📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 কুরবানী করা হইয়াছিল ইসমাঈলকে, ইসহাককে নয়

📄 কুরবানী করা হইয়াছিল ইসমাঈলকে, ইসহাককে নয়


কুরবানী করা হইয়াছিল ইসমাঈলকে, ইসহাককে নয়
কুরআন মজীদে কুরবানীর যে ঘটনা বিবৃত হইয়াছে তাহাতে নামোল্লেখ করিয়া বলা হয় নাই যে, হযরত ইবরাহীম (আ) তাঁহার পুত্রদ্বয়ের মধ্যে ইসমাঈল (আ)-কে কুরবানী করিয়াছেন, না ইসহাক (আ)-কে। এই বিষয়ে হাদীছের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থাবলীতেও সহীহ সনদসূত্রে রাসূলুল্লাহ (স)-এর কোন বক্তব্যও বিদ্যমান নাই। ইয়াহুদী-খৃস্টান সম্প্রদায় দাবি করে যে, হযরত ইসহাক (আ)-কে কুরবানী করা হইয়াছিল, ইসমাঈল (আ)-কে নয়। এই বিষয়ে বাইবেলের বক্তব্য নিম্নরূপঃ "এই সকল ঘটনার পরে সদাপ্রভু ইবরাহীমের পরীক্ষা করিলেন। তিনি তাঁহাকে বলিলেন, হে ইবরাহীম! তুমি আপন পুত্রকে, তোমার অদ্বিতীয় পুত্রকে, যাহাকে তুমি ভালোবাস, সেই ইসহাককে লইয়া মোরিয়া দেশে যাও এবং তথাকার যে এক পর্বতের কথা আমি তোমাকে বলিব, তাহার উপর তাহাকে হোমার্থে যবেহ কর। পরে ইবরাহীম প্রত্যুষে উঠিয়া গর্দভ সাজাইয়া দুইজন দাস ও আপন পুত্র ইসহাককে সঙ্গে লইলেন, হোমের নিমিত্ত কাষ্ঠ কাটিলেন, আর উঠিয়া সদাপ্রভুর নির্দিষ্ট স্থানের দিকে গমন করিলেন। তৃতীয় দিবসে ইবরাহীম চক্ষু তুলিয়া দূর হইতে সেই স্থান দেখিলেন। তখন ইবরাহীম আপন দাসদিগকে কহিলেন, তোমরা এই স্থানে গর্দভের সহিত থাক; আমি ও যুবক আমরা ঐ স্থানে গিয়া প্রণিপাত করি, পরে তোমাদের কাছে ফিরিয়া আসিব। তখন ইবরাহীম হোমের কাষ্ঠ লইয়া আপন পুত্র ইসহাকের স্কন্ধে দিলেন এবং নিজ হস্তে অগ্নি ও খড়গ লইলেন; পরে উভয়ে একত্রে চলিয়া গেলেন। আর ইসহাক আপন পিতা ইবরাহীমকে বলিলেন, হে আমার পিতা! তিনি কহিলেন, হে বৎস! দেখ, এই আমি। তখন তিনি বলিলেন, এই দেখুন অগ্নি ও কাষ্ঠ, কিন্তু হোমের নিমত্ত মেষশাবক কোথায়? ইবরাহীম কহিলেন, বৎস! সদাপ্রভু আপনি হোমের জন্য মেষশাবক যোগাইবেন। পরে উভয়ে একসঙ্গে চলিয়া গেলেন। সদাপ্রভুর নির্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত হইলে ইবরাহীম সেখানে যবেহ করার মঞ্চ নির্মাণ করিয়া কাষ্ঠ সাজাইলেন, পরে আপন পুত্র ইসহাককে বাঁধিয়া মঞ্চে কাষ্ঠের উপর রাখিলেন। অতঃপর ইবরাহীম হস্ত বিস্তার করিয়া আপন পুত্রকে যবেহ করিতে খড়গ গ্রহণ করিলেন। এমন সময় আকাশ হইতে সদাপ্রভুর দূত তাঁহাকে ডাকিলেন এবং বলিলেন, ইবরাহীম! তিনি বলিলেন, দেখুন এই আমি। তখন তিনি