📄 কা'বা শরীফ নির্মাণে ইসমাঈল (আ)-এর অংশগ্রহণ
হযরত ইবরাহীম (আ) তাঁহার জ্যেষ্ঠ পুত্র হযরত ইসমাঈল (আ)-কে সঙ্গে লইয়া আল্লাহ তা'আলার মহিমান্বিত ঘর কা'বা শরীফ স্থায়ীভাবে নির্মাণ করেন। তিনি সর্বপ্রথম কা'বা ঘর নির্মাণ করেন নাই, বরং পুনর্নির্মাণ করিয়াছেন, যাহা ১৪ : ৩৭ আয়াত হইতে পরিষ্কার বুঝা যায়। এই ঘরের সম্পূর্ণরূপে নূতন নির্মাণে হযরত ইসমাঈল (আ) পিতার সহযোগিতা করেন। কুরআন মজীদে তাহা এইভাবে উল্লেখ করা হইয়াছে :
وَعَهِدْنَا إِلى إِبْرَاهِيمَ وَاسْمَعِيلَ أَنْ طَهْرًا بَيْتِيَ لِلطَّائِفِينَ وَالْعُكَفِينَ وَالرُّكَّعِ السُّجُودِ . "এবং আমি ইবরাহীম ও ইসমাঈলকে আদেশ করিলাম যে, তোমরা দুইজনে আমার ঘরকে তাওয়াফকারী, ই'তিকাফকারী এবং রুকু ও সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখ” (২: ১২৫)।
وَإِذْ يَرْفَعُ ابْرَاهِيمُ الْقَوَاعِدَ مِنَ الْبَيْتِ وَاسْتَعِيلُ رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا إِنَّكَ أَنْتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ . "যখন ইবরাহীম ও ইসমাঈل কা'বা ঘরের প্রাচীর তুলিতেছিল তখন তাহারা বলিয়াছিল, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের এই কাজ কবুল কর, নিশ্চয় তুমি সর্বশ্রোতা সর্বজ্ঞাতা” (২ঃ ১২৭)।
তাফসীর ও ইতিহাসের বর্ণনা হইতে জানা যায় যে, হযরত ইসমাঈل (আ) কা'বা ঘর নির্মাণে প্রয়োজনীয় পাথর ও আনুষঙ্গিক দ্রব্যাদির যোগান দিতেন। কা'বা ঘর আগে নির্মিত হইয়াছে না কুরবানীর ঘটনা আগে ঘটিয়াছে তাহা নিশ্চিত করিয়া বলা যায় না। তবে কা'বা ঘর নির্মাণকালেও ইসমাঈল (আ) যে তরুণ যুবক ছিলেন তাহার ইঙ্গিত পাওয়া যায় কা'বা ঘর নির্মাণে তাঁহার সহযোগী ভূমিকা হইতে। ইবন সা'দ লিখিয়াছেন যে, হযরত ইবরাহীম (আ) এক শত বৎসর বয়সে কা'বা ঘর নির্মাণের নির্দেশ প্রাপ্ত হন এবং তখন ইসমাঈল (আ)-এর বয়স ত্রিশ বৎসর হইয়াছিল (আত-তাবাকাতুল-কুবরা, ১খ, পৃ. ৫২)। তবে কা'বা শরীফ নির্মাণকালে ইবরাহীম (আ.)-এর বয়স সংক্রান্ত এই বর্ণনাটি সন্দেহমুক্ত নহে। কা'বা ঘর নির্মাণ সংক্রান্ত বিস্তারিত বিবরণ হযরত ইবরাহীম (আ) শীর্ষক নিবন্ধে দ্র.।
নবুওয়াত প্রাপ্তি: হযরত ইসমাঈল (আ) আল্লাহ তা'আলার একজন মহান নবী ও রাসূল ছিলেন। তাঁহার দা'ওয়াতের কর্মক্ষেত্র ছিল হিজায, ইয়ামান, হাদারামাওতসহ সমগ্র আরব উপদ্বীপ। তিনি কত বৎসর বয়সে নবুওয়াতপ্রাপ্ত হন তাহা নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায় না। তাঁহার নবুওয়াত ও রিসালাতের সাক্ষ্য প্রদান করিয়া মহান আল্লাহ বলেন: وَاذْكُرْ فِي الْكِتَابِ اسْمُعِيلَ إِنَّهُ كَانَ صَادِقَ الْوَعْدِ وَكَانَ رَسُولًا نَّبِيًّا ، وَكَانَ يَأْمُرُ أَهْلَهُ بِالصَّلَوٰةِ والزكوة وكَانَ عِنْدَ رَبِّهِ مَرْضِيًّا "আর স্মরণ কর এই কিতাবে ইসমাঈলের কথা। সে ছিল প্রতিশ্রুতি পালনে সত্যাশ্রয়ী এবং সে ছিল রাসূল ও নবী। সে তাহার পরিবারবর্গকে সালাত ও যাকাত আদায়ের নির্দেশ দিত এবং সে ছিল তাহার প্রতিপালকের সন্তোষভাজন" (১৯:৫৪-৫৫)।
