📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 জন্ম ও বংশপরিচয়

📄 জন্ম ও বংশপরিচয়


হযরত ইসহাক (আ) একজন বিশিষ্ট নবী। তিনি মহান নবী হযরত ইব্রাহীম খলীলুল্লাহ (আ)-এর দ্বিতীয় পুত্র। তাঁহার বংশতালিকা হইল : ইসহাক ইব্‌ন ইব্রাহীম ইব্‌ন তারিহ (বা আযর) ইব্‌ন নাহুর ইব্‌ন সারুগ ইব্‌ন রাউ ইব্‌ন ফালিগ ইব্‌ন আবির ইব্‌ন শালিখ ইব্‌ন আরফাখশাজ ইব্‌ন সাম ইব্‌ن নূহ (আ) (ইব্‌ন কুতায়বা, আল-মা'আরিফ, পৃ. ১৯)। সাম ইব্‌ن নূহ ('আ)-এর বংশধরগণ ইতিহাসে সামী বা সেমিটিক জাতি হিসাবে পরিচিত। সুতরাং হযরত ইসহাক (আ)-এর পূর্বপুরুষগণ সেমিটিক জাতিরই অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তবে সাম ইব্‌ন নূহ ('আ) এবং হযরত ইসহাক ('আ)-এর মধ্যে সময়ের ব্যবধান ছিল এক হাজার বৎসরেরও অধিক (মুহাম্মাদ আলী আস-সাবৃনী, আন-নুবুওয়াত ওয়া'ل-আম্বিয়া, পৃ. ১৪৬)।
নমরুদের অগ্নিকুণ্ড হইতে বাহির হইয়া হযরত ইব্রাহীম ('আ) ভ্রাতুষ্পুত্র হযরত লূত (আ)-সহ তাঁহার পরিবার-পরিজনকে লইয়া দেশত্যাগ করিয়া ইরাকের বাবিল শহর হইতে শাম (সিরিয়া) চলিয়া যান। বিদেশ-বিভূঁইয়ে পৌছিয়া তিনি অত্যন্ত চিন্তিত হইয়া পড়িলেন। অবশেষে তিনি কানআন (ফিলিস্তীন) অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসবাস করিতে লাগিলেন (ইব্‌ন কুতায়বা, পৃ. ২০)। তাঁহার একান্ত বাসনা ছিল এবং তিনি আল্লাহ তাআলার নিকট দুআও করিয়াছিলেন : رَبِّ هَبْ لِي مِنَ الصَّالِحِينَ. "হে আমার প্রতিপালক! আমাকে একটি সৎকর্মপরায়ণ সন্তান দান কর" (৩৭: ১০০)।
তাঁহার প্রথমা স্ত্রী সারা বিন্ত লাবান ইব্‌ন বাছবীল ইব্‌ন না'হুর, যিনি ইবরাহীম ('আ)-এর পরিবারের সহিত সম্পৃক্ত ছিলেন (ইবন হাবীব, আল-মুহাব্বার, পৃ. ৩৯৪; আল-মাস'উদী, মুরূজু'য-যাহাব, ১খ., পৃ. ৮৫)। তাঁহার কোন সন্তান ছিল না। অতঃপর তাঁহার দ্বিতীয় স্ত্রী হাজার (হাজিরা)-এর গর্ভে তাঁহার প্রথম সন্তান হযরত ইসমাঈল (আ) জন্মগ্রহণ করেন। অতঃপর দীর্ঘকাল পর কানআনে অবস্থানকালেই তাঁহার প্রথমা স্ত্রী সারার গর্ভে তাঁহার দ্বিতীয় সন্তান হযরত ইসহাক (আ) জন্মগ্রহণ করেন।
হযরত ইসহাক (আ)-এর জন্ম-সংক্রান্ত আল-কুরআনে যে ঘটনা বিবৃত হইয়াছে উহার সারাংশ হইল : হযরত ইব্রাহীম (আ)-এর নিকট কিছু সম্মানিত মেহমান (ফেরেশতা) আসিলেন। তিনি তাঁহাদের জন্য একটি মাংসল গো-বৎস ভাজা লইয়া আসিলেন এবং তাঁহাদিগকে খাইতে বলিলেন, কিন্তু তাঁহারা হাত গুটাইয়া রাখিলেন। ইহাতে ইব্রাহীম (আ) কিছুটা ভীত হইয়া পড়িলেন। তাঁহারা বলিলেন, "ভয় করিবেন না, আমাদিগকে লূত ('আ)-এর মহল্লায় প্রেরণ করা হইয়াছে”। ইহার পর তাঁহারা হযরত ইব্রাহীম ('আ)-কে একটি পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিলেন। আল-কুরআনে উল্লেখ করা হইয়াছে :
وَامْرَاتُهُ قَائِمَةً فَبَشِّرْنَهَا بِإِسْحَاقَ وَمِنْ وَرَاءِ إِسْحَاقَ يَعْقُوبَ . "তাহার স্ত্রী তথায় দণ্ডায়মান ছিল। অতঃপর আমি তাহাকে ইসহাকের ও ইসহাকের পরবর্তীতে ইয়া'كُوبَ সুসংবাদ দিলাম" (১১ঃ ৭১)।
আরও উল্লেখ করা হইয়াছে: فَأَقْبَلَتِ امْرَأَتُهُ فِي صَرَّةٍ فَصَكَّتْ وَجْهَهَا وَقَالَتْ عَجُوزٌ عَقِيمٌ . "তখন তাহার স্ত্রী চিৎকার করিতে করিতে সম্মুখে আসিল এবং গাল চাপড়াইয়া বলিল, এই বৃদ্ধা বন্ধ্যার সন্তান হইবে" (৫১ঃ ২৯)?

