📄 যমযম কূপের বিশেষত্ব
আল্লাহ তা'আলার নির্দেশে এবং শিশু নবী হযরত ইসমাঈল (আ) ও তাঁহার পুণ্যময়ী মাতা হাজার (রা)-এর প্রতি তাঁহার অসীম অনুগ্রহস্বরূপ সর্বাধিক সম্মানিত ফেরেশতা হযরত জিবরাঈل (আ) এই কূপ প্রবাহিত করেন। একজন নবী ও তাঁহার পুণ্যবতী মাতা সর্বপ্রথম এই কূপের পানি পান করায় ইতিহাসে ইহার মর্যাদা বৃদ্ধি পাইয়াছে (তারীখুল কাবীম, ৩খ, পৃ. ৬৭)। কথিত আছে যে, এই পানি পান করার সঙ্গে সঙ্গে হযরত হাজার (রা)-এর স্তনদ্বয় তাঁহার সন্তানের জন্য দুগ্ধে পূর্ণ হইয়া যায় (তারীখুল কাবীম, ৩খ, পৃ. ৫৯)। এই কূপের বরকতেই ধূসর মরুতে মানববসতি গড়িয়া উঠে। হযরত আলী (রা) বলেন, পৃথিবীর বুকে সর্বোত্তম কূপ হইল যমযম (তারীখুল কাবীম, ৩খ, পৃ. ৬৭)।
এই কূপটি কা'বা ঘরের পাদদেশ এবং আল্লাহ্র দুই নিদর্শন সাফা-মারওয়া পর্বতদ্বয়ের সহিত সংযুক্ত। হাজারুল আসওয়াদমুখী নালাটি জান্নাত হইতে প্রবাহিত হওয়ায় জান্নাতের কূপের সঙ্গে এই কূপের যোগসূত্র স্থাপিত হইয়াছে এবং স্বয়ং কূপটিও আল্লাহ্ এক নিদর্শন।
সুদূর অতীত হইতে আম্বিয়ায়ে কিরাম, আল্লাহর অনুগ্রহপ্রাপ্ত মহান বান্দাগণ, সিদ্দীকীন, সালিহীন প্রমুখ এই কূপের পানি পান করিয়াছেন এবং এখনও পান করা হইতেছে। ইব্ন আব্বাস (রা)-এর মতে সত্তরজন এবং মুজাহিদ (র)-এর মত পঁচাত্তরজন নবী-রাসূল (আ) কা'বা ঘরের চত্বরে আসেন এবং হযরত মূসা (আ) ও তাঁহাদের অন্তর্ভুক্ত। এই উপলক্ষে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নবী উক্ত কূপের পানি পান করিয়া ইহার মর্যাদা বর্ধিত করিয়া থাকিবেন (তা'রীখুল কাবীম, ৩খ, পৃ. ১১৫)।
মহানবী (সা)-এর যতবার শাক্কু'স-সদর (বক্ষস্থল বিদীর্ণকরণ) হইয়াছে ততবার তাঁহার কলব এই কূপের পানি দ্বারা ধৌত করা হইয়াছে। তিনি এই কূপের পানি পান করিয়াছেন এবং অন্যদেরকে তাহা পান করিতে উৎসাহিত করিয়াছেন (বিস্তারিত দ্র. তা'রীখুল কাবীম, ৩খ, পৃ. ৬৬-৭১)।
এই বরকতময় কূপ আল্লাহ্র রহমতে কিয়ামত পর্যন্ত অটুক থাকিবে। দাহ্হাক (র) বলেন, কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার পূর্বে ইহার পানির উৎস বন্ধ হইয়া যাইবে এবং এইভাবে কূপটি বিলীন হইয়া যাইবে (অযরাকীর তারীখ মাক্কা-এর বরাতে তারীখুল কাবীম, ৩খ, পৃ.৭৫)।
যমযম কূপ সম্পর্কিত হুকুম ও ইহার পানির বহুমুখী ব্যবহার