বলিলেন, যুবকের প্রতি তোমার হস্ত বিস্তার করিও না, তুমি সদাপ্রভুকে ভয় কর, আমাকে আপনার অদ্বিতীয় পুত্র দিতেও অসম্মত নও। তখন ইবরাহীম চক্ষু তুলিয়া চাহিলেন, আর দেখ, তাঁহার পশ্চাৎ দিকে একটি মেষ, তাহার শিং ঝোপে বদ্ধ। পরে ইবরাহীম গিয়া সেই মেষটি লইয়া আপন পুত্রের পরিবর্তে হোমার্থে যবেহ করিলেন।..... পরে সদাপ্রভু কহিলেন..... আমি অবশ্যই তোমাকে আশীর্বাদ করিব এবং আকাশের তারকারাজি ও সমুদ্র তীরস্থ বালুকার ন্যায় তোমার অতিশয় বংশ বৃদ্ধি করিব..." (বাইবেলের যাত্রাপুস্তক, ২২: ১-১৯)। যবীহুল্লাহ সম্পর্কে বাইবেলের বর্ণনায় স্ববিরোধিতা রহিয়াছে। কুরআন মজীদে এই ঘটনার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা নিম্নরূপ:
আল্লাহ তা'আলা পিতার ছুরি ও পুত্রের কণ্ঠনালীর মাঝখানে একটি তাম্রপাত রাখিয়া দিয়াছিলেন। ফলে ছুরি কণ্ঠনালী স্পর্শ করিতে পারে নাই (আরাইস, পৃ. ১০০)। মহান আল্লাহ বলেন: "আমি এইভাবেই সৎকর্মপরায়ণদেরকে পুরস্কৃত করিয়া থাকি"। হে ইবরাহীম! এই তোমার পুত্রের পরিবর্তে তোমার যবেহ করার প্রাণী। ইহাকে তুমি যবেহ কর। ইবরাহীম (আ) দৃষ্টি ফিরাইয়া একটি হৃষ্টপুষ্ট দুম্বাসহ হযরত জিবরাঈল (আ)-কে উপস্থিত দেখিতে পান। ইন্ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত যে, ইহা ছিল জান্নাতের একটি দুম্বা যাহা চল্লিশ বৎসর ধরিয়া জান্নাতে বিচরণ করিয়াছে। অপর বর্ণনায় আছে, ইবন আব্বাস (রা) বলেন যে, ইবরাহীম (আ) যে দুম্বা যবেহ করেন তাহা ছিল আদম (আ)-এর পুত্র হাবীল কর্তৃক কুরবানীকৃত দুম্বা, যাহা আল্লাহ কবুল করিয়াছিলেন (তাফসীরে কবীর, ২৬খ, পৃ. ১৫৮; তাফসীরে রুহুল মাআনী, ২৩ খ, পৃ. ১৩২)।
ইবরাহীম (আ) পুত্রকে ছাড়িয়া দিলেন এবং দুম্বাটি মিনার কুরবানীর স্থানে যবেহ করিলেন (আরাইস, পৃ. ১০০; মাআরেফুল কোরআন, ৭খ, পৃ. ৪৪৯)। তখন হইতে কিয়ামতকাল পর্যন্ত তৌহীদবাদী মানবজাতির জন্য প্রতি বৎসর দশ যুলহিজ্জা পশু কুরবানী করার ঐতিহ্য চালু হইয়াছে। এইভাবে অবিস্মরণীয় করিয়া রাখা হইয়াছে পিতা-পুত্রের এক কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার দৃষ্টান্তকে। "নিশ্চয় ইহা ছিল এক স্পষ্ট পরীক্ষা। আমি তাহাকে মুক্ত করিলাম এক কুরবানীর বিনিময়ে। আমি ইহা পরবর্তীদের জন্য স্মরণে রাখিয়াছি” (৩৭: ১০৬-৭)।
