📄 বায়তুল মাকদিস নির্মাণ
আল্লামা ইব্ন কাছীর (র) তাঁহার তাফসীর গ্রন্থে পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবের বরাতে লিখিয়াছেন যে, হযরত ইয়াকূব (আ) সর্বপ্রথম বায়তুল মাকদিস নির্মাণ করেন (তাফসীর ইন্ন কাছীর, বাংলা অনু., ১খ, পৃ. ৫৭৩)। বাইবেলের আদিপুস্তকে উল্লিখিত আছে : "পরে যাকোব প্রত্যূষে উঠিয়া বালিশের নিমিত্ত যে প্রস্তর রাখিয়াছিলেন, তাহা লইয়া স্তম্ভরূপে স্থাপন করিয়া তাহার উপর তৈল ঢালিয়া দিলেন। আর সেই স্থানের নাম বৈথেল (বায়ত ঈল=আল্লাহ্ত্র ঘর) রাখিলেন এবং এই যে প্রস্তর আমি স্তম্ভরূপে স্থাপন করিয়াছি, ইহা আল্লাহ্র ঘর হইবে” (২৮ঃ ১৮-২২)।
অতএব হযরত ইয়াকূব (আ)-ই বায়তুল মাকদিস-এর প্রথম নির্মাতা, অতঃপর হযরত সুলায়মান (আ) ইহা পুননির্মাণ করেন (বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ., পৃ. ১৯৪ ও ১৯৬; আল-মাআরিফ, পৃ. ২৩)।
হযরত আবু যার আল-গিফারী (রা) বলেন, আমি বলিলাম,
يَا رَسُولَ اللَّهِ أَيُّ مَسْجِدٍ وُضِعَ فِي الْأَرْضِ أَوَّلُ قَالَ الْمَسْجِدُ الحَرَامُ قَلْتُ ثُمَّ أَيُّ قَالَ الْمَسْجِدُ الْأَقْصَى قَالَ كَمْ كَانَ بَيْنَهُمَا قَالَ أَرْبَعُونَ سَنَةً . "হে আল্লাহ্র রাসূল! পৃথিবীতে সর্বপ্রথম কোন মসজিদ নির্মিত হয়? তিনি বলেন: মসজিদুল হারাম। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, অতঃপর কোনটি? তিনি বলেন: মসজিদুল আকসা (বায়তুল মাকদিস)। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, এই মসজিদ নির্মাণের মধ্যকার (কালের) ব্যবধান কত ছিল? তিনি বলেন: চল্লিশ বৎসর" (বুখারী, আম্বিয়া, বাব ১০, নং ৩১১৬; বাব ৪০, নং ৩১৭৩; মুসলিম, মাসাজিদ, নং ১০৪২-৩; নাসাঈ, মাসাজিদ, বাব আয়্যু মাসজিদ উদিআ আওয়ালান; ইব্ন মাজা, মাসাজিদ, বাব ৭, নং ৭৫৩)।
বাইবেলের বিবরণ ও উক্ত হাদীছের বিষয়বস্তু হইতে প্রমাণিত হয় যে, হযরত ইবরাহীম (আ) কর্তৃক কাবা ঘর নির্মিত হওয়ার চল্লিশ বৎসর পর তাঁহার পৌত্র হযরত ইয়াকূব (আ) বায়তুল মাকদিস নির্মাণ করেন। উক্ত হাদীছের ভিত্তিতে ইব্ن হিব্বান মত প্রকাশ করেন যে, হযরত ইবরাহীম (আ) ও হযরত সুলায়মান (আ)-এর যুগের মধ্যে মাত্র চল্লিশ বৎসরের ব্যবধান ছিল। তিনি ধারণা করেন যে, হযরত সুলায়মান (আ)-ই বায়তুল মাকদিসের নির্মাতা। তাঁহার এই ধারণা যথার্থ নহে। বস্তুত হযরত সুলায়মান (আ)-এর যুগ ও হযরত ইবরাহীম (আ)-এর যুগের মধ্যে পার্থক্য হাজার বৎসরের অধিক। সুলায়মান (আ) উহা পুনর্নির্মাণ করিয়াছিলেন মাত্র (তাফসীর ইব্ن কাছীর, বাংলা অনু, ১খ, পৃ. ৫৭৪)।
📄 উটের গোশত ভক্ষণ সংক্রান্ত বিবরণ