এই কূপের চত্বর মসজিদের অন্তর্ভুক্ত বিধায় এখানে সালাত আদায় করা, ই'তিকাফ করা ইত্যাদি জাইয। এখানে নাপাক অবস্থায় প্রবেশ করা বা বসা, থুথু বা আবর্জনা ইত্যাদি নিক্ষেপ করা নিষিদ্ধ। ইহা হানাফী মাযহাবের অভিমত এবং অন্যান্য মাযহাবের অধিকাংশ আলিমের অভিমতও ইহাই। আবদুল মুত্তালিব যখন কূপ খনন শুরু করেন তখন কুরায়শরা তাহাকে বলিল, আমরা আপনাকে মূর্খ মনে করি না, কিন্তু আপনি আমাদের মসজিদে খননকার্য করিয়া কেন তাহা নষ্ট করিতেছেন? এই কথার দ্বারা পূর্বোক্ত মতের সমর্থন পাওয়া যায় (বিস্তারিত দ্র. তারীখুল কাবীম, ৩খ, পৃ. ১০১-১০৫)।
অনুরূপভাবে যমযমের পানিও যাবতীয় প্রয়োজনে ব্যবহার করার ব্যাপারে বিধিনিষেধ আছে।
টিকাঃ
১. আল ফাসী বলেন, চারি মাযহাবের সর্বসম্মত রায় অনুযায়ী যমযম কূপের পানি অন্য স্থানে বা দেশান্তরে লইয়া যাওয়া বৈধ, বরং শাফিঈ ও মালিকী মাযহাবমতে উহা মুস্তাহাব।
📄 যমযম কূপ সম্পর্কিত হুকুম ও ইহার পানির বহুমুখী ব্যবহার
যমযম কূপ সম্পর্কিত হুকুম ও ইহার পানির বহুমুখী ব্যবহার
এই কূপের চত্বর মসজিদের অন্তর্ভুক্ত বিধায় এখানে সালাত আদায় করা, ই'তিকাফ করা ইত্যাদি জাইয। এখানে নাপাক অবস্থায় প্রবেশ করা বা বসা, থুথু বা আবর্জনা ইত্যাদি নিক্ষেপ করা নিষিদ্ধ। ইহা হানাফী মাযহাবের অভিমত এবং অন্যান্য মাযহাবের অধিকাংশ আলিমের অভিমতও ইহাই। আবদুল মুত্তালিব যখন কূপ খনন শুরু করেন তখন কুরায়শরা তাহাকে বলিল, আমরা আপনাকে মূর্খ মনে করি না, কিন্তু আপনি আমাদের মসজিদে খননকার্য করিয়া কেন তাহা নষ্ট করিতেছেন? এই কথার দ্বারা পূর্বোক্ত মতের সমর্থন পাওয়া যায় (বিস্তারিত দ্র. তারীখুল কাবীম, ৩খ, পৃ. ১০১-১০৫)।
অনুরূপভাবে যমযমের পানিও যাবতীয় প্রয়োজনে ব্যবহার করার ব্যাপারে বিধিনিষেধ আছে।
টিকাঃ
১. আল ফাসী বলেন, চারি মাযহাবের সর্বসম্মত রায় অনুযায়ী যমযম কূপের পানি অন্য স্থানে বা দেশান্তরে লইয়া যাওয়া বৈধ, বরং শাফিঈ ও মালিকী মাযহাবমতে উহা মুস্তাহাব।
📄 ইসমাঈল (আ)-কে কুরবানীর নির্দেশ