এখানে একটি প্রশ্ন জাগিতে পারে যে, হযরত ইবরাহীম (আ) তো পুত্রকে কুরবানী করার স্বপ্ন দেখিয়াছেন, অথচ তিনি তাহাকে কুরবানী করেন নাই। তাহা হইলে নবীর স্বপ্ন সত্য হইল কিভাবে? বস্তুত ইবরাহীম (আ) স্বপ্নে পুত্রকে যবেহ করিতে দেখিয়াছেন, যবেহ করিয়া তাহাকে শেষ করিয়া ফেলিয়াছেন তাহা দেখেন নাই। অতএব তিনি তাঁহার স্বপ্ন বাস্তবায়িত করিয়াছেন অর্থাৎ স্বপ্নে যবেহ করিতে দেখিয়াছিলেন এবং বাস্তবেও তিনি ছুরি হাতে লইয়া পুত্রের গলায় তাহা সজোরে চালাইয়াছেন কিন্তু যেহেতু তিনি যবেহকর্ম সমাপ্ত করিয়াছেন এইরূপ স্বপ্ন দেখেন নাই, তাই বাস্তবেও যবেহ সমাপ্ত করিতে পারেন নাই। আল্লাহ তাঁহাকে যতদূর স্বপ্ন দেখাইয়াছেন, তিনি ততটাই বাস্তবায়িত করিয়াছেন (তাফসীরে কবীর, ২৬খ, পৃ. ১৫৫; তাফহীমুল কুরআন, ৩৭: ১০২ ও ১০৫ আয়াত সংশ্লিষ্ট ৫৮ ও ৬৩ নং টীকা)।
ইয়াহুদী-খৃস্টানগণ হযরত ইসমাঈল (আ)-এর প্রতি বিদ্বেষবশত এই কুরবানীর ঐতিহ্যকে ত্যাগ করিয়াছে। আরবদের মধ্যে ইহা চালু থাকিলেও কালক্রমে তাওহীদের বিশ্বাস হইতে তাহাদের বিচ্যুতির সঙ্গে সঙ্গে এই প্রথাও বিকৃত হইয়া যায়। তাহারা আল্লাহ্ উদ্দেশ্যে কুরবানী করার পরিবর্তে তাহাদের মনগড়া দেব-দেবীর নামে পশু উৎসর্গ করিত। যেমন কুরআন মজীদে উক্ত হইয়াছে: وَمَا ذُبِحَ عَلَى النُّصُبِ . “এবং যাহা মূর্তিপূজার বেদীর উপর বলি দেওয়া হয় (তাহাও তোমাদের জন্য হারাম)" (৫ঃ৩)। জাহিলী যুগে আরব মুশরিকরা কা'বা ঘরে স্থাপিত মূর্তির নামে পশু যবেহ করিত এবং উহার রক্ত সেগুলির দেহে মর্দন করিত। অন্যান্য স্থানেও তাহারা অনুরূপ কুরবানগাহ স্থাপন করিয়াছিল (ফী জিলালিল কুরআন, ২খ, পৃ. ৮৪০)। ইন্ন কাছীর (র) বলেন, অর্থাৎ মূর্তিপূজার বেদীতে যাহা যবেহ করা হয়। মুজাহিদ ও ইব্‌ন জুরায়জ বলেন, কা'বা গৃহের পার্শ্বে অবস্থিত একটি পাথরকে 'নুসুব' বলা হয়। ইব্‌ن জুরায়জ আরও বলেন, জাহিলী যুগে সেখানে ৩৬০টি পূজার বেদী ছিল। সেইগুলির উপর তাহারা পশু বলি দিত এবং তাহারা কাবাগৃহের নিকটবর্তী বেদীগুলিতে বলিকৃত পশুর রক্ত কাবাগৃহে ছিটাইয়া দিত এবং ঐগুলির গোশত বেদীমূলে রাখিয়া দিত (তাফসীরে ইন্ন কাছীর, সংক্ষিপ্ত সং, ১খ, পৃ. ৪৮১; বৃহৎ সং, ২খ, পৃ. ৪৮৬)।
وَلَا تَأْكُلُوا مِمَّا لَمْ يُذكَرِ اسْمُ اللَّهُ عَلَيْهِ وَإِنَّهُ لَفَسْقٌ . "যাহাতে আল্লাহ্ নাম লওয়া হয় নাই তাহার কিছুই তোমরা আহার করিও না" (৬ঃ ১২১)। উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় আতা (র) বলেন, এখানে সেইসব জন্তুর গোশত ভক্ষণ করিতে নিষেধ করা হইয়াছে, যাহা কুরায়শ সম্প্রদায় তাহাদের দেব-দেবীর নামে যবেহ করিত (তাফসীরে ইন্ন কাছীর, উক্ত আয়াতাধীন; ফী জিলালিল কুরআন, ৩খ, পৃ. ১১৯৭)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বৈবাহিক জীবন ও সন্তান-সন্তুতি

