📄 হযরত লূত (আ)-এর ইনতিকাল
লূত (আ)-এর শেষ জীবন সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। তাঁহার সম্প্রদায়ের ধ্বংসের পর হয়তো তিনি আর দীর্ঘকাল জীবিত ছিলেন না। কারণ তিনি বেশি দিন জীবিত থাকিলে পুনরায় তাঁহার নবুওয়াতী দায়িত্ব পালন সম্পর্কিত অতিরিক্ত কিছু তথ্য অন্তত বাইবেল, কুরআন মজীদ ও ইতিহাসের গ্রন্থাবলীতে বিদ্যমান থাকিত। এই সকল উৎসই এই ব্যাপারে নীরব। বাইবেল ভিত্তিক বর্ণনা হইতে এতখানি জানা যায় যে, তিনি গযব নাযিলের পূর্বে সপরিবারে প্রথমে সোয়ার (Zoar) নামক শহরে গিয়া আশ্রয় গ্রহণ করেন, যাহা লূত সাগরের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত ছিল। অতঃপর তিনি অজ্ঞাত এক পর্বতের গুহায় দুই কন্যাসহ আশ্রয় গ্রহণ করেন (Ency. Brit., vol. 14, P. 401; Collier's Ency., vol. 15, P. 20)। তিনি এখানেই ইনতিকাল করেন কি না তাহা অজ্ঞাত এবং তাঁহার জীবনকাল সম্পর্কিত তথ্যও এখানেই শেষ। ইসলামী উৎসে বলা হইয়াছে যে, গযব নাযিলের পূর্বে তিনি সিরিয়া অভিমুখে প্রস্থান করেন (আল-কামিল, ১খ, পৃ. ৯৩; বিদায়া, ১খ, পৃ. ১৮১)।
লূত (আ) ছিলেন এমন একজন নবী যিনি নিজ সম্প্রদায়ের নিকট প্রেরিত না হইয়া, তাঁহার সহিত সম্পর্কহীন ভিন্ন সম্প্রদায়ের নিকট প্রেরিত হইয়াছিলেন। তাঁহার পর হইতে যে কোন জাতির নিকট সেই জাতিভুক্ত কোন মহান ব্যক্তিকে নবীরূপে প্রেরণ করা হইয়াছে। মহান আল্লাহ বলেন: وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَسُولٍ إِلَّا بِلِسَانِ قَوْمِهِ لِيُبَيِّنَ لَهُمْ . "আমি প্রত্যেক রাসূলকেই তাহার স্বজাতির ভাষাভাষী করিয়া পাঠাইয়াছি তাহাদের নিকট পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করিবার জন্য" (১৪:৪)।
মহানবী (স) বলেন: فَمَا بَعَثَ اللَّهُ بَعْدَهُ مِنْ نَبِي إِلَّا فِي ثَرْوَةٍ مِّنْ قَوْمِهِ . "আল্লাহ তা'আলা লুত (আ)-এর পর হইতে যে কোন জাতির নিকট তাহাদের মধ্যকার প্রভাবশালী বংশ হইতেই নবী প্রেরণ করিয়াছেন” (আল-মুসতাদরাক, ২খ, পৃ. ৫৬১)।
📄 বাইবেল ভিত্তিক বর্ণনার পর্যালোচনা
বাইবেল এবং বাইবেল ভিত্তিক সাহিত্যেও লূত (আ)-এর হিজরত, লুত জাতির কেন্দ্র, তাহাদের অপকর্ম, নবীর সতর্কবাণী, ফেরেশতাগণের আগমন, লূত (আ)-এর সপরিবারে নিরাপদ আশ্রয়ে প্রস্থান, অতঃপর তাহাদের উপর আল্লাহর গযব নাযিলের বিবরণ সামান্য পার্থক্যসহ মোটামুটি কুরআন মজীদ ও ঐতিহাসিক বর্ণনার সহিত সামঞ্জস্যপূর্ণ। খৃস্টান লেখকগণের রচিত বিশ্বকোষসমূহে লূত (LOT) শিরোনামের অধীনে বাইবেলের বর্ণনাই সন্নিবেশিত হইয়াছে (উদাহরণস্বরূপ দ্র. বাইবেলের আদিপুস্তক, ১১, ১২, ১৩; ১৪, ১৮ ও ১৯ অধ্যায় এবং লুক, ১৭ঃ ২৮-২৯; আরও দ্র. Ency. Brit., ১৯৬২ খৃ, ১৪খ, পৃ. ৪০১; Collier's Ency., vol. 15, P. 20; Ency. Religion, MacMillan & Co., New York 1987; Americana, vol 17, P. 758)।
কিন্তু বাইবেল হযরত লূত (আ) ও তাঁহার অবিবাহিতা কন্যাদ্বয়ের প্রতি এক চরম ঘৃণার্হ অপবাদ আরোপ করিয়াছে (দ্র. আদিপুস্তক, ১৯: ৩১-৩৮), যাহা বাস্তব পরিস্থিতি, বুদ্ধি, যুক্তি ও বিবেকের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। যে পরিস্থিতি হইতে আল্লাহ তা'আলা লূত-পরিবারকে রক্ষা করিয়াছেন, যেই প্রকারের নৈতিক পাপাচারের কারণে আল্লাহ তাআলা সাদৃমবাসীকে ধ্বংস করিয়াছেন, উন্নত নৈতিক গুণের কারণে তাহা হইতে পরিত্রাণপ্রাপ্ত একটি পরিবার কখনও নিকৃষ্ট নোংরামি ও ভ্রষ্টতায় লিপ্ত হইতে পারে না। পরিস্থিতির বিশ্লেষণপূর্বক মানুষের সুস্থ বুদ্ধি এই সাক্ষ্যই দিবে। কুরআন মজীদে হযরত লূত (আ)-এর যে মহান মর্যাদার উল্লেখ রহিয়াছে এবং তাঁহার স্ত্রী ব্যতীত তাঁহার পরিবারের সদস্যগণের যে প্রশংসা করা হইয়াছে, ইহার ভিত্তিতে বলা যায় যে, সেই পরিবারের প্রতি প্রচলিত বাইবেলে ঐরূপ জঘন্য একটি অপবাদ আরোপ করিয়া চরম অন্যায় করা হইয়াছে। হযরত লূত (আ) সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন: وَلُوطًا أَتَيْنَهُ حُكْمًا وَعِلْمًا وَنَجَّيْنَهُ مِنَ الْقَرْيَةِ الَّتِي كَانَتْ تَعْمَلُ الخَبْنْتَ .... وَأَدْخَلْتُهُ فِي رَحْمَتِنَا إِنَّهُ من الصلحين . "আর আমি লূতকে দিয়াছিলাম প্রজ্ঞা ও জ্ঞান এবং তাহাকে উদ্ধার করিয়াছিলাম এমন এক জনপদ হইতে যাহার অধিবাসীরা লিপ্ত ছিল অশ্লীল কর্মে... এবং আমি তাহাকে আমার অনুগ্রহভাজন করিয়াছিলাম। সে ছিল সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত" (২১ঃ ৭৪-৭৫)।