আল্লাহ তা'আলা হযরত ইবরাহীম (আ)-এর যে কয়টি কঠিন পরীক্ষা গ্রহণ করেন, একমাত্র পুত্র ইসমাঈল (আ)-কে কুরবানীর নির্দেশ সম্বলিত পরীক্ষা তার অন্যতম। নবী-রাসূলগণ নিজ নিজ মর্যাদা ও স্থান অনুযায়ী পরীক্ষার সম্মুখীন হইয়া থাকেন (কাসাসুল কুরআন, ১খ, পৃ. ২৩৫)। তিনি স্বপ্নযোগে নিজ পুত্রকে কুরবানী করার নির্দেশ প্রাপ্ত হন এবং "নবী-রাসূলগণের স্বপ্ন জাগ্রত অবস্থায় প্রাপ্ত ওহীর সমতুল্য” (তাফসীরে ইব্ন কাছীর, ৩খ, পৃ. ১৮৬; তাফসীরে রূহুল মা'আনী, ২৩খ, পৃ. ১২৮ ইত্যাদি)। তিনি পরপর তিন রাত্র স্বপ্ন দর্শন করেন যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে তাঁহার একমাত্র পুত্রকে কুরবানী করার নির্দেশ দিতেছেন (মাআরিফুল কোরআন, বাংলা, অনু. ৭খ, পৃ. ১৪৫; কাসাসুল কুরআন, ১খ, পৃ. ২৩৬)। কতক মুফাসসিরের মতে ইবরাহীম (আ) সরাসরি নিজ পুত্রকে কুরবানী করিতেছেন এইরূপ স্বপ্ন দেখিয়াছিলেন (নাজ্জার, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ১০১)। হযরত ইবরাহীম (আ) সর্বপ্রথম যিলহজ্জ মাসের সাত তারিখ দিবাগত আট তারিখের রাত্রে এই স্বপ্ন দর্শন করেন। সারাটি দিন তাঁহার উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও দুশ্চিন্তার মধ্যে অতিবাহিত হয় যে, স্বপ্নটি কি আল্লাহর পক্ষ হইতে না ইহা শয়তানের চক্রান্ত? তাই এই দিনটি ইয়াওমুত তারবিয়াহ (উৎকণ্ঠার দিন) নামে অভিহিত হয়। আট তারিখ দিবাগত রাত্রে তিনি পুনরায় একই স্বপ্ন দর্শন করেন এবং অনুধাবন করেন যে, ইহা আল্লাহ্র একটি নির্দেশ। তাই এই দিনটির নামকরণ করা হয় ইয়াওমুন নাহ্ বা কুরবানীর দিন (তাফসীরে কবীর, ২৬খ, পৃ. ১৫৩; তাফসীরে রূহুল মা'আনী, ২৩খ, পৃ. ১২৮; কুরতুবীর আহকামুল কুরআনের বরাতে মাআরিফুল কোরআন, বাংলা অনু, ৭খ, পৃ. ৪৪৫; কাসাসুল কুরআন, ১খ পৃ. ২৩৬)। স্বপ্নের ভিন্নতর ব্যাখ্যা করার অবকাশ থাকা সত্ত্বেও হযরত ইবরাহীম (আ) আল্লাহর নির্দেশের সামনে মাথা নত করিয়া দেন (তাফসীরে কবীরের বরাতে মাআরিফুল কোরআন, ৭খ, পৃ. ৪৪৫)।
📄 কুরবানী করা হইয়াছিল ইসমাঈলকে, ইসহাককে নয়
কুরবানী করা হইয়াছিল ইসমাঈলকে, ইসহাককে নয়
কুরআন মজীদে কুরবানীর যে ঘটনা বিবৃত হইয়াছে তাহাতে নামোল্লেখ করিয়া বলা হয় নাই যে, হযরত ইবরাহীম (আ) তাঁহার পুত্রদ্বয়ের মধ্যে ইসমাঈল (আ)-কে কুরবানী করিয়াছেন, না ইসহাক (আ)-কে। এই বিষয়ে হাদীছের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থাবলীতেও সহীহ সনদসূত্রে রাসূলুল্লাহ (স)-এর কোন বক্তব্যও বিদ্যমান নাই। ইয়াহুদী-খৃস্টান