📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 খতনার সুন্নাত প্রবর্তন

📄 খতনার সুন্নাত প্রবর্তন


হযরত ইব্রাহীম (আ) ও তাঁহার স্ত্রী হযরত সারা উভয়েরই বৃদ্ধাবস্থায় সন্তান জন্মদানের বিষয়টিতে হযরত সারা আশ্চর্যান্বিত হইয়াছিলেন। কুরআন কারীমে বলা হইয়াছে: قَالَتْ يَا وَيْلَتَا وَالِدُ وَأَنَا عَجُوزٌ وَهُذَا بَعْلِى شَيْئًا إِنْ هَذَا شَيْءُ عَجِيبٌ . "সে (সারা) বলিল, কী আশ্চর্য! সন্তানের জননী হইব আমি, যখন আমি বৃদ্ধা এবং এই আমার স্বামী বৃদ্ধ! ইহা অবশ্যই একটি অদ্ভুত ব্যাপার" (১১: ৭২)।
আরও বলা হইয়াছে:
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي وَهَبَ لِي عَلَى الْكِبَرِ اسْمَاعِيلَ وَاسْحَقَ إِنَّ رَبِّي لَسَمِيعُ الدُّعَاءِ . "(ইব্রাহীম বলিলেন) সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্ প্রাপ্য, যিনি আমাকে আমার বার্দ্ধক্যে ইসমাঈل و ইসহাককে দান করিয়াছেন। আমার প্রতিপালক অবশ্যই প্রার্থনা শুনিয়া থাকেন" (১৪: ৩৯)।
অন্যত্র বলা হইয়াছে:
وَوَهَبْنَا لَهُ إِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ نَافِلَةً وَكُلًّا جَعَلْنَا صَالِحِينَ . "আমরা তাহাকে (ইব্রাহীমকে) দান করিয়াছিলাম ইসহাক এবং পৌত্ররূপে ইয়া'কূব এবং প্রত্যেককেই করিয়াছিলাম সৎকর্মপরায়ণ" (২১: ৭২)।
কুরআন কারীমের উল্লিখিত আয়াতসমূহে হযরত ইব্রাহীম (আ)-কে যে পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হইয়াছিল তিনিই হযরত ইসহাক (আ)। সূরা হূদ-এ (আয়াত ৭১) তাঁহার নামও স্পষ্টরূপে উল্লিখিত হইয়াছে। প্রাচ্যবিদগণ তাওরাতের ভাষ্য মিদরাস (R. Gena, ৫৫, Tachuna Gen., ৪০)-এর কোন কোন বর্ণনার উদ্ধৃতি দিয়া বলেন যে, সেই মেহমানগণ হযরত ইবরাহীম (আ)-কে ইহাও বলিলেন যে, ইহাকে আল্লাহ্ নামে কুরবানীর নিমিত্ত যবেহ করিতে হইবে। এই বর্ণনা সঠিক নহে। অনুরূপভাবে এই বর্ণনাও সঠিক নহে যে, ইসহাক ('আ)-এর বয়স সাত বৎসর হইলে ইব্রাহীম (আ) তাঁহাকে বায়তুল মাকদিস লইয়া যান, সেখানে তাঁহার প্রতি স্বপ্নাদেশ হইল যে, উহাকে আল্লাহ্ রাহে কুরবানী কর। সকালে তিনি একটি ষাঁড় আল্লাহ্ নামে যবেহ করিলেন। কিন্তু রাত্রে পুনরায় গায়েব হইতে আওয়ায আসিল, "আল্লাহ ইহার চেয়ে অধিক মূল্যবান বস্তুর কুরবানী চাহেন।” সুতরাং তিনি এইবার একটি উট যবেহ করিলেন। পরের রাত্রে তিনি এই আওয়ায শুনিলেন, আল্লাহ তোমার পুত্রের কুরবানী চাহেন। প্রাচ্যবিদগণ উপরিউক্ত ঘটনাকে ইসহাক (আ)-এর সহিত সম্পৃক্ত বলিয়া ধারণা করত তাঁহাকে যাবীহুল্লাহ (আল্লাহ্ নামে কুরবানীকৃত) বলিয়া আখ্যায়িত করেন। অথচ তাওরাত ও কুরআন কারীমের ঘটনা দ্বারা এই উভয় রিওয়ায়াতই প্রত্যাখ্যাত হইয়া যায়।
আল্লাহ্ তাআলা হযরত ইব্রাহীম (আ)-কে তাঁহার "একমাত্র পুত্র”-কে কুরবানী করিবার নির্দেশ দিয়াছিলেন, যাহা বাইবেলেও (আদি পুস্তক) উক্ত হইয়াছে "Thine Only Son" (Genesis, 22: 2)। আর ইসহাক (আ) ইব্রাহীম (আ)-এর একমাত্র পুত্র ছিলেন না। তাঁহার পূর্বে ইসমাঈل (আ) জন্মগ্রহণ করেন। Genesis, ১৬: ১৬ অনুযায়ী ইব্রাহীম (আ)-এর ৮৬ বৎসর বয়সে ইসমাঈল (আ)-এর জন্ম এবং Genesis ২১ : ৫ অনুযায়ী তাঁহার ১০০ বৎসর বয়সে ইসহাক (আ)-এর জন্ম। অতএব ইসমাঈল (আ) ইসহাক (আ) হইতে ১৪ বৎসরের বড় ছিলেন। সুতরাং আল্লাহ্ এই নির্দেশকালে ইসমাঈل (আ)-ই ছিলেন তাঁহার একমাত্র পুত্র। অতএব তাঁহাকেই যবেহ করার নির্দেশ দেওয়া হয় [বিস্তারিত দ্র. ইসমাঈল (আ) শীর্ষক নিবন্ধ]।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বালক ইসমাঈল (আ) ও তাঁহার ভাষার পরিবর্তন

