📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হযরত ইউসুফ (আ)-এর সময়কাল

📄 হযরত ইউসুফ (আ)-এর সময়কাল


ইতিহাস গ্রন্থসমূহে ইউসুফ (আ)-এর সময়কাল ১৯২৭ খৃ. পূ. হইতে ১৮১৭ খৃ. পূ. বলা হইয়াছে অর্থাৎ তাওরাতের এই বর্ণনামতে তাঁহার জীবনকাল ১১০ বৎসর (দ্র. আম্বিয়ায়ে কুরআন, ১খ, ৩০২-৩০৩, বরাত ই. বিশ্বকোষ, ২২খ, ১১৭)। প্রথম মানব হযরত আদম (আ)-এর পৃথিবীতে আগমন সাল হইতে হযরত ইউসুফ (আ)-এর জন্ম পর্যন্ত সময়ের ব্যবধান ছিল বাইবেলে প্রদত্ত হিসাবমতে ২১৭৯ বৎসর।
• মুসলিম ঐতিহাসিকদের অনেকেই এই বিবরণের উদ্ধৃতি দিয়াছেন। আবার কেহ কেহ ইহাতে দ্বিমত পোষণ করিয়া ভিন্নতর বর্ণনা দিয়াছেন। ইবনুল আছীরের বর্ণনামতে নূহ (আ)-এর তুফানের ১২৬৩ বৎসরে হযরত ইবরাহীম (আ) জন্মগ্রহণ করেন এবং আদম (আ) ও ইবরাহীম (আ)-এর মধ্যে সময়ের ব্যবধান ছিল ৩৩৩৭ বৎসর (আল-কামিল, ১খ, ৬৩)। সুতরাং এ বিষয়ে সন্দেহমুক্ত ও সুনিশ্চিত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া দুরূহ। ফলে এই বিষয়ে তাওরাতে বর্ণিত ইয়াহুদীদের বিবৃতিকে প্রামাণ্য মনে না করিবার যথেষ্ট যুক্তি রহিয়াছে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 কুরআন ও হাদীছে হযরত ইউসুফ (আ)

📄 কুরআন ও হাদীছে হযরত ইউসুফ (আ)


পবিত্র কুরআনে অন্যান্য বিশিষ্ট নবী-রাসূলগণের ন্যায় হযরত ইউসুফ (আ)-এর নাম উল্লিখিত হইয়াছে, যাহা তাঁহার বিশিষ্ট মর্যাদার অধিকারী হওয়ার প্রমাণ বহন করে। তাঁহার জন্য আরও মর্যাদা ও গর্বের বিষয় এই যে, পবিত্র কুরআনে তাঁহার প্রপিতামহের নামে যেরূপে একটি সূরার নামকরণ করা হইয়াছে 'সূরা ইবরাহীম' (সূরা নং ১৪), তদ্রূপ তাঁহার নামেও একটি স্বতন্ত্র সূরার নামকরণ করা হইয়াছে 'সূরা ইউসুফ' (সূরা নং ১২)। সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য বিষয় এই যে, পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন সূরায় অন্যান্য নবীগণের সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হইয়াছে, এমনকি অন্য নবীগণের নামে নামকরণকৃত সূরাসমূহেও তাঁহাদের আংশিক আলোচনার তুলনায় ১১১ আয়াতের বিশাল পরিসরযুক্ত সূরা ইউসুফের প্রায় সম্পূর্ণটা জুড়িয়া রহিয়াছে তাঁহার জীবনের ঘটনাবলীর বিবরণ। সূরা ইউসুফ ব্যতীত অন্যত্র দুইবার-সহ পবিত্র কুরআনে তাঁহার নাম 'ইউসুফ' মোট সাতাশবার উল্লিখিত হইয়াছে। সূরা আনআমের আয়াতে আছে:
وَوَهَبْنَا لَهُ إِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ كُلَّا هَدَيْنَا وَنُوحًا هَدَيْنَا مِنْ قَبْلُ وَمِنْ ذُرِّيَّتِهِ دَاوُدَ وَسُلَيْمَنَ وَأَيُّوبَ وَيُوسُفَ وَمُوسَى وَهَارُونَ .
"আমি তাহাকে (ইবরাহীমকে) দান করিলাম ইসহাক ও ইয়াকূব (সন্তান ও নবীরূপে)। তাহাদের প্রত্যেককে আমি সঠিক পথের দিশা (নবুওয়াত) দান করিলাম; ইতোপূর্বে আমি হিদায়াত দান করিয়াছিলাম নূহকে; এবং তাহার (ইবরাহীমের) বংশধরদের মধ্য হইতে দাউদ, সুলায়মান, আইয়ুব, ইউসুফ, মূসা ও হারুনকে" (৬:৮৪)।
সূরা আল-মু'মিন-এ আছে : وَلَقَدْ جَاءَكُمْ يُوسُفُ مِنْ قَبْلُ بِالْبَيِّنَات "তোমাদের নিকট ইউসুফ আসিয়াছিল ইতোপূর্বে স্পষ্ট প্রমাণাদি সহকারে..." (৪০:৩৪)।
সূরা ইউসুফের ৪, ৭, ৮, ৯, ১০, ১১, ১৭, ২১, ২৯, ৪৬, ৫১, ৫৬, ৫৮, ৬৯, ৭৬, ৭৭, ৮০, ৮৪, ৮৫, ৮৭, ৮৯, ৯০, ৯৪, ৯৯ এই চব্বিশটি আয়াতে মোট ২৫ বার (৯০ নং আয়াতে ২বার) তাঁহার নাম উল্লিখিত হইয়াছে।
হাদীছে তাঁহার বংশমর্যাদা, তাঁহার অপরিসীম সৌন্দর্য, তাঁহার নজিরবিহীন সবর ও সহনশীলতা, তাঁহার অনুপম গুণাবলী ও অন্যান্য প্রসঙ্গে মহানবী (স) তাঁহার কথা আলোচনা করিয়াছেন।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সূরা ইউসুফ নাযিল হওয়া প্রসঙ্গ

📄 সূরা ইউসুফ নাযিল হওয়া প্রসঙ্গ


মহানবী (স)-এর নিকট সাহাবীগণ কোন ঘটনা শুনিবার আগ্রহ প্রকাশ করিলেন, তখন সূরা ইউসুফ নাযিল হইল। ভিন্নমতে ইয়াহুদীদের প্রশ্নের জবাবে সূরাটি নাযিল হয়। ইহা দ্বারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নবুওয়াতের প্রমাণ পাওয়া যায়। (১) হাকেম ও ইব্‌ন আবু হাতিম, সা'দ ইবন আবু ওয়াক্কাস (রা) হইতে, ইবন জারীর তাবারী আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা) হইতে এবং ইবন মারদাওয়ায়হ আবদুল্লাহ ইবন মাস'ঊদ (রা) হইতে রিওয়ায়াত করিয়াছেন। নবী (স)-এর উপর কুরআন নাযিল হওয়ার সময় এবং কুরআন তিলাওয়াত করার কালে সাহাবীগণ বলিলেন, আপনি যদি আমাদিগকে কোন কাহিনী শুনাইতেন। তখন আল্লাহ তা'আলা নাযিল করিলেন, نحن نقص عليك احسن القصص "আমি তোমার নিকট উত্তম কাহিনী বর্ণনা করিতেছি"।
(২) মুশরিকরা নবী (স)-এর নবুওয়াতের দাবির প্রেক্ষিতে আসমানী কিতাবের জ্ঞানসম্পন্ন ইয়াহুদীদের কাছে বুদ্ধি ও পরামর্শ চাহিল। তাহারা এই প্রশ্ন শিখাইয়া দিল যে, তোমরা তাহাকে জিজ্ঞাসা কর... কিংবা ইয়াহুদীরা তাঁহাকে পরীক্ষা করিবার জন্য এবং বেকায়দায় ফেলিবার অসৎ উদ্দেশ্যে সরাসরি তাঁহার কাছে প্রশ্ন উত্থাপন করিল, আপনি সত্য নবী হইলে বলুন তো ইয়াকূব-বংশ সিরীয় অঞ্চল হইতে মিসরে স্থানান্তরিত হইয়াছিল কেন এবং ইউসুফের বৃত্তান্ত কি ছিল? কিংবা প্রশ্নভাষ্যটি ছিল নিম্নরূপ: বলুন তো, নবীকূলের মধ্যে সেই নবী কে ছিলেন যিনি শামে বসবাস করিতেন এবং তাঁহার এক পুত্র মিসরে নীত হইয়াছিলেন এবং পুত্রশোকে কাঁদিতে কাঁদিতে পিতা অন্ধ হইয়া গিয়াছিলেন? তখন সূরা ইউসুফ নাযিল করা হইল। উম্মী হওয়ার কারণে তাওরাত-ইনজীল পাঠ করিয়া তাঁহার পক্ষে ঘটনাটি জানিবারও কোন অবকাশ ছিল না। এই অবস্থায় তাওরাতের বর্ণনার তুলনায় অধিক পূর্ণাঙ্গ এবং সঠিক তথ্য সমৃদ্ধ ইয়াকূব-ইউসুফের জীবন-বৃত্তান্ত বর্ণনা করা ছিল তাঁহার জন্য নবুওয়াতের প্রমাণ বহনকারী প্রকাশ্য মু'জিযা [ইবন কাছীর (মুখতাসার) ২খ, ২৩৯; কুরতুবী, ৫খ, ১১৮; মাজহারী, ৫খ, ১৩৫; মাআরিফুল কুরআন, ৫খ, ৫১৭]।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হযরত ইউসুফ (আ)-এর ভ্রাতৃবর্গের পরিচয়

📄 হযরত ইউসুফ (আ)-এর ভ্রাতৃবর্গের পরিচয়


পুত্র-কন্যা সমেত হযরত ইয়াকূব (আ)-এর সন্তানের সংখ্যা ছিল তেরজন। ইহাদের মধ্যে হযরত ইউসুফ (আ) ছিলেন (ভাই-বোন সম্মিলিত হিসাবে দ্বাদশ এবং শুধু ভাইদের মধ্যে) একাদশ। একমাত্র দ্বাদশ ভাই বিনআমীন ছিলেন ইউসুফ (আ)-এর সহোদর এবং অন্য সকলে ছিলেন তাঁহার বৈমাত্রেয় ভাই (বিস্তারিত বিবরণ ইয়াকুব (আ) নিবন্ধে দ্র.]।
মুফতী শফী (র) লিখিয়াছেন, ইয়াকুব (আ)-এর বার পুত্রের মধ্যে দশ পুত্র ছিল হযরত ইয়াকূব (আ)-এর প্রথম মহিয়সী পত্নী লায়‍্যা বিনত লায়‍্যানের গর্ভজাত এবং তাহার মৃত্যুর পর ইয়াকুব (আ) লায়‍্যার ভগ্নী রাহীলকে বিবাহ করিলে তাহার গর্ভে ইউসুফ ও বিনয়ামীন নামে দুই পুত্রের জন্ম হয়।..... ইউসুফের শৈশবে বিনয়ামীনকে প্রসবকালে তাহাদের মাতা রাহীলও ইনতিকাল করেন। (তাফসীরে মাআরিফুল কুরআন, ৫খ, ১৮; বরাত কুরতুবী, ৫খ, ১৩০ পৃ.)
উল্লেখ্য যে, ইউসুফ (আ)-এর এই এগার ভাই তথা ইয়াকূব (আ)-এর বার সন্তান পরবর্তী বংশধররা পরবর্তী কালে পৃথিবীর একটি উল্লেখযোগ্য জাতিতে পরিণত হয় এবং তাহারা অদ্যাবধি ইয়াহুদী ও বনী ইসরাঈল নামে পরিচিত। ইয়াকুব (আ)-এর অন্য নাম ইসরাঈল (اسرا - اسرائیل - বান্দা + ایل -আল্লাহ) অনুসারে তাহদিগকে বনু ইসরাঈল নামে অভিহিত করা হয় এবং ইয়াকূব (আ)-এর ওফাতের পরে তাঁহার ওসিয়ত অনুসারে বংশীয় নেতৃত্ব কর্তৃত্ব (ইয়াহুদী পরিভাষায় জ্যেষ্ঠতা) হযরত ইউসূফ (আ)-কে প্রদত্ত হয়। পিতার ওফাতের অত্যল্প কাল পরে ইউসুফ (আ)-এর ওফাত হয়। তাঁহার ওফাত কালে তিনি ভাইদের মধ্যে জ্ঞান-গরিমা ও বিদ্যাবুদ্ধিতে শ্রেষ্ঠ ইয়াহুদাকে বংশীয় কর্তৃত্বের ওসিয়াত করিয়া যান। এই সুবাদে বনু ইসরাঈল 'ইয়াহুদী' নামেও পরিচিতি লাভ করে। বার ভাইয়ের বার খান্দানের কথা বিভিন্ন প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনের বহু আয়াতে উল্লিখিত হইয়াছে এবং ইহাদিগকে একত্রে 'আসবাত' )اسباط( -ও বলা হইয়াছে। যেমন ৪
وَقَطَّعْنَهُمُ اثْنَتَى عَشْرَةَ أَسْبَاطًا أَمَمًا وَأَوْحَيْنَا إِلى مُوسى اذ اسْتَسْقَهُ قَوْمُهُ أَنِ اضْرِبْ بِعَصَاكَ الْحَجَرَ فَانْبَجَسَتْ مِنْهُ اثْنَتَا عَشْرَةَ عَيْنًا .
"আমি তাহাদিগকে দ্বাদশ গোত্রে বিভক্ত করিয়াছি এবং আমি মূসার কাছে ওয়াহয়ি পাঠাইলাম, যখন তাহার সম্প্রদায় তাহার কাছে পানির প্রার্থনা করিল, তুমি তোমার লাঠি দ্বারা পাথরটিতে আঘাত কর; ফলে উহা হইতে উৎসারিত হইল বারটি প্রসবণ" ...... (৭: ১৬০; আরও দ্র. ১৪ ৭, ২ঃ ৬০ ২৪ ১৩৬, ৫: ১২, ৫: ২৩ ব্যাখ্যাসহ ও অন্যত্র)।
ইতিহাসের অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের পরেও বর্তমান বিশ্বে তাঁহার এই বার বংশধারার উত্তরসূরি টিকিয়া রহিয়াছে (দ্র. ইসলামী বিশ্বকাষ ও অন্যান্য গ্রন্থে 'য়াহুদী' ও 'ইসরাঈল' শিরো.).

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00