📄 বৈবাহিক জীবন ও সন্তান-সন্তুতি


হযরত ইসমাঈল (আ) যৌবনে পদার্পণ করিয়া দাম্পত্য বন্ধনে আবদ্ধ হন। ইব্‌ন আব্বাস (রা)-র দীর্ঘ হাদীছে বলা হইয়াছে, ইসমাঈলও (ক্রমান্বয়ে) বড় হইলেন এবং জুরহুমীদের নিকট হইতে আরবী ভাষা শিখিলেন। যৌবনে পদার্পণ করিলে তিনি তাহাদের অধিক আগ্রহের পাত্র হইলেন এবং তাহাদের এক কন্যাকে বিবাহ করিলেন। অতঃপর ইসমাঈলের মাতা ইনতিকাল করেন। একদা ইবরাহীম (আ) তাঁহার পরিজনকে দেখিতে আসিয়া ইসমা'ঈল (আ)-কে বাড়িতে পাইলেন না। এদিকে তিনি তাঁহার পুত্রবধূর কথাবার্তা ও আচরণে সন্তুষ্ট হইতে না পারিয়া তাহার নিকট ইঙ্গিতে পুত্রকে জানাইয়া যান যে, তিনি যেন এই স্ত্রীকে বিদায় করিয়া দেন। পিতার নির্দেশমত তিনি প্রথম স্ত্রীকে ত্যাগ করিয়া একই গোত্রের আরেক কন্যাকে বিবাহ করেন। এক সময় ইবরাহীম (আ) পুনরায় পুত্রের সহিত সাক্ষাত করিতে আসিয়া শেষোক্ত পুত্রবধূর কথাবার্তা ও আচরণে সন্তুষ্ট হন এবং তাহার প্রতি যত্নবান হওয়ার জন্য পুত্রকে নির্দেশ দিয়া যান (বুখারী, আম্বিয়া, বাব ১১, নং ৩১১৫, ৩য় খণ্ড)। ইব্‌ন কাছীর লিখিয়াছেন যে, ইসমাঈল (আ) যৌবনে পদার্পণ করিয়া প্রথমে আমালিক গোত্রের উমারাহ নাম্নী এক কন্যাকে বিবাহ করেন এবং পরে পিতার নির্দেশে তাহাকে ত্যাগ করেন। সে ছিল সা'দ ইবন উসামা ইব্‌ন আকীল আল-আমালিকীর কন্যা। অতঃপর তিনি মাদাদ ইব্‌ন আমর আল-জুরহুমীর কন্যা সায়্যিদা (মতান্তরে ছালিছা)-কে বিবাহ করেন। ইবন সা'দ ও ইবনুল আছীরের মতে তাঁহার উভয় স্ত্রীই ছিল জরহুম গোত্রীয়। ইবন ইসহাকের মতে শেষোক্ত স্ত্রীর নাম রি'লা বিন্ত মাদাদ ইবন আমর এবং আল-কালবীর মতে রি'লা বিন্ত ইয়াশজাব ইব্‌ন ইয়া'রাব (তাবাকাত, ১খ, পৃ. ৫১)। তাঁহার গর্ভে ইসমাঈল (আ)-এর ১২ জন পুত্র জন্মগ্রহণ করেন (বিদায়া, ২খ, পৃ. ১৯২-৯৩; আরাইস, পৃ. ১০৭; আল-কামিল, ১খ, পৃ. ৯৫)। তাঁহাদের নাম : নবায়ত (স্নাবিত) কেদর (ক্বিযর) অদবেল (আযবিল) মিবসাম (মিশ্‌মী) মিশ্‌ম (মুসাম্মা) দুমা (দূমা) মসা (মাশ) হৃদদ (হাদার) তেমা (ত্বায়মা) ফিটুর (ত্বূর) নাফীশ (নাবশ) ও কেদমা (ক্বিযমা) (বাইবেলের আদিপুস্তক, ২৫: ১৪-১৫; ১ বংশাবলী, ১: ৩০-৩১; বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, পৃ. ১৯৩; ২খ, পৃ. ১৮৪; আরাইস, পৃ. ১০৭; আল-কামিল, ১খ, পৃ. ৯৫; তাবাকাতুল কুবরা, ১খ, পৃ. ৫১; কোন কোন নামের উচ্চারণে যৎকিঞ্চিৎ পার্থক্য আছে)।
নাসামা (নাসামা) নাম্নী তাঁহার এক কন্যা সন্তানও ছিল। মৃত্যুর সময় ইসমাঈল (আ) হযরত ইসহাক (আ)-কে ওসিয়ত করিয়া যান যে, তাঁহার পুত্র এষৌ-এর সহিত তাঁহার কন্যাকে (বাইবেলে নাম বাসমৎ, আদি, ৩৬ : ৩) যেন বিবাহ দেন। তাঁহার ওসিয়ত কার্যকর হয় (আদিপুস্তক, ৩৬ : ৩; আরাইস, পৃ. ১০৭; বিদায়া, ১খ, পৃ. ১৯৩; আরও দ্র. পৃ. ১৮৫; আনওয়ারে আম্বিয়া, পৃ. ৬৬)। এই কন্যার গর্ভে রূম, ইউনানা ও ইশবাস (মতান্তরে ফারিস) নামে তিন পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করে (বিদায়া, ১খ, পৃ. ১৯৩; আরও দ্র. ২খ, পৃ. ১৮৫)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 কা'বা শরীফ নির্মাণে ইসমাঈল (আ)-এর অংশগ্রহণ

📄 কা'বা শরীফ নির্মাণে ইসমাঈল (আ)-এর অংশগ্রহণ


হযরত ইবরাহীম (আ) তাঁহার জ্যেষ্ঠ পুত্র হযরত ইসমাঈল (আ)-কে সঙ্গে লইয়া আল্লাহ তা'আলার মহিমান্বিত ঘর কা'বা শরীফ স্থায়ীভাবে নির্মাণ করেন। তিনি সর্বপ্রথম কা'বা ঘর নির্মাণ করেন নাই, বরং পুনর্নির্মাণ করিয়াছেন, যাহা ১৪ : ৩৭ আয়াত হইতে পরিষ্কার বুঝা যায়। এই ঘরের সম্পূর্ণরূপে নূতন নির্মাণে হযরত ইসমাঈল (আ) পিতার সহযোগিতা করেন। কুরআন মজীদে তাহা এইভাবে উল্লেখ করা হইয়াছে :
وَعَهِدْنَا إِلى إِبْرَاهِيمَ وَاسْمَعِيلَ أَنْ طَهْرًا بَيْتِيَ لِلطَّائِفِينَ وَالْعُكَفِينَ وَالرُّكَّعِ السُّجُودِ . "এবং আমি ইবরাহীম ও ইসমাঈলকে আদেশ করিলাম যে, তোমরা দুইজনে আমার ঘরকে তাওয়াফকারী, ই'তিকাফকারী এবং রুকু ও সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখ” (২: ১২৫)।
وَإِذْ يَرْفَعُ ابْرَاهِيمُ الْقَوَاعِدَ مِنَ الْبَيْتِ وَاسْتَعِيلُ رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا إِنَّكَ أَنْتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ . "যখন ইবরাহীম ও ইসমাঈل কা'বা ঘরের প্রাচীর তুলিতেছিল তখন তাহারা বলিয়াছিল, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের এই কাজ কবুল কর, নিশ্চয় তুমি সর্বশ্রোতা সর্বজ্ঞাতা” (২ঃ ১২৭)।
তাফসীর ও ইতিহাসের বর্ণনা হইতে জানা যায় যে, হযরত ইসমাঈل (আ) কা'বা ঘর নির্মাণে প্রয়োজনীয় পাথর ও আনুষঙ্গিক দ্রব্যাদির যোগান দিতেন। কা'বা ঘর আগে নির্মিত হইয়াছে না কুরবানীর ঘটনা আগে ঘটিয়াছে তাহা নিশ্চিত করিয়া বলা যায় না। তবে কা'বা ঘর নির্মাণকালেও ইসমাঈল (আ) যে তরুণ যুবক ছিলেন তাহার ইঙ্গিত পাওয়া যায় কা'বা ঘর নির্মাণে তাঁহার সহযোগী ভূমিকা হইতে। ইবন সা'দ লিখিয়াছেন যে, হযরত ইবরাহীম (আ) এক শত বৎসর বয়সে কা'বা ঘর নির্মাণের নির্দেশ প্রাপ্ত হন এবং তখন ইসমাঈল (আ)-এর বয়স ত্রিশ বৎসর হইয়াছিল (আত-তাবাকাতুল-কুবরা, ১খ, পৃ. ৫২)। তবে কা'বা শরীফ নির্মাণকালে ইবরাহীম (আ.)