📄 বালক ইসমাঈল (আ) ও তাঁহার ভাষার পরিবর্তন


শৈশবকাল হইতে ইসমাঈল (আ) জুরহুম গোত্রের লোকদের নিকট আরবী ভাষা শিক্ষা করেন। এই প্রসঙ্গে মহানবী (সা) বলেন: أَوَّلُ مَا فُتِقَ لِسَانُهُ بِالعَرَبِيَّةِ المُبَيِّنَةِ اسْمَاعِيلُ وَهُوَ ابْنُ أَرْبَعَ عَشَرَ سَنَةً . "সর্বপ্রথম স্পষ্ট আরবী ভাষা ইসমাঈল (আ)-এর মুখে ফুটিয়া উঠে; তখন তিনি ছিলেন চৌদ্দ বৎসরের বালক" (শীরাযীর আলকাব গ্রন্থের বরাতে কানযুল উম্মাল, ১১ খ, পৃ. ৪৯০, নং ৩২৩০৯)।
الهم اسْمَاعِيلُ هَذَا النِّسَانَ الْعَرَبِيُّ الْهَامًا "ইসমাঈল (আ)-এর অন্তরে আরবী ভাষা শিক্ষার অনুপ্রেরণা সঞ্চারিত হইয়াছিল" (ঐ গ্রন্থ, ১১খ, নং ৩২৩১১; হাকেম ও ইবন হিব্বানের আস-সাহীহ গ্রন্থের বরাতে)।
বালক ইসমাঈل (আ) তীরন্দাজী, অশ্বারোহণ, শিকার ও কুস্তি শিক্ষা করেন। বংশবিশারদ ও জীবনীকারগণ বলেন যে, ইসমাঈل (আ)-ই সর্বপ্রথম ঘোড়াকে পোষ মানাইয়া উহাকে বাহন হিসাবে কাজে লাগান। ইহার পূর্বে অশ্ব ছিল বন্য প্রাণী। মহানবী (সা) বলেন: اتَّخِذُوا الْخَيْلَ وَاعْتَبَقُوهَا فَإِنَّهَا مِيْرَاثُ أَبِيْكُمْ إِسْمَاعِيلَ . "তোমরা ঘোড়া পোষো এবং উহার প্রতি যত্নবান হও। কেননা উহা তোমাদের পূর্বপুরুষ ইসমাঈল (আ)-এর পরিত্যক্ত সম্পদ" (সাঈদ ইব্‌ن ইয়াহ্ইয়া আল-উমাবীর আল-মাগাযী গ্রন্থের বরাতে বিদায়া, ২খ. পৃ. ১৯২)।
ইসমাঈল (আ) যৌবনে একজন পারদর্শী তীরন্দায ছিলেন, বাইবেল এবং মহানবী (সা)-এর হাদীছে যাহার স্বীকৃতি বিদ্যমান। তিনি শিকারকার্য করিয়া জীবিকা নির্বাহ করিতেন (বরাতের জন্য দ্র. ইতিপূর্বে উদ্ধৃত দীর্ঘ হাদীছ)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 কুরআন মজীদে হযরত ইসমাঈল (আ)