সম্প্রদায় দাবি করে যে, হযরত ইসহাক (আ)-কে কুরবানী করা হইয়াছিল, ইসমাঈল (আ)-কে নয়। এই বিষয়ে বাইবেলের বক্তব্য নিম্নরূপঃ "এই সকল ঘটনার পরে সদাপ্রভু ইবরাহীমের পরীক্ষা করিলেন। তিনি তাঁহাকে বলিলেন, হে ইবরাহীম! তুমি আপন পুত্রকে, তোমার অদ্বিতীয় পুত্রকে, যাহাকে তুমি ভালোবাস, সেই ইসহাককে লইয়া মোরিয়া দেশে যাও এবং তথাকার যে এক পর্বতের কথা আমি তোমাকে বলিব, তাহার উপর তাহাকে হোমার্থে যবেহ কর। পরে ইবরাহীম প্রত্যুষে উঠিয়া গর্দভ সাজাইয়া দুইজন দাস ও আপন পুত্র ইসহাককে সঙ্গে লইলেন, হোমের নিমিত্ত কাষ্ঠ কাটিলেন, আর উঠিয়া সদাপ্রভুর নির্দিষ্ট স্থানের দিকে গমন করিলেন। তৃতীয় দিবসে ইবরাহীম চক্ষু তুলিয়া দূর হইতে সেই স্থান দেখিলেন। তখন ইবরাহীম আপন দাসদিগকে কহিলেন, তোমরা এই স্থানে গর্দভের সহিত থাক; আমি ও যুবক আমরা ঐ স্থানে গিয়া প্রণিপাত করি, পরে তোমাদের কাছে ফিরিয়া আসিব। তখন ইবরাহীম হোমের কাষ্ঠ লইয়া আপন পুত্র ইসহাকের স্কন্ধে দিলেন এবং নিজ হস্তে অগ্নি ও খড়গ লইলেন; পরে উভয়ে একত্রে চলিয়া গেলেন। আর ইসহাক আপন পিতা ইবরাহীমকে বলিলেন, হে আমার পিতা! তিনি কহিলেন, হে বৎস! দেখ, এই আমি। তখন তিনি বলিলেন, এই দেখুন অগ্নি ও কাষ্ঠ, কিন্তু হোমের নিমত্ত মেষশাবক কোথায়? ইবরাহীম কহিলেন, বৎস! সদাপ্রভু আপনি হোমের জন্য মেষশাবক যোগাইবেন। পরে উভয়ে একসঙ্গে চলিয়া গেলেন। সদাপ্রভুর নির্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত হইলে ইবরাহীম সেখানে যবেহ করার মঞ্চ নির্মাণ করিয়া কাষ্ঠ সাজাইলেন, পরে আপন পুত্র ইসহাককে বাঁধিয়া মঞ্চে কাষ্ঠের উপর রাখিলেন। অতঃপর ইবরাহীম হস্ত বিস্তার করিয়া আপন পুত্রকে যবেহ করিতে খড়গ গ্রহণ করিলেন। এমন সময় আকাশ হইতে সদাপ্রভুর দূত তাঁহাকে ডাকিলেন এবং বলিলেন, ইবরাহীম! তিনি বলিলেন, দেখুন এই আমি। তখন তিনি বলিলেন, যুবকের প্রতি তোমার হস্ত বিস্তার করিও না, তুমি সদাপ্রভুকে ভয় কর, আমাকে আপনার অদ্বিতীয় পুত্র দিতেও অসম্মত নও। তখন ইবরাহীম চক্ষু তুলিয়া চাহিলেন, আর দেখ, তাঁহার পশ্চাৎ দিকে একটি মেষ, তাহার শিং ঝোপে বদ্ধ। পরে ইবরাহীম গিয়া সেই মেষটি লইয়া আপন পুত্রের পরিবর্তে হোমার্থে যবেহ করিলেন।..... পরে সদাপ্রভু কহিলেন..... আমি অবশ্যই তোমাকে আশীর্বাদ করিব এবং আকাশের তারকারাজি ও সমুদ্র তীরস্থ বালুকার ন্যায় তোমার অতিশয় বংশ বৃদ্ধি করিব..." (বাইবেলের যাত্রাপুস্তক, ২২: ১-১৯)। যবীহুল্লাহ সম্পর্কে বাইবেলের বর্ণনায় স্ববিরোধিতা রহিয়াছে। কুরআন মজীদে এই ঘটনার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা নিম্নরূপ:
আল্লাহ তা'আলা পিতার ছুরি ও পুত্রের কণ্ঠনালীর মাঝখানে একটি তাম্রপাত রাখিয়া দিয়াছিলেন। ফলে ছুরি কণ্ঠনালী স্পর্শ করিতে পারে নাই (আরাইস, পৃ. ১০০)। মহান আল্লাহ বলেন: "আমি এইভাবেই সৎকর্মপরায়ণদেরকে পুরস্কৃত করিয়া থাকি"। হে ইবরাহীম! এই তোমার পুত্রের পরিবর্তে তোমার যবেহ করার প্রাণী। ইহাকে তুমি যবেহ কর। ইবরাহীম (আ) দৃষ্টি ফিরাইয়া একটি হৃষ্টপুষ্ট দুম্বাসহ হযরত জিবরাঈল (আ)-কে উপস্থিত দেখিতে পান। ইন্ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত যে, ইহা ছিল জান্নাতের একটি দুম্বা যাহা চল্লিশ বৎসর ধরিয়া জান্নাতে বিচরণ করিয়াছে। অপর বর্ণনায় আছে, ইবন আব্বাস (রা) বলেন যে, ইবরাহীম (আ) যে দুম্বা যবেহ করেন তাহা ছিল আদম (আ)-এর পুত্র হাবীল কর্তৃক কুরবানীকৃত দুম্বা, যাহা আল্লাহ কবুল করিয়াছিলেন (তাফসীরে কবীর, ২৬খ, পৃ. ১৫৮; তাফসীরে রুহুল মাআনী, ২৩ খ, পৃ. ১৩২)।
ইবরাহীম (আ) পুত্রকে ছাড়িয়া দিলেন এবং দুম্বাটি মিনার কুরবানীর স্থানে যবেহ করিলেন (আরাইস, পৃ. ১০০; মাআরেফুল কোরআন, ৭খ, পৃ. ৪৪৯)। তখন হইতে কিয়ামতকাল পর্যন্ত তৌহীদবাদী মানবজাতির জন্য প্রতি বৎসর দশ যুলহিজ্জা পশু কুরবানী করার ঐতিহ্য চালু হইয়াছে। এইভাবে অবিস্মরণীয় করিয়া রাখা হইয়াছে পিতা-পুত্রের এক কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার দৃষ্টান্তকে। "নিশ্চয় ইহা ছিল এক স্পষ্ট পরীক্ষা। আমি তাহাকে মুক্ত করিলাম এক কুরবানীর বিনিময়ে। আমি ইহা পরবর্তীদের জন্য স্মরণে রাখিয়াছি” (৩৭: ১০৬-৭)।
এখানে একটি প্রশ্ন জাগিতে পারে যে, হযরত ইবরাহীম (আ) তো পুত্রকে কুরবানী করার স্বপ্ন দেখিয়াছেন, অথচ তিনি তাহাকে কুরবানী করেন নাই। তাহা হইলে নবীর স্বপ্ন সত্য হইল কিভাবে? বস্তুত ইবরাহীম (আ) স্বপ্নে পুত্রকে যবেহ করিতে দেখিয়াছেন, যবেহ করিয়া তাহাকে শেষ করিয়া ফেলিয়াছেন তাহা দেখেন নাই। অতএব তিনি তাঁহার স্বপ্ন বাস্তবায়িত করিয়াছেন অর্থাৎ স্বপ্নে