قُلْ أَمَنَّا بِاللَّهِ وَمَا أُنْزِلَ عَلَيْنَا وَمَا أُنْزِلَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَاسْمُعِيلَ وَإِسْحَقَ وَيَعْقُوبَ وَالْأَسْبَاطَ . "বল, আমরা আল্লাহতে এবং আমাদের প্রতি যাহা নাযিল হইয়াছে তাহাতে এবং ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকূব ও তাহার বংশধরগণের প্রতি যাহা নাযিল হইয়াছে তাহাতে ঈমান আনিয়াছি” (৩:৮৪)।
قُولُوا آمَنَّا بِاللَّهِ وَمَا أُنْزِلَ إِلَيْنَا وَمَا أُنْزِلَ إِلَى إِبْرَاهِيمَ وَاسْمُعِيلَ . "তোমরা বল, আমরা ঈমান আনিয়াছি আল্লাহতে এবং যাহা আমাদের উপর নাযিল হইয়াছে এবং যাহা ইবরাহীম ও ইসমাঈলের উপর নাযিল হইয়াছে....." (২: ১৩৬)।
إِنَّا أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ كَمَا أَوْحَيْنَا إِلَى نُوحٍ وَالنَّبِيِّنَ مِنْ بَعْدِهِ وَأَوْحَيْنَا إِلَى إِبْرَاهِيمَ وَاسْمُعِيلَ وَإِسْحَقَ وَيَعْقُوبَ . "আমি তোমার নিকট ওহী প্রেরণ করিয়াছি যেমন নূহ ও তাহার পরবর্তী নবীগণের নিকট ওহী প্রেরণ করিয়াছিলাম, ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকূব...... নিকট ওহী প্রেরণ করিয়াছিলাম" (৪: ১৬৩)।
অনুরূপভাবে ৬: ৭৪-৯০ আয়াত অবধি হযরত ইবরাহীম (আ) প্রসঙ্গে আলোচনার সূত্রপাত হইয়া ধারাবাহিকভাবে অন্যান্য নবীগণের প্রসঙ্গও উল্লিখিত হইয়াছে এবং সেখানে হযরত ইসমাঈল (আ)-ও অন্তর্ভুক্ত আছেন। অতএব তাঁহার নবুওয়াতপ্রাপ্তিও সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হইয়াছে। পিতা-পুত্র কর্তৃক নির্মিত তাওহীদবাদী মানবজাতির কিবলা ও পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম ঘর কা'বা শরীফকে কেন্দ্র বানাইয়া হযরত ইসমা'ঈল (আ) গোটা আরবভূমিতে দীন ইসলামের দাওয়াত সম্প্রসারিত করেন (আরাইস, পৃ. ১০৭; বিদায়া, ২খ, পৃ. ১৯৩)। বুখারীর কিতাবুল আম্বিয়ায় সন্নিবিষ্ট ৩১১৪ নম্বর হাদীছ হইতে জ্ঞাত হওয়া যায় যে, হযরত ইবরাহীম (আ) ইসমাঈল (আ) ও তাঁহার মাতাকে দেখিবার জন্য দুইবার মক্কায় আসিয়াছিলেন এবং পুত্রকে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দান করিয়া যান। হযরত ইসমাঈল (আ) তাঁহার মায়ের ভাষা কিবতী (কপটিক) এবং পিতার ভাষা হিব্রুও জানিতেন এবং আরবে আসিয়া আল্লাহর অনুগ্রহে আরবী ভাষাও শিক্ষা করেন। ফলে ঐ তিন ভাষাভাষী জাতির মধ্যে আল্লাহ্ দীন প্রচার তাঁহার জন্য সহজসাধ্য হয়, অন্তত ভাষাগত দিকের বিবেচনায় (আনওয়ারে আম্বিয়া, পৃ. ৬৫)। তাঁহার তত্ত্বাবধানে বাৎসরিক হজ্জের অনুষ্ঠানও উদযাপিত হইতে থাকে। এখানে উল্লেখ্য যে, পিতা-পুত্র-ভ্রাতুষ্পুত্র সকলের ধর্মীয় নীতিমালা ছিল একই এবং বলা যায়, ইবরাহীম (আ) ছিলেন তিনজন নবীর ইমাম। সেই কালেও হজ্জ করা ফরয ছিল। যেমন কুরআন মজীদ হইতে জানা যায় যে, আল্লাহ তা'আলা হযরত ইবরাহীম (আ)-কে নির্দেশ প্রদান করিয়া বলেন: وَأَذِّنْ فِي النَّاسِ بِالْحَجِّ يَأْتُوكَ رِجَالًا وَعَلَى كُلِّ ضَامِرٍ يَأْتِينَ مِنْ كُلِّ فَجٍّ عَمِيقٍ. "এবং তুমি মানুষের মধ্যে হজ্জের ঘোষণা করিয়া দাও, তাহারা তোমার নিকট আসিবে পদব্রজে ও সর্বপ্রকার ক্ষীণকায় উষ্ট্রের পিঠে, তাহারা আসিবে দূর-দূরান্তের পথ অতিক্রম করিয়া" (২২: ২৭)।