হযরত ইয়াকূব (আ) রুচিগত কারণে অথবা অজ্ঞাত কোন ব্যাধির কারণে (কোনও কোনও ভাষ্যকার ও ঐতিহাসিক সাইটিকা নামক বাতরোগের কথাও বলিয়াছেন) উটের গোশত ভক্ষণ করিতেন না এবং উহার দুধ পান করিতেন না। তিনি ইহা ব্যক্তিগতভাবে নিজের জন্য নিষিদ্ধ করিয়া লইয়াছিলেন। পরবর্তী পর্যায়ে ইসরাঈলীরা উটের গোশত ও দুগ্ধ নিজেদের জন্য নিষিদ্ধ করিয়া লয়। বিষয়টি সম্পর্কে কুরআন মজীদে এইভাবে ইঙ্গিত করা হইয়াছে:
كُلُّ الطَّعَامِ كَانَ حِلًّا لِبَنِي إِسْرَاءِيْلَ إِلَّا مَا حَرَّمَ إِسْرَاءِيْلُ عَلَى نَفْسِهِ مِنْ قَبْلِ أَنْ تُنَزِّلَ التَّوْرَةُ قُلْ فَأْتُوا بالتَّوْرَاةِ فَاتْلُوهَا إِنْ كُنْتُمْ صَدقِيْنَ . فَمَنِ افْتَرَى عَلَى اللهِ الْكَذِبَ مِنْ بَعْدِ ذَلِكَ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّلِمُونَ . قُلْ صَدَقَ اللَّهُ فَاتَّبِعُوا مِلَّةَ إِبْرَاهِيمَ حَنِيفًا وَمَا كَانَ مِنَ الْمُشْرِكِينَ. "তাওরাত নাযিল হওয়ার পূর্বে ইসরাঈل নিজের জন্য যাহা হারাম করিয়াছিল তাহা ব্যতীত বনূ ইসরাঈলের জন্য যাবতীয় খাদ্যই হালাল ছিল। তুমি বল, তোমরা সত্যবাদী হইয়া থাকিলে তাওরাত আন এবং তাহা পাঠ কর। ইহার পরও যাহারা আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা রচনা করে তাহারাই যালিম। তুমি বল, আল্লাহ সত্য বলিয়াছেন। সুতরাং তোমরা একনিষ্ঠ হইয়া ইবরাহীমের ধর্মাদর্শ অনুসরণ কর এবং সে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নহে” (৩ঃ ৯৩-৯৫)।
দীন ইসলামের মূল ভিত্তি যেসব জিনিসের উপর স্থাপিত, সেই বিবেচনায় পূর্ববর্তী নবীগণের শিক্ষা ও মহানবী (স)-এর শিক্ষার মধ্যে নীতিগতভাবে কোন পার্থক্য নাই। কুরআন মজীদ ও মহানবী (স)-এর আদর্শ ও শিক্ষ সম্পর্কে ইয়াহূদী আলিমগণ যখন নীতিগত কোনও আপত্তি উত্থাপনের সুযোগ পাইল না, তখন তাহারা কতিপয় শরীআতী আইনগত আপত্তি উত্থাপন করিতে থাকে। এই প্রসঙ্গে তাহারা প্রশ্ন তুলিল যে, এমন অনেক জিনিসকে হযরত মুহাম্মাদ (স) হালাল ঘোষণা করিয়াছেন, যাহা পূর্বকালের নবীগণের শরীআতে সম্পূর্ণ হারাম ছিল, ইহা কিরূপে সম্ভব হইল? এখানে সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়া বলা হইয়াছে যে, আহারের জন্য ইসলামী শরীআতে যে সমস্ত জিনিস হালাল তাহা বনূ ইসরাঈলের জন্যও হালাল ছিল। অবশ্য কোনও জিনিস এমনও ছিল যাহা তাওরাত কিতাব নাযিল হওয়ার পূর্বে বনু ইসরাঈل স্ব-উদ্যোগে নিজেদের জন্য হারাম ঘোষণা করিয়াছিল। আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (স)-কে এই প্রসঙ্গে ইহা বলিতে নির্দেশ দিলেন: "তোমরা তাওরাত আন এবং উহা পাঠ কর" (৩ঃ ৯৩)। কিন্তু তাহারা সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করিতে দুঃসাহস দেখায় নাই। মূলত উটের গোশত ও দুধ তাওরাতে ইয়াহুদীদের জন্য হারাম ঘোষণা করা হয় নাই, হইয়া থাকিলে প্রসঙ্গক্রমে কুরআন মজীদের এই স্থানে তাহার উল্লেখ থাকিত। খাদ্যের মধ্যে কোন্ কোন্ বস্তু তাহাদের জন্য হারাম ছিল কুরআন মজীদে তাহার উল্লেখ আছে এবং তাহাও তাহাদের অবাধ্যাচরণের কারণে শাস্তিস্বরূপ হারাম করা হইয়াছিল। যেমন:
فَبِظُلْمٍ مِنَ الَّذِينَ هَادُوا حَرَّمْنَا عَلَيْهِمْ طَيِّبَتْ أُحِلَّتْ لَهُمْ وَبِصَدِّهِمْ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ كَثِيرًا ، وَأَخْذِهِمُ الرَّبوا وَقَدْ نُهُوا عَنْهُ وَأَكْلِهِمْ أَمْوَالَ النَّاسِ بِالْبَاطِلِ . "উত্তম জিনিসসমূহ যাহা ইয়াহুদীদের জন্য হালাল ছিল, তাহাদের সীমালঙ্ঘনের কারণে আমি তাহা তাহাদের জন্য হারাম করিয়াছি, আল্লাহ্র পথে অনেক লোককে বাধা প্রদানের জন্য, তাহাদের সূদ গ্রহণের জন্য, যাহা তাহাদের জন্য নিষিদ্ধ করা হইয়াছিল এবং অন্যায়ভাবে জনগণের ধন-সম্পদ গ্রাস করার জন্য" (৪ঃ ১৬০-১৬১)।
وَعَلَي الَّذِينَ هَادُوا حَرَّمْنَا كُلَّ ذِي ظُفُرٍ وَمِنَ الْبَقَرِ وَالْغَنَمِ حَرَّمْنَا عَلَيْهِمْ شُحُومَهُمَا إِلَّا مَا حَمَلَتْ ظُهُورُهُمَا أَوِ الْحَوَايَا أَوْمَا اخْتَلَطَ بِعَظْمٍ ذَلِكَ جَزَيْنَهُمْ بِبَغْيِهِمْ وَإِنَّا لَصَدِقُونَ. "আমি ইয়াহুদীদের জন্য নখরযুক্ত সমস্ত পশু হারাম করিয়াছিলাম এবং গরু ও ছাগলের চর্বিও তাহাদের জন্য হারাম করিয়াছিলাম, তবে এইগুলির পৃষ্ঠের অথবা অন্ত্রের কিংবা অস্থিসংলগ্ন চর্বি ব্যতীত, তাহাদের অবাধ্যতার দরুন তাহাদেরকে এই প্রতিফল দিয়াছিলাম। নিশ্চয় আমি সত্যবাদী" (৬:১৪৬)।
উক্ত আয়াতসমূহ হইতে পরিষ্কার প্রতিভাত হয় যে, ইয়াহুদীদের অবাধ্যতার শাস্তিস্বরূপ আল্লাহ তা'আলা তাহাদের জন্য এই বিধান দেন। অনন্তর তাহাদের জন্য উটের গোশত ও দুধ হারাম করা হইলে তাহা অবশ্যই উক্ত আয়াতসমূহে উদ্ধৃত হইত। তাহা ছাড়া তাওরাতে উক্ত বিধান বিদ্যমান থাকিলে ৩ঃ ৯৩ আয়াতের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করিয়া তাহারা মহানবী (স)-এর সামনে তাওরাত কিতাব আনিয়া হাযির করিয়া দেখাইয়া দিত, কিন্তু তাহারা তাহা করিতে অপারগ ছিল। বাইবেলে যে উট ও খরগোশের গোশত হারাম (বাইবেলের লেবীয় পুস্তক, ১১:৪-৬; দ্বিতীয় বিবরণ, ১৪:৭) লিপিবদ্ধ রহিয়াছে তাহা পরবর্তী কালের সংযোজন হইতে পারে (তাফহীমুল কুরআন, ৩ঃ ৯৩-৯৫ আয়াতের ৭৬, ৭৭ ও ৭৮ নং টীকা এবং ৬: ১৪৬ নং আয়াতের ১২২ নং টীকা; শায়খুল হিন্দের তরজমায় শাববীর আহমাদ উছমানীর টীকাভাষ্য, ৩: ৯৩ আয়াতের ২ ও ৩ নং টীকা, পৃ. ৭৯; ৬ঃ ১৪৬ আয়াত সংশ্লিষ্ট ২ নং টীকা, পৃ. ১৯৬)।