-এর বয়স সংক্রান্ত এই বর্ণনাটি সন্দেহমুক্ত নহে। কা'বা ঘর নির্মাণ সংক্রান্ত বিস্তারিত বিবরণ হযরত ইবরাহীম (আ) শীর্ষক নিবন্ধে দ্র.।
নবুওয়াত প্রাপ্তি: হযরত ইসমাঈল (আ) আল্লাহ তা'আলার একজন মহান নবী ও রাসূল ছিলেন। তাঁহার দা'ওয়াতের কর্মক্ষেত্র ছিল হিজায, ইয়ামান, হাদারামাওতসহ সমগ্র আরব উপদ্বীপ। তিনি কত বৎসর বয়সে নবুওয়াতপ্রাপ্ত হন তাহা নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায় না। তাঁহার নবুওয়াত ও রিসালাতের সাক্ষ্য প্রদান করিয়া মহান আল্লাহ বলেন: وَاذْكُرْ فِي الْكِتَابِ اسْمُعِيلَ إِنَّهُ كَانَ صَادِقَ الْوَعْدِ وَكَانَ رَسُولًا نَّبِيًّا ، وَكَانَ يَأْمُرُ أَهْلَهُ بِالصَّلَوٰةِ والزكوة وكَانَ عِنْدَ رَبِّهِ مَرْضِيًّا "আর স্মরণ কর এই কিতাবে ইসমাঈলের কথা। সে ছিল প্রতিশ্রুতি পালনে সত্যাশ্রয়ী এবং সে ছিল রাসূল ও নবী। সে তাহার পরিবারবর্গকে সালাত ও যাকাত আদায়ের নির্দেশ দিত এবং সে ছিল তাহার প্রতিপালকের সন্তোষভাজন" (১৯:৫৪-৫৫)।
قُلْ أَمَنَّا بِاللَّهِ وَمَا أُنْزِلَ عَلَيْنَا وَمَا أُنْزِلَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَاسْمُعِيلَ وَإِسْحَقَ وَيَعْقُوبَ وَالْأَسْبَاطَ . "বল, আমরা আল্লাহতে এবং আমাদের প্রতি যাহা নাযিল হইয়াছে তাহাতে এবং ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকূব ও তাহার বংশধরগণের প্রতি যাহা নাযিল হইয়াছে তাহাতে ঈমান আনিয়াছি” (৩:৮৪)।
قُولُوا آمَنَّا بِاللَّهِ وَمَا أُنْزِلَ إِلَيْنَا وَمَا أُنْزِلَ إِلَى إِبْرَاهِيمَ وَاسْمُعِيلَ . "তোমরা বল, আমরা ঈমান আনিয়াছি আল্লাহতে এবং যাহা আমাদের উপর নাযিল হইয়াছে এবং যাহা ইবরাহীম ও ইসমাঈলের উপর নাযিল হইয়াছে....." (২: ১৩৬)।
إِنَّا أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ كَمَا أَوْحَيْنَا إِلَى نُوحٍ وَالنَّبِيِّنَ مِنْ بَعْدِهِ وَأَوْحَيْنَا إِلَى إِبْرَاهِيمَ وَاسْمُعِيلَ وَإِسْحَقَ وَيَعْقُوبَ . "আমি তোমার নিকট ওহী প্রেরণ করিয়াছি যেমন নূহ ও তাহার পরবর্তী নবীগণের নিকট ওহী প্রেরণ করিয়াছিলাম, ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকূব...... নিকট ওহী প্রেরণ করিয়াছিলাম" (৪: ১৬৩)।