কিন্তু ইয়াহুদীরা হযরত ইসমাঈল (আ) ও তাঁহার মাতার প্রতি অনর্থক বিদ্বেষভাবাপন্ন হইয়া বাইবেল হইতে কা'বা ঘরের নির্মাণ, হজ্জের মহাসমাবেশ ও কুরবানীর উৎসবকে সম্পূর্ণরূপে গায়েব করিয়া দিয়াছে। শুধু তাহাই নহে, তাহারা নিজদিগকে ইবরাহীম (আ)-এর বংশধর ও তাঁহার আদর্শের উত্তরাধিকারী বলিয়া দাবি করিলেও তাহারা এই নবীগণের নিকট অবতীর্ণ সহীফাসমূহ অবলুপ্তির হাত হইতে রক্ষা করিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হইয়াছে।
📄 হযরত ইসমাঈল (আ)-এর ইনতিকাল
হযরত ইসমাঈল (আ)-এর ইনতিকাল
বাইবেলের বর্ণনামতে হযরত ইসমা'ঈল (আ) ১৩৭ বৎসর বয়সে ইনতিকাল করেন (আদিপুস্তক, ২৫: ১৭)। মুসলিম ঐতিহাসিকগণও উক্ত তারিখ উদ্ধৃত করিয়াছেন (বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, পৃ. ১৯৩; তাবারী, তারীখুল উমাম, ১খ, পৃ. ১৬২-এর বরাতে আওয়ারে আম্বিয়া, পৃ. ৬৬; আল-কামিল, ১খ, পৃ. ১৯৫; আরাইস, পৃ. ১০৭)। ইনতিকালের সময় তিনি ভ্রাতুষ্পুত্র ইসূর সহিত নিজ কন্যার বিবাহের ওসিয়ত করিয়া যান এবং তাহা প্রতিপালিত হয় (আরাইস, পৃ. ১০৯; আল-কামিল, ১খ, পৃ. ৯৫; বিদায়া, ১খ, পৃ. ১৯৩)। মুসলিম ঐতিহাসিকগণের মতে ইসমাঈল (আ) মক্কা শরীফেই ইনতিকাল করেন এবং তাঁহাকে তাঁহার মাতার কবরের পাশে রুকন ও কা'বার মাঝখানে হিজরে মীযাবের নিচে দাফন করা হয় (আত-তাবাকাতুল কুবরা, ১খ, পৃ. ৫২; আল-কামিল, ১খ, পৃ. ৯৫; বিদায়া, ১খ, পৃ. ১৯৩; আরাইস, পৃ. ১০৭; তারীখ তাবারী, ১খ-এর বরাতে কাসাসুল কুরআন, ১খ, পৃ. ২৪৭)। আল্লামা হিফজুর রহমান লিখিয়াছেন, তাওরাতে ইঙ্গিত রহিয়াছে যে, হযরত ইসমাঈল (আ)-এর কবর ফিলিস্তীনেই অবস্থিত এবং তিনি এখানেই ইনতিকাল করেন (কাসাসুল কুরআন, ১খ, পৃ. ২৪৭)। তিনি সম্ভবত নাজ্জারের কাসাসুল আম্বিয়ার বক্তব্য উদ্ধৃত করিয়াছেন। কারণ উহাতে এইরূপ একটি বক্তব্য বিদ্যমান (পৃ. ১০১)। কিন্তু বাইবেলের আদিপুস্তকের ২৫শ অধ্যায়সহ উক্ত পুস্তকের কোথায়ও অনুরূপ স্পষ্ট ইঙ্গিত নাই (নিবন্ধকার)।
উমার ইব্ন আবদুল আযীয (র)-এর সূত্রে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন, ইসমাঈল (আ) আল্লাহ্র নিকট মক্কাভূমির উষ্ণ আবহাওয়ার অভিযোগ করিলে তাঁহার মহান প্রতিপালক ওহী মারফত বলেন, তোমাকে যেখানে দাফন করা হইবে, আমি সেখান হইতে তোমার জন্য জান্নাতের দিকে একটি দরজা খুলিয়া দিব এবং কিয়ামত পর্যন্ত তোমার আত্মার প্রতি উহার শান্তিধারা প্রবাহিত হইতে থাকিবে (বিদায়া, ১খ, পৃ. ১৯৩; আরাইস, পৃ. ১০৭)। ইবন সা'দ বলেন, তিনজন নবীর কবরের স্থান সম্পর্কেই জানা যায়: ইসমাঈল (আ)-এর কবর কা'বার চত্বরে, হূদ (আ)-এর কবর ইয়ামানের কোন এক পর্বতোপরি, যেখানে মাটি সিক্ত করার উপযোগী একটি বৃক্ষ আছে, যে স্থানের উষ্ণতা পৃথিবীর মধ্যে সর্বাধিক এবং মহানবী (স)-এর রওযা মুবারক (তাবাকাত, ১খ, পৃ. ৫২)।