ইয়াহুদীদের দ্বিতীয় আপত্তি এই ছিল যে, তোমরা মুসলমানগণ বায়তুল মাকদিসকে ত্যাগ করিয়া কা'বা ঘরকে কেন কিবলা বানাইয়াছ, অথচ পূর্বকালের নবীগণকে নবী-রাসূলগণের কিবলা তো ছিল এই বায়তুল মাকদিস? তাহা হইলে তোমরা কিভাবে মিল্লাতে ইবরাহীমীর অনুসারী হওয়ার দাবি করিতে পার? ইহার উত্তর সূরা আল-বাকারায় (২ঃ ১৪২-৪৫) দেওয়া ছাড়াও উহার উত্তরে নিম্নোক্ত আয়াত (৩ঃ ৯৬) অবতীর্ণ হইয়াছে:
إِنَّ أَوَّلَ بَيْتٍ وُضِعَ لِلنَّاسِ لَلَّذِي بِبَكَّةَ مُبْرَكًا وَهُدًى لِلعَلَمِينَ فِيهِ أَيْتُ بَيِّنَتُ مُقَامُ إِبْرَاهِيمَ. "নিশ্চয় মানবজাতির জন্য সর্বপ্রথম যে ঘর প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল তাহা তো বাক্কায় (মক্কায়), উহা বরকতময় ও বিশ্বজগতের দিশারী। উহাতে বহু সুস্পষ্ট নিদর্শন আছে। যেমন মাকামে ইবরাহীম।"
📄 ইয়াকূব (আ)-এর চারিত্রিক গুণাবলী
নবী-রাসূলগণ হইলেন মানবজাতির মধ্যে আদর্শ মানব। সরাসরি আল্লাহ্ তত্ত্বাবধানে তাঁহাদের জীবন সৌন্দর্য প্রস্ফুটিত হয়। সততা, নিষ্ঠা, জ্ঞান, প্রজ্ঞা, ধৈর্য, সৎকর্মশীলতা, তাওয়াক্কুল সার্বিক দিক হইতে তাঁহারা মানবজাতির অনুসরণীয় আদর্শ। নবী হিসাবে হযরত ইয়াকূব (আ)-এর মধ্যে এইসব বৈশিষ্ট্য পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান ছিল। বাইবেল যেখানে নবী-রাসূলগণের মহত গুণাবলীর যৎসামান্য বর্ণনা করার পাশাপাশি তাঁহাদের উপর এমন কালিমা লেপন করিয়াছে যে, তাঁহাদের মহৎ গুণাবলী ম্লান হইয়া গিহয়াছে, কুরআন মজীদ সেখানে তাঁহাদের মহৎ গুণাবলী তুলিয়া ধরার সঙ্গে সঙ্গে তাঁহাদের প্রতি আরোপিত অপবাদসমূহ জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করিয়াছে। কুরআন মজীদ হযরত ইসহাক (আ) ও ইয়াকূব (আ)-সহ বেশ কয়েকজন নবীর উল্লেখ পূর্বক বলিয়াছে :
كُلُّ هَدَيْنَا “ইহাদের প্রত্যেককে আমি সৎপথে পরিচালিত করিয়াছি” (৬:৮৪); كُلُّ مِنَ الصَّلْحِيْنَ "ইহাদের প্রত্যেকেই সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত" (৬:৮৫); كُلُّ فَضَّلْنَا عَلَى الْعَلَمِينَ "ইহাদের প্রত্যেককে আমি বিশ্ববাসীর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করিয়াছি" (৬ঃ ৮৬)।
وَاجْتَبَيْنَهُمْ وَهَدَيْنَهُمْ إِلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ. "আমি তাহাদেরকে মনোনীত করিয়াছিলাম এবং সরল পথে পরিচালিত করিয়াছিলাম" (৬:৮৭)।