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 খতনার সুন্নাত প্রবর্তন

📄 খতনার সুন্নাত প্রবর্তন


হযরত ইব্রাহীম (আ) ও তাঁহার স্ত্রী হযরত সারা উভয়েরই বৃদ্ধাবস্থায় সন্তান জন্মদানের বিষয়টিতে হযরত সারা আশ্চর্যান্বিত হইয়াছিলেন। কুরআন কারীমে বলা হইয়াছে: قَالَتْ يَا وَيْلَتَا وَالِدُ وَأَنَا عَجُوزٌ وَهُذَا بَعْلِى شَيْئًا إِنْ هَذَا شَيْءُ عَجِيبٌ . "সে (সারা) বলিল, কী আশ্চর্য! সন্তানের জননী হইব আমি, যখন আমি বৃদ্ধা এবং এই আমার স্বামী বৃদ্ধ! ইহা অবশ্যই একটি অদ্ভুত ব্যাপার" (১১: ৭২)।
আরও বলা হইয়াছে:
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي وَهَبَ لِي عَلَى الْكِبَرِ اسْمَاعِيلَ وَاسْحَقَ إِنَّ رَبِّي لَسَمِيعُ الدُّعَاءِ . "(ইব্রাহীম বলিলেন) সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্ প্রাপ্য, যিনি আমাকে আমার বার্দ্ধক্যে ইসমাঈل و ইসহাককে দান করিয়াছেন। আমার প্রতিপালক অবশ্যই প্রার্থনা শুনিয়া থাকেন" (১৪: ৩৯)।
অন্যত্র বলা হইয়াছে:
وَوَهَبْنَا لَهُ إِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ نَافِلَةً وَكُلًّا جَعَلْنَا صَالِحِينَ . "আমরা তাহাকে (ইব্রাহীমকে) দান করিয়াছিলাম ইসহাক এবং পৌত্ররূপে ইয়া'কূব এবং প্রত্যেককেই করিয়াছিলাম সৎকর্মপরায়ণ" (২১: ৭২)।
কুরআন কারীমের উল্লিখিত আয়াতসমূহে হযরত ইব্রাহীম (আ)-কে যে পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হইয়াছিল তিনিই হযরত ইসহাক (আ)। সূরা হূদ-এ (আয়াত ৭১) তাঁহার নামও স্পষ্টরূপে উল্লিখিত হইয়াছে। প্রাচ্যবিদগণ তাওরাতের ভাষ্য মিদরাস (R. Gena, ৫৫, Tachuna Gen., ৪০)-এর কোন কোন বর্ণনার উদ্ধৃতি দিয়া বলেন যে, সেই মেহমানগণ হযরত ইবরাহীম (আ)-কে ইহাও