অনুরূপভাবে ৬: ৭৪-৯০ আয়াত অবধি হযরত ইবরাহীম (আ) প্রসঙ্গে আলোচনার সূত্রপাত হইয়া ধারাবাহিকভাবে অন্যান্য নবীগণের প্রসঙ্গও উল্লিখিত হইয়াছে এবং সেখানে হযরত ইসমাঈল (আ)-ও অন্তর্ভুক্ত আছেন। অতএব তাঁহার নবুওয়াতপ্রাপ্তিও সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হইয়াছে। পিতা-পুত্র কর্তৃক নির্মিত তাওহীদবাদী মানবজাতির কিবলা ও পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম ঘর কা'বা শরীফকে কেন্দ্র বানাইয়া হযরত ইসমা'ঈল (আ) গোটা আরবভূমিতে দীন ইসলামের দাওয়াত সম্প্রসারিত করেন (আরাইস, পৃ. ১০৭; বিদায়া, ২খ, পৃ. ১৯৩)। বুখারীর কিতাবুল আম্বিয়ায় সন্নিবিষ্ট ৩১১৪ নম্বর হাদীছ হইতে জ্ঞাত হওয়া যায় যে, হযরত ইবরাহীম (আ) ইসমাঈল (আ) ও তাঁহার মাতাকে দেখিবার জন্য দুইবার মক্কায় আসিয়াছিলেন এবং পুত্রকে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দান করিয়া যান। হযরত ইসমাঈল (আ) তাঁহার মায়ের ভাষা কিবতী (কপটিক) এবং পিতার ভাষা হিব্রুও জানিতেন এবং আরবে আসিয়া আল্লাহর অনুগ্রহে আরবী ভাষাও শিক্ষা করেন। ফলে ঐ তিন ভাষাভাষী জাতির মধ্যে আল্লাহ্ দীন প্রচার তাঁহার জন্য সহজসাধ্য হয়, অন্তত ভাষাগত দিকের বিবেচনায় (আনওয়ারে আম্বিয়া, পৃ. ৬৫)। তাঁহার তত্ত্বাবধানে বাৎসরিক হজ্জের অনুষ্ঠানও উদযাপিত হইতে থাকে। এখানে উল্লেখ্য যে, পিতা-পুত্র-ভ্রাতুষ্পুত্র সকলের ধর্মীয় নীতিমালা ছিল একই এবং বলা যায়, ইবরাহীম (আ) ছিলেন তিনজন নবীর ইমাম। সেই কালেও হজ্জ করা ফরয ছিল। যেমন কুরআন মজীদ হইতে জানা যায় যে, আল্লাহ তা'আলা হযরত ইবরাহীম (আ)-কে নির্দেশ প্রদান করিয়া বলেন: وَأَذِّنْ فِي النَّاسِ بِالْحَجِّ يَأْتُوكَ رِجَالًا وَعَلَى كُلِّ ضَامِرٍ يَأْتِينَ مِنْ كُلِّ فَجٍّ عَمِيقٍ. "এবং তুমি মানুষের মধ্যে হজ্জের ঘোষণা করিয়া দাও, তাহারা তোমার নিকট আসিবে পদব্রজে ও সর্বপ্রকার ক্ষীণকায় উষ্ট্রের পিঠে, তাহারা আসিবে দূর-দূরান্তের পথ অতিক্রম করিয়া" (২২: ২৭)।
কিন্তু ইয়াহুদীরা হযরত ইসমাঈল (আ) ও তাঁহার মাতার প্রতি অনর্থক বিদ্বেষভাবাপন্ন হইয়া বাইবেল হইতে কা'বা ঘরের নির্মাণ, হজ্জের মহাসমাবেশ ও কুরবানীর উৎসবকে সম্পূর্ণরূপে গায়েব করিয়া দিয়াছে। শুধু তাহাই নহে, তাহারা নিজদিগকে ইবরাহীম (আ)-এর বংশধর ও তাঁহার আদর্শের উত্তরাধিকারী বলিয়া দাবি করিলেও তাহারা এই নবীগণের নিকট অবতীর্ণ সহীফাসমূহ অবলুপ্তির হাত হইতে রক্ষা করিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হইয়াছে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হযরত ইসমাঈল (আ)-এর ইনতিকাল