📄 কুরআন মজীদে হযরত ইসমাঈল (আ)


কুরআন মজীদের মোট নয়টি সূরায় হযরত ইসমাইল (আ) সম্পর্কে উল্লেখ আছে। তন্মধ্যে বারো স্থানে তাঁহার নামোল্লেখসহ আলোচনা রহিয়াছে। (দ্র. ২ঃ ১২৫, ১২৭, ১৩৩, ১৩৬, ১৪০; ৩ঃ ৮৪; ৪: ১৬৩; ৬:৮৬; ১৪ : ৩৯; ১৯: ৫৪; ২১:৮৫ ও ৩৮:৪৮)। ২ঃ ১২৪-১৪১ আয়াতে পিতা-পুত্রের কা'বা ঘর নির্মাণ, তৎসংক্রান্ত দু'আ এবং ইবরাহীম পরিবারের তৌহীদী আদর্শের আলোচনা, ১৪: ৩৯-৪১ আয়াতে মাতা-পুত্রকে মক্কায় স্থানান্তর ও ইবরাহীম (আ)-এর আবেগাপ্লুত দু'আ এবং ৩৭: ১০০-১১৩ আয়াতে কুরবানী সংক্রান্ত ঘটনা আলোচিত হইয়াছে। অবশিষ্ট সূরাসমূহে তাঁহার সম্পর্কে খুবই সংক্ষিপ্ত উল্লেখ আছে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 যমযম কূপের পূর্বকথা

📄 যমযম কূপের পূর্বকথা


ইব্‌ن আব্বাস (রা) কর্তৃক বর্ণিত দীর্ঘ হাদীছে বলা হইয়াছে যে, ইবরাহীম (আ) স্ত্রী ও পুত্রের জন্য যে যৎসামান্য পানি রাখিয়া গিয়াছিলেন তাহা ফুরাইয়া যাওয়ার পর হযরত হাজার (রা) পানি সংগ্রহের আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও তাহার কোন ব্যবস্থা করিতে না পারিয়া নিরাশ হইয়া পড়িলেন। তিনি সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে ছুটাছুটির সময়ে মারওয়া পাহাড়ে উঠার পর একটি অদৃশ্য আহবান শুনিতে পান এবং বর্তমানে যেখানে যমযম কূপ অবস্থিত সেখানে একজন ফেরেশতাকে দেখিতে পান। ফেরেশতার পদাঘাতে বা ডানার আঘাতে মাটির অভ্যন্তর হইতে পানির উৎস নির্গত হইল। হযরত হাজার (রা) ইহার চারিপাশে আইل বাঁধিয়া উহাকে কূপের রূপ দান করিলেন (বুখারী, বাংলা অনু., ৩খ, পৃ. ৩৫৭-৮, নং ৩১১4)। এই কূপই "যমযম কূপ” নামে ইতিহাস খ্যাত। ইহাই যমযম কূপের আদি উৎস। যমযম শব্দের আভিধানিক অর্থ নির্ণয়ে মতভেদ আছে। ইবন হিশামের মতে আরবদের নিকট زمزمة শব্দের অর্থ প্রাচুর্য, সঞ্চিত হইয়া জমা হওয়া। যেহেতু সূচনা হইতেই ইহাতে পানির প্রাচুর্য লক্ষ্য করা গিয়াছে এবং ব্যবহারের ফলে পানি হ্রাস প্রাপ্ত না হইয়া সঙ্গে সঙ্গে পরিপূর্ণ হইয়া গিয়াছে, তাই ইহার এই নামকরণ। ভিন্ন মতে শব্দটির অর্থ গর্জন, নাদ, শব্দধ্বনি; হযরত হাজার (রা) অদৃশ্য শব্দধ্বনি শ্রবণ করিয়া কূপের সন্ধান লাভ করিয়াছিলেন। ভিন্নমতে যমযম শব্দ হইতে উক্ত নামকরণ হইয়াছে। শব্দটির অর্থ অবরুদ্ধ হওয়া, শক্ত করিয়া বাঁধা। হাজার (রা) কূপের চারিদিকে বাঁধ নির্মাণ করিয়া পানি অবরুদ্ধ করিয়াছেন। বাঁধ দিয়া আটক করা না হইলে কূপের পানি মাটির উপর দিয়া গড়াইয়া যাইত। ইব্‌ন আব্বাস (রা)-এর এই মত। হারাবীর মতে زَمْزَمَةُ الْمَاءِ শব্দের অর্থ 'পানির শব্দ' এবং এজন্য কূপটির উক্ত নামকরণ। ইয়া'কূব আল-হামাবী লিখিয়াছেন যে, পানির প্রাচুর্যের কারণেই কূপটির 'যমযম' নামকরণ করা হইয়াছে। মুহাম্মাদ ইব্‌ন ইসহাক আল-ফাকিহী তাঁহার "আখবার মাক্কাতা ফী কাদীমি'د-দাহহি ওয়া হাদীছিহি” গ্রন্থে যমযম কূপের চৌত্রিশটি অর্থবোধক নাম উল্লেখ করিয়াছেন (মক্কা শরীফের ইতিকথা, পৃ. ৫৮-৬১; তারীখু'ل-কাবীم, ৩খ, পৃ. ৯৫; মু'জামুল-বুলدان, ৩খ, পৃ. ১৪৭-৮)।
যেহেতু কা'বা শরীফ হযরত আদম (আ)-এর যুগ হইতেই বর্তমান স্থানে বিদ্যমান ছিল, হয়ত কালের প্রবাহে কখনও কখনও গৃহকাঠামো অবলুপ্ত হইয়াছে, তাই নিশ্চয়ই তখন হইতেই এখানে পানির ব্যবস্থাও বিদ্যমান থাকার কথা। আল্লাহর ইবাদতে লিপ্ত হওয়ার উদ্দেশে পানি হইল পবিত্রতা অর্জনের অন্যতম উপাদান। তাই এই মহাসম্মানিত গৃহের সংলগ্ন পানি ব্যবস্থাও নিশ্চয়ই ছিল।
সকল ঐতিহাসিকের জন্য ইব্‌ن আব্বাস (রা)-র হাদীছই যমযমের আদি ইতিহাসের উৎস। আল্লাহ তা'আলা হযরত ইবরাহীম ও ইসমাঈল (আ)-এর দু'আ (দ্র. ২: ১২৬-২৯ এবং ১৪: ৩৫-৮) এবং স্বামী-স্ত্রী ও পুত্রের আল্লাহ্ জন্য নিবেদিতপ্রাণ হওয়ার উসীলায় এমন বরকত দান করিলেন যে, এই যমযম কূপকে কেন্দ্র করিয়া স্বল্প কালের মধ্যে মক্কার বিজন প্রান্তর মানুষের কোলাহলে মুখরিত হইয়া উঠিল। প্রাথমিক পর্যায়ে আরবের একটি আদি গোত্র 'জুরহুম' হযরত হাজার (রা)-এর অনুমতিপ্রাপ্ত হইয়া এখানে বসতি স্থাপন করে এবং হযরত ইসমাঈل (আ) যৌবনে পদার্পণ করিয়া এই গোত্রে বিবাহ করেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00