বলিলেন যে, ইহাকে আল্লাহ্ নামে কুরবানীর নিমিত্ত যবেহ করিতে হইবে। এই বর্ণনা সঠিক নহে। অনুরূপভাবে এই বর্ণনাও সঠিক নহে যে, ইসহাক ('আ)-এর বয়স সাত বৎসর হইলে ইব্রাহীম (আ) তাঁহাকে বায়তুল মাকদিস লইয়া যান, সেখানে তাঁহার প্রতি স্বপ্নাদেশ হইল যে, উহাকে আল্লাহ্ রাহে কুরবানী কর। সকালে তিনি একটি ষাঁড় আল্লাহ্ নামে যবেহ করিলেন। কিন্তু রাত্রে পুনরায় গায়েব হইতে আওয়ায আসিল, "আল্লাহ ইহার চেয়ে অধিক মূল্যবান বস্তুর কুরবানী চাহেন।” সুতরাং তিনি এইবার একটি উট যবেহ করিলেন। পরের রাত্রে তিনি এই আওয়ায শুনিলেন, আল্লাহ তোমার পুত্রের কুরবানী চাহেন। প্রাচ্যবিদগণ উপরিউক্ত ঘটনাকে ইসহাক (আ)-এর সহিত সম্পৃক্ত বলিয়া ধারণা করত তাঁহাকে যাবীহুল্লাহ (আল্লাহ্ নামে কুরবানীকৃত) বলিয়া আখ্যায়িত করেন। অথচ তাওরাত ও কুরআন কারীমের ঘটনা দ্বারা এই উভয় রিওয়ায়াতই প্রত্যাখ্যাত হইয়া যায়।
আল্লাহ্ তাআলা হযরত ইব্রাহীম (আ)-কে তাঁহার "একমাত্র পুত্র”-কে কুরবানী করিবার নির্দেশ দিয়াছিলেন, যাহা বাইবেলেও (আদি পুস্তক) উক্ত হইয়াছে "Thine Only Son" (Genesis, 22: 2)। আর ইসহাক (আ) ইব্রাহীম (আ)-এর একমাত্র পুত্র ছিলেন না। তাঁহার পূর্বে ইসমাঈل (আ) জন্মগ্রহণ করেন। Genesis, ১৬: ১৬ অনুযায়ী ইব্রাহীম (আ)-এর ৮৬ বৎসর বয়সে ইসমাঈল (আ)-এর জন্ম এবং Genesis ২১ : ৫ অনুযায়ী তাঁহার ১০০ বৎসর বয়সে ইসহাক (আ)-এর জন্ম। অতএব ইসমাঈল (আ) ইসহাক (আ) হইতে ১৪ বৎসরের বড় ছিলেন। সুতরাং আল্লাহ্ এই নির্দেশকালে ইসমাঈل (আ)-ই ছিলেন তাঁহার একমাত্র পুত্র। অতএব তাঁহাকেই যবেহ করার নির্দেশ দেওয়া হয় [বিস্তারিত দ্র. ইসমাঈল (আ) শীর্ষক নিবন্ধ]।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বালক ইসমাঈল (আ) ও তাঁহার ভাষার পরিবর্তন