📄 হযরত ইসমাঈল (আ)-এর ইনতিকাল


হযরত ইসমাঈল (আ)-এর ইনতিকাল
বাইবেলের বর্ণনামতে হযরত ইসমা'ঈল (আ) ১৩৭ বৎসর বয়সে ইনতিকাল করেন (আদিপুস্তক, ২৫: ১৭)। মুসলিম ঐতিহাসিকগণও উক্ত তারিখ উদ্ধৃত করিয়াছেন (বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ, পৃ. ১৯৩; তাবারী, তারীখুল উমাম, ১খ, পৃ. ১৬২-এর বরাতে আওয়ারে আম্বিয়া, পৃ. ৬৬; আল-কামিল, ১খ, পৃ. ১৯৫; আরাইস, পৃ. ১০৭)। ইনতিকালের সময় তিনি ভ্রাতুষ্পুত্র ইসূর সহিত নিজ কন্যার বিবাহের ওসিয়ত করিয়া যান এবং তাহা প্রতিপালিত হয় (আরাইস, পৃ. ১০৯; আল-কামিল, ১খ, পৃ. ৯৫; বিদায়া, ১খ, পৃ. ১৯৩)। মুসলিম ঐতিহাসিকগণের মতে ইসমাঈল (আ) মক্কা শরীফেই ইনতিকাল করেন এবং তাঁহাকে তাঁহার মাতার কবরের পাশে রুকন ও কা'বার মাঝখানে হিজরে মীযাবের নিচে দাফন করা হয় (আত-তাবাকাতুল কুবরা, ১খ, পৃ. ৫২; আল-কামিল, ১খ, পৃ. ৯৫; বিদায়া, ১খ, পৃ. ১৯৩; আরাইস, পৃ. ১০৭; তারীখ তাবারী, ১খ-এর বরাতে কাসাসুল কুরআন, ১খ, পৃ. ২৪৭)। আল্লামা হিফজুর রহমান লিখিয়াছেন, তাওরাতে ইঙ্গিত রহিয়াছে যে, হযরত ইসমাঈল (আ)-এর কবর ফিলিস্তীনেই অবস্থিত এবং তিনি এখানেই ইনতিকাল করেন (কাসাসুল কুরআন, ১খ, পৃ. ২৪৭)। তিনি সম্ভবত নাজ্জারের কাসাসুল আম্বিয়ার বক্তব্য উদ্ধৃত করিয়াছেন। কারণ উহাতে এইরূপ একটি বক্তব্য বিদ্যমান (পৃ. ১০১)। কিন্তু বাইবেলের আদিপুস্তকের ২৫শ অধ্যায়সহ উক্ত পুস্তকের কোথায়ও অনুরূপ স্পষ্ট ইঙ্গিত নাই (নিবন্ধকার)।
উমার ইব্‌ন আবদুল আযীয (র)-এর সূত্রে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন, ইসমাঈল (আ) আল্লাহ্র নিকট মক্কাভূমির উষ্ণ আবহাওয়ার অভিযোগ করিলে তাঁহার মহান প্রতিপালক ওহী মারফত বলেন, তোমাকে যেখানে দাফন করা হইবে, আমি সেখান হইতে তোমার জন্য জান্নাতের দিকে একটি দরজা খুলিয়া দিব এবং কিয়ামত পর্যন্ত তোমার আত্মার প্রতি উহার শান্তিধারা প্রবাহিত হইতে থাকিবে (বিদায়া, ১খ, পৃ. ১৯৩; আরাইস, পৃ. ১০৭)। ইবন সা'দ বলেন, তিনজন নবীর কবরের স্থান সম্পর্কেই জানা যায়: ইসমাঈল (আ)-এর কবর কা'বার চত্বরে, হূদ (আ)-এর কবর ইয়ামানের কোন এক পর্বতোপরি, যেখানে মাটি সিক্ত করার উপযোগী একটি বৃক্ষ আছে, যে স্থানের উষ্ণতা পৃথিবীর মধ্যে সর্বাধিক এবং মহানবী (স)-এর রওযা মুবারক (তাবাকাত, ১খ, পৃ. ৫২)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00