা পাওয়া যায়। ক্রেতারা দেখিল, পলায়নে অভ্যস্ত গোলামের জন্য অধিক মূল্য দেওয়ার প্রয়োজন নাই। ইহা ছাড়া এই গোলামের ভবিষ্যত কত উজ্জ্বল হইবে তাহা অনুধাবন করিবার সাধ্য তাহাদের ছিল না।
অতঃপর বাণিজ্য কাফেলা তাহাদের গন্তব্যস্থল মিসরের উদ্দেশ্যে প্রস্থান করিল এবং মিসর পৌঁছিয়া ইউসুফ (আ)-কে গোলামরূপে বিক্রয় করিল। কাফেলার মিসর গমন ও ইউসুফ (আ)-কে বিক্রয় করা সংক্রান্ত কাহিনীর বিশদ বিবরণ গুরুত্বের নিরিখে অপ্রয়োজনীয় অংশ হওয়ার কারণে পবিত্র কুরআন উহার উল্লেখে নীরব। তবে তাওরাত, ইতিহাস ও তাফসীরকারদের বর্ণনা হইতে জানা যায় যে, ইউসুফের ভাইয়েরা তাহাকে বিক্রয় করিবার পর কাফেলার প্রস্থান করা পর্যন্ত সে স্থানে অবস্থান করিল। কেননা তাহারা এই ব্যাপারে শংকিত ছিল যে, কাফেলার লোকেরা অজ্ঞাত বিপদের আশংকায় ইউসুফ (আ)-কে সেখানে কিংবা পথিমধ্যে কোথাও রাখিয়া যাইবে এবং ইউসুফ (আ) কোন উপায়ে পিতার কাছে ফিরিয়া আসিয়া ভাইদের সকল ষড়যন্ত্র ফাঁস করিয়া দিবে। সুতরাং কাফেলা চলিতে আরম্ভ করিলে ভাইয়েরাও কিছুদূর পর্যন্ত তাহাদের সাথে থাকিল এবং ইউসুফের পালাইবার অভ্যাসের কথা বলিয়া তাঁহাকে বাঁধিয়া রাখিবার উপদেশ দিল। এই মহামানবের মর্যাদা সম্পর্কে অজ্ঞ লোকেরা উপদেশ মানিয়া লইল এবং উক্ত অবস্থায়ই তাঁহাকে মিসর পর্যন্ত লইয়া গেল। দীর্ঘপথ পরিক্রমার পর তাহারা মিসরের বাজারে তাহাদের বিক্রয় পণ্যসমূহ উপস্থাপন করিল।
ইউসুফ (আ) সর্বাবস্থায় আল্লাহ্ ফয়সালায় রাজী থাকিয়া তাঁহার কুদরতের ধারা প্রত্যক্ষ করিতে থাকিলেন। ইউসুফ (আ)-এর জীবনের এই হৃদয়বিদারক মুহূর্তগুলির ছবি দৃষ্টির সামনে উদ্ভাসিত করিলে দেখা যাইবে যে, অতি অল্প বয়স্ক এক বালক, শিশু বয়সে মাতৃহারা, পিতার অপরিসীম স্নেহ-মমতার ক্রোড় হইতে বিচ্ছিন্ন, ভাইদের প্রতিহিংসার শিকার হইয়া বাৎসল্যপূর্ণ স্বাধীন জীবন হইতে বঞ্চিত হইয়া এক অপরাধী গোলামরূপে অজানার উদ্দেশে চলিয়াছেন। তিনি জানেন না, কোথায় তাঁহাকে নেওয়া হইতেছে, আর কোন দিন স্বাধীনতার স্বাদ ভোগ করিবেন কিনা, স্নেহময় পিতার সাথে আর কখনও সাক্ষাত ঘটিবে কিনা? কিন্তু তিনি সম্পূর্ণ নির্বিকার, মুখে নাই কোন বিমর্ষতা, উচ্চারণে নাই কোন অভিযোগ, নাই কোন প্রকার কান্নাকাটি বা অস্থিরতার প্রকাশ। বিপদে ধৈর্য ও ভাগ্যে প্রসন্নতার মূর্ত প্রতীক হইয়া তিনি চলিয়াছেন গোলামরূপে মিসরের বাজারে বিক্রয় হওয়ার জন্য।
ইউসুফ (আ)-এর সৌন্দর্য ও প্রতিভাদীপ্ত চেহারা খরিদ্দারদের প্রবল ভাবে আকর্ষণ করিল। একটি বর্ণনামতে (মাযহারী, ৫খ, ১৫১) চল্লিশ স্বর্ণমুদ্রা (দীনার) ও দুই প্রস্থ বস্ত্র ইত্যাদির বিনিময় ইউসুফ (আ)-কে বিক্রয় করা হইল। ওয়াহব ইবন মুনাব্বিহের সূত্র ও কুরতুবীর বর্ণনামতে ইউসুফ (আ)-কে বিক্রয়ের ঘোষণা দেওয়া হইলে খরিদ্দারদের ভিড় জমিয়া গেল এবং তাঁহার মূল্য বৃদ্ধিতে তাহারা প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হইল। আল্লাহ তা'আলা তাঁহার মর্ষী বাস্তবায়নের কুদরতী ব্যবস্থাপনায় মিসরের সরকারের অর্থ, খাদ্য ও বাণিজ্যের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান মন্ত্রীকে দাস ক্রয়-বিক্রয়ের বাজারে পৌঁছাইয়া দিলেন। বিক্রয় প্রস্তাবিত গোলামরূপে ইউসুফ (আ) প্রধান মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করিলেন এবং তিনিও মূল্যবৃদ্ধির প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করিলেন। সর্বশেষে ইউসুফের মূল্য স্থির হইল তাঁহার ওযনের সমপরিমাণ স্বর্ণ, অনুরূপ ও সমপরিমাণ মিশাক এবং সমপরিমাণ রেশমীবস্ত্র। ইউসুফের খরিদ্দার হওয়ার সৌভাগ্য লিপিবদ্ধ ছিল প্রধান মন্ত্রীর তথা আযীয মিসরের ললাটে এবং এত উচু মূল্য পরিশোধ করা তাহারই পক্ষে সহজসাধ্য ছিল। তিনি স্থিরীকৃত মূল্য পরিশোধ করিয়া ইউসুফ (আ)-কে ক্রয় করিলেন। বর্ণনামতে এই সময় তের বৎসর বয়স্ক ইউসুফ (আ)-এর ওযন হইয়াছিল চার শত রিত্ল বা চার শত পাউন্ডের অর্থাৎ প্রায় ১৫.০০০ তোলার সমপরিমাণ (মাজহারী, ৫খ, ১৫১; মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ, ৩১)।