যবেহ করিতে দেখিয়াছিলেন এবং বাস্তবেও তিনি ছুরি হাতে লইয়া পুত্রের গলায় তাহা সজোরে চালাইয়াছেন কিন্তু যেহেতু তিনি যবেহকর্ম সমাপ্ত করিয়াছেন এইরূপ স্বপ্ন দেখেন নাই, তাই বাস্তবেও যবেহ সমাপ্ত করিতে পারেন নাই। আল্লাহ তাঁহাকে যতদূর স্বপ্ন দেখাইয়াছেন, তিনি ততটাই বাস্তবায়িত করিয়াছেন (তাফসীরে কবীর, ২৬খ, পৃ. ১৫৫; তাফহীমুল কুরআন, ৩৭: ১০২ ও ১০৫ আয়াত সংশ্লিষ্ট ৫৮ ও ৬৩ নং টীকা)।
ইয়াহুদী-খৃস্টানগণ হযরত ইসমাঈল (আ)-এর প্রতি বিদ্বেষবশত এই কুরবানীর ঐতিহ্যকে ত্যাগ করিয়াছে। আরবদের মধ্যে ইহা চালু থাকিলেও কালক্রমে তাওহীদের বিশ্বাস হইতে তাহাদের বিচ্যুতির সঙ্গে সঙ্গে এই প্রথাও বিকৃত হইয়া যায়। তাহারা আল্লাহ্ উদ্দেশ্যে কুরবানী করার পরিবর্তে তাহাদের মনগড়া দেব-দেবীর নামে পশু উৎসর্গ করিত। যেমন কুরআন মজীদে উক্ত হইয়াছে: وَمَا ذُبِحَ عَلَى النُّصُبِ . “এবং যাহা মূর্তিপূজার বেদীর উপর বলি দেওয়া হয় (তাহাও তোমাদের জন্য হারাম)" (৫ঃ৩)। জাহিলী যুগে আরব মুশরিকরা কা'বা ঘরে স্থাপিত মূর্তির নামে পশু যবেহ করিত এবং উহার রক্ত সেগুলির দেহে মর্দন করিত। অন্যান্য স্থানেও তাহারা অনুরূপ কুরবানগাহ স্থাপন করিয়াছিল (ফী জিলালিল কুরআন, ২খ, পৃ. ৮৪০)। ইন্ন কাছীর (র) বলেন, অর্থাৎ মূর্তিপূজার বেদীতে যাহা যবেহ করা হয়। মুজাহিদ ও ইব্ন জুরায়জ বলেন, কা'বা গৃহের পার্শ্বে অবস্থিত একটি পাথরকে 'নুসুব' বলা হয়। ইব্ن জুরায়জ আরও বলেন, জাহিলী যুগে সেখানে ৩৬০টি পূজার বেদী ছিল। সেইগুলির উপর তাহারা পশু বলি দিত এবং তাহারা কাবাগৃহের নিকটবর্তী বেদীগুলিতে বলিকৃত পশুর রক্ত কাবাগৃহে ছিটাইয়া দিত এবং ঐগুলির গোশত বেদীমূলে রাখিয়া দিত (তাফসীরে ইন্ন কাছীর, সংক্ষিপ্ত সং, ১খ, পৃ. ৪৮১; বৃহৎ সং, ২খ, পৃ. ৪৮৬)।
وَلَا تَأْكُلُوا مِمَّا لَمْ يُذكَرِ اسْمُ اللَّهُ عَلَيْهِ وَإِنَّهُ لَفَسْقٌ . "যাহাতে আল্লাহ্ নাম লওয়া হয় নাই তাহার কিছুই তোমরা আহার করিও না" (৬ঃ ১২১)। উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় আতা (র) বলেন, এখানে সেইসব জন্তুর গোশত ভক্ষণ করিতে নিষেধ করা হইয়াছে, যাহা কুরায়শ সম্প্রদায় তাহাদের দেব-দেবীর নামে যবেহ করিত (তাফসীরে ইন্ন কাছীর, উক্ত আয়াতাধীন; ফী জিলালিল কুরআন, ৩খ, পৃ. ১১৯৭)।