📄 যমযম কূপের পূর্বকথা
ইব্ن আব্বাস (রা) কর্তৃক বর্ণিত দীর্ঘ হাদীছে বলা হইয়াছে যে, ইবরাহীম (আ) স্ত্রী ও পুত্রের জন্য যে যৎসামান্য পানি রাখিয়া গিয়াছিলেন তাহা ফুরাইয়া যাওয়ার পর হযরত হাজার (রা) পানি সংগ্রহের আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও তাহার কোন ব্যবস্থা করিতে না পারিয়া নিরাশ হইয়া পড়িলেন। তিনি সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে ছুটাছুটির সময়ে মারওয়া পাহাড়ে উঠার পর একটি অদৃশ্য আহবান শুনিতে পান এবং বর্তমানে যেখানে যমযম কূপ অবস্থিত সেখানে একজন ফেরেশতাকে দেখিতে পান। ফেরেশতার পদাঘাতে বা ডানার আঘাতে মাটির অভ্যন্তর হইতে পানির উৎস নির্গত হইল। হযরত হাজার (রা) ইহার চারিপাশে আইل বাঁধিয়া উহাকে কূপের রূপ দান করিলেন (বুখারী, বাংলা অনু., ৩খ, পৃ. ৩৫৭-৮, নং ৩১১4)। এই কূপই "যমযম কূপ” নামে ইতিহাস খ্যাত। ইহাই যমযম কূপের আদি উৎস। যমযম শব্দের আভিধানিক অর্থ নির্ণয়ে মতভেদ আছে। ইবন হিশামের মতে আরবদের নিকট زمزمة শব্দের অর্থ প্রাচুর্য, সঞ্চিত হইয়া জমা হওয়া। যেহেতু সূচনা হইতেই ইহাতে পানির প্রাচুর্য লক্ষ্য করা গিয়াছে এবং ব্যবহারের ফলে পানি হ্রাস প্রাপ্ত না হইয়া সঙ্গে সঙ্গে পরিপূর্ণ হইয়া গিয়াছে, তাই ইহার এই নামকরণ। ভিন্ন মতে শব্দটির অর্থ গর্জন, নাদ, শব্দধ্বনি; হযরত হাজার (রা) অদৃশ্য শব্দধ্বনি শ্রবণ করিয়া কূপের সন্ধান লাভ করিয়াছিলেন। ভিন্নমতে যমযম শব্দ হইতে উক্ত নামকরণ হইয়াছে। শব্দটির অর্থ অবরুদ্ধ হওয়া, শক্ত করিয়া বাঁধা। হাজার (রা) কূপের চারিদিকে বাঁধ নির্মাণ করিয়া পানি অবরুদ্ধ করিয়াছেন। বাঁধ দিয়া আটক করা না হইলে কূপের পানি মাটির উপর দিয়া গড়াইয়া যাইত। ইব্ন আব্বাস (রা)-এর এই মত। হারাবীর মতে زَمْزَمَةُ الْمَاءِ শব্দের অর্থ 'পানির শব্দ' এবং এজন্য কূপটির উক্ত নামকরণ। ইয়া'কূব আল-হামাবী লিখিয়াছেন যে, পানির প্রাচুর্যের কারণেই কূপটির 'যমযম' নামকরণ করা হইয়াছে। মুহাম্মাদ ইব্ন ইসহাক আল-ফাকিহী তাঁহার "আখবার মাক্কাতা ফী কাদীমি'د-দাহহি ওয়া হাদীছিহি” গ্রন্থে যমযম কূপের চৌত্রিশটি অর্থবোধক নাম উল্লেখ করিয়াছেন (মক্কা শরীফের ইতিকথা, পৃ. ৫৮-৬১; তারীখু'ل-কাবীم, ৩খ, পৃ. ৯৫; মু'জামুল-বুলدان, ৩খ, পৃ. ১৪৭-৮)।