أولئِكَ الَّذِينَ أَتَيْنَهُمُ الْكَتَبَ وَالْحُكْمَ وَالنُّبُوَّةَ "আমি তাহাদেরকে কিতাব, হিকমাত ও নবুওয়াত দান করিয়াছি” (৬ঃ ৮৯)। أولئِكَ الَّذِينَ هَدَى اللَّهُ فَيَهُدُهُمُ اقْتَدِهِ "ইহাদেরকেই আল্লাহ সৎপথে পরিচালিত করিয়াছেন। সুতরাং তুমি (মুহাম্মাদ) তাহাদের পথের অনুসরণ কর" (৬:৯০)।
ইয়াকূব (আ)-এর জ্ঞান ও প্রজ্ঞা সম্পর্কে স্বয়ং আল্লাহ সাক্ষ্য দেন : وَأَنَّهُ لَذُوْ عِلْمٍ لَمَا عَلَمْنُهُ “এবং সে অবশ্যই জ্ঞানী ছিল, কারণ আমি তাহাকে জ্ঞান শিক্ষা দিয়াছিলাম" (১২ঃ ৬৮)।
তাঁহার ধৈর্য সম্পর্কে দুই স্থানে বলা হইয়াছে: فَصَيْرٌ جَمِيلٌ 'পূর্ণ ধৈর্যই শ্রেয়' (১২ঃ ১৮ ও ৮৩)।
অর্থাৎ প্রাণপ্রিয় পুত্র ইউসুফ (আ)-এর নিখোঁজ সংবাদ শ্রবণ করিয়া এবং মিসর সম্রাটের হাতে সর্বকনিষ্ঠ পুত্র বিনয়ামীন চুরির দায়ে গ্রেপ্তার হওয়ার সংবাদ শুনিয়া হযরত ইয়াকূব (আ) এই কথা বলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে আরো বলেন:
وَاللهُ الْمُسْتَعَانُ عَلَى مَا تَصِفُونَ . "তোমরা যাহা বলিতেছ সেই বিষয়ে একমাত্র আল্লাহ আমার সাহায্যস্থল" (১২ঃ ১৮)। আল্লাহ্ কাছেই তিনি সাহায্যপ্রার্থী হইলেন। মহানবী (স) ইহাই আমাদেরকে শিক্ষা দিয়াছেন:
وَإِذَا اسْتَعَنْتَ فَاسْتَعِنْ بِاللَّه "তোমার সাহায্য চাওয়ার প্রয়োজন হইলে আল্লাহ্র নিকটই সাহায্য প্রার্থনা কর” (তিরমিযী, বাংলা অনু., ৪খ, পৃ. ৩১৩, বাব ৫৯, নং ২৪৫৬, কিয়ামত অধ্যায়)।
হযরত ইউসুফ (আ)-এর অনুরোধে ইউসুফ (আ)-এর সহোদর বিনয়ামীনকে ইয়াকূব-পুত্রগণ তাহাদের সঙ্গে মিসরে লইয়া যাইতে চাহিলে তাহাদের পক্ষ হইতে পিতাকে বিনয়ামীনের পূর্ণ নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় (১২ঃ ৬৩)। তখন তিনি নবীসুলভ কণ্ঠে বলিয়া উঠেন:
فَاللَّهُ خَيْرٌ حفظًا وَهُوَ أَرْحَمُ الرَّحِمِينَ . "আল্লাহ-ই সর্বোত্তম নিরাপত্তাবিধায়ক এবং তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু" (১২ঃ ৬৪)।
পুত্রের নিরাপত্তার জন্য পার্থিব নিয়ম অনুযায়ী অন্যান্য পুত্রগণের নিকট হইতে প্রতিশ্রুতি গ্রহণের এবং তাহাদের মিসরে প্রবেশের প্রয়োজনীয় পরার্মশ প্রদানের (১২ঃ ৬৬-৭) পর আল্লাহ্ মহা ক্ষমতার ও ভরসাস্থল হওয়ার কথা স্মরণ করাইয়া দিয়া তিনি বলিলেন:
وَمَا أُغْنِي عَنْكُمْ مِّنَ اللهِ مِنْ شَيْءٍ إِنِ الْحُكْمُ إِلا لِلَّهِ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَعَلَيْهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُتَوَكِّلُونَ . "আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধে আমি তোমাদের জন্য কিছু করিতে অক্ষম। বিধান আল্লাহ্রই। আমি তাঁহারই উপর ভরসা করি এবং যাহারা ভরসা করিতে চাহে তাহারা যেন আল্লাহ্র উপরই ভরসা করে" (১২ঃ ৬৭)।
ইউসুফ (আ)-এর নিখোঁজ হওয়ার দীর্ঘ বিচ্ছেদ বেদনায় হযরত ইয়াকুব (আ)-এর হৃদয় ছিল দুঃখ ভারাক্রান্ত। তাঁহার জন্য সৃষ্টিগত স্বভাবসুলভ শোকে তাঁহার দৃষ্টিশক্তিও লোপ পাইয়াছিল (১২ঃ ৮৪)। তাঁহার দশ পুত্র এই অবস্থা দেখিয়া বলিল, ইউসুফের জন্য এইভাবে সদাসর্বদা মনস্তাপ করিতে থাকিলে হয় আপনার স্বাস্থ্যহানি ঘটিবে অথবা আপনি মারা যাইবেন। ইয়াকূব (আ) উত্তরে বলেন:
قَالَ إِنَّمَا أَشْكُوا بَنِي وَحُزْنِي إِلَى اللَّهِ وَأَعْلَمُ مِنَ اللَّهِ مَالَا تَعْلَمُونَ . "সে বলিল, আমি আমার অসহনীয় বেদনা ও দুঃখ কেবল আল্লাহ্র নিকট নিবেদন করিতেছি এবং আমি আল্লাহর নিকট হইতে জ্ঞাত আছি যাহা তোমরা জ্ঞাত নও" (১২ঃ ৮৬)।
হযরত ইয়াকূব (আ)-এর এইরূপ অসহনীয় অবস্থায় আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে ওহীর মাধ্যমে শেষ পর্যায়ে জানাইয়া দিলেন যে, ইউসুফ (আ) জীবিত আছেন এবং মহাসম্মানে ও প্রতিপত্তির সহিত মিসরে শাসনকার্য করিতেছেন। উক্ত আয়াতের শেষাংশে সেই জ্ঞানের কথাই বলা হইয়াছে। বাইবেলীয় পণ্ডিতগণের মতে পিতা-পুত্রের বিচ্ছেদকাল ছিল বাইশ বৎসর (খৃ. পূ. ১৭২৮-১৭০৬ সাল; বাইবেল ডিকশনারী, পৃ. ২৩) এবং কোনও কোনও তাফসীরকারের মতে চল্লিশ বৎসর (বিস্তারিত দ্র. ইউসুফ শীর্ষক নিবন্ধ)। দুঃখ ও মনস্তাপ সত্ত্বেও তিনি ধৈর্য ধারণ করিলেন এবং সন্তানদেরকে আশার বাণী শুনাইলেন:
يُبَنِي اذْهَبُوا فَتَحَسَّسُوا مِنْ يُوسُفَ وَآخِيْهِ وَلَا تَاينَسُوا مِنْ رُّوْحِ اللَّهِ إِنَّهُ لَا يَاينَسُ مِنْ رَّوْحِ اللَّهِ إِلَّا الْقَوْمُ الْكَفَرُونَ . "হে আমার পুত্রগণ! তোমরা যাও, ইউসুফ ও তাহার সহোদরের অনুসন্ধান কর এবং আল্লাহ্ দয়া হইতে তোমরা নিরাশ হইও না। কারণ আল্লাহর দয়া হইতে কেবল কাফেররাই নিরাশ হয়" (১২ঃ ৮৭)।
সংবাদবাহক আসিয়া যখন ইউসুফ (আ)-এর খবর জানাইল এবং ইউসুফ (আ)-এর জামা তাঁহার চক্ষুদ্বয়ে রাখিতেই তিনি দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়া পাইলেন, তখন দশ পুত্র আসিয়া পিতার নিকট ক্ষমাপ্রার্থী হইল। তিনি বলিলেন:
سَوْفَ اسْتَغْفِرُ لَكُمْ رَبِّي إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ. "আমি আমার প্রতিপালকের নিকট তোমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করিব। তিনি তো পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়াময়” (১২ঃ ৯৮)।
নবী-রাসূলগণ হইলেন ক্ষমা ও অনুগ্রহের মূর্ত প্রতীক। তাঁহারা আল্লাহ্ বিধানের সীমালংঘনের অপরাধ ব্যতীত ব্যক্তিগত কারণে কখনও প্রতিশোধ গ্রহণ করেন না, বরং অপরাধীর জন্য ক্ষমা প্রার্থনাই করেন। রাসূলুল্লাহ (স) সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, তিনি কখনও ব্যক্তিগত কারণে কাহারও উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করেন নাই।
📄 বনী ইসরাঈলের পরিচয়
বনী ইসরাঈলের পরিচয়
হযরত ইয়াকূব (আ)-এর বংশধরগণ বনূ ইসরাঈল নামে পরিচিত। হযরত ইয়াকূব (আ)-এর অপর নাম ইসরাঈل। ইসর (اَسْر) অর্থ বান্দা (عَبْد) এবং (اِیْل) অর্থ আল্লাহ্, অতএব "ইসরাঈল শব্দের অর্থ "আল্লাহর বান্দা" (তাফসীরে তাবারী, বাংলা অনু, ১খ, পৃ. ৩৭০; তাফসীর ইবন কাছীর, বাংলা অনু., ১খ, পৃ. ৩০১; মাআরিফুল কুরআন, সংক্ষিপ্ত সং, পৃ. ৩৪; শায়খুল হিন্দের তরজমা, উছমানীর টীকাভাষ্য, টীকা নং ৫, পৃ. ৯; তাফহীমুল কুরআন, ২:৪০ আয়াতের ৫৬ নং টীকা)।
কুরআন মজীদের এক আয়াতে বলা হইয়াছে, "তাহারা ছিল আমারই ইবাদতকারী" (২১ঃ ৭০), এই কারণেও তাঁহার উক্ত নামকরণ হইতে পারে। ইবনুল আছীর বলিয়াছেন, জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা কর্তৃক নিহত হওয়ার ভয়ে তিনি রাত্রে বাড়ি হইতে পলায়ন করিয়া মামার বাড়ি যান। পথিমধ্যে তিনি রাত্রে ভ্রমণ করিতেন এবং দিনের বেলা নিরাপদ স্থানে বিশ্রাম করিতেন। এই রাত্রি ভ্রমণের জন্য তাঁহার উক্ত নামকরণ হয় (আল-কামিল, ১খ, পৃ. ৯৬)। কুরআন মজীদে ইদাফাত ছাড়া একবার মাত্র এই নামের উল্লেখ আছে (দ্র. ৩ঃ ৯৩)। ইব্ন আব্বাস (রা) বলেন, ইসরাঈল অর্থ আল্লাহ্র বান্দা (তাবারী, ১খ, পৃ. ৩৭০)। একটি হাদীছ হইতেও ইহার সমর্থন পাওয়া যায়। একদল ইয়াহুদী নবী করীম (স)-এর নিকট উপস্থিত হইলে তিনি তাহাদেরকে জিজ্ঞাসা করেন: ইয়াকূব (আ)-ই যে ইসরাঈল তাহা কি তোমরা জান? তাহারা বলিল, আল্লাহ্ শপথ! আমরা তাহা জানি। নবী (স) বলেন, হে আল্লাহ! আপনি সাক্ষী থাকুন (আবু দাউদ তায়ালিসীর বরাতে তাফসীর ইব্ن কাছীর, বাংলা অনু, ১খ., পৃ. ৩০১)। আল্লামা ইব্ن কাছীর বলেন, একদা মানুষের বেশে একজন ফেরেশতা হযরত ইয়াকূব (আ)-এর নিকট উপস্থিত হইয়া তাঁহার সহিত মল্লযুদ্ধে লিপ্ত হন। ফেরেশতা পরাজিত হইয়া জিজ্ঞাসা করেন, আপনার নাম কি? তিনি বলেন, ইয়াকূব। ফেরেশতা বলেন, এখন হইতে আপনার নাম "ইসরাঈل"। ইয়াকূব (আ) তাঁহার পরিচয় জিজ্ঞাসা করিলে তিনি অদৃশ্য হইয়া যান। তখন তিনি বুঝিতে পারেন যে, ইনি আল্লাহ্র ফেরেশতা (বিদায়া, ১খ., পৃ. ১৯৬)। ইহা বাইবেলের বিকৃত ঘটনার মার্জিত রূপ বলিয়া মনে হয়। কারণ বাইবেলের হাস্যাস্পদ বিবরণ যায়ী 'ইসরাঈল' অর্থ "আল্লাহ্র সহিত যুদ্ধকারী" এবং তাহাতে অনুরূপ একটি ঘটনা বর্ণিত আছে (দিপুস্তক, ৩২ঃ ২৪-৩০)। অতএব 'বনূ ইসরাঈল' অর্থ ইয়াকূব (আ)-এর বংশধর।