📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 জন্ম ও বংশপরিচয়

📄 জন্ম ও বংশপরিচয়


হযরত ইয়াকূব (আ) আনু. ১৮৩৬ খৃ. পূ. সালে কানআন (বর্তমান ফিলিস্তীন)-এ জন্মগ্রহণ করেন (বাইবেল ডিকশনারী, পৃ. ২৩)। তাঁহার সময়কাল সাধারণ হিসাব অনুসারে খৃ. পৃ. ১৮শ শতক (Collier's Encyclopedia, ১৩ খ., পৃ. ৪২৭) এবং তাফসীরে মাজেদীর বর্ণনামতে খৃ. পৃ. ২০০০ সাল হইতে ১৮৫৩ খৃ. পূ. (১খ., পৃ. ২৪৬, টীকা ৪৭৫, ই. ফা.-র বাংলা সং)। তিনি ছিলেন হযরত ইসহাক (আ)-এর পুত্র এবং হযরত ইবরাহীম (আ)-এর পৌত্র। এই বংশলতিকা কুরআন মজীদ কর্তৃক স্বীকৃত। মহান আল্লাহ বলেন:
وَوَهَبْنَا لَهُ إِسْحَقَ وَيَعْقُوبَ نَافِلَةً . "আমি ইবরাহীমকে দান করিয়াছিলাম ইসহাক এবং অতিরিক্ত পৌত্ররূপে ইয়াকূব” (২১:৭২)।
হাদীস শরীফে ইহার প্রমাণ বিদ্যমান। রাসূলুল্লাহ (স) এক ব্যক্তির জিজ্ঞাসার উত্তরে বলেনঃ
فَاكْرَمُ النَّاسِ يُوسُفُ نَبِيُّ اللَّهِ ابْنُ نَبِي اللهِ ابْنُ نَبِيِّ اللَّهِ ابْنِ خَلِيْلِ اللَّهِ . "সর্বাধিক সম্মানিত ব্যক্তি হইলেন আল্লাহ্র নবী ইউসুফ, তিনি ছিলেন আল্লাহ্ নবী (ইয়াকূব)-এর পুত্র, ইয়াকূব (আ) ছিলেন আল্লাহ্ নবী (ইসহাক)-এর পুত্র” (বুখারী, ১খ., পৃ. ৪৭৮, কিতাবুল আম্বিয়া, বাব ১৫; মুসলিম, ফাদাইল, বাংলা অনু., ৭খ., পৃ. ৩৬৮)।
বুখারীর অন্যত্র হাদীছটি এভাবে বর্ণিত হইয়াছে:
عَنِ ابْنِ عُمَرَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ قَالَ الكَرِيمُ بْنُ الكَرِيمِ بْنُ الْكَرِيمِ بْنِ الْكَرِيمِ يُوسُفُ بْنُ يَعْقُوبَ بْنِ إِسْحَاقَ بْنِ إِبْرَاهِيمَ عَلَيْهِمُ السَّلَامُ . "ইবন উমার (রা) হইতে বর্ণিত। নবী (স) বলেনঃ মর্যাদাবান ব্যক্তি, মর্যাদাবান ব্যক্তির পুত্র, মর্যাদাবান ব্যক্তির পুত্র, মর্যাদাবান ব্যক্তির পুত্র ইউসুফ ইব্‌ন ইয়াকূব ইবন ইসহাক ইব্‌ن ইবরাহীম আলায়হিমুস সালাম (আম্বিয়া, বাব ১৯, নং ৩১৩২, ৩খ., পৃ. ৩৭২; আরও দ্র. তাফসীর সূরা ১২, নং ৪৩২৭, ৪খ., পৃ. ৪৩০)।
তাঁহার মাতার নাম রিষ্কা (রিবকা)। তিনি ছিলেন পিতা-মাতার জমজ সন্তান। বাইবেলের ব্যাখ্যা অনুসারে ইয়াকূব (পাদগ্রাহী) শব্দটি হিব্রু বিশেষ্যপদ 'আকিব' (পায়ের গোছা) হইতে গৃহীত।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 কুরআন মজীদে হযরত ইয়াকূব (আ)