📄 বালক ইসমাঈল (আ) ও তাঁহার ভাষার পরিবর্তন


শৈশবকাল হইতে ইসমাঈল (আ) জুরহুম গোত্রের লোকদের নিকট আরবী ভাষা শিক্ষা করেন। এই প্রসঙ্গে মহানবী (সা) বলেন: أَوَّلُ مَا فُتِقَ لِسَانُهُ بِالعَرَبِيَّةِ المُبَيِّنَةِ اسْمَاعِيلُ وَهُوَ ابْنُ أَرْبَعَ عَشَرَ سَنَةً . "সর্বপ্রথম স্পষ্ট আরবী ভাষা ইসমাঈল (আ)-এর মুখে ফুটিয়া উঠে; তখন তিনি ছিলেন চৌদ্দ বৎসরের বালক" (শীরাযীর আলকাব গ্রন্থের বরাতে কানযুল উম্মাল, ১১ খ, পৃ. ৪৯০, নং ৩২৩০৯)।
الهم اسْمَاعِيلُ هَذَا النِّسَانَ الْعَرَبِيُّ الْهَامًا "ইসমাঈল (আ)-এর অন্তরে আরবী ভাষা শিক্ষার অনুপ্রেরণা সঞ্চারিত হইয়াছিল" (ঐ গ্রন্থ, ১১খ, নং ৩২৩১১; হাকেম ও ইবন হিব্বানের আস-সাহীহ গ্রন্থের বরাতে)।
বালক ইসমাঈل (আ) তীরন্দাজী, অশ্বারোহণ, শিকার ও কুস্তি শিক্ষা করেন। বংশবিশারদ ও জীবনীকারগণ বলেন যে, ইসমাঈل (আ)-ই সর্বপ্রথম ঘোড়াকে পোষ মানাইয়া উহাকে বাহন হিসাবে কাজে লাগান। ইহার পূর্বে অশ্ব ছিল বন্য প্রাণী। মহানবী (সা) বলেন: اتَّخِذُوا الْخَيْلَ وَاعْتَبَقُوهَا فَإِنَّهَا مِيْرَاثُ أَبِيْكُمْ إِسْمَاعِيلَ . "তোমরা ঘোড়া পোষো এবং উহার প্রতি যত্নবান হও। কেননা উহা তোমাদের পূর্বপুরুষ ইসমাঈল (আ)-এর পরিত্যক্ত সম্পদ" (সাঈদ ইব্‌ن ইয়াহ্ইয়া আল-উমাবীর আল-মাগাযী গ্রন্থের বরাতে বিদায়া, ২খ. পৃ. ১৯২)।
ইসমাঈল (আ) যৌবনে একজন পারদর্শী তীরন্দায ছিলেন, বাইবেল এবং মহানবী (সা)-এর হাদীছে যাহার স্বীকৃতি বিদ্যমান। তিনি শিকারকার্য করিয়া জীবিকা নির্বাহ করিতেন (বরাতের জন্য দ্র. ইতিপূর্বে উদ্ধৃত দীর্ঘ হাদীছ)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 কুরআন মজীদে হযরত ইসমাঈল (আ)

📄 কুরআন মজীদে হযরত ইসমাঈল (আ)


কুরআন মজীদের মোট নয়টি সূরায় হযরত ইসমাইল (আ) সম্পর্কে উল্লেখ আছে। তন্মধ্যে বারো স্থানে তাঁহার নামোল্লেখসহ আলোচনা রহিয়াছে। (দ্র. ২ঃ ১২৫, ১২৭, ১৩৩, ১৩৬, ১৪০; ৩ঃ ৮৪; ৪: ১৬৩; ৬:৮৬; ১৪ : ৩৯; ১৯: ৫৪; ২১:৮৫ ও ৩৮:৪৮)। ২ঃ ১২৪-১৪১ আয়াতে পিতা-পুত্রের কা'বা ঘর নির্মাণ, তৎসংক্রান্ত দু'আ এবং ইবরাহীম পরিবারের তৌহীদী আদর্শের আলোচনা, ১৪: ৩৯-৪১ আয়াতে মাতা-পুত্রকে মক্কায় স্থানান্তর ও ইবরাহীম (আ)-এর আবেগাপ্লুত দু'আ এবং ৩৭: ১০০-১১৩ আয়াতে কুরবানী সংক্রান্ত ঘটনা আলোচিত হইয়াছে। অবশিষ্ট সূরাসমূহে তাঁহার সম্পর্কে খুবই সংক্ষিপ্ত উল্লেখ আছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00