যেহেতু কা'বা শরীফ হযরত আদম (আ)-এর যুগ হইতেই বর্তমান স্থানে বিদ্যমান ছিল, হয়ত কালের প্রবাহে কখনও কখনও গৃহকাঠামো অবলুপ্ত হইয়াছে, তাই নিশ্চয়ই তখন হইতেই এখানে পানির ব্যবস্থাও বিদ্যমান থাকার কথা। আল্লাহর ইবাদতে লিপ্ত হওয়ার উদ্দেশে পানি হইল পবিত্রতা অর্জনের অন্যতম উপাদান। তাই এই মহাসম্মানিত গৃহের সংলগ্ন পানি ব্যবস্থাও নিশ্চয়ই ছিল।
সকল ঐতিহাসিকের জন্য ইব্ن আব্বাস (রা)-র হাদীছই যমযমের আদি ইতিহাসের উৎস। আল্লাহ তা'আলা হযরত ইবরাহীম ও ইসমাঈল (আ)-এর দু'আ (দ্র. ২: ১২৬-২৯ এবং ১৪: ৩৫-৮) এবং স্বামী-স্ত্রী ও পুত্রের আল্লাহ্ জন্য নিবেদিতপ্রাণ হওয়ার উসীলায় এমন বরকত দান করিলেন যে, এই যমযম কূপকে কেন্দ্র করিয়া স্বল্প কালের মধ্যে মক্কার বিজন প্রান্তর মানুষের কোলাহলে মুখরিত হইয়া উঠিল। প্রাথমিক পর্যায়ে আরবের একটি আদি গোত্র 'জুরহুম' হযরত হাজার (রা)-এর অনুমতিপ্রাপ্ত হইয়া এখানে বসতি স্থাপন করে এবং হযরত ইসমাঈل (আ) যৌবনে পদার্পণ করিয়া এই গোত্রে বিবাহ করেন।
📄 যমযম কূপের বিশেষত্ব
আল্লাহ তা'আলার নির্দেশে এবং শিশু নবী হযরত ইসমাঈল (আ) ও তাঁহার পুণ্যময়ী মাতা হাজার (রা)-এর প্রতি তাঁহার অসীম অনুগ্রহস্বরূপ সর্বাধিক সম্মানিত ফেরেশতা হযরত জিবরাঈل (আ) এই কূপ প্রবাহিত করেন। একজন নবী ও তাঁহার পুণ্যবতী মাতা সর্বপ্রথম এই কূপের পানি পান করায় ইতিহাসে ইহার মর্যাদা বৃদ্ধি পাইয়াছে (তারীখুল কাবীম, ৩খ, পৃ. ৬৭)। কথিত আছে যে, এই পানি পান করার সঙ্গে সঙ্গে হযরত হাজার (রা)-এর স্তনদ্বয় তাঁহার সন্তানের জন্য দুগ্ধে পূর্ণ হইয়া যায় (তারীখুল কাবীম, ৩খ, পৃ. ৫৯)। এই কূপের বরকতেই ধূসর মরুতে মানববসতি গড়িয়া উঠে। হযরত আলী (রা) বলেন, পৃথিবীর বুকে সর্বোত্তম কূপ হইল যমযম (তারীখুল কাবীম, ৩খ, পৃ. ৬৭)।
এই কূপটি কা'বা ঘরের পাদদেশ এবং আল্লাহ্র দুই নিদর্শন সাফা-মারওয়া পর্বতদ্বয়ের সহিত সংযুক্ত। হাজারুল আসওয়াদমুখী নালাটি জান্নাত হইতে প্রবাহিত হওয়ায় জান্নাতের কূপের সঙ্গে এই কূপের যোগসূত্র স্থাপিত হইয়াছে এবং স্বয়ং কূপটিও আল্লাহ্ এক নিদর্শন।
সুদূর অতীত হইতে আম্বিয়ায়ে কিরাম, আল্লাহর অনুগ্রহপ্রাপ্ত মহান বান্দাগণ, সিদ্দীকীন, সালিহীন প্রমুখ এই কূপের পানি পান করিয়াছেন এবং এখনও পান করা হইতেছে। ইব্ন আব্বাস (রা)-এর মতে সত্তরজন এবং মুজাহিদ (র)-এর মত পঁচাত্তরজন নবী-রাসূল (আ) কা'বা ঘরের চত্বরে আসেন এবং হযরত মূসা (আ) ও তাঁহাদের অন্তর্ভুক্ত। এই উপলক্ষে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নবী উক্ত কূপের পানি পান করিয়া ইহার মর্যাদা বর্ধিত করিয়া থাকিবেন (তা'রীখুল কাবীম, ৩খ, পৃ. ১১৫)।