📄 কুরআন মজীদে হযরত ইয়াকূব (আ)


কুরআন মজীদে নামসহ ষোলবার হযরত ইয়াকূব (আ)-এর প্রসঙ্গ উল্লেখ করা হইয়াছে এবং সর্বনামরূপে আরও কয়েক স্থানে তাঁহার প্রসঙ্গ আসিয়াছে। যেমন ২ঃ ১৩২, ১৩৩, ১৩৬, ১৪০; ৩ঃ ৮৪; ৪: ১৬৩; ৬:৮৪; ১১: ৭১; ১২:৬, ৩৮, ৬৮; ১৯৪৬, ৪৯; ২১: ৭২; ২৯: ২৭; ৩৮: ৪৫। এইসব স্থানে হযরত ইয়াকূব (আ) সম্পর্কে যে তথ্যাবলী উক্ত আছে তাহা মূল পাঠসহ নিবন্ধের সংশ্লিষ্ট স্থানসমূহে উদ্ধৃত হইয়াছে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ইয়াকূব (আ)-এর বৈবাহিক জীবন ও সন্তান-সন্তুতি

📄 ইয়াকূব (আ)-এর বৈবাহিক জীবন ও সন্তান-সন্তুতি


ইয়াকূব (আ) মাতুলালয়ে পৌঁছিয়া তাহার গবাদিপশু লালন-পালনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মামার দুই কন্যা ছিল, বড়জনের নাম লিয়া এবং ছোটজনের নাম রাহীল। সাত বৎসর পর ইয়াকূব (আ) মামার ছোট কন্যা রাহীলকে বিবাহ করিতে আগ্রহ প্রকাশ করিলেন। কিন্তু মামা তাঁহার সহিত জ্যেষ্ঠা কন্যা লিয়ার বিবাহ দিলেন। কারণ জ্যেষ্ঠা কন্যাকে অবিবাহিত রাখিয়া কনিষ্ঠা কন্যার বিবাহদান তাহাদের রীতিবিরুদ্ধ ছিল (বিদায়া, ১খ., পৃ. ১৯৫)। অবশ্য পরে আরো সাত বৎসর (বিদায়া, ১খ., পৃ. ১৯৫; বাইবেলের আদিপুস্তক, ২৯: ২৭) মামার পশুপাল চরাইবার পর তিনি তাঁহার কাঙ্খিত মামাত ভগিনী রাহীলকেও বিবাহ করিতে সক্ষম হইলেন। তৎকালে একত্রে দুই বোনকে বিবাহ করা বৈধ ছিল। তাহার কন্যা লিয়ার সহিত জুলফা (সিল্পা) ও রাহীলের সহিত বিলহা নাম্নী দুইটি দাসীও দান করেন। পরে দুই স্ত্রী স্ব স্ব দাসীকেও ইয়াকূব (আ)-এর সহিত বিবাহ দেন (বিদায়া, ১খ., পৃ. ১৯৫)।
আল্লাহ্ তা'আলা এই চারজন স্ত্রীর গর্ভে ইয়াকূব (আ)-কে দ্বাদশ পুত্র ও এক কন্যা সন্তান দান করেন। প্রথম স্ত্রী লিয়ার গর্ভে রূবিল (রূবেন=পুত্রকে দেখ), শাম'ঊন (শিমিয়ন=শ্রবণ), লাবী (লেবী-আসক্ত), ইয়াহুযা (যিহূদা-স্তব), ঈসাখর, অপর বর্ণনায় ইনসাখর (ইযাখর=বেতন) ও যাঈলুন (সবূলূন= বসবাস) নামে পাঁচ পুত্র সন্তান এবং রাহীলের গর্ভে হযরত ইউসুফ (যোশেফ= বৃদ্ধি) ও বিনয়ামীন (বিন্যামিন=দক্ষিণ হস্তের পুত্র), তৃতীয় স্ত্রী এবং রাহীলের দাসী বিলহার গর্ভে দান (বিচার) ও নাফতালী (মল্লযুদ্ধ), চতুর্থ স্ত্রী এবং লিয়ার দাসী যুলফার গর্ভে জাদ, অপর বর্ণনায় হায (গাদ=সৌভাগ্য) ও আশীর (ধন্য) জন্মগ্রহণ করে (বিদায়া, ১খ., পৃ. ১৯৭; আরও দ্র. পৃ. ১৯৫; আল-কামিল, ১খ, পৃ. ৯৫-৬; তাফসীরে তাবারী, বাংলা অনু., ২খ, পৃ. ৩৬৭-৮; বাইবেলের আদিপুস্তক, ২৯ : ৩২-৩৫; ৩০ : ১-২৪; ৩৫ : ১৮ ও ২৩-২৬)। বিনয়ামীন ব্যতীত ইয়াকূব (আ)-এর সকল সন্তান তাঁহার মাতুলালয় হাররানে (তাবারীর মতে বাবিলে) জন্মগ্রহণ করেন।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 দ্বাদশ পুত্র হইতে দ্বাদশ গোত্র

📄 দ্বাদশ পুত্র হইতে দ্বাদশ গোত্র


ইয়াকূব (আ)-এর মামা লাভান-এর দুই কন্যা ছিল, বড়জনের নাম লিয়া এবং ছোটজনের নাম রাহীল। সাত বৎসর পর ইয়াকূব (আ) মামার ছোট কন্যা রাহীলকে বিবাহ করিতে আগ্রহ প্রকাশ করিলেন। কিন্তু মামা তাঁহার সহিত জ্যেষ্ঠা কন্যা লিয়ার বিবাহ দিলেন। কারণ জ্যেষ্ঠা কন্যাকে অবিবাহিত রাখিয়া কনিষ্ঠা কন্যার বিবাহদান তাহাদের রীতিবিরুদ্ধ ছিল (বিদায়া, ১খ., পৃ. ১৯৫)। অবশ্য পরে আরো সাত বৎসর (বিদায়া, ১খ., পৃ. ১৯৫; বাইবেলের আদিপুস্তক, ২৯: ২৭) মামার পশুপাল চরাইবার পর তিনি তাঁহার কাঙ্খিত মামাত ভগিনী রাহীলকেও বিবাহ করিতে সক্ষম হইলেন। তৎকালে একত্রে দুই বোনকে বিবাহ করা বৈধ ছিল। তাহার কন্যা লিয়ার সহিত জুলফা (সিল্পা) ও রাহীলের সহিত বিলহা নাম্নী দুইটি দাসীও দান করেন। পরে দুই স্ত্রী স্ব স্ব দাসীকেও ইয়াকূব (আ)-এর সহিত বিবাহ দেন (বিদায়া, ১খ., পৃ. ১৯৫)।
আল্লাহ্ তা'আলা এই চারজন স্ত্রীর গর্ভে ইয়াকূব (আ)-কে দ্বাদশ পুত্র ও এক কন্যা সন্তান দান করেন। প্রথম স্ত্রী লিয়ার গর্ভে রূবিল (রূবেন=পুত্রকে দেখ), শাম'ঊন (শিমিয়ন=শ্রবণ), লাবী (লেবী-আসক্ত), ইয়াহুযা (যিহূদা-স্তব), ঈসাখর, অপর বর্ণনায় ইনসাখর (ইযাখর=বেতন) ও যাঈলুন (সবূলূন= বসবাস) নামে পাঁচ পুত্র সন্তান এবং রাহীলের গর্ভে হযরত ইউসুফ (যোশেফ= বৃদ্ধি) ও বিনয়ামীন (বিন্যামিন=দক্ষিণ হস্তের পুত্র), তৃতীয় স্ত্রী এবং রাহীলের দাসী বিলহার গর্ভে দান (বিচার) ও নাফতালী (মল্লযুদ্ধ), চতুর্থ স্ত্রী এবং লিয়ার দাসী যুলফার গর্ভে জাদ, অপর বর্ণনায় হায (গাদ=সৌভাগ্য) ও আশীর (ধন্য) জন্মগ্রহণ করে (বিদায়া, ১খ., পৃ. ১৯৭; আরও দ্র. পৃ. ১৯৫; আল-কামিল, ১খ, পৃ. ৯৫-৬; তাফসীরে তাবারী, বাংলা অনু., ২খ, পৃ. ৩৬৭-৮; বাইবেলের আদিপুস্তক, ২৯ : ৩২-৩৫; ৩০ : ১-২৪; ৩৫ : ১৮ ও ২৩-২৬)। বিনয়ামীন ব্যতীত ইয়াকূব (আ)-এর সকল সন্তান তাঁহার মাতুলালয় হাররানে (তাবারীর মতে বাবিলে) জন্মগ্রহণ করেন।
ইয়াকূব (আ)-এর উসীলায় আল্লাহ্ তা'আলা তাঁহার মামার সম্পদে, বিশেষত গবাদিপশুতে প্রচুর বরকত ও প্রাচুর্য দান করেন। তিনি মোট বিশ বৎসর মাতুলালয়ে অবস্থান করেন (বিদায়া, ১খ., পৃ. ১৯৫)। পরে আল্লাহ তা'আলা ওহীর মাধ্যমে ইয়াকুব (আ)-কে তাঁহার পিতৃভূমিতে প্রত্যাবর্তনের নির্দেশ দান করেন এবং তাঁহাকে সহায়তা দানের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন (বিদায়া, ১খ., পৃ. ১৯৫)। তদনুযায়ী তিনি সপরিবারে প্রচুর সম্পদসহ পিতৃভূমি হেব্রনে ফিরিয়া আসেন। আসার পথে রাহীল “আফরাছ” (ইফরাত বা বেথেলহাম) নামক স্থানে বিনয়ামীনকে প্রসব করার পরপরই ইনতিকাল করেন। ইয়াকূব (আ) তাহাকে এখানেই দাফন করেন এবং তাহার কবরের উপর একটি প্রস্তর স্তম্ভ স্থাপন করেন (বিদায়া, ১খ., পৃ. ১৯৭; বাইবেলের আদিপুস্তক, ৩৫ : ১৬-২০)।
ইব্‌ন কাছীর (র) আহলে কিতাবের বরাতে উল্লেখ করেন যে, কানআনে বসবাসকালে ইয়াকূব (আ)-এর একমাত্র কন্যা দীনাকে এতদ অঞ্চলের রাজপুত্র শিখীম অপহরণ করে। শিখীমের পিতা জামূর (হমোর) তাহার পুত্রের সহিত এই কন্যাকে বিবাহ দেওয়ার প্রস্তাব করিলে ইয়াকূব (আ)-এর পুত্রগণ বলিলেন যে, তাহারা খাতনাহীনদের সহিত আত্মীয়তা করেন না। যদি তাহারা সকলে খাতনা করিতে সম্মত হয় তবে উক্ত প্রস্তাব গ্রহণ করা যাইতে পারে। তাহারা খাতনা করিবার তৃতীয় দিনে অসুস্থ হইয়া পড়িল। এই সুযোগে ইয়াকূব (আ)-এর পুত্রগণ রাজ-পরিবারে আক্রমণ চালাইয়া শিখীম ও তাহার পিতাসহ বহু লোককে হত্যা করেন। এই আক্রমণে রাজবংশের শক্তি খর্ব হইয়া যায় (দ্র. আদিপুস্তক ৩৪ : ১-৩১)। বাইবেলে বর্ণিত এই ঘটনাটি নবী পরিবারের মর্যাদার পরিপন্থী বিধায় গ্রহণযোগ্য নহে।
কুরআন মজীদ হইতেও ইয়াকূব (আ)-এর বারজন পুত্র থাকার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ইউসুফ (আ) তাঁহার পিতার নিকট তাঁহার স্বপ্নের কথা এইভাবে ব্যক্ত করেন:
يَـٰٓأَبَتِ إِنِّى رَأَيْتُ أَحَدَ عَشَرَ كَوْكَبًا وَٱلشَّمْسَ وَٱلْقَمَرَ رَأَيْتُهُمْ لِى سَـٰجِدِينَ "হে আমার পিতা! নিশ্চয় আমি দেখিয়াছি একাদশ নক্ষত্র, সূর্য ও চন্দ্রকে, আমি এইগুলিকে আমার প্রতি সিজদাবনত অবস্থায় দেখিয়াছি” (১২:৪)।
ইব্‌ন আব্বাস (রা)-র মতে একাদশ নক্ষত্র অর্থ ইউসুফ (আ)-এর একাদশ ভ্রাতা এবং সূর্য ও চন্দ্র অর্থ তাঁহার পিতা-মাতা (তাফসীরে ইব্‌ন আব্বাস, পৃ. ১৯৩; তাফসীরে উছমানী, সৌদী সং, পৃ. ৩১২, টীকা ২; মাআরেফুল কোরআন, সংক্ষিপ্ত সৌদী সং, পৃ. ৬৫১, কলাম ২; তাফহীমুল কুরআন, সূরা ইউসুফ, ৪ নং টীকা)। ইবন আব্বাস (রা)-র মতে ইউসুফ (আ)-এর স্বপ্ন দর্শনকালে তাঁহার মাতা রাহীল জীবিত ছিলেন (তাফসীরে ইব্‌ন আব্বাস, পৃ. ১৯৩)। তাফসীরে কুরতুবীতে বলা হইয়াছে যে, তখন তাঁহার মাতা জীবিত ছিলেন না, তাঁহার সৎমাতা লিয়া জীবিত ছিলেন। শেষোক্ত মত সত্য হইলে ইয়াকূব (আ) সপরিবারে মিসর গমনকালেও লিয়া জীবিত ছিলেন। কারণ ইউসুফ (আ)-এর রাজ-দরবারে তাহাদের উপস্থিতি প্রসঙ্গে কুরআন মজীদে বলা হইয়াছে:
وَرَفَعَ أَبَوَيْهِ عَلَى الْعَرْشِ وَخَرُّوا لَهُ سُجَّدًا . "এবং ইউসুফ তাহার মাতা-পিতাকে উচ্চাসনে বসাইল এবং তাহারা সকলে তাহার সম্মানে সিজদায় লুটাইয়া পড়িল” (১২ঃ ১০০)।
বাইবেল হইতে জানা যায় যে, লিয়া ইয়াকূব (আ)-এর জীবদ্দশায় মারা যান (আদিপুস্তক, ৪৯ঃ ৩১)। তাঁহার অপর স্ত্রীদ্বয় কখন মৃত্যুবরণ করেন সেই সম্পর্কে কিছু জানা যায় না।
হযরত ইয়াকূব (আ) পুত্রগণের মধ্যে বৃদ্ধ বয়সের পুত্র ইউসুফ (আ)-কে সর্বাধিক স্নেহ করিতেন। স্বপ্নের বিবরণ শুনিয়াই তিনি তাঁহাকে নিজ ভ্রাতাদের নিকট তাহা গোপন রাখার উপদেশ দেন, যাহাতে তাহারা তাঁহার ক্ষতিসাধন করিতে না পারে (দ্র. ১২:৫)। ১২ঃ ৬ হইতে ১৮ আয়াত পর্যন্ত তাঁহার বিরুদ্ধে সৎ ভ্রাতাদের ষড়যন্ত্র ও তাহা বাস্তবায়নের ঘটনা উল্লিখিত হইয়াছে। সর্বাধিক প্রিয় সন্তানকে হারাইয়া হযরত ইয়াকূব (আ) পুত্রশোকে এক পর্যায়ে দৃষ্টিশক্তি হারাইয়া ফেলেন এবং পরবর্তী কালে ইউসুফ (আ)-এর জামা তাঁহার মুখমণ্ডলে স্পর্শ করাইলে তিনি পুনরায় দৃষ্টিশক্তি লাভ করেন (দ্র. ১২:৮৪ ও ৯৬)। এক সময়ে কানআনে দুর্ভিক্ষের প্রাদুর্ভাব হইলে ইয়াকূব (আ) তাঁহার দশ পুত্রকে খাদ্যশস্য সংগ্রহের জন্য মিসরে প্রেরণ করেন। ইউসুফ (আ) তাহাদেরকে দেখিয়া চিনিয়া ফেলেন কিন্তু নিজের পরিচয় গোপন রাখেন, অবশ্য তাহারা তাঁহাকে চিনিতে পারে নাই (দ্র. ১২: ৫৮)। তিনি তাহাদেরকে পর্যাপ্ত খাদ্যশস্য দান করেন, গোপনে তাহাদের ক্রয়মূল্য ফেরত দেন এবং তাহারা পুনর্বার আসিলে তাহাদের কনিষ্ঠ ভ্রাতাকে সঙ্গে করিয়া আনিবার জন্য জোর তাগিদ দেন (দ্র. ১২ঃ ৫৯-৬২)। তাহাদের কনিষ্ঠ ভ্রাতা এবং ইউসুফ (আ)-এর সহোদর বিনয়ামীনই ছিলেন তখন ইয়াকূব (আ)-এর সর্বাধিক স্নেহের পাত্র। মিসর হইতে ফিরিয়া আসিয়া তাহারা পিতাকে মিসরের শাসনকর্তার অনুরোধ সম্পর্কে অবহিত করিল এবং বিনয়ামীনকে তাহাদের সঙ্গী করা হইলে তাহার নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতিও প্রদান করিল (১২ঃ ৬৩)। ইয়াকূব (আ) বিদায়কালে বলিলেন:
فَاللَّهُ خَيْرٌ حَفِظَا وَهُوَ أَرْحَمُ الرَّحِمِينَ. "আল্লাহ্ই রক্ষণাবেক্ষণে শ্রেষ্ঠ এবং তিনি সর্বশ্রেষ্ট দয়ালু" (১২ঃ ৬৪)।
দ্বিতীয়বার তাহারা মিসর পৌছিলে ইউসুফ (আ) তাঁহার সহোদরকে সুকৌশলে নিজের কাছে রাখিয়া দেন এবং নিজের পরিচয় সহোদরের নিকট ব্যক্ত করেন (দ্র. ১২ঃ ৬৯-৭৯)। বিনয়ামীন মিসর হইতে প্রত্যাবর্তন না করায় ইয়াকুব (আ) আল্লাহ্র তরফ হইতে ইঙ্গিত পাইলেন যে, তাঁহার স্নেহের ধন ইউসুফ (আ) এখনো জীবিত আছেন। তিনি পুত্রদের সহিত সাক্ষাতের জন্য ব্যাকুল হইয়া উঠিলেন। এইজন্য তাঁহার অপর পুত্রগণ তাঁহার প্রতি অনুযোগ (দ্র. ১২ঃ ৮৬) করিলে তিনি বলেন:
إِنَّمَا أَشْكُوا بَنِي وَحُزْنِي إِلَى اللَّهِ وَأَعْلَمُ مِنَ اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ. "আমি আমার অসহনীয় বেদনা এবং আমার দুঃখ শুধু আল্লাহ্র নিকট নিবেদন করিতেছি। আমি আল্লাহ্র নিকট হইতে জানি যাহা তোমরা জান না" (১২ঃ ৮৬)। তৃতীয়বার তাহারা মিসর পৌঁছিলে ইউসুফ (আ) তাহাদের সামনে নিজের পরিচয় ব্যক্ত করেন, তাহাদের পূর্বের কৃতকর্মের কথা স্মরণ করাইয়া দেন এবং তাহাদের জন্য ক্ষমা ঘোষণা করেন এবং তাহাদের সকলকে সপরিবারে মিসরে চলিয়া আসিতে বলেন (দ্র. ১২ঃ ৮৬-৯৩)।
তখন তিনি স্পষ্টভাবে ইউসুফ (আ)-এর নাম উচ্চারণ পূর্বক তাহাদেরকে পুনরায় মিসরে যাইতে বলেন। তাহারা ইউসুফ (আ)-এর দরবারে উপস্থিত হইয়া অনুনয়-বিনয় করিয়া তাহাদের জন্য রসদ সরবরাহের আবেদন জানায়। তিনি তাহাদের সঙ্গে পিতার জন্য নিজের জামা প্রেরণ করেন (দ্র. ১২: ৯৩)। চতুর্থবারের সফরে হযরত ইয়াকূব (আ) সপরিবারে মিসর গমন করেন। তাঁহারা শহরদ্বারে পৌছিলে ইউসুফ (আ) পিতা-মাতাকে আলিঙ্গনের মাধ্যমে অভ্যর্থনা জানাইয়া নির্ভয়ে ও নিরাপদে রাজধানীতে প্রবেশ করিতে বলেন। রাজ-দরবারে তিনি পিতা-মাতাকে তাঁহার পাশে বসান এবং দশ ভ্রাতা তাঁহাকে রাজকীয় সম্মান প্রদর্শন পূর্বক সিজদা করে (দ্র. ১২ঃ ৯৯-১০০)। তখন ইউসুফ (আ) বলেন:
يابَتِ هُذَا تَأْوِيلُ رُؤْيَايَ مِنْ قَبْلُ قَدْ جَعَلَهَا رَبِّي حَقًّا . "হে আমার পিতা! ইহাই আমার পূর্বেকার স্বপ্নের ব্যাখ্যা, আমার প্রতিপালক উহাকে সত্যে পরিণত করিয়াছেন" (১২ঃ ১০০)।
দ্বাদশ পুত্র হইতে দ্বাদশ গোত্র
হযরত ইয়াকূব (আ)-এর দ্বাদশ পুত্র হইতে আল্লাহ তা'আলা দ্বাদশ গোত্রের উন্মেষ ঘটান। এই সম্পর্কে কুরআন মজীদে সুস্পষ্ট ইঙ্গিত বিদ্যমান:
وَقَطَّعْنَهُمُ اثْنَتَيْ عَشْرَةَ أَسْبَاطًا أَمَمًا . "আমি তাহাদেরকে দ্বাদশ গোত্রে বিভক্ত করিয়াছি" (৭: ১৬০; আরও দ্র. ৫: ১২; এবং ২ঃ ৬০)।
পুত্রগণের মধ্যে হযরত ইউসুফ (আ)-এর নবুওয়াত সম্পর্কে কুরআন মজীদে সুস্পষ্ট উল্লেখ আছে, কিন্তু তাঁহার অবশিষ্ট ভ্রাতাগণ নবী ছিলেন কি না সেই বিষয়ে কোন উল্লেখ নাই। অধিকাংশ তাফসীরকারের মতে তাহারা নবী ছিলেন না (বিদায়া, ১খ, পৃ. ১৯৮)। অবশ্য কতক তাফসীরকার নিম্নোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় তাহারাও নবী ছিলেন বলিয়া মত প্রকাশ করিয়াছেন:
وَمَا أُنْزِلَ إِلَيْنَا وَمَا أُنْزِلَ إِلَى إِبْرَاهِيمَ وَاسْمَعِيلَ وَاسْحَقَ وَيَعْقُوبَ وَالْأَسْبَاطَ . "এবং যাহা নাযিল হইয়াছে ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকূব ও তাহার বংশধরগণের উপর" (২ঃ ১৩৬)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00