📄 ভূমিকা
পৃথিবীর বুকে হযরত আদম (আ) হইতে শুরু করিয়া সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (স) পর্যন্ত প্রেরিত নবীদের সংখ্যা এক লক্ষ চব্বিশ হাজার (বা দুই লক্ষ চব্বিশ হাজার) হওয়ায় রিওয়ায়াত রহিয়াছে। কোন কোন বর্ণনা অনুসারে নবী-রাসূলের মোট সংখ্যা আট হাজারের মধ্যে চার হাজার বনী ইসরাঈলের অন্তর্ভুক্ত এবং চার হাজার পূর্বাপর অন্যান্য জাতি-গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। ইমাম বুখারী বর্ণিত এক হাদীছে উল্লেখ আছে:
كانت بنو اسرائيل تسوسهم الانبياء كلما هلك نبي خلفه نبي ধারাবাহিকভাবে নবী প্রেরিত হইতেন যাহারা বনী ইসরাঈলকে পরিচালনার দায়িত্ব পালন করিতেন। একজন নবীর ইনতিকালের পর অপরজন আবির্ভূত হইতেন" (বিদায়া, ২খ, পৃ. ১৫৩)।
উল্লেখ্য, বিশ্বনবী ও খাতামুন্নাবিয়ীন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের পূর্বে আগমনকারী নবীকুলের মধ্যে মাহাত্ম্য ও শ্রেষ্ঠত্বের শিখর মর্যাদায় অধিষ্ঠিত এবং পবিত্র কুরআনের ভাষায় 'উলুল 'আযম' অভিধায় ভূষিত পাঁচজন রাসূলের অন্যতম, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহ আলায়হি ওয়াসাল্লামের পরেই দ্বিতীয় অবস্থানের অধিকারী ছিলেন 'খলীলুল্লাহ' হযরত ইবরাহীম (আ) (বিদায়া-১খ, ১৭০) যিনি مِلَّةَ أَبِيكُمْ إِبْرَاهِيمَ هُوَ سَمَّاكُمُ الْمُسْلِمِينَ "অনুসরণ কর তোমাদের পিতা ইবরাহীমের মিল্লাত, যিনি তোমাদিগকে 'মুসলিম' নামকরণ করিয়াছেন" (২২ : ৭৮) আয়াতের মর্ম অনুসারে মুসলিম জাতির পিতৃ আসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার মর্যাদায় সমাসীন।
হযরত ইবরাহীম (আ)-এর সন্তানগণের মধ্যে হযরত ইসমাঈল ও হযরত ইসহাক (আ) ছিলেন নুবুওয়াত মর্যাদায় ভূষিত। ইসহাক (আ)-এর (দুই যমজ পুত্রের দ্বিতীয়) পুত্র হযরত ইয়াকুব (আ)-ও নবী ছিলেন যাঁহার সম্পর্কে পূর্ব হইতেই পিতামহ ইবরাহীম (আ)-কে সুসংবাদ দেওয়া হইয়াছিল (দ্র. ১১ : ৭১)। ইয়াকুব (আ)-এর ঐতিহাসিক নাম ইসরাঈল (اسرا - اسرائیل - বান্দা + ایل -আল্লাহ) অনুসারে তাঁহার পরবর্তী বংশধরগণ বনু ইসরাঈল বা ইসরাইলী নামে পরিচিতি লাভ করে। হযরত ইয়াকুব (আ)-এর বারজন পুত্র সন্তানের মধ্যে রূপেগুণে শ্রেষ্ঠ ছিলেন তাঁহার এগারতম পুত্র হযরত ইউসুফ (আ), যিনি পিতার জীবন কালেই নবুওয়াত লাভ করিয়াছিলেন। সুতরাং তাঁহাকে ইয়াকুব (আ)-এর উত্তরসুরি নবী বলা যায়।
📄 জন্ম ও বংশপরিচয়
ইসরাঈলী বর্ণনামতে হযরত ইসহাক (আ) চল্লিশ বৎসর বয়সে পিতা ইবরাহীম (আ)-এর পসন্দ ও আদেশ অনুসারে জ্ঞাতি সম্পর্কীয়া রিফকা (রেবেকা) বিন্ত বাতুওয়াঈলকে বিবাহ করেন।
বুখারী শরীফ ও অন্যান্য হাদীছ গ্রন্থে ইবন 'উমার (রা) সূত্রের হাদীছে আছে, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেনঃ ان الكريم بن الكريم بن الكريم من الكريم يوسف بن يعقوب بن اسحاق بن ابراهيم (বংশ পরম্পরায়) মর্যাদাশীল ব্যক্তির পুত্র-মর্যাদাশীল মর্যাদাশীল, ব্যক্তির পুত্র-মর্যাদাশীল, মর্যাদাশীল ব্যক্তির পুত্র হইলেন ইউসুফ ইবন ইয়াকূব ইবন ইসহাক ইবন ইবরাহীম।" আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণিত হাদীছে আছেঃ সর্বাধিক মর্যাদাবান ব্যক্তি কে (اى الناس اكرم) প্রশ্নের জবাবে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, يوسف نبي الله بن نبي الله من نبى الله بن خليل الله (অভিজাত) ব্যক্তি আল্লাহর নবী ইউসুফ (আ), যিনি আল্লাহর নবী ইয়াকুব (আ)-এর পুত্র। ইয়াকূব ছিলেন আল্লাহর নবী ইসহাক (আ)-এর পুত্র এবং ইসহাক (আ) ইবরাহীম খলীলুল্লাহর পুত্র” (বুখারী, কিতাবুল আম্বিয়া, বরাত, বিদায়া, ১খ, ১৯৩; মুখতাসার তাফসীর ইবন কাছীর, ২খ, ২৪০)।
📄 হযরত ইউসুফ (আ)-এর সময়কাল
ইতিহাস গ্রন্থসমূহে ইউসুফ (আ)-এর সময়কাল ১৯২৭ খৃ. পূ. হইতে ১৮১৭ খৃ. পূ. বলা হইয়াছে অর্থাৎ তাওরাতের এই বর্ণনামতে তাঁহার জীবনকাল ১১০ বৎসর (দ্র. আম্বিয়ায়ে কুরআন, ১খ, ৩০২-৩০৩, বরাত ই. বিশ্বকোষ, ২২খ, ১১৭)। প্রথম মানব হযরত আদম (আ)-এর পৃথিবীতে আগমন সাল হইতে হযরত ইউসুফ (আ)-এর জন্ম পর্যন্ত সময়ের ব্যবধান ছিল বাইবেলে প্রদত্ত হিসাবমতে ২১৭৯ বৎসর।
• মুসলিম ঐতিহাসিকদের অনেকেই এই বিবরণের উদ্ধৃতি দিয়াছেন। আবার কেহ কেহ ইহাতে দ্বিমত পোষণ করিয়া ভিন্নতর বর্ণনা দিয়াছেন। ইবনুল আছীরের বর্ণনামতে নূহ (আ)-এর তুফানের ১২৬৩ বৎসরে হযরত ইবরাহীম (আ) জন্মগ্রহণ করেন এবং আদম (আ) ও ইবরাহীম (আ)-এর মধ্যে সময়ের ব্যবধান ছিল ৩৩৩৭ বৎসর (আল-কামিল, ১খ, ৬৩)। সুতরাং এ বিষয়ে সন্দেহমুক্ত ও সুনিশ্চিত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া দুরূহ। ফলে এই বিষয়ে তাওরাতে বর্ণিত ইয়াহুদীদের বিবৃতিকে প্রামাণ্য মনে না করিবার যথেষ্ট যুক্তি রহিয়াছে।
📄 কুরআন ও হাদীছে হযরত ইউসুফ (আ)
পবিত্র কুরআনে অন্যান্য বিশিষ্ট নবী-রাসূলগণের ন্যায় হযরত ইউসুফ (আ)-এর নাম উল্লিখিত হইয়াছে, যাহা তাঁহার বিশিষ্ট মর্যাদার অধিকারী হওয়ার প্রমাণ বহন করে। তাঁহার জন্য আরও মর্যাদা ও গর্বের বিষয় এই যে, পবিত্র কুরআনে তাঁহার প্রপিতামহের নামে যেরূপে একটি সূরার নামকরণ করা হইয়াছে 'সূরা ইবরাহীম' (সূরা নং ১৪), তদ্রূপ তাঁহার নামেও একটি স্বতন্ত্র সূরার নামকরণ করা হইয়াছে 'সূরা ইউসুফ' (সূরা নং ১২)। সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য বিষয় এই যে, পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন সূরায় অন্যান্য নবীগণের সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হইয়াছে, এমনকি অন্য নবীগণের নামে নামকরণকৃত সূরাসমূহেও তাঁহাদের আংশিক আলোচনার তুলনায় ১১১ আয়াতের বিশাল পরিসরযুক্ত সূরা ইউসুফের প্রায় সম্পূর্ণটা জুড়িয়া রহিয়াছে তাঁহার জীবনের ঘটনাবলীর বিবরণ। সূরা ইউসুফ ব্যতীত অন্যত্র দুইবার-সহ পবিত্র কুরআনে তাঁহার নাম 'ইউসুফ' মোট সাতাশবার উল্লিখিত হইয়াছে। সূরা আনআমের আয়াতে আছে:
وَوَهَبْنَا لَهُ إِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ كُلَّا هَدَيْنَا وَنُوحًا هَدَيْنَا مِنْ قَبْلُ وَمِنْ ذُرِّيَّتِهِ دَاوُدَ وَسُلَيْمَنَ وَأَيُّوبَ وَيُوسُفَ وَمُوسَى وَهَارُونَ .
"আমি তাহাকে (ইবরাহীমকে) দান করিলাম ইসহাক ও ইয়াকূব (সন্তান ও নবীরূপে)। তাহাদের প্রত্যেককে আমি সঠিক পথের দিশা (নবুওয়াত) দান করিলাম; ইতোপূর্বে আমি হিদায়াত দান করিয়াছিলাম নূহকে; এবং তাহার (ইবরাহীমের) বংশধরদের মধ্য হইতে দাউদ, সুলায়মান, আইয়ুব, ইউসুফ, মূসা ও হারুনকে" (৬:৮৪)।
সূরা আল-মু'মিন-এ আছে : وَلَقَدْ جَاءَكُمْ يُوسُفُ مِنْ قَبْلُ بِالْبَيِّنَات "তোমাদের নিকট ইউসুফ আসিয়াছিল ইতোপূর্বে স্পষ্ট প্রমাণাদি সহকারে..." (৪০:৩৪)।
সূরা ইউসুফের ৪, ৭, ৮, ৯, ১০, ১১, ১৭, ২১, ২৯, ৪৬, ৫১, ৫৬, ৫৮, ৬৯, ৭৬, ৭৭, ৮০, ৮৪, ৮৫, ৮৭, ৮৯, ৯০, ৯৪, ৯৯ এই চব্বিশটি আয়াতে মোট ২৫ বার (৯০ নং আয়াতে ২বার) তাঁহার নাম উল্লিখিত হইয়াছে।
হাদীছে তাঁহার বংশমর্যাদা, তাঁহার অপরিসীম সৌন্দর্য, তাঁহার নজিরবিহীন সবর ও সহনশীলতা, তাঁহার অনুপম গুণাবলী ও অন্যান্য প্রসঙ্গে মহানবী (স) তাঁহার কথা আলোচনা করিয়াছেন।