মহানবী (সা)-এর যতবার শাক্কু'স-সদর (বক্ষস্থল বিদীর্ণকরণ) হইয়াছে ততবার তাঁহার কলব এই কূপের পানি দ্বারা ধৌত করা হইয়াছে। তিনি এই কূপের পানি পান করিয়াছেন এবং অন্যদেরকে তাহা পান করিতে উৎসাহিত করিয়াছেন (বিস্তারিত দ্র. তা'রীখুল কাবীম, ৩খ, পৃ. ৬৬-৭১)।
এই বরকতময় কূপ আল্লাহ্র রহমতে কিয়ামত পর্যন্ত অটুক থাকিবে। দাহ্হাক (র) বলেন, কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার পূর্বে ইহার পানির উৎস বন্ধ হইয়া যাইবে এবং এইভাবে কূপটি বিলীন হইয়া যাইবে (অযরাকীর তারীখ মাক্কা-এর বরাতে তারীখুল কাবীম, ৩খ, পৃ.৭৫)।
যমযম কূপ সম্পর্কিত হুকুম ও ইহার পানির বহুমুখী ব্যবহার
এই কূপের চত্বর মসজিদের অন্তর্ভুক্ত বিধায় এখানে সালাত আদায় করা, ই'তিকাফ করা ইত্যাদি জাইয। এখানে নাপাক অবস্থায় প্রবেশ করা বা বসা, থুথু বা আবর্জনা ইত্যাদি নিক্ষেপ করা নিষিদ্ধ। ইহা হানাফী মাযহাবের অভিমত এবং অন্যান্য মাযহাবের অধিকাংশ আলিমের অভিমতও ইহাই। আবদুল মুত্তালিব যখন কূপ খনন শুরু করেন তখন কুরায়শরা তাহাকে বলিল, আমরা আপনাকে মূর্খ মনে করি না, কিন্তু আপনি আমাদের মসজিদে খননকার্য করিয়া কেন তাহা নষ্ট করিতেছেন? এই কথার দ্বারা পূর্বোক্ত মতের সমর্থন পাওয়া যায় (বিস্তারিত দ্র. তারীখুল কাবীম, ৩খ, পৃ. ১০১-১০৫)।
অনুরূপভাবে যমযমের পানিও যাবতীয় প্রয়োজনে ব্যবহার করার ব্যাপারে বিধিনিষেধ আছে।
টিকাঃ
১. আল ফাসী বলেন, চারি মাযহাবের সর্বসম্মত রায় অনুযায়ী যমযম কূপের পানি অন্য স্থানে বা দেশান্তরে লইয়া যাওয়া বৈধ, বরং শাফিঈ ও মালিকী মাযহাবমতে উহা মুস্তাহাব।
📄 যমযম কূপ সম্পর্কিত হুকুম ও ইহার পানির বহুমুখী ব্যবহার
যমযম কূপ সম্পর্কিত হুকুম ও ইহার পানির বহুমুখী ব্যবহার
এই কূপের চত্বর মসজিদের অন্তর্ভুক্ত বিধায় এখানে সালাত আদায় করা, ই'তিকাফ করা ইত্যাদি জাইয। এখানে নাপাক অবস্থায় প্রবেশ করা বা বসা, থুথু বা আবর্জনা ইত্যাদি নিক্ষেপ করা নিষিদ্ধ। ইহা হানাফী মাযহাবের অভিমত এবং অন্যান্য মাযহাবের অধিকাংশ আলিমের অভিমতও ইহাই। আবদুল মুত্তালিব যখন কূপ খনন শুরু করেন তখন কুরায়শরা তাহাকে বলিল, আমরা আপনাকে মূর্খ মনে করি না, কিন্তু আপনি আমাদের মসজিদে খননকার্য করিয়া কেন তাহা নষ্ট করিতেছেন? এই কথার দ্বারা পূর্বোক্ত মতের সমর্থন পাওয়া যায় (বিস্তারিত দ্র. তারীখুল কাবীম, ৩খ, পৃ. ১০১-১০৫)।
অনুরূপভাবে যমযমের পানিও যাবতীয় প্রয়োজনে ব্যবহার করার ব্যাপারে বিধিনিষেধ আছে।
টিকাঃ
১. আল ফাসী বলেন, চারি মাযহাবের সর্বসম্মত রায় অনুযায়ী যমযম কূপের পানি অন্য স্থানে বা দেশান্তরে লইয়া যাওয়া বৈধ, বরং শাফিঈ ও মালিকী মাযহাবমতে উহা মুস্তাহাব।
📄 ইসমাঈল (আ)-কে কুরবানীর নির্দেশ
আল্লাহ তা'আলা হযরত ইবরাহীম (আ)-এর যে কয়টি কঠিন পরীক্ষা গ্রহণ করেন, একমাত্র পুত্র ইসমাঈল (আ)-কে কুরবানীর নির্দেশ সম্বলিত পরীক্ষা তার অন্যতম। নবী-রাসূলগণ নিজ নিজ মর্যাদা ও স্থান অনুযায়ী পরীক্ষার সম্মুখীন হইয়া থাকেন (কাসাসুল কুরআন, ১খ, পৃ. ২৩৫)। তিনি স্বপ্নযোগে নিজ পুত্রকে কুরবানী করার নির্দেশ প্রাপ্ত হন এবং "নবী-রাসূলগণের স্বপ্ন জাগ্রত অবস্থায় প্রাপ্ত ওহীর সমতুল্য” (তাফসীরে ইব্ন কাছীর, ৩খ, পৃ. ১৮৬; তাফসীরে রূহুল মা'আনী, ২৩খ, পৃ. ১২৮ ইত্যাদি)। তিনি পরপর তিন রাত্র স্বপ্ন দর্শন করেন যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে তাঁহার একমাত্র পুত্রকে কুরবানী করার নির্দেশ দিতেছেন (মাআরিফুল কোরআন, বাংলা, অনু. ৭খ, পৃ. ১৪৫; কাসাসুল কুরআন, ১খ, পৃ. ২৩৬)। কতক মুফাসসিরের মতে ইবরাহীম (আ) সরাসরি নিজ পুত্রকে কুরবানী করিতেছেন এইরূপ স্বপ্ন দেখিয়াছিলেন (নাজ্জার, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ১০১)। হযরত ইবরাহীম (আ) সর্বপ্রথম যিলহজ্জ মাসের সাত তারিখ দিবাগত আট তারিখের রাত্রে এই স্বপ্ন দর্শন করেন। সারাটি দিন তাঁহার উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও দুশ্চিন্তার মধ্যে অতিবাহিত হয় যে, স্বপ্নটি কি আল্লাহর পক্ষ হইতে না ইহা শয়তানের চক্রান্ত? তাই এই দিনটি ইয়াওমুত তারবিয়াহ (উৎকণ্ঠার দিন) নামে অভিহিত হয়। আট তারিখ দিবাগত রাত্রে তিনি পুনরায় একই স্বপ্ন দর্শন করেন এবং অনুধাবন করেন যে, ইহা আল্লাহ্র একটি নির্দেশ। তাই এই দিনটির নামকরণ করা হয় ইয়াওমুন নাহ্ বা কুরবানীর দিন (তাফসীরে কবীর, ২৬খ, পৃ. ১৫৩; তাফসীরে রূহুল মা'আনী, ২৩খ, পৃ. ১২৮; কুরতুবীর আহকামুল কুরআনের বরাতে মাআরিফুল কোরআন, বাংলা অনু, ৭খ, পৃ. ৪৪৫; কাসাসুল কুরআন, ১খ পৃ. ২৩৬)। স্বপ্নের ভিন্নতর ব্যাখ্যা করার অবকাশ থাকা সত্ত্বেও হযরত ইবরাহীম (আ) আল্লাহর নির্দেশের সামনে মাথা নত করিয়া দেন (তাফসীরে কবীরের বরাতে মাআরিফুল কোরআন, ৭খ, পৃ